বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পদার্থবিদ্যার নবদিগন্তের অপেক্ষায়

মহাবিশ্বের যাবতীয় মৌলিক কণা, অর্থাৎ যাদের আর ভাঙা যায় না, তাদের তিনটি গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়। প্রথম গোষ্ঠীটি হল কোয়ার্ক। নিউট্রন আর প্রোটন আসলে এই কোয়ার্কেরই সমবায়।

অনিন্দ্য দে

বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয়ের যে চেষ্টা মানুষ করে আসছে তার ইতিহাসটা বেশ পুরনো। গাছের আপেলটা পৃথিবীর টানেই মাটিতে নামে। আবার সূর্যের টানেই পৃথিবী বছরের পর বছর ধরে সূর্যের চারদিকে ঘুরে চলেছে। কিন্তু দুটোই যে আসলে একই মহাকর্ষ, সেটা প্রথম আমাদের বুঝিয়ে দিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। পৃথিবীর একটা আটপৌরে বিষয়কে একটা মহাজাগতিক ঘটনার সঙ্গে এক সুতোয় গেঁথে দিলেন তাঁর মহাকর্ষ সূত্রে। এটা সতেরো শতকের শেষ দিকের ঘটনা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা পেলাম আরও একটা সমন্বয়। পজিটিভ আর নেগেটিভ চার্জের মধ্যে যে আকর্ষণ হয় বা একই জাতের দুটো চার্জের ক্ষেত্রে বিকর্ষণ হয় এবং চুম্বকের উত্তর আর দক্ষিণ মেরু যে একে অন্যকে কাছে টানে আর একই ধরনের মেরু একজন অন্যজনকে যে দূরে ঠেলে দিতে চায়— সেই ব্যাপারগুলো অনেক আগে থেকেই আমাদের জানা ছিল। কিন্তু কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণের শেষে পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখালেন যে, তড়িৎ আর চুম্বকের বিশেষত্বগুলো আলাদা কিছু নয়। এরা আসলে একই বিষয়ের বিভিন্ন রূপ। এদের একসঙ্গে আমরা এখন বলি তড়িৎচুম্বকত্ব বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম। আলোর চরিত্রটা ঠিক কেমন সেটা প্রথম বোঝা গেল এই সমন্বয় থেকেই।
বিশ শতকের একেবারে গোড়ার দিক থেকেই কোয়ান্টাম তত্ত্বের বাড়বাড়ন্তের শুরু। এই কোয়ান্টাম তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই ১৯৩৩ সালে এনরিকো ফের্মি বললেন উইক ফোর্সের কথা। নিউক্লিয়াসের ভেতরে প্রোটন আর নিউট্রনগুলো বেশ আঁটোসাটোভাবে বসে থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াস যত ভারী হতে থাকে তার আকার ততই বাড়তে থাকে। আর প্রোটন ও নিউট্রনের বাঁধনও আলগা হতে থাকে। পরমাণুর নিউক্লিয়াস যখন অনেকটা ভারী হয়ে যায়, তার মানে নিউক্লিয়াস আকারে যখন বেশ অনেকটা বড় হয়, উইক ফোর্স তখন ওই নিউক্লিয়াসকে ভেঙে দিয়ে ছোট দুটো নিউক্লিয়াস তৈরি করে।
বলার বিষয় হল, দুটো বস্তু অসীম দূরত্বে থাকলেও তারা একে অন্যের মহাকর্ষের টান অনুভব করে, অসীম দূরত্ব থেকেও দুটো চার্জের মধ্যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স কাজ করে। কিন্তু দুটো কণার মধ্যে উইক ফোর্স কাজ করে খুব কম দূরত্বে। দশমিকের পরে আঠেরোটা শূন্য লিখে তার পরে এক লিখলে যা হবে, মিটার এককে সেই ক্ষুদ্র দূরত্বে যদি দুটো কণা থাকতে পারে, তাহলেই শুধুমাত্র তাদের মধ্যে উইক ফোর্স কাজ করতে পারবে। অর্থাৎ দু’জনের মধ্যেকার দূরত্ব যদি একটা প্রোটনের ব্যাসের মাত্র ০.১ শতাংশ হয়, তবেই তাদের মধ্যে উইক ফোর্স কাজ করবে। সুতরাং এর অস্তিত্ব খুঁজতে হলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে নজর দিতে হবে। পজিটিভ প্রোটন আর নেগেটিভ ইলেকট্রনের মধ্যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স যেখানে একটা পরমাণুকে ধরে রাখতে চাইছে, উইক ফোর্স সেখানে পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙে ফেলার কাজে ব্যস্ত। এতটাই পার্থক্য এই দুই জাতের ফোর্সের। তবুও কোনও কোনও জায়গায় এদের মধ্যে অদ্ভুত মিল। সেই সাদৃশ্যগুলো দেখেই ষাটের দশকে এদের এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা শুরু হল। সাফল্যও এল খুব তাড়াতাড়ি। তিন বিজ্ঞানী শেলডন গ্ল্যাশো, আবদুস সালাম আর স্টিভেন ভিনবার্গ মিলে দেখালেন যে, তড়িৎচুম্বকত্ব আর উইক ফোর্স পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
দৈনন্দিন জীবনে খুব কম শক্তির যেসব ব্যাপার-স্যাপার আমরা দেখি, সেখানে এই দুটো ফোর্সকে বেশ আলাদা রকমের বলে মনে হয়। কিন্তু উষ্ণতা যদি অনেকটা বেড়ে যায়, সেন্টিগ্রেড স্কেলে তাকে বোঝাতে গেলে যদি একের পরে পনেরোটা শূন্য লিখতে হয়, সেক্ষেত্রে কিন্তু ইলেকট্রোম্যাগনেটিক আর উইক ফোর্সকে আলাদা করা যাবে না। যে মহাবিস্ফোরণে এই মহাবিশ্বের জন্ম, সেই বিগ ব্যাং-এর সামান্য কিছু সময় পরে অবস্থাটা ঠিক এরকমই ছিল। তখন তাদের একটাই রূপ, আমরা তার নাম দিয়েছি ইলেকট্রো-উইক ফোর্স। প্রাথমিকভাবে যে ধারণাগুলোকে হাতে নিয়ে মহাবিশ্বের বর্ণনা দেওয়ার কাজটা শুরু করতে হয়, সেই প্রাথমিক ধারণাগুলোর সংখ্যা যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনার একটা চেষ্টা নিরন্তর চলছে। ইলেকট্রো-উইক সমন্বয় বিজ্ঞানীদের এই চেষ্টায় নিঃসন্দেহে একটা বড় মাইলফলক। অল্প কিছুদিন আগে হিগ্‌স কণার খোঁজ মেলায় এই সমন্বয়ের ব্যাপারটা আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এতদূর এগোনোর পরেও একটা বিষয়ে অস্পষ্টতা থেকেই গিয়েছিল। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে চার্জবিহীন নিউট্রন আর পজিটিভ চার্জের প্রোটন যে এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকে সেটা জানা ছিল। কিন্তু পজিটিভ প্রোটনগুলোর তো একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা। তাহলে নিউক্লিয়াসটারই টিকে থাকার কথা নয়। অথচ তারা দিব্যি টিকে আছে বছরের পর বছর। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও এ প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তরটা পদার্থবিদদের জানা ছিল না। সমস্যাটার সমাধান হিসেবে সাতের দশকের গোড়ার দিকে প্রবল শক্তিশালী একটা ফোর্সের কথা ভাবা হল। এই ফোর্স এতটাই জোরালো যে প্রোটনগুলোর পারস্পরিক বিকর্ষণকে অগ্রাহ্য করে নিউক্লিয়াসকে এক জায়গায় বেঁধে রাখে। শক্তিশালী, তাই এর নাম দেওয়া হল স্ট্রং ফোর্স। দেখা গেল, নতুন এই ফোর্স ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের প্রায় একশো গুণ আর উইক ফোর্সের প্রায় দশ লক্ষ গুণ শক্তিশালী। আর এই স্ট্রং ফোর্সের শক্তির সঙ্গে মহাকর্ষের শক্তির অনুপাতকে প্রকাশ করতে হলে একের পরে উনচল্লিশটা শূন্য লিখতে হবে। তবে এই স্ট্রং ফোর্সের পাল্লাও কিন্তু খুবই ছোট। একটা নিউক্লিয়াসের ব্যাসের থেকে বেশি দূরত্বে এই ফোর্স আর কাজ করে না। নতুন এই স্ট্রং ফোর্সের কথা জানার পরে তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন মনে আসে। মহাকর্ষ আর ইলেকট্রো-উইক ফোর্সের সঙ্গে স্ট্রং ফোর্সের সমন্বয়ের কি কোনও সম্ভাবনা নেই? এ ব্যাপারে কী বলছে আধুনিক পদার্থবিদ্যা?
একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে যে, আমাদের এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে আমরা এখনও পর্যন্ত যতটুকু জানতে পেরেছি সেই দৃশ্যমান মহাবিশ্বে ফোর্স মাত্র চার রকমের : মহাকর্ষ, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক, উইক আর স্ট্রং ফোর্স। তবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক আর উইক ফোর্সের সমন্বয়ের পরে এখন অবশ্য আমরা বলি আমাদের মহাবিশ্বে ফোর্স তিনরকমের : মহাকর্ষ, ইলেকট্রো-উইক আর স্ট্রং ফোর্স। এই তিন রকমের ফোর্সকে কি এক সুতোয় বাঁধা সম্ভব? একুশ শতকের পদার্থবিদ্যায় এ একটা বিরাট প্রশ্ন। কারণ স্ট্রং ফোর্স যে অন্য ফোর্সগুলোর তুলনায় বেশ অনেকটাই শক্তিশালী। তাহলে এদের সবাইকে এক জায়গায় করব কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টায় আধুনিক পদার্থবিদ্যার গতিবিধির দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।
১৯৭৪ সালে হাওয়ার্ড জর্জি আর শেলডন গ্ল্যাশো প্রথম স্ট্রং ফোর্সের সঙ্গে ইলেকট্রো-উইক ফোর্সকে বাঁধার একটা চেষ্টা করেছিলেন। কাছাকাছি সময়েই ঠিক একই রকমের আর একটি মডেলের কথা বলেছিলেন আবদুস সালাম আর যোগেশ পতি। অর্থাৎ অঙ্কের একটাইমাত্র ভাষায় স্ট্রং, উইক আর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সকে ব্যাখ্যা করার একটা রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেল। হিসেব কষে দেখা গেল যে, শক্তি ১ হাজার বিলিয়ন ভোল্টের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে স্ট্রং ফোর্সের আচার-আচরণ ইলেকট্রোম্যাগনেটিক আর উইক ফোর্সের মতোই। ১৯৭৮ সালে সার্ন-এর একদল বিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণাপত্রে স্ট্রং ফোর্সের সঙ্গে ইলেকট্রো-উইক ফোর্সের এই সমন্বয়ের ব্যাপারটাকে গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিয়োরি বলে উল্লেখ করলেন। সেই থেকে এই নামটাই চলে আসছে। কিন্তু এরকম একটা সমন্বয়ের ফলে কী পেলাম আমরা? এটা কি শুধুই বুদ্ধির ব্যায়াম, না কি বিশ্বপ্রকৃতিকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে কাজে লাগবে এই সমন্বয়? সেটা বুঝতে হলে এখনও পর্যন্ত মহাবিশ্বের যেসব কণাকে আমরা চিনতে পেরেছি তাদের চরিত্রটাও একটু বুঝে নেওয়া দরকার।
মহাবিশ্বের যাবতীয় মৌলিক কণা, অর্থাৎ যাদের আর ভাঙা যায় না, তাদের তিনটি গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়। প্রথম গোষ্ঠীটি হল কোয়ার্ক। নিউট্রন আর প্রোটন আসলে এই কোয়ার্কেরই সমবায়। প্রকৃতিতে মাত্র ছয় জাতের কোয়ার্ক থাকতে পারে বলেই বিজ্ঞানীদের ধারণা। মৌলিক কণার দ্বিতীয় গোষ্ঠী হল লেপটন। ইলেকট্রন একরকমের লেপটন। আশ্চর্যের ব্যাপার, লেপটনের ক্ষেত্রেও রকমফের সেই ছয়। তৃতীয় গোষ্ঠীর মৌলিক কণাগুলো বিভিন্ন ইন্টারঅ্যাকশনের সময়ে এক কণা থেকে অন্য কণায় যাতায়াত করে। যেমন দুটো কণার মধ্যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স কাজ করলে তাদের মধ্যে ফোটনের আদানপ্রদান হয়। কণাদুটির মধ্যে উইক ফোর্স কাজ করলে তারা W আর Z-বোসন দেওয়া-নেওয়া করে। আর তাদের মধ্যে যদি স্ট্রং ফোর্স কাজ করে সেক্ষেত্রে বিনিময় হয় গ্লুওনের।

মোটামুটিভাবে এটাই হল পার্টিকল ফিজিক্সের স্ট্যান্ডার্ড মডেল। যদি একটা পরমাণুর আকারের হাজার ভাগের মাত্র এক ভাগ দূরত্বের মধ্যেও পদার্থের প্রকৃতি কেমন হবে সেটা জানতে চাওয়া হয় তাহলেও স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে প্রায় ঠিকঠাক তথ্য পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও আমাদের বিশ্বপ্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য স্ট্যান্ডার্ড মডেলই যে শেষ কথা, এমনটা বলা যায় না। বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখান থেকে পাওয়া যায় না। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বিরূদ্ধে সবচেয়ে ঘোরতর অভিযোগ হল যে, মডেলটা বেশ জটিল। সামগ্রিকভাবে একটা পরমাণুর কোনও চার্জ নেই। কারণ প্রোটন আর ইলেকট্রনের চার্জ সমান কিন্তু বিপরীত। কিন্তু কেন? স্ট্যান্ডার্ড মডেলে তার কোনও জবাব নেই। সুতরাং স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে ছাড়িয়ে আরও একটু বড় ধাঁচের কোনও সমন্বয় যে দরকারি তার একটা আভাস যেন এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে।
সেই সমন্বয়ের সাধনার ফসলই হল গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন তত্ত্ব। আমাদের চারপাশে যেসব বস্তু আমরা দেখি তারা সবাই প্রায় দু’জাতের কোয়ার্ক আর ইলেকট্রন দিয়ে তৈরি। অথচ গবেষণাগারে ও মহাজাগতিক রশ্মির বিভিন্ন পরীক্ষায় আরও নানা জাতের যথেষ্ট ভারী কিছু কোয়ার্ক আর লেপটনের উপস্থিতির টের পাওয়া গেছে। এদের উৎপত্তির কারণটা যে কী সে ব্যাপারেও স্ট্যান্ডার্ড মডেল একেবারে নিরুত্তর। কিন্তু কোয়ার্ক আর লেপটনকে একই গোষ্ঠীর আওতায় এনে গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড তত্ত্ব সাজালে উত্তরটা পাওয়া যেতে পারে। আবার মহাকর্ষ ধ্রুবক বা আলোর বেগের মতো ধ্রুবকের সংখ্যা স্ট্যান্ডার্ড মডেলে অনেকটাই বেশি, উনিশটা। গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড তত্ত্বে এই সংখ্যাটাও অনেকটা কমে আসে।
অল্প কিছুদিন আগে হিগ্‌স কণার আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীতে একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। ষাটের দশকে যখন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক আর উইক ফোর্সের সমন্বয়ের চেষ্টা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই এরকম একটা কণা যে খুব দরকারি সেটা বোঝা যাচ্ছিল। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের বাহক ফোটন। এই ফোটনের ভর শূন্য। কিন্তু উইক ফোর্সের বাহক W আর Z–বোসন যথেষ্টই ভারী। এই অসাম্য দূর করার জন্য হিগ্‌স কণার উপস্থিতিটা খুব প্রয়োজন ছিল। সেই হিগ্‌স কণাকে খুঁজে পাওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু অঙ্কের হিসেবে এই হিগ্স কণার ভর যা হওয়ার কথা ছিল বাস্তবে তা পাওয়া গেল না। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে যে হিগ্স কণাকে পাওয়া গেল সে অনেকটাই হালকা। তবে গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন তত্ত্বের সুপারসিমেট্রিক মডেল ধরে এগোলে এই সমস্যাটার সমাধান হতে পারে। যদিও এই সুপারসিমেট্রিক মডেলের অন্যতম শর্ত হল প্রোটনের ভাঙন। অঙ্কের হিসেব বলছে, প্রোটনের আয়ু বছরে হিসেব করতে হলে একের পরে বত্রিশটা শূন্য লিখতে হবে। তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই প্রকৃতিতে এই সুপারসিমেট্রির দেখা এখনও মেলেনি। তবে বিজ্ঞানীদের আশা, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুপারসিমেট্রির প্রমাণ আমাদের হাতে আসবে। পদার্থবিদ্যার সেই নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশায় আমাদের অধীর অপেক্ষা।
মহাকর্ষ সূত্রে জাগতিক আর মহাজাগতিক ঘটনাকে ঐক্যবদ্ধ করে নিউটন যে কাজটা শুরু করেছিলেন সেই ধারা এখনও অব্যাহত। একে একে তড়িৎ আর চুম্বকের বিষয়গুলোকে এক সুতোয় গেঁথে তৈরি হয়েছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইলেকট্রো-উইক ফোর্সের ধারণা, তৈরি হয়েছে গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন থিয়োরি। সুতরাং বাকি থাকল মহাকর্ষের সঙ্গে স্ট্রং, উইক আর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটি। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। চলতি কথায় থিয়োরি অফ এভরিথিং। অর্থাৎ একটাইমাত্র গণিতের ভাষায় চার রকম ফোর্সকে প্রকাশ করার একটা সামগ্রিক তত্ত্ব। কিন্তু চরিত্রের বিচারে মহাকর্ষ বাদবাকি ফোর্সগুলো থেকে এতটাই আলাদা যে তাদের এক জায়গায় আনার কাজটা বেশ কঠিন। আধুনিক পদার্থবিদ্যায় এটাই বোধহয় সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

মহাকর্ষ সম্পর্কে নিউটনের ধারণাটাকে একেবারে পাল্টে দিয়ে ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন প্রকাশ করলেন জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্ব। এই জেনারেল রিলেটিভিটি অনুসারে মহাকর্ষ আসলে দেশকালের জ্যামিতিক গঠনের একটা অবশ্যম্ভাবী রেজাল্ট। গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সিকে নিয়ে যে বিশ্বজগৎ, যেখানে অতিকায় সব বস্তুসমূহের চলাফেরা, বিরাট বিরাট দূরত্বের হিসেবনিকেশ, সেই ম্যাক্রো-কসমসকে ব্যাখ্যা করতে হলে জেনারেল রিলেটিভিটি ছাড়া আমাদের চলবে না। আবার অন্যদিকে লেপটন, কোয়ার্কের মতো হালকা ছোট্ট ছোট্ট কণা নিয়ে যে বিশ্বপ্রকৃতি, সেই মাইক্রো-কসমসকে ব্যাখ্যা করতে পারে একমাত্র কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরি। সুতরাং কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি আসলে জেনারেল রিলেটিভিটির সঙ্গে কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরির সমন্বয়ের সাধনা। এখনও পর্যন্ত প্রকৃতির যেসব মৌলিক সূত্র আমরা খুঁজে পেয়েছি তাদের বেশিরভাগই হয় জেনারেল রিলেটিভিটি নয়তো কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরির সঙ্গে খাপ খায়। তবে ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরের মুহূর্তে মহাবিশ্বের অবস্থা বা ব্ল্যাক হোলের মতো বিষয়কে এই দুটি আঙ্গিক থেকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। দুটি ক্ষেত্রেই ভর প্রকাণ্ড অথচ আকারটা খুবই ছোট। কিন্তু জেনারেল রিলেটিভিটি বা কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরি কেউই পুরোপুরি এবং সঠিকভাবে বিষয়দুটিকে বোঝাতে পারে না। এই অপূর্ণতা থেকেই কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির জন্ম।
গত কয়েক দশকে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির বেশ কয়েকটি তত্ত্ব আমাদের হাতে এসেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তত্ত্ব হল স্ট্রিং থিয়োরি। স্ট্রিং থিয়োরিতে খুব ছোট সরু সুতোর মতো একটা পদার্থকে বিশ্বজগতের মূল উপাদান হিসেবে ধরা হয়। সুতোর মতো এই পদার্থেরই পোশাকি নাম স্ট্রিং। এই মূল স্ট্রিংয়ের কাঁপুনির রকমফেরেই লেপটন বা কোয়ার্কের মতো বিন্দুকণাগুলো তৈরি হয় বলেই ভাবা হয়। সেতার বা সরোদের তারকে যেমন নানারকমভাবে আন্দোলিত করে আলাদা আলাদা সুর সৃষ্টি করা হয়, ঠিক সেরকমই মূল স্ট্রিংয়ের বিভিন্ন রকমের কম্পনে লেপটন আর কোয়ার্কগুলো তৈরি হতে পারে। স্ট্রিং থিয়োরির অঙ্ক কষে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ছাড়াও স্পেসের আরও কিছু বাড়তি মাত্রা পাওয়া যায়। কিন্তু এই বাড়তি মাত্রাগুলো এতটাই গুটিয়ে থাকে যে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ছাড়া আর কোনও মাত্রাকেই আমরা বুঝতে পারি না।
স্ট্রিং থিয়োরিতে আরও একটি বিষয়কে আনা হয়। সেটা হল বিশ্বপ্রকৃতির সুপারসিমেট্রি। এই সুপারসিমেট্রির তাগিদেই ১৯৯৫ সালে মহাবিশ্বের মূল উপাদান হিসেবে স্ট্রিংয়ের পাশাপাশি ব্রেন আর পার্টন নামের নতুন দুটো পদার্থের আমদানি করা হয়েছে। তবে অল্প দিনের মধ্যেই যে ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় সরাসরি এই তত্ত্বের প্রমাণ পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তা সত্ত্বেও খুব কম সময়ের মধ্যেই এই স্ট্রিং থিয়োরি তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের মন জয় করে নিয়েছে। কারণটা অবশ্যই তার সাফল্যের খতিয়ান। পার্টিকল ফিজিক্সের স্ট্যান্ডার্ড মডেলে দুরন্ত বেগে গতিশীল, ভরহীন গ্র্যাভিটনের কথা বলা হয়েছে। মহাকর্ষের ক্ষেত্রে এই কণার আদানপ্রদান হয়। কিন্তু ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় একে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ স্ট্রিং থিয়োরির মধ্যে থেকেই গ্র্যাভিটনের কথা বেরিয়ে আসে। এটাই বোধ হয় স্ট্রিং থিয়োরির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
এই বিশ্বজগতের আর এক বিস্ময় হল ব্ল্যাক হোল। এই ব্ল্যাক হোলের ভেতরে যেসব কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে সেসব খবর বের করে আনার ব্যাপারে স্ট্রিং থিয়োরি অনেকটাই সফল। ব্ল্যাক হোলের ভেতরটা কেমন হতে পারে তার একটা মডেল তৈরি করা গেছে এই স্ট্রিং থিয়োরি ব্যবহার করে। প্রায় তিরিশ বছর আগে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোলের চরিত্র সম্পর্কে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তার অনেকগুলোকেই এই মডেল থেকে পাওয়া সম্ভব।
এতখানি সাফল্যের পরেও কয়েকটা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মৌলিক কণার সংখ্যা আঠেরো। কিন্তু সুপারসিমেট্রিকে জায়গা দিতে গিয়ে স্ট্রিং থিয়োরিতে মূল পদার্থের সংখ্যা হয়ে যায় ছত্রিশ। মহাবিশ্বের প্রসারণের হার যে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে সেটা প্রমাণিত। মূলত ডার্ক এনার্জিই এর জন্য দায়ী। অথচ স্ট্রিং থিয়োরিতে এই ডার্ক এনার্জি নিয়ে আলোচনার কোনও সুযোগ নেই। আবার স্ট্রিং থিয়োরির বিভিন্ন সমীকরণ থেকে অনেক রকমের সমাধান বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে কোন সমাধানটিকে আমরা মহাবিশ্বের প্রকৃত বর্ণনা হিসেবে বেছে নেব সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। এই সব অসম্পূর্ণতা নিয়ে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বর্ণনা করার মতো একটা মডেল স্ট্রিং থিয়োরি থেকে আদৌ তৈরি করা যাবে কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তার সঙ্গে আছে তত্ত্বের মূল নির্যাসকে ল্যাবরেটরিতে পরখ করার প্রশ্ন। সে ব্যাপারটাও বাস্তব থেকে অনেকটাই দূরে। তা সত্ত্বেও স্ট্রিং থিয়োরিস্টদের গভীর বিশ্বাস যে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এইসব সমস্যার সমাধান হাতে পাওয়া যাবে। পদার্থবিদ্যার এই নতুন দিগন্তে থিয়োরি অফ এভরিথিং-এর সোনালি রেখাটা দেখার অপেক্ষায় আমরা দিন গুনছি।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.