বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

দিলারা হাফিজের দুটি কবিতা

মীরার ভজন

খঞ্জ ভিখিরির মতন আমি নিজে
দু’হাত বাড়িয়েছি তোমার দিকদিশে;
শূন্য পেয়ালায় দু’হাত রেখে, দ্যাখো,
আমি কি আরও বেশি শূন্যতারই দিকে
পাতিনি বারবার আমার দু’টি হাত?

খঞ্জ ভিখিরির মতন আগ্রহে
দু’হাত বাড়িয়েছি তোমারই দিকে শুধু—
আধুলি নয়তো বা একটি সিকি যেন
তুল্য প্রতিমান! —তোমাকে দিতে পারি
স্বপ্ন মহলের সোনার চাবিকাঠি :
বুকের খুব কাছে লুকানো রয়েছে যা।

খঞ্জ ভিখিরির মতন আমি আজও
দু’হাত বাড়িয়েছি তোমার উদ্দেশে—
জড়ের মতো স্থানু অন্ধ ভিখিরি যে
যখন আর আমি দেখি না মুখ-চোখ
রাতের গহ্বরে! তখনও এই আমি
তোমারই দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছি তো
নীরব নিষ্ঠায়;

আমার দেহজুড়ে শরীর-মন ভরে
তোমার জয়গান, তোমারই সাম্যগীতি :
আমি তো বাড়িয়েই রয়েছি দু’টি হাত
তোমার দিকে শুধু হিরণ-দাহ-বুকে—
তৃষ্ণা কাতরতা তপ্ত দুই ঠোঁটে
রাবণ-চিতা জ্বেলে জাগিয়ে রেখেছি তো—
তোমার পথ চেয়ে মধ্যরাত জেগে
শুনেছি সুদূরের সরোদ-মূর্ছনা:

শুদ্ধ স্মরণিকা-ক্ষুব্ধ অভিমান
আজকে কেন টানে বিরহ-অভিসারে!
কে জানে কত দূর, কোথায় সুদূরতা—
কুমারী দিন-রাত অলস, অনাহত!
কে জানে সেই কবে আমার শাম্পানে
উড়িয়ে দিয়েছিলে বিজয়-পতাকাটি…

সুরার গহ্বরে এখনও ডুবে আছ,
পিপাসা মেটেনি কি? —এবার ফিরে এসো :
আমার মৃদু মদে তোমার স্নান সারো—
মীরার আকুতিটি ধরেছি দেহ-মনে,
অন্ধ ভিখিরির মতন অবিরত
এখনও বাড়িয়েই রেখেছি দুই হাত,
আমার দুটি হাত।

আই কান্ট ব্রিদ

হে, জর্জ ফ্লয়েড,
আমরাও জানি;

তুমি ছিলে নিরস্ত্র ও সত্য,
একা ও একাকী।
ফাঁসিতে নিহত প্রতিবাদী কবি বেঞ্জামিন ছিল সহোদর
মানবজাতির আদি আঁতুরঘরেই ছিল প্রথম ঠিকানা,
আফ্রিকার ছায়াবৃত্ত ইতিহাসের সবুজ অরণ্যে,
জন্মেছিলে নিয়ে তুমি অপার সৌন্দর্য,
কালোর পেখমতোলা আদিত্য কিরণ।

সাদাদের দেশে ছিল ভিন্ন পরিচয়
কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান এক নাগরিক,
বর্ণবাদী তন্তুজালে তারা জন্মমুহূর্ত থেকেই
তোমাকে রেখেছে বেঁধে,
দাসত্বচাবুকে উল্কি ফুটে আছে তার দিকে দিকে
আজও তাই আমন্ত্রণ করে আনে সেই নৃশংসতা
সেকথা কি ভুলে যাবে শ্বেতাঙ্গ সহসা?

কী যে এক টগবগে তরুণ বয়স
মাত্র ছেচল্লিশ, যেন অন্ধ আকাশের ধ্রুবতারা
নিশ্চয় কন্যাটি সবে স্কুল শেষ করেছে তোমার
গৃহবন্দি করোনায় ঘরে থাকা ক্লান্ত,
প্রিয় সন্তানের হাতে ক্ষুদকুড়াসহ
অসামান্য এক ভালবাসা
তুলে দেবে বলে গিয়েছিলে তুমি ওই গ্রোসারিশপে
হাতে নিয়ে মাত্র,
মাত্র বিশটি ডলার,
কে জানত জাল নোটে লেখা ছিল এমন সমন।

খুব দুঃখ হচ্ছে আজ, তুমি তো জেনে গেলে না কিছু
কেবল তোমার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের চল্লিশ
শহরেই শুনশান কারফিউ ভেঙে
ক্ষোভে ও বিক্ষোভে জনগণ নেমে এসেছে রাস্তায়
এই মহাদেশ জুড়ে বিরতিবিহীন প্রতিবাদে ভেসে যাচ্ছে বাদামি, সাদা ও কালো-মানুষের কান্না,
আন্দোলনকারী যত স্বেচ্ছায় তোমার জন্যে আজ
বরণ করেছে কারা,
কোভিড ছাড়াও মৃত্যুভয়কে করেছে তুচ্ছজ্ঞান।

নিজেকে অনিরাপদ ভেবে হোয়াইট হাউসের
চারপাশে আজ টেনে দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পি পর্দা
ওয়াসিংটন ডিসি সহ পনেরোটি অঙ্গরাজ্যে
সেনাবাহিনীর কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছে সুসজ্জিত ভারী অস্ত্র
উন্নত বিশ্বের তিনি মোড়ল, তবুও
থরথর করে আজ কাঁপছে করোনাক্রান্ত জ্বরে, শ্বাসকষ্টে,
হাঁটু চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে তোমাকে যারা যারা
ওই যে সাদা চামড়ার বিশেষ পুলিশ
ড্যারেক চৌভিন, যার নাম উচ্চারণ করা পাপ
যার হাঁটুর তলা থেকে তবু তুমি বারবার বলেছিলে,
‘আই কান্ট ব্রিদ,
আই কান্ট ব্রিদ
আই অ্যাম অ্যাবাউট টু ডাই’

স্বপ্নময় আমেরিকা আজ
বিড়বিড় করে যাচ্ছে ঝিঁঝিপোকার মতন এক,
আই কান্ট ব্রিদ,
আই কান্ট ব্রিদ—

বিশ্ব যেন আজ এক উত্তাল অগ্নির তপোবন,
দহনে পুড়ছে জন-দাবানল তৃণ
শোষণ-ভূষণ আর বর্ণবৈষম্যের আদিমতা…
মুহূর্তেই যেন ঝরে যাচ্ছে হলুদপাতার মতো।
প্রতিবাদী ঢেউ এক ছুটেছে সমুদ্রসঙ্গমের লক্ষ্যভেদে
একই পঙ্‌ক্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে সাম্যের পৃথিবী,
আফ্রিকার মরুভূমি সাহারা থেকেও
দীর্ঘশ্বাস এক ছুটে এসেছে তোমাকে মনে করে,
তোমার উচ্চতা যেন অ্যাটলাস পর্বতের শৃঙ্গ,
এতটাই শক্তিধর, তুমি—
তোমার জন্যেই বুন্দেসলিগার মঞ্চে থেকে আজ
জ্যাডন স্যাঞ্চো ও আশরাফ হাকিমিও
‘জাস্টিস ফর জর্জ ফ্লয়েড’
লিখিত টি-শার্ট পরে খেলতে নেমেছে মাঠে
মাঠ থেকে মাঠে মাঠে
খেলা নয় যেন প্রতিবাদের অনন্য এক ঝড়—
পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে বসে তোমারই নামে
কবিতা লিখছে কবি,
সঙ্গীতের সুরে সুরকার নাম গায় তোমারই।

বিস্মৃতির ছেঁড়াপাতা থেকে উঠে আসে এক নাম
মার্টিন লুথার কিং, মানবতার ওই বাতিঘর
গুপ্তহত্যা দেখে তার, বিক্ষুব্ধ, বিপন্ন বিশ্ববাসী কেঁদেছিল
যে দুঃখে, বিক্ষোভে আর বেদনা-লাভায়
বাহান্ন বছর পরে আজ
তোমারই জন্যে, শুধু তোমারই জন্যে
একই রকম এক আকাশ বিষাদে নেমে এল
নীচে, আরও নীচে, জল-মাটির বিপন্ন ঘর-দোরে
তবু যদি সাম্য ফিরে আসে একবার,
বৈষম্যের এই ঘোলাজল ও কাদায়

বহুবর্ণ মানুষের একই লাল রক্তের আভায়?

অঙ্কন : সৌজন্য চক্রবর্তী
মতামত জানান

Your email address will not be published.