বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

জেঠামো

সামান্যতঃ জেঠামোর লক্ষণা করিতে গেলে ইহা বলা যাইতে পারে যে যাহা নিজের ক্ষমতার অতীত সে বিষয়ে কথা কওয়া জেঠামো। জেঠা নানা প্রকার। জেঠা কবি, জেঠা সমালোচক, জেঠা দার্শনিক, জেঠা বৈজ্ঞানিক, জেঠা পুরাতত্ত্বানুসন্ধায়ী, জেঠা বক্তা, জেঠা রিফরমর।

রাজনারায়ণ বসু

নৈয়ায়িকেরা অনেক পদার্থের লক্ষণা করিয়াছেন, তাঁহাদের যদি জেঠামো শব্দের লক্ষণা করিতে হইত তাহা হইলে তাঁহারা মুশকিলে পড়িতেন। যেহেতু জেঠামো নানাবিধ ও এক একবিধ জেঠামি নানারূপ ধারণ করে। সামান্যতঃ জেঠামোর লক্ষণা করিতে গেলে ইহা বলা যাইতে পারে যে যাহা নিজের ক্ষমতার অতীত সে বিষয়ে কথা কওয়া জেঠামো। জেঠা নানা প্রকার। জেঠা কবি, জেঠা সমালোচক, জেঠা দার্শনিক, জেঠা বৈজ্ঞানিক, জেঠা পুরাতত্ত্বানুসন্ধায়ী, জেঠা বক্তা, জেঠা রিফরমর। জেঠা কবির বস্তুতঃ কবিত্বশক্তি নাই কিন্তু কতকগুলি শব্দাড়ম্বর দ্বারা লোককে জানাইতে চান, যে তিনি একজন প্ৰকৃত কবি। তাঁহাদের কবিতাতে ‘ঘনঘটা’, ‘সৌদামিনী’, ‘নলিনীনায়ক’, ‘চাতকিনী’, ‘মৃদুল মৃদুল সমীর’ সম্পূর্ণরূপে বিরাজ করে। আজকাল জেঠা কবিদিগের জ্বালায় তিষ্ঠানো ভার হইয়া উঠিয়াছে। আজকাল গুটিকতক শব্দ সংগ্ৰহ করিলে সমালোচনায় বিলক্ষণ জেঠামি করা যায়–সে সকল শব্দ ‘ওজোগুণ’ ‘প্ৰসাদগুণ’ ‘প্ৰাঞ্জলতা’ প্ৰভৃতি। জেঠা সমালোচকেরা আশু প্ৰতিপত্তি লাভ করিবার জন্য বড়ো বড়ো লেখককে গালি দিয়া থাকেন; যথা,–ভারতচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, মাইকেল ইত্যাদি। সকল প্ৰকার জেঠা অপেক্ষা দার্শনিক জেঠা সর্বশ্রেষ্ঠ। মনুষ্য যাহা কখনো নিরূপণ করিতে পারে না, যাহা ধরিতে ছুঁইতে পাওয়া যায় না, দার্শনিকেরা সেই সকল তত্ত্ব নিরূপণ করিতে গিয়া বিলক্ষণ জেঠামি করেন। যেন কতই বিজ্ঞ, যেন পৃথিবীর সকল তত্ত্বই বুঝিয়াছেন। দার্শনিকদের গ্ৰন্থ হইতে যদি জেঠামি বাদ দেওয়া যায় তাহা হইলে অল্পই অবশিষ্ট থাকে। তাঁহারা ঘটত্বাবচ্ছিন্ন, পটত্বাবচ্ছিন্ন, ইত্যাদি শব্দ দ্বারা কান ঝালাপালা করেন। বৈজ্ঞানিক জেঠা পূর্ব প্রকার বৈজ্ঞানিক মত প্ৰমাণসিদ্ধ হইলেও তাহা খণ্ডন করিয়া নাম লইবার চেষ্টা করেন। তাঁহাদিগের মত জলবুদ্বুদের ন্যায় বৈজ্ঞানিক জগতে এক একবার উত্থিত হয় ; আবার কিছুদিন পরে বিলীন হইয়া যায়।

সকল বৈজ্ঞানিক জেঠা অপেক্ষা বাঙালী বৈজ্ঞানিক জেঠা আরও ভয়ানক। তাঁহারা ইংরাজী বৈজ্ঞানিক গ্ৰন্থ হইতে উপাদান অপহরণ করিয়া তাঁহাদিগের অজ্ঞ স্বদেশস্থ ব্যক্তিগণের নিকট বিলক্ষণ জ্যেষ্ঠতাতি ফলান। নিজে একটি কোনো নূতন তত্ত্ব উদ্ভাবিত করিতে পারেন না, কেবল ইউরোপীয় মহাজনদিগের নিকট ক্রয় করিয়া ‘রিটেল’ বিক্রয় করেন! পুরাতত্ত্বানুসন্ধায়ী জেঠা হাওয়ার উপর অট্টালিকা নির্মাণ করেন। সামান্য নিদর্শন ধরিয়া তুলকালাম করিয়া তুলেন। এই শ্ৰেণীর জেঠারা বলেন যে বাল্মীকি হোমরের চুরি করিয়া রামায়ণ লিখিয়াছেন এবং ভগবদগীতা-প্ৰণেতা বাইবেল হইতে ভাব লইয়া গীতা রচনা করিয়াছেন। পুরাতত্ত্বানুসন্ধায়ী জেঠা প্ৰস্তরখণ্ডের উপর নৈসৰ্গিক কারণে যে সকল আঁজিবিজি পড়িয়াছে, তাহা পুরাকালের কোনো রাজার খোদিত আদেশ বলিয়া ব্যাখ্যা করেন। পরিশেষে যখন তাঁহার জেঠামো ধরা পড়ে তখন অপ্রতিভ হয়েন। তখন জেঠার পদ হইতে ছোটো খুড়োর পদে তাঁহাকে নামিতে হয়! বক্তৃতাতে যখন জেঠামি চলে এমন অল্প বিষয় আছে যাহাতে তদ্রূপ জেঠামি চলিতে পারে। নিমিষ বলিয়া এক পদার্থ আছে ; অতি অল্প দুগ্ধ ফেনাইয়া ফেনাইয়া তাহা প্ৰস্তুত হয়। জেঠা বক্তার বক্তৃতা এই নিমিষের ন্যায়। সার অতি অল্পই থাকে, কিন্তু তিনি তাহা ফেনাইয়া ফেনাইয়া মস্ত করিয়া তুলেন। তিনি গুটিকতক পুরাতন পচা কথা লইয়া তিন ঘণ্টা কাটাইতে পারেন। জেঠা বক্তার বক্তৃতাতে এই কয়টি কথা থাকিবেই থাকিবে :–‘পূৰ্ব পশ্চিম এক করা’ ‘হিমালয় হইতে কুমারিকা পৰ্যন্ত’ ‘জয়-পতাকা উড্ডীন’ ইত্যাদি। তাঁহার বক্তৃতার শেষে ‘উত্থান কর, জাগ্ৰত হও, আর কতকাল আলস্য-শয্যায় শয়ান থাকিবে’ এই কথাগুলি চাইই চাই। কোনো কোনো জেঠা বক্তা নম্ৰতার ভান করিয়া বক্তৃতার প্রথমে বলেন যে ‘যদ্যপিও এই বিষয় বলা আমার ক্ষমতার অতীত তথাপি সাহসের উপর নির্ভর করিয়া বলিতে প্ৰবৃত্ত হইতেছি।’ ইহা খুড়ামির আকারে জেঠামো! কোনো কোনো জেঠা বক্তা বক্তৃতার প্রারম্ভে বলেন যে ‘আমি এ-বিষয়ে বলিতে প্রস্তুত হইবার সময় পাই নাই।’ কিন্তু হয়তো বাড়ি হইতে সমস্ত বক্তৃতা মুখস্থ করিয়া আসিয়াছেন! আরও বলেন যে ‘বন্ধুগণের অনুরোধে আমি এ বিষয় বলিতে আসিয়াছি’ কিন্তু হয়তো বক্তৃতা করিবার লালসায় তাঁহার প্ৰাণ ছটফট করিতেছিল! ইহার পর জেঠা রিফরমার। জেঠা রিফরমররা সহরের বড়ো বড়ো সভায় রিফরমেশন ফলান। কথা শুনিয়া বোধহয় তাঁহারা রাতারাতি ভারতবর্ষকে বিলাত করিয়া তুলিবেন কিন্তু কাজে সব ফাঁকি। তাঁহাদিগের ছোটো ছোটো অনেক সভা আছে। সে সকল সভার সাংবৎসরিক অধিবেশন মহা সমারোহপূর্বক সম্পন্ন হয়, তাহাতে রাঙা মুখের বিলক্ষণ ছড়াছড়ি হইয়া থাকে ; কিন্তু মাসিক অধিবেশন হয় না কেন ইহা নরলোকের বুদ্ধির অগম্য। তাঁহারা স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে লম্বা লম্বা বক্তৃতা করেন, স্ত্রীলোকের দুঃখে তাঁহাদিগের চক্ষে জল ধরে না, কিন্তু তাঁহাদিগের বাটীর স্ত্রীলোকের বর্ণ পরিচয় হইয়াছে কিনা সন্দেহ! তাঁহারা সামান্য লোকের সঙ্গে পত্রাদি লিখিতে ইচ্ছা করেন না। বিলাতের বড়ো বড়ো লোকের সঙ্গে পত্রাদি লিখিয়া থাকেন। ইঁহারা কোনো একটি সামান্য কীর্তি করিলে যাহাতে তাঁহাদিগের নাম সংবাদপত্রে উঠে এইজন্য সম্পাদকদিগের বিলক্ষণ খোসামোদ করিয়া থাকেন। জেঠা রিফরমরদের রিফরমেশন প্রধানতঃ বোতলেই পৰ্যাপ্ত হয়। পূর্বে লোকের কোন উপজীবিকা না থাকিলে গুরুমহাশয় অথবা কবিরাজের ব্যবসা অবলম্বন করিত, এক্ষণে লোকের অন্য কোন জীবনোপায় না থাকিলে সংবাদপত্রের সম্পাদক হয়েন। বিদ্যা যত না থাকুক তাহার অভাব জেঠামি দ্বারা পূরণ করেন। ইঁহারা সবজান্তা! এমন তত্ত্ব নাই যাহা উঁহারা অবগত নহেন। ইস্তক ‘কানাইয়ে ঠেলা’ হইতে নাগাত ‘দণ্ডগ্ৰহণ’ পর্যন্ত এমন বিষয় নাই যাহাতে ব্যাপকতা না করিতে পারেন। আমরা এই শ্রেণীভুক্ত জেঠা।

কিন্তু সকল জেঠা অপেক্ষা বিরক্তিকর বালক জেঠা ও মেয়ে জেঠা অথবা জেঠাইমা। বালক জেঠার জ্বালায় আমরা অস্থির হইয়াছি! গলা টিপিলে দুধ বেরোয় অথচ ভারি ভারি বিষয়ে বিজ্ঞতা ফলাইতে চেষ্টা করে। ইহারা অল্প বয়সে চশমা ব্যবহার করে ও নস্য লয়। বালকদিগের সম্বন্ধে জেঠামি অত্যন্ত অনিষ্টকর। যে বালক জেঠিয়ে যায় তাহাদের আর ভদ্ৰস্থ নাই। তাহাদের লেখাপড়ার বিষয়ে জলাঞ্জলি। বাঙালী বালকেরা অন্য দেশের বালক অপেক্ষা শীঘ্ৰ এঁচোড়ে পাকিয়া যায়। অন্য দেশীয় বালকেরা ষোড়শ বৎসর বয়ঃক্রমের সময়ে বালকবৎ ব্যবহার করে ; কিন্তু বাঙালী ঐ বয়সে পরম বিজ্ঞ হইয়া ওঠে ও বিলক্ষণ জেঠামি করে! নিতান্ত ক্ষুদ্র আম্রবৃক্ষে বড়ো বড়ো বিস্বাদ আম্র ফলিলে যেমন খারাপ, বালক জেঠারা তদ্রূপ। বালক জেঠাদিগের প্রায় এই দুৰ্দশা ঘটিয়া থাকে যে তাহারা প্রকৃত জেঠার বয়স প্রাপ্ত হইলে খুড়ার ন্যায় লোকের নিকট প্রতীয়মান হয় ; প্রকৃত বিজ্ঞতা কখনো লাভ করিতে সক্ষম হয় না। এক্ষণে আমাদের দেশে মেয়ে জেঠার সংখ্যা অতি অল্প। কিন্তু মনে এইরূপ আশঙ্কার উদয় হইতেছে যে আমাদিগের দেশে স্ত্রীশিক্ষা যত বিস্তৃত হইবে ততই ঐ শ্রেণীর জেঠা বৃদ্ধি পাইবে। এক্ষণেই বসন্ত-প্রারস্তের কুসুমের ন্যায় দুই একটি দেখা দিতে আরম্ভ করিয়াছে। আমাদিগের কোনো বন্ধু সেদিন আমাদিগের নিকট গল্প করিতেছিলেন যে, তিনি রেলের গাড়িতে একটি জেঠাইমার হস্তে পড়িয়াছিলেন। জেঠাইমা ধৰ্ম-সংস্কারের বিষয় কিছুই বুঝেন না কিন্তু সে বিষয়ে বিলক্ষণ জেঠাইমো করিতেছিলেন। আমাদিগের বন্ধুকে তিনি বিশেষরূপে আক্রমণ করিলেন, বন্ধু ‘ত্রাহি মধুসূদন’ করিতে লাগিলেন! কি ভাগ্য যে গাড়ি শীঘ্ৰ আড্ডায় আসিয়া পৌঁছিল, তা না হইলে তাঁর কি দশা হইত বলা যায় না। আমাদিগের আর একটি বন্ধু প্ৰসিদ্ধ গ্ৰন্থকার। তিনি আমাদের নিকট একদিন গল্প করিতেছিলেন যে তাঁহার কোনো গ্ৰন্থ রচনার সময় তাঁহার কোনো সুহৃদ তাঁহার নিকট করযোড়ে বলিলেন যে, দোহাই তুমি এ গ্ৰন্থখানি রচনা করিও না। আমার বাড়িতে আমার শালী থাকেন, তিনি একজন শিক্ষিতা স্ত্রীলোক, তাঁহার জেঠাইমোতে আমার বাড়িতে তিষ্ঠানো ভার হইয়াছে। তোমার এ গ্ৰন্থখানি প্রকাশিত হইলে তাঁহার জেঠাইমো আরও বৃদ্ধি পাইবে।

(প্রবন্ধটি বাবু নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রতিধ্বনি’ পত্রিকায় প্রথম প্ৰকাশিত হয়। বানান ও যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত।)

1 Comment
  1. Somnath Chakraborty says

    জেঠা সমালোচকের প্রসঙ্গে জীবনানন্দের সমারূঢ় কবিতাটি মনে পড়লো । মনে পড়লো তাদের কথা, যারা কোনোদিনও হাঙরের ঢেউয়ে লুটোপুটি
    খাননি !!

মতামত জানান

Your email address will not be published.