বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

চেরির স্বাদ, বারুদের গন্ধ : ইরানের সিনেমা

ইরানীয় ছবিতে আসলে এক অপূর্ণতা থাকে। সেই অপূর্ণতাই বোধহয় ইরানীয় ছবির সম্পদ। যেখানে ইরানীয় ছবির শেষ, সেখানেই যে ছবি দেখে ফিরে যাওয়া দর্শকের সঙ্গে পরিচালকের ভাবনার নবতর সংলাপের শুরু।

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

এখনও অবধি ইরানীয় ছবির ইতিহাসে পুরোধাপুরুষ হিসেবে যিনি বিচার্য হবেন তিনি নিঃসন্দেহে আব্বাস কিয়ারোস্তামি। ১৯৪০ সালের ২২ জুন তেহরান শহরে জন্ম। মৃত্যু ৪ জুলাই, ২০১৬ তারিখে প্যারিসের এক হাসপাতালে। ছিয়াত্তর বছরের জীবন, তারই মধ্যে সাবালক করে দিয়ে যাওয়া জাতির সিনেমাকে। কিয়ারোস্তামি কেবলই চিত্রপরিচালক ছিলেন না, একাধারে তিনি ছিলেন চিত্রকর, চিত্রনাট্যকার, আলোকচিত্রী ও কবি। যৌবনবেলায় তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন আর্টস নিয়ে পড়াশোনার জন্য অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনে তিনি ট্রাফিক পুলিশেরও চাকরি করেছেন। তিনিই ইরানীয় সিনেমায় নতুন ঢেউয়ের প্রবর্তক। ১৯৭০ সালে আব্বাস কিয়ারোস্তামি ‘দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি’ নামে স্বল্পদৈর্ঘ্যের একটি (মাত্র ১২ মিনিটের) নতুন ধারার ছবি নির্মাণ করেন। তখন কিয়ারোস্তামির ইউনিটের একমাত্র ক্যামেরাম্যান ছাড়া আর সকলেই ছিলেন ফিল্ম দুনিয়ায় নবাগত। কাজেই ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে পরিচালকের নিত্য খিটিমিটি বাঁধত। বাঁধাধরা নিয়মে এতকাল ধরে ক্যামেরাম্যান যা যা শিখে এসেছিলেন, এই নবাগত পরিচালক যে তার সব কিছুকেই মাটি করতে চাইছেন; এমনটাই সেদিন ধারণা হয়েছিল পোড়খাওয়া চিত্রগ্রাহকের। অনেক ভাগ্যক্রমে সেদিন শেষ অবধি পরিচালকেরই জিত হয়েছিল। ‘দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি’ প্রত্যক্ষ করার পরে পরেই বিদগ্ধ মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছিল নতুন এই কাজটির বিষয়ে। ইরানীয় সিনেমাতে সেই ছিল এক নতুন যুগের সূত্রপাত।
কিয়ারোস্তামির সঙ্গে কুরোসাওয়া অথবা সত্যজিৎ রায়ের তুলনা করা হয়। তাঁর সিনেমায় অনায়াসে সঙ্গীত, চলচ্চিত্র এবং কবিতা মিশে যায়— এককথায় বলতে গেলে এই কিয়ারোস্তামির সিনেমা। সেখানে জীবনের সরলতা আর নিত্যদিনের জটিলতা পাশাপাশি হাত রেখে এগোয়। সিনেমার বাস্তবতার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে এক সমান্তরাল জগতে দর্শক হারিয়ে যান, সবসময় তা ঠাহর করে ওঠা যায় না। একাধিকভাবে তাঁর ছবিগুলিকে বর্ণনা করা চলে, ব্যাখ্যা করা চলে। তবুও দিনের শেষে দর্শকের মনে লেগে থাকে এক চেরির মিষ্টতা।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি।

কিয়ারোস্তামি প্রথম আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমাদৃত হয়ে ওঠেন ১৯৮৭-তে। ছবির নাম ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম?’। পারসিক কবি সোহরাব সেফেরির একটি কবিতার পঙ্‌ক্তি থেকে সিনেমার এই নামকরণ। দুটি ইরানি গ্রাম। এক বন্ধু চলেছে তার আর এক বন্ধুকে স্কুলের একটি নোটবই ফিরিয়ে দিতে। ছবির চেয়েও সুন্দর দৃশ্যপট, পরতে পরতে লেগে রয়েছে ইরানীয় গ্রামীণ জীবন। ইরানীয় সঙ্গীত আর কবিতার মতোই এক মনোমুগ্ধকর অনুভূতি। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন এই ছবি থেকেই কিয়ারোস্তামির ‘কোকের ট্রিলজি’-র সূত্রপাত। যে সিরিজের আরও দুটি ছবি হল, ‘লাইফ অ্যান্ড নাথিং মোর’ (১৯৯২) এবং ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’ (১৯৯৪)। অসাধারণ এক জ্যামিতিক নির্মিতি উঠে এসেছে এই তিনটি ছবির মধ্যে। তারই সঙ্গে উঠে এসেছে ১৯৯০ সালে ইরানের সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের দুঃসহ স্মৃতির উল্লেখ। যে ভূমিকম্পের ফলে ইরানে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ৫০ হাজার সাধারণ মানুষ।
জ্যামিতিক নির্মিতির বিষয়ে এখানে আলাদা করে একটু বলা প্রয়োজন। ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম?’ থেকে যে ট্রিলজির সূত্রপাত, দ্বিতীয় ছবি ‘লাইফ অ্যান্ড নাথিং মোর’-এ দেখা যাচ্ছে ইরানীয় পটভূমিতে একটি আঁকাবাঁকা চলে যাওয়া সুদূরের যাত্রাপথ। যে ছবিটিকে দেখেই একজন চিত্রপরিচালকের মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁর পুরনো দিনে বানানো একটি ছবির কথা। সেই ছবিটিই আসলে ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম?’। পরিচালকের মনে হচ্ছে ভূমিকম্পের পরে কেমনই বা আছে তাঁর সেই গ্রামের বাসিন্দারা যেখানে তিনি তাঁর সিনেমার শ্যুটিং করেছিলেন। আবারও তাই তাঁর পুত্রের সঙ্গে তিনি খানিকটা উদাসীনভাবেই পথে বেরিয়ে পড়ছেন ভূমিকম্পের পরের সেই গ্রামের খবর নেওয়ার প্রচেষ্টায়। সেখানে গিয়ে তাঁর দেখা হচ্ছে গ্রামের মানুষদের সঙ্গে। দু’জন নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে, যারা ভূমিকম্পের ফলে আত্মীয়স্বজনদের প্রায় সকলকে খোয়ানোর পরেও বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে আবারও এক নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে। তাঁর সঙ্গে আরও দেখা হয়ে যাচ্ছে পূর্বোক্ত ছবিটিতে অভিনয় করা এক শিশুশিল্পীর সঙ্গে, যে কিনা তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে এক তাঁবুতে যেখানে বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার চলছে। প্রতিবেশী গ্রামের উদ্বাস্তুরাও সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে।
এমন অজস্র রংবেরঙের ফ্রেমের সমাহারে ফুটে উঠছে এক জীবনের গল্প, একাধিক জীবনের গল্প। নববিবাহিত যে দু’জনের সঙ্গে পরিচালকের দেখা হয়ে যাচ্ছে এই সিনেমায়, সেই নববিবাহিত দু’জনকে নিয়ে গড়ে তোলা একটি বিশেষ দৃশ্যকেই আবারও সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হবে ট্রিলজির তৃতীয় ছবিতে। ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’-এ (১৯৯৪) উঠে আসবে তাঁদের বিবাহ-পূর্ববর্তী জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস। কবিতা ও জ্যামিতির এক অনায়াস চলন ও গমন। এমনটাই কিয়ারোস্তামির বৈশিষ্ট্য। যদিও পরিচালক নিজে এই তিনটি ছবিকে ট্রিলজি হিসেবে মনে করেননি। তাঁর কথায়, ‘লাইফ অ্যান্ড নাথিং মোর’ এবং ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’ ছবির সঙ্গে ‘টেস্ট অব চেরি’ (১৯৯৭) জুড়লে তবেই তাকে একটি সার্থক ট্রিলজি বলা চলে। তাঁর মতে, এই ট্রিলজিতে উঠে এসেছে জীবন ও অস্তিত্বরক্ষার উপাখ্যান। ‘টেস্ট অব চেরি’ নিয়ে সবশেষে আলোচনা করতে চাইব। এখন বরং কিয়ারোস্তামিকে ছাড়িয়ে খানিক দূর এগিয়ে যাই।
২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস। ইরানীয় আদালত রায় দিয়ে জানাল, চিত্রপরিচালক জাফর পানাহি দেশের বিরুদ্ধে প্রচার-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কাজেই ছ’বছরের সশ্রম কারাবাস, কুড়ি বছরের জন্য সিনেমা থেকে নির্বাসন ও স্বাস্থ্যগত কারণ অথবা হজযাত্রার উদ্দেশ্য ব্যতীত ইরানের বাইরে তাঁর যাওয়া নিষেধ। উচ্চতর আদালতে আপিল করলেন পানাহি। তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হল। সেই অবস্থাতেই আস্ত একটি সিনেমা বানিয়ে ফেললেন কিয়ারোস্তামির অন্যতম প্রিয় এই ছাত্র। একটি কেকের ভেতরে ছোট্ট একটি ইউএসবি ড্রাইভের সাহায্যে সেই ছবি পাড়ি দিল ইরান ছাড়িয়ে ইওরোপে। ২০১১ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হল জাফর পানাহির ছবি ‘দিস ইজ নট এ ফিল্ম’। এর পর ২০১৩ ও ২০১৫-তে গৃহবন্দি দশা, আদালত-আপিল ইত্যাদির জন্য ছুটোছুটির মধ্যেই পানাহি বানিয়ে ফেললেন সাম্প্রতিককালের মধ্যে তাঁর অন্যতম দুটি আলোচিত ছবি ‘ক্লোজড কার্টেন’ ও ‘ট্যাক্সি’। দ্বিতীয় ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়, গোল্ডেন বেয়ার সম্মান লাভ করে। তবে পরিচালক হিসেবে পানাহির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল অনেক আগেই, গুরু আব্বাস কিয়ারোস্তামির হাত ধরে।

জাফর পানাহি।

প্রিয় ছাত্র পানাহিকে ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’ ছবির জন্য সহকারী পরিচালক হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন কিয়ারোস্তামি। সেই ছবির সেটেই আলোচনা প্রসঙ্গে মাস্টারমশাইকে ছাত্র শুনিয়েছিলেন তাঁর মনের মধ্যে চলতে থাকা নতুন একটি পরিকল্পনার কথা। উল্লসিত মাস্টারমশাই বলেছিলেন সেই ছবিটির চিত্রনাট্যকার হবেন তিনি স্বয়ং। বাস্তবেও তাই হয়েছিল। আব্বাস কিয়ারোস্তামির চিত্রনাট্যে, জাফর পানাহির পরিচালনায় ১৯৯৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’। ইরানীয় ছবিতে শিশুশিল্পীদের ব্যবহার বিশেষ উল্লেখযোগ্য, আর সেই সূত্রে পানাহি-কিয়ারোস্তামি বা নতুন যুগের অন্যান্য অনেক ইরানীয় চিত্রপরিচালকদেরই বিশেষত্ব হল পেশাদার নয়, একেবারে নবাগত অথবা অভিনয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন মানুষদের তাঁদের ছবিতে ব্যবহার করা। হয়তো এই কারণেই ইরানীয় সিনেমায় সামগ্রিকভাবে একটি বাস্তব চিত্র উঠে আসে। এক স্বাভাবিকতার বিচ্ছুরণ হয়। ইরানীয় ছবিতে বাজতে থাকা এক একটি তারবাদ্য, তালবাদ্য অথবা বাঁশির সুর আর সেইসঙ্গে শহর অথবা গ্রামের স্পষ্ট চিত্রায়ন এক অদ্ভুত আবেশের সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে কিয়ারোস্তামি অথবা পানাহির ছবিতে দেখা যায়, ছবির মূল দৃশ্যায়নটিই হচ্ছে একটা গাড়ির মধ্যে, জানলা দিয়ে বাইরের পৃথিবীকে যেমনটা দেখায়— দর্শক ঠিক সেই চোখেই যেন বা ইরানকে দেখছে। মিনিম্যালিস্ট হয়ে ওঠবার এক সার্থক প্রচেষ্টা, কিন্তু তারই সঙ্গে জুড়ে আছে মৌলিকত্বের ছোঁয়া। ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’-এর সেই শিশু অভিনেতাটি অথবা আফগান উদ্বাস্তু ছেলেটির চরিত্রে অভিনয় করা কিশোরের ক্যামেরার সেই বিশেষ এক একটি কৌণিক অবস্থানে এক একটি দৃষ্টিপাত মনে থেকে যাবে। নামানো শাটারের ওপর একখানি বাঁশের লাঠিতে জেগে থাকবে সাদা একটি বেলুনের দৃশ্যপট।
এর পর পানাহির নির্মাণ ‘দ্য মিরর’ (১৯৯৭) ও ‘দ্য সার্কল’ (২০০০)। প্রথম ছবিটিতেও বিশেষভাবে লক্ষণীয় শিশু অভিনেতাদের অভিনয় এবং সব বয়সের দর্শকদের জন্যই উপযোগী একটি গল্পের উপস্থাপনা। কিন্তু ‘দ্য সার্কল’ থেকেই ক্রমশ বিদ্রোহী হয়ে উঠতে শুরু করেন জাফর। এই ছবিতে উঠে আসে মুসলিম শাসনাধীন ইরানে মেয়েদের অবস্থার কথা। ৫৩ দিন সময়ের মধ্যে, ৩৫ দিনের একটি হাড়ভাঙা শ্যুটিং শিডিউলে ছবিটি সমাপ্ত হয়। এই ছবিটির উদ্বোধনী দৃশ্যেই ইরানীয় ছবির সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে ভেঙে এক অন্য নতুনত্বের ছোঁয়া এনে দিতে চেষ্টা করেন পরিচালক। ছবিটি ইরানে নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়। ছবিটির অনেকগুলি কপি তৈরি করে পরিচালক সেসব সারা ইরানে ছড়িয়ে দেন।
২০০৩ সালে পানাহি নির্মাণ করেন ‘ক্রিমসন গোল্ড’, এক পিৎজা ডেলিভারি বয়ের হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠবার আকাঙ্ক্ষা থেকে একটি সোনার দোকান লুঠ করতে যাওয়ার গল্প। শোনা যায়, কিয়ারোস্তামির কাছ থেকেই প্রথম এই গল্পটির বিষয়ে অনুপ্রেরণা পান জাফর। পরে তিনিই উৎসাহী হয়ে উঠে ছবিটি নির্মাণ করেন। গুরু কিয়ারোস্তামি আবারও ছাত্রের প্রয়োজনে চিত্রনাট্যকারের দায়িত্ব নেন। ‘দ্য সার্কল’-এর মতোই ‘ক্রিমসন গোল্ড’-ও ইরানে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
এর পর ২০০৬ সালে পানাহি নির্মাণ করেন এযাবৎকাল অবধি তাঁর সবচেয়ে আলোচিত ছবি ‘অফসাইড’। ইরানীয় মেয়েদের ফুটবল খেলা দেখার ওপরে তখন নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। ‘অফসাইড’-এ পানাহি তুলে আনেন একদল ইরানী মেয়েদের উপাখ্যান, যারা কিনা বাড়ির অমতে দলবেঁধে পুরুষের ছদ্মবেশে তেহরানের আজাদি স্টেডিয়ামে ইরান বনাম বাহরেনের বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ালিফায়িং ম্যাচ দেখতে এসেছেন। ছবিটির শ্যুটিংয়ে যাতে কোনওরকম সরকারি বাধা না আসে সেই কারণে পানাহি দেশের চলচ্চিত্র বিভাগে ছবিটির একটি ছদ্ম-স্ক্রিপ্ট জমা করেন এবং শ্যুটিং শুরু করে দেন। উল্লিখিত ইরান বনাম বাহরেনের সত্যিকারের ফুটবল ম্যাচটি চলাকালীনও পানাহি স্টেডিয়ামে থেকে ছবিটির বেশ কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। শহরে শ্যুটিংয়ের জন্য অনেক সময়ই গোপনীয়তার কারণে পানাহি ছোট ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবিটির বেশ কিছু অংশের চিত্রগ্রহণ করেন। ইরানীয় ছবিতে এই প্রথম ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। ২০০৬ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয় এবং সিলভার বেয়ার সম্মান লাভ করে।
পাশাপাশি রাখতে চাইব কিয়ারোস্তামির ছবি ‘টেন’, তাঁরই আর একটি প্রকল্প ‘ফাইভ’ এবং পানাহির ‘ট্যাক্সি’-কে। ‘টেন’ এবং ‘ট্যাক্সি’ দুটি ছবিতেই মূল কথক হিসেবে পরিচালক অথবা মুখ্য অভিনেতা একজন গাড়ির চালক। গাড়ির সওয়ারিদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনই ছবির মূল উপজীব্য। গাড়ির জানলা দিয়ে দর্শক ইরানের দৃশ্যপট ফুটে উঠতে দেখেন আর কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসে ইরানের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিবরণ। ‘ট্যাক্সি’ ছবিটিতে পানাহি ও তাঁর মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করা হানা সেইদি-কে (যিনি কিনা আদতে পানাহির ভাইঝি) মনে রাখতেই হবে তাঁদের সাবলীল অভিনয়ের জন্য। এই ছবিগুলি সত্যি করেই বুঝিয়ে দেয়, আমাদের চারপাশের জগতেই সিনেমার উপকরণ লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের চারপাশের জগৎটাই আসলে একটা সিনেমা। আমরা কেবল অজস্র ফ্রেমের মাঝখানে ঘুরে বেড়াই।

বাহমান ঘোবাডি।

তুলনায় আর একটু স্বল্পপরিচিত নাম বাহমান ঘোবাডি। ইরানীয় অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক। যেমনটা শিরোনামে বলেছিলাম, ইরানীয় ছবিতে মিশে আছে চেরির স্বাদ ও বারুদের গন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আমরা যত না জেনেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি করে জেনেছি সেখানকার যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাস। খনিজ তেলের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের যে রাজনীতি তারই প্রয়োজনে সমগ্র পশ্চিম এশিয়াকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাঞ্চলে পরিণত করে রাখাটা পশ্চিমি দেশগুলির ‘নৈতিক’ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর সেই যুদ্ধবিস্তীর্ণ অঞ্চলের পিছনে পড়ে থাকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া এক একটা জীবনের গল্প। ‘এ টাইম ফর ড্রাঙ্কেন হর্সেস’ (২০০০) ও ‘টার্টলস ক্যান ফ্লাই’ (২০০২), বাহমানের দুটি ছবিতে চেরির আস্বাদের সঙ্গেই মিশে রয়েছে বারুদের পোড়া গন্ধ। যেমন আমরা ‘থাউজেন্ড স্‌প্লেনডিড সান’ উপন্যাসে পড়েছি, তালিবানি অত্যাচারের বিবরণ, তেমনই ‘এ টাইম ফর ড্রাঙ্কেন হর্সেস’ ও ‘টার্টলস ক্যান ফ্লাই’ ছবিদুটিতে আমরা দেখব যুদ্ধের কারণে শিশুদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সেই ভয়াবহতা ভাষায় বর্ণনা করা চলে না। আমাদের চোখে কেবলই ভেসে থাকবে, মনে গেঁথে থাকবে ‘টার্টলস ক্যান ফ্লাই’ ছবিটিতে সোরান, আগরিন, রিগা ও হেনগভের জীবন। আগরিন ও রিগার সম্পর্ক। রিগা ও হেনগভের সম্পর্ক। বুকের ভেতরে দলা পাকিয়ে উঠবে যন্ত্রণার স্বর। এক আশ্চর্য সুন্দর শৈশবকে আমরা বিচ্ছিন্ন করেছি। আমরা মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ বুঝি না। আমরা উদ্বাস্তু, যুদ্ধবিদ্ধস্ত শিশুদের জীবন উপলব্ধি করি না। এই দুটি ছবিই আমাদের বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়। আমাদের বিড়ম্বনায় নিক্ষেপ করে বুঝিয়ে দেয় যে আমরা ঠিক কতখানি ভাল আছি।

মজিদ মাজিদি।

মজিদ মাজিদির ‘দ্য সং অব স্প্যারোজ’ (২০০৮) ও আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অব চেরি’ পাশাপাশি রাখলে দুটিতে প্রযুক্তিগত মিল কতখানি আছে জানি না। প্রযুক্তিগত দিক থেকে সিনেমার প্রকাশে রঙের উচ্ছল ব্যবহার অথবা দৃশ্যপটের বিস্তীর্ণ বিবরণ জরুরি। ইরানীয় ছবিতে আমি সেই রঙের প্রাচুর্য দেখেছি। সোনালি গমের খেত থেকে শুরু করে গোধূলির সময়কার বিষণ্ণ তেহরানকে দেখেছি। আর দেখেছি সেই রঙের উচ্ছলতা ও একইসঙ্গে সেই একই আশ্চর্য বিষণ্ণতার ভেতরে ডুবে থাকা সামগ্রিক নাগরিক জীবন। ‘দ্য সং অব স্প্যারোজ’ ও ‘টেস্ট অব চেরি’, দুটি সিনেমাই অস্তিত্বযাপনের কথা বলে। জীবনের কথা বলে। অথচ দুটি সিনেমারই বিষয়বিন্যাস লক্ষণীয়ভাবে আলাদা। ‘সং অব স্প্যারোজ’ যতখানি সরল, সাবলীল, অনায়াস, ঠিক ততটাই গভীর, জটিল ও দার্শনিকতায় সম্পৃক্ত ‘টেস্ট অব চেরি’। প্রবল এক ঝড়ের রাত্রির অবসানে, কিয়ারোস্তামির এই ছবিতে প্রদর্শিত হয় ‘চতুর্থ দেওয়াল’-এর তত্ত্ব। অদৃশ্য সেই দেওয়ালের পিছনে কলাকুশলীদের স্বাভাবিক কাজকর্ম চলতে থাকে। শ্রীযুক্ত বাদি-র আত্মহত্যার প্রচেষ্টা শেষ অবধি সফল হতে পারল কিনা তা অনুক্তই থেকে যায়। কেবল ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে তখন কিয়ারোস্তামির প্যাক আপের ঘোষণা, চেরির আস্বাদ। ‘সং অব স্প্যারোজ’-এর অন্তিমে মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় সেই হারানো অস্ট্রিচ পাখিটি। রংবেরঙের সেই সমস্ত সোনালি মাছ। সোনালি রোদ।
ইরানীয় ছবিতে আসলে এক অপূর্ণতা থাকে। সেই অপূর্ণতাই বোধহয় ইরানীয় ছবির সম্পদ। যেখানে ইরানীয় ছবির শেষ, সেখানেই যে ছবি দেখে ফিরে যাওয়া দর্শকের সঙ্গে পরিচালকের ভাবনার নবতর সংলাপের শুরু। ব্রেখট যেমন বলেছিলেন, “কোটের সঙ্গে নিজের মস্তিষ্কটাকেও যে মঞ্চের বাইরের হ্যাঙারে নিশ্চিন্ত হয়ে ঝুলিয়ে রেখে আসে, আমি সেই সমস্ত মানুষের জন্য শিল্প নির্মাণ করি না।” কিয়ারোস্তামিও তাই চেয়েছিলেন। সিনেমার সঙ্গে দর্শকসমাজের এক অনন্তবিস্তৃত কথোপকথন।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা : ময়ূরীকা মুখোপাধ্যায় ও কৌশিক পাত্র

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.