বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১

ঠিক করলাম আফ্রিকা যাব। প্রায় হঠাৎই। বেড়াতে যাওয়া নয়। একটা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বুনো কল্পরাজ্যে ভবঘুরেমি করা। ইউরোপের দশগুণ বড় বেওয়ারিশ এই মহাদেশটাকে ইউরোপীয় যুদ্ধবাজরা লুটেপুটে খাওয়ার পর তারা কী অবস্থায় আছে সেটা জানবার নিরন্তর তাড়না মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।

পীযূষ রায়চৌধুরী

আফ্রিকা : স্বপ্নের এল ডোরাডো

ঠিক করলাম আফ্রিকা যাব। প্রায় হঠাৎই। বেড়াতে যাওয়া নয়। একটা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বুনো কল্পরাজ্যে ভবঘুরেমি করা। ইউরোপের দশগুণ বড় বেওয়ারিশ এই মহাদেশটাকে ইউরোপীয় যুদ্ধবাজরা লুটেপুটে খাওয়ার পর তারা কী অবস্থায় আছে সেটা জানবার নিরন্তর তাড়না মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ধর্ম, সভ্যতা, বাণিজ্য, শোষণ— লিভিংস্টোনের গোঁজ দেওয়া হাতে গরম ফোর ইন ওয়ান প্যাকেজ। তাই নিয়ে ধাপ্পাবাজ ঔপনিবেশিক মাস্তানদের আফ্রিকার গায়ে ঠোকরানো ঘা কতটা শুকিয়েছে তা সরেজমিনে পরখ করা। নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি গুঁতোগুঁতি করে আফ্রিকা নামে রসালো ফলটা রাজনৈতিক কূটকৌশলে কে কতটা খেল তার ইতিহাস জানা। গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা, ক্রীতদাস ব্যবসা, চিরায়ত উপজাতি সংস্কৃতি, আইকনিক বন্যজীবন, সৃষ্টির কাঁচা রূপ— এসব নিয়ে মহাসাগর ঘেরা জনবিরল মহাদেশ তখন আমার স্বপ্নের এল ডোরাডো। অতএব আফ্রিকা। ঘেমো জুতোর সুখতলা খইয়ে ভিসা পাওয়া। বাধা-বিপত্তি, উৎকণ্ঠা, অজানা ঝুঁকি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার যন্ত্রণা— সব না-ধর্মী ব্যাপারগুলোকে সৌভাগ্যের মোড়কে মুড়ে পাড়ি দিলাম অস্থির আদিম আফ্রিকায়। দীর্ঘ ন’মাসের জন্য। ২০১৬-র নভেম্বরে।

বিলেত
স্থানীয় সময় সকাল ন’টায় বিমান লন্ডনের মাটি ছুঁল। ব্যস্ত অথচ নিয়মনিষ্ঠ হিথরো এয়ারপোর্ট। বাইরে এলাম লাগেজ ছাড়িয়ে। ইমিগ্রেশন চেকে তরুণ অফিসার দু-চারটে বেয়াড়া প্রশ্ন করেছিল। কেনই বা একা লন্ডনে এলাম? আর এলামই যদি, মাত্র তিন রাতের জন্য কেন? আসল কারণ কী? করবেই বা কী? চারদিকে সন্ত্রাসের চোখরাঙানি। ওয়েসিস ওভারল্যান্ড ট্রান্স আফ্রিকা এক্সপিডিশনের চিঠিটা দেখাতে হল। ভাল করে পড়ে আট মাসের আফ্রিকা অভিযান সম্বন্ধে যখন জানল, একটু বিস্ময় প্রকাশ করেই পাসপোর্টে ইমিগ্রেশন চেকের সিলমোহর দিল। বাইরে তখন ইলশেগুঁড়ি।

গন্তব্য এবার অ্যাকটন টাউন। যার অবস্থান লন্ডনের বাইরে এক মফস্সল টুলিতে। থাকব একটা গেস্ট হাউসে। লন্ডন ব্যয়বহুল। ইচ্ছে ছিল ট্যাক্সি চড়বার, শোফার হবে বিলিতি সাহেব আর পেছনের সিটে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশি আমি। কল্পনার জগতে গোরা ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আমার ক্ষুদ্র প্রতিবাদী প্রতিশোধ। স্ট্যান্ডে প্রায় সব ট্যাক্সি চালক দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার। পাগড়িধারী শিখও আছে। এক সাহেব ট্যাক্সি ড্রাইভার, সেও রুমানিয়ার। বদন দেখে জাতভাই ভেবে বাংলাদেশি ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করলেন, ট্যাক্সির প্রয়োজন কিনা। ভাড়া শুনে আঁতকে উঠলাম। ড্রাইভার বিলিতি হলেও ট্যাক্সি চড়বার উপায় ছিল না। ক্ষমতার বাইরে। কলকাতার বাঙালি জেনে চওড়া করে হেসে বলল, এক কাম করেন, পাতালরেলে যান, সস্তা হইব। মালপত্র যহন বিশেষ কিসু নাই তহন পাতালরেলই হাপনার লইগ্যা উপযুক্ত।
অনুমান করে রেলস্টেশনে কুড়ি পাউন্ডের একটা ওয়েস্টার কার্ড কিনলাম। লন্ডনে আমার দিন তিনেক থাকার কথা। ট্রেনে-বাসে আর নতুন করে টিকিট কেনার দরকার পড়বে না। পিকাডিলি লাইনের মেট্রো পাতালে। প্ল্যাটফর্মে ভিড় নেই। ডিজিটাল সাইনে ট্রেন অ্যারাইভালের সময় সারণি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ট্রেন আসছে না। আমার কৌতূহল বাড়ছে। সময়নিষ্ঠা নিয়ে ব্রিটিশদের গর্ব আছে। শরীরটাও ঠিক নেই। ঝিমঝিমে জেট ল্যাগ। বিছানার আরাম দরকার। মনে অস্থিরতা। সন্দেহ হল— ঠিক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি তো? সিকিউরিটি অ্যালার্মের আনাউন্সমেন্ট হল। ক্লিয়ার সাইন ঘোষণা না করা অবধি ট্রেন ছাড়বে না। ট্রেনের ভেতর বেশিরভাগ যাত্রীর চোখ হয় খবরের কাগজে, না হয় বইয়ের পাতায়। গদি মোড়া পাশাপাশি সিটগুলো বিপরীত সারির সিটের মুখোমুখি। স্ক্রিনে সবসময় স্টেশন আসার আগাম খবর। কলকাতার প্রাগৈতিহাসিক মেট্রো থেকে উন্নত মানের হলেও আমাদের দিল্লির মেট্রো অনেক আধুনিক। কিছু কিছু স্টেশনে ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের মধ্যে বিপজ্জনক ফাঁক।

আধ ঘণ্টায় ট্রেন অ্যাকটন টাউনে। বাইরে চিমটি-কাটা বৃষ্টি। বৃষ্টি মাথায় পিঠে ভারী রুকস্যাক ও বুকে ক্যামেরা ব্যাগ ঝুলিয়ে গেস্ট হাউসের ঠিকানায় গুটিগুটি। সঠিক নির্দেশনামা থাকায় গেস্ট হাউসের হদিশ অনায়াসেই। মিনিট দশেকেই বাড়ির সামনে। কিন্তু বাড়িতে তালা দেওয়া। ভেতরে কেউ নেই। ঘাবড়ে গেলাম। বাড়ির মালকিনের মেসেজ এল হোয়াটসঅ্যাপে— চাবি বাইরে আবর্জনার ভ্যাটের নীচে। চাবি নিয়ে দরজা খুলতে নাকাল। এদিকে বৃষ্টিতে জেরবার। উল্টে মালকিনকে ফোন করায় উনি বিরক্ত। কথার ঢঙে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত— এ উদো আবার কোত্থেকে এল? আমাকে সতর্ক করে বললেন,  দেখো বাপু, চাবিটা সাবধান। ভাঙলে আমার আশি পাউন্ড গচ্চা যাবে। এবার আমার রাগ হল। একে তো কাহিল অবস্থা, তার ওপর অকারণ হয়রানি। গলার স্বর চড়িয়ে বললাম, তোমার গেস্টদের সঙ্গে তুমি কি এইভাবে ব্যবহার করো? আমার অন্য কোথাও যাওয়া উচিত ছিল। এবার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন,  একটু সবুর করো বাপু, আমি ব্যবস্থা করছি। অল্পক্ষণ বাদে একটা ছেলে হন্তদন্ত ছুটে এসে চাবি নিয়ে সদর দরজা খুলে ফেলল। ভেতরে আরও এক আগল। সেটাও খোলার পর আমার দিকে হেসে বলল, ওয়েলকাম, আমি লিওনার্দো। রাস্তার ওপারে ইতালিয়ান পিৎজার দোকানটা আমার। তোমার খিদে পেলে আমার কাছে চলে এসো। জুডিথ বলল দরজা খুলতে পারছ না। তাই দৌড়ে এলাম সাহায্য করতে। বললাম, সে তো নয় হল, কিন্তু এভাবে বারবার দরজা খুলে আমাকে যাতায়াত করতে হবে না কি? বাড়িতে কেউ থাকে না? সে বলল, জুডিথ চাকরি করে। সকালে বেরিয়ে সন্ধেয় বাড়ি ফেরে।

লন্ডনে আমার হোস্ট জুডিথ আকলামা ও পিৎজার দোকানের মালিক লিওনার্দো।

তিনতলায় উপেক্ষিত সিঁড়ির নীচে সৃষ্টিশীল কুশলতায় শয়নকক্ষ। ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে। বিকেলে ঘুম ভাঙার পর কাচের জানলা দিয়ে গানারসবেরি পার্কের দিকে চোখ গেল। মসৃণ রাস্তা চওড়া ফুটপাথের কোলে। রাস্তা ধরে সাজানো বাড়ি। বৃষ্টি থেমেছে। বেশ ঠান্ডা। রাস্তায় লোকজন কম। খিদে পাচ্ছে। একবার ভাবলাম বেরিয়ে খাবার কিনে আনি। ভরসা হল না। আবার যদি দরজা খুলতে গিয়ে ফেঁসে যাই! বাড়িতে আমি একা। অদ্ভুত গেস্ট হাউস। নিঝুম বাড়ি, কাঠের সিঁড়িতে পদধ্বনি একমাত্র ভৌত সহচর। দোতলায় অগোছালো রান্নাঘরে ইলেকট্রিক কেটলিতে জল গরম করে চা ও সঙ্গে থাকা বিস্কুট ভুখা পেটকে শান্ত করল।
সন্ধের দিকে কাঠের সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ। মিষ্টি হেসে এক মাঝবয়েসি কৃষ্ণকায় আফ্রিকান মহিলা আমার আস্তানায় ঢুকে অভ্যর্থনা করেই আমার বিছানা ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বললেন, তোমার হয়রানির জন্য আমি দুঃখিত। আমার নাম জুডিথ আকলামা। বাড়িতে আমি আমার ছেলের সঙ্গে থাকি। ওর বাবার সঙ্গে আমার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে। আমি ফ্রান্সের নাগরিক। ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এই দেশে থাকি। খোরপোষ বাবদ বাড়িটা আমি আমার প্রাক্তনের কাছ থেকে পেয়েছি। আমার ছেলে টমের বয়স ষোল। স্কুলে যায়। তুমি সারাদিন আমাদের পাবে না। তোমার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি দেওয়া থাকবে। ইচ্ছেমতো আসা-যাওয়া করতে পারো। নীচে রান্নাঘর আছে, ব্যবহার করতে পারো। তবে ভাঙচুর হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আশা করি আমাদের অনুপস্থিতিতে আমার ক্ষতি হতে পারে এমন কোনও অনৈতিক কাজ তুমি করবে না। তবে তোমাকে দেখে আমার ভরসা হচ্ছে।
গড়গড় করে একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে জুডিথ থামল। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে আছি। মনে মনে ভাবছি— কোথায় এলাম রে বাবা। জিজ্ঞাসা করলাম, সব গেস্টদের কি আসার সঙ্গে সঙ্গে একই কথার রেকর্ড চালিয়ে সতর্ক করো? এবার জুডিথ হেসে ফেলল। না, আগে বলতাম না, ইদানীং বলি।
কন্ট্রাক্টে বেড-টি পাওয়ার কথা। জুডিথ বলল চা তৈরি করে নিতে হবে। সব কিছুই পরিষ্কার সোজাসাপটা, কোনও ভণিতা নেই।
লন্ডনে গোটা দুটো দিন ভিক্টোরিয়া টিউবে নেমে সারা শহর পায়ে হেঁটে ঘুরেছি। অফ সিজন। ট্যুরিস্টদের ভিড় কম। বাকিংহাম প্যালেসের সামনে রানি ভিক্টোরিয়ার শ্বেতপাথরের বিশাল মূর্তির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই সেই নারী, অষ্টাদশ শতাব্দীতে যিনি সারা পৃথিবীর ওপর অধিকার ফলাতে চেয়েছিলেন।

বাকিংহামে রয়্যাল গার্ডের মার্চ পাস্ট।

লন্ডনে বেশ কয়েকটা মিউজিয়াম আছে। ওখানে চলছে আন্তর্জাতিক লুণ্ঠকদের চুরি করা মালের প্রদর্শনী। আমার দেখার ইচ্ছে হয়নি। মাদাম তুসোতে গিয়ে বুঝলাম, ক্রিকেটার ও বলিউড ছাড়া ভারতের আর কোনও পরিচয় নেই। দু’হাজার বছরের ইতিহাস জড়ানো লন্ডনের রাস্তায় এখনও মানুষে টানা প্যাডেল রিকশা চলছে। তাও আবার বাকিংহাম প্যালেসের পাশেই। সাহেবে টানা রিকশায় প্রতীকী সওয়ারি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। হল না। আমি থেমস নদীর দক্ষিণ পাড় ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি। টাওয়ার অব লন্ডন, সেক্সপিয়ার গ্লোব, বিখ্যাত আইকনিক সব মনুমেন্টগুলো দেখে আশ্চর্য হয়েছি। ব্রিক লেনে গিয়ে বাঙালি খাবার চেখে দেখেছি। লন্ডন-আই নাগরদোলায় উঠে পাখির চোখে শহরটাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি। মানুষদের সঙ্গে মিশেছি আর বুঝেছি, যে সাম্রাজ্যে একসময় সূর্যাস্ত হত না, সেই দেশ এখন সারা বিশ্বের নাগরিকদের ভারে ন্যুব্জ। সেন্থিলকে মনে পড়ছে। শ্রীলঙ্কার মানুষ, এখন ব্রিটিশ প্রবাসী। গৃহহীন বেকার। সরকার থেকে সপ্তাহে বাহাত্তর পাউন্ড বেকার ভাতা পায়। তাই দিয়ে কোনওরকমে বেঁচে থাকা। বউ-বাচ্চা সবাইকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। এখন দিশাহারা জীবন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত ‘ব্রেক্সিট’ একটা জাতিকে লম্বালম্বিভাবে বিভক্ত করেছে। তাতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এমন হাসির খোরাক হয়ে উঠেছিলেন যে লন্ডনের কমেডিয়ানদের বাজার নষ্ট হচ্ছিল। ইংল্যান্ডে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ট্যুরিস্ট আসে প্রতিবছর। আমার ইংল্যান্ড ঘোরার বাসনা ছিল না অন্তত এ যাত্রায়। আমার সমগ্র সত্তা জুড়ে তখন শুধুই আফ্রিকা।

লন্ডনে মানুষে টানা প্যাডেল রিকশা, বাকিংহাম প্যালেসের পাশেই।

জুডিথ আমার স্থলপথে আফ্রিকা অভিযানের কথা জেনে আশ্চর্য হল। বলল, আমার টোগো ছোট কিন্তু অসম্ভব সুন্দর একটা দেশ। তুমি যদি সেখানে পৌঁছতে পারো তা হলে আমার মাতৃভূমির কিছু ছবি পাঠিয়ো। পরের দিন আমার গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট থেকে জিব্রলটারের ফ্লাইট ধরার কথা। জুডিথ আমাকে লিওনার্দোর পিৎজা রেস্তোরাঁয় ডিনারে আমন্ত্রণ জানাল। আমুদে লিওনার্দো ইতালি থেকে চলে এসেছে লন্ডনে। নিজের দেশে বেঁচে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একসময়কার শক্তিধর সারা ইউরোপেই এখন মন্দা। বাজারে পশ্চাদ্‌গতি। এবার একের পর এক দেশ বামাল বিক্রি হয়ে যাবে। অর্থনৈতিকভাবে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারে উদ্বৃত্ত টাকার থলি নিয়ে চিন তৈরি। গ্রিসকে কেনা হয়ে গেছে। এবার চোখ অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর দিকে। মার্ক্স, লেনিন, মাও সে তুং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত কমিউনিস্ট চিন নিজেদের ভাবধারাকে প্রতারণা করে পুঁজিবাদকে আঁকড়ে ধরেছে। দেশের এলিটদের প্রতিবাদী মুখ বন্ধ। চিনের এই নয়া ধনতন্ত্র ওদের রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার প্রদর্শন। দেশের মধ্যে চাবুকের নীচে সমাজতন্ত্র আর বিশ্বের দোরগোড়ায় নিশান তুলে ধরা আগ্রাসী ধনতন্ত্র। সারা বিশ্বের উঠোন এখন ওদের নিম্নমানের উদ্বৃত্ত পণ্যের জাঙ্ক ইয়ার্ড। লিওনার্দো মাস দুয়েক হল এখানে এই দোকানটা খুলেছে। এখনও সেইভাবে জমেনি। শেষ পাতে ইতালিয়ান ডেজার্ট ‘পান্না কোট্টা’ নিজের হাতে তৈরি করে পরিবেশন করল।
দুপুর একটায় ফ্লাইট। দশটার মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছনো চাই। কাজেই সকাল সকাল আমি তৈরি। কিন্তু জুডিথের বেডরুমের দরজা বন্ধ। আজ ১৩ নভেম্বর, রবিবার, ছুটির দিন। জুডিথ সম্ভবত দেরি করে বিছানা ছাড়বে। মনে সংশয়, একবার না দেখা করেই বিদায় নেব? কাঠের সিঁড়িতে আমার ভারী পায়ের আওয়াজ আর দরজা খোলার শব্দে চলে যাওয়ার আগে সদর দরজায় জুডিথ। অবিন্যস্ত স্লিপিং গাউন আর ঘুমে জড়িয়ে থাকা চোখ। পুরু ঠোঁটে একচিলতে হাসি। শেষ মুহূর্তটা ক্যামেরায় ধরতে যাওয়ার আগেই জুডিথ দরজার আড়ালে।ভিক্টোরিয়া মেট্রো স্টেশনে ব্যাপক ভিড়। স্টেশনের বাইরে নিরাশ্রয় এক ছন্নছাড়া ভিখিরি তার তল্পিতল্পার মধ্যে আধশোয়া অবস্থায় রাজকীয় ঢঙে একটা লম্বা দামি সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে। চুল শনের নুড়ি। গালে খোঁচাখোঁচা দাড়ি কিন্তু চেহারায় আভিজাত্য। একেবারেই বুর্জোয়া ভিখিরি। মুখে ব্র্যান্ডেড সিগারেটে কি লন্ডনবাসীর উদারতার পরিচয়? কই কাউকে তো ভিক্ষা দিতে দেখছি না। ব্যাপারটা একটু পরখ করতে পকেট থেকে একটা এক পাউন্ডের নোট বের করে সামনে ধরলাম। টাকাটা নেওয়ার সময় তার ভাবলেশহীন মুখে তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া।
স্টেশনের মধ্যে ঢুকতেই এক বরিষ্ঠ সাহেব কাছে এসে বললেন, তুমি মনে হচ্ছে এই শহরে নতুন। লক্ষ করছিলাম অপাত্রে পাউন্ডটা দিলে। এরকম ভিখিরি সারা শহরে ছড়িয়ে আছে। তবে এরা কেউই ভিখিরি নয়। এদের ঘরবাড়িও আছে। কখনও কখনও এরা ড্রাগ ডিলারের কাজ করে। দ্যাখো গিয়ে হয়তো এদের বাৎসরিক আয় দেশের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র থেকেও বেশি। সাহেবের কথায় শ্লেষ। জিজ্ঞাসা করলাম, সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না কেন? মুচকি হেসে তিনি বললেন, মাঝে মাঝে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে ফাটকে পোরে। বেরিয়ে এসে আবার যে কে সেই।
গ্যাটউইক এয়ারপোর্টের পৌঁছনোর টিকিট কাটলাম দামি গ্যাটউইক এক্সপ্রেস ট্রেনে। কোনও ঝুঁকি না নিয়ে। সস্তার ট্রেনে যাওয়া যেত। কিন্তু সময় বেশি নিত। ওয়েস্টার কার্ডে অব্যবহৃত টাকা ও সিকিউরিটি ডিপোজিট ফেরত নিলাম কার্ড পাঞ্চ করে। দ্রুতগামী ট্রেন ভিক্টোরিয়া মেট্রো স্টেশন থেকে গ্যাটউইক এয়ারপোর্টে পৌঁছল টানা আধ ঘণ্টায়। মনার্ক এয়ারলাইন্সে বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় বুঝলাম দলের অনেকেই ইতিমধ্যেই হাজির। সিকিউরিটি চেকে সারা শরীর এক্স-রে করার পর ছাড়পত্র পেলাম। ফ্লাইটেই দলের অনেকের সঙ্গে আলাপ হল। আমার পাশের সিটে অ্যান্ডি ও গার্লফ্রেন্ড ট্যামি।ঘণ্টা তিনেক বাদে হাওয়ায় বিমান দুলে উঠল। আলোড়ন শুরু হল। ভাবলাম বিমান বুঝি এয়ারপকেটে পড়েছে। সেবিকার ঘোষণা সিট বেল্ট বাঁধার। কিছুক্ষণ বাদে বিমান জিব্রলটার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের রানওয়ে ছুঁল। ফ্লাইটের জানলা দিয়ে দেখছি একদিকে জিব্রলটার রক, অন্যদিকে সমুদ্রের অনন্ত জলরাশি। মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। একইরকম উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম নেপালে কাঠমাণ্ডু থেকে লুকলা ফ্লাইটে। পৃথিবীর বিপজ্জনক রানওয়েগুলোর মধ্যে এরা অন্যতম। সমুদ্রের হাওয়া রানওয়ে ঘেঁষা রকের গায়ে ধাক্কা খেয়ে বাতাসে একটা ভীতি উদ্রেককারী আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাটি ছোঁয়ার আগে এই আলোড়নের মধ্যে পড়ে বিমানের টালমাটাল অবস্থা হয়। চালক দক্ষ না হলে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়। তারও পরে লম্বায় ছোট রানওয়ে। চালক ঠিক সময় ব্রেক না কষতে পারলে বিমান সরাসরি সমুদ্রে গিয়ে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা।
রানওয়ের বুকের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে চার লেনের উইনস্টন চার্চিল রোড। টেক অফ বা ল্যান্ডিংয়ের সময় দু’দিকে সার বেঁধে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। মাঝে একবার ভাবা হয়েছিল রানওয়ের নীচে দিয়ে গাড়ি যাওয়ার একটা রাস্তা তৈরি করা হবে। স্পেনের তরফে বাধা এল। এই বিতর্কিত রানওয়েতে ওরা কিছু করতে দেবে না। জিব্রলটার আসলে কোনও একটা দেশ নয়, সুদূর আন্দুলুসিয়া স্পেন ভূখণ্ডে একটি ব্রিটিশ রাজ্যাংশ। ১৭০৪ সালে অ্যাংলো ডাচ বাহিনী কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই অংশটিকে দখল করে। পরে পারস্পরিক সন্মতিতে এটা ইংল্যান্ডের সম্পত্তি হয়। স্পেন এখন জিব্রলটারকে ফেরত পেতে চাইছে। ইংল্যান্ডের কাছে এই সম্পত্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ভূমধ্যসাগর আর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগকারী জিব্রলটার প্রণালীর ওপর এই বন্দর শহর থেকে প্রচুর উপার্জন বা রাজস্ব মেলে। তার থেকেও বেশি জরুরি এই বিমানবন্দরকে সামরিক কারণে নিজেদের দখলে রাখা। আপাত নিরীহ দেশ স্পেন, যারা দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধে এড়িয়ে দেশটাকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। তাতে তাদের যে খুব একটা সুবিধে হয়েছে তা বলা যাবে না। দেশটা ১৯৩৬-৩৯ সালের যুদ্ধে জেরবার হয়েছে। তার ওপর ‘বাস্ক কান্ট্রি’ স্পেন থেকে আলাদা থাকতে চাইছে। সঙ্গে সন্ত্রাসের আবহ তো আছেই। তবুও তারা এখন যুদ্ধবাজ ব্রিটিশদের ভ্রুকুটি দেখাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থাকা যে ব্রিটিশ নাগরিকরা জিব্রলটারে আছেন তাদের স্পেন সীমান্তের আলজেসিরাসে ঢোকার ব্যাপারে আবার নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। যে নিষেধাজ্ঞা ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ অবধি বলবৎ ছিল। আবার ইংল্যান্ড যদি নতুন করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে চায় তবে স্পেন বলেছে ভেটো দেবে। মার্গারেট থ্যাচার যেমন ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনিয়দের শিক্ষা দিয়েছিলেন, তেমনই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র ওপর চাপ আছে স্পেনকে শিক্ষা দেওয়ার।

ছবি : লেখক

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ২

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৩

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৪

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৫

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৬

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৭

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৮

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৯

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১০

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১১

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১২

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১৩

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১৪

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১৫

৬ Comments
  1. Susmita Khan says

    প্রথম থেকেই বেশ ভালো লাগতে শুরু করলো।কিছু বর্ণনা,কিছু তথ্য,কিছু স্থানীয় মানুষের পরিচয়,সব মিলিয়ে সুখপাঠ্য।অধীর অপেক্ষায় রইলাম পরবর্তী পর্বের জন্য।

  2. Soumashree Nandy says

    অসাধারণ ,, লেখাটা পড়ার সময় দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসছিল ।

  3. Polly Roychowdhury says

    আগামী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম

  4. আলী আকবর says

    মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে কি করে যে খুলে গেল বোঝা মুস্কিল। যাইহোক খুলেছে যখন পড়েই ফেলি।যদিও এখন রাত বলবো না ভোর বলবো- তিনটে বাজে। তা সত্ত্বেও পড়ার একটাই কারণ, যদি পরে খুলতে না পারি। তাই পড়ে ফেললাম। শেষ হয়েছে বুঝতে পারলাম সকলের কমেন্ট দেখে। আবার খুলতে পারলে পড়া হবে।

  5. জয়দীপ ভট্টাচার্য says

    বেশ ভালো লেখা। তবে কাহিনী হিসেবে নয় ভ্রমণ হিসেবে বেশি নম্বর পাবে … 😀

    ইংরেজি বা পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাবিত রচনা শৈলী। বাংলা সাহিত্য গুণের ছোঁয়া কম। অক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম কিন্তু …

    1. Mainak Thakur says

      একটা পড়লেই পরেরটা পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকছি, এটাই গল্পকারের সার্থকতা।

মতামত জানান

Your email address will not be published.