বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

নামিবিয়ার নোমাডদের আশ্চর্য মনঃসংযোগ

হিম্বারা তাঁদের পারিপার্শ্বিক জগৎকে অনেক নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখেন এবং আধুনিক সভ্যতার যেসব সুবিধে যেসব বিক্ষিপ্ততা তৈরি করে সেইসব হিম্বাদের মনোযোগকে ক্ষুণ্ণ করে না।

মণিশংকর বিশ্বাস

উত্তর-পশ্চিম নামিবিয়ার লম্বা ঢেউখেলানো ঘাসের ওপর ছোট্ট যে শহরটির নাম ওপুয়ো (Opuwo), তার জনসংখ্যা মাত্র ১২ হাজার। শহরটা এত ছোট যে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে গাড়িতে দু-এক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। দুটো স্কুল, একটা হাসপাতাল, পোস্ট অফিস, সরকারি কয়েকটি দপ্তর, গোটা কতক সুপার মার্কেট ও পেট্রল পাম্প। ব্যাস, এই নিয়েই ওপুয়ো শহর। উপত্যকায় বসবাসকারী অনেক মানুষের কাছেই এই ছোট্ট শহরটি কিন্তু আধুনিক নগর সভ্যতার প্রথম আস্বাদন। হাজার হাজার বছর ধরে উপত্যকায় বসবাসকারী হিম্বা নামক প্রাচীন জনগোষ্ঠীটির একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই শহর।
এই সেমি-নোমাডিক উপজাতির মানুষজন মূলত পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে আধুনিকভাবে গড়ে ওঠা ওপুয়ো শহরের অবস্থান হিম্বাদের অতি নিজস্ব স্বাভাবিক জীবনযাপন পদ্ধতির ওপর প্রভাব ফেলছে। হিম্বাদের নতুন প্রজন্ম এই প্রথম ইটের বাড়ি, মোটরগাড়ি, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। এই প্রথম লেখাপড়া বা আধুনিক মানুষের বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছেন হিম্বারা। বিজ্ঞানীরাও তাই হিম্বাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে বুঝে নিতে চাইছেন আধুনিক সভ্যতা আমাদের মনকে কীভাবে পরিবর্তিত করেছে। এই প্রাচীন জনজাতির মানুষের আধুনিকতার দিকে যাত্রাপথের শুরুকে বিজ্ঞানীরা খুব যত্নসহকারে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বুঝে নিতে চাইছেন, ঠিক কীভাবে আধুনিকতার বিভিন্ন অভিনবত্বের সঙ্গে মানবমন মোকাবিলা করে। সোজা কথায়, আধুনিকতা ঠিক কীভাবে মনকে পরিবর্তিত করে। বিজ্ঞানীরা যতটুকু বুঝতে পেরেছেন তা খুবই চিত্তাকর্ষক। আমরা, ‘আধুনিক মানুষরা’ আমাদের চারপাশকে যেরকম দেখি, হিম্বারা সেভাবে দেখেন না।
আধুনিকতা আমাদের বাস্তববোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে এমন ইঙ্গিত আমরা প্রথম পাই ভিক্টোরিয়ান যুগের নৃতাত্ত্বিক ডবলু এইচ আর রিভার্সের (WHR Rivers) পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে। বিশ শতকের একদম শুরুর দিকে তিনি অস্ট্রেলিয়া এবং পাপুয়া নিউগিনির মধ্যবর্তী টরেস স্ট্রেইটের দ্বীপগুলিতে যেসব উপজাতি বসবাস করে তাদের ভেতরে নানারকম ‘সেন্সরি টেস্ট’ পরীক্ষা করে দেখেন। এই টেস্টগুলির মধ্যে ছিল অতি বিখ্যাত মুলার লাইয়ার ইলিউশান ( Muller-Lyer illusion)। একবার নিজেরাই পরীক্ষা করে দেখা যাক সেটা কীরকম।

বাস্তবে A এবং B সরলরেখা দুটির দৈর্ঘ্য একেবারে সমান। বেশিরভাগ মানুষ, আমাদের মতো যারা, অর্থাৎ আধুনিকতার সুযোগসুবিধাপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় লাইনটিকে (B) বড় মনে করেন। এমনকি পশ্চিমী সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত মানুষ দ্বিতীয় লাইনটিকে ২০ শতাংশ দীর্ঘ মনে করেন। অথচ টরেস আইল্যান্ড সমূহের উপজাতীয়রা কিন্তু এই দৃষ্টিবিভ্রম দ্বারা বিভ্রান্ত হন না। বিজ্ঞানী রিভার্স এটা লক্ষ করেছিলেন। ওখানকার প্রায় প্রতিটি মানুষ দুটি সরলরেখাই যে সম-দৈর্ঘ্যের তা বলতে পেরেছিলেন। পরবর্তীকালে এই একই পরীক্ষা দক্ষিণ ভারতের টোড়া উপজাতির মানুষদের মধ্যেও করা হয়। কী আশ্চর্য, এখানেও পরীক্ষার ফল পাওয়া গেল একই। অর্থাৎ এই উপজাতীয় সবাই বলতে পারছেন সরলরেখা দুটি একই দৈর্ঘ্যের। অন্যান্য আরও বেশ কিছু প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই পরীক্ষা করে অনুরূপ ফল পাওয়া গেল।
এটা একটা অসম্ভব শক্তিশালী আবিষ্কার। ছোট্ট এই পরীক্ষার ফলাফল আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, সবচেয়ে সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ধারণাগুলি, যা আমরা মনে করি আমাদের মস্তিষ্কে অনাদিকাল ধরে একদম গেঁথে আছে, সেই ধারণাগুলিও বস্তুত আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত। এই দৃষ্টিবিভ্রমটি সম্পর্কে একটা তত্ত্ব হল এই যে, আধুনিক মানুষ ঘর জাতীয় ‘কার্পেন্টেড কর্নার’-এ বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করে। এইরকম পরিবেশে যদি কোনও বস্তুর প্রান্তের কোণগুলি বাইরে থাকে তবে বস্তুটি দূরে, আবার প্রান্তের কোণগুলি যদি ভেতরের দিকে থাকে তবে বস্তুটির এই প্রান্তটি দর্শকের কাছাকাছি থাকে (চিত্র ২)।

চিত্র ২

আমরা যখন কোনও ঘরের ভেতরে ঢুকি, মস্তিষ্ক ঘরের মধ্যে বা কোনও কাঠামোর ভেতরে রাখা বিভিন্ন বস্তুর দূরত্ব খুব দ্রুত ক্যালকুলেশন করে ফেলে। এর জন্য মস্তিষ্ককে ‘ভাবতে’ হয় না। এক্ষেত্রে কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি ব্যাকফায়ার করেছে। ফলে একই দৈর্ঘ্যের দুটি রেখাকে একটিকে প্রশস্ত এবং অন্যটিকে সংকুচিত করেছে। এটা একটা উদাহরণ। কিন্তু এই উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়, আধুনিক সভ্যতা কীভাবে আমাদের অনুধাবিত জগৎকে বদলে দিয়েছে।
বিভিন্ন দিক থেকে তাই হিম্বাদের জীবন এবং পারিপার্শ্বিক জগৎকে দেখার পদ্ধতি আমাদের থেকে একদম আলাদা, কখনও বা বিপরীত। কেন না হিম্বারা মূলত ছোট ছোট দলে কাঠ দিয়ে বানানো কুঁড়েঘরগুলিতে বাস করেন। কুঁড়েগুলি হয় একটা পবিত্র আগুনকে ঘিরে। মনে করা হয়, এই পবিত্র আগুনের দ্বারাই হিম্বারা তাঁদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র রক্ষা করেন। তাঁদের দৈনন্দিন জীবন বলতে পশুপালন ও পশুচারণ। ফলে এঁরা প্রায়ই নতুন নতুন চারণক্ষেত্রের দিকে সরে সরে যান। নির্দিষ্ট ঠিকানা, বাড়ি, জমিজিরেত নেই। সত্যি বলতে কী, এ আমরা ভাবতেও পারি না।
বিজ্ঞানী জুলস ডেভিডফ (Jules Davidoff) ও তাঁর দল হিম্বাদের জীবনযাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল থেকে হিম্বাদের জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করেছেন। হিম্বাদের গ্রামপ্রধানের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তাঁদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এইসব পরীক্ষা সাধারণত ক্রালের (ছোট ছোট দলগুলি একত্রে যে ঘেরা জায়গাতে বসবাস করে তাকে ক্রাল বলা হয়।) বাইরে করা হত। ডেভিডফ পরে জানিয়েছিলেন যে, তাঁকে একবার ক্রালের ভেতরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি লক্ষ করেছিলেন, হিম্বাদের কুটিরগুলিকে অনায়াসে প্রস্তরযুগের বলে মনে হয় কিন্তু তাই বলে এদের কোনও অভাব-অনুযোগ নেই। মোটামুটি সবাই স্বাস্থ্যবান। ডেভিডফ পরে মন্তব্য করেন, অনেক দিক থেকেই এদের জীবন খুব সুন্দর, স্বাভাবিক ও পরিপূর্ণ। খুবই সংবেদনশীলতার সঙ্গে ডেভিডফ যেসব পরীক্ষা বা সেন্সরি টেস্ট করেছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল এবিংহউস ইলিউশান (Ebbinghaus Illusion)।

আধুনিক সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত মানুষ আমরা, প্রথম ছবির কেন্দ্রীয় কমলারঙের বৃত্তটিকে দ্বিতীয়টির কেন্দ্রীয় কমলারঙের বৃত্তটি অপেক্ষা ছোট দেখি, যখন কিনা দুটি বৃত্তই সমান আকারের। ডেভিডফ এবং তাঁর টিমের সদস্যরা কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করেন যে হিম্বারা এই ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম দ্বারা বিভ্রান্ত হন না। প্রায় সকলেই বলে দিতে পারেন, দুটি বৃত্তই একই আকারের।
এই পরীক্ষার ফল আমাদের বলে দেয়, এইসব খুঁটিনাটির প্রতি হিম্বাদের মনঃসংযোগ আমাদের থেকে অনেক যত্নশীল ও নিখুঁত। এর পরে আরও জটিল কিছু পরীক্ষা করেও দেখা গেছে, হিম্বারা অনেক সহজে পারিপার্শ্বিকের বিক্ষিপ্ততা বা ডিস্ট্রাকশন উপেক্ষা করতে পারেন এবং ছোট ছোট ডিটেইলসের ওপর মনোযোগ দিতে পারেন।
হিম্বাদের বিস্ময়কর মনোযোগের একটা ব্যাখ্যা হল, পশুচারণের সময় ও প্রতিপালনের সময় প্রতিটি পশুকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিতকরণ এবং সেইমতো আগলে রাখার পদ্ধতি। এছাড়া বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে পশুগুলিকে চরানোর মতো আপাতদৃষ্টিতে বৈচিত্র্যহীন কাজটি দীর্ঘসময় করার অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু কারণ যাই হোক, এইসব পরীক্ষানিরীক্ষা দ্বারা একটা কথা খুব স্পষ্ট যে, হিম্বারা তাঁদের পারিপার্শ্বিক জগৎকে অনেক নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখেন এবং আধুনিক সভ্যতার যেসব সুবিধে যেসব বিক্ষিপ্ততা তৈরি করে সেইসব হিম্বাদের মনোযোগকে ক্ষুণ্ণ করে না। আধুনিক সভ্যতার ভোক্তা মানুষ হিসেবে আমরা আর কোনওদিনই এই অবিচলন অর্জন করতে পারব না। হিম্বারা বা আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে যেসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ এখনও পর্যন্ত টিকে আছেন তাঁরাও আধুনিক সভ্যতার গ্রাসে এই বিরল গুণটি ক্রমে খুইয়ে ফেলবেন এবং ‘বাস্তবতা’ অনুধাবন করবার স্বাভাবিক আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাবেন।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.