বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

চাঁদের না-দেখা পিঠ

আলবত ঘোরে। কারণ ঘোরে না এমন কোনও বস্তু নেই মহাবিশ্বে। সূর্য ঘোরে, গ্যালাক্সিও ঘোরে। একদল বিজ্ঞানী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেও ঘুরতে কল্পনা করেন। মোট কথা চাঁদও ঘোরে। তাহলে পৃথিবী থেকে তার অন্য পিঠ দেখা যায় না কেন?

বিমান নাথ

চাঁদ বললে কলঙ্কের কথা মনে পড়বেই। যেন এই দুটি শব্দ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অবশ্য এতে চাঁদকে নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাস মোটেই কমেনি। বরং একে আমরা নজর টিপ হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত। যদিও অনেক সময় চাঁদের এই চেহারা কোনও কবিকে মনে পড়িয়ে দিয়েছে আধপোড়া রুটির কথা। আবার কারও মনে হয়েছে এ যেন ক্ষুধাতুর চুম্বনের দাগ।
চাঁদকে নিয়ে এই তো আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। কিন্তু যদি বলি জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের অন্য এক গল্প শোনাচ্ছে। কৌতূহল হচ্ছে তো? হলফ করে বলতে পারি, সেই গল্প শুনলে চমকে যাবেন। বলছি কী, চাঁদের অন্য পিঠে কিন্তু কলঙ্ক নেই। আর এই সত্যে মোটেই ভেজাল মেশানো নেই।
জানি, আপনাদের মনে একের পর এক প্রশ্ন ভিড় করে আসছে এখন। সেই ধাঁধাগুলোর জবাব দেওয়া যাক একে একে। এক্ষেত্রে অবধারিতভাবে প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগবে, চাঁদের ‘অন্য পিঠ’ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইছি? চাঁদ কি তাহলে একমুখী হয়ে থাকে? পৃথিবীর মতো করে সে ঘোরে না?
আলবত ঘোরে। কারণ ঘোরে না এমন কোনও বস্তু নেই মহাবিশ্বে। সূর্য ঘোরে, গ্যালাক্সিও ঘোরে। একদল বিজ্ঞানী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেও ঘুরতে কল্পনা করেন। মোট কথা চাঁদও ঘোরে। তাহলে পৃথিবী থেকে তার অন্য পিঠ দেখা যায় না কেন? সেরকম হলে ‘চাঁদের অন্য পিঠে কলঙ্ক নেই’ এই কথাটার সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যেত সহজে।

চাঁদের দুই পিঠ– আমাদের দিকে মুখ করে থাকা দিকে কলঙ্ক বেশি (বাঁদিকের ছবি)। ডানদিকে চাঁদের অন্য পিঠের ছবি। (সৌজন্য : NASA)

মুশকিলটা এখানেই। চাঁদের মর্জি। সে শুধু তার একটা দিকই আমাদের দেখতে দেয়। অন্য পিঠটা লুকিয়ে রাখে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। অর্থাৎ, ঘুরছে কিন্তু সবসময় আমাদের দিকে মুখ রেখে। আমাদের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে যত সময় লাগে, ততদিনে নিজের চারদিকেও একবার ঘুরে নেয়। দুষ্টু ছেলে বাতাসা চুরি করে হাত পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। মা যখন বললেন, ঘুরে দেখাতে– তখন সে একবার মায়ের চারদিকে ঘুরে এল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে। দুষ্টু বুদ্ধি আর কি! মা যখন বললেন, তোকে ঘুরে দাঁড়াতে বলেছি, আমার চারদিকে ঘুরতে বলেছি? দুষ্টু ছেলে তখন বলল, আমি দুটোই করেছি কিন্তু! সে জানে যে দুই ঘোরার সময় সমান হলে তার ফল কাটাকুটি হয়ে যায়। তার পেছনে রাখা বাতাসা মা দেখতেই পাবে না!
চাঁদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তার দুই ধরনের ঘোরার হিসেব সমান। দুটোর জন্যই সময় লাগে পাক্কা সাড়ে সাতাশ দিন। এই দুই আলাদা চলনের সময় সমান মাপের, এটা জানার পর আর একটা প্রশ্ন মনে জাগে— কেন এমন হয়? পৃথিবী আর সূর্যের ক্ষেত্রে তো সেরকম হয় না? আমরা সূর্যের চারদিকে এক বছরে একবার ঘুরে আসি, আর পৃথিবী নিজের চারদিকে ঘুরতে সময় নেয় একদিন। কিন্তু চাঁদ আর পৃথিবীর কথা আলাদা। তারা যেন এক মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ। পৃথিবী যেন চাঁদের চাঁদপানা মুখ না দেখে থাকতে পারে না, তাই দুই সহচরী মিলে হাত ধরাধরি করে নাচে।
এটা কাকতালীয় নয়। এর কারণ রয়েছে। পৃথিবী এবং চাঁদ মহাকাশের অন্যান্য বস্তুর তুলনায় অনেক কাছাকাছি। তাই তাদের পরস্পরের দাবিদাওয়ার জেরে নিজেদের গতিবিধিতে নানা রকমের বাধা পড়ে। যেমন, চাঁদের জন্য পৃথিবীতে জোয়ার হয়। কিন্তু পৃথিবীর ঘোরার গতি আর চাঁদের গতি আলাদা মাত্রার। তাই ছন্দপতন হয়। জোয়ারের ঢেউ এসে সমুদ্র উপকুলে আছাড় খায় এবং তখন কিছুটা শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি কমে আসে। খুব ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন আসে, কিন্তু আসে ঠিকই। পৃথিবীর ক্ষেত্রে একশো কোটি বছর ছয় ঘণ্টার মতো তফাত হয় দিনরাতের দৈর্ঘ্যে। আরও বিভিন্ন উপায়ে শক্তিক্ষয় হয়। তাই একসময় সব গতির ছন্দ একরকম হয়ে আসে। যাতে ছন্দপতন না হয়। শক্তিক্ষয় না হয়। চাঁদের ঘূর্ণন আর আবর্তন এইভাবে একই ছন্দে চলে এসেছে। গায়কের তালের সঙ্গে যদি তবলচির তাল না মেলে তখন প্রথমে টানাপোড়েন চলে, তালও কাটে, কিন্তু যদি দু’জনের ধৈর্য থাকে, সদিচ্ছা থাকে, তাহলে একসময় দু’জনে একই তালে চলতে শুরু করেন। পৃথিবী আর চাঁদের যুগলবন্দির মূল কারণ এটাই।
এই যুগলবন্দির জন্যই চাঁদের একটা দিক আমাদের কাছে অধরা থেকে যায়। ধরাপৃষ্ঠ থেকে তার অর্ধেক আমরা কখনও দেখি না। চাঁদে মানুষ গিয়েও কিন্তু অন্য দিকে যায়নি। কারণ নভোচারীদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখা দরকার যাতে গণ্ডগোল দেখা দিলে সঠিক পথ বাতলে দেওয়া যেতে পারে। অন্য দিকে গিয়ে নামলে তাদের পাঠানো সিগন্যাল পৃথিবীতে আসবে না। তাই নীল আর্মস্ট্রং থেকে শুরু করে সব নভোচারী চাঁদের একটি দিকেই নেমেছেন, যেদিকটা আমরা দেখটে পাই। রোবটযানগুলোও। শুধু চিন থেকে পাঠানো মহাকাশযান ২০১৯ সালে প্রথম বার গিয়ে চাঁদের অন্য পিঠে নেমেছে।
অবশ্য চাঁদের মাটিতে না নামলেও এর আগে অনেক মহাকাশযান চাঁদকে প্রদক্ষিণ করেছে। ভারতের পাঠানো চন্দ্রযান-১ সমেত। সেগুলো থেকে ছবি তুলে যা জানা গেছে তা রীতিমত বিস্ময়কর। আর সেই ছবিগুলোই বলছে, অপরপিঠে চাঁদের বড় কোনো কলঙ্ক নেই। যদিও সেদিকও মসৃণ নয় মোটেই, আর মাটিও এবড়োখেবড়ো। গহ্বর আছে, পাহাড়পর্বত আছে কিন্তু বিশাল অঞ্চল জুড়ে কোনও কালো দাগ নেই, যেমনটা আছে আমাদের দিকে মুখ করে থাকা অংশে। রহস্য এখানেই। তাহলে শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকা অংশেই কেন ওই বড় বড় কালো দাগ? যেন পৃথিবীকে সবসময় নিজের কলঙ্ক দেখিয়ে চাঁদ কী একটা জানাতে চায়, মনে করিয়ে দিতে চায়। ভুলতে দিতে চায় না।
এরকম মনে হওয়াটা ঠিক কবির কল্পনা নয়। বিজ্ঞানীরা এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সত্যিই অতীতের কথা ভাবছেন। পৃথিবী এবং চাঁদের উদ্দাম যৌবনের কথা। তবে সেই প্রেমকথায় ডুব দেওয়ার আগে জেনে নেওয়া ভাল, চাঁদের কলঙ্ক আসলে কী? কালো দাগগুলো কীসের তৈরি এবং কবেকার?
প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল যে কলঙ্কের কালো দাগগুলোর পোশাকি নাম যদিও ‘সাগর’, সেখানে কিন্তু একফোঁটা জল নেই। পৃথিবী থেকে দেখতে সাগরের মতো মনে হয়েছিল, তাই এমন নামকরণ। সেটা গ্যালিলিওর সময় থেকেই। কিন্তু অ্যাপোলো নভোচারীরা যখন বিভিন্ন ‘সাগর’ থেকে পাথর নিয়ে এসেছিলেন তখন বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন সেগুলো ব্যাসল্ট, যা একধরনের আগ্নেয়শিলা। যে ধরনের পাথর তৈরি হয় লাভা থেকে। তপ্ত লাভা যখন ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধে তখন ব্যাসল্টের মতো কালো পাথর তৈরি হয়।
এইসব পাথরের বয়সও মাপা হয়েছে। বেশিরভাগ কলঙ্কের কালো পাথরের বয়স মোটামুটি তিন থেকে চারশো কোটি বছর। অর্থাৎ, যে লাভা উদ্গিরণের ফলে এই দাগ লেগেছে চাঁদের গায়ে, সেই অগ্ন্যুৎপাতের জের প্রায় একশো কোটি বছর ধরে চলেছিল। আজ থেকে তিনশো কোটি বছর আগে। কিছু কিছু ব্যতিক্রমী পাথরও পাওয়া গেছে, তবে মোটের ওপর এটাই চাঁদের কলঙ্কের ইতিহাস।
চাঁদের কলঙ্কগুলোকে খুঁটিয়ে দেখলে চাঁদের ইতিহাসের এই পর্যায়ের সপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। সতেরো শতকে এই বিষয়ে প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন রবার্ট হুক, তাঁর ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’ বইয়ে। ইনিই সেই বিজ্ঞানী যিনি প্রাণীর কোষ আবিষ্কার করেছিলেন এবং মহাকর্ষের ধারণার উদ্ভবেও তাঁর অবদান ছিল। কোথাও কোথাও দেখা গেছে ঢিবির আকারের পাহাড়, যেরকম পৃথিবীতেও দেখা যায়। যদি অগ্ন্যুৎপাতের পর লাভা ধীরে ধীরে বয়ে নেমে আসে তাহলে জমাট বাঁধার পর সেই আগ্নেয়গিরিটিকে ঢিবির মতো দেখায়। এও বোঝা যায় যে কোথাও কোথাও লাভাস্রোতে ঢেউ ছিল, কারণ সেগুলো ঠান্ডা হয়ে পাথরের মধ্যে ঢেউ খেলানো আকার নিয়েছে। আমরা এই ধরনের গঠন দেখতে পাই মহারাষ্ট্রের পাহাড়ে। মহাবলেশ্বের বা আশেপাশের কোনও জায়গায় বেড়াতে গেলে চোখে পড়বে পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির মতো দাগ— যাকে বলা হয় ডেকান ট্র্যাপস। লাভা গড়িয়ে পড়তে পড়তে জমাট বাঁধে, তাই পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির মতো দাগ থেকে যায়। ভূতত্ত্বের ভাষায় এর নাম ফ্লাড ব্যাসল্ট। ঠিক সেইরকমই চিহ্ন দেখা গেছে চাঁদের কলঙ্কে। অর্থাৎ, চাঁদের কলঙ্ক আসলে তার আদিম যুগের অগ্নিপর্বের চিহ্ন।

বাঁদিকে মহারাষ্ট্রের পাহাড়ে প্রাচীন লাভাস্রোতের চিহ্ন (ছবি সৌজন্য : ডঃ বিমলেন্দু নাথ), ডানদিকে চাঁদের হেডলি রাইল অঞ্চলে লাভা স্রোতের চিহ্ন (ছবি সৌজন্য : NASA)।

কিন্তু তাহলে চাঁদের অন্য পিঠে সেই চিহ্ন নেই কেন? সেখানে কি আগ্নেয়গিরি ছিল না? সেখানে যদিও ছোটখাটো কয়েকটা কলঙ্কের দাগ আছে, পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকা অংশের মতো চোখে পড়ার নয়। প্রশ্ন হল, কেন এই তফাত? বেশিরভাগ আগ্নেয়গিরি এদিকেই ছিল কেন?
এর উত্তর একটু তলিয়ে দেখা দরকার। আক্ষরিক অর্থেই। কলঙ্কগুলোর মাটির নীচে ঠিক কী আছে সেটা জেনে নিতে হবে আগে। না, খোঁড়াখুঁড়ির দরকার নেই। মাটির অনেক ওপর থেকেই সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ কত শক্তিশালী সেটা মাপা যায়। কয়েকটি মহাকাশযানে রাখা যন্ত্রপাতি চাঁদের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন জায়গায় মাধ্যাকর্ষণের টান কত বেশি বা কম সেটা মেপেছে। আর সেই মাপজোক থেকে আন্দাজ করা যায় মাটির নীচে কত দূর অবধি কী আছে। হয়তো মনে হচ্ছে, মাটিতে কোনও গুপ্তধন লুকোনো থাকলে এই উপায়ে নির্ঘাত খুঁজে নেওয়া যাবে! কিন্তু কে এত ঝক্কি পোহাবে! হয়তো দেখা গেলো মাপজোক করার খরচও উঠে এল না গুপ্তধন আবিষ্কার করে। আর এই মাপ দিয়ে শুধু মাটির নীচের দিকের পদার্থের বিস্তৃতির একটা গড়পড়তা আন্দাজ পাওয়া যায়, যেটা গুপ্তধন খোঁজার জন্য যথেষ্ট নয়।
২০১১ সালে আমেরিকা থেকে পাঠানো দুটি যমজ মহাকাশযান Gravity Recovery and Interior Laboratory (GRAIL)-এর সাহায্যে এই পরীক্ষা করা হয়েছিল। মাপা হয়েছিল চাঁদের বিভিন্ন অংশের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় দুই মহাকাশযানের অন্তর্বর্তী দূরত্ব। চাঁদের কোনও অংশে যদি ভর বেশি থাকে তাহলে সেই অংশের ওপর দিয়ে যে মহাকাশযানটি যাচ্ছে তার ওপর মহাকর্ষের টান বেশি করে পড়বে এবং অন্য মহাকাশযানটি থেকে তার দূরত্ব খানিকটা বেড়ে যাবে।
বিজ্ঞানীরা চাঁদের পিঠে এই মাপজোক করার পর আরও একটি ধাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন, চাঁদের এই দিককার মাটিতে বাইরের স্তর বেশ পাতলা, আর অন্য দিকে পুরু। আগে ধারণা ছিল এই স্তর প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার পুরু। কিন্তু দেখা গেল আসলে তার চেয়ে অনেক কম, ত্রিশ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার। আরও লক্ষ করে দেখা গেছে যে কলঙ্কগুলোতে এই স্তরের গভীরতা খুব কম। প্রায় নেই বললেই চলে। যেমন, ক্রিসিয়াম সাগরে চাঁদের বাইরের স্তর বলে প্রায় কিছুই নেই। বরং এইসব অঞ্চলে চাঁদের অন্দরমহলের পদার্থের সংমিশ্রণ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে এর অর্থ হল, চাঁদের বাইরের স্তরটিকে যেন দুরমুশ দিয়ে পেটানো হয়েছে। ফলে তার গভীরতা কমে গেছে। সেটার জন্য দায়ী যুগ যুগ ধরে এসে পড়া গ্রহাণুর টুকরোগুলো, যেগুলোর আঘাতে তৈরি হয়েছে চাঁদের পিঠের এবড়োখেবড়ো আকার। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, বিশেষ করে চাঁদের কলঙ্কাচ্ছাদিত অঞ্চলে এই স্তরটিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
এই তথ্য দিয়ে চাঁদের দুই দিকের বৈষম্য ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে একটা সূত্র পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা এক নতুন কথা ভেবেছেন। ২০১১ সালের ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে মার্টিন জুতসি এবং এরিক এসফগ এই কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই ধাঁধার সমাধানের জন্য চাঁদের জন্মলগ্নের কথা মনে রাখতে হবে।
শুনতে অবাক লাগলেও, চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন। সৌরমণ্ডলের অন্যান্য গ্রহের উপগ্রহগুলোর তুলনায় চাঁদ একেবারেই আলাদা কিনা, তাই। গ্রহ আর উপগ্রহগুলোর ভর তুলনা করলেই চাঁদের বৈশিষ্ট্য নজরে পড়ে। পৃথিবীর ভরের আশি ভাগের এক ভাগ হল চাঁদের ভর। অন্য সব উপগ্রহের ভর তাদের মূল গ্রহের তুলনায় এর চেয়ে অনেক কম। গ্রহ আর উপগ্রহের মধ্যে ভরের এক স্বাভাবিক অনুপাত থাকে। সেদিক থেকে পৃথিবী-চাঁদের জুটি তেমনই বেমানান। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর জন্মের মুহূর্তে চাঁদ ছিল না, তাহলে তাদের আপেক্ষিক সাইজ এমন বেখাপ্পা হত না। তাঁরা মনে করেন, চাঁদের উৎপত্তি পরে হয়েছে।
চাঁদ সম্পর্কে আর একটি ধাঁধা হল, চাঁদ যেসব জিনিস দিয়ে তৈরি তার সঙ্গে পৃথিবীর বাইরের স্তরের উপকরণের আশ্চর্যজনক মিল! এরকম সাদৃশ্য সৌরমণ্ডলের আর কোনও গ্রহ-উপগ্রহের মধ্যে নেই। এই দুই সূত্র ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়েছে যে, সৌরমণ্ডলের আদি যুগে কোনও একসময় এক বিশাল বস্তু এসে পৃথিবীকে ধাক্কা মেরেছিল। সেই আঘাতের পর পৃথিবীর বাইরের স্তরে এক বড় অংশ বাইরে ছিটকে পড়ে। টুকরো টুকরো হয়ে। তার পর সেই টুকরোগুলো এক জায়গায় এসে জোড়া লেগে তৈরি হয় চাঁদ।
যে বস্তুটি এসে ধাক্কা খেয়েছিল সেটির নাম রাখা হয়েছে থিয়া (Theia)। যখন এই সংঘর্ষ ঘটেছিল তখন সৌরজগতের বস্তুপিণ্ডগুলোর মধ্যে হরদম ঠোকাঠুকি লেগেই থাকত। হয়ত পৃথিবীর কাছেই সেটির জন্ম হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে একসময় টক্কর লাগতই।
জুতসি এবং এসফগ এই প্রসঙ্গে একটি নতুন ধারণা যোগ করেছেন। তাঁদের মতে, পৃথিবী ও থিয়ার সংঘর্ষের ফলে হয়তো একটা নয়, দুটো চাঁদ তৈরি হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটা ছিল খানিকটা বড়। সেটাই এখনকার চাঁদ হয়েছে। কাছাকাছি ঘুরতে ঘুরতে একসময় দুটোর মধ্যে ধাক্কা লেগেছিল। তখনও ‘চাঁদগুলো’-র মাটিতে কাঠিন্য আসেনি। তাদের ভেতরের দিককার পদার্থ তরল ম্যাগমার মতো ছিল, যেমন রয়েছে পৃথিবীর গভীরে। যখন ছোট ‘চাঁদ’ এসে বড়টির ওপর পড়ে তখন দুইয়ে মিলে শেষপর্যন্ত একটি চাঁদ তৈরি হয়। সেই ধাক্কায় অবশ্য খুব একটা জোর ছিল না, কারণ তাদের আপেক্ষিক গতিবেগ কম ছিল। পাশাপাশি ঘুরছিল, তাই। দুটো ট্রেন যখন একই দিকে মুখ করে দুই লাইনে চলে তখন তাদের মধ্যে যেমন আপেক্ষিক গতি কম থাকে, তেমনই। কিন্তু কম জোরের ধাক্কা হলেও পিছন থেকে গুঁতো খাওয়ার ফল এখনও দেখা যায়।
এই ধাক্কার ফলে চাঁদের ভেতরের তরল পদার্থ একদিকে সরে এসেছিল। একদিকে বাইরের কঠিন স্তর হল পাতলা, আর তার উল্টো পিঠের স্তর হয়ে গেল পুরু। যেদিকে এসে ছোট চাঁদটি ধাক্কা দিয়েছিল সেদিকের স্তর হল পুরু। আর অন্য দিকে, যেদিকে ভেতরের লাভা সরে এসেছিল, সেদিক হল পাতলা।
তখন ছিল সৌরমণ্ডলে উল্কাবৃষ্টির যুগ। গ্রহগুলো জন্ম নিয়েছে কিন্তু অসংখ্য বস্তুপিণ্ড পড়ে রয়েছে তখনও। বাড়ি বানানোর পর যেমন বাতিল ইট-কাঠ ইতস্তত পড়ে থাকে, সেইরকম অবস্থা। সেই টুকরোগুলো উল্কার মতো এসে পড়ত গ্রহগুলোর উপর। পৃথিবীর ওপর এবং সদ্যোজাত চাঁদের ওপরেও এসে পড়ত হরবখত।
সেই অবস্থায় চাঁদের যেদিককার বাইরের স্তর পাতলা, সেখানে উল্কাবর্ষণের ফলে সহজেই ভেতরকার লাভা ওপরে উঠে এসেছিল। আবার অন্যদিকে, যেখানে বাইরের স্তর পুরু, সেখানকার ভেতরের লাভা অন্তঃপুরেই রয়ে গিয়েছিল। এইভাবেই চাঁদের দুই দিকের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল বলে এই দুই বিজ্ঞানীর ধারণা।

জুতসি এবং এসফগের ধারণা অনুযায়ী দুটি চাঁদ ধাক্কা লেগে আমাদের বর্তমান চাঁদ তৈরি হয়েছিল বলেই চাঁদের দুই পিঠে বৈষম্য দেখা যায়।

এই পাতলা স্তরের দিকটাই বর্তমানে আমাদের দিকে মুখ করা এবং এইজন্যই চাঁদের এই পিঠে এতগুলো কালো দাগ, কারণ এই দিকেই লাভা বেরিয়ে এসেছিল বড় বড় উল্কাপাতের সময়। অন্দরমহলের লাজুক লাভা বেরিয়ে আসার ফলেই চাঁদের গায়ে লেগেছে কলঙ্কের দাগ।
এই ধারণার সঙ্গে কলঙ্কের অঞ্চল থেকে পাওয়া পাথরের বয়সের হিসেব মিলে যায়। তিন থেকে চারশো কোটি বছর আগে চাঁদে প্রচণ্ড উল্কাবর্ষণ হয়েছিল। অর্থাৎ, তখনই লাভা বেরিয়ে এসে জমাট বেঁধেছিল। তাই পাথরগুলোর বয়সও সেইরকম পাওয়া গেছে।
চাঁদের পিঠে উল্কাবর্ষণের এই পর্যায় সম্বন্ধে কীভাবে জানতে পারলেন বিজ্ঞানীরা? কিছু তথ্য এসেছে ষাটের দশকের পর নভোচারীরা চাঁদ থেকে যেসব পাথর কুড়িয়ে এনেছিলেন, সেগুলোর মাপজোক থেকে। দেখা গেছে যে চাঁদের বিশাল গহ্বরগুলো খুব কম সময়ের মধ্যে তৈরি হয়েছিল— ৩৮০ থেকে ৩৯০ কোটি বছর আগে। ইম্ব্রিয়াম সাগরের বয়স ৩৮৫ কোটি বছর, সেরেনিট্যাটিস-এর ৩৮৭ কোটি, ক্রিসিয়াম ৩৮৭-৩৯০ কোটি, ওরিয়েন্টাল ৩৮৫ কোটি এবং নেক্টারিস সাগরের বয়স ৩৯২ কোটি বছর।
অর্থাৎ মাত্র ১০ কোটি বছরের ব্যবধানে এই কলঙ্কগুলো তৈরি হয়েছিল। তিন-চারশো কোটি বছরের তুলনায় ১০ কোটি বছরের ব্যবধান কিছুই নয়। তাই যে ঘটনার এই গহ্বরগুলি তৈরি হয়েছিল তাকে একধরনের আকস্মিক ঘটনা বলা যেতে পারে। অর্থাৎ হঠাৎ কিছু একটা ঘটেছিল যার জন্য দুদ্দাড় করে এই বড় আকারের গহ্বরগুলো তৈরি হয়েছিল। এই তথ্য জানার পর হয়তো পূর্ণিমার চাঁদ দেখে পুলকিত হওয়ার বদলে চাঁদের কলঙ্কগুলো সৃষ্টির ভয়াবহ দিনের কথা ভেবে গায়ে কাঁটা দেবে। কারণ, চাঁদের মুখের ছবি এখনও সেই আকস্মিক বিপর্যয়ের স্মৃতি বয়ে চলেছে।

চাঁদের বড় গহ্বরগুলোর বয়স।

মনে রাখা উচিত এই গহ্বরগুলো খুব বড়। এক একটির ব্যাস প্রায় হাজার কিলোমিটার। তাদের প্রত্যেকটির ক্ষেত্রফল ভারতবর্ষের চার ভাগের এক ভাগ প্রায়। অর্থাৎ, এক একটি গহ্বর তৈরির সময় যে উল্কাপাত হয়েছিল তার ফল নিশ্চয়ই বিধ্বংসী ছিল এবং প্রত্যেকবার এক তোলপাড় করা ঘটনা ঘটেছিল চাঁদে। আর এইসব উল্কাপাত যদি মোটামুটি একই সময়ে হয়ে থাকে তাহলে তাদের মিলিত রূপ ভয়ঙ্কর হওয়ার কথা।
বিজ্ঞানীরা তাই এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে আজ থেকে ৩৮০-৩৯০ কোটি বছর আগে চাঁদে প্রচণ্ড পরিমাণে উল্কাপাত হয়েছিল। পৃথিবীতেও নিশ্চয়ই হয়েছিল, কারণ চাঁদ আর পৃথিবী খুব কাছাকাছি। একের ওপর অত্যাচার হলে অন্যটির রেহাই পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু পৃথিবীর ওপর সেই অত্যাচারের চিহ্ন হারিয়ে গেছে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ু সেই দাগ ধীরে ধীরে মুছে দিয়েছে। চাঁদে জলবায়ু নেই। তার স্মৃতি তাই অক্ষত। চাঁদের কলঙ্কের দিকে তাকিয়ে সেই মুছে যাওয়া দিনগুলির কথা মনে পড়ে আমাদের।
এই প্রচণ্ড উল্কাপাতের যুগের নাম দেওয়া হয়েছে Late Heavy Bombardment Era। এখনও এই ঘটনার কারণ এবং প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে। আর সেই গবেষণা থেকে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা খুব চমকপ্রদ। যেমন, এই আকস্মিক উল্কাবর্ষণের চিহ্ন শুধু চাঁদেই নয়, মঙ্গলেও পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, সৌরমণ্ডলের বাইরে একটি প্রতিবেশী নক্ষত্রের গ্রহমণ্ডলেও এমন একটি ঘটনার আভাস পাওয়া গিয়েছে। কর্ভাস নক্ষত্রমণ্ডলীর অন্তর্গত একটি নক্ষত্র, যার নাম ইটা কর্ভি (Eta Corvi)— আমাদের আকাশে চিত্রা নক্ষত্রের পাশেই এর অবস্থান, পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ, সেখান থেকে আলো আসতে সময় নেয় ৫৯ বছর। ভরের দিক দিয়ে নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে দেড় গুণ বড় এবং প্রায় পাঁচ গুণ বেশি উজ্জ্বল। এর চারদিকে একটি চাকতির আকারে ধুলোবালি এবং বস্তুপিণ্ড ছড়ানো রয়েছে, যেগুলো থেকে বিকিরিত অবলোহিত আলোর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তার অস্তিত্ব জানতে পেরেছেন। সবচেয়ে মজাদার কথা হল, এই চাকতির ভেতরের দিকের অংশে বিশেষ ধুলোবালি নেই। অর্থাৎ, সেই অংশে গ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে সেখানকার ধুলোবালি এবং ছোটখাটো বস্তুপিণ্ড আর পড়ে নেই। ২০১১ সালে ক্যারি লিসে এবং তাঁর সহকর্মীরা এই গ্রহমণ্ডলে আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কিছু চমকপ্রদ ব্যাপার লক্ষ করেছিলেন।

শিল্পীর কল্পনায় ইটা কর্ভির গ্রহমণ্ডলে উল্কাবর্ষণের যুগ (সৌজন্য: NASA)

এক একটি নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য অনুযায়ী তার চারদিকে এক বিশেষ দূরত্ব থাকে যেখানকার তাপমাত্রা তরল জলের পক্ষে অনুকূল। এই অঞ্চলকে ‘বাসযোগ্য অঞ্চল’ বলা যেতে পারে। এই অঞ্চলে কোনও গ্রহ থাকলে তার মধ্যে প্রাণের আবির্ভাব সম্ভব। এর চেয়ে দূরে থাকলে জলের বদলে থাকবে বরফ এবং এর চেয়ে নিকটবর্তী হলে জল বাষ্পীভূত হবে। তাই সব নক্ষত্রের চারদিকে একটি অঞ্চল কল্পনা করা যায় যা প্রাণের পক্ষে অনুকূল। ইটা কর্ভির ক্ষেত্রে এই দূরত্ব পৃথিবী-সূর্যের দূরত্বের চেয়ে তিন গুণ বেশি, কারণ নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। ইটা কর্ভির চারদিকে এই অঞ্চলে বিজ্ঞানীরা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ধুলোবালির চিহ্ন পেয়েছেন, যার মধ্যে জল এবং কার্বনের মিশ্রণ রয়েছে। ধুলোর পরিমাণ থেকে তাঁরা অনুমান করেছেন যে এর উৎস হল আমাদের সৌরমণ্ডলের নেপচুনের বাইরের দিকের বস্তুপিণ্ডের মতো কোনও বস্তু। যেগুলো আমরা জানি ধুলোমাখা বরফ দিয়ে তৈরি। তাঁদের মতে, খুব সম্ভবত ইটা কর্ভির গ্রহমণ্ডলের বাইরের দিকেও আমাদের সৌরমণ্ডলের মতো ধুলোমাখা বরফপিণ্ড রয়েছে। হয়তো সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি ভেতরের দিকে ছিটকে পড়ার পর সেখানকার কোনও গ্রহের সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্রচুর পরিমাণে জল, ছাই, মাখা ধুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
তাহলে কি ওই গ্রহমণ্ডলের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থিত কোনও গ্রহের ওপর এই মুহূর্তে (অর্থাৎ ৫৯ বছর আগে) উল্কাবর্ষণ চলছে? যেরকম হয়েছিল চাঁদ এবং পৃথিবীর শৈশবে?
এই পর্যবেক্ষণ থেকে আমাদের সৌরমণ্ডলের জন্মলগ্নে উল্কাবর্ষণের কারণ সম্বন্ধে কিছু আভাস পাওয়া যায়। চারশো কোটি বছর আগেকার উল্কাবর্ষণের জন্য দায়ী উল্কাগুলোর সম্ভাব্য উৎস দুটি। এক হল মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যবর্তী অঞ্চলের গ্রহাণুগুলো, অথবা নেপচুনের কক্ষপথের বাইরের বস্তুপিণ্ডগুলো। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, সৌরমণ্ডলে এভাবে হঠাৎ করে আঘাত হানার জন্য গ্রহাণুগুলি দায়ী নয়। কারণ সেখান থেকে ছিটকে পড়া গ্রহাণুদের হার হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া এবং কমা সম্ভব নয়। বরং ইটা কর্ভির গ্রহমণ্ডলের মতো নেপচুনের বাইরের দিকের বস্তুপিণ্ডের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
একদল বিজ্ঞানীর মতে, ইউরেনাস এবং নেপচুন তৈরি হতে বেশ কিছুটা সময় নিয়েছিল। অন্য গ্রহগুলো তৈরি হওয়ার ৫০-৬০ কোটি বছর পর তাদের জন্ম। কারণ সৌরমণ্ডলের বাইরের দিকে গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়া ঢিমেতালে চলছিল। সেখানে বস্তুপিণ্ডের ভিড় নেই। একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে বড় আয়তনের বস্তু হওয়ার সম্ভাবনা কম। অতএব এমন হতে পারে যে নেপচুন তৈরি হওয়ার সময় সেটি তার বাইরের ছোটখাটো বস্তুপিণ্ডের ওপর মহাকর্ষের জোর দেখাতে শুরু করেছিল। ফলে এইসব বস্তুপিণ্ড সৌরমণ্ডলের অন্দরমহলে ঢুকতে শুরু করে। এখনও এমন ঘটনা ঘটে, যখন ধূমকেতুগুলো ভেতরের দিকে ছুটে আসে। কিন্তু শুরুর দিকে, যখন নেপচুন সবেমাত্র গ্রহের মর্যাদা পেয়ে দাদাগিরি ফলাতে শুরু করেছে, তখন হয়তো এরজন্যই পৃথিবী এবং চাঁদের ওপর উল্কাবর্ষণের হার হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছিল।
আবার ভিন্ন মতো পোষণ করেন কিছু বিজ্ঞানী। তাঁদের মতে, ইউরেনাস এবং নেপচুন তাদের বর্তমান কক্ষপথে তৈরি হয়নি। তাদের জন্মমুহূর্তের কক্ষপথ ছিল আরও ভেতরের দিকে। ধীরে ধীরে তারা বাইরের দিকে সরে গিয়েছে। গ্রহদের মধ্যে এমন দূরে সরে যাওয়া বা কাছে চলে আসা অসম্ভব নয়। প্রত্যেকটি গ্রহের সঙ্গে অন্যান্য গ্রহের মহাকর্ষের মাধ্যমে পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া চলতেই থাকে। এর ফলে তাদের কক্ষপথ বদলাতে পারে। যদিও এই ধরনের পরিবর্তন খুব ধীরগতিতে হয়, লক্ষ-কোটি বছর ধরে।
এমনও হতে পারে যে ৩৮০-৩৯০ কোটি বছর আগে যখন ইউরেনাস এবং নেপচুন ধীরে ধীরে বাইরের দিকে যাচ্ছিল তখন তাদের পথে ছড়িয়ে থাকা বস্তুপিণ্ডগুলোকে ছিটকে সরিয়ে দিচ্ছিল। সৌরমণ্ডলের ভেতরের দিকে তার ফল হয়েছিল সাংঘাতিক। চাঁদের ওপর লেগেছিল কলঙ্কের দাগ। আর যেহেতু আমাদের দিকে মুখ করে থাকা অংশে তার বাইরের স্তর ছিল পাতলা, তাই এই দিকে মাটির নীচের লাভা সহজেই বেরিয়ে পড়েছে। কালো দাগ পড়েছে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকা অংশে।
চাঁদের এপিঠ-ওপিঠ নিয়ে আলোচনা শুরু করে পিঠোপিঠি আরও অনেক কথা চলে এসেছে। সৌরমণ্ডলের বাইরের দিকের গ্রহ তৈরির কথা। দূর নক্ষত্রের চারদিকে গ্রহমণ্ডলের কথাও। পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় মোহিত হয়ে আমরা যখন চাঁদের দিকে তাকাই তখন হয়তো এইসব বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং তত্ত্বকথা মনে নাও থাকতে পারে। মনে হতে পারে বিজ্ঞানের কচকচি আমাদের সৌন্দর্য উপভোগে বাধা দেবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আমরা যদি চাঁদের কলঙ্কের দিকে তাকিয়ে অতীতের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা ভাবি তাহলে চাঁদ আমাদের কাছে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ নিয়ে দেখা দেয়। সেই অনুভূতিও অতুলনীয়।

মতামত জানান

Your email address will not be published.