বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

খনগান : পরম্পরাগত ঐতিহ্যের সন্ধানে

মালদার যেমন গম্ভীরা, মুর্শিদাবাদের আলকাপ, কোচবিহারের কুশান গানের মতোই দিনাজপুরের খন। খন একধরনের লোকনাট্য। খন শুধুই গান নয়, নাচ, গান, সংলাপ, বাজনা, পারফরমেন্স সব মিলিয়ে একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত লোকনাট্য।

অনন্যা বড়ুয়া

দিনাজপুর ও খনগান যেন প্রায় সমার্থক শব্দবন্ধ। দুটিই একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। বিচ্ছিন্ন কোনও অংশ নয়। মালদার যেমন গম্ভীরা, মুর্শিদাবাদের আলকাপ, কোচবিহারের কুশান গানের মতোই দিনাজপুরের খন। খন একধরনের লোকনাট্য। খন শুধুই গান নয়, নাচ, গান, সংলাপ, বাজনা, পারফরমেন্স সব মিলিয়ে একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত লোকনাট্য।

খন কী

খনগানের ‘খন’ শব্দের উৎস নিয়ে নানা মতভেদ আছে। কেউ বলেন এখন থেকে খন এসেছে। কেউ বলেন খন হল হালে সমাজে যা ঘটছে তার বর্ণন। কেউ বলেন খনার বচন বা সত্য ঘটনা থেকে তৈরি হয় খন। তবে খিসা খন থেকেই যে খনের উৎপত্তি তা বোঝা যায়। সমাজ অনুমোদিত নয় এমন বিষয় সমাজে ঘটলে তা থেকে অবলীলায় তৈরি হতে পারে তাৎক্ষণিকভাবে খন। এমনকি খনের সংলাপও তৈরি হয় তৎক্ষণাৎ, কোনও পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট ছাড়াই।
অনেকে খিসা খন ছাড়াও আর এক প্রকার খনের কথা বলে থাকেন। শাস্ত্রীয় খন বা শাস্তরি। অর্থাৎ পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি নিয়ে তৈরি খন। কিন্তু এরকম খনের অস্তিত্ব এখন নেই। চাহিদাও নেই। ফলে খিসা খনের ধারণার মধ্যে পুরাণের ধর্মতত্ত্ব কেমন করে আছে তার সূত্র পাওয়া যায়নি।

খনের বৈশিষ্ট্য

এক) খনের সুর একটিই। একই সুরে খনের গান লেখা ও গাওয়া হয়।
দুই) খনের গানগুলি ছাড়া বাকি সংলাপ আগে থেকে লেখা হয় না। অভিনেতারা অভিনয় চলাকালীন পালার দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী সংলাপকে দীর্ঘ করে থাকেন। এই সংলাপগুলি পালাকার বা গায়কেরা গল্পের ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে তৈরি করেন। সংলাপগুলি পদ্যে নয়, যেমনভাবে আমরা কথা বলি তেমনভাবেই বলা হয়।
তিন) খনের ভাষা হল রাজবংশী ভাষা। বাংলার দিনাজপুরের দেশি পোলিয়াদের ভাষায় তৈরি হয় খন। মান্য বাংলা ও ইংরেজির অধিগ্রহণ থেকে খনের ভাষা মুক্ত নয়। খনের পালার নামকরণের মধ্যে থেকেই তা প্রমাণ করা যায়।
চার) খনের উৎসভূমি দেশভাগ-পূর্ব পশ্চিম দিনাজপুর। রায়গঞ্জ, কুশমন্ডি, ইটাহার, বুনিয়াদপুর ইত্যাদি ব্লকেই মূলত খনগানের চর্চা হয়।
পাঁচ) খন তৈরি হয় সমাজে কোনও ‘অনৈতিক’ ঘটনা ঘটলে, সেই ঘটনার আদলে। ঘটনাটি আলোড়ন তৈরি করলেই খন গান তৈরি হয়। যতক্ষণ না কোনও ঘটনা মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত এগোবে না ততক্ষণ পর্যন্ত খন তৈরি হবে না।
ছয়) খনগান আসলে খন পালাগান, খন পালাগানের শুরুতে থাকে বন্দনা। যেমন, ‘আশাসোরী হেমন্ত বাউদিয়া’ খনের বন্দনা অংশে আছে—
“পুরবে বন্দনা করি ঠাকুর ধর্ম নিরঞ্জন

উত্তরে বন্দনা করি আমরা কালিকার চরণ

পশ্চিমে বন্দনা করি সত্যপীরের চরণ
দক্ষিণে বন্দনা করি আমরা গঙ্গার সাগর

প্রণাম জানাই আমরা, নেহ তোমরা দশজন।”
অনেকে দুর্গা বা কালীমাতার বন্দনাও করেন। বন্দনা অংশের পরে থাকে মূল অংশ, মূল গল্প।
সাত) খনগানের শুরুতে বাজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। বাজনার সুর দিয়ে দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়। দর্শক উচ্চগ্রামের বাজনায় মুগ্ধ হয়ে এর পর কী হতে পারে এই উৎসাহে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
আট) খনের বাজনা বলতে একসময় ছিল হারমোনিয়াম, খোল, করতাল, তাল ইতাদি। এখন তার জায়গায় এসেছে নাল, সিন্থেসাইজার ইতাদি। যাঁরা বাজান তাঁদের বাজনদার, দোহার বলা হয়ে থাকে।
নয়) খনের গানগুলোয় প্রতিটি কথা দু’বার করে পুনরাবৃত্তি করা হয়।
দশ) খনগানে কোনও প্রম্পট করা হয় না।
নানান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দিয়েই খনগানকে চিহ্নিত করা যায় লোকসংস্কৃতির ধারার মধ্যে।

‘আশাসোরী পালা’র কলাকুশলীরা।

স্নাতকোত্তর লোকসংস্কৃতি বিশেষ পত্রের প্রায় ১৭জন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে ২০২০-তে তিন দিন ধরে দিনাজপুরের অন্তর্গত বুনিয়াদপুরের পার্শ্বস্থ অঞ্চলগুলিতে ক্ষেত্রসমীক্ষার ভিত্তিতে বর্তমানে খনগানের প্রকৃত অবস্থানটি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তারই ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা করা হয়েছে। সাহায্য করেছে গবেষক ছাত্র দেবরাজ দেবনাথ।

খনপালার পরিচয়

ক) আশাসোরী হেমন্ত বাউদিয়া : এক ভণ্ড সত্তর বছরের বৃদ্ধ গোঁসাই নামমন্ত্র দেওয়ার নামে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তেরো-চোদ্দো বছরের ভক্ত মেয়েটির সঙ্গে। মেয়েটি মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর লেখাপড়া ছেড়ে গোঁসাইয়ের জন্য পাগল হয়ে ওঠে। পরিবারের লোক কলঙ্ক থেকে বাঁচতে গোঁসাইয়ের সঙ্গে গোপনে বিয়ে দিতে প্রস্তুত হয় অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটির। পুলিশ এসে বিয়েটি আটকায়। গোঁসাইকে পাকড়াও করে, শাস্তিও পায় সে। ‘সোরী’ শব্দ এসেছে ঈশ্বরী থেকে, এর অর্থ নায়িকা।
খ) ফাঁকা ডাব : ফাঁকা আর ডাব দুই ভাই। পড়াশোনা থেকে পালাতে তারা কলকাতায় আসে। নিজেদের মূর্খামির দোষে সর্বস্ব খুইয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চেকারের সহৃদয়তায় নিজেদের গ্রামে ফেরে।
গ) বাল্যবিবাহ : বড়লোক শিবুর ছেলের জন্য বিয়ের সম্বন্ধ আসে। বিধবা গরীব মায়ের একমাত্র নাবালিকা মেয়ের কাছে। মেয়েটি চায় পড়াশোনা করতে। মা চায় মেয়ের বিয়ে দিতে ভাল বাড়িতে। এই চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্বে শেষমেশ বিয়েতে রাজিও হয় মেয়েটি। যদিও মা-মেয়ে শেষে বাল্যবিবাহকে মেনে নেননি।
ঘ) মায়াবন্ধকি : রঙ্গিয়া আর কিরণের দুঃখের সংসার। তারা প্রবল বৈষ্ণব। তিন দিন খাওয়া জুটছে না এরকম সময়ে তাদের গোঁসাই এসে দাবি করে তার সেবা করতে হবে। রঙ্গিয়া তার দাদার কাছে কিছু চাল ভিক্ষা চাইতে গেলে দাদা চালের বদলে কিরণকে বন্ধকি রাখে। রঙ্গিয়া কিছুতেই সফল হয় না বন্ধকি কাটাতে। ফলে কিরণ দাদার সম্পত্তি হয় আর রঙ্গিয়া বিবাগী হয়। এভাবেই এগোতে থাকে পালা।
ঙ) হেলমেট : হেলমেট ছাড়া বুনিয়াদপুর বাজারে মোটরবাইকে বাজার করতে চলে আসে এক লোক। পুলিশ তাকে ধরে। জরিমানা চায়। গরীব সে লোক জরিমানার টাকা দিতে না পেরে অপদস্থ হয়। আর তার ঘরে বউ তার জন্যে অপেক্ষায় দুশ্চিন্তার প্রহর কাটাতে থাকে।
চ) তেভাগা : স্বাধীনতার আগের কৃষক বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনের জ্বলন্ত দলিল এই খন।

‘আশাসোরী পালা’র দৃশ্য।

সমসাময়িক বিষয়ে নির্ভরতার কারণে খনগানের পালায় স্থান পেয়েছে করোনা ভাইরাসের প্রসঙ্গটিও।
পালাগুলি দেখার পর খনগান সম্পর্কে যে সিদ্ধান্তগুলি করা যায়—
অ) খনগান একপ্রকার লোকসাংবাদিকতা। কোনও গ্রামে ঘটে যাওয়া কোনও বিশেষ ঘটনা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়ায় খনগান হয়ে।
আ) শুধু সাংবাদিকতাই নয়, এই বিষয়গুলির মধ্যে দিয়ে একদিকে হয় লোকরঞ্জন, আর একদিকে হয় লোকশিক্ষা। ন্যায়-অন্যায়, শুভ–অশুভের বার্তা দেওয়াই মূলত খনগানের উদ্দেশ্য।
ই) ‘মাস্টার মার্ডার’ খনগানের মধ্যে যে গল্প আছে সেটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে। এই ঘটনাটি ঘটেছিল কুমারগঞ্জ থানার এক গ্রামে। এরকমই ‘হালুয়া হালুয়ানি’-র ঘটনাটিও বাংলাদেশের পশ্চিম দিনাজপুরের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ‘আশাসোরী’-র গল্পটি বংশীহারী আর ভাগুরাপড়া গ্রামের ঘটনা। ‘দশমী রাতে পুকুরে ভাসল মায়ের দেহ’ খনগানটি রায়গঞ্জের ঘটনা। মূলত অঞ্চলের আশেপাশের চমকপ্রদ ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়েই এই খনগান। বাস্তব ছবিও খনগানের বিষয় হয়ে উঠতে বাধা নেই। অটোর দৌরাত্ম্যে কীভাবে ভ্যানরিকশার চালকরা নাস্তানাবুদ হল তা নিয়েও গড়ে উঠেছে খনগান।
ঈ) অনেক সময় নানান পালায় এসেছে সরকারি কর্মসূচির ফরমায়েশ।
জনপ্রিয় খনপালার রচয়িতা খুশি সরকারের রচনায় বন্দনা অংশ—
“গগন পবন বন্দি
মোর পিতা মাতা
উমরা হইল মোর জন্মদাতা
বেভাগে বন্দি আর
গুরু ভূপানন্দ পুরী।
সত্য সাই দেবা।
বেভাগের সূর্য বন্দি
প্রকৃতি ভূমি মা
যাহার অধিপতি গোলোকপতি কৃষ্ণা
আর বন্দি পল্টু পচি,
আতা— আয়া মোর জগৎ মাঝারে
যাদের কৃপা ধান্য আসি এভাবর সংসারে
ওম নমঃ নমঃ নমঃ গগন পবন।”
বাজনা— খোল, হারমোনিয়াম, করতাল, ডুগি তবলা, বাঁশের বাঁশি।

শাস্তরি খন

কুশমন্ডির কিছু অঞ্চল থেকে আমরা শাস্তরি খনের অতি অল্প কিছু প্রসঙ্গ জানতে পেরেছি। তাঁরা মূলত চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, রামায়ণ মহাভারতের কাহিনি অবলম্বন করেই খনগান বাঁধেন। মূলত সমগ্র কাহিনি নয়, কাহিনির খুব ছোট্ট অংশ, যা কিনা চিত্তাকর্ষক, সেই অংশটুকুই নির্বাচন করে খন পালাগান প্রস্তুত করেন। সাধারণত কোনও বিশেষ পূজা-পার্বণকে কেন্দ্র করে এই শাস্তরি খন গাওয়া হয়।
আমরা কুশমন্ডির খন শিল্পীদের থেকে যে খনগানটি সংগ্রহ করি তার নাম ‘কানি-বিষহরি পালা’। মনসামঙ্গলের কাহিনি কেন্দ্র করে এই পালাগান রচিত এবং মনসা পুজোর সমকালীন সময়ে, পুজোর আগের দিন, পুজোর দিন ও পরের দিন ধরে মোট তিন দিন জুড়ে ভাগ করে করে গাওয়া হয় ‘কানি-বিষহরি পালা’।
“মন চোর হয়রান হোয়ল রে
দুই নয়নের জলে।”
এই হাহাকার দিয়ে শুরু হয় ‘কানি বিষহরি পালা’ এবং লক্ষ্মীন্দরের বৃত্তান্তটুকুই মূলত আবৃত্ত হয় গানের সুরে, লক্ষ্মীন্দরের বেঁচে ফিরে আসা অবধি হয়ে শেষ হয়। তবে খনগান স্বতন্ত্র শিল্পীর রচিত। ‘কানি-বিষহরি পালা’-ও নানা শিল্পী দ্বারা রচিত। মূল কাহিনি একই হলেও বিভিন্ন শিল্পী তা বিভিন্নভাবে রচনা ও পরিবেশন করেন।
এছাড়া একইভাবে পঞ্চানন ঠাকুরকে নিয়ে পালা রচিত হয়েছে। পঞ্চাননকে ‘খন ঠাকুর’ বলা হয়, এটিও শাস্তরি খন একটি। যুগবদলের সঙ্গে সঙ্গে শাস্তরি খনের শ্রোতা ও চহিদা দুই–ই কম হয়ে আসছে। মানুষ কেচ্ছা-কাহিনিমূলক খন বা খিসা খনের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।

খিসা খন

খনগানের জগতে খিসা খনেরই প্রাচুর্য্য, মাহাত্ম্য এবং জনপ্রিয়তা বেশি। আধুনিক মানুষ অনেক বেশি মানবজগৎ নির্ভর। দেবতার প্রয়োজন সেখানে দায়জনিত, ভয়জনিত। সে কারণেই সাধারণ পূজা-পার্বণ ব্যতিরেকে অন্য সময়ে শাস্তরি খনের আয়োজন বা চাহিদা হয় না।
বিখ্যাত অধিকাংশই খনগানই খিসা খন। সামাজিক কেচ্ছা-কাহিনি মূলত অবৈধ প্রেম-পিরিত-ভালবাসা এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের প্রচারকার্যে খন পালাগান রচিত হয়। তাই খিসা খন নামে পরিচিত। খুব জনপ্রিয় একটি খিসা খন হল ‘মায়াবন্ধকি’। এই ‘মায়াবন্ধকি’ পালার মূল গল্পটি হল—
একজন ভজনশীল মানুষ। সে মূলত সাধনভজন করে গৃহে বসে এবং কৃষিকাজ করে। তার বাড়িতে একবার তার গুরুদেব আসেন। সে গুরুদেবের আপ্যায়নের জন্য স্ত্রীকে অনুরোধ করে বাইরে থেকে গিয়ে কিছু সু-আহার্য আনতে। স্ত্রী তখন বলে সে পারবে না, পুরুষমানুষ হওয়ার সুবাদে তারই বাড়ির বাইরে গিয়ে সমস্ত যোগাড় করা উচিত। লোকটি তার দায়িত্ব স্বীকার করে এবং গুরুদেবকে স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে রেখে বাড়ির বাইরে যায় কিছু আহার্য্য সামগ্রীর সন্ধানে। কিন্তু কোনওরূপ সন্ধান না করতে পেরে অনেক ঘুরে ঘুরে সে তার নিজের দাদার কাছে যায় কিছু সাহায্যের আশায়। দাদা বড়লোক, অনেক জমির মালিক। সে সাহায্য করতে রাজি হয়। কিন্তু তার বিনিময়ে সে ভাইয়ের জমিটি বন্ধক নিয়ে নেয়। আপাতভাবে সে গুরুদেবকে আপ্যায়িত করে এবং সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে তার সমস্যা মেটে। কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হয় এর পর। জমি বন্ধক নেওয়ার সময় চালাকি করে তার দাদা ভাইয়ের স্ত্রীকে কেড়ে নেয়। কারণ যে পরিমাণ সাহায্য তার লাগত তাতে নাকি এইটুকু জমিতে কিছুই হওয়ার নয়। পরবর্তীকালে ঋণ পরিশোধ করবার সময় ওই লোকটি দেখে তার ধার নেওয়া টাকার পরিমাণ সুদ-সহ বেড়ে আরও অনেক গুণ হয়েছে। সে তখনই সমস্ত চক্রান্ত বুঝতে পারে এবং আর কখনই সেই ঋণ শোধ করতে পারবে না বুঝতে পেরে উন্মাদপ্রায় হয়ে যায়। এদিকে তার দাদা ভাইয়ের স্ত্রীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় এবং তাকে তার সঙ্গে থাকতে বাধ্য করে।
‘মায়াবন্ধকি’ পালার এই মূল কাহিনি থেকে আমরা অবশ্যই বুঝতে পারি যে এটা কোনও স্থানীয় জোতদার, জমিদারের গল্প। অতীতে সামন্ততান্ত্রিক সভ্যতার চাপ রয়ে গিয়েছে এখনও এদের পালাগানের মধ্যে।

‘ফাঁকা ডাব’ খনপালার মুহূর্ত।

আর একটি বিখ্যাত পালা আমরা ক্ষেত্রসমীক্ষায় গিয়ে প্রত্যক্ষ করি। ‘আশাসোরী পালা’। ‘দিনাজপুর গ্রামীণ লোকনাট্য সংস্থা’ নিবেদিত এই ‘আশাসোরী পালা’ মূলত বাল্যবিবাহ রুখে দেবার প্রচারকার্যে উদ্যত। এই পালাগানের মূল গল্পটি হল—
একটি সাধারণ গৃহস্থ পরিবার, যাদের একটি কন্যা আছে, কন্যাটি পড়াশুনা করতে চায়। কিন্তু সামাজিকতার খাতিরে তার বাবা-মা তাকে বিয়ে দিতে চায় অথচ তারা মেয়েকে বোঝাতে পারে না। এই মেয়েটির নামই হল আশা। মেয়েটির ঠাকুরদা তাঁর গুরুদেবকে ডাকেন বাড়িতে, তাঁর নাতনিকে বশ করার জন্য যাতে সে বিবাহে আগ্রহী হয়। গুরুদেব এসে আশাকে দেখেন এবং তাঁর মনে প্রেমের উদয় হয়। তিনি মেয়েটিকে বশীকরণ ওষুধ দেওয়ার বদলে এমন ওষুধ দেন যা খেয়ে মেয়েটি গুরুদেবের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং গুরুদেবের প্রেমে পড়ে। আশা গুরুদেবের নামে পাগল হয়। গুরুদেবের সংস্পর্শে এসে আশা গর্ভবতী হয়। আশার বাবা ও তার ঠাকুমা বিষয়টি বুঝতে পারেন। তাঁরা পুলিশ ডেকে আনেন এবং গুরুদেব গ্রেপ্তার হন। বাল্যবিবাহের মতো ঘটনাকে রদ করতে তার সামাজিক প্রচারের কাজ করে চলে খনগান।
খনগুরু সৌরভ রায়ের ‘ঊষাভানু’ নাট্য সংস্থার ‘ফাঁকা ডাব’ নামক খনপালাটির দর্শনেরও সুযোগ হয় আমাদের।
ফাঁকা ও ডাব নামক দুটি ভাই। তারা পড়াশোনায় খুবই কাঁচা এবং স্কুলে পড়তে চায় না। তারা একদিন রেলগাড়িতে চড়তে চায় এবং কোনওভাবে কলকাতা গিয়ে সেখান থেকে ফেরার সময় রেলগাড়িতে চড়বার জন্য মনস্থির করে। তারা ‘এলগাড়ি করি শুতি শুতি যাবে’। কিন্তু দালাল মারফত রেলে চড়ার টিকিট বাবদ মোট চারশো টাকা খরচ করে তারা ঠকে যায়। শেষে এক দয়ালু টিকিট মাস্টারের সহায়তায় তারা তাদের গ্রামে এসে পৌঁছতে পারে। গ্রামে এসে তারা তাদের স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের দেখা পায়। তাদের ঠকে যাওয়ার বৃত্তান্ত শুনে তিনি তাদের পড়াশুনার মর্ম বোঝান।
এই পালাটি একদিকে যেমন সামাজিক প্রতারণার একটি ছবি তুলে ধরে, তেমনই শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে খুব জোরের সঙ্গে। এই খনপালাটি বাদ দিয়ে আরও প্রচুর বিখ্যাত খনপালা, যেগুলি বহুদিন ধরে দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, সেগুলির প্রত্যেকটিই মূলত খিসা খনগান। এর মধ্যে বিখ্যাত আর একটি পালা হল ‘হালুয়া-হালুয়ানির পালা’।
খনকার মাধাই মোহান্তর লেখা ‘হালুয়া-হালুয়ানির পালা’ বাংলাদেশের একটি ঘটনা নিয়ে রচিত এবং এখনও অবধি তা চলে আসছে। আবৃত্ত হচ্ছে রাজবংশী জাতির মানুষের মুখে মুখে খনগানের সুরে।
অতি বিখ্যাত পালাগুলির মধ্যে মাধাই মোহান্তর একাধিক পালা রয়েছে। যেমন ‘মিনতি সোরী পুলিশ মার্ডার’, ‘কুসুম সোরী বাউদিয়া’, ‘সিম চীপ সোরীর কথা’, ‘কারেন্ট সোরী’, ‘ফুলেশ্বরী সাপুড়িয়া মার্ডার’ ইত্যাদি খনপালা।
সৌরভ রায়ের ‘ঊষাভানু’ নাট্য সংস্থার ‘সুখশান্তি’, ‘হালুয়া-হালুয়ানি’, ‘জীবনসাথী’, ‘সাপুড়িয়া মার্ডার’ প্রভৃতি খনগান খুবই বিখ্যাত।
খুশি সরকার খনগানের জগতে তথা পশ্চিমবঙ্গ লোকসংস্কৃতি জগতের একটি খুবই বিখ্যাত নাম।
এছাড়াও বিপুল বসাকের মতো আংশিক খনশিল্পীরাও আছেন যাঁরা কৃষিকাজের পাশাপাশি খনপালা লেখেন। সেখানে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পায়। নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘মালতীর অধিকার’ নামক খনপালা। আবার ‘ভুল’ নামক একটি খনপালায় তিনি দেখান, একটি লোক মারা গেছে বলে সবাই জানে কিন্তু আসলে সে মরেনি। ঈশ্বরের দূত তাকে ভুল করে নিয়ে গেছে। খনপালার মধ্যে খিসা খনের অংশ বিষয় বৈচিত্র্যে ভরা।

খনগানের মঞ্চ

খনগানে মঞ্চের কোনও ব্যবহার একসময় ছিল না। বেশ কিছু বছর ধরে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ধাঁচে খনগানে বাঁধা মঞ্চের ব্যবহার হচ্ছে। যদিও আদিতে খনগানের উপস্থাপন হত অন্যভাবে। মাঝখানে বাজনদাররা বাজনা নিয়ে বসতেন। তাঁদের চারদিকে একটু দূর থেকে দর্শকরা বসতেন। আর মাঝের ফাঁকা বৃত্তাকার অংশে ঘুরে ঘুরে নেচে খনশিল্পীরা খন অভিনয় করতেন। এখন বাঁধা মঞ্চে কিংবা এমনিতে মঞ্চ না হলেও সামনে দর্শকদের রেখে একটা দিকে পিছনে বাজনদাররা বসেন। তাঁদের সামনে অভিনয় করেন খনশিল্পীরা। মঞ্চের সামনে প্রায় তিন দিকে দর্শকরা অভিনয় দেখতে পারেন।
আগে খালি গলাতেই চলত রাতভর অভিনয়। এখন মাইক্রোফোন আছে, কর্ডলেস আছে, আবার তিরিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে খন শেষ ও পেশ করবার যুগপৎ ফরমায়েশও আছে। ফলে খালি গলার কেরামতি বা রাতভর পালা চালানোও বিশেষ নেই।
খন সচরাচর অগ্রহায়ণ মাসে মাঠের ফসল বিক্রি করবার পর নবান্নের সময় শুরু হয়ে থাকে। গ্রামের প্রায় প্রতি পাড়ায় খনগান অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়ে মানুষের হাতে পয়সা থাকে। শ্রমের পর মানুষ রঙ্গ করতে, আনন্দ করতে চায়। খন তাদের সেই আনন্দটুকু যোগায়। সারাবছর নানা জায়গা থেকে ডাক আসে, বায়না আসে। খনগান নিয়ে আগ্রহ আছে গবেষকদের মধ্যে। গিরীশ কারনাডের ‘হয়বদন’ নাটকে খনগানকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ফাঁকা ডাব’ পালার দৃশ্য।

খনগানের মহড়া সারাবছরই চলে। একটি পালা দশ-পনেরো দিন মহড়া দিলেই আয়ত্তে আনা যায়। দুই দিনাজপুরে খনগানের প্রায় ৩৬-৩৭টি দল আছে। আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল ‘উত্তরকন্যা খন নাট্যসংস্থা’, ‘দিনাজপুর গ্রামীণ লোকনাট্য সংস্থা’ ইত্যাদি লোকনাট্য সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে।
খনের জোর যে তার ঔদার্যে, তার গ্রহণ করবার ক্ষমতায় তার প্রমাণ মেলে। অনিল পাহানের মতো কেউ কেউ সাঁওতাল সমাজ থেকে বা সৌরভ রায়ের মতো কোনও পণ্ডিত গবেষকও খনগানে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন। রাজবংশী কৌলীন্য অ-রাজবংশীদের খনে অংশগ্রহণে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

খনের দর্শক

খনগানের দর্শক দেশি পোলিয়া রাজবংশীরাই। এই কৃষিজীবী মানুষগুলোই খনগানের মূল দর্শক। কেননা এঁদের জীবনেরই কোনও কেচ্ছা-কাহিনি নিয়ে এঁদেরই ভাষায় তৈরি হয় খন। নতুন প্রজন্মের দর্শক পাওয়া মুশকিল হলেও বিষয়ের ও উপস্থাপনের জোরে অনেকে শুনতে আসে, দেখতে আসে খন। কিন্তু খন করতে তারা উৎসাহী নয়। তাদের প্রশ্ন, লোকের কেচ্ছা আর কত শুনব? যদিও খনের দর্শক এখন শুধুমাত্র গ্রামের রাজবংশীরাই নন। খন দুই দিনাজপুর জেলার, এমনকি হরিদেবপুর, মালদা, আরও দূরে, কখনও কখনও শহর কলকাতাতেও হয়ে থাকে বিভিন্ন কমিটির আমন্ত্রণে। ফলে দর্শককুলের মধ্যে নানা ভিন্নতা (রুচিগত, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত) লক্ষ করা যায়। দর্শকদের রুচি ও চাহিদার ওপরেই কোনও খনপালার জীবনকাল নির্ভর করে থাকে। শাস্তরি খন হারিয়ে যাওয়ার বড় কারণ দর্শকদের চাহিদার অভাব ও খিসা খনের দুর্নিবার জনপ্রিয়তা।
কোশাম্বী যে সংস্কৃতায়ন বা হিন্দুত্ব আরোপের কথা বলেন তাতে ভারতীয় আদিবাসী সমাজ একদিকে ভারতের Great Tradition বেশ খানিকটা আত্মসাৎ করেছে। এই Great Tradition বলতে আমরা আসলে মহান ঐতিহ্য বোঝাতে চাইছি না। ব্যাপ্তির দিক থেকে যে সংস্কৃতি প্রবল, বিশাল তাকেই বুঝতে চাইছি। রাজবংশী দেশি পোলিয়াদের সমাজ আদিবাসী সমাজ নয়। কিন্তু গ্রামীণ লোকসমাজই বটে। ফলে তাদের লোকনাট্যের ধারাতেও ধর্ম-মনসা-কালী-দুর্গা-সত্যপিরের সহাবস্থান ঘটে। এদের মধ্যে আপাত কোনও সংঘর্ষ নেই। যদিও তারা নিজেরা বৈষ্ণব ধর্ম অনুসারী। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গত হাজার বছরে ধর্ম ও সংস্কৃতির দিক থেকে বহু রদবদল ঘটেছে। বৌদ্ধ-জৈন পরম্পরা বিলুপ্ত হয়েছে, ইসলাম ধর্মের আকর্ষণ প্রবল হয়েছে, একটা সময় ‘কানি বিষহরি’-র দৌলতে হিন্দু সমাজের নিচুতলার ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। আবার বৈষ্ণব ধর্মের প্রচলনের সময়েও একটা domination লক্ষ করা গেছে। কিন্তু এই domination আগের সব ঐতিহ্যকে মুছে ফেলে নয়, বরং তার কিছু কিছু বহমান থেকেছে আগামী সম্ভাবনার মধ্যেও।

খুশি সরকার ও মাধাই পণ্ডিত।

আমরা বলতেই পারি যে খনগানে ভাবগত, বিষয়গত, আঙ্গিকগত এমনকি উপস্থাপনেও বদল ঘটে চলেছে প্রযুক্তি ও আধুনিকতার নামে। বদলানোর রুচির কারণে তা নিয়ে হা-হুতাশ করলে চলবে না। এই বদল ভাল কি মন্দ, এই বদল ঠিক কি ভুল, সে বিচার পরে। কিন্তু এই বদলানোর ক্ষমতা থাকবার দরুনই ফিল্মি গানের চাপেও এখনও হারিয়ে যায়নি খনগান। লোকসংস্কৃতির টিকে থাকার জন্যে বিবর্তিত তাকে হতেই হবে।
খনগানে প্রসেনিয়াম রীতির প্রভাব পড়লেও দর্শক ও শিল্পীদের পারস্পরিক সক্রিয় অংশগ্রহণ লোকনাট্যের মেজাজটুকু ধরে রেখেছে এখনও। রাতভর পালা চালানোর সমবেত ডাক খনশিল্পীরা উপেক্ষা করতে পারেন না। Performing Art সবসময়ই দর্শকদের চাহিদার মূল্য দেয়। তাই শাস্তরির জয়গান, খিসার জনপ্রিয়তা অযৌক্তিক ও বদরুচির লক্ষণ নয়। খনগান একটি আদ্যোপান্ত Group Production। লোকের মনে গানগুলি রয়ে যায়।
সংস্কৃতির পণ্যায়নের বাজারে সৌন্দর্যের লোকনান্দনিক দৃষ্টিকোণ মূল ধারার হেজিমনিতে হারিয়ে যাচ্ছে কিনা তা ভবিষ্যৎই বলবে। লোকসংস্কৃতির অন্যান্য ধারার মতোই খনগানেও আঞ্চলিকতা ও আন্তর্জাতিকতা মিলেমিশে আছে। খনগান একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বটে। কিন্তু ভাষার ব্যবধান পেরিয়ে খনগানের লোকসাংস্কৃতিক স্বকীয়তাগুলি যে অনন্য তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
আশঙ্কা আছে, জাতীয় আনুগত্যের প্রয়োজনে খনগানের সত্তাই না বিকিয়ে যায় মেইনস্ট্রিম মাস মিডিয়ার কাছে। কিন্তু আশাও আছে এই যে, খনগান পারিপার্শ্বিক সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সরকারি আনুকূল্য ছাড়াও জনপ্রিয়তা ও লোকরঞ্জন ক্ষমতা বজায় রাখতে সক্ষম, বদলকে মেনে এগোতে সক্ষম। লোকনাট্যের গতিশীল ধারায় খনগান তাই বাঁচবে এই আশা করা যায়।

তথ্য সহায়তা
অনিল পাহান, বুলবুলি সরকার, গোবিন্দ তালুকদার, সৌরভ রায়, খুশি সরকার, সুখেন সরকার, দীনেশ সরকার, সাম্পান সরকার, কাঞ্চন সরকার, দীপালি সরকার, কল্পনা সরকার, রানি সরকার, কবিতা সরকার, আহরী মণ্ডল, বদ্রীনাথ বসাক, ব্রজেন্দ্রনাথ রায়, সিরু সরকার, উত্তম সরকার, প্রকাশ সরকার প্রমুখ।

ছবি : লেখক
মতামত জানান

Your email address will not be published.