বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

গিরিশ কারনাড ও ‘রক্তকল্যাণ’

দেশের চারপাশটা যখন মুক্তমন নিয়ে দেখি তখন জাতপাত, সম্প্রদায় নিয়ে যে অমানবিক রাজনীতির ছবি স্পষ্ট হয় তাতে মনে ভয় বাসা বাঁধে। শেষমেশ আবার ওই কল্যাণনগরের মতো আধুনিক ডিজিটাল ইন্ডিয়াও আতঙ্কে ও রক্তস্রোতে ভেসে যাবে না তো!

সত্য ভাদুড়ি

কখনও কখনও এমন নাটকের হদিশ মেলে যেটি বিষয় বিন্যাসের স্বকীয়তায়, চরিত্র নির্মাণের কুশলতায়, চরিত্রের স্ব-স্ব মানসিকতা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী সংলাপ রচনার দক্ষতায়, নাটকীয় মুহূর্ত ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টির মুনশিয়ানা এবং সর্বোপরি এর ব্যাপ্তি ও স্বদেশের সমকালীনতার নিরিখে পাঠক হিসেবে আমার মনঃসংযোগ ঘটাতে বাধ্য করে। স্বীকার্য একথা, ‘রক্তকল্যাণ’ উপরোক্ত গুণের সমাহারে একটি সবিশেষ নাটক (Text)। তাই, এ নাটকের নাতিদীর্ঘ আলোচনা এ লেখার প্রতিপাদ্য। তবে সেখানে যাবার আগে এর স্রষ্টা সম্পর্কে ক’টি কথা বলব।
২০০৪-এ প্রকাশিত একটি গ্রন্থে গিরিশ সম্পর্কে নিম্নলিখিত তথ্য পাচ্ছি —
Girish Karnad, World Theatre Ambassador of the International Theatre Institute, Paris (ITI), was a Rhodes Scholar at Oxford. Apart from his work in theatre, he has directed and acted in films. He has served as Director, Film and Television Institute of India; Chairman, Sangeet Natak Akademi (The National Academy of the Performing Arts); and Director, The Nehru Centre, London. He was Visiting Professor and Playwright-in-Residence at the University of Chicago. The Guthrie Theater, Minneapolis in the US and the Haymarket Theatre, Leicester, in the UK, have been among the theatres that commissioned him to write for them. He has been honoured with the Padma Bhushan and was conferred the prestigious Jnanpith Award.
এই আন্তর্জাতিক বরেণ্য চিন্তক ও সৃজনশীল মানুষটি মহারাষ্ট্রের মাথেরানে, ১৯ মে ১৯৩৮-এ জন্মগ্রহণ করেন। মা কৃষ্ণাবাই, বাবা রঘুনাথ। বাবা পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। শৈশব থেকেই গিরিশের প্রখর ধীশক্তির প্রকাশ মেলে। বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জ্ঞানচর্চার পরিচয় পাওয়া যায়। সাহিত্য ছাড়াও দর্শন ও অর্থনীতিতে তাঁর বুৎপত্তি ছিল বলার মতো। চাকরির প্রথম জীবনে ছিলেন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে। একসময় ওই চাকরি ছেড়ে তিনি পাকাপাকিভাবে স্বদেশে ফিরে আসেন। মনোযোগ দেন নাট্যকলায়। ২২ বছর বয়সে লেখেন ‘যযাতি’। তাঁর মাতৃভাষা কন্নড় হলেও ইংরেজিতে অসম্ভব দখলের কারণে নিজেই নিজের নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন। এছাড়া হিন্দিটাও তাঁর ভাল রপ্ত ছিল। বাদল সরকারের সাড়াজাগানো ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের প্রতিভা অগ্রবালের হিন্দি অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে তিনি এর ইংরেজি তর্জমা করেন।
‘রক্তকল্যাণ’ ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হল— ‘হয়বদন’, ‘নাগমণ্ডল’, ‘তুঘলক’, ‘দ্য ড্রিম অব টিপু সুলতান’ এবং ‘বলি : দ্য স্যাকরিফাইস’। বাংলায় তিনি আদৃত নাটককার। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রায় সবক’টি নাটক বাংলায় অভিনীত হয়েছে। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ বাংলা নাটমঞ্চ প্রতিষ্ঠা সমিতি মঞ্চস্থ করে ‘তুঘলক’। এর নির্দেশক ছিলেন শ্যামানন্দ জালান। আর তুঘলক-এর ভূমিকায় অভিনয় করেন শম্ভু মিত্র।
সিনেমাতেও তিনি ছিলেন বলার মতো অভিনেতা। যাঁরা ‘নিশান্ত’-এ মাস্টার, ‘মন্থন’-এ ড. রাও, ‘আতঙ্ক’-এ ইন্সপেক্টর খান, ‘আক্রোশ’-এ রাজবংশ শাস্ত্রী বা ‘সুরসঙ্গম’-এ পণ্ডিত শিবশঙ্কর শাস্ত্রীর ভূমিকায় তাঁকে অভিনয় করতে দেখেছেন, বোধকরি, তাঁরা আমার সঙ্গে এ বিষয়ে একমত হবেন। হিন্দি ছাড়াও কন্নড়, তামিল, মালয়ালম, অসমিয়া ও ইংরেজি সিনেমাতে তিনি সাবলীলভাবে অভিনয় করেছেন। একাধিক চলচ্চিত্রের তিনি ছিলেন নির্দেশক।
প্রতীচ্যের নাটককলা সম্পর্কে তাঁর নিবিড় পাঠ থাকলেও তাঁর নিজের নাটকে (Text) ঘুরেফিরে এসেছে স্বদেশের পুরাণ, ইতিহাস, কিংবদন্তি, লোককথা, নীতিকথা এবং আবহমান কাল ধরে চলে আসা লোকাচার ও রাজনীতি। তবে এক্ষেত্রে বিষয়মুখকে কালের মাত্রায় রেখে ঘটিয়েছেন তার পুনর্নির্মাণ। দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে বিন্যাসে এনেছেন আধুনিকতা। স্থূল কোনও রীতির নিগড়ে নিজের সৃষ্টিকে সীমায়িত করেননি। প্রয়োজনে খনন করে নিয়েছেন নিজের পথ।
যথার্থ মুক্তমনা এই চিন্তক কোনওদিনই পাটিজান মানসিকতার সংকীর্ণ পরিসরে নিজেকে শৃঙ্খলিত করেননি। ফলে, সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় মৌলবাদ, জাতপাতের বিভেদ, অর্থনৈতিক ও লিঙ্গবৈষম্য আর যেকোনও হেজিমনির বিরুদ্ধে তাঁর ছিল সক্রিয় অবস্থান। তাই যুক্তিসঙ্গতভাবেই নোবেলজয়ী ভি এস নাইপলের লেখায় তিনি খুঁজে পান হিন্দু-মুসলমানের বিদ্বেষের ছবি। এ প্রসঙ্গে ঢাক ঢাক গুড়গুড় না করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর মন্তব্য : ‘ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে নাইপলের কোনও ধারণাই নেই।’ এছাড়া ইতিহাস মন্থন করে এই ইতিহাসবেত্তা আমাদের এও ধরিয়ে দেন : ‘শিবাজির থেকে টিপু সুলতানের অবদান আমাদের ভারতের ইতিহাসে কোনও অংশে কম নয়’।

তাই তাঁর The Dreams of Tipu Sultan-এ আমরা নতুন এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে টিপুকে পাই— The figure of Tipu Sultan has continued to dominate Indian and British imagination for over two centuries, as the endless flow of scholarly works, ballads, plays and novels about his tempestuous life and tragic end testifies. What, however, is less well known is that this man, who spent a large part of his life on horseback, maintained a record of his dreams, which he kept concealed from his nearest associates. The Dreams of Tipu Sultan examines the inner life of this warrior, political visionary, and dreamer. It was commissioned by the BBC and broadcast in Britain on the Fiftieth anniversary of Indian Independence. বর্তমানে প্রাচ্য যে ‘আজাদি’ করছে সেটি এই নাটকটির প্রেরণায় রতনকুমার দাস গড়ে তুলেছেন। প্রযোজনাটি মঞ্চসফলতা পেয়েছে। সুপ্রিয় দত্ত ও বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় সুন্দর অভিনয় করেছেন।

আবার নারীর যৌন স্বাধীনতার পক্ষে ও ধর্মীয় হিংসাত্মক প্রথার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে তাঁর ‘বলি : দ্য স্যাকরিফাইস’। অদ্ভুত এর বিন্যাস— you have probably never seen anything quite like it. …it is both quite alien and completely accessible. …tragedy and comedy, the universal and the deeply personal, spark off each other. Every time you are about to snort with laughter, you are stunned into silence by the realisation of what is at stake. …it is as enjoyable as it is thought-provoking.
উপরোক্ত কথা বলা এবং সাহসের সঙ্গে এমন সব নাটক লেখার কারণে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়। তা সত্ত্বেও দেখি, এই অকুতোভয় লেখক সত্যের প্রতি অবিচল থাকেন। গত লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘এই প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলকে ফিরিয়ে আনবেন না’ এই শিরোনামে একটি আবেদনপত্রে দেশের ছশোজন মুক্তমনা শিক্ষক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী যখন সই করেন, সেখানে তাঁর সইটা থাকে সবার ওপরে।
এছাড়া দেশের বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী যখন বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে থাকেন এবং তার প্রতিক্রিয়ায় যখন তাঁদের একের পর এক ‘আরবান নকশাল’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় এবং এর ফলে যখন কয়েকজন খুন হন, তখন গিরিশকে দেখি, অসুস্থ শরীরে বৃদ্ধ বয়সেও নাকে অক্সিজেনের নল লাগিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে সামিল হতে। দেখি, গলায় একটা পোস্টার লাগিয়ে ওই মিছিলে হাঁটতে। সেই পোস্টারে লেখা ছিল— ‘মি টু আরবান নকশাল’।

তবে একথা ঠিক, রবীন্দ্র-নাটক সম্পর্কে তাঁর উক্তি— ‘…১৯ শতকের ভারতীয় নাটকে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা গৌণ। ওঁর নাটক সে সময়ে দেশের মানুষ দেখেনইনি, বোঝা তো দূরে থাক। পেশাদাররা তাঁর নাটক সে সময় ছুঁয়েও দেখতেন না। আসলে বড় কবিমাত্রেই বড় নাট্যকার হবেন তার তো কোনও মানে নেই। রবীন্দ্রনাথের নাটকের যে অনুবাদগুলো অবাঙালিরা পড়েন তার ভিত্তিতে রবীন্দ্রনাথের নাটককে আমি অন্তত উচ্চাসনে বসাতে পারি না।’ বিশেষ করে, রবীন্দ্র-নাটক অনুরাগীরা সুনজরে নেননি।
ভারতীয় আধুনিক নাটককার হিসেবে, ঠাট্টা করে তিনি নিজেই নিজেকে রাখতেন তৃতীয় স্থানে। এক্ষেত্রে এগিয়ে রাখতেন বাদল সরকার ও বিজয় তেন্ডুলকরকে।
ব্যক্তিগত জীবনে গিরিশ ছিলেন অত্যন্ত সুভদ্র ও তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল পরিশীলিত। সেখানে অহংয়ের কোনও স্থান ছিল না। কেউ যদি তাঁকে ফোন করতেন এবং ব্যস্ততার কারণে যদি ফোনটা ধরতে না পারতেন, সময় পেলেই তিনি নিজে তাঁকে ফোন করতেন। এক্ষেত্রে তাঁর সামাজিক অবস্থান যাচাই করতেন না। এই অভিজ্ঞতা আমার মতো আরও অনেকের আছে।
কথা ও কর্মে মানুষটি নিখাদ ছিলেন। মৃত্যুর আগে পরিবারকে তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। আর তা হল : তাঁর মরদেহ যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাহ না করা হয়। ফলে তিনি প্রয়াত হবার পর তাঁর রাজ্য সরকার যখন তাঁর পরিবারকে সেই প্রস্তাব দেয় তখন তাঁরা তাতে রাজি হন না। ফলে তাঁর সৎকার আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই হয়। এই অ্যাবাভ অ্যাভারেজ মানুষটি ১০ জুন ২০১৯-এ একাশি বছর বয়সে বেঙ্গালুরুতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

রক্তকল্যাণ

এ সেই সময়ের কথা যখন জাতপাত, ধর্ম, রাজনীতির কারণে আমাদের স্বদেশ আবার নতুন করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে। একদিকে প্রকাশ পেয়েছে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট। এতে উঠে এসেছে স্বদেশের জাতিগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের নিদারুণ চালচিত্র। বিপরীতে, গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো বাবরি মসজিদকে কেন্দ্রে রেখে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব আবার তীব্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই অবস্থায় আপামর সাধারণ মানুষ শঙ্কিত হচ্ছেন। রক্তে ভিজতে আরম্ভ করেছে দেশের মাটি। এই ভয়াবহ উৎকেন্দ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে মুক্তমনা গিরিশ, ইতিহাসসচেতন গিরিশ, দূরদ্রষ্টা গিরিশ নির্লিপ্ত থাকতে পারছেন না। সিঁদুরে মেঘ দেখছেন, ডরাচ্ছেন, লিখছেন ‘রক্তকল্যাণ’। বস্তুত, দেশের সর্বশ্রেণির মানুষকে জাতপাতের বিভেদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে চৈতন্য জাগাতে। সময়টা সঠিক করে বললে ১৯৮৯।
নাটকটি গিরিশ প্রথম লেখেন কন্নড়ে। তখন নাম ছিল ‘তালেদণ্ড’। এই শব্দটির অর্থ শিরশ্ছেদের শাস্তি। পরে অবশ্য তিনি নিজেই এটির একটি ইংরেজি ভার্সন তৈরি করেন। রামগোপাল বাজাজ এর হিন্দি অনুবাদ করেন। এই কাজে বাজাজকে সাহায্য করেন স্বয়ং নাটককার। এই হিন্দি অনুবাদটি জানুয়ারি ১৯৯২-তে ‘রক্তকল্যাণ’ নামে প্রথম অভিনীত হয়, দিল্লিতে। প্রযোজনাটি ছিল এনএসডি রেপার্টরি কোম্পানির, নির্দেশক ছিলেন ভারতীয় থিয়েটারের অন্যতম নির্দেশক ও এনএসডির তখনকার অধ্যক্ষ ইব্রাহিম আলকাজি। অবশ্য—‘অভিনয়ের সুবিধা-অসুবিধার কথা মনে রেখে পরিচালক আর অনুবাদকের সঙ্গে পরামর্শক্রমে, হিন্দিতে নাটকটির অল্পস্বল্প বদল ঘটিয়েছেন নাট্যকার। বদল হয়েছিল নামেও। মূল কন্নড় নাম ‘তালেদণ্ড’ হিন্দিতে হল ‘রক্তকল্যাণ’। এ নামে নাট্যকারের সম্মতি ছিল’।
বাংলা অনুবাদের সময় অনুবাদক শঙ্খ ঘোষের প্রধান নির্ভর ছিল কারনাডের নিজস্ব ইংরেজি, তবে ‘সংলাপের দু-একটি ক্ষেত্রে’ তিনি ‘ইংরেজি পাঠের বদলে হিন্দি পাঠকে গ্রাহ্য করেছেন কিন্তু সর্বত্র নয়।’ একথা আমাদের জানাচ্ছেন অনুবাদক স্বয়ং।
এটি প্রথম প্রকাশ পায় ‘স্যাস’ নাট্যপত্রে, ১৯৯৪-এ। গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় বইমেলা ১৯৯৫-এ, প্রকাশক প্যাপিরাস। বাংলায় মঞ্চস্থ করে ‘রঙরূপ’, সীমা মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়।

‘রক্তকল্যাণ’ একটি ব্যপ্ত ক্যানভাসের নাটক। নারী-পুরুষ মিলিয়ে নামযুক্ত চরিত্রের সংখ্যা ২৮। এছাড়াও আছে অসংখ্য নামহীন চরিত্র। যেমন ব্রাহ্মণদল, প্রাসাদের ভৃত্যদল, জনতা, আদিবাসী, শরণদল, সৈন্য, দূত।
কল্যাণনগরের সমগ্র অঞ্চল ও তার আশপাশ জুড়ে থাকে এর পটভূমি। এটি ৩ অঙ্কে বিভক্ত। দৃশ্যসংখ্যা ১৬। প্রথম অঙ্কের দৃশ্যসংখ্যা ৪। দ্বিতীয় অঙ্কে ২। আর তৃতীয় অঙ্কে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০।
স্বদেশের দ্বাদশ শতাব্দীর এক উল্লেখযোগ্য বৈপ্লবিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নাটক আবর্তিত। এর ভরকেন্দ্রে থাকেন কর্ণাটকের এক সন্ত কবি, বাসবান্না। লিঙ্গায়ত সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বীরশৈব ধর্মের প্রখ্যাত এই কবি তাঁর শিষ্যদের বোঝাতে পেরেছিলেন যে মন্দিরের কোনও মানে নেই, স্থাবরের কোনও মানে নেই, দেবতা আছেন জঙ্গম জীবনের মধ্যে, দেবতা আছেন  কঠোর প্রাত্যহিক শ্রমের মধ্যে। শ্রমের এই জীবনদর্শনকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘কায়ক’। আর এই ‘কায়ক’ যাঁরা মেনে নেবেন তাঁরাই তাঁর শিষ্য ‘শরণ’।
ভাবতে অবাক লাগে, আজ থেকে প্রায় ৯০০ বছর আগে এই বৈপ্লবিক কথা বলেই বাসবান্না তাঁর কর্তব্যধর্ম শেষ করেননি। বাস্তবে প্রত্যক্ষ শ্রম ও মননের দ্বারা এই ব্রাহ্মণ গড়ে তুলেছিলেন সুবিশাল ‘শরণ’ সম্প্রদায়। অহিংসার পথে। আজকের দিনের পরিভাষায় যাকে বলে একেবারে ‘দ্য ক্লাসে’ হয়ে। বর্ণভেদ প্রথাকে ভেঙে দিয়েছিলেন, নারী-পুরুষের শ্রেণিবৈষম্য ঘুচিয়ে তাদের একমাত্র মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন, তাদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন সাম্য, মুক্তি, স্বাধীনতা। কিন্তু একটা সময়ের পর, মূলত কিছু তরুণ ‘শরণ’-এর হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে সেই মহান আন্দালন কীভাবে পথ হারাল আর সেই সুযোগ নিয়ে সনাতনপন্থী ব্রাহ্মণরা কীভাবে ‘শরণ’-দের ওপর অত্যাচার করে কল্যাণনগরকে তাদের রক্তে ডুবিয়ে দিল— তারই নিদারুণ ট্র্যাজিক বয়ান মেলে গিরিশের এই নাটকে।
আমাদের এই ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে ধরা দেয় ‘রক্তকল্যাণ’। পথ দেখায় দিগ্‌দর্শনের। এ নাটকে পরিশেষে উদারনৈতিক কিন্তু ডিপ্লোম্যাট রাজা বিজ্জল খুন হন। তবে এই রাজা একসময় তাঁর দ্বিতীয় রানি রম্ভাবতীকে বলেছিলেন—
“কে আমি? আমি বিজ্জল। কল্যাণের সম্রাট। কালচূর্য বংশের বৃষস্কন্ধ বীরযোদ্ধা। কিন্তু তবু— জাত কী আমার?
রম্ভাবতী (রানি) : তার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
বিজ্জল : আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। উত্তর দাও তার।
রম্ভাবতী : আমরা ক্ষত্রিয়।
বিজ্জল : তোমার পরিবার, হৈসেল বংশ, তোমরা ক্ষত্রিয় হতে পারো। কিন্তু আমি কালচূর্য, কালচুরি। নাপিত। মহামহিম নৃপতি বিজ্জল জাতে নাপিত। দশ পুরুষ ধরে আমাদের বাপঠাকুর্দারা ডাকাতি করে লুটেপুটে খেয়েছে। রাজার বিশ্বস্ত জায়গিরদার হয়ে কাটিয়েছি আরও পাঁচ পুরুষ। যত রাজবংশ আছে, সবার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করেছে তারা। লক্ষ লক্ষ গোরু ঘুষ দিয়ে হাত করেছে বামুনদের। এমন সব করেছে কেন? তাদের কপালে ক্ষত্রিয়ের ছাপ পড়বে বলে। কিন্তু তবু, আমার এই সাম্রাজ্যের যেকোনও অবোধ শিশুকেই জিজ্ঞেস করো, কালচূর্য পারমলি-র ছেলে বিজ্জল, তার জাত কী বলো তো খোকা? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পাবে, নাপিত। এমনকি তোমাকেও যখন আমার হাতে সম্প্রদান করা হচ্ছিল, তোমার বাবার চোখ—
রম্ভাবতী : বাজে কথা বোলো না। বাবা কখনও ও-রকম—
বিজ্জল : যা বলি শোনো। জাত একজনের গায়ে চামড়ার মতো লেগে থাকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত তুমি সেটা খুলে ফেলতে পারো, কিন্তু আবার যখন চামড়া গজাবে, দেখবে আবার সেই নাপিত, রাখাল, মেথর। (একটু থেমে)
আমার এই বাষট্টি বছর পর্যন্ত কেবলমাত্র শরণরাই— এই বাসবান্না আর তাঁর লোকজনেরাই— আমার দিকে তাকিয়েছে অন্যভাবে— নিচু বংশে আমার জন্ম নিয়ে মাথা ঘামায়নি তারা। তারা আমাকে দেখছে— কীসের মতো? মানুষের মতো। বর্ণাশ্রমের বিলোপ! কী স্বপ্ন! আর কী অসামান্য সাহস! হ্যাঁ, সে ক্ষমতা তার আছে। দেখো তার চারপাশে কারা এসে জুটেছে : কবিরা, মরমিয়া, দ্রষ্টারা। ভেবো না যে এর মধ্যে কোনও আকাশকুসুম আছে। পথপ্রান্তর থেকে সব খেটেখাওয়া মানুষের দল। তারা একসঙ্গে বসে সবাই, একসঙ্গে খায়, ভগবান আছে কী নেই তা নিয়ে তর্ক করে, ভাবে না কখনও জাতের কথা, জন্মের কথা, পদমর্যাদার কথা। আর এইসব ঘটছে কল্যাণনগরে, আমারই কল্যাণনগরে।”
কিন্তু আমরা দেখব, তাঁর এই আত্মশ্লাঘা স্থায়ী হয় না। অদৃষ্টের কী পরিহাস, যে শরণদের নিয়ে তাঁর এত বিশ্বাস, গর্ব, সেই শরণদের একজন ভুল বুঝে তাঁকে হত্যা করে। অবশ্য শেষে সে নিজেকেও হত্যা করে।
পরের রাজা হয় বিজ্জল ও রম্ভাবতীর সন্তান সোবিদেব। হয় বললে ভুল হবে। সনাতনবাদী ব্রাহ্মণরা তাঁকে রাজা তৈরি করেন। যার কোনও যোগ্যতা নেই। রাজা হয়েই সে একসময় ঘোষণা করে : এই মুহূর্ত থেকে সমস্ত শরণকে, সমস্ত বিরোধীকে, সমস্ত মুক্তচিন্তার মানুষকে এ রাজ্যে নিষিদ্ধ করা হল, শহরে পেলেই তাদের শিরশ্ছেদ করা হবে। মেয়েরা অথবা নিচু জাতের লোকেরা আমাদের সনাতন ঐতিহ্যের নির্দিষ্ট প্রথা অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। যদি কেউ তা না করে, তবে তাদের মরতে হবে কুত্তার মতো। প্রত্যেক নাগরিককে তৈরি থাকতে হবে যেন রাজার জন্য যেকোনও মুহূর্তে প্রাণ দিতে পারে তারা। কেননা, রাজাই হলেন মূর্তিমান ভগবান।
এসব কথা যখন হাঁড়িচাচার মতো চিৎকার করতে করতে সোবিদেব বলে চলে তখন ব্রাহ্মণরা তাকে রাজা হিসেবে বরণ করে নেন নানা ধর্মীয় প্রথার মধ্যে দিয়ে। এদিকে তখন পটভূমিতে দেখা যায় আগুনের হলকা। চলতে থাকে লুটপাট, শরণরা প্রাণভয়ে পালাচ্ছে, খুন হচ্ছে তাও দেখা যায়। এসব ছাপিয়ে নকিবরা সোবিদেবের উদ্দেশে ঘোষণা করতে থাকে—
“মহারাজাধিরাজ কালঞ্জর-পুরধীশ্বর গো-ব্রাহ্মণ-প্রতিপালক বর্ণাশ্রমধর্মরক্ষক দুঃস্থশাসন সুবর্ণবৃষভধ্বজ ডমরুতূর্যনির্ঘোষণ কালচূর্যবংশকমলভাস্কর ত্র্যম্বকপাদপদ্মমধুপ পরম-মহেশ্বর প্রতাপ-লঙ্কেশ্বর গিরিদুর্গমল্ল রিপুকরি সংদোহ-সিংহ নিঃশঙ্কমল্ল ভুজবলচক্রবর্তী সোমেশ্বররাজেন্দ্র ভোঃ পরাক্ ভোঃ পরাক্।”
এখানে আমরা বেশ বুঝতে পারি— জন্ম নিল আর এক একনায়ক। এর থেকেও বড় কথা, তৃতীয় দৃশ্যে রাজা বিজ্জল যখন রাজপ্রাসাদে আসেন তখন নকিবরা যে ঘোষণা রাখেন সেখানে কিন্তু রাজা বিজ্জলের আগে গো-ব্রাহ্মণ-প্রতিপালক, বর্ণাশ্রমধর্মরক্ষক প্রভৃতি বিশেষণগুলি বসাননি। নতুন রাজার ক্ষেত্রে তা বসালেন, যা অতীব তাৎপর্যপূর্ণ। একটু যদি তলিয়ে ভাবি তাহলে বেশ বুঝি, সোবিদেবের মতোই বর্তমান ভারতের শাসকদের সঙ্গে এই শব্দগুলির কী নিবিড় আত্মীয়তা।
এ নাটকের ট্র্যাজিক পরিণতি নিঃসন্দেহে আমাকে বিব্রত করে, মনখারাপ করায়। কিন্তু দেশের চারপাশটা যখন মুক্তমন নিয়ে দেখি তখন জাতপাত, সম্প্রদায় নিয়ে যে অমানবিক রাজনীতির ছবি স্পষ্ট হয় তাতে মনে ভয় বাসা বাঁধে। শেষমেশ আবার ওই কল্যাণনগরের মতো আধুনিক ডিজিটাল ইন্ডিয়াও আতঙ্কে ও রক্তস্রোতে ভেসে যাবে না তো! আর তখনই এই মহাকাব্যিক দ্যোতনার নাটকটি আমাকে সচেতন করে।
আগেই বলা হয়েছিল, গিরিশ ‘রক্তকল্যাণ’ লিখেছিলেন ১৯৮৯-তে। এরপর সরযূ-যমুনা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২-এ বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বহুত্ববাদী আমাদের স্বদেশকে ধীরে ধীরে একটি নিদিষ্ট ধর্মের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। গোরু ও হিন্দুধর্মকে সমার্থক করে দেবার মরিয়া প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

একথা ঠিক, গোরু নিয়ে ভারতীয় রাজনীতির চর্চা বহু পুরনো। গো-হত্যা প্রসঙ্গে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী একবার বলেছিলেন : ‘হিন্দুদের যে গো-হত্যা নিষেধ তা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার ধর্ম কীভাবে বাকি সব ভারতীয়দের ধর্ম হতে পারে? যারা হিন্দু নন এ তো তাদের ওপর জোর-জবরদস্তির সামিল হচ্ছে… প্রার্থনার সময় আমরা কোরানের সুরাও পাঠ করে থাকি। কেউ যদি আমাকে তা পাঠ্য করতে বাধ্য করতেন, আমার সেটা মোটেই ভাল লাগত না। কেউ যদি নিজে থেকে রাজি না হন, আমি কীভাবে তাকে গো-হত্যা না করতে বাধ্য করতে পারি? ভারতে যে শুধু হিন্দুরাই রয়েছেন তা তো নয়। এখানে মুসলমান, পার্শি, খ্রিশ্চান এবং অনান্য ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছেন। ভারত এখন হিন্দুদের দেশ হয়ে গিয়েছে এমনটা ধরে নেওয়া ভুল।’

এছাড়া এও দেখছি, দিনের পর দিন এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের উদয় হচ্ছে যারা মনগড়া যুক্তি খাড়া করে, আদাজল খেয়ে হিন্দুধর্মের নামে ক্রমাগত অপব্যাখ্যা করে চলেছেন। যার পেছনে ইতিহাসসম্মত কোনও ভিত্তি নেই। ইতিহাস বলে— ‘হিন্দু’ শব্দটির উৎপত্তি সিন্ধু থেকে। ভারতকে বাকি পৃথিবী চিনত সিন্ধুপারের দেশ হিসেবে। তাই ‘হিন্দু’ বলতে সাধারণত বোঝায়— সিন্ধুপারের বসবাসকারী মানুষের ধর্মকে।

ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছেন : ‘খ্রিস্টান, ইসলাম বা বৌদ্ধ— বিশ্বের এইসব ধর্মের যেমন একজন প্রবর্তক আছেন হিন্দুধর্মের তেমন কোনও প্রবর্তক নেই। প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতের সমস্ত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সাঙ্গীকরণ ও স্বীকরণের মধ্য দিয়ে ক্রমশ গড়ে উঠেছে এই ধর্ম। ফলত মতান্তরের মীমাংসার জন্য এর কোনও বাইবেল, কোরান কিংবা ধর্ম্মপদ নেই। বেদ-উপনিষদ-গীতা, রামায়ণ মহাভারত পুরাণ, তথাকথিত ষড়দর্শন বিষয়ক গ্রন্থাবলী, ভক্তি ধর্মান্দোলনের পদাবলী সাহিত্য, মরমিয়া সাধকের গান— এ সমস্তই প্রামাণ্য আধার, কিন্তু কোনটিই এককভাবে নয়।’
এখানে প্রশ্ন, আজকের দিনে হিন্দুধর্মের স্বঘোষিত গুরুরা ঘোষিত ডিজিটাল ইন্ডিয়াতে বসবাস করেও মানুষের মনে হিন্দুধর্ম নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন কেন? এর উত্তর, কারণটা কায়েমী স্বার্থের, যার ভিত্তি একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর।
এখন সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দিরের কাজ শুরু হয়ে গেছে। আর এখন বিশেষভাবে ‘রক্তকল্যাণ’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র মরমিয়া সাধক বাসবান্নার এই কথাগুলো মনে পড়ে—
“…একটা ইটপাথরের কাঠামো নিয়ে এই হিংসাশ্রয়, —এ তো একেবারে মূর্খতার পরাকাষ্ঠা।
***
বড়লোকে গড়ে
শিবমন্দির
আমি যে গরিব
কী করি?
স্তম্ভ আমার দুই পা, আমার
দেহ মন্দির
মাথা তো স্বর্ণশিখরই।
***
নদীসঙ্গমদেবতা আমার, শোনো—
যা কিছু অনড় হবে চুরমার
স্থায়ী শুধু তাই, গতি আছে যার ভিতরে।”

সূত্র

১. Two plays by Girish Karnad, Oxford।
২. তদেব।
৩. তদেব The Guardian, Lynn Gardner।
৪. অনুবাদ সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়, বহুরূপী পত্রিকা, শেষ সংখ্যা, সম্পাদক : প্রভাতকুমার দাস।
৫. রক্তকল্যাণ, গিরিশ কারনাড, অনুবাদ : শঙ্খ ঘোষ, প্যাপিরাস।
৬. তদেব।
৭. প্রার্থনা প্রবচন, ২৫ জুলাই ১৯৪৭, মহাত্মা গান্ধী, অনুষ্টুপ, সম্পাদক : অনিল আচার্য।
৮. বাঙালির হিন্দুত্ব, শ্রীপর্ণ দত্ত, অনুষ্টুপ।
৯. হিন্দুধর্ম, ক্ষিতিমোহন সেন, বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.