বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

জগদ্দল

বরানগরের উঠে যাওয়া ফোর-এ বাসস্ট্যান্ডের কাছে একবার আসুন। তার গা ঘেঁষে একটা পুরনো ভাঙাচোরা বাড়ি দেখতে পাবেন। যার মাথায় সাইনবোর্ড আছে ‘দ্দ’। সম্ভবত সেটা একটা ইউনিয়ন অফিস।

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

রাজ্য সরকারি অফিসের নেক্সট-টু বড়বাবু— মিত্তিরমশাই একজন সদাবিশ্বাসী মানুষ। ঠাকুরদেবতা, চন্দ্র-সূর্য, বড়বাবু, পাড়ার ক্লাব, বউ ও শ্বশুরকুল— এসবের প্রতি তার অখণ্ড বিশ্বাস। অফিসে গত পনেরো বছর একই চেয়ারে থিতু। নো প্রোমোশন।
সেদিন পাশের চেয়ারের বোসবাবু কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আপনি সর্দিকাশিতে বিশ্বাস করেন?
মিত্তিরমশাই অবাক হয়ে বললেন, সর্দিকাশিতে বিশ্বাস! মানে?
বোসবাবু জবাব দিলেন, আহা-হা, যা যা আপনি ভয় পান, তাকেই তো বিশ্বাস করেন। সর্দিকাশি একটা রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার…।
মিত্তিরমশাই কী বুঝলেন তিনিই জানেন। সম্মতির মাথা নাড়লেন।
বোসমশাই দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুড়লেন— আমাশা? সেও এক মহাশক্তি… শূন্য থেকে ডাইরেক্ট পেটে। এবং কিছুতেই সারে না।
মিত্তিরমশাই এবার আর মাথা নেড়ে নয়, মিনমিন করে বললেন, ঠিকই বলেছেন, বিশ্বাস না করে উপায় কী…?
এবার বোসবাবু গুছিয়ে বসলেন। কিছু একটা চিন্তা করে গলা আরও নামিয়ে বললেন, জগদ্দল!
মানে… ওই নৈহাটি, ভাটপাড়া, জগদ্দল…?
আরে না না। সেখানে তো সবাই নড়াচড়া করছে, আজ এদিকে, কাল ওদিকে। আমি জগদ্দল পাথরের কথা বলছিলাম।
এবার আর মিত্তিরমশাই জবাব দিলেন না। হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।
বোসবাবু বললেন, স্টোনে তো আস্থা আছে, না কি? তাহলে জগদ্দল পাথরেও বিশ্বাস রাখুন। এক চেয়ারে পনেরো বছর… জগদ্দল কুপিত হয়েছেন।
মিত্তিরমশাই থাকতে পারলেন না, ভীষণ ব্যাকুল হয়ে বললেন, সে কী! তাহলে উপায়? জগদ্দল পাথর কি ধারণ করতে হবে?
বোসবাবু জিভ কেটে বললেন, না না, ধারণ নয়, নির্ধারণ…।
মিত্তির হাঁ।

এতদূর পড়ে বহু পাঠে অভিজ্ঞ যেসব পাঠিকা ও পাঠক ভাবছেন, এ নিশ্চয়ই কাল্পনিক সংলাপ, তাদের আশ্বস্ত করার জন্য বলছি, বরানগরের উঠে যাওয়া ফোর-এ বাসস্ট্যান্ডের কাছে একবার আসুন। তার গা ঘেঁষে একটা পুরনো ভাঙাচোরা বাড়ি দেখতে পাবেন। যার মাথায় সাইনবোর্ড আছে ‘দ্দ’। সম্ভবত সেটা একটা ইউনিয়ন অফিস। জগদ্দলে আক্রান্ত হয়েছেন বা হতে চান, এরকম লোকজনদের নিয়েই ইউনিয়ন। আমি একবার সেখানে গেছিলাম।
সে বাড়িতে পা দেওয়ামাত্র এক ভদ্রলোক বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় এসেছেন?
আজ্ঞে… মানে…।
তিনি বললেন, বলুন বলুন…। মাথার ওপর কোনও সাইনবোর্ড দেখেননি?
আজ্ঞে দেখেছি।
কী লেখা আছে?
দয়ে দয়ে।
ভদ্রলোক ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, এটা কোনও জবাব হল? আপনি তো মুখুজ্জে, সারনেম জিজ্ঞেস করলে কী বলবেন, ম-এ হস্যু, খ-এ হস্যু, বর্গীয় জ-এ জ-এ এ-কার…, আরে বাবা একটা উচ্চারণ তো আছে, না কি?
আমি বার কয়েক দয়ে দয়ে উচ্চারণের চেষ্টা করে হতাশ হয়ে বললাম, নাঃ, হচ্ছে না।
ভদ্রলোক কপালে দু’হাত ঠেকিয়ে বললেন, তাহলেই বুঝুন। জগদ্দল চোখে দেখা যায় না, মুখে আনাও যায় না— কত বড় অতীন্দ্রিয় শক্তি…!
আমিও হাত কপালে ঠেকাতে যাচ্ছি, পরের প্রশ্ন ধেয়ে এল। ‘দ্দ’-এর মানে কী, জানেন?
আমি দু’দিকে মাথা নাড়লাম।
ভদ্রলোক বললেন, দুটো দ মানে দক্ষিণা প্লাস দক্ষিণা। যদি ছাড়াতে চান, দক্ষিণা লাগবে, আক্রান্ত হতে গেলেও দক্ষিণা মাস্ট।
বললাম, আক্রান্ত আবার কে হতে চায়!
ভদ্রলোক ভীষণ অবাক হয়ে বললেন, আপনি দেখছি খুবই সরলমতি। আরে বাবা, মিনিস্টার, অফিসার, লোকাল কাউন্সিলার— জগদ্দলে আক্রান্ত হতে কে না চায়?

এই ‘দ্দ’ ইউনিয়ন ঠিক কীভাবে কাজ করে আমি জানি না। জিজ্ঞেস করেও কোনও সদুত্তর পাইনি। তিনি কেবল গম্ভীর হয়ে বললেন, আমরা এখন জগদ্দলের রুট চার্ট তৈরিতে ব্যস্ত আছি। তিনি একজায়গায় কতক্ষণ স্টপেজ দেন, ফের কোনদিকে, কখন, কেন চলতে শুরু করেন— এসব নিয়ে গবেষণা চলছে।
কিছু করা গেছে?
তিনি আশ্বস্ত করে বললেন, প্রায় হয়ে এসেছে, আর একটু বাকি। তবে ওটুকু থেকে যাবে বলেই মনে হয়। তিনি পুরো ধরা দেবেন না।
ব্যাকুল হয়ে বললাম, তাহলে উপায়?
আমার হতাশ মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, অন্য উপায় আছে, আমরা সেই চেষ্টাই করছি। যত বেশি সম্ভব ‘দ্দ’ ইউনিয়নের সভ্যসংখ্যা বাড়াতে চাইছি। কিচ্ছু না, কেবল সুখসমৃদ্ধি অফার করছি, পাবলিক টুক করে চলেও আসছে।
তার পর?
তার পর আবার কী, জগদ্দলীয় বেশি হয়ে গেলে জগদ্দলের কোনও ভ্যালু থাকবে? বলুন?
আমার বিল্টুর বাল্যবিধবা বুড়ি পিসিমার কথা মনে পড়ল। সারাটা জীবন পুজোআচ্চা করে এসে সেদিন ফোকলা হেসে বললেন, যেদিন আমার একটু খিদে বেশি হয় সেদিন নৈবেদ্য বেশি দিই, খিদে না পেলে নৈবেদ্য দুটোমাত্র বাতাসা।
জগদ্দলকে এত ভাল ‘ডিল’ আর কেউ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

অঙ্কন : রাজ রায়
1 Comment
  1. Rejanul Karim says

    বাহ বেশ লাগল। একেবারেই অন্য ধরনের স্বাদ পেলাম। ভাবনার বৈচিত্র থাকলে তবেই এমন লেখা, লেখা সম্ভব।

মতামত জানান

Your email address will not be published.