বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

দুই ভুবনের সৌমিত্র

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়টা হল সম্পূর্ণ আচরণবাদী। অর্থাৎ, ক্যামেরার সামনে তিনি তাঁর অভিনেয় চরিত্রের মতোই আচরণকে তুলে ধরছেন। চরিত্রের চলাফেরায় কিংবা কথাবার্তায় কোনও বাড়াবাড়ি করছেন না।

কান্তিরঞ্জন দে

প্রবল আমফান ঝড়ে প্রকাণ্ড কদমগাছটা দীর্ঘক্ষণ ধরে মাটিতে-শেকড়ে লড়াই করতে করতে সন্ধ্যার মুখে একসময় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। রাস্তার ধারে ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে সে এক কাণ্ড! মুহূর্তের মধ্যে গোটা এলাকা অন্ধকার। বিদ্যুৎহীন, জল সরবরাহহীন, সংযোগহীন কয়েকটা দিন। একদিন সকালবেলা বুঝতে পারলাম গাছটা আমাদের অস্তিত্বের কতটা অংশ ছিল। পুকুরের ধারটা ফাঁকা ফাঁকা। তার পান্না-সবুজ জলে আর কোনওদিন কদম্ববৃক্ষের প্রতিবিম্ব ভাসবে না।
গাছটা শুধু যে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল, তা-ই নয়। পাড়ার ছেলেরা তাতে নানা উপলক্ষে ব্যানার টাঙাত। সকালবেলায় দুই দোকানি গাছের ছায়ায় পসরা নিয়ে বসত। সবচেয়ে বড়কথা, গাছটার প্রসারিত ডালপালায় অনেকগুলো ছোটবড় পাখির বাসা ছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে যাবার প্রায় তিন সপ্তাহ পরেও আমার কেন জানি না, অনেকখানি জায়গা জুড়ে থাকা প্রবীণ ওই কদমগাছটার কথাই বারবার মনে পড়ছে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সংস্কৃতির অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিলেন– এ কোনও নতুন কথা নয়। তাঁর সৃজনশীল ভুবন ছিল দশদিগন্ত জোড়া। একথাও আজ সবাই জানেন। কিন্তু তাঁর প্রথম ও প্রধান পরিচিতি যেহেতু অভিনয়সত্ত্বা নিয়ে সুতরাং আপাতত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়েই কথা বলা যাক। অভিনয়ে দুই ভুবনের সৌমিত্রবাবুকে নিয়ে।
ছোটবেলা থেকে একটা লব্জ আমাদের খুব চেনা– গণশিল্পী। অর্থাৎ কিনা, জনতার জন্য নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী। সৌমিত্রবাবুকে যদি আমরা সত্যিকারের গণশিল্পী বলে ডাকতে চাই, আশা করি, তাতে কেউ আপত্তি করবেন না। জানি, গণশিল্পী বললেই আমাদের চোখের সামনে চট করে ভেসে ওঠে আধময়লা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে ঝোলা, গায়ে এণ্ডির চাদর, গালে রুখুসুখু দাড়ি এবং মাথাভর্তি উসকোখুসকো চুলওয়ালা একজন মানুষের ছবি। ঠিক যেন, ‘অপুর সংসার’-এর বিবাগী অপু।

অপুর সংসার।

ইতিহাসের কী আশ্চর্য পরিহাস, জীবনের প্রথম ছবিতে তিনি ওই চেহারাতেই জনতার সামনে উপস্থিত হলেন। বিভূতিভূষণের মানসপুত্র অপু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সত্যজিৎ রায়ের মানসপ্রতিমা হয়ে হয়ে পর্দায় দেখা দিলেন। যতই কন্দর্পকান্তি চেহারা হোক, ধোপদুরস্ত রঙিন পোশাক পরুন, দামি সিগারেট অথবা পাইপের ধোঁয়া ওড়ান, দামি গাড়ি চড়ুন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কিন্তু সারাজীবন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে গেলেন।
সিনেমার একজন জনপ্রিয় হিরো কিংবা বর্ষীয়ান অভিনেতার সঙ্গে দর্শক-মানুষ তো এমনিতেই সারাজীবন সম্পর্ক রাখেন। তাকেই তো পরিভাষায় জনপ্রিয়তা বলে। কিন্তু জনপ্রিয় সৌমিত্র মানুষের প্রিয়জনও ছিলেন। জীবনভর তিনি সচেতনভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। ধুলোমাটির পৃথিবী থেকে একমুহূর্তের জন্যও পা তোলেননি। পাঠকমাত্রই জানেন, অভিনয়বৃত্তি ছাড়াও কবিতা লেখা, পত্রিকা সম্পাদনা করা, গদ্য রচনা করা, নাটক লেখা কিংবা অনুবাদ করা, সেই নাটককে নিজহাতে পোশাক-আলো-রূপসজ্জা-মঞ্চায়োজন এবং সঙ্গীত সংযোজন সহ পরিচালনা করা, এমনকি নানা অনুষ্ঠানে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাস থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত প্রবীণ-নবীন সব কবিদের কবিতা আবৃত্তি– এসবই ছিল সৌমিত্রবাবুর সচেতন জনসংযোগ উদ্যমের ফসল।
রাজনৈতিক আচরণে তিনি তাঁর বামপন্থার প্রতি আস্থা এই দুর্দিনের বাজারেও গোপন করেননি। ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন সহ নানা গণআন্দোলন এবং ত্রাণের জন্য অর্থসংগ্রহে মিছিলে হেঁটেছেন। ১৯৬৮ সালে টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মালিক এবং প্রযোজক-প্রদর্শক পক্ষ বনাম কলাকুশলীদের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় পক্ষেই। এর জন্য তিনি প্রাণের বন্ধু উত্তমকুমারের বিরুদ্ধাচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। এতটাই ছিল তাঁর গণসচেতনতা।

ফেলুদার ভূমিকায়।

কিন্তু এহ বাহ্য। আমরা কথা বলছিলাম অভিনয়ের রাজকুমার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। ওই রাজকুমার জীবনের শুরুতেই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, তিনি শুধু পয়সা কিংবা গ্ল্যামার অর্জন করবার জন্য সিনেমায় আসেননি। ঋত্বিক ঘটক আরও বেশি দর্শকের সঙ্গে সংযোগস্থাপনের জন্যে একদিন গণনাট্য ছেড়ে সিনেমা পরিচালনায় হাত লাগিয়েছিলেন। ঠিক তেমনই কলেজজীবনে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর আমর্ম-আজীবন অনুরাগী-অনুগামী সৌমিত্রবাবুও সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেই প্রথম সিনেমা অভিনয়ের চান্স পাওয়া সত্ত্বেও নাক উঁচু করে সারাজীবন শুধু পুরস্কারপ্রত্যাশী সিনেমাতেই অভিনয় করে যাবেন– এমন ধনুকভাঙা পণ করে বসে থাকেননি। ধনুক তিনি ভাঙেননি ঠিকই, কিন্তু নিজের ইমেজ ভেঙেছেন বারবার। এভাবেই তাঁর অভিনয়ের দুই ভুবনে যাতায়াতের শুরু।
এবার একটু শুরুতে যাই। উত্তমকুমারের খ্যাতি যদি হয় শ্রমের মধ্য দিয়ে অর্জন, তাহলে সৌমিত্রর খ্যাতিকে বলা যায় পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা। যেন সহজ প্রাপ্তি। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেই জীবনে প্রথম সুযোগ পাওয়া, তাও একেবারে প্রধান চরিত্রে! এ তো একেবারে হাতে চাঁদ পাওয়া। আজ্ঞে না, প্রাপ্তিটা অত সহজ ছিল না। অপু চরিত্রের জন্যও তাঁকে দিনের পর দিন মেধাবী প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। ভাবতে হয়েছে। মননের মধু সবটুকু মিশিয়ে তিনি সত্যজিৎ রায়ের মানসপ্রতিমাকে পর্দায় মূর্ত করেছেন। অপু চরিত্রের মধ্য দিয়ে সৌমিত্র যে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তা আসলে ধ্যানের মধ্য দিয়ে অর্জন। ‘অপুর সংসার’ ছবির প্রথমার্ধ এবং দ্বিতীয়ার্ধের চরিত্রচিত্রণের মধ্যে সেই ধ্যানের ছবিটি ধরা আছে। পাঠক, সিনেমাটি আর একবার দেখলেই তা অনুভব করতে পারবেন।

বসন্তবিলাপ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর সারাজীবনের সাক্ষাৎকারে এবং নিজস্ব অভিনয় সম্পর্কিত লেখালেখিতে দুটি কথা খুব বলতেন। ১. সিনেমায় অভিনয় সবসময় পরনির্ভর শিল্প, ২. তিনি আজীবন সিনেমায় জীবন-সদৃশ অভিনয় করবার চেষ্টা করে গিয়েছেন। সিনেমা পরনির্ভর শিল্প তো বটেই। প্রযোজক কিংবা পরিচালক কোনও ছবিতে অভিনয় করতে ডাকলে তবেই অভিনেতা অভিনয় করবার সুযোগ পান। নইলে নয়। যত নামী কিংবা দামি হিরোই হোন না কেন, একজন অভিনেতার অভিনয়ভাগ্য প্রয়োজক-পরিচালকের হাতে বাঁধা।
কিন্তু জীবন-সদৃশ অভিনয় কেন? কারণ, বাংলা সিনেমার আদিযুগ থেকেই অভিনয়ে একটা থিয়েটারি রীতি প্রচলিত ছিল। থিয়েটার করবার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে প্রমথেশ বড়ুয়া, এবং থিয়েটারে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল কিংবা তুলসী চক্রবর্তীরা খাঁটি সিনেমাটিক অভিনয়ের সূত্রপাত করেন। উত্তমকুমার একটু স্টাইলাইজেশন সহযোগে তাতেই পূর্ণতা আনেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায় এবং পরবর্তীকালের রবি ঘোষ এই সিনেমাটিক অভিনয়ে সম্পূর্ণ সিদ্ধি আনেন। ১৯৫৯ সালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন বাংলা সিনেমায় এলেন, ততদিনে সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহরা বাংলা সিনেমা পরিচালনায় বাস্তবতাবাদী ঘরানা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। এই তৈরি করা জমিতে অতএব সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়টা হল সম্পূর্ণ আচরণবাদী। অর্থাৎ, ক্যামেরার সামনে তিনি তাঁর অভিনেয় চরিত্রের মতোই আচরণকে তুলে ধরছেন। চরিত্রের চলাফেরায় কিংবা কথাবার্তায় কোনও বাড়াবাড়ি করছেন না। মেধা-মনন-অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন প্রয়োগ করে নিজেই চরিত্রটি হয়ে উঠছেন।

ঝিন্দের বন্দী।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর সাক্ষাৎকারগুলিতে বারবার স্বীকার করেছেন যে, সত্যজিৎ রায়ের কাছে তিনি সার্বিক চলচ্চিত্রবোধ শিখেছেন। আর তপন সিংহ মশাই তাঁকে হাতে ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয় বিদ্যার খুঁটিনাটি শিখিয়েছেন। সৌমিত্রবাবুর অভিনীত দ্বিতীয় সিনেমা ‘ক্ষুধিত পাষাণ’। সেখানে ক্যামেরার সামনে হাঁটা, শরীরের ভার রাখা ইত্যাদি অনুপুঙ্খ শিক্ষা পেয়েছেন তপন সিংহের কাছে। সৌমিত্রবাবুর তৃতীয় ছবি ‘দেবী’। তার পরে পরেই তিনি তপন সিংহ, অজয় কর, মৃণাল সেন, অসিত সেনের মতো টেকনিক্যালি দক্ষ, মেধাবী পরিচালকদের সঙ্গে পরপর কাজের সুযোগ পেতে থাকেন। উত্তমকুমারের পাশাপাশি সুদর্শন প্রেমিক-নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে তাঁর খুব একটা দেরি হয়নি।
কিন্তু এখানেই যদি সন্তুষ্ট হতেন তাহলে তিনি আর আপামর বাঙালির প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হতেন কী করে? অভিনয় জীবনের তৃতীয় বছরেই এই জনপ্রিয় হিরো অভিনয়ের প্রথম ভুবনে পা রেখেই দ্বিতীয় ভুবনের দিকে তাঁর অভিযান শুরু করে দিলেন।
‘অভিযান’ (১৯৬২) সত্যজিৎ রায়ের ন’নম্বর ছবি। আর সৌমিত্র অভিনীত তেরো নম্বর ছবি। সত্যজিৎ রায়ের কলাকুশলীরা মিলে কিছু টাকা যোগাড় করে ছবিটি প্রযোজনা করবেন বলে স্থির করেছিলেন। প্রথমে পরিচালনা করবার কথা ছিল বিজয় চট্টোপাধ্যায়ের। সত্যজিৎ রায়কে শুধু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনিটির চিত্রনাট্য লেখার অনুরোধ করা হয়েছিল। পাঞ্জাবি ড্রাইভার নরসিং এ ছবির হিরো। উত্তমকুমারকে এই চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি পাঞ্জাবির চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি তখন বাংলা সিনেমার গ্ল্যামার বয়। ঘটনাচক্রে পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ল সত্যজিৎ রায়ের হাতে। বন্ধু-সখা-গুরু-পথপ্রদর্শকের প্রস্তাব সৌমিত্রবাবু লুফে নিলেন। শুরু হল তাঁর দ্বিতীয় ভুবনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ। অভিযান ছবিতে সৌমিত্রবাবুর ইমেজ ভাঙা অভিনয় সবারই মনে আছে। আমি আর তার বিশদে যাচ্ছি না।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ৬১ বছর (১৯৫৯-২০২০) বিস্তৃত অভিনয় জীবনে অভিনয় করেছেন সাড়ে তিনশোরও বেশি ছবিতে। এ হিসেব সম্পূর্ণ হতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে এবং এই হিসেবের মধ্যে হিন্দি ও ইংরেজি ছবি ধরতে হবে। যাইহোক, অভিযানের আগে তাঁর সপ্তম ছবিতেই সৌমিত্রবাবু ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করে ফেলেছেন (ঝিন্দের বন্দী, পরিচালক তপন সিংহ, ১৯৬১)। যদিও সেই ভিলেন ময়ূরবাহন একটু মিষ্টি মিষ্টি রোম্যান্টিক দেখতে। তবুও ভিলেন তো। খ্যাতির প্রথম ধাপেই সাত নম্বর ছবিতে ভিলেন সাজতে গেলে তলোয়ার চালানো কিংবা ঘোড়ায় চড়ার দক্ষতা ছাড়াও কিঞ্চিৎ বুকের পাটা লাগে। ইমেজ ভাঙার দুঃসাহস। অভিনয় জীবনের সবক’টা ভুবনকে দেখে নেওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

তিন ভুবনের পারে।

তার পরের জীবনটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়সত্ত্বার ভাঙা-গড়ার খেলা। ‘সাত পাকে বাঁধা’ (পরিচালক অজয় কর, ১৯৬৩) ছবিতে তিনি সুচিত্রা সেনের হিরো (এই প্রথম) ঠিকই। তবে রোম্যান্টিক হিরো নন। ‘তিনকন্যা’-য় অমূল্য চরিত্রে যে হালকা কমেডির ছোঁয়া, ‘বাক্সবদল’ ছবিতে (পরিচালক নিত্যানন্দ দত্ত, ১৯৬৫) সেই কমেডি অভিনয় রোম্যান্স মেশানো হলেও পরিপূর্ণতা পেল। পরবর্তী সময়ে খ্যাতির মাঝ আকাশেই সৌমিত্রবাবু ‘বসন্তবিলাপ’ (১৯৭৩), ‘ছুটির ফাঁদে’ (১৯৭৫), ‘বাবুমশাই’ ও ‘মন্ত্রমুগ্ধ’ (১৯৭৭), ‘শ্যামসাহেব’ (১৯৮৬) থেকে ২০০০ সালের ‘পাতালঘর’-এর পাগলাটে বৈজ্ঞানিক পর্যন্ত অসংখ্য চরিত্রে তাঁর কমেডি অভিনয়ের নিদর্শন রাখবেন।
‘ঝিন্দের বন্দী’ ছবি দিয়ে তিনি ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন। আবার সুখেন দাসের পরিচালনায় উত্তমকুমারের ভিলেন ভাই সনাতনের চরিত্রে অভিনয় করলেন ‘প্রতিশোধ’ (১৯৮১) ছবিতে। আপাদমস্তক বাণিজ্যিক ছবি। মোটাদাগের কাহিনি। পরিচালনাও বলার মতো কিছুই নয়। বলা বাহুল্য, কাহিনি-চিত্রনাট্য-পরিচালনা সবই সুখেন দাসের। কিন্তু বলার কথা যেটা তা হল এই যে, এই ধরনের মোটাদাগের ছবিতেও সৌমিত্রবাবু কখনও ঢিলে দিতেন না। শুধু দর্শকদের এবং পরিচালকের সীমা মেপে নিয়ে অভিনয়ের মাত্রা একটু চড়া স্কেলে বাঁধতে হত তাঁকে।

দ্য বেঙ্গলি নাইট।

জীবনের প্রথম দিকে একটি বাণিজ্যিক ছবিতে সৌমিত্রবাবু ব্যাক টু ক্যামেরা অবস্থাতেও নায়িকার সংলাপের সময় হাসছিলেন। ছবিটা দেখার পরে সত্যজিৎ রায় সৌমিত্রবাবুকে ধমক দেন। ক্যামেরার দিকে পিছন ফেরা অবস্থা হলেও নায়কের ওই অকারণ হাসি সত্যজিৎ রায়ের তীক্ষ্ণ নজর এড়ায়নি। সৌমিত্রবাবু বলেছিলেন, ‘ওরকম বোকা বোকা সংলাপে না হেসে পারা যায়? বলুন মানিকদা?’ সত্যজিৎ রায় উত্তরে বলেন, ‘তা বললে চলবে কেন? তুমি একজন পেশাদার অভিনেতা। পরিচালক যেমনই হোক, তাকে এবং সহ অভিনেতা অভিনেত্রীদের সম্পূর্ণ সহায়তা দেওয়া তোমার কাজ। গল্প-চিত্রনাট্য-পরিচালনা যেমনই হোক, তোমার কাজ পরিচালকের আস্থা অর্জন করা এবং দর্শকশ্রেণির বিশ্বাস অর্জন করা।’ পরবর্তী জীবনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করেছেন।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.