বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

গ্যালোয় থিওরি : বিশেই বিস্ময়

রাত শেষ হতে চলেছে। কালই সম্মুখসমরে নামছেন প্রিয়তমা স্টেফানির পাণিগ্রাহী পেশ্চু ডি হারবিনভিলের সঙ্গে। এ লড়াই আত্মসম্মানের লড়াই। হারলেও তাঁরই জয়। মন বলছে, আজই জীবনের শেষ রাত।

দেবাশিস দে

রাতও যেন আজ তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। না হলে কীসের এত তাড়া। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ফরাসি যুবার মনে উথালপাথাল চলছে। একের পর এক চিঠি লিখে চলেছেন তাঁর প্রিয়জনদের। আজই যে শেষ করতে হবে সব কাজ। সারাজীবনে যা অঙ্ক কষেছেন তা আজ মিলিয়ে নিতে বসেছেন। খাতার মার্জিনে কখনও নোট দিচ্ছেন, কখনও ভুলত্রুটি সংশোধন করছেন। উপপাদ্যের প্রমাণে ফুটনোটে লিখছেন— এখনও কিছুটা বাকি আছে এই প্রমাণ সম্পূর্ণ করতে, আমার হাতে সময় নেই। আজ রাতের মধ্যেই সমস্ত অঙ্ক শেষবারের মতো মিলিয়ে নিতে হবে যে! চিঠি লিখলেন বন্ধু শেভালিয়ারকে। তাঁর সমস্ত গণিত বিষয়ক কাজ যেন বিশ্ববিখ্যাত গণিতবিদ গাউস আর জ্যাকবিকে পাঠানো হয়। হয়তো ওঁরা তাঁর কাজের সঠিক মূল্যায়ন করবেন। রাত শেষ হতে চলেছে। কালই সম্মুখসমরে নামছেন প্রিয়তমা স্টেফানির পাণিগ্রাহী পেশ্চু ডি হারবিনভিলের সঙ্গে। এ লড়াই আত্মসম্মানের লড়াই। হারলেও তাঁরই জয়। মন বলছে, আজই জীবনের শেষ রাত।

এভারিস্তে গ্যালোয় (১৮১১-১৮৩২)।

পরদিন সকাল। ৩০ মে, ১৮৩২। প্যারিসের এক রাস্তায় দু’জনেই খোলা পিস্তল নিয়ে মুখোমুখি। ডি হারবিনভিলের পিস্তলের গুলি যুবকের তলপেট ভেদ করে চলে গেল। তিনি পড়ে রইলেন আহত অবস্থায়। এক চাষি দেখতে পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরদিন কোচিন হাসপাতালে ভাই আলফ্রেডের কোলে মাথা রেখে তিনি চলে গেলেন চিরঘুমের দেশে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে। এভারিস্তে গ্যালোয়। গণিতের একটি বিমূর্ত শাখা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আ্যলজেব্রার দুটি স্তম্ভ— গ্রুপ থিওরি ও গ্যালোয় থিওরি যাঁর হাত ধরে সামনে এসেছিল। আর তাঁর জীবন ছিল নানা তরঙ্গে আন্দোলিত। মধ্যমেধার জ্যামিতিক পরিধি উত্তীর্ণ এক বর্ণময় ট্র্যাজিক চরিত্র। যে জীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে আছে শাসকের বিরুদ্ধে উদ্ধত যৌবনের চ্যালেঞ্জ, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
ফ্রান্স, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ। ফরাসি বিপ্লব শেষ, রাজতন্ত্রের পতন, নেপোলিয়নের নেতৃত্বে সামরিক শক্তির উত্থান। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে তাঁর জয়জয়কার। চরম আগ্রাসন থেকে ১৮১২ সালের এক গ্রীষ্মে রাশিয়া অভিযান। রাশিয়ার অনেক নগরী ধ্বংস হল কিন্তু সম্পূর্ণ জয় এল না। উল্টে বিপর্যয় ডেকে আনল নেপোলিয়ন বাহিনীর। অস্ট্রিয়া, সুইডেন, প্রুশিয়া, রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফ্রান্স আক্রমণ করে বসল। ১৮১৪ সালে যৌথ শক্তি প্যারিস দখল করে নেপোলিয়নকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করল। এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হল তাঁকে। ফিরিয়ে আনা হল রাজবংশের করতত্ব। নেপোলিয়ন কিছুদিনের মধ্যেই নির্বাসন থেকে পালিয়ে পুনরুদ্ধার করলেন ফ্রান্স। এরপর ১৮১৫ সাল, জুন মাস। শুরু হল ভয়ঙ্কর ওয়াটারলুর যুদ্ধ। যুদ্ধে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যৌথ শক্তিতে যোগ দিল ব্রিটেন। পরাজিত হলেন তিনি। ব্রিটিশরা তাঁকে এবার নির্বাসনে পাঠাল পরিত্যক্ত সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। রাজা অষ্টাদশ লুই সিংহাসনে বসলেন।
প্যারিস থেকে দশ কিলোমিটার দূরে একটি ছোট সুন্দর শহর বৌর্গ-লা-রিইন পরিচিত ছিল রানির শহর নামে। ১৮১৫ সালে তার মেয়র নির্বাচিত হলেন নেপোলিয়নের এক অনুগামী নিকোলাস গ্যাব্রিয়েল গ্যালোয়। নেপোলিয়নের প্রথম নির্বাসনের সময় থেকেই শহরের প্রজাতন্ত্রী পার্টির প্রধান তিনি। ওয়াটারলুর যুদ্ধের পর নেপোলিয়ন আবারও নির্বাসনে গেলে তিনি পার্টির প্রধান পদ ছেড়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু বিধি বাম। যাঁর হাতে পদ তুলে দিতে চাইলেন, তিনি দেশত্যাগী হলেন। নিরুপায় হয়ে পদে থেকে গেলেন। নতুন রাজা অষ্টাদশ লুইয়ের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখেই কাজ চালাচ্ছিলেন। কিন্তু শহরের রক্ষণশীল অংশ থেকে এবার আসতে লাগলো নানাবিধ বাধা। তাঁর উদারপন্থী মনোভাব অনেকের স্বার্থে আঘাত করছিল যে।
নিকোলাস গ্যালোয় ও তাঁর স্ত্রী আ্যডিলেড মেরি দেমান্তে দু’জনেই ছিলেন যথেষ্ট শিক্ষিত এবং সম্ভ্রান্ত। সাহিত্য, ধর্ম, দর্শনশাস্ত্রে ছিল অনুরাগ। নিকোলাসের যখন ৩৬ বছর বয়স, জন্ম হল ছোট্ট এভারিস্তের। ২৫ অক্টোবর, ১৮১১। খোলামেলা, হাসিখুশি পারিবারিক আবহে এভারিস্তের বড় হয়ে ওঠা। বাবার রাজনৈতিক কার্যকলাপ শিশু বয়স থেকেই এভারিস্তে প্রত্যক্ষ করে। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের তত্ত্বাবধানে বাড়িতে বেড়ে ওঠা। মা তাঁকে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় যথেষ্ট পারদর্শী করে তোলেন। কিন্তু প্রচলিত ধর্ম সম্পর্কে মায়ের সংশয়বাদ তাকে প্রভাবিত করেছিল। আবার পিতা-মাতার উদারপন্থী মনোভাব তার মুক্তচিন্তার প্রসারে সহায়ক হয়েছিল। ৬ অক্টোবর, ১৮২৩। একটু দেরিতেই বারো বছর বয়সে প্যারিসের নামকরা স্কুল ‘লুইস লে গ্রাঁ’-তে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হল এভারিস্তে। এই স্কুল থেকেই ভিক্টর হুগো, রবেস্পিয়ের মতো ফরাসি ব্যক্তিত্ব পাঠ নিয়েছেন। তাই স্কুলের একটা আলাদা সুনাম ও ঐতিহ্য আছে। প্রথম দু’বছর ভালভাবেই কেটে গেল। বেশ কিছু পুরস্কার এল পড়াশোনার জন্য। ল্যাটিন ভাষায় তার দক্ষতা স্কুলে অনেকের নজর কাড়ল।

লুইস লে গ্রাঁ।

এই সময়েই স্কুলে একটি ঘটনা গ্যালোয়কে নাড়া দিয়ে গেল। বিদ্যালয়ের প্রধান রক্ষণশীল গোঁড়া ধর্মীয় রীতিনীতি ফিরিয়ে আনছেন, এই গুজব কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল। সমস্ত ছাত্রকে যখন আ্যসেম্বলিতে প্রার্থনার জন্য ডাকা হল, তারা আসতে অস্বীকার করল। শিক্ষকদের আদেশ অমান্য করল। সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল, যখন রাজা অষ্টাদশ লুইকে অভিনন্দন জানাতে ছাত্রদের অফিসিয়াল ব্যাঙ্কোয়েটে অংশগ্রহণ করতে বলা হল, তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। স্বভাবতই স্কুলের প্রোভাইসর (বিদ্যালয় প্রধান) স্কুলের শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে চল্লিশজন ছাত্রকে বহিষ্কার করলেন। তিনি সন্দেহ করলেন যে এই চল্লিশজন ছাত্রই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছে, তাই তাদের বহিষ্কার অনিবার্য। গ্যালোয় এসবের সাতে-পাঁচে ছিল না কিন্তু এসব ঘটনা তার শিশুমনে স্কুলজীবনেই গভীর দাগ কেটে গেল। হয়তো বা শুরু ভবিষ্যতের বিদ্রোহী মনের বীজ বপন।
চোদ্দো বছর বয়সে তার প্রথম বার পরিচয় ঘটে গণিতের সঙ্গে। গণিতের প্রথম ক্লাসেই লিজেন্ডরের জ্যামিতি। ঝড়ের মতো পড়ে শেষ করল লিজেন্ডরের ‘এলিমেন্টস দ্য জিওমেট্রি’। তার পর একে একে ল্যাগরাঞ্জের সব পাঠ— ‘রেজলুশন অফ নিউমেরিক্যাল ইক্যুয়েশন’, ‘থিওরি অফ আ্যনালিটিক্যাল ফাংশনস’, ‘লেসনস অন দ্য ক্যালকুলাস অফ ফাংশন’। এভারিস্তে ডুবে গেল গণিতের রহস্যভেদের রোমাঞ্চে। সাহিত্য এবং অন্যান্য বিষয়ে গ্যালোয়ের আগ্রহ একেবারে কমে গেল। সে গণিতে এতই মজে ছিল যে অন্য সব কিছু পড়া একেবারে ছেড়ে দিল। সাহিত্য এবং অলংকারশাস্ত্রের শিক্ষকরা তার ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। তার প্রথম গণিত শিক্ষক ছিলেন এম ভার্নিয়ের। তিনি গ্যালোয়ের গণিতে বিশেষ দক্ষতা ও মেধা লক্ষ করছিলেন। কিন্তু প্রথার বাইরে গ্যালোয়ের পড়াশোনা তাঁকে বিরক্ত করেছিল। তিনি তাঁর ত্রৈমাসিক ফলাফলের রিপোর্ট কার্ডে বার বার গ্যালোয়কে ব্যাকরণ মেনে পড়াশোনা করতে পরামর্শ দেন।
এই সময় ইকোলে পলিটেকনিক ছিল গণিতচর্চার জন্য প্যারিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ১৭৯৪ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় দু’জন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ ল্যাজারে কারনট ও গ্যাসপার্ড মঞ্জের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়। পড়াশোনা করেছেন লিওভিল্লে, লেম, কৌচির মতো প্রবাদপ্রতিম গণিতবিদরা। আবার দেশের প্রয়োজনে কখনও যুদ্ধে, কখনও বা বিপ্লবে যোগ দিয়েছে এখানকার ছাত্ররা। পড়াশোনার পাশাপাশি হয়তো বা বিপ্লবের প্রতি কোনও অজানা আগ্রহ গ্যালোয়কে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে প্রচণ্ড উৎসাহী করে তুলল। স্কুলের পড়াশোনা শেষ হওয়ার এক বছর আগেই, ১৮২৮ সালে ভর্তির পরীক্ষায় বসে গেলেন গ্যালোয়। তিনি তখনও পর্যন্ত গণিতের প্রথাগত বেসিক কোর্সগুলোতে রপ্ত হতে পারেননি। বিনা প্রস্তুতিতে পরীক্ষায় বসার ফল যা হওয়ার তাই হল। তিনি ব্যর্থ হলেন ইকোলে পলিটেকনিকের ভর্তির পরীক্ষায়।
যদিও এই ঘটনায় গ্যালোয়ের নিজের ধারণা হল, তাঁর প্রতি অবিচার হয়েছে। নিজের ওপর গভীর বিশ্বাস যে, তিনি কিছুতেই ব্যর্থ হতে পারেন না। গ্যালোয় হতাশ হলেন না। সেই একই বছরে ভর্তি হয়ে গেলেন লুই পল এমিলে রিচার্ড নামে এক প্রসিদ্ধ গণিত শিক্ষকের কাছে। তিনি গ্যালোয়কে গণিতে উৎসাহ দিতে থাকলেন। এমনকি ঘোষণা করে বসলেন, গ্যালোয়ের যা প্রতিভা তাতে পরীক্ষা না নিয়েই পলিটেকনিক কর্তৃপক্ষের তাঁকে ভর্তি করে নেওয়া উচিত ছিল। এই উৎসাহের ফল হল খুবই ইতিবাচক। অচিরেই গ্যালোয় তাঁর স্যারের মূল্যায়নকে সঠিক প্রমাণিত করলেন।
১৮২৯ সালের এপ্রিল মাসে গ্যালোয় তাঁর জীবনের প্রথম ছোট্ট একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। পেপারটির শিরোনাম ছিল ‘প্রুফ অফ এ থিওরেম অন পিরিয়ডিক কনটিনিউড ফ্যাকশনস’। প্রকাশ পেল ‘আ্যনালেস দ্য জার্গন’ জার্নাল থেকে। এদিকে গ্যালোয় তখন গণিতের অন্য একটি বিষয়ে পড়াশোনায় মগ্ন। ‘থিওরি অব ইকুয়েশন’ তাঁর একটি প্রিয় বিষয়, যা পরে ‘গ্যালোয়স থিওরি’ নামে পরিচিত হবে। মাত্র সতেরো বছর বয়সে, ১ জুন, ১৮২৯ সালে তিনি ‘অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’-এ মৌলিক ঘাতের সমীকরণের সমাধান বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র পাঠালেন। পেপারটির মূল্যায়ন করতে রেফরি নিযুক্ত হলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ লুই কৌচি।
কিছু কিছু ঘটনা থাকে মানুষের জীবনে, যা হতে পারত টার্নিং পয়েন্ট। গ্যালোয়ের পেপারের বিষয়টি কৌচি বেমালুম ভুলে গেলেন। মতান্তরে, হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে অ্যাকাডেমির আর্কাইভে পাওয়া কৌচির লেখা এক চিঠি থেকে জানা যায়, তিনি নাকি পরের বছর জানুয়ারি মাসে অ্যাকাডেমির সভায় গ্যালোয়ের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করবেন ঠিক করেছিলেন। যাইহোক, গ্যালোয়ের জীবনে এই অপ্রকাশিত গবেষণাপত্রটি হতাশা এনে দিল। পেপারটি জমা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে তাঁর হতাশাকে বিপর্যয়ে পরিণত করল তাঁর বাবার অকস্মাৎ মৃত্যু। দিনটি ছিল ২ জুলাই। যে মৃত্যু ছিল গভীর রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার। ক্রমশ গ্যালোয় ঢুকে যাবেন চলমান জীবনের ঘূর্ণাবর্তে, যার গতিপ্রকৃতি হয়তো বা কোনও অজানা মহাশক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
বৌর্গ-লা-রিইনের প্রতিক্রিয়াশীল পুরোহিত সম্প্রদায়ের একজন গ্যালোয়ের বাবার নামে একাধিক স্ক্যান্ডালের অভিযোগ আনলেন। স্বভাবগতভাবে বৌর্গ-লা-রিইনের মেয়র ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র এবং নম্র। তিনি কিছুতেই এইসব নোংরা, মিথ্যে অভিযোগ মানতে পারলেন না। অ্যাপার্টমেন্টে নিজেই নিজের শ্বাসরোধ করে আত্মহত্যা করলেন। দু’পা দূরেই এভারিস্তের স্কুল লুইস লে গ্রাঁ। বাবার মৃত্যুর শোকযাত্রায় সেই পুরোহিত হাজির হলে শহরে প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে উদারপন্থী বিপ্লবের সমর্থকদের দাঙ্গা লেগে গেল। এসব ঘটনা গ্যালোয় সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করলেন আর তাঁর মনের গভীরে বিদ্রোহের বারুদের সঞ্চার ঘটল।
দুঃসময় যেন পিছু ছাড়ে না। গ্যালোয় আবার বসলেন ইকোলে পলিটেকনিকের ভর্তির পরীক্ষায়। এবারও ব্যর্থ হলেন। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত, ইনটিউশন নির্ভর গণিত প্রতিভা, গণিতের অনেক বিমূর্ত ধারণা কীভাবে যেন তাঁর মাথায় চলে আসত। অনেকটা আমাদের দেশের রামানুজনের মতো। স্বাভাবিকভাবেই সবটা পরীক্ষকদের সামনে প্রকাশ করতে পারতেন না। মৌখিক পরীক্ষায় তিনি পরীক্ষকদের কোনও প্রশ্নের উত্তরেই সন্তুষ্ট করতে পারলেন না। পরীক্ষকদের নির্বুদ্ধিতায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের দিকে একটি ইরেজার ছুড়ে মারলেন। দু’বারের ব্যর্থতায় গ্যালোয় বাধ্য হলেন পলিটেকনিকে পড়ার আশা ছাড়তে। ভর্তি হলেন অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ইকোলে নর্মালে।

ইকোলে নর্মালে এবং ইকোলে পলিটেকনিক।

ইকোলে নর্মালে তিনি ভর্তি হলেন ১৮৩০ সালের জানুয়ারি মাসে। আর এই সময়েই কৌচি গ্যালোয়কে পরামর্শ দিলেন অ্যাকাডেমিতে পাঠানো তাঁর পেপারটি নতুন করে সাজিয়ে এবং আরও ফলাফল যোগ করে ব্যাখ্যা করার জন্য। অনুরোধ করলেন পেপারটি একটি বড় পুরস্কারের প্রতিযোগিতায় পাঠাতে, যে প্রতিযোগিতার শেষ দিন ছিল ১ মার্চ। ১৮৩১ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ গ্যালোয় প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ ও পদার্থবিদ ফুরিয়ারকে তাঁর পেপারটি পাঠালেন এই পুরস্কারের জন্য। জোসেফ ফুরিয়ার ছিলেন অ্যাকাডেমির গণিত ও পদার্থবিদ্যা বিভাগের সম্পাদক। এই পুরস্কারের জন্য ফুরিয়ার ছাড়াও বিশেষজ্ঞ কমিটিতে ছিলেন পঁয়স, লিজেন্ডর, পয়েনশট ও আরও কয়েকজন পণ্ডিত ব্যক্তি। কৌচি পেপারটির ভূয়সী প্রশংসা করলেন। লিখলেন, ল্যাগরাঞ্জ যে বীজগাণিতিক সমীকরণের সমাধান ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ, তার সমাধান দিতে পারে গ্যালোয়ের পেপারটি। আরও বললেন, পেপারটি এই বড় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।
এমন সময়ে এপ্রিল মাসে ফুরিয়ারের মৃত্যু আরও বিপর্যয় ডেকে আনল। গ্যালোয়ের পেপার যে জমা হয়েছে এমন কোনও নথির অস্তিত্বই ছিল না। পেপারটি হারিয়ে গেল। গ্যালোয় পুরস্কার পেলেন না । ফলে রাজনৈতিক কারণে পেপার গায়েব হয়েছে বলে তাঁর সন্দেহ হল। এই সন্দেহ পুরোপুরি বাস্তবে প্রমাণিত হল, যখন পরে তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স ফেরত পাঠাতে থাকল, অযৌক্তিক আর অবোধ্য— এই যুক্তি খাড়া করে। এরকম দুর্ভাগ্য আর হতাশা সত্ত্বেও গ্যালোয় এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পেপার প্রকাশ করলেন। যার মধ্যে একটি বিখ্যাত ‘গ্যালোয় থিওরি’-র ভিত্তি গড়ে দেয়। অন্য দুটি ছিল আধুনিক উপায়ে সমীকরণের সমাধান নির্ণয় সম্পর্কিত এবং নাম্বার থিওরি নিয়ে। শেষেরটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখান থেকেই পরবর্তীকালে ফাইনাইট ফিল্ডের ধারণা পাওয়া যাবে ।
১৮৩০ সালের জুলাই মাস। শুরু দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব তথা জুলাই বিপ্লব। তার গনগনে তাপ স্কুলের করিডরে প্রায় ধাক্কা মারছে। ছাত্ররা যাতে রাস্তায় নামতে না পারে তার জন্য ইকোলে নর্মালের ডিরেক্টর গিগনিয়ত স্কুলের প্রধান ফটকে তালা মেরে দিলেন। এই ঘটনা বিদ্রোহীমনা গ্যালোয়কে ভীষণ তাতিয়ে দিল। তিনি স্কুলের উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে রাস্তায় নেমে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিতে চাইলেন। ব্যর্থ হলেন। শাসন যত কড়া, বিদ্রোহের ঝোঁক তত প্রবল। রাজা দশম চার্লস দেশ ছেড়ে পালালেন। নতুন রাজা হলেন তাঁর তুতো ভাই লুই ফিলিপ। রিপাবলিকানদের সঙ্গে গ্যালোয়ের যোগাযোগ বাড়ছিল। ডিরেক্টর গিগনিয়ত সংবাদপত্র ও জার্নালে ছাত্রদের বিরুদ্ধে সরকারের সমর্থনে লিখলেন। এবারে গ্যালোয় বিস্ফোরণ ঘটালেন ওই জার্নালেই সম্পাদকীয় কলমে। তীব্র প্রতিবাদ করে গিগনিয়তের মুখোশ খুলে দিতে চাইলেন ছাত্রদের সমর্থনে। কিন্তু হায়! যে ছাত্রদের অসহায়তার প্রতিবাদ করে তিনি চিঠি লিখলেন, সেই ছাত্ররা গিগনিয়তের প্ররোচনায় গ্যালয়ের বিরুদ্ধে চিঠি দিল। গ্যালোয় বহিষ্কৃত হলেন। প্রথাগত পড়াশোনারও ইতি হল। এবার আর অপেক্ষা নয়। তিনি মুক্ত এখন। সরাসরি রিপাবলিকানদের সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নাম লেখালেন। রাজা চার্লসের তিন প্রাক্তন মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বর মাসে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতির মাঝে জড়িয়ে পড়লেন। রাজা ফিলিপ গ্যালোয়ের আর্টিলারি গোষ্ঠী আইন করে ভেঙে দিলেন।

চিত্রে জুলাই বিপ্লব, ১৮৩০।

সম্পূর্ণ বেকার গ্যালোয় পরের বছর জানুয়ারি থেকে টিউশন পড়ানো শুরু করলেন। চল্লিশজন ছাত্র। কিন্তু গ্যালোয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সেসব কিছুই টিকল না। এদিকে সরকারি বাহিনী থেকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে উনিশজন রক্ষীকে বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে রাজা বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলেন। বিচারে তারা মুক্তি পেলে এক পানশালায় রিপাবলিকানরা জমায়েত হল। রাজার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তখন চরমে। এক হাতে পানীয় গ্লাস ও অন্য হাতে একটা খোলা ছুরি নিয়ে গ্যালোয় সেই ক্ষোভের স্রোতে গলা চড়ালেন। অচিরেই খবর গেল রাজাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন গ্যালোয়। নেমে এল সাজার কোপ। বন্দি হলেন গ্যালোয়।
বিচার শুরু হল। কেউই নির্দিষ্ট করে বলতে পারল না যে সত্যিই সে গ্যালোয়কে দেখেছে রাজাকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে। বিচারক অভিযুক্তের বয়স ও অপরাধের প্রমাণের অভাবে গ্যালোয়কে মুক্তি দিলেন। কিন্তু পরের মাসেই আবার গ্যালোয় বন্দি হলেন। ১৪ জুলাই, ১৮৩১, বাস্তিল ডে। গ্যালোয় নিষিদ্ধ আর্টিলারি গোষ্ঠীর গার্ডের ইউনিফর্ম পরে, হাতে খোলা বন্দুক ও পিস্তল নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে ঘুরে বেড়ালেন। এ যেন রাজা ও তাঁর প্রশাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া। অপরাধে ছ’মাস জেল।
সেইন্ট পেলাজি জেলে থাকতেই গ্যালোয়কে মাদকের নেশা গ্রাস করল। একদিন জেলের বাইরের একটি বাড়ির চিলেকোঠার ছাদ থেকে এক বন্দুকবাজ সেলের মধ্যে গুলি ছুড়লে গ্যালোয়ের পাশের বন্দি গুলিবিদ্ধ হল। গ্যালোয়ের এবার স্থির বিশ্বাস জন্মাল যে তাঁকে হত্যা করতেই এই গুলি চালনা এবং অবশ্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।
এদিকে জেলে থাকলেও গণিতে একাত্মতা তাঁর মননে, চিন্তায় সদা জাগ্রত। কিন্তু ‘অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স’-এর প্রতি তৈরি হয়েছিল এক চরম বিরাগ। তাঁর মনে হয়েছিল, অ্যাকাডেমি তাঁর পেপার কোনওদিনই ছাপবে না। ব্যর্থতা ও বিষণ্ণতায় তিনি নিজেকে বাকি বন্দিদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। হতাশা তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরল। জেলের মধ্যেই একদিন ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন তিনি। সেই সময় একই জেলে বন্দি ছিলেন আর এক ফরাসি বিজ্ঞানী ও উদ্ভিদবিদ ফ্রাঙ্কোইস র্যা স্পাইল। যিনি রাজা লুই ফিলিপের কাছ থেকে ‘ক্রস অফ দি লিজিয়ন দ্য অনার’ সম্মান নিতে অস্বীকার করেন ও রিপাবলিকানদের সমর্থক ছিলেন। তিনি ও অন্য কয়েকজন বন্দি গ্যালোয়কে আত্মহত্যা থেকে বাঁচালেন।
জেল থেকে মুক্তির ঠিক এক মাস আগে গোটা প্যারিসে প্লেগ মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। সংক্রমণ ঠেকাতে সেইন্ট পেলাজি জেলের বন্দিদের সিউর ফল্ট্রিয়ার পান্থশালায় সরানো হল। ২৯ এপ্রিল, ১৮৩২, গ্যালোয় মুক্ত। পরের কয়েক সপ্তাহ গ্যালোয়ের জীবনের ইতিহাস কিছুটা অস্পষ্ট থাকে। আর এই পর্বেই ঘটল যৌবনের রঙিন অঙ্কের সঙ্গে পরিচয়, যা গ্যালয়ের জীবনকে দিতে পারত এক সুখী আনন্দময় জীবনের পরিপূর্ণতা। কিন্তু বদলে তা ডেকে এনেছিল করুণ বিয়োগান্তক পরিণতি। গণিতের এক অমিত সম্ভাবনাময় প্রতিভা অকালে ঝরে পড়েছিল তাঁর মেধার পূর্ণ স্ফুরণের অনেক আগেই।
বন্ধু শেভালিয়ারকে ২৫ মে তারিখের এক চিঠিতে গ্যালোয় জানালেন তাঁর প্রেমে সিক্ত ভগ্ন হৃদয়ের কথা। প্রেয়সী স্টেফানি ফেলিসি। স্টেফানি প্যারিসের এক বিখ্যাত ডাক্তারের মেয়ে। কীভাবে তাঁদের প্রেম শুরু হয়েছিল তা আজও অজানা। স্টেফানি ইতিমধ্যেই প্যারিসের এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে পেশ্চু ডি হারবিনভিলের বাগদত্তা। পেশ্চু এই ঘটনা জানতে পেরে ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি প্যারিসের নামকরা নিশানাবাজ। অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে সহজেই শুটিং ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন গ্যালোয়কে। গ্যালোয় নিশ্চিত ছিলেন এই ডুয়েলের ফল নিয়ে। তাই আগের রাতে বসে গেলেন জীবনের শেষ অঙ্কগুলির সমাধানে। শেভালিয়ারকে লিখলেন—
My dear friend,
I have made some new discoveries in analysis. The first concern the theory of quintic equations, and the others integral functions. In the theory of equations I have researched the conditions for the solvability of equations by radicals; this has given me the occasion to deepen this theory and describe all the transformations possible on an equation even though it is not solvable by radicals. All this will be found here in three memoirs…
গ্যালোয় সহজ ভাষায় বর্ণনা করে লিখে চললেন সেইসব গবেষণাপত্র যা পঁয়স বাতিল করেছিলেন। সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক কাজেরও বর্ণনা, কোথাও বা সংশোধন। গ্যালোয় পাঁচ ঘাত সমীকরণদের দু’ভাগে ভাগ করেছিলেন— সমাধানযোগ্য ও সমাধানযোগ্য নয়। জানিয়েছিলেন, সমাধানযোগ্য পাঁচ ঘাত (সর্বোচ্চ x5 যুক্ত সমীকরণ) সমীকরণদের সমাধান পদ্ধতি এবং তারও বেশি ঘাতযুক্ত সমীকরণদের (সর্বোচ্চ x6, x7,… যুক্ত সমীকরণ) সমাধানের সম্ভাবনা। বিনির্মাণ করে চললেন সম্পূর্ণ নতুন এক গাণিতিক ক্ষেত্রকে যার পুরোটাই হয়তো সেই বিশেষ রাতে লেখা নয়। কিন্তু সব মিলিয়ে যা দিয়ে গেলেন তা পরের একশো বছর গণিতবিদদের ব্যস্ত রাখবে। কিছু পরে উপপাদ্যর প্রমাণে তিনি লিখছেন—
There are a few things left to be completed in this proof. I have not the time.
চিঠিতে আরও লিখছেন—
In my life I have often dared to advance propositions about which I was not sure. But all I have written down here has been clear in my head for over a year, and it would not be in my interest to leave myself open to the suspicion that I announce theorems of which I do not have a complete proof.
Make a public request of Jacobi or Gauss to give their opinions not as to the truth but as to the importance of these theorems.
After that, I hope some men will find it profitable to sort out this mess.
I embrace you with effusion. (E. Galois)
তাঁর শোকযাত্রাও ছিল তাঁর বাবার মতই। রাজনৈতিক র‌্যালির চেহারা নেবে, এই ভেবে আগের দিনই পুলিশ তিরিশজন কমরেডকে গ্রেপ্তার করল। তা সত্ত্বেও প্রায় দু’হাজার রিপাবলিকান শেষযাত্রায় হাজির হয়ে সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিল। তারা সন্দেহ করল, পেশ্চু সরকারি এজেন্ট।
গ্যালোয়ের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আলফ্রেড ও বন্ধু শেভালিয়ার সব গবেষণা প্রবন্ধ একত্রিত করে জ্যাকবি, গাউস ও আরও কয়েকজন গণিতবিদকে পাঠালেন। গ্যালোয়ের মৃত্যুর প্রায় চোদ্দো বছর পর, ১৮৪৬ সালে লিওভিল্লে সেইসব কাগজপত্র থেকে কঠিন পরিশ্রম করে এক সংকলন তৈরি করলেন এবং বিখ্যাত জার্নাল ‘জার্নাল দ্য ম্যাথেমেটিক পিওরস অ্যাট আ্যপ্লিকেস’ থেকে প্রকাশ করালেন। জানা গেল, সমাধানযোগ্য পাঁচ ঘাত সমীকরণের সমাধান পদ্ধতি এবং তারও বেশি ঘাতযুক্ত সমীকরণদের সমাধান সম্ভাবনা। প্রকাশ পেল গ্যালোয় থিওরি। উন্নত হল গ্রুপ থিওরি, যা পরবর্তীকালে ভিত গড়ে দিল গণিতের আধুনিকতম শাখা ‘অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আ্যলজেব্রা’ (Abstract Algebra)-র। আর বিশ্ব সাক্ষী থাকল সমকালীন গণিত ভাবনা থেকে অনেক এগিয়ে থাকা অসামান্য এক গণিত প্রতিভার রাজনীতি, বিপ্লব, উপেক্ষা, আর মেধার দ্বন্দ্বে দীর্ণ ট্র্যাজিক পরিণতির।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.