বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

অনিতা

প্রবল উৎসাহ নিয়ে অনিতা কাজ করছিল। ছাত্রদের উন্নতির জন্য নতুন নতুন কিছু জিনিস আমদানি করল। স্কুলের বাইরে যুব গোষ্ঠীতেও নাম লেখাল যাতে সমাজের জন্যও কিছু করা যায়।

জরিনা হাসান

অনুবাদ : শুভঙ্কর সাহা

স্কুলের দিনগুলো থেকেই অনিতা আমার ভাল বন্ধু। স্কুলে থাকাকালীন আমাদের এই ছোট্ট শহরে অনিতা ছিল এক পরিচিত মুখ, প্রায় সব বিষয়েই ও ছিল পারদর্শী। পড়াশুনায় ছিল এক নম্বর। কী অসাধারণ ডিবেট করত! নাট্য সংঘের ও ছিল নামী অভিনেত্রী আর আমার অবস্থানটা ছিল শুধুই দর্শকের। এটাই সব নয়। স্কুলের নেট-বল টিমের খেলোয়াড়ও ছিল অনিতা। আর আমি ছিলাম মাঠের বাইরে থেকে উৎসাহ দেওয়ার দলে।
আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ওকে দেখতেও বেশ লাগত। ওর ত্বক, চোখ চকচক করত ওর শারীরিক কর্মতৎপরতায়, বৌদ্ধিক দীপ্তিতে। ভাবটা ছিল বন্ধুতার, সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশত। যেখানেই থাকত, সেখানেই অনিতা মধ্যমণি। এটা একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল না যে অন্য স্কুলের ছেলেরা আমার সঙ্গে ভাব জমাত অনিতার কাছাকাছি পৌঁছনোর জন্য। অনিতার সঙ্গে কাউকে হাঁটতে দেখা গেলে সে গর্বিত হত। আমি জানতাম, স্কুলের অনেক মেয়েই ওকে ঈর্ষা করত, আবার মনে মনে ওর মতনই হতে চাইত।
আমিও কি ভাবিনি অনিতার মতো যদি ঝকঝকে বুদ্ধি থাকত আমার! গ্রামের লোকেদের মানোন্নয়নে অনিতা যখন ওর চিন্তাভাবনার কথা বলত, সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। আমি জানতাম, আমি কখনই ওর কাছাকাছিও পৌঁছতে পারব না। দর্শকদের সামনে মঞ্চের ওপরে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলে নির্ঘাৎ আমার হাঁটু কাঁপবে।
স্কুলের হলে, খেলার মাঠে যেসব ছেলের সঙ্গে দেখা হত, সবার সঙ্গেই ও বন্ধুত্ব করত। কিন্তু আমার চোখে পড়েনি যে ও কাউকে বিশেষ নজরে দেখছে। বুঝতে পারতাম, এ বিষয়ে ওর কোনও তাড়া ছিল না। হাতে অনেক সময় ছিল, সুযোগ ছিল— অকারণ ব্যস্ত হবে কেন।
আমরা একসঙ্গে সেই ক্লাস সিক্স থেকে। অনিতার অনেক বন্ধু জুটত। গুণগ্রাহীও। কিন্তু বিশেষ ছেলে-বন্ধু হিসেবে কাউকেই বাছেনি। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল আলাদা। আমার বেশি বন্ধু ছিল না, কিন্তু অনেকেই জানত, স্কুলবাসে আসত হালিম বলে যে ছেলেটা, তার সঙ্গে আমার বিশেষ ভাব ছিল। পরে অনিতা, হালিম আর আমি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। আমাদের থেকে অনিতার রেজাল্ট অনেক ভাল ছিল। ওর রেজাল্ট আমাদের কাছে, আমাদের স্কুলের কাছে গর্বের বিষয় ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়েও অনিতার কাজ যথারীতি চলতে লাগল। ছাত্র-নেত্রী হিসেবে ও অচিরেই উঠে এল। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সদস্যও নির্বাচিত হয়ে গেল। প্রথম বছরে থাকাকালীনই মালয় ভাষা পরিষদে ও নির্বাচিত হল। কয়েক মাসের মধ্যেই ও হয়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ মুখ। আমার ভাবতে ভাল লাগত, এই বিশেষ মানুষটি আমার জন্মভূমি থেকেই উঠে এসেছে।
ধীরে ধীরে ছাত্র সংগঠনের নেত্রী হিসেবে ও সারা দেশেই পরিচিত হল। অনিতার উন্নতি হল দ্রুত কিন্তু আমি সেই এক জায়গাতেই রয়ে গেলাম বা খুব সামান্য হয়তো বদল হল। তখনও আমার ক্লাসের শেষের দিকে বসাটাই পছন্দের। মুখ নিচু করে থাকা, হাত না তোলাদের দলে। একটু লুকিয়েই থাকা, পাছে মাস্টারমশাইরা কঠিন প্রশ্ন না করে বসেন। কিন্তু অনিতা প্রায়ই হাত তুলত আর অসাধারণ সব মতামত জানাত। অনেকের মতো আমিও একজন যারা মুগ্ধ হয়ে শুনত আর প্রয়োজনে খাতায় নোট নিত।
অনিতা সব বিষয়েই ছিল আগ্রহী। আর ওর ভাল লাগার জায়গা ছিল স্বেচ্ছাসেবী ছাত্রদলের কাজ। গ্রামীণ এলাকায় ঘুরে ঘুরে অঙ্ক আর বিজ্ঞানের পাঠ দিত ছেলেমেয়েদের। আসলে এই দুটো বিষয়ে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বরাবরই একটু কাঁচা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমেস্টারের ছুটিতে এই কাজগুলো ওরা করত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনিতা প্রচার চালাত আরও বেশি বেশি করে এই সমস্ত প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার জন্য। ও বলত, এ বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। আমাদের উচিত গরিব মালয় ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করা। দায়িত্ব নিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে যারা মনে করে ওদের ভাগ্যেই লেখা আছে এই দারিদ্র্য, আমাদের উৎসাহ দিতে হবে ওদের জীবনের মান উন্নত করার। ওদের ভাবনার জায়গাটাতেই বদল আনতে হবে। ওদের মানসিকতা, জীবনধারণের পদ্ধতিতে বদল আনার জন্য আমাদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে বড়। আমরা যদি না হই তো তবে কারা?
আমি লজ্জিত হতাম। নিজেকে অপরাধী বলে মনে হত। আমি তো কখনও সাহায্য করিনি। অনিতার এই অদম্য ইচ্ছাকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু আমি ছিলাম নিরুপায়। হালিম চাইত না আমি গ্রামে যাই। এর চেয়ে ছুটিতে বাড়ি গিয়ে মাকে সাহায্য করা ভাল বলে ও মনে করত। সত্যিই তো, মা কেমন বাড়ির কাজ নিয়ে নাজেহাল হয়ে থাকে। আমারও উচিত ছুটির দিনগুলোতে অন্তত মায়ের পাশে দাঁড়ানো। হাসিমুখে হালিম বলত, রান্নাবান্না, ছোটদের দেখাশুনা করার কাজগুলো আমার শিখে ফেলা উচিত, কারণ বছরখানেকের মধ্যেই ও আমাকে বিয়ে করবে। হালিম আরও বলত, বউ হিসেবে কোনও চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় বা নেত্রীকে ও চায় না। এমন একজন মেয়েকে ও চায় যে তার পুরো মনোযোগটা পরিবারকে দেবে। আমি কিছুই বলতাম না। আমি স্বপ্নে ভাসতাম হালিমের সঙ্গে এক সুখী দাম্পত্যের।
এই বন্ধনের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে দু-একবার যে ভাবিনি তা নয়। আমার স্বাধীন চলাফেরা কোথাও যেন বেড়ি পরানো আছে। আবার অন্যদিকে একজন এমন ছেলে-বন্ধু থাকার সুবিধেও আছে— একধরনের নিরাপত্তাবোধ। ছাত্ররা আমার পিছনে লাগত না, কারণ সবাই জানত আমার সঙ্গে হালিম আছে। সঙ্গীবিহীন ছাত্রীরা অনায়াসেই মুখোরোচক গল্পের খোরাক হয়। এইরকমটাই ছিল ক্যাম্পাস- সংস্কৃতি।
অনিতা ওই বেজোড় দলেই পড়ে। প্রথম দিকে খেয়াল করেছি, আসমায়ি নামে এক ছেলের সঙ্গে ওর কিছু ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। ছেলেটির কথা বলত আমাকে মাঝে মাঝে। আমি খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সম্পর্কটা টিকল না যখন অনিতা পড়ার জন্য জাপান যাওয়ার ছাড়পত্র পেল। আসমায়ি খুশি হয়নি। এমনকি অনিতাকে না যাওয়ার জন্যও বলেছিল। এর পর থেকে ওদের দু’জনকে আর কখনও একসঙ্গে দেখিনি।
কলা বিভাগে স্নাতক হওয়ার পর অনিতা ও আমি আরও সাত মাসের জন্য শিক্ষক-শিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হয়ে যাই। এই ডিপ্লোমাটা করা থাকলে শিক্ষক হিসেবে আমরা বিবেচিত হব। হালিম বাড়ি চলে গেল। ওর ইচ্ছে প্রশাসনিক আধিকারিক হওয়ার। পরে ও ওর স্বপ্নের চাকরিতে যোগ দিল— সহ জেলা আধিকারিক।
মাস তিনেক পরেই আমার আর হালিমের ধুমধাম করে বিয়ে হল। যদিও ডিপ্লোমা কোর্সের বেশ কয়েক মাস তখনও বাকি। অবশ্য এর পিছনে আমাদের অন্য একটা উদ্দেশ্যও ছিল। হালিমের অফিসের কাছাকাছি কোনও স্কুলে জায়গা পাওয়াটা সুবিধে হবে এর ফলে। অবশ্য শিক্ষা দপ্তর বিষয়টাকে সাধারণত মানবিকতার খাতিরেই দেখে থাকে।
পরের বছর জানুয়ারিতে আমাকে আমার সেই পুরনো স্কুলেই পাঠানো হল। এখানেও অনিতাকে সঙ্গী হিসেবে পেলাম।
শিক্ষিকা হিসেবে অনিতা তুমুল আগ্রহ নিয়ে কাজ শুরু করল। এটাই তো ও চেয়েছিল, যার নমুনা স্বেচ্ছাসেবী ছাত্রদলের কাজেও দেখেছি। এই লক্ষ্যটা সম্পূর্ণ করার জন্যই ও শিক্ষক-শিক্ষণের ডিপ্লোমাটা করেছে। ওর মতো মেধাবী একজন ছাত্রী চাইলেই আরও বর্ণময় কোনও সরকারি চাকরি পেতে পারত। ওর এই মানসিক দৃঢ়তাকে আমি কুর্নিশ করি। আমি তো ডিপ্লোমাটা করেছি আসলে হালিম জোর করল বলে। ওর হিসেব হল, শিক্ষকতার চাকরি তো অর্ধেক দিনের, বাকি সময়টা পরিবারকে দেওয়া যাবে। আপনারা বলতেই পারেন— আমার কোনও লক্ষ্যই ছিল না।
প্রবল উৎসাহ নিয়ে অনিতা কাজ করছিল। ছাত্রদের উন্নতির জন্য নতুন নতুন কিছু জিনিস আমদানি করল। স্কুলের বাইরে যুব গোষ্ঠীতেও নাম লেখাল যাতে সমাজের জন্যও কিছু করা যায়। যারা স্কুলছুট, যারা নিরক্ষর, তাদের জন্যও কর্মসূচি বানাল।

অনিতা আমাকে বলত, এই তো সময় সমাজের জন্য কিছু করার। লোকজন তো খালি বলে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে অনেক বড় বড় কথা বলা যায়, পাশ করার পর সব টাকা কামানোর মেশিন। ওদের ভুল প্রমাণ করতেই হবে। আমি খুব খুশি যে আমাকে আমার পুরনো জায়গাতেই পাঠানো হয়েছে। আমার কাজটা অনেক সহজ হবে। এখানকার মানুষ, পরিস্থিতি অনেকটাই আমাদের জানা।
কিন্তু অনিতার এই ধারণা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হল। বয়স্কদের ক্লাস চালু করা, যুব গোষ্ঠীকে সক্রিয় করে তোলা— এসব কাজ শুরু করার কয়েক মাস পরেই উদ্বেগজনক এক ঘটনা ঘটল।
একদিন স্টাফরুমে বসে ছেলেমেয়েদের খাতা দেখছি এমন সময় এক অচেনা মহিলা ভেতরে ঢুকে এলেন। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, যেন কাউকে খুঁজছেন। অনিতাকে দেখতে পেয়ে সরাসরি ওর কাছে চলে গেলেন। মহিলার মুখে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে রাগ, বিরক্তি এবং দুঃখের ছায়া। অনিতা উঠে দাঁড়িয়ে ওকে বসতে বলল। যদিও ও জানত না কেন এই সাক্ষাৎ। কাছাকাছি একটা চেয়ার টেনে বসে তিনি কথা শুরু করলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম মহিলা রেগে আছেন, যদিও গলার স্বর নিচুতে রেখেই কথা বলছিলেন, বোধহয় অফিসের মধ্যে বলে। আমার বসার জায়গা একটু দূরে বলে আমি ওদের কথাবার্তা ঠিক শুনতে পারছিলাম না। ফলে আমার কৌতূহলও নিরসন হল না। অনিতার মুখ লাল আর সেখানে বিষাদের কালো মেঘ। বুঝলাম খারাপ কিছু। সৌভাগ্যবশত অন্য কোনও শিক্ষক-শিক্ষিকা সেই সময়ে ওখানে ছিলেন না।
আমি সময়াভাবে অনিতাকে পুরো ঘটনাটা জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। অপেক্ষা করতে হল ছুটির ঘণ্টা বাজা পর্যন্ত। অনিতা আমাকে বলল, ওই মহিলা যুব গোষ্ঠীর সহ-সভাপতি রোজলির স্ত্রী। অনিতা রোজলির সঙ্গে সমানতালে কাজ করে চলেছিল আর অবিবেচক কিছু লোক গুজব ছড়িয়ে বেড়াচ্ছিল দু’জনের মধ্যের প্রেমের সম্পর্কের। অনিতাকে যা আঘাত দিয়েছে বেশি তা হল ওই মহিলার কথা। বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে অনিতা নাকি যেনতেনপ্রকারেণ স্বামী খুঁজতে শুরু করেছে। এমনকি কারও দ্বিতীয় স্ত্রী হতেও নাকি ওর আপত্তি নেই।
আমার খারাপ লাগল অনিতার জন্য। আমার খুব দুঃখ হল ওর কথা ভেবে। এতদিনের পরিশ্রম, ত্যাগের ফল এই! আমি ওর হাতটা ধরে আঙুলগুলোয় আলতো চাপ দিয়ে বললাম, কিচ্ছু ভাবিস না। আল্লা জানেন তুই কতটা আন্তরিক এবং নিশ্চয়ই তার পুরস্কার দেবেন।
একমুহূর্ত চুপ থেকে বললাম, নারী হওয়া খুবই কঠিন।
অনিতা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, না, এমন কিছু কঠিন নয়। এটা শুধু তখনই কঠিন যখন তুমি স্বাধীন নারী হতে চাইবে।

অঙ্কন : রাজ রায়

অনুবাদক পরিচিতি : শুভঙ্কর সাহার আজন্ম বাস বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তর ২৪ পরগনার সিন্দ্রানীতে। ইংরেজি ভাষা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সবান্ধব ‘এখন চলতে চলতে’ পত্রিকা সম্পাদনা করছেন প্রায় আড়াই দশক। ভাল লাগার বিষয় আঞ্চলিক ইতিহাস ও তার চর্চা। ‘বিভূতির সংসার’ নামে একটি ট্রাস্টের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। অনুবাদ সাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প ইত্যাদি পড়া ও লেখালিখি করতে করতে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিদেশি গল্প সংগ্রহ’, ‘এক দশকের এলোমেলো প্রবন্ধ’ ও কবিতার বই ‘বিষণ্ণ রাত্রির মিছিল’।

মতামত জানান

Your email address will not be published.