বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

অলক্ষ্য জনপদ

পঞ্চান্নটি ছোট ছোট রচনার (Text) মধ্যে এখানে বর্ণিত হয়েছে কল্পনার বা বাস্তবের শহরের কল্পিত বর্ণনা, যার অনেকগুলোই সংস্কৃতি, ভাষা, সময়, স্মৃতি, মৃত্যু বা সাধারণ মানুষের নানান অভিজ্ঞতার প্যারাবল-প্রতিম এক গভীর অনুধ্যান।

বিকাশ গণ চৌধুরী

যে জনপদে/পরিসরে আমরা থাকি, যে জনপদে/পরিসরে আমরা থাকতে যাই কিংবা যে জনপদে/পরিসরে আমরা বেড়াতে যাই বা মানসে ঘুরে বেড়াই, যে জনপদে/পরিসরে আমরা জয় করতে চাই, তা সে যেভাবেই হোক না কেন, সেই জনপদে/পরিসরের স্মৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল কতটা আমরা জানি? কিন্তু আমরা সততই জানার এক আত্মশ্লাঘার মধ্যে বাস করি, যে আত্মশ্লাঘা দেশ বা মানুষকে বোঝার প্রয়াসে প্রায়শই বিফল, প্রায়শই তা আমাদের এই উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয় যে কোনও কিছুই পুরোপুরি বোঝা বা জানার প্রয়াস সম্ভব নয়। বিজিত ভূখণ্ডের/পরিসরের অন্তহীন বিস্তার বৃদ্ধিতে এরকমই এক আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন সম্রাটের দল। তবে তাদের জীবনেও কখনও কখনও আসে এক বিশেষ মুহূর্ত, আসে অন্য এক উপলব্ধি। তাঁদেরও মনে হয়, বিজিত সব দেশ আর সেইসব দেশের মানুষজনকে জানা বা বোঝার প্রয়াস বিফল হবেই; আর সেই বোধ থেকেই জেগে ওঠে যুগপৎ বিষণ্নতা ও ভারমুক্তির আবেশ। এক শূন্যতার সন্ধ্যালোক তাকে গ্রাস করে, যে “শূন্যতায় মিশে থাকে বৃষ্টিশেষের হাতির পালের গন্ধ আর আংরায় নিভে আসা চন্দন কাঠের ছাইয়ের সুবাস, মিশে থাকে একধরনের ভরহীন মত্ততা যা মানচিত্রপটে নির্বীয বক্ররেখায় আঁকা নদী পাহাড়কে টলিয়ে দেয়; গুটিয়ে যায় একের পর এক সেইসব বার্তাপত্র যাতে ঘোষিত হয়েছে শেষ শত্রুবাহিনীর পরাজয় থেকে পরাজয় পরবর্তী চূড়ান্ত ধ্বংসের কথা… এ সেই বিহ্বল লগ্ন, যখন আমাদের বোধ হয় যে এই সাম্রাজ্য যাকে আগে মনে হত তামাম আশ্চর্যের সমাহার, তা এখন বস্তুত এক সীমাহীন আকারহীন অবক্ষয়ের স্তূপ; আমরা বুঝতে পারি যে ভ্রষ্টাচারের পচনের চোরাক্ষত যত দূর বিষিয়ে গিয়েছে তা আর রাজদণ্ডে শোধরানোর নয়…”
১৯৭২ সালে তুরিন শহর থেকে প্রকাশ পায় ইতালো কালভিনোর বই ‘Le città invisibili’ (অলক্ষ্য জনপদ), ইংরেজি অনুবাদে যা প্রকাশ পায় ১৯৭৪ সালে ‘Invisible Cities’ নামে। এই বইকে প্রকাশকালে এবং পরবর্তীতেও কেউ বলেছেন রচনা সংকলন, কেউ বলেছেন উপন্যাস, কেউ অভিহিত করেছেন গদ্যকবিতার বা গল্পের সংকলন, ঝামেলা এড়াতে কেউ ফিকশন আখ্যা দিয়েছেন। গোত্র বিভাগের এমনতর সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে একথা বলাই ভাল যে, “অলক্ষ্য জনপদের মতো এক অসামান্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বইয়ের সারবস্তুটি কী তা এককথায় বুঝিয়ে বলা কঠিন, সে চেষ্টা বিলকুল এক বাতুলতা মাত্র।”
এই বইয়ে চরিত্র দুটি, ভেনিসীয় অভিযাত্রী মার্কো পোলো এবং তাতার সম্রাট কুবলাই খাঁ। পঞ্চান্নটি ছোট ছোট রচনার (Text) মধ্যে এখানে বর্ণিত হয়েছে কল্পনার বা বাস্তবের শহরের কল্পিত বর্ণনা, যার অনেকগুলোই সংস্কৃতি, ভাষা, সময়, স্মৃতি, মৃত্যু বা সাধারণ মানুষের নানান অভিজ্ঞতার প্যারাবল-প্রতিম এক গভীর অনুধ্যান। বইয়ের মাঝামাঝি এসে কুবলাই খাঁ মার্কো পোলোকেকে এমন একটা শহরের কথা জিজ্ঞেস করেন যা নিয়ে মার্কো সরাসরি কোনও কথা বলেনি। জবাবে মার্কো বলেন, “আমি যখনই কোনও শহরের কথা বলি সেই বর্ণনায় কিছুটা হলেও আমার শহর ভেনিসের কথা আমি বলি।” এ যেন এক লেখকের নিয়তি। লেখক যাই লিখুন না কেন, সমস্ত লেখা জুড়ে তাঁর ব্যক্তি ‘আমি’-র এক প্রচ্ছন্ন থেকে যাওয়া রয়ে যায়।
এই বই কোনও ঐতিহাসিক দলিল নয়, কিন্তু একে মার্কো পোলোর ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে একেবারে আলাদা করেও দেখা চলে না। এই বইয়ে কালভিনো মার্কো পোলোর ধারণাগুলোকে নিজের মতো করে ভেঙেচুরে নিয়েছেন, মার্কোর রচনার একধরনের বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন। এ বইয়ে রয়েছে ন’টি অধ্যায়, বিষয়ের নিরিখে যা আবার এগারোটি বিষয়ে বিভক্ত। ১) শহর ও স্মৃতি, ২) নগর ও কামনা, ৩) নগর ও চিহ্ন, ৪) ক্ষীণ শহর, ৫) বিনিময়ের/ব্যবসার শহর, ৬) নগর ও নজর/দৃষ্টি, ৭) নগর নাম, ৮) শহর ও মৃতজন, ৯) শহর ও আকাশ (স্বর্গের অনুষঙ্গও এতে মিশে আছে), ১০) ধারাবাহিক শহর, ১১) লুকোনো শহর। লেখার সময় এইসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে না লিখলেও পাঠক চাইলে বইটিকে অধ্যায় ধরে ধরে না পড়ে বিষয়কে ভিত্তি করে এবং কোন বিষয়ের পর কোন বিষয় পড়বেন সেটা ঠিক করে নিজের মতো করেও পড়তে পারেন। ১৯৮৩ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে কালভিনো বলেছিলেন, ‘অলক্ষ্য জনপদ’-এর কোনও সুনির্দিষ্ট শেষ নেই কারণ এই বইটি একটি বহুতল বিশিষ্ট জ্যামিতিক আকারের মতো করেই রচনা করা হয়েছে, ফলত এর প্রত্যেকটি কোনায়, প্রত্যেকটি ধারে, সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে এর উপসংহার/সমাপ্তি/সিদ্ধান্ত। এছাড়াও স্থাপত্যশৈলীর বিজ্ঞানের আলোকে নানাভাবে এ বইয়ের গঠনগত বিচার করা যায়। বিচার করা যায় বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধের ফরাসি সাহিত্যে গণিতশাস্ত্রের অপরিসীম প্রভাবে প্রভাবিত কালভিনোর রচনা প্রসঙ্গেও, এ বইটির প্রসঙ্গে যা বিশেষভাবেই আলোচনার বিষয়। তবুও সেসব বিষয় বিদ্যায়তনিক আলোচনার বিষয় বিবেচনায় আপাতত তোলা রইল। শুধু উল্লেখ রইল এই কথাটির যে, নারীদের নামেই এই বইয়ের প্রত্যেকটি শহরের নাম— ডরোথিয়া, আনাসতাসিয়া, দেওপিনা, লিওনিয়া ইত্যাদি।
এ বইয়ের পাঠ শুধু এক ভ্রমণবৃত্তান্তের পাঠ নয়, ইতিহাসের পাঠ নয়, নয় কোনও ভৌগোলিক বর্ণনা। এ বইয়ের পাঠ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক ভ্রমণ। মার্কো পোলো, কালভিনোর সঙ্গে নিজস্ব এক ভ্রমণ, নিজস্ব এক আবিষ্কারের ইতিহাস, নিজস্ব এক স্মৃতি নির্মাণের আয়োজন, নিজস্ব এক বোঝাপড়ার খেলা। এখানে প্রত্যেকটি জনপদের মধ্যেই রয়েছে মার্কোর নিজস্ব ভেনিসের মতো আমাদের নিজস্ব জনপদের কিছু না কিছু পরিসর; তা আবিষ্কারের হাতছানি। স্মৃতির সাগর থেকে যেখানে ঢেউ বয়ে আসবে, স্পঞ্জের মতো ফুলে উঠে ছড়িয়ে পড়বে। এখানে আছে সেইসব শহর যে তার নিজের কথা ব্যক্ত করবে না, তাকে পড়ে নিতে হবে। যেভাবে মানুষের হাতের রেখা পড়তে হয়, সেভাবেই পড়ে নিতে হবে পথের বাঁকে, জানালার গরাদে, সিঁড়ির আলসে ধরে, বাড়ির মাথায় বাজ ধরার শলাকায়, পতাকা উত্তোলনের দণ্ডে। যেখানেই সময়ের আঁচড় লেগেছে, রয়েছে কাটা দাগ, রয়েছে গল্প-বলা পট, সেখান থেকে পড়ে নিতে হবে ওইসব শহরের ইতিকথা।
বাঙালি পাঠকের কাছে এ এক আনন্দসংবাদ যে এ বই অভিজিৎ ঘোষ আর জয়তী দত্তের অনবদ্য ভাষান্তরে ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বাংলায়। কিন্তু বাঙালি পাঠকের পড়ার অবহেলায় সে বইয়ের সংস্করণ আজও শেষ হয়নি, মেলায় খুঁজলে এখনও তার কপি পাওয়া যায়। উৎসাহী পাঠকের বই সংগ্রহ করার সুবিধার্থে এখানে রইল ইতালীয়, ইংরেজি ও বাংলা এই তিন ভাষাতেই প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ। লেখায় রইল অভিজিৎ এবং জয়তীর অনুবাদ থেকে নেওয়া কালভিনোর লেখার কয়েকটি টুকরোও।
আপনাদের যাত্রা শুভ হোক! আপনারা আপনাদের অলক্ষ্য জনপদে পদচারণা শুরু করুন।

মতামত জানান

Your email address will not be published.