বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

ইঁদুরের নিউমোনিয়া ও অস্থির ক্রিস্টাল

ইঁদুরের শরীরে নিউমোনিয়া ব্যাকটিরিয়ার বেঁচে ওঠা থেকে পাখির ডানার রঙের গভীরে যে জিনের খেলা আর তার জন্য যে নিউক্লিক অ্যাসিড অণুর কারসাজি আছে, তা প্রমাণ করা গেল।

অরণ্যজিৎ সামন্ত

সকল বৈচিত্র্যের আড়ালে থাকে কিছু সরল উপকরণের সজ্জাবিন্যাস। সে প্রকৃতিতেই হোক বা মানুষের ভাবনার বৃত্তে। বিজ্ঞানের কাজ তার অনুসন্ধান। সুরে সা থেকে নি, এর মধ্যেই আছে যতেক জাদু। সূর্যের আলোর বেগুনি থেকে লাল বর্ণমালার বিন্যাসেই আছে রঙের যত বাহার। ইংরেজিতে এ থেকে জেড আর বাংলায় অ থেকে চন্দ্রবিন্দুতেই বিধৃত সাহিত্যের ভুবন, তার কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস। সব ভাষাতেই এক রীতি। সরল সুরের যোগানদার কখনও প্রকৃতি— যেমন পাখির গান, নদীর তান, পল্লবমর্মর ধ্বনি। আবার কখনও মানুষ শব্দ নিয়ে ফাঁদে কবিতা, বাঁধে সুর। সে সাহিত্য রচনা করে। বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। আবার অন্যদিকে সৃষ্টিকে বাঁচিয়েও রাখে সেই বৈচিত্র্য। সে যত ডালপালা মেলে, ততই সজীবতায় ভরে ওঠে। প্রকৃতির নিজস্ব সজীবতার মধ্যেও এই বিচিত্রতা, এই বহুরূপতা বর্তমান। বর্ণ গন্ধ ছন্দ ও সুরের ভূষণে সে নিজেকে সাজায়। চার্লস ডারউইন বুঝেছিলেন সে কথা। শুধু বুঝেছিলেন নয়, বৈচিত্র্যই যে প্রকৃতিতে টিকে থাকার, বিবর্তিত হওয়ার প্রধান হাতিয়ার, তাও লিখেছিলেন তাঁর বইতে। সেটা ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে।
এখন বিচার্য হল, এই যে উপকরণ, তার উৎস কী। চরিত্রটাই বা কী তার। কী দিয়ে সে গড়া। ডারউইন অবশ্য সেটা ধরতে পারেননি। সে অন্য কথা। কিন্তু এই যে আপাতদৃষ্টিতে একইরকম শামুক, ঝিনুক, প্রজাপতি, মাছ আমরা দেখি, সব কি প্রকৃতই অভিন্ন? না। ‘‘আকারে-আকৃতিতে তো বটেই, সূক্ষ্ম রঙের পার্থক্যে, আঁশের গঠনে, শরীরের রোঁয়ার বিন্যাসে, সব দিক থেকেই তারা ভীষণরকম আলাদা।’’ লিখেছেন বিজ্ঞানী আর্নস্ট মায়ার। তার মানে প্রকৃতির উপাদানের যত গভীরে অনুসন্ধান করা হবে, বৈচিত্র্যের নানা দিক উঠে আসবে। গাছের পাতার একটা কোষ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে রেখে নজর করলেই বোঝা যাবে বিন্যাসসৌষ্ঠব আপাতভাবে যা চোখে পড়ে তার বাইরেও কত দূর বিস্তৃত। ফলে, খালি চোখে দেখা যায় না এমন জগতের ছবি যন্ত্রের সাহায্যে যত বেশি করে ফুটে উঠছে, বিচিত্রতার নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হচ্ছে মানুষের সামনে।
ডারউইন বলেছিলেন, এই বৈচিত্র্য বা ভ্যারিয়েশন জীবের টিকে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। কিন্তু প্রশ্ন হল, কীভাবে সে কাজ করে? প্রকৃতির এই পাজল বক্স কোন কোন ধরনের উপাদান (পিস) দিয়ে তৈরি? পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব সাড়ে তিনশো কোটি বছর আগে। ভাবা যায়! কোনও পাজল এতদিন খেলা যায়? বিজ্ঞানী স্টিভ জোনস ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব সম্বন্ধে মন্তব্য করছেন, “ইভোলিউশন থিয়োরির লজিকটা খুব সরল। সবার মধ্যেই ভ্যারিয়েশন আছে। বাবা-মায়ের থেকে সেটা সন্তানে যায়। সেটা নিয়েই যে যোগ্য সে টিকে থাকে। …এভাবেই পরপর প্রজন্মগুলিতে কিছু জীব কিছু কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মাতে থাকে আর পৃথক হতে থাকে অন্যদের থেকে। এভাবেই অনেকটা চলার পর… অনেক নতুন বৈশিষ্ট্য জমা হয়ে যাবার পর, নতুন প্রজাতির জন্ম হয়।” যেন এমন পাজল যার সজ্জা উপাদান (পিস) পাল্টে যায় সময়ের সঙ্গে। শুরু হয় নতুন করে সাজানোর খেলা। কে এই কাজ করছে, জানবার চেষ্টা সেটাই।

ইঁদুরের নিউমোনিয়া

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ১৯১৮-তে ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণ মহামারীর আকার ধারণ করে। ইতিহাসে তাকে স্প্যনিশ ফ্লু বলা হয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে এই রোগে। স্প্যানিশ ফ্লুয়ের দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রধান বিপদ ছিল নিউমোনিয়া, অনেকটা একালের করোনা সংক্রমণেও যা দেখা গেছে, তাই। নিউমোনিয়া ফুসফুসের রোগ। ১৯২৮-এ ব্রিটিশ সরকার লন্ডনে নিউমোনিয়া ব্যাকটিরিয়ার ওপর গবেষণার ভার দিয়েছিলেন ফ্রেডরিক গ্রিফিথকে। গ্রিফিথ সেইসময় ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ডাক্তার, নিউমোনিয়া নিয়ে গবেষণা করে ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। গ্রিফিথ লক্ষ করলেন, আলাদা দেখতে দু’রকম ব্যাকটিরিয়া ইঁদুরের শরীরে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ ঘটাতে পারে। একটি নিরীহ, সে শরীরে গেলেও ইঁদুর মরে না। আর একটি ক্ষতিকর। সে ইঁদুরকে মেরে ফেলে। গ্রিফিথ ক্ষতিকর জীবাণুটিকে গরম করে, ‘তাপমৃত’, (ইংরেজিতে এ হল ‘হিট কিলিং’। নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর জীবকে রেখে তার শারীরিক সক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়ার পদ্ধতি) করে ইঁদুরকে ইঞ্জেকশন দিয়ে দেখলেন, জীবাণুর ক্ষতি করার শক্তি চলে গেছে। ইঁদুর বেঁচে আছে। শেষে নিরীহ আর এই ‘তাপমৃত’ জীবাণু একসঙ্গে ইঁদুরের শরীরে দিয়ে দেখলেন, আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। আলাদাভাবে যে দুটি জীবাণুর ইঁদুরকে মেরে ফেলার ক্ষমতা ছিল না, তারা একসঙ্গে ইঁদুরকে মেরে ফেলল। শুধু তাই নয়, নিরীহ ও ক্ষতিকর, দু’রকম জীবাণুই মৃত ইঁদুরের শরীরে পাওয়া গেল। এই ফলাফলে গ্রিফিথ উৎসাহিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে তিনি স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি ব্যাকটিরিয়ার ভোলবদলের একটি চেহারা ধরতে পারলেন যা ভ্যাকসিন তৈরিতে কাজে লাগবে। গ্রিফিথ মনে করতেন, ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে জীবাণুকে ভালভাবে চেনাটাই খুব জরুরি। এহেন বহুরূপতার কারণ কী, বিবর্তনে তার কী ভূমিকা, এসব ভাবার ইচ্ছে গ্রিফিথের ছিল না। তিনি ভাবছিলেন, কীভাবে অ্যান্টিসেরাম বানানো যায়। ডাক্তার হিসেবে রোগীর চিকিৎসার সুবিধে হয়। গ্রিফিথ যা চাননি, গবেষণা কিন্তু গেল সেই দিকেই। পাজলের সন্ধান মিলল যেন। বহুরূপতার কারণ খুঁজে নিতেই আগ্রহ বেড়ে গেল। কোন রাসায়নিক অণু বৈচিত্র্যকে ধারণ করছে, উপকরণ কী, সেটাই আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠল। যে প্রশ্নের উত্তর ডারউইনের জানা ছিল না, গ্রিফিথ যেন তার গবেষণায় সেই উত্তর খোঁজার পথটা দেখালেন।

মটর গাছের উচ্চতা আর ফল-মাছির চোখ

জীবের বৈচিত্র্যের উৎস অনুসন্ধানের ইতিহাসটি দীর্ঘ। কে ভাল কে খারাপ, কোনটি লাভজনক আর কোনটি তা নয়, বেছে নেওয়ার কাজটি মানুষ বহু আগে থেকেই শুরু করেছিল। ভাল মানের ও লাভজনক ফসল উৎপাদন করতে কোন বীজ বাছতে হবে, তাকে তো জানতেই হত। ফলে গ্রিফিথের পরীক্ষার অনেক আগে থেকেই চাষের জমিতে কোন বীজ লাগালে ভালো ফলন মিলবে তা জানা হয়ে গিয়েছিল। এভাবেই একদিন অস্ট্রিয়ার এক পাদ্রী, গ্রেগর মেন্ডেল, গ্রিফিথের ইঁদুরের জায়গায় মটর গাছের ওপর কিছু ‘বৈজ্ঞানিক’ পর্যবেক্ষণ লক্ষ করলেন। বস্তুত, সেটাকেই চারপাশে দেখতে পাওয়া জীবজন্তুর বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণের প্রথম গাণিতিক মডেল হিসেবে ধরা হয়। মেন্ডেল যদিও ধর্মপ্রচারক ছিলেন, তথাপি বাগানে মটর গাছের ফলন বাড়িয়ে নিতে কোন গাছের সঙ্গে কোন গাছের ‘মেটিং’ সুবিধাজনক হবে তা খুঁজে নেওয়ার আগ্রহ তাঁর ছিল। সেটা ধর্মাচরণকে বাধা দেয়নি। যদিও আঠাশ হাজার বিভিন্ন গাছের মধ্যে থেকে বেছে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পথটি খুব সহজ ছিল না। দুটি বেঁটে মটর গাছ সবসময় বেঁটে গাছের জন্ম দেয়, কিন্তু দুটো লম্বা মটর গাছ সবসময় কেন লম্বা গাছের জন্ম দেয় না তার ব্যাখ্যা অঙ্ক কষে তিনি দিতে পেরেছিলেন। ফলে গ্রিফিথের পরীক্ষার ছয় দশকের বেশি আগেই বিজ্ঞানীরা ধরতে পেরেছিলেন মটর গাছের চোদ্দোরকম বৈশিষ্ট্য কোন সংখ্যায় ও অনুপাতে এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে যায়।
মেন্ডেলের পর্যবেক্ষণ ১৮৬৬-তে প্রকাশিত হয় কিন্তু বিজ্ঞানীমহলে অনাদৃত হয়। নতুন দৃষ্টিকোণ, অভ্যস্ত নন সবাই। মেনে নিতে অসুবিধে হল। তাছাড়া সে সময় ডারউইনের তত্ত্ব সব ভাবনাকে ঢেকে রেখেছিল। বৈচিত্র্য বা বৈশিষ্ট্য যাই বলি, তা কী অনুপাতে ছড়ায়, সে ব্যাপারে মেন্ডেলের বিশ্লেষণ ডারউইন নিজে কাজে লাগাতে পারেননি। বাকি, যাঁরা জানতেন, বুঝেছিলেন বলে ভেবেছিলেন, তাঁরা মেন্ডেলের পরীক্ষার ফলাফলকে বাবা-মায়ের যুগ্ম বৈশিষ্ট্যের ‘মিলিজুলি’ (মিশ্রিত বা ব্লেন্ডেড) অনুপাত বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এরা কেউ বিষয়গুলি খতিয়ে দেখেননি। ফলে বৈশিষ্ট্য কীভাবে বংশানুসরণের মাধ্যমে বন্টন হতে পারে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা সেই সময় অন্ধকারেই থেকে গেলেন। মেন্ডেল ও গ্রিফিথের পর্যবেক্ষণ পাশাপাশি রেখে যদি ভাবা যায়, দেখা যাবে, ছয় দশকের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে তাঁরা যা পর্যবেক্ষণ করলেন, বস্তুত তার দুটি দিক। একটি তার গাণিতিক ব্যাখ্যা— বৈচিত্র্য কী অনুপাতে যায়, আর অন্যটি— রাসায়নিকভাবে ব্যাকটিরিয়ার ‘ট্রান্সফর্মেশন’, যে আসলে বদল ঘটায় তাকে খুঁজে বের করা।
মেন্ডেলকে অবজ্ঞার মাসুল গুনতে হল বিজ্ঞানকে। চৌত্রিশ বছর পরে, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে মেন্ডেলের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হল। উইলহেম জাঁসে ১৯০৯-এ মেন্ডেলের ব্যবহার করা ‘ফ্যাক্টর’ শব্দটির বদলে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করলেন। যা এখন ভুল ব্যবহৃত। ১৯০২-এ থিওডোর বোভেরি ও ওয়াল্টার সাটন দেখালেন এই জিনের বাহক হল কোষের ক্রোমোজোম। ততদিনে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। ১৯১০-এ আমেরিকান বিজ্ঞানী মরগ্যান মটর গাছের বদলে ‘ফল-মাছি’ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন। মুখ্য উদ্দেশ্য, মেন্ডেলের পর্যবেক্ষণকে আরও স্পষ্ট করে তোলা এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারক যে ‘ফ্যাক্টর’-এর কথা মেন্ডেল বলেছিলেন তার অবস্থান ও প্রকৃতি সম্বন্ধে আরও নিঃসন্দেহ হওয়া। তিনি ধারণা দিলেন, একাধিক জিন একসঙ্গে পিতা-মাতা থেকে সন্তানে যেতে পারে। তাদের কারও মধ্যে একত্রে যাবার প্রবণতা থাকতে পারে, যা মেন্ডেল জানতেন না। ১৯২৬-এ আর এক আমেরিকান বিজ্ঞানী মুলার দেখালেন, এই যে বৈশিষ্ট্য, যে বৈচিত্র্য ঘটাচ্ছে, তাকে এক্স রে চালিয়ে বদলে ফেলাও সম্ভব। লাল চোখের মাছিদের থেকে সাদা চোখের মাছির জন্ম হতে পারে। তার মানে, বদল কার জানা না গেলেও, বোঝা যাচ্ছে বদল ঘটছে এবং তার গঠন পরিবর্তনশীল রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি। এই জায়গায় এসে কে দায়ী তা জানা না গেলেও, সে কোথায় থাকে, কীভাবে যায়, আর তাকে যে বদলে ফেলা যায়, মানে সে যে বিশেষ রাসায়নিক গড়নযুক্ত তা জানা গেল।

তারে ধরি ধরি মনে করি

রাসায়নিক উপাদানের অনুসন্ধান ১৮৬৯-তে শুরু হয়েছিল। মেন্ডেলের গবেষণার ফল প্রকাশের তিন বছর পরে। ফ্রেডরিক মিশার জার্মানির স্থানীয় হাসপাতালের রোগীদের পুঁজ ব্যান্ডেজ থেকে রক্তকণিকা নিউট্রোফিল নিয়ে কাজ শুরু করলেন। নিউট্রোফিলের নিউক্লিয়াস থেকে ‘নিউক্লিন’ উপাদান বের করে ফেলেছেন তিনি। জেনে গেছেন, তাতে ফসফরাস ও নাইট্রোজেন থাকে, সালফার থাকে না। ভাবছেন, এই উপাদানই কি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বয়ে যেতে পারে? ভাবলেন, কিন্তু প্রমাণ করতে পারলেন না। কিছু পরে, ১৮৯৫ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত গবেষণার ভিত্তিতে জার্মানিতে অ্যালব্রেখট কোসেল বললেন, মিশার যে ‘নিউক্লিন’-এর কথা বলেছিলেন, আসলে সেটাই নিউক্লিক অ্যাসিড। নতুন এক জৈব অণুর দিকে নজর গেল, যার দুটি ধরন। DNA ও RNA। ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড এবং রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড। কোসেল বললেন এতে অ্যাডিনিন, গুয়ানিন, থায়ামিন, সাইটোসিন ও ইউরাসিল (A, T, G, C ও U) নামের উপাদান থাকে। ১৯১০-এ তাঁকে নোবেল দেওয়া হল এই আবিষ্কারের স্বীকৃতিতে।
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ফিবাস লেভিন নিউক্লিক অ্যাসিড গবেষণায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেন। শুধু তাই নয়, যে কথা ভাবা হচ্ছিল, নিউক্লিক অ্যাসিড জেনেটিক বস্তু কিনা, সে ব্যাপারেও তিনি মিশারের অনুমান নস্যাৎ করে প্রায় সিদ্ধান্ত করে ফেললেন যে, নিউক্লিক অ্যাসিড জেনেটিক বস্তু নয়। লেভিন স্পষ্ট করলেন, কোসেলের বলে যাওয়া A, T, G, C, U জুড়ে থাকে একধরনের শর্করা উপাদান দিয়ে। আর বললেন, G-A-C-T সমবায়ে DNA অণু গঠিত। বৈচিত্র্যহীন টেট্রানিউক্লিওটাইড। কাজেই, আণবিক গঠনে যে অণুর গঠন স্থির তার হাতে জীবজগতের যাবৎ জীবের বৈচিত্র্য থাকবে কীভাবে? এই কথা লেভিন যখন বলছেন আমেরিকায়, আটলান্টিকের অন্য তটে গ্রিফিথ দেখছেন, নিউমোনিয়ার মৃত ব্যাকটিরিয়া কী এক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বেঁচে উঠছে ইঁদুরের শরীরে।

আভেরি আর দুই আরভিনের গল্প

নিউক্লিক অ্যাসিড নামের একটি রাসায়নিকের অস্তিত্ব জানা গেছে। গঠনও জানা গেছে কিছুটা। কিন্তু কাজ জানা যায়নি। এমতাবস্থায়, ১৯৩৮-এ আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আসেন আরভিন শ্রয়েডিংগার। পদার্থবিদ্যার পাঠক এঁর নাম জানেন। জীববিজ্ঞানের পাঠকের কাছে ইনি অপরিচিত হতে পারেন। তবে আধুনিক জীববিজ্ঞানের দিশা নির্দেশক হিসেবে এঁর অবদান স্মরণীয়। ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৪৩-এ শ্রয়েডিংগার তিনটি বক্তৃতা দেন। বিষয় ছিল ‘হোয়াট ইজ লাইফ’। পরে ওই নামে বইও প্রকাশিত হয়। জার্মানিতে তখন কার্ল জিমার, ম্যাক্স ডেলব্রুক ‘জিন’-এর মধ্যে কতগুলি পরমাণু আছে তা খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। শ্রয়েডিংগার বললেন, “প্রতিটি সজীব কোষ পরিচালনার জন্য কোষের ভেতরেই ‘কোড-স্ক্রিপ্ট’ থাকা দরকার। তার সজ্জাবিন্যাস শৃঙ্খলিত ও রক্ষণশীল হওয়া উচিত। বংশপরম্পরায় বাহিত বৈশিষ্ট্যের ‘অ্যপিরিওডিক ক্রিস্টাল’ এরই মধ্যে থাকবে। সে অ্যাপিরিওডিক, পিরিওডিক বা পর্যায়ক্রমিক নয়। কারণ, এর বিন্যাস নির্দিষ্টভাবে নিয়ম মেনে পাল্টাবে না। একটা অনিশ্চয়তা থাকবে। আবার অন্যদিকে, সে এতটাও অবিন্যস্ত হবে না যে তাকে ক্রিস্টালও বলা যাবে না।” তিনি এও বলেছিলেন যে, “এই ক্রিস্টালের কোড খুব জটিল হতে পারে না। তা হতে পারে মর্স কোডের মতো বাইনারি।” এই প্রথম কেউ বললেন, জেনেটিক কোড সরল বাইনারি হতে পারে।
শ্রয়েডিংগার স্পষ্ট করলেন ‘জিন’ কী হতে পারে। কী হওয়া দরকার। কী হলে এই কোটি কোটি বছরের বৈচিত্র্যকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। অথবা, এই পর্যন্ত জিন গবেষণা যেখানে এসেছে তার ব্যাখ্যা মিলতে পারে। ভ্যারিয়েশনের জন্য দায়ী উপাদানের একটা মলিকিউলার মডেল বানানো সম্ভব হতে পারে। তবে তার আগে গ্রিফিথের ফেলে আসা পথে আর একবার হাঁটা দরকার।
সেই কাজ করলেন আভেরি। তিনি বুঝেছিলেন, গ্রিফিথের পরীক্ষায় মৃত ব্যাকটিরিয়ার কোন উপাদান নিরীহ ব্যাকটিরিয়াকে প্রাণঘাতী ব্যাকটিরিয়ায় পরিণত করছে তা জানতে হলে একাধিক সম্ভাব্য জৈব উপাদান নাকচ করতে হবে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দাবিদার প্রোটিন। নিউক্লিক অ্যাসিড গবেষণার পাশাপাশি সারা পৃথিবী জুড়েই প্রোটিনের গঠনের গবেষণা চলছিল। লিনাস পাউলিং, ফ্রেডারিক স্যাঙ্গার, ম্যাক্স পেরুজ, জন কেন্ড্রিউ কাজ করছিলেন। একটা ধারণা গড়ে উঠছিল যে, প্রোটিনের গঠনের যে বৈচিত্র্য এবং ব্যাপ্তি, নিউক্লিক অ্যাসিড তার তুলনীয় হতে পারে না। কাজেই প্রোটিনের সম্ভাবনাকে বাতিল করা সহজ ছিল না। ছিল RNA অণুর সম্ভাবনাও। তাকেও বাতিল করতে হত। ১৯৪৪-এ আভেরি, ম্যাকলিয়ড ও ম্যাকার্থি গ্রিফিথের পরীক্ষা থেকেই প্রমাণ করলেন যে নিউক্লিক অ্যাসিডই শেষ বিচারে শ্রয়েডিংগারের ‘অ্যপিরিওডিক ক্রিস্টাল’, জিনবস্তু। জীবের যাবতীয় বৈচিত্র্যের জন্য দায়ী রাসায়নিক।
লেভিনের প্রস্তাব ছিল, নিউক্লিক অ্যাসিড অণু চারটি নিউক্লিওটাইডের সমবায়। G-A-C-T। অবশ্য DNA যে জিনবস্তু তা প্রমাণ হওয়ার আগেই এ কথা বলেছিলেন তিনি। সজীব কোষের সকল বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় DNA দ্বারা। পিতা-মাতার থেকে সন্তানের দেহে সেই DNA অণুই বৈশিষ্ট্য নিয়ে যায়। কাজেই তার গঠন কখনও এতটাই সংরক্ষিত হতে পারে না। যেমন শ্রয়েডিংগার বলেছেন। ১৯৫০-এ বিজ্ঞানী আরভিন চারগাফ প্রমাণ করলেন, জীবের কোষে যে DNA থাকে সেখানে A=T, এবং G=C। প্রজাতি ভেদে এই অনুপাতের পার্থক্য ঘটে থাকে। মানুষের A/T অনুপাত শিম্পাঞ্জির অনুপাতের সঙ্গে এক হয় না। পার্থক্য ঘটে। এটাই প্রজাতি ভেদের তফাত। চারগাফের পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করল, প্রতিটি প্রজাতির DNA গঠন আলাদা। শিম্পাঞ্জির সঙ্গে মানুষের জিনগত সাদৃশ্য ৯৬ শতাংশ। বাকি চার শতাংশের অমিল থেকে মানুষের জন্ম।
মেন্ডেল, গ্রিফিথ, মুলার, মিশার এবং অন্য অনেকে মিলে একটা ছবি আঁকছিলেন যেন। শ্রয়েডিংগার সেই ছবিটিকে সম্পূর্ণ করলেন। পরের গবেষণা সেই দিকেই এগিয়ে গেল। বৈচিত্র্য বা ভ্যারিয়েশনের কারণ নিউক্লিক অ্যাসিড অণু— বিজ্ঞান সেটা প্রমাণ করল। ইঁদুরের শরীরে নিউমোনিয়া ব্যাকটিরিয়ার বেঁচে ওঠা থেকে পাখির ডানার রঙের গভীরে যে জিনের খেলা আর তার জন্য যে নিউক্লিক অ্যাসিড অণুর কারসাজি আছে, তা প্রমাণ করা গেল। এই অম্লটি জীবকোষের মধ্যে থেকে যাবতীয় কাজ করে। তার চরিত্র নির্মাণ করে। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে জীবের টিকে থাকা ও ক্রমবিবর্তনকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে এই রাসায়নিক উপাদান। ভাইরাস থেকে মানুষ— কেউ তার বাইরে নয়।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.