বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

থিয়েটারের সলিল

নাট্যের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে অভিনেতাদের শরীর, গলা, মগজ কীভাবে সম্পৃক্ত করতে হয় সেটা সলিলদার কাছে শিখছিলাম প্রতিদিন। শেখার পর্ব চলছিল এই নাট্যনির্মাণ পর্বের বাইরেও।

দেবেশ চট্টোপাধ্যায়

বর্তমান প্রজন্ম তাঁর নামই জানে না। অথচ বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য ‘প্রথম পার্থ’, ‘সংক্রান্তি’ আর ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’-কে প্রথম মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন তিনিই। গিরিশ কারনাডের ‘তুঘলক’ থেকে ইউরিপিদিসের ‘মেদেয়া’— এক বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে নির্দেশনার মুন্সিয়ানাও দেখিয়েছেন। শেক্সপিয়রের ‘কিং লিয়ার’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ তাঁর নির্দেশনায় এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল। তিনি থিয়েটারের সলিল। সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার শিক্ষক।
১৯৯০ সাল। গোবরডাঙা শিল্পায়নের সে বছরের প্রযোজনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’। এর আগে শিল্পায়ন নাট্য পত্রিকার জন্য তাপস সেনের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। আমি আর আশিস চট্টোপাধ্যায়। অত্যন্ত দুঃসাহসের সঙ্গে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম ‘রক্তকরবী’ দেখার জন্য। আমাদের অবাক করে তাপস সেন রাজিও হয়েছিলেন। আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল শোয়ের দিন সকালে নাকতলার বাড়ি থেকে ওঁকে নিয়ে আসার। ভোরবেলা পৌঁছে গেলাম। গাড়িতে উঠে বললেন, লেক মার্কেট চলো। লেক মার্কেটের পাশে ‘সুখদা’ নামের একটি পাঁচতলা বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। তাপস সেন হাতছানি দিয়ে কাকে যেন ডাকলেন, তাকিয়ে দেখি প্রায় প্রফেসর শঙ্কুর মতো দেখতে একজন গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছেন। জানলাম তিনি সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। ওই দিন আরও একজন কালিন্দী থেকে গাড়িতে উঠেছিলেন, বিষ্ণু বসু। ওই রাতটাই আমার জীবনের মোড় অনেকটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। অভিনয় দেখার পরে সেদিন রাতে তিনজনই ছিলেন আমাদের বাড়িতে। গভীর রাত পর্যন্ত তিনজনের আড্ডার শ্রোতা আমি। পরের দিন সকালে যাওয়ার আগে সলিলদা আমার ঘরে ঢুকে বইয়ের তাক খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর খাটে বসে খাতায় কতগুলো বইয়ের নাম লিখে দিয়ে বললেন, পড়ে ফেলো বইগুলো আর থিয়েটার ছেড়ো না।

সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়।

এরপর ১৯৯৩ সালে পড়ানোর চাকরি নিয়ে কলকাতায় চলে আসা। এসেই সলিলদার সঙ্গে দেখা করে বললাম, আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই। সলিলদা বলেছিলেন, তোমার স্কুল তো অনেক দূরে, সময়মতো পৌঁছতে পারবে তো? আমি বলেছিলাম, অবশ্যই। এরপর বছর দুইয়েরও বেশি গড়িয়াহাট মোড়ে কিংবদন্তী-র উপরে সুরতীর্থ-য় এসেছিলাম। তখন ‘থিয়েট্রন’-এর নাটক ‘খেলাঘর’। প্রত্যেকটা রিহার্সাল থেকে আমার শেখার পর্ব শুরু হল। ‘খেলাঘর’-এর নাটক থেকে নাট্যনির্মাণের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এ নাটকে বাংলা থিয়েটারের অনেক নামকরা অভিনেতা ছিলেন। বিজয়লক্ষ্মী বর্মন, সুমন্ত্র মুখার্জি, জয় সেনগুপ্ত, অরুন্ধতী বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবু দত্তরায়, মণিকা চ্যাটার্জি, পৃথা সেনগুপ্ত, জিনিয়া রায়চৌধুরী, অশেষ চৌধুরী— প্রত্যেকেই অসাধারণ পারফরমেন্স করতেন। কিন্তু নাট্যের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে অভিনেতাদের শরীর, গলা, মগজ কীভাবে সম্পৃক্ত করতে হয় সেটা সলিলদার কাছে শিখছিলাম প্রতিদিন। শেখার পর্ব চলছিল এই নাট্যনির্মাণ পর্বের বাইরেও। সলিলদার লেখা নাটক ‘অসঙ্গত’ তাঁর নিজের মুখে পড়া শুনেছি। পরে যখন নাট্যে রূপান্তরিত হয়েছে তখন দেখেছি নির্দেশক সলিলদার সঙ্গে নাটককার সলিলদার এক উভমুখী বিক্রিয়ার রসায়ন।

‘অসঙ্গত’ নাটকে সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়।

একদিন বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য ‘সংক্রান্তি’ হাতে দিয়ে বললেন, পড়ো তো প্রথম চার লাইন। আমি পড়লাম। এরপর সলিলদা চারদিন ধরে আমাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে পড়তে হবে। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, তাই প্রথম লাইনে, ‘দিন বদান্য দিন, যাতে সর্বজীব জেগে ওঠে চঞ্চল’-এ একজন মানুষ যিনি চোখে আলোর স্পর্শ পান না তার কাছে ‘বদান্য’ শব্দের ছবি কেমন করে তৈরি হবে। তিনি চোখে দেখছেন না, শুধু কানে শুনছেন, তাই পরের লাইনে, ‘পাখি নাড়ে ডানা, গান গায় পতঙ্গ।’ এভাবেই বছর দুয়েক সলিলদার নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছি।
এ নাট্যে ব্যাকস্টেজের কিছুটা দায়িত্ব ছিল আমার। তিন অঙ্কের এই নাট্যের সম্ভবত দ্বিতীয় অঙ্কে অ্যাকটর্স লেফ্টের ডাউন স্টেজে অশেষদা আর অরুন্ধতীদির একটা কথোপকথন ছিল। আলো করেছিলেন বাদল দাস। একাডেমির গেট উইংসটায় জানলার একটা ফ্রেম বসত। তার মধ্যে দিয়ে একটা আলো পড়ত ওদের মুখে। এখানে সলিলদা একটা গাছের পাতার আবছা ছায়া চেয়েছিলেন অরুন্ধতীদির মুখে। আমি প্রতিদিন একাডেমিতে একটা গাছের ডাল ভেঙে জানলার ফ্রেমের পিছন দিকে বসাতাম। একদিন পর্দা ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখি ডালটা পড়ে গেছে। দৌড়ে গিয়ে ডালটা ধরতেই পর্দা খুলে গেল। ফলে পুরোটাই ডাল ধরে পিছনে বসেছিলাম। সলিলদা একাডেমির ‘এ-২৫’-এ বসে নাটক দেখতেন। অভিনয় শেষে ডেকে বললেন, আজ বোধহয় একটু জোরে হাওয়া দিচ্ছিল বাইরে, না হলে পাতাগুলো মঝেমাঝেই কেঁপে কেঁপে উঠছিল যে!

নান্দীকার উৎসবে সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়।

সে সময় সুরতীর্থ-তে রিহার্সাল দিতেন অসিত মুখোপাধ্যায় আর দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রিহার্সালের আগে নিচে চায়ের দোকানে মাঝেমাঝেই তিনজনের আড্ডার দর্শক হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সৌভাগ্য হয়েছে ১০০, রাসবিহারী এভিনিউয়ের সেই ছোট্ট দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরটায় সলিলদার সঙ্গে বহুবার আড্ডা দেওয়ার। প্রতিটি আড্ডা ঋদ্ধ করেছে আমায়। দূরত্বের কারণে সত্যিই একসময় আর নিয়মিত আসতে পারছিলাম না। সলিলদাকে বলতেই বলেছিলেন সেই পুরনো কথা, থিয়েটার ছেড়ো না দেবেশ। ছাড়িনি তো বটেই, আরও আঁকড়ে ধরেছি দিনের পর দিন। ১৯৯৫ থেকে ২০১৯— এই দীর্ঘ সময় যে কাজই করেছি সলিলদাকে জানিয়েছি, আলোচনা করেছি। আমার মনে হয়, যে সম্মান সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাপ্য ছিল বাংলা থিয়েটার সেটা দেয়নি তাঁকে।
সলিলদার সঙ্গে শেষবার দেখা ২০১৮ সালের শেষদিকে। সলিলদা তখন বেশ অসুস্থ। বাইরে বেরচ্ছেন না। অনেকক্ষণ কথা হল, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানলেন আমার নাট্যনির্মাণের পদ্ধতি। ‘সিনোগ্রাফি’-র বাংলা প্রতিশব্দ কী হতে পারে সেটা নিয়েও অনেক কথা হয়েছিল। সলিলদা বলেছিলেন, ভেবে জানাবেন। আর জানা হবে না কোনওদিনই। সলিলদা চলে গেছেন ২০১৯-এর ৫ জুন। কিন্তু সলিল বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন আমার মতো আরও অনেক নাট্যশিক্ষার্থীর হৃদয়ে এবং মগজে, আজীবন।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.