বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

কাবুলকথা

বাঙালি পাঠক প্রথম কাবুলের মানুষকে জানলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে। “ময়লা ঢিলা কাপড় পরা, পাগড়ি মাথায়, ঝুলি ঘাড়ে, হাতে গোটা দুই-চার আঙুরের বাক্স, এক লম্বা কাবুলিওয়ালা মৃদুমন্দ গমনে পথ দিয়া যাইতেছিল।”

সৃজা মণ্ডল

‘ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর/আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’— কবি শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতায় পিতার এই আকুতির সঙ্গে যোগসূত্র ঘটে যায় ইতিহাসে বর্ণিত বাবরের আকুল আবেদন যেখানে তিনি আল্লার কাছে নিজের প্রাণের বিনিময়ে তাঁর পুত্র হুমায়ুনের জীবন কামনা করেছিলেন। আজকের আফগানিস্তান দেখুন। আজ তালিবান অধিকৃত আফগানিস্তানের বাবা-মায়েরা কাঁটাতার ঘেরা উঁচু পাঁচিল থেকে কাঁথায় মোড়া ছোট ছোট শিশুদের সেনার হাতে কার্যত ছুড়ে দিচ্ছেন, সঙ্গে কাতর অনুরোধ, এই শিশুদের যেন শরণার্থী বিমানে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এই ত্রাসের রাজত্ব থেকে বহুদূরে, অন্য দেশে।
বাবর কাবুলে এসে দেখেছিলেন, আদিগন্ত চাষজমি। তারই মাঝে কাবুলের অবস্থান। এর পুব দিকে পরশাওয়ার (বর্তমানে পেশোয়ার), হ্যস্ত নগর আর হিন্দুস্থানের কিছু অংশ। পশ্চিমে ঘুর পর্বতশ্রেণি, এখন হাজারা ও নিকুদারি উপজাতির আশ্রয়স্থল। উত্তরে, হিন্দুকুশ পর্বতমালা দ্বারা দু’ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একধারে কুন্দুজ, অন্যধারে অন্দর আব অঞ্চল। দক্ষিণে আছে ফারমুল, নগজ, বান্নু নামের সব জনবসতি। আর আছে আফগানিস্তান, অর্থাৎ কাবুল-পেশোয়ার রাস্তার দক্ষিণে আফগান উপজাতির বসতি।
আফগান রাষ্ট্র আসলে বহু জাতিগোষ্ঠীর মিশেল। অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা মিলে আফগান রাষ্ট্র। এখানকার জনগোষ্ঠীর মাঝে সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতুন। তবে এছাড়াও এখানে তাজিক, উজবেগ, তুর্খমেন ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। যেহেতু বহু জাতির আবাস, তাদের সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন। মূলত ট্রাইবাল ডমিনেন্ট কালচার তাদের, কিন্তু এক এক জায়গায় এক একরকম লোকাচার বা রীতিনীতি।
বাঙালি পাঠক প্রথম কাবুলের মানুষকে জানলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে। “ময়লা ঢিলা কাপড় পরা, পাগড়ি মাথায়, ঝুলি ঘাড়ে, হাতে গোটা দুই-চার আঙুরের বাক্স, এক লম্বা কাবুলিওয়ালা মৃদুমন্দ গমনে পথ দিয়া যাইতেছিল।” ১৮৯২ সালে প্রকাশিত ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার কাবুলিওয়ালাদের বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবেই। তবে তাঁর দেখা কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে আজকের কাবুলিওয়ালাদের বেশ ফারাক রয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কিছু আগে ব্রিটিশ আমলে প্রথম কলকাতায় আসেন এই কাবুলিওয়ালারা। প্রায় দু’শো বছর ধরে তাদের কয়েকটি প্রজন্ম বাস করছেন এই কলকাতায়। কাবুলিওয়ালা বলা হলেও তারা অনেকেই কাবুলের বাসিন্দা নন। আফগানিস্তানের কান্দাহার, জালালাবাদ থেকেও অনেকেই এসেছেন কলকাতায়। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা তাঁর ঝুলিতে করে বিক্রি করতেন আফগানিস্তানের স্বাদ আর গন্ধ। পেস্তা, বাদাম, আখরোঠ ও আরও হরেকরকম শুকনো ফল। ইতিহাস বলছে, বহু যুগ আগে থেকেই আফগানরা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শুকনো ফলের ব্যবসা করতেন। গত কয়েক দশকে তাঁরা অন্যান্য ব্যবসার দিকেও ঝুঁকেছেন, যার মধ্যে রয়েছে শহরের বড়বাজার এলাকায় দর্জির দোকান। তবে এখনকার কাবুলিদের মূল জীবিকা সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দেওয়া।

আফগানদের মানবিকতার বর্ণনা পাই রবীন্দ্রনাথের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকে।

১৯২৭ সালে কাবুল কৃষি কলেজে অধ্যাপনা করতে গিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর আফগানিস্তান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ছবি এঁকেছেন ‘দেশে বিদেশে’ উপন্যাসে।
‘‘চোখ বন্ধ অবস্থায়ই ঠান্ডা হাওয়ার প্রথম পরশ পেলুম। খুলে দেখি সামনে সবুজ উপত্যকা— রাস্তার দুদিকে ফসলের ক্ষেত। সর্দারজী পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন ‘জলালাবাদ’।
দেক্কার পাশের সেই কাবুল নদীর কৃপায় এই জলালাবাদ শস্য শষ্প শ্যামল। এখানে জমি বোধহয় দক্কার মত পাথরে ভর্তি নয় বলে উপত্যকা রীতিমত চওড়া— একটু নীচু জমিতে বাস নামার পরে আর তার প্রসারের আন্দাজ করা যায় না। তখন দুদিকেই সবুজ আর লোকজনের ঘরবাড়ী। সামান্য একটি নদী ক্ষুদ্রতম সুযোগ পেলে যে কি মোহনীয় সবুজের লীলাখেলা দেখাতে পারে জলালাবাদ তার অতি মধুর দৃষ্টান্ত। এমন কি যে দুটো চারটে পাঠান রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তাদের চেহারা ও যেন ফ্রন্টিয়ারের পাঠানের চেয়ে মোলায়েম বলে মনে হল। লক্ষ্য করলুম যে-পাঠান বড় শহরে গিয়ে সেখানকার লোকের ‘বেপর্দামির’ নিন্দা করে তারই বউ ঝি ক্ষেতে কাজ করছে অন্য দেশের মেয়েদেরই মত। মুখ তুলে বাসের দিকে তাকাতে ও তাদের আপত্তি নেই। বেতার কর্তাকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘আমার যতদূর জানা, কোনো দেশের গরীব মেয়েই পর্দা মানে না। অন্ততঃ আপন গাঁয়ে মানে না। শহরে গিয়ে মধ্যবিত্তের অনুকরণে কখনো পর্দা মেনে ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করে কখনো কাজকর্মের অসুবিধা হয় বলে গাঁয়ের রীতিই বজায় রাখে।’
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘আরবের বেদূইন মেয়েরা?’
তিনি বললেন, ‘আমি ইরাকে তাদের বিনাপর্দায় ছাগল চরাতে দেখেছি। থাক্ উপস্থিত এসব আলোচনা। গোটা দেশটা প্রথম দেখে নি; তারপর রীতিরেওয়াজ ভালোমন্দের আলোচনা করা যাবে।’’
মুজতবা আলী লিখছেন : “কাবুলের সামাজিক জীবন তিন হিস্যায় বিভক্ত। পয়লা শরিক খাস কাবুলী; সেও আবার দু’ভাগে বিভক্ত— জনানা, মর্দানা। কাবুলি মেয়েরা কট্টর পর্দার আড়ালে থাকেন, তাঁদের সঙ্গে নিকট আত্মীয় ছাড়া, দেশী-বিদেশী কারো আলাপ হওয়ার জো নেই। পুরুষের ভিতরে আবার দু’ভাগ। একদিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের মোল্লা সম্প্রদায়, আর অন্যদিকে প্যারিস-বার্লিন–মস্কো ফের্তা এবং তাদের ইয়াবক্সীতে মেশানো ইয়োরোপীয়ো ছাঁচে ঢালা তরুণ সম্প্রদায়। দুসরা শরিক ভারতীয় অর্থাৎ পাঞ্জাব ফ্রন্টিয়ারের মুসলমান ও ১৯২১ সনের খেলাফৎ আন্দোলনের ভারতত্যাগী মুহাজিরগণ। তিসরা শরিক ইংরেজ, ফরাসী, জর্মান, রুশ ইত্যাদি রাজদূতাবাস।”
১৯২৮ সালে শ্রীসুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সহযাত্রী হয়েছিলেন কয়েকজন কাবুলিওয়ালার। সেই অভিজ্ঞতা আমরা পাই ‘পথ-চলতি’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন : “ফারসী হচ্ছে আফগানিস্তানের শিক্ষিত জনের ভাষা, উচ্চ ও ভদ্র সমাজের ভাষা, সরকারি ভাষা।” পাঠানের মাতৃভাষা পশতু। তাদের গ্রামগুলোতে দারিদ্র্যে র ছবি স্পষ্ট। সরকার তাদের উন্নতির ব্যাপারে বেশ উদাসীন।
মুজতবা আলীর কথায় : “আফগানিস্তানের সম্পূর্ণ চাষবাসের সময় শুকনো ঋতুতে। শীতে তাদের ক্ষেতের উপর বরফ জমে। এই পানি গলে চুঁইয়ে মাটির নিচে ঢুকে ক্ষেতটাকে নরম করে তোলে। গ্রীষ্মকালে চারপাশের পাহাড়গুলোর উপরে জমা বরফ গলে কাবুল উপত্যকায় নেমে আসে। চাষীরা তখন এই পানি বাঁধ দিয়ে নিজেদের ক্ষেতগুলো নাইয়ে নেয়।” তাঁর বাড়ির সামনে এরকমই একটি নালা বয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি আফগান কৃষকের এসব চাষবাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।
আপাতদৃষ্টিতে পাঠানদের শুষ্ক, রসকষহীন মনে হলেও একবার আলাপ হলেই তারা যে কাউকে আপন করে নেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন : “পাঠানের অভ্যর্থনা সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক। অতিথিকে বাড়িতে ডেকে নেওয়ার মত আনন্দ পাঠান অন্য কোনো জিনিসে পায় না আর সে অতিথি যদি বিদেশী হয় তা হলে তো আর কথাই নেই।” পাঠানরা অলস এবং আড্ডাবাজ হলেও তারা আরামপ্রয়াসী নয়। গালগল্প আর আড্ডায় মশগুল থাকা স্বভাবের ভেতরে তাদের অকৃত্রিম দেশপ্রেম আবিষ্কার করেছিলেন মুজতবা আলী।

১৯২৭ সালে কাবুল কৃষি কলেজে অধ্যাপনা করতে গিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর আফগানিস্তান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ছবি এঁকেছেন ‘দেশে বিদেশে’ উপন্যাসে।

১৯৪০ সালে রামনাথ বিশ্বাস গিয়েছিলেন আফগানিস্তানে। বাহন সাইকেল। ১৯৪১ সালে কলকাতায় থিতু হবার পর তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লেখা শুরু করেন। যা ‘আফগানিস্থান ভ্রমণ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তিনি লিখেছেন, ‘‘কোথায় ডাকাতের অত্যাচার আর কোথায় হিন্দু বিদ্বেষ’’। এমনকি আফগান জাতিকে নিষ্ঠুর নরঘাতী বলে যারা চিত্রিত করেছেন তাদের প্রতিও তাঁর মনে ঘৃণা জন্মেছিল।
আফগানিস্তানে পৌঁছে রামনাথ বিশ্বাসের পরিচয় হয়েছিল লক্ষ্মী নামে একটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে। লক্ষ্মীর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করার পর তাঁর সামনে লক্ষ্মীর মধ্যে যেন সমস্ত বাংলাদেশ মূর্ত হয়ে উঠেছিল। সেখানেই তিনি দেখেছিলেন লক্ষ্মীর পুস্তকের ভাণ্ডার— কাশীদাসের মহাভারত, টেকচাঁদ ঠাকুরের গ্রন্থাবলী, বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখর, আনন্দমঠ, বিষবৃক্ষ ও পুরনো কয়েকটি প্রবাসী পত্রিকা।
ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস লিখেছেন : “পাঠানদের একটা প্রচলিত কথা আছে, যদি বাঁচতে হয় তবে মরণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবেই, লড়াই করতে হবেই, বৈদেশিক শত্রুকে রুখতে হবেই, যদি বাঁচতে হয় তবে নেকড়ে বাঘের মতো লড়তে হবেই, মরণকে কোন মতেই ভয় করলে চলবে না।” এসব কথা যখন রামনাথ বিশ্বাস শুনছিলেন তখন তাঁর মনে পড়েছিল নিজের দেশের কথা। তিনি বলেছেন : “আমাদের প্রাণের মায়া অপরিসীম। আমরা মরতে জানি না, বাঁচতেও জানি না। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ ভগবানের ওপর ছেড়ে দি। পাঠানেরা আল্লাকে মানে, আল্লার নামে ভয়ও পায়, কিন্তু তা বলে নিজের দেশকে, নিজের মা বোনকে রক্ষা করার বেলা আল্লার ওপর সব ছেড়ে দেয় না।”
আফগানদের মানবিকতার বর্ণনা আমরা পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধে। “কয়েক বৎসর পূর্ব্বে লণ্ডনের টাইম্‌স পত্রে একটি সংবাদ বেরিয়েছিল, আমেরিকার নেশন পত্র থেকে তার বিবরণ পেয়েচি। বায়ুপোতে চ’ড়ে ব্রিটিশ বায়ুনাবিকসৈন্য আফগানিস্থানে মাহ্‌সুদ্‌ গ্রাম ধ্বংস করতে লেগেছিল। শতঘ্নীবর্ষিণী একটা বায়ুতরী বিকল হয়ে গ্রামের মাঝখানে গেল পড়ে। একজন আফগান মেয়ে নাবিকদের নিয়ে গেল নিকটবর্ত্তী গুহার মধ্যে, একজন মালিক তাদের রক্ষার জন্যে গুহার দ্বার আগলিয়ে রইল। চল্লিশজন ছুরি আস্ফালন ক’রে তাদের আক্রমণ করতে উদ্যত, মালিক তাদের ঠেকিয়ে রাখলে। তখনো উপর থেকে বোমা পড়চে, ভিড়ের লোক ঠেলাঠেলি করচে গুহায় আশ্রয় নেবার জন্যে। নিকটবর্ত্তী স্থানের অন্য কয়েকজন মালিক এবং একজন মোল্লা এদের আনুকূল্যে প্রবৃত্ত হোলো। মেয়েরা কেউ কেউ নিলে এদের আহারের ভার। অবশেষে কিছু দিন পরে মাহ্‌সুদের ছদ্মবেশ পরিয়ে এরা তাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দিল।”
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ১৭৪৭ সালে সমস্ত আফগানিস্তান নিয়ে বাদশাহ আহমদ শাহ আবদালি সর্বপ্রথম নিজস্ব রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন শাসকের শাসনামলে এটি একটি পূর্ণ রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়। আফগানিস্তান যতটা না ন্যাশনাল স্টেট তার চেয়ে অনেক বেশি বলা যায় ফেডারেল স্টেট।

১৯২৮ সালে শ্রীসুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সহযাত্রী হয়েছিলেন কয়েকজন কাবুলিওয়ালার। সেই অভিজ্ঞতা আমরা পাই ‘পথ-চলতি’ গ্রন্থে।

ইতিহাসে আফগানিস্তানকে বলা হয় ‘রাজাধিরাজদের মৃত্যুপুরী’। যুগে যুগে বহু প্রতাপশালী রাজ্য আফগানিস্তান দখল করতে এলেও প্রায় সকলকেই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। মেসিডোনিয়ার আলেকজান্ডার, মঙ্গোলিয়ার চেঙ্গিস খান বা মোঘল সম্রাট শাহজাহান, ঔরঙ্গজেব আফগানিস্তান দখলে সমর্থ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারেননি। সময়টা ১৮০০ সালের শুরুর দিকে। তখনকার দিনে আফগানিস্তানের একপাশে ছিল বিশাল ‘রাশিয়ান সাম্রাজ্য’ আর অপরদিকে ‘ব্রিটিশদের ভারত রাজ’। এই দুই পরাক্রমশালী রাজ্যের মধ্যে দখলমুক্ত ছোট্ট এক অঞ্চল আফগানিস্তান। ১৮৩৮ সাল। ব্রিটিশদের নজর পড়ে এই অঞ্চলের দিকে। আফগানিস্তানের সে সময়ের রাজা আমির দোস্ত মোহাম্মদকে সরিয়ে দিয়ে ব্রিটিশরা নিজেদের কাঠপুতুল শাহ সুজাকে আফগানিস্তানের মসনদে বসিয়ে দেয়।
আফগানিস্তানের রাজাদের সে সময় ছিল না কোনও প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী। এই অঞ্চলের লোকেরা তখন ছোট ছোট অঞ্চলে বাস করতেন এবং প্রতিটি অঞ্চলের একজন নেতা থাকতেন। যখনই আফগানিস্থানের রাজাদের যুদ্ধে সৈন্য প্রয়োজন হত তখনই এসব অঞ্চলের নেতাদের টাকা দিয়ে সৈন্য ভাড়ায় নেওয়া হত। ১৮৩৯ সালে শাহ সুজার আমলে এই টাকার ভাগ অনেক কমে যায় এসব স্থানীয় নেতাদের। তাই তারা একত্রিত হয়ে শাহ সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যা ইতিহাসে ‘প্রথম ব্রিটেন-আফগান যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। প্রায় তিন বছর ধরে যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের হার হয়। শাহ সুজাকে হত্যা করা হয় এবং আমির দোস্ত মোহাম্মদকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হয়।
১৮৭৮ সালে ব্রিটেন আবার আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে আফগানিস্তানের নতুন আমির হিসেবে আবদুর রহমান খানকে নিযুক্ত করে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটেন আফগানিস্তান এবং ব্রিটিশ ভারতের মাঝে তৈরি করল একধরনের সীমারেখা। যা ‘ডুরান্ড লাইন’ হিসেবে পরিচিত। এটি আজও পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমানারেখা। ১৯০৭ সালে ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার বহু কাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ঠিক তার কাছাকাছি সময়েই রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয় এবং লেনিনের হাতে রাশিয়ার ক্ষমতা আসে। সে হাওয়া এসে পৌঁছয় আফগানিস্তানেও। লেনিনের ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক এক বছর পরেই, ১৯১৯ সালে আফগানিস্তান ব্রিটেনের বিপক্ষে আবারও যুদ্ধ ঘোষণা করে যা ইতিহাসে ‘আফগানিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধ’ নামেও পরিচিত। আফগানিস্তান এই যুদ্ধে জয়লাভ করে পুরোপুরিভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। দিনটি ছিল ১৯১৯ সালের ১৯ আগস্ট। আফগানিস্তানের সে সময়ের রাজা ছিলেন আমির আমানউল্লাহ খান।
বাদশাহ আমানউল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও রীতি-নীতির প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। আমানউল্লাহ নানারকম সংস্কারমূলক কাজ করেছিলেন। যেমন, নারী-পুরুষ সবার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের জোর করে বিয়ে না দেওয়া বা ১৬ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে নিষিদ্ধ করা, এমনকি নারীদের বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার দেওয়া। একাধিক বিবাহের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য সমান বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো নানা পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন এক নতুন আফগানিস্তান তৈরির জন্য। তিনি মেয়েদের বোরকা পরার বিরোধী ছিলেন, ছেলেদের কুর্তা-জামার বদলে কোট-প্যান্ট পরা প্রচলন করেছিলেন। মেয়েদের শিক্ষা এবং ভোটদানের অধিকারও দেন আমানউল্লাহ খান। সব শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের জন্য জেলায় জেলায় আবাসিক স্কুল খোলা হয়। আমানউল্লাহর পত্নী সুরাইয়াও ছিলেন সংস্কারের পক্ষে। ১৯২১ সালে কাবুলে প্রথম মেয়েদের জন্য প্রাথমিক স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেন সম্রাজ্ঞী সুরাইয়া। তাঁর সংস্কারমূলক কাজের বিস্তারিত বর্ণনা মেলে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায়।
সুরাইয়া তার্জি ছিলেন নারী জাগরণের অন্যতম কান্ডারি। তিনি আমানউল্লাহর ভ্রমণসঙ্গিনী হয়ে ইউরোপ ভ্রমণকালে জনসমক্ষে বোরকা ছাড়া বের হন। ইতিহাস বলছে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তখনকার মোল্লা ‘হযরত অফ শোরবাজার’-এর নেতৃত্বে অন্যান্য মোল্লা ও সাধারণ আফগানরাও বাদশাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ১৯২৮ সালে বিক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ নেয়। কমিউনিস্ট ও মোল্লারা সবাই একজোট হন রাজশাসনের অবসান ঘটাতে। সোভিয়েত ইউনিয়নও সরকার-বিরোধীদের ভেতরে ভেতরে সহযোগিতা করতে থাকে। জালালাবাদ থেকে একদল বিদ্রোহী রাজধানীর দিকে অগ্রসর হলে সেনাবাহিনী প্রতিরোধের বদলে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি আমানউল্লাহ খান তার ভাই এনায়েতউল্লাহ খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ব্রিটিশ ভারতে পালিয়ে যান। এর তিন দিন পর বিদ্রোহীরা এনায়েতউল্লাহের কাছ থেকেও ক্ষমতা কেড়ে নেন। মোল্লা শোরবাজার-এর সহায়তায় ডাকু সর্দার বাচ্চা সকাও তখন কাবুল দখল করে নেন। বাদশাহ ও তাঁর পরিবারবর্গ বাচ্চার লোকদের হাতে বন্দি হন।
সেই থেকে আফগানিস্তানে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ। যেখানে ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, ক্ষমতার লোভ, দুর্নীতি সব মিলেমিশে একাকার। সৈয়দ মুজতবা আলী যখন কাবুলে ছিলেন তখন আফগানিস্তানের রাজনৈতিক সংকট ছিল মূলত রাজতন্ত্রের পতনের আন্দোলন। তিনি লিখেছেন, “বাচ্চা তার ফরমানে আমান উল্লা যে কাফির সে কথা সপ্রমাণ করে বলেছে ‘এবং যেসব দেশী-বিদেশী মাস্টার প্রফেসর আমান উল্লাকে এসব কর্মে সাহায্য করতো, তাদের ডিসমিস করা হল; স্কুল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হল’। বাচ্চাও হুকুম দিল আমান উল্লার মন্ত্রীদের ধরে নিয়ে এসো, আর তাদের বাড়ি লুঠ করো। সে লুঠ কিস্তিতে কিস্তিতে হল। বাচ্চার খাস পেয়াদারা প্রথম খবর পেয়েছিল বলে তারা প্রথম কিস্তিতে টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি, দামী টুকিটাকি ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। দ্বিতীয় কিস্তিতে সাধারণ ডাকাতরা আসবাবপত্র, কার্পেট, বাসন-কোসন, জামা-কাপড় বেছে বেছে নিয়ে গেল, তৃতীয় কিস্তিতে আর সব ঝড়ের মুখে উড়ে গেল— শেষটায় রাস্তার লোক কাঠের দরজা জানলা পর্যন্ত ভেঙে নিয়ে গিয়ে শীত ভাঙালো। মন্ত্রীদের খালি পায়ে বরফের ওপর দাঁড় করিয়ে হরেক রকম সম্ভব অসম্ভব অত্যাচার করা হল গুপ্তধন বের করবার আশায়। … তারপর আমান উল্লার ইয়ারবক্সি, ফৌজের অফিসারদের পালা। বন্ধ দোর-জানালা ভেদ করে গভীর রাত্রে চিৎকার আসে— ডাকু পড়েছে। সে আবার সরকারি ডাকু— তার সঙ্গে লড়াই করার উপায় নেই, তার হাত থেকে পালাবার পথ নেই।… কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেল— রাস্তার উপর শীতে জমে যাওয়া রক্ত, উলঙ্গ মড়া, রাত্রে ভীত নরনারীর আর্ত চিৎকার সবই সহ্য হয়ে গেল।”

১৯৪০ সালে রামনাথ বিশ্বাস গিয়েছিলেন আফগানিস্তানে। বাহন সাইকেল। তাঁর অভিজ্ঞতা ‘আফগানিস্থান ভ্রমণ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাস। আফগানিস্তানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দাউদ খানের সরকারের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ঘটল। এতে নিহত হলেন দাউদ খান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এই অভ্যুত্থানে ব্যাপক জনসমর্থন থাকায় এটাকে বলা হয়েছিল জনগণের অভ্যুত্থান। আফগানিস্তানের মানুষ ভেবেছিলেন এতে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, তারা একটা নিরাপদ জীবন পাবেন। কিন্তু তারা জানতেন না নতুন কমিউনিস্ট সরকার তাদের ন’বছর ধরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ উপহার দেবে, যে যুদ্ধে তারা হারাবেন জীবন, সম্পদ, আপনজন-সহ সব কিছু। ১৯৭৯ সালে রাশিয়ান আর্মি আফগানিস্তান আক্রমণের পর তাদের সীমাহীন বর্বরতায় আফগানিস্তান হয়ে উঠল মৃত্যপুরী। আফগানিস্তানের মানুষ নিজেদের ভূমিতে অত্যাচারিত হচ্ছিলেন, খুন হচ্ছিলেন, জেলে যাচ্ছিলেন।
১৯৯৯ সালের একদিন। টিভিতে খবর এল তালিবান আফগানিস্তানের জনপ্রিয় খেলা ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ করেছে। সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা আফগান লেখক খালেদ হোসাইনি মর্মাহত হলেন এই খবর শুনে। কাবুলের অভিজাত ওয়াজির আকবর খান এলাকায় কেটেছিল তাঁর শৈশবের প্রথম দিনগুলো। ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মুগ্ধতা আছে। কাবুলে বন্ধুবান্ধব ও স্বজনদের সঙ্গে তিনি ঘুড়ি ওড়াতেন। এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি তখনই একটি ছোটগল্প লিখে ফেললেন। ২০০১ সালের মার্চ মাসে পাণ্ডুলিপিটি খুঁজে পাওয়ার পর তিনি গল্পটি বড় করতে শুরু করেন এবং আমরা পাই তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘দ্য কাইট রানার’। ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হলে তাঁরা আমেরিকায় চলে আসেন এবং অভিবাসী জীবন শুরু করেন। আমেরিকায় বসবাস শুরু করলেও বুকের মধ্যে আফগানিস্তানের মানচিত্র তিনি বয়ে বেড়ান আজও। ‘দ্য কাইট রানার’ উপন্যাসে আমরা আমেরিকায় অভিবাসী আফগান-জীবনের যে ছবি দেখতে পাই তা হোসাইনির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছিল। তবে হোসাইনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমরা ছিলাম খুবই ভাগ্যবান আফগান, কারণ আমরা আমেরিকায় এসে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পেয়েছিলাম, যেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন আফগান পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে পচে মরছে।” তিনি আবিষ্কার করেন, চরিত্রগুলোর নিজেদের জীবনের গল্প এবং আফগানিস্তানের গল্প একে অপরের সঙ্গে ডিএনএ সূত্রকের মতোই সমান্তরালভাবে চলে যায়।
কমিউনিস্ট আমলের সব গুম-হত্যা-অন্যায়ের পরেও কাবুলে নারীরা স্বাধীন ছিলেন। আফগান গ্রামাঞ্চলের নারীরা হয়তো তালিবান শাসনের পূর্ববর্তী কিংবা পরবর্তী কোনও সময়েই নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাননি। কিন্তু কাবুলে তবু নারীরা মাথা উঁচু করে রাষ্ট্র ও সমাজে বেঁচে ছিলেন। সেই মুক্ত সময় ভেঙে টুকরো হয়ে যায় ১৯৯৬ সালে তালিবানদের ক্ষমতা দখলের পরে। খালেদ হোসাইনির ‘আ থাউজেন্ড স্প্লেনডিড সানস’ ১৯৯৬ সালের তালিবান শাসন পরবর্তী আফগানিস্তানে নারীর পৃথিবী ভেঙে পড়ার গল্প। ক্ষমতার পালাবদলে শেষপর্যন্ত সমাজের দুই স্তরের দুই নারী লায়লা আর মারিয়মের জীবন এক হয়ে যায়। তারা যাপন করে দাসের বন্দিজীবন।
তালিবান রাষ্ট্রে নারীরা দমবন্ধ অবস্থায় বেঁচে থাকেন। স্বামী-পিতা-পুত্র যদি চার দেওয়ালের মধ্যে নারীকে খুন করে, রাষ্ট্র খুনির পিঠ চাপড়ে দেয়। কালো বোরকায় তাদের মুখ ঢেকে রাখতে হয়। বন্ধ হয়ে যায় কন্যাশিশুদের স্কুল। সন্তান জন্মের সময় নারীরা পান না চিকিৎসার অধিকার। ফতোয়ার পাথর কিংবা শিরশ্ছেদ একমাত্র নিয়তি। সেই অবরুদ্ধ সময় মরিয়ম আর লায়লাকে রূপান্তর করে মাতা ও কন্যায়। তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। মরিয়ম শেষ পর্যন্ত ভালবাসার সন্ধান পায়। লায়লার স্বাধীনতার জন্য মরিয়ম তালিবানদের কাছে নতি স্বীকার করে।
খালেদ হোসাইনি ‘আ থাউজেন্ড স্প্লেন্ডিড সানস’ বইটি উৎসর্গ করেছেন আফগানিস্তানের নিপীড়িত নারীদের প্রতি। অসাধারণ বুনন, সমকালীন আফগানিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট, সব মিলিয়ে অসাধারণ একটি বই। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা আফগান মহিলাদের জীবন নিয়ে রচিত মর্মস্পর্শী এই লেখা পড়লে উপন্যাসের বোরকা পরা, চেহারাহীন, নামহীন মহিলাদেরও যে আলাদা জীবন আছে, স্বপ্ন আছে, গল্প আছে, পাঠক সেটাই অনুভব করবেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর কথায় : “আফগানিস্তানের উত্তর ভাগ অর্থাৎ বল্‌খ্‌-বদখশানের ইতিহাস তার সীমান্ত নদী আমুদরিয়ার (গ্রীক অক্ষুস, সংস্কৃত বন্ধু) ওপারের তুর্কিস্তানের সঙ্গে, পশ্চিমভাগ অর্থাৎ হিরাত অঞ্চল ইরানের সঙ্গে, পূর্বভাগ অর্থাৎ কাবুল জলালাবাদ খাস ভারতবর্ষ ও কাশ্মীরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে নানা যুগে নানা রঙ ধরেছে।”
মৌলবাদ ও যুদ্ধের ক্রমাগত দংশনে এখানকার সমাজব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলেও এখানকার সাহিত্য পেয়েছে এক অন্যরকম নতুনত্ব। তেরোশো শতকে সুফি সাধক ও কবি জালাল আল দীন রুমি মহাকাব্য ‘মসনবি-ইয়ে মানাবি’ রচনা করেন, যা ইসলামি সাহিত্য ও চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। সতেরো শতকের বিখ্যাত যোদ্ধা ও কবি খুশহাল কাট্টাক কবিতার মাধ্যমে উপজাতীয় আচার-আচরণের নিয়ম জুড়ে দিতেন। তবে পশতু ভাষায় সাম্যবাদী ভাবধারা সংযুক্ত হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে। সেদাল সোখানদিন-এর আবির্ভাব ঘটে এই সময়েই। বুর্জোয়া রাজনীতির প্রভাববলয় ভেঙে তিনি নতুন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর বিপ্লবী কবিত্বের মহিমায় গেয়ে ওঠেন : “বন্দুক ও বেওনেট দিয়ে উপনিবেশবাদের বুক চিরে দাও, সাবাস শ্রমিক সমাজ, সাবাস; তোমাদের বিশ্বস্ততা ও সংকল্পবোধ বিশ্বকে দেখিয়ে দাও।”
নব্বই দশকের তালিবান শাসন কেড়ে নিয়েছিল নারীদের ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতা, শিক্ষার স্বাধীনতা, সাজসজ্জার স্বাধীনতা এমনকি প্রকাশ্যে সহজভাবে হাসা বা মুখ দেখানোর স্বাধীনতাটুকুও। সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কাবুলিওয়ালার বউ’ বইয়ের পাতায় পাতায় আমরা এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাই। বিশিষ্ট লেখক অমিতাভ রায় আফগানিস্তান সরকারের উপদেষ্টা পদে কাবুলে কর্মরত ছিলেন একসময়। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানাচ্ছেন কাবুল থেকে ফিরে আসার মুহূর্ত। সাধারণ কাবুলবাসীদের একটাই প্রার্থনা, ‘‘স্যার, আল্লার কাছে আমাদের জন্য একটাই দোয়া করবেন, তালিবানদের যুগ যেন ফিরে না আসে’’। কিন্তু সেই যুগ আবার ফিরে এল। এখন তালিবান আতঙ্কে দিশেহারা আফগানিস্তান। বাতাসে বারুদের গন্ধ। এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্যই দলে দলে মানুষ দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য ভিড় করছেন কাবুলের বিমানবন্দরে। জমি যায় যাক, প্রাণটুকু তো বাঁচুক। আফগানের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্দেশক সারা করিমি বলেছেন, তালিবানি অত্যাচার ও আগ্রাসনে কীভাবে ধ্বংস হতে চলেছে তাঁর দেশ, তাঁর দেশের নারীদের সম্মান ও স্বাধীনতা, স্তব্ধ হতে চলেছে সভ্যতা ও নানান সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ।
সন্ত্রাস কোনওদিনই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবুও আশঙ্কা হয় তালিবান ফের আফগানিস্তানকে আরও গাঢ়, নিকষ কালো অন্ধকারের সরু গলিতে নিয়ে যাবে না তো? যদি তা না হয় তাহলে হয়তো লেখা হবে এক অন্য কাবুলকথা।

তথ্যঋণ :
১। শঙ্খ ঘোষ, বাবরের প্রার্থনা, ৩১তম সংস্করণ, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৭।
২। প্রেমময় দাশগুপ্ত, বাবর নামা, ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮২।
৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাবুলিওয়ালা, গল্পগুচ্ছ, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, শ্রাবণ, ১৪১৫
৪। সৈয়দ মুজতবা আলী, দেশে বিদেশে, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৩৫৬।
৫। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কাবুলিওয়ালা সহযাত্রী, পথ-চলতি, প্রকাশক স্বপনকুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৬০।
৬। রামনাথ বিশ্বাস, আফগানিস্থান, কোরক, কলকাতা, জানুয়ারি, ২০২০।
৭। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানুষের ধর্ম, রবীন্দ্র রচনাবলী, বিংশ খণ্ড, বিশ্বভারতী।
৮। Khaled Hosseini, The Kite Runner, Riverhead Books, United States, 2003।
৯। Khaled Hosseini, A Thousand Splendid Suns, Riverhead Books, United States, 2007।

মতামত জানান

Your email address will not be published.