বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

অপমানিত মেয়েদের পাশে থাকার কথা বলে এই উপন্যাস

লেখার গদ্য ঝরঝরে। অতুলনীয় সব উপমা। মৃত্তিকা মাইতির এই আখ্যান একটি শিক্ষা দেয়। হেরে যাওয়া মানুষের প্রতি ভালবাসা আর ক্ষমার শিক্ষা। অপমানিত মেয়েদের পাশে থাকার শিক্ষা। এ যেন লেখকেরই অঙ্গীকার। স্নেহ-মমতা-ভালবাসা আর ক্ষমার প্রতিমূর্তি পরমা। সে পাঠকের হৃদয়ে ভালবাসার বীজ পুঁতে দেয়।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

বাংলা উপন্যাসের ধারায় আশ্চর্য ব্যতিক্রম মৃত্তিকা মাইতির ‘পাখিঘর’। ব্যতিক্রম এই কারণে, তিনি এমন একটি বিষয় নিয়ে উপন্যাসটি লিখেছেন যার সম্পর্কে আমাদের অপার কৌতূহল, অথচ তা নিয়ে তেমন করে লেখাই হয়নি। সাহিত্য তো নয়ই। অন্তত আমাদের তা জানা নেই। উপন্যাসটি বিন্যস্ত হয়েছে অনাথ মেয়েদের হোমকে কেন্দ্র করে। হোমটির নাম ‘আশ্রয়’।
সমস্ত দিক থেকেই উপন্যাসটি অভিনব এবং ভিন্ন গোত্রীয়। এর অধিকাংশ চরিত্রই মহিলা। সেই মহিলাদের অবস্থান সমাজ, পরিবার থেকে দূরে। সাধারণভাবে উপন্যাসের কাহিনির কেন্দ্রে থাকে এক বা একাধিক পরিবার। এখানে তথাকথিত কোনও পরিবার নেই। একসঙ্গে বসবাস করেও মেয়েরা প্রত্যেকেই আলাদা। তারা কেউই লেখকের ভাবনা বা বিমূর্ত আইডিয়া থেকে সৃষ্ট নয়, প্রত্যেকেই উঠে এসেছে বিচিত্র সমাজ-বাস্তবতা থেকে। ছোট্ট একটি ভৌগোলিক প্রেক্ষিতে লেখক নারীজীবনের সমগ্রতাকে তুলে ধরেছেন। হোমের মেয়েদের সমস্ত পরিচয়কে ছাপিয়ে উদগ্র হয়ে আছে তাদের নারীপরিচয়। তারা প্রথমত মেয়ে। শেষ পর্যন্ত মেয়ে। কিন্তু এই মেয়েদের জায়গা নেই সমাজে। মৃত্তিকা মাইতি সেই মেয়েদের জন্য পৃথক একটি সিংহাসন এগিয়ে দিয়েছেন।
আখ্যানের শুরুতেই লেখক আমাদের নিয়ে গেছেন সেখানে। কলকাতার অদূরে গাছপালা ঘেরা পাখপাখালির ডাকে ভরা জায়গাটির বর্ণনা দিয়েছেন। “এসবের মাঝেই বিঘা তিনেক জমির ওপর লাল রঙের পাঁচিল ঘেরা জায়গাটা অনড়। যেন কোনও কঠিন দুর্গ। বিরাট লোহার গেটের মাথার ওপরে বোর্ড। বড় বড় করে লেখা—আশ্রয় হোম। নীচে ছোট অক্ষরে লেখা গোবিন্দপুর।”
চারপাশে জলা-জঙ্গল। শ্যাওলা জমা পুকুর। তারই মধ্যে আশ্রয়। ছিন্নমূল সদা উদ্বিগ্ন মেয়েদের অস্থির-বিক্ষুব্ধ জীবনসমস্যায় উত্তপ্ত এক জগত।
মৃত্তিকা শুরুতে যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে মনে পড়ে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের কথা। তেলেনাপোতার পাঠকের মতো এই আখ্যানের পাঠকও তো আবিষ্কার করতে করতে এগোবেন। দেখবেন—আমাদের চেনা সমাজ সভ্যতার পাশেই এক আশ্চর্য অচেনা পৃথিবী।
এ তো গেল বাইরের পরিবেশ। ভেতরেও দমবন্ধ করা অবস্থা। বাথরুমে গোটা গোটা ভাত, হলদে হয়ে যাওয়া সবজির টুকরো, পাকানো শাক চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। সঙ্গে টোকো গন্ধ। দাঁত মেজে মেঝেতে থুতু ফেলে রাখা। বেসিন থাকা সত্ত্বেও ওখানে বাসন ধোয়া। একটা গা ঘিনঘিন করা দৃশ্য। এত বড় বড় মেয়েরাও এরকম নোংরা থাকে! তাদের জীবনটাই যে কেদাক্ত। বদ্ধ। সারাক্ষণ তালা বন্ধ থাকে। খাবার জলটুকু নিতেও বাইরে আসতে পারে না। বিকেলে দু-ঘন্টার জন্য কেবল ছাড়া পায়। এভাবে থাকতে থাকতে তাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। তারই বহিঃপ্রকাশ তাদের চারপাশে ছড়ানো। খাবার সময় ঝনঝন করে থালা বাজিয়ে কর্কশ শব্দে ডাকা হয়। এই শব্দ শুনলে পরমার মনে হয় “কোথায় যেন কী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান জীবন। জীবনের মূল্যবান সময়।
সব বয়সের মেয়েরাই থাকে এখানে। দু-মাস বয়সের বাচ্চাও। হাসপাতালে জন্ম দিয়ে বাচ্চাটার মা পালিয়ে গেছিল। ঝাড়খণ্ডের যে ঠিকানা দিয়ে ভর্তি হয়েছিল, সেখানে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি কাউকে। আবার চোদ্দ বছরের নিতুকে বাড়িতে রেখে মা কাজে বেরিয়ে যেত। সেই সুযোগ নিয়েছে বাড়িওয়ালা। এখন সে গর্ভবতী হয়ে এই হোমে। বাচ্চা হওয়ার পরে চলে যাবে সে। বাচ্চা থাকবে এখানে। কল্পনা থাপা, মণি পাগলি… সবার আলাদা আলাদা কাহিনি আছে। আবার কারও নতুন করে কাহিনি তৈরি হয়েছে এখানে আসার পর। স্কুল বাসের ড্রাইভার হরিপদর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পিঙ্কি। তার পেটে বাচ্চা চলে আসে। জানাজানি হওয়ার পরে হরিপদকে পুলিশে না দিয়ে শুধু তাড়িয়ে দেওয়া হয় চাকরি থেকে। হোম থেকেই বিয়ে হয় পল্লবীর। অচেনা এক দম্পতি রাখিকে দত্তক নিয়ে চলে যায়। রাখির আকুল কান্নায় থেঁতলে যায় পরমার ভেতরটা।
এরকম একটা পরিবেশে এক ঝলক টাটকা হাওয়ার মতো পরমা। এখানে হোম-মাদারের কাজে বহাল সে। পরমার চোখ দিয়ে পাঠক দেখেন ‘আশ্রয়’-এর খুঁটিনাটি। পরমা বড় ভালোবাসে মেয়েদের। পরম মমতার বন্ধনে সকলকে বেঁধে ফেলেছে। দুপুরে মাংস হলে সকলে বায়না করে পরমা যেন পরিবেশন করে। কেননা নতুন আন্টি সকলকে সমান দেয়। জুলেখা বলে, ‘‘না গো আন্টি, তোমারে সত্যিই কেমন যেন মা মা মনে হয়। সবাইরে ভালবাস। কখনও বিরক্ত হও না। অন্য আন্টিদের মতো নও তুমি।”
এক হোম-মাদার অর্পিতা হাত দেখে সবার। পরমাকে সে একদিন বলে নিজের কথা—“আপনজন বলে কেউ নেই। ভবিষ্যৎ বলেও কিছু নেই। কেমন জলের মতো বয়ে চলেছে জীবনটা। শুধু ঢেউ নেই কোনও।” হোমের মধ্যে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ অজস্র গল্প তৈরি হয়। জীবনেরই গল্প। কিন্তু সেই জীবন লাঞ্ছিত মেয়েদের। যাদের কেউ ভালোবাসে না। যাদের কেউ নেই। লক্ষ্যহীন জীবনের বিমূঢ়তায় মেয়েরা আছন্ন থাকলেও তাদের জীবনবোধ তীব্র। তারা জীবনবিমুখ নয়।
মেয়েদের প্রত্যেকের পৃথক পৃথক ইতিহাস আছে। পরমারও নিজস্ব একটা অতীত আছে। কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু করে ফ্ল্যাশব্যাকে পরমার অতীত ইতিহাস তুলে ধরেছেন মৃত্তিকা। কাহিনিকে কেন্দ্রচ্যুত না করেই অসামান্য দক্ষতায় এই কাজটি করেছেন।
মা-হারা পরমাকে এগারো বছর বয়সে পাড়ি দিতে হয়েছিল কলকাতায়। বাবা এসে বাসে তুলে দিয়ে গেছিল। পরমা কখনও ভুলতে পারবে না সেই দিনটা। “ধানখেত, বুড়ো বট, জিঞ্জোকুলের গাছ, যুগীপুকুর, শীতলামন্দির, পিরের মাজার, খোলা হাওয়া, খেলার মাঠ, ফুলবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বন্ধুদের ছেড়ে সে চলেছে কলকাতায়।” এই মাঠঘাট-গাছপালা-চারপাশটাই তার প্রকৃত আত্মীয়। তাই তাদের ছেড়ে যাওয়ার সময় এত কষ্ট।
কলকাতায় বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করেছে পরমা। সেই অভিজ্ঞতা এই আখ্যানে মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে রয়েছে। শহরে ঘরে ঘরে টিভি। সেই টিভি দেখা নিয়ে ঝগড়া মা-মেয়ের। পরমা দেখত মা-মেয়েকে। “বুকের মধ্যে ব্যথা করত, দমবদ্ধ হয়ে আসত তার। এখানে বিকেলে পাড়াতো ভাইবোনদের সঙ্গে কেউ খেলা করে না। মাঠেঘাটে দৌড়য় না। হাসতে হাসতে পেটে খিলও ধরে না। এখানে পাশের বাড়িতে যারা থাকে তাদের রোজ দেখে কিন্তু কেউ কাউকে চেনে না! শহরে কারেন্ট গেলে সবাই অন্ধ। আর দেশে অন্ধকারেও সব যেন দেখতে পেত তারা।” গ্রামের চোখ দিয়ে শহর দেখে সে। আর প্রতি মুহূর্তে সবিস্ময়ে দেখে গ্রামজীবনের থেকে কতটা আলাদা শহর।
একবার একটা বুড়ির দেখাশোনার কাজে ছিল পরমা। একজন সঙ্গী চাই বুড়ির। পরমা সেই সঙ্গী। এখানে পরমার ভাবনা—“টাকা থাকলে কতরকমভাবেই না খরচ করে এরা। সময় কাটানোর জন্য মানুষ পোষে।” একটা করুণা, বিদ্বেষ ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পরমার মধ্যে। জগত এবং জীবন সম্পর্কে লেখকের এই যে ভাবনা, অভিব্যক্তি তা একজন সচেতন সমাজমনস্ক পর্যবেক্ষকের। শহুরে মানুষ গ্রামের অনেক কিছুকে করুণা করে, এটা সত্যি। কিন্তু এর উল্টোটাও সত্যি! বহু অপ্রিয় কথা লেখক সটান বলে দিয়েছেন।
একটা বাড়ির কাজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে যখন একা একা রাস্তায় হাঁটে পরমা তখন মনে হয় এই সময়টাই তার নিজের। “কারও হুকুম নেই। মনের মধ্যে ভয় কাজ করছে না। এখন আমি কারও কেনা নই। ছোটবেলায় স্কুলে স্বাধীনতা দিবস পালনের সময় উঁচু বাঁশের মাথায় যেমন পতাকা উড়ত, যেমন পতপত শব্দ হত হাওয়ার ঝাপটে, তেমন আমিও যেন একটি পতাকা।
তবে পতাকা হয়ে ওড়ার জীবন বড় কম সময়ের। কেননা সব রাস্তাই সরু হতে হতে এসে থামে নতুন কাজের বাড়ির সামনে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই অন্য এক জীবন। সেখানে কোনও পরিচয় নেই। একটাই নাম—কাজের লোক।”
এরকম অসামান্য সব অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা যায়। আর এইসবের ভিতর দিয়েই মূর্ত হয়ে ওঠে লেখকের জীবনদর্শন। বর্তমান বহু লেখকের লেখায় এই দর্শন থাকে না।
এর পরে যেখানে ছিল সেই বাড়ির কাকিমা তাকে বলত লক্ষ্মী। কিন্তু বাড়ির লক্ষ্মীর জন্য মোটা মোটা চাল আসত। নিজেই ফুটিয়ে খেত। রান্নাঘরে আরশোলার জঙ্গলের মধ্যে খেতে হত বসে। থাকতে হত। এতকিছুর পরেও লক্ষ্মীর কৃপা বজায় ছিল লোকগুলোর ওপর। একদিন কাজে ভুল হল। নারায়ণের ভোগের বাসনে মাছের ঝোল ঢেলে ফেলেছিল সে। তাতেই লক্ষ্মীর চুলের মুঠি ধরে নারায়ণের পায়ের কাছে ঠুকতে লাগল কাকিমা। পাথরের নারায়ণ নড়ল না। একেই দু’বেলা পুজো করতে হয়েছে তাকে। কাজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরমা ভাবে “শহরের লোককে ভালবেসে যতই কাজ করে দাও, তাদের মন আর গলে না। সাত বছরে জানা হয়ে গেছে পরমার। শহুরে বাবুরা টাকা দিয়ে ঝি-চাকর পোষে। তাদের ভালবাসে না। শুধু কাজ আদায় করে নেয়।” শহরের ভদ্র শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেও যে নীচতা প্রচ্ছন্ন থাকে তা এক ঝটকায় পরমার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। পাঠকের সামনেও।
এরই মধ্যে অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদি তার জীবনটাকে বদলে দিয়েছে। সেখানেও কাজের মেয়ে হিসেবেই ঢুকে ছিল। কিন্তু এর আগে যেসব বাড়িতে কাজ করত এরা সেরকম নয়। এখানে সে যেন এই বাড়িরই একজন ছিল। একই রান্না খেত। অনিন্দ্যদা, বউদি তাকে আলাদা করে পড়িয়েছে। এখানে এসেই সে বুঝতে পারে স্কুলের পড়াশুনোটা সব নয়। গ্রামে থাকলেই কেউ গেঁয়ো হয়ে যায় না। এখন সে নিয়মিত বই পড়ে। নানারকম বই। পরমার বিয়ের ব্যবস্থাও করেছিল তারা। মেদিনীপুরে গ্রামেরই ছেলে। কিন্তু সেই বিয়েও টেকেনি। স্বামীর অন্য একটি বউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে জানতে পেরে চলে আসে পরমা। আবারও কলকাতায়। শেষমেশ এই হোমে।
মা না থাকার জন্য পরমাকে গ্রামেও সংগ্রাম করতে হয়েছে বেঁচে থাকার জন্য। শহরেও। পরমা গ্রামকে যেভাবে চেনে তেমন করে হয়তো চেনে না গ্রামের বহু মানুষ। আবার শহুরে মানুষদের সে অনেক ভাল চেনে শহরের মানুষদের থেকে। ছোট ছোট তুলনার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গ্রাম ও শহরের জীবনযাত্রার তফাত। এই সহজ জিনিসটা আমরা বুঝতে পারি না বলে সাহিত্যের দরকার হয়। বোঝানোর কাজটাই করেছে এই আখ্যান। এখানে গ্রাম এবং শহর পাশাপাশি এসেছে। কিন্তু ঘটনার কেন্দ্র হোমের মধ্যে গ্রাম-শহর সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। হোমের জগতটা সম্পূর্ণ আলাদা। গ্রামজীবন শহরজীবনের ঊর্ধ্বে তার অবস্থান।
পরম মমতায় লেখক পরমা চরিত্রটিকে গড়ে তুলেছেন। পড়তে পড়তে মনে হয় লেখক বোধহয় নিজের কথা বলছেন। পরমার সঙ্গে তাঁর সাযুজ্য, একাত্মতা এতটাই গভীর। একটি অভিযোগ অবশ্যি করা যেতে পারে পরমা সম্পর্কে। তার সবই যেন ভাল। সেদিক থেকে কিছুটা একরঙা। দোষেগুণে গড়া মেয়ে নয়। কিন্তু লেখকের উপস্থাপনার মুনশিয়ানায় চরিত্রটিকে অস্বাভাবিকও মনে হয় না। বরং পাঠকের সব মায়া কেড়ে নেয় সে।

চমৎকার সব ইমেজ, অনুভব চিত্র, চিত্রকল্প, উপমা ব্যবহৃত হয়েছে লেখায়। যেমন (ক) হোমে স্টাফদের মধ্যে যে কথা ঘুরে বেড়ায় তাকে পরমার মনে হয় খেলা। ছোটবেলার চু কিতকিত। কত কথা যে লাফায়। সেও সেই খেলায় যোগ দেয়। “তার ঘর থেকে গুটি ছুড়ে দেয়। তবে সেটা কথা নয়। হাসি।” (খ) ভাগ্যরেখায় বিশ্বাস নেই তার। “পরমা জানে, হাতের ওইটুকু সব রেখায় ভাগ্য নেই। তার ছোট্ট জীবনটা ভেতরে ভেতরে এত বড় যে ওখানে আঁটবে না। আর সামনে কতটা পড়ে আছে তা জানতেও চায় না সে।” (গ) বিকেলে টিফিনে থাকে কোনও দিন মুড়ি-চানাচুর, কোনওদিন কানাইদার আলুর চপ। কানাইদা “এত ঝাল দেয় যে চোখে জল চলে আসে। তবে হুসহাস করলেও খায় সবাই। ওই চোখের জল কোনও মেয়ের কাছেই কিছু নয়।”
এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আর এসবের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের গভীর জীবনবোধ এবং দর্শন।
হোমের মধ্যে বড়দিন পালন করা হয়। ঈদ, দুর্গাপূজাও হয় এখানে। দুর্গা পূজার দিন সুযোগ বুঝে হোমের পিছনের পাঁচিল টপকে পালিয়ে যায় ক’জন। পরমার মনে হয়—“এই জায়গাটাকে কি ওরা খাঁচাই মনে করে? সেই খাঁচা থেকেই কি আজ উড়ে গেল তিনটে পাখি ?”
খাঁচাই তো। তা না হলে এত অর্গল কেন চারপাশে! এই মেয়েরাই তো পাখি। আর হোমটাই তাদের ঘর। পাখিঘর। সেদিক থেকে উপন্যাসের নামকরণ ব্যঞ্জনাধর্মী। পরমার ওপরে বেশি আলো পড়লেও এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পরমা নয়। ‘আশ্রয়’ হোম এবং হোমের মেয়েরাই সামগ্রিকভাবে আখ্যানে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে।
হেরো মেয়েদের ভিড় এই উপন্যাসে। আর পরমা নিজেও একজন অসহায় হেরো মানুষ। বিনা দোষেই তাকে হোম ছেড়ে বিদায় নিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে হোম থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। হোম ছেড়ে যাওয়ার সময়—“পিছন ফিরে হোমের লাল রঙের পাঁচিলটা একবার দেখল পরমা। সে হাঁটছে আর আস্তে আস্তে যা দূরে সরে যাচ্ছে তার নাম আশ্রয়। অর্পিতার কাছে এটাই একমাত্র ছাদ। সঞ্চিতার ভালোবাসার জানলা। প্রীতির ভাঙা স্বপ্ন জুড়ে যাওয়ার আঠা। উর্মিলার সংসারের গরম ভাত। কোথাও তো ঠিক করে থাকা হয়ে ওঠে না পরমার। তার সব আশ্রয় বরাবরই নড়বড়ে। কিন্তু মেয়েদের এই আশ্রয়টা যেন নড়ে না যায়। তাহলে তারা থাকবে কোথায়? এখান থেকেই তো নিজের জায়গা খুঁজে পাবে অনেকে। কেউ জুলেখার মতো ফিরতে পারবে ঘরে। কোনও এক বাবা-মায়ের মেয়ে হয়ে উঠবে রাখি। মণির মতো মেয়েদের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে না। কোথাও যেন ভূমিকম্প না হয় আর। কল্পনা থাপারা তা হলে এখান থেকে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে কোনওদিন। আরও অনেক পল্লবী হাসিমুখে চলে যাক নতুন জীবনে। শান্তাকে যেন পচে মরতে না হয়। রিমার মতো কোনও মেয়েকে যেন নাচতে না হয় কোথাও। জুলিয়েনরা যেন বেঁচে থাকে। সর্বাণী মিত্রকেও চাই এখানে। না হলে এতকিছু করবে কে ? শুক্লা হালদার, কৃষ্ণাদি, ঈশিতাদি, মঞ্জরীদি, শংকরদা—সবাইকে খুব দরকার। পরমা নাই বা থাকল।”
উপসংহারে পরমা যেন হোমের সমীক্ষার ভিতর দিয়ে এক নতুন উপলব্ধিতে উপস্থিত হয়। নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অন্যায়, কারচুপি সত্ত্বেও ‘আশ্রয়’ বেঁচে থাকতে শেখায়। জীবনের প্রতি আস্থা হারানোর পর আবারও নতুন জীবনের প্রেরণা যোগায় এই ‘আশ্রয়’। লেখক তাঁর সংবেদনশীল মন নিয়ে রিক্ত ভাগ্যহত মেয়েদের জীবনকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়েছেন।
মৃত্তিকার সবচেয়ে বড় জোর অভিজ্ঞতার। পড়তে গিয়ে বোঝা যায়, তিনি তাঁর চেনা জগতের বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেননি। অনেক সময় অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে লেখকদের একটু সুর চড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। উচ্চকিত হয়ে পড়েন। কিন্তু এই আখ্যানে কোথাও লেখক সংযম এবং পরিমিতিবোধ হারাননি। লেখার মধ্যে একটা শান্ত সত্যপ্রিয়তা আছে। এর ফলে উপস্থাপনভঙ্গিতে একটা স্নিগ্ধতা এসেছে।
লেখার গদ্য ঝরঝরে। অতুলনীয় সব উপমা। মৃত্তিকা মাইতির এই আখ্যান একটি শিক্ষা দেয়। হেরে যাওয়া মানুষের প্রতি ভালবাসা আর ক্ষমার শিক্ষা। অপমানিত মেয়েদের পাশে থাকার শিক্ষা। এ যেন লেখকেরই অঙ্গীকার। স্নেহ-মমতা-ভালবাসা আর ক্ষমার প্রতিমূর্তি পরমা। সে পাঠকের হৃদয়ে ভালবাসার বীজ পুঁতে দেয়।
‘পাখিঘর’ মৃত্তিকা মাইতির প্রথম উপন্যাস। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থও বটে। এই প্রথম গ্রন্থটি লেখকের একটি মহৎ ও স্থায়ী সৃষ্টি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে থেকে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

পাখিঘর
মৃত্তিকা মাইতি
পরশপাথর
২৫০ টাকা

মতামত জানান

Your email address will not be published.