বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি ও হেলম্যান

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় নাৎসি আগ্রাসনের শিকার হয়ে প্রতিভাবান জার্মান বিজ্ঞানীদের পরিবার-পরিজন-সহ শিকড় ওপড়ানোর যন্ত্রণার। আবার স্তালিনের চরম বামপন্থার সঙ্কীর্ণ রাজনীতির দ্বন্দ্বে দীর্ণ সমান্তরাল ইতিহাসও অনেক নির্মমতার সাক্ষী হয়ে থাকে।

দেবাশিস দে

পঁচিশ বছরের যুবক গেনাদিজ মিনচিন আজ জানতে পেরেছে, তার মা বন্দি আছে কাজাখস্তানে। মস্কো থেকে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে কাজাখস্তানের রুক্ষ ক্যাম্পের দিকে ছুটল গাড়ি। চোদ্দো বছর ধরে শিকড়ের খোঁজে ক্লান্ত, অবসন্ন দেহ তার, মন ভারাক্রান্ত। হালকা হাওয়ায় জড়িয়ে এল চোখ। আর চোখের সামনে সেইসব অভিশপ্ত দিনরাত অ্যালবামের পাতা হয়ে ভেসে উঠল।


১৯৩৮ সালের ৯ মার্চ। গভীর নিস্তব্ধ রাত্রি। কতই বা বয়স তখন মিনচিনের। আট বছরের শিশু বাবা-মায়ের নিশ্চিন্ত পরশে বিছানায় ঘুমিয়ে। হঠাৎ ঘরের আলোয় ঘুম ভেঙে গেল। চোখ গেল ভয়ার্ত মুখে বসে থাকা বাবা-মায়ের দিকে। আ্যপার্টমেন্টের সিঁড়িতে ভারী বুটের আওয়াজ জোরালো হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কালো কোট পরা কয়েকজন জোর ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ফেলল ফ্ল্যাটের দরজা। তন্ন তন্ন করে কীসব যেন কাগজপত্র খুঁজতে লাগল বাবার আপত্তিকে অগ্রাহ্য করেই। তার পর বাবাকে নিয়ে চলে গেল স্তালিনের সোভিয়েত গুপ্তচর পুলিস।
ধাক্কা কাটিয়ে মা ভিক্টোরিয়া বার্নস্টেন কয়েক দিন পর ছুটে গিয়েছিলেন বাবা অ্যাডলফ হেলম্যানের চাকরির জায়গা মস্কোর কারপভ ইনস্টিটিউটে, যেখানে বাবা গবেষণা করতেন। চেয়েছিলেন বাবার মাইনের বাকি টাকা। বদলে দেখলেন একটি নোটিশ ঝোলানো। বাবার কাজকর্মকে অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে আর সেখানে সই রয়েছে বাবারই সহকর্মীর।
ধাক্কা শেষ হতে না হতেই কারপভ ইনস্টিটিউট থেকে পাওয়া আ্যপার্টমেন্ট ছেড়ে দিতে হল। ছেলেকে নিয়ে ভিক্টোরিয়া মস্কোর আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, যদি কোনও কাজ আর আশ্রয় জোটে। ১৯৪১ সাল। ইউক্রেন বংশোদ্ভূত ভিক্টোরিয়াকে গুপ্ত জার্মান সেনাদের জার্মান অনুবাদে সাহায্য করার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হল। জন্মসূত্রে ভিক্টোরিয়ার ইহুদি যোগ থাকায় যে জার্মান সেনা একদিন তাঁকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ছুড়ে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল, তাদের সাহায্যের অভিযোগে ভিক্টোরিয়ার জেল হল। আসলে গভীরে আছে অন্য ইতিহাস। যে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় নাৎসি আগ্রাসনের শিকার হয়ে প্রতিভাবান জার্মান বিজ্ঞানীদের পরিবার-পরিজন-সহ শিকড় ওপড়ানোর যন্ত্রণার। আবার স্তালিনের চরম বামপন্থার সঙ্কীর্ণ রাজনীতির দ্বন্দ্বে দীর্ণ সমান্তরাল ইতিহাসও অনেক নির্মমতার সাক্ষী হয়ে থাকে।


হান্স গুস্তাভ অ্যাডলফ হেলম্যান। জন্ম উত্তর-পশ্চিম জার্মানির উইলহেল্মশ্যাভেনের ছোট্ট একটি বন্দর শহরে, ১৪ অক্টোবর, ১৯০৩। খুব অল্প বয়সে বাবা পথদুর্ঘটনায় মারা গেলে বাবার সামান্য পেনশনই ভরসা হয়ে উঠল পরিবারের তিন প্রাণী হান্স হেলম্যান, তার বোন ও মায়ের। কারখানার শ্রমিকদের জন্য খাবার সরবরাহ করে মা বাড়তি রোজগারের চেষ্টা করেন। হান্স নিলেন টুরিস্টদের লোকাল গাইডের কাজ। সব মিলে দুই ভাইবোনের পড়াশোনা চালানোর মতো বন্দোবস্ত হল। হান্সের স্কুলের পাঠ শেষ হল।
রোজগারের জন্য দরকার ছিল কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ। তাই তার প্রাথমিক পাঠ নিয়েই হান্স ভর্তি হলেন ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ইন স্টুটগার্ট ফর ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (১৯২২)। এখানেই তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী হলেন। পড়াশোনা চালানোর জন্য কখনও কাজ করছেন ওয়ার্কশপে, কখনও ফিজিক্স ল্যাবে। কোনও সেমিস্টারে ছুটি নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছেন ফিজিক্সের ডিপ্লোমা পরীক্ষার জন্য।

ছাত্র হেলম্যান।


১৯২৫ সাল। কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ডের সহকারী, অধ্যাপক ওয়ালদার কোসেল কয়েক বছর আগেই কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার পাঠদানে যুক্ত হয়েছেন। এক সামার সেমিস্টারে হেলম্যান মুগ্ধ হয়ে শুনলেন অধ্যাপক কোসেলের লেকচার— ‘যোজ্যতার ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব’। এই সেমিস্টারেই পরিচিত হলেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির সঙ্গে। ‘তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য’ পদার্থদের নিয়ে পিটার ডেবাই, হাকেল, অন্সাগের, ফাকেনহাগেনদের কাজ সাড়া ফেলেছে গোটা ইউরোপে। আগ্রহ বাড়ল পদার্থের রাসায়নিক বন্ধন নিয়ে। ডেবাই, হাকেল, অন্সাগের, ফাকেনহাগেনদের কাজের জটিল পরীক্ষা হেলম্যান করলেন কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে, আয়নীয় দ্রবণের ডাই-ইলেকট্রিক ধ্রুবক নির্ণয়ের মাধ্যমে। তড়িৎ রাসায়নিক পরিমাপের এক অভিনব কৌশল সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেন তিনি।
এবার ফিরে এলেন স্টুটগার্টে। অধ্যাপক ওয়াল্ড, অধ্যাপক রেগেনার তখন ছাত্রদের বোঝাচ্ছেন প্রকৃতির আচরণে পদার্থের পরমাণু ও তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্তরের ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গুরুত্ব। পরমাণু ও কেলাসের ওপর কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে কীভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে সেই ভাবনায় হান্স ঈষৎ উত্তেজিতও বা। যা কণা তা-ই আবার কখনও তরঙ্গ। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এসব প্রহেলিকাময় জগতের আভাস পেয়ে হেলম্যানের ভবিষ্যৎ গন্তব্যের অভিমুখ ততদিনে নিশ্চিত। বার্লিনের ‘রেডিও অ্যাকটিভ ল্যাবরেটরি’-তে অটো হান আর লিজে মিতেনারের কাছে হল তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে হাতেখড়ি। ডিস্টিংশন নিয়ে স্নাতক হলেন পদার্থবিদ্যায়।


এরিখ রেগেনার এক জার্মান পদার্থবিদ, পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের বহু শাখায় যাঁর অসীম আগ্রহ। অধ্যাপক ওয়াল্ডের সঙ্গেই তিনি যোগদান করেন স্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯২০)। তৈরি করেন কসমিক রশ্মি পরিমাপের যন্ত্র। হেলম্যান স্নাতক হওয়ার পরেই রেগেনারের কাজে প্রভাবিত হয়ে তাঁর সহকারী নিযুক্ত হন। পাশাপাশি চলে রেগেনারের অধীনে গবেষণা। ওজোন গ্যাস থেকে আয়নের সৃষ্টি এবং স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে আয়নাইজেশন নিয়ে থিসিস জমা দিয়ে হেলম্যান ডক্টরেট পেলেন ১৯২৯ সালে। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ছাপিয়ে রেগেনারের সঙ্গে হেলম্যানের গড়ে ওঠে নিবিড় বন্ধুত্ব।
রেগেনারের স্ত্রী ভিক্টোরিয়া ইউক্রেনীয় ইহুদি। তাঁর দূরসম্পর্কের এক ভাইঝি (মতান্তরে বোনঝি) ভিক্টোরিয়া বার্নস্টেন। অল্প বয়সে বাবা-মা হারিয়ে নিরাশ্রয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে কোনওরকমে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়তে সমর্থ হন। আশ্রয় পেলেন জার্মানির স্টুটগার্টে, পিসি ভিক্টোরিয়ার কাছে।
সেদিন ছিল এক বসন্তের রঙিন সন্ধ্যা। এরিখ রেগেনার নিমন্ত্রণ করেছেন তাঁর প্রিয় ছাত্র-বন্ধু হেলম্যানকে। হেলম্যান এলেন। হালকা আলাপচারিতা গড়াল জমাটি আড্ডায়। ধীরে ধীরে হেলম্যানকে ঘিরে বার্নস্টেনের মুগ্ধতা। পরিণতিতে বিবাহ, হেলম্যানের ডক্টরেট হওয়ার বছরেই। পরের বছরেই তাঁদের জীবনে এল পুত্রসন্তান হান্স হেলম্যান জুনিয়র।

হান্স হেলম্যান জুনিয়র মা বার্নস্টেনের সঙ্গে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হারের পর জার্মানিতে জনমানসে এক হতাশাজনক পরিস্থিতি। একদিকে ভার্সাইয়ের চুক্তি জার্মান জাত্যভিমানকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অন্যদিকে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধজনিত আর্থিক দেনা দেশটাকে দেউলিয়া অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শুরু হল রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। মানুষ বিকল্প চায়। কিন্তু কে দেবে সেই বিকল্প?
ছোট্ট একটা জাতীয়তাবাদী সংগঠন, সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি, জার্মানিতে বিশ্বযুদ্ধের পর সবে তার কাজকর্ম জনসমক্ষে আনতে শুরু করেছে। এক নবীন পার্টি কর্মী তাঁর বাকচাতুর্যে উগ্র জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করছেন সর্বত্র। নাম অ্যাডলফ হিটলার। ১৯২৩-এর শেষ দিকে মিউনিখে সরকার বিরোধী একটা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিলেন। ব্যর্থ হলেন। জেল হল। জেল থেকে তাড়াতাড়ি ছাড়া পেলে (১৯২৪) ঝাঁপিয়ে পড়লেন সরকার বিরোধী জনমতকে বিক্ষোভমুখী করতে। ১৯৩২-এর নির্বাচনে কোনও পার্টিই গরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারল না, যদিও নাৎসি দল সবচেয়ে বেশি আসন অর্জন করল। এই পরিস্থিতিতে পূর্বতন চ্যান্সেলর ও রক্ষণশীল দলের নেতারা হিটলারকে নেতা বলে মেনে নেওয়ায় হিটলার জার্মানির নতুন চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। শুরু হল প্রজাতান্ত্রিক সরকার থেকে একনায়কতান্ত্রিক, স্বেচ্ছাচারী শাসনের এক কালো অধ্যায়।
কয়েক বছরের মধ্যেই শতাধিক জার্মান বিজ্ঞানী, গবেষক ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবী দেশ ছাড়লেন বা ছাড়তে বাধ্য হলেন। তাঁদের বেশিরভাগ আশ্রয় নিলেন ব্রিটেন ও আমেরিকায়। বাকিরা আরও কিছু দেশে ছড়িয়ে পড়লেন। আইনস্টাইন, হান্স ক্রেবস, আরউইন শ্রোডিঙ্গার, হান্স বেথে, লিজে মিতেনার, এডওয়ার্ড টেলার-সহ একঝাঁক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী হারাল জার্মানি।


হান্স গুস্তাভ অ্যাডলফ হেলম্যানের জীবনে ১৯২৯ এক ব্যস্ততম বছর। ডাক পেলেন হ্যানভারের ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার পণ্ডিত আরউইন ফ্যুস স্টুটগার্ট থেকে অধ্যাপনা ও গবেষণা করতে এসেছেন সেখানে। হান্স হেলম্যানকে নিয়োগ করলেন সহকারী পদে। লক্ষ্য, তাত্ত্বিক রসায়নের সমস্যার সমাধানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জ্ঞান কাজে লাগানো। কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি সবে তার ডানা মেলতে শুরু করেছে হেইটলার ও লন্ডনের (১৯২৭) হাত ধরে। বিজ্ঞানের এই আধুনিকতম শাখাটি তখনও ম্যাথেমেটিক্যাল কেমিস্ট্রি বা সাব-অ্যাটমিক থিয়োরিটিক্যাল কেমিস্ট্রি নামে পরিচিত। কেউ বা বলেন কেমিক্যাল ফিজিক্স। ১৯২৯-এ ভিয়েনিস কেমিক্যাল-ফিজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভায় আর্থার হা প্রথম এই বিভাগটিকে কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি নামে অভিহিত করলেন।
কয়েক বছর আগে শোনা কোসেলের লেকচারের মুগ্ধতা এখনও হেলম্যানের চেতনার কোথায় যেন গুনগুন করছে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে কাজে লাগিয়ে রাসায়নিক বন্ধনের প্রকৃতি উন্মোচনে নেমে পড়লেন কোমর বেঁধে। প্রথম কয়েক বছর শুধু সহ-গবেষকদের কাজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন আর বিশ্লেষণ করলেন। ১৯৩৩-এর গ্রীষ্ম আর বসন্তে সমযোজী বন্ধনের গঠন নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন ‘জেইটশ্রিফট ফ্যুর ফিজিক’ জার্নালে। সমযোজী বন্ধনে প্রয়োজনীয় আণবিক গতিশক্তি ও স্থিতিশক্তির পরিমাপ করলেন ‘মলিকিউলার ভিরিয়াল উপপাদ্য’-এ যা ‘হেলম্যান-স্লেটার উপপাদ্য’ নামেও পরিচিত। কয়েক মাস পরেই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি তিনি করেছিলেন অণুস্থিত মলিকিউলার ফোর্স নির্ণয় নিয়ে, যা পরে হেলম্যান-ফেইনম্যান থিয়োরেম নামে পরিচিত হয়েছিল।


বিজ্ঞানচর্চায় হ্যানোভারের ভেটিরিনারি কলেজ জার্মানির অন্যতম উৎকর্ষ কেন্দ্র। বিখ্যাত ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকেও অধ্যাপকরা সেখানে পড়াতে আসেন। পদার্থবিদ্যার একজন অধ্যাপকের পদ সেখানে ফাঁকা হলে হেলম্যান আবেদন করলেন। অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হলেন ওই কলেজে ১৯৩১ সালে।
ঠিক যখন বিজ্ঞানচর্চার একটি উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম পেয়ে গবেষণায় চূড়ান্ত মনোনিবেশ করছেন হান্স তখনই হ্যানোভারের কলেজে ঘনিয়ে উঠল রাজনীতির কালো মেঘ। কিছু তরুণ ছাত্র জার্মানির জাতীয়তাবাদী সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির আগ্রাসনের চরম সমর্থক হয়ে উঠলেন। বিশেষত বামপন্থী ও ইহুদি বংশোদ্ভূতদের প্রতি। পুড়ল বই, লাইব্রেরি। বামপন্থী মনোভাবের কারণে হেলম্যানকে কটূক্তির শিকার হতে হল। ভয় পেয়ে বাড়ির লাইব্রেরিতে থাকা সমাজবাদী ও বামপন্থী লেখকদের লেখা সমাজ ও অর্থনীতির সমস্ত বই পুড়িয়ে দিলেন তিনি।
তবে কোনও প্রচেষ্টাই হেলম্যানের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে পারল না। ১৯৩৩ সালের ৭ এপ্রিল এল সেই কালা আইন। যার ইংরেজি করলে দাঁড়ায়, ‘ল ফর রেস্টোরেশন অফ দি প্রফেশনাল সিভিল সার্ভিস’। হেলম্যানের স্ত্রীর ইহুদি রক্তের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। সে বছর বড়দিন শুরুর আগেই দুঃসংবাদ এল। হেলম্যান বরখাস্ত।

বোনের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় হেলম্যান।


কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির ভবিষ্যৎ জার্মানিতে ক্রমেই অন্ধকারে ডুবছে। হেলম্যানের সহকারী গবেষকদের অধিকাংশই দেশ ছাড়তে শুরু করেছিলেন। তাই তিনি যোগাযোগ রেখেছিলেন আমেরিকা আর পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে। অফার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকেও। নিজের সমাজতান্ত্রিক মনোভাব ও স্ত্রীর ইউক্রেনীয় যোগাযোগের সূত্রে বেছে নিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন। রাজধানী মস্কোর কারপভ ইনস্টিটিউটে তখন শাসকের প্রবল আর্থিক ও নৈতিক আনুকূল্য। সেটি গোটা দেশে ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির অগ্রণী প্রতিষ্ঠান। কয়েকটি থিয়োরি গ্রুপে ভাগ করে চলে গোটা ইনস্টিটিউটের কর্মকাণ্ড। এরকমই একটা থিয়োরি গ্রুপের প্রধান হয়ে ১৯৩৪ সালে হেলম্যান সেখানে যোগ দিলেন। দেড়শোরও বেশি বিজ্ঞানী ও আড়াইশো কর্মী সেখানে কর্মরত।
কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে ইনস্টিটিউটের অন্দরে তখনও কিছু প্রশ্ন ছিল। সত্যিই কি এর কোনও বাস্তব প্রয়োগ আছে? না কি তা নিছক কিছু গাণিতিক ফর্মুলা? সোভিয়েত বিজ্ঞানী সিরকিনের নেতৃত্বে হেলম্যান কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির পথকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। সমস্যা হল সেইসব বিজ্ঞানীর যাঁদের পদার্থবিদ্যা বা ম্যাথেমেটিক্যাল ফিজিক্সের দুরূহ তত্ত্বের ধারণা কম। হেলম্যানের কাজকর্ম তাঁরা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। ইনস্টিটিউটে হেলম্যানের সমালোচকদের মধ্যে ঝুখোভিৎস্কিজ ও তেমকিন বেশ প্রভাবশালী। তবে সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে হেলম্যানের হাত ধরে কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি দ্রুত শাখা বিস্তার করছিল। পর্যায় সারণীর একই গ্রুপের দুটি মৌল— যেমন লিথিয়াম ও পটাসিয়ামের পরমাণুর গঠনে কোয়ান্টাম স্তরের জটিল ব্যাখ্যায় সাফল্য পেলেন হেলম্যান। ইনস্টিটিউটের বিশেষ পুরষ্কার পেলেন ১৯৩৬ সালে। প্রায় প্রতি দু’মাস অন্তর তাঁর একটি করে গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়, যার অধিকাংশই কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির মৌলিক কাজ। বিভিন্ন কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হয়ে মত বিনিময় করার সুযোগ পেলেন বোর, ডিরাক, পেরিন-সহ পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির টেক্সট বুক লেখার কাজ শুরু করেছিলেন জার্মানিতে বসেই। শেষ করতে পারেননি। কারপভ ইনস্টিটিউটের ছাত্র ও সহকর্মীদের সাহায্যে তাঁর প্রথম টেক্সট বুক রাশিয়ান ভাষায় প্রকাশ পেল। ১৯৩৭-এর জানুয়ারি মাসে পেলেন ইনস্টিটিউটে প্রফেসরের সমতুল পূর্ণ সদস্য পদ আর একই বছরের শেষ দিকে ‘লিডিং সায়েন্টিস্ট’ সম্মান।
আগেই নিয়েছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার নাগরিকত্ব (১৯৩৫)। খুব সফল বিজ্ঞানী হয়েও ইনস্টটিউটের অভ্যন্তরীণ পারস্পরিক বৈরিতা কোথাও যেন তাঁকে সবসময় অস্বস্তিতে রাখত। ইনস্টিটিউটে (কমিউনিস্ট) পার্টির সেক্রেটারি ছিলেন তেমকিন। জার্মান বংশোদ্ভূত হেলম্যানের কাজকর্ম নজরে রাখার গোপন নির্দেশ হোক অথবা পেশাগত ঈর্ষা, তেমকিন হেলম্যানের কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির ফলাফলে সদা সন্দিহান। হেলম্যানের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থেকেও ঝুখোভিৎস্কিজ তেমকিনের সমর্থক। ঠিক এই সময় সোভিয়েত বিরোধী সমস্ত শক্তিকে দেশ থেকে উৎখাত করার অভিযানে নামল স্তালিনের পুলিস ও গুপ্তঘাতকের দল। পলিটব্যুরোর প্লেনামে একই সিদ্ধান্ত হল। সমস্ত মিডিয়া, গণমাধ্যমে সরকারি বজ্রআঁটুনি। দেশজুড়ে শুরু হল প্রোপাগান্ডা আর শত্রু সন্দেহে ধরপাকড়। লক্ষ্য হলেন জার্মান, পোলিশ, কোরিয়ান বা ইহুদি নাগরিকরা। হেলম্যান এই নতুন পরিবেশে আবার নিজেকে বিপন্ন বোধ করতে শুরু করলেন। রাশিয়ার ত্রুবনাজা স্কোয়ারের জার্মান স্কুল, যেখানে ছেলে হান্স জুনিয়র পড়াশোনা করে, সেটা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হল জার্মানি থেকে আসা জার্মান ভাষার বই।
এবার সেই অভিশপ্ত রাত। হঠাৎই কালো কোট পরা কয়েকজন হেলম্যানকে তুলে নিয়ে গেল। আটক করে রাখল টাগাঙ্কা জেলে। না, আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি হেলম্যানের। ভিক্টোরিয়া বার্নস্টেন কয়েক দিন পর কারপভ ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখলেন, হেলম্যানের ডিপার্টমেন্টের বাইরে একটা নোটিশ ঝোলানো। স্বামীর কাজকর্মকে দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক ঘোষণা করা হয়েছে। আর সেখানে সই রয়েছে হেলম্যানেরই প্রিয় সহকর্মী ঝুখোভিৎস্কিজের।


মা গ্রেপ্তার হওয়ার পর হান্স জুনিয়রকে একটা হোমে পাঠানো হয়েছিল। পালিয়ে এসে এক আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে থাকল সে। নাম হল গেনাদিজ মিনচিন, যা ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হয়েছিল। কাজাখস্তানের ক্যাম্পে মায়ের খোঁজ পেলেও মিনচিন আর তাঁর মা সম্পূর্ণ পুনর্বাসন পেয়েছিলেন ১৫ অক্টোবর, ১৯৫৭। আরও দু’বছর পর রেডক্রসের সাহায্যে হামবুর্গে থাকা পিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন (১৯৯১) হলে রাশিয়া ছেড়ে স্ত্রী-পুত্র-সহ জার্মানি ফিরে এসে জার্মান নাগরিকত্ব নিলেন হান্স হেলম্যান জুনিয়র।
বিজ্ঞানী হেলম্যানের মৃত্যু রহস্যই থেকে যেত, যদি না পশ্চিমের কিছু বিজ্ঞানী উদ্যোগ নিতেন। একজন ইতিহাসের অধ্যাপক যোগাযোগ করেছিলেন মস্কোর সাংবাদিক, ঐতিহাসিক সাবিনে আর্নল্ডের সঙ্গে। আর্নল্ডের সাহায্যে পিপল কমিশনারেট ফর ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্সে আবেদন করেন হান্স জুনিয়র, বাবার মৃত্যুর নথি চেয়ে। ফাইল প্রকাশ্যে (১৯৯২) এলে দেখা যায়, গ্রেপ্তারির পর জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের কোনও তথ্য নেই। গ্রেপ্তার হওয়ার চার দিন পর একটা হাতে লেখা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়, যা হেলম্যানের হাতের লেখা নয়। স্বীকারোক্তিতে লেখা— তিনি নাৎসি জার্মানির সিক্রেট সার্ভিস দ্বারা নিযুক্ত এবং একজন পোলিশ সহ-বিজ্ঞানীর মাধ্যমে কারপভ ইনস্টটিউটের কাজকর্মের গোপন নথি পাচার করেছেন। ইনস্টিটিউটে বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদনের প্রযুক্তি গোপনে সরিয়েছেন জার্মানিতে। স্বীকারোক্তি সমর্থন করার মতো কোনও প্রামাণ্য নথি নেই।
ইনস্টিটিউটে অবশ্য হেলম্যানের একটা পারসোনাল স্টাফ রেকর্ড রাখা ছিল। জানা যায়, রাশিয়ার এক পাবলিক প্রসিকিউটর হেলম্যানকে গুলি করার অর্ডার দিয়েছিলেন ১৭ মে। আর গুলির আদেশ কার্যকর হয় ২৯ মে, ১৯৩৮।
মৃত্যুর পর ছাড়েনি তাঁকে নাৎসি জার্মানিও। ১৯৪৪ সালের মে মাসে জার্মান ভাষার নিরাপত্তায় গঠিত এক কমিশনের রিপোর্টে হেলম্যানের নাম স্পেশাল USSR (সোভিয়েত রাশিয়া) ওয়ান্টেড তালিকায়। নিজভূমে ব্রাত্য, আবার পরবাসে সন্দেহ। বিশ্ব রাজনীতির পটভূমিকায় হেলম্যানের এহেন ট্র্যাজিক পরিণতি বিজ্ঞানীকে অমর করেছে না বিজ্ঞানকে? প্রশ্নটা পাঠকের জন্যই তোলা থাক।

ছবি সৌজন্য : ফিজিক্স টুডে, উইকিপিডিয়া।

তথ্য সহায়তা :
১। ‘হান্স জি এ হেলম্যান (১৯০৩-১৯৩৮)’, এম স্মিথ অ্যান্ড ডব্লিউ এইচ ই সোয়ার্জ, ট্রান্সলেশন ফ্রম বুনসেন ম্যাগাজিন, ১৯৯৯ (১), ১০-২১ ও (২), ৬০-৭০।
২। ‘হান্স জি এ হেলম্যান (১৯০৩-১৯৩৮)’, সোয়ার্জ এট আল।
৩। ফিজিক্স টুডে।

মতামত জানান

Your email address will not be published.