বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পিটার ব্রুকের মহাভারত : রক্ষণশীলতার আখ্যান

অথচ ওঁরা কাজ করেছিলেন বিশ শতকে, যখন আবিশ্ব এক তুমুল চেতনার বিপ্লবে আন্দোলিত। নারী স্বাধীনতার আন্দোলন, শ্রেণি অধিকারের আন্দোলন চারপাশকে তছনছ করছে। সেই সময়কার জরুরি প্রশ্নগুলিই সযত্নে সরিয়ে রাখা কেন?

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

পিটার ব্রুকের ‘মহাভারত’ প্রথম যখন দেখি দূরদর্শনে তখন অবশ্যই খানিক অবাক হয়েছিলাম। বি আর চোপড়ার ‘মহাভারত’ দেখার ফলে নয়। নানা কারণেই আমার বাল্য থেকে রামায়ণ-মহাভারত চর্চার পরিসর ছিল। সেখান থেকেই বরং অবাক হয়েছিলাম। বিশেষ করে সেই অল্প বয়সে চোখ টেনেছিল নানা দেশের নানা মানুষ মহাভারতের নানা চরিত্র করছেন। মহাভারতের ঘটনাক্রম বদলে চলেছে। শুধু তাই নয়, তার নাটকীয়তা ইত্যাদিও দেখার মতো। কিন্তু আরও পরে যখন প্যারিসে তাঁর থিয়েটারে অভিনীত ‘মহাভারত’-এর সংক্ষিপ্ত আকার হিসেবে চলচ্চিত্রটি দেখলাম তখন ভাবনা পাল্টে গেল। প্রাথমিক উত্তেজনা ততদিনে থিতিয়ে গিয়েছে। বরং ‘মহাভারত’ নিয়ে কাজ করতে শুরু করে নিজেই তলিয়ে যাচ্ছি এর বিপুল সমুদ্রে।
স্বাভাবিকভাবেই সে কাজ করতে গিয়ে দর্শন এবং দার্শনিক অবস্থানগুলিকে বুঝতে চেষ্টা করতে হয়েছে। এডওয়ার্ড সইদ কথিত ওরিয়েন্টালিজম ছাড়াও বস্তুত স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা থেকে খানিক এ বিষয় জ্ঞান লাভ করা যায়। যখন স্কুল যেতে শুরু করেছি তখন ধুতিও আর পরতে হয় না, হাফপ্যান্ট-শার্ট পরাই দস্তুর। উপনিবেশ আমাদের ওপর এতটাই চেপে বসেছে যে শুধু ইংরেজি ভাষাটা জাতীয় ভাষা আখ্যা পাওয়া বাকি। যে কাজটা আফ্রিকার রোয়ান্ডার মতো দেশগুলো করেও ফেলেছে। এবারে মহাভারত ও নাট্য ও দর্শনের পরিসরে তাকে বুঝতে শুরু করতেই সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াল।
উইলিয়াম জোন্স সংস্কৃতের সঙ্গে প্রথমে গ্রিক-ল্যাটিন, পরে গথিক-কেলটিক-পারসিক ভাষার তুলনামূলক আলোচনা এবং সম্বন্ধ নির্ণয় করে একদিকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর মতো ভাবনাকে আরও পুষ্ট করলেন, অন্যদিকে ‘আর্যত্ব’ ধারণার বীজ পুঁতে দিলেন। শুধু তাই নয়, সংস্কৃত নাটককে এমন ‘ব্রাহ্মণ্য’ মর্যাদা দিয়ে বসলেন যে তার ধাক্কা ইউরোপের মূল স্রোত আজ অবধি কাটাতে পারেনি। কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ অনুবাদ করলেন। ভূমিকায় লিখলেন, “at a time when the Britons were as unlettered and unpolished as the army of Hanuman”। স্রেফ এই বাক্যটি খেয়াল করলেই দেখা যাচ্ছে হনু সৈন্যের দল মানে বর্বর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, যা আর্যত্বের নতুন ব্যাখ্যাকে আরও বর্ণাশ্রমিক করবে। সেই বর্ণাশ্রমের মূলে থাকবে ওঁদের কথিত সভ্যতা-বর্বরতা দ্বিভাজন। অথচ প্রচলিত রামায়ণের প্রেক্ষিতে বানর/হনুমানের দিকে লক্ষ রাখলেও এই তথাকথিত বর্বরতা সত্যি নয়। রীতিমতো নগর সভ্যতার কথা আছে রামায়ণে বানর বলে কথিতদের।
এখানেই শেষ নয়। তিনি পরোক্ষে আবিষ্কার করে বসলেন হিন্দু নাটক, যা হিন্দু সভ্যতাকে ধারণ করছে। ভূমিকাতে লিখে দিলেন, “a most pleasing and authentic picture of old Hindu manners, and one of the greatest curiosities that the literature of Asia has yet brought to light”। এর ফল হল হিন্দু শব্দটা সম্পর্কে ধারণাটা ঐতিহাসিকভাবে যা, তার থেকে বহুদূরে সরে গেল।
পিটার ব্রুক প্রসঙ্গে লিখতে বসে ‘হিন্দু’ শব্দে এসে পৌঁছলাম কেমন করে তা এবারে বলা দরকার। পিটার ব্রুক যখন ইয়ং ভিক-এ ব্যাটলফিল্ড করবেন তখনকার একটি সাক্ষাৎকারে ব্যবহার করছেন শব্দটা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যখন তাঁরা তার বিরোধিতায় কাজ করছেন, তখনই মহাভারত-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। এক ভারতীয় কয়েক পাতার একটি নাটক শোনান তাঁদের। বিষয়বস্তু হল অর্জুন ও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। এই বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতেই তিনি ফিলিপ লাফাস্তিনের কথা শোনেন। ফিলিপের যোগ্যতা বোঝাতে গিয়ে বলছেন ‘ইন্ডিয়ান হিন্দু কালচার’-এর ফ্রান্সের সেরা স্কলার। একই বন্ধনীতে ইন্ডিয়ান এবং হিন্দু দুটি শব্দই চলে এল যা আবার ভাবাল।

পিটার ব্রুক।

‘মহাভারত’ একটি নির্দিষ্ট বছরে লিখিত কোনও মহাকাব্য নয়। প্রথমে শ্রুতিতে এর উৎপত্তি বা নির্মাণ। তার পরে শ্রুতিতেই আরও আরও বিষয় সংযুক্ত হতে হতে একদা এই বিপুল কলেবর ধারণ করেছে এবং লিখিত আকারে এসেছে। এই সময়কাল অনেকটাই। এই সময়কালের মধ্যে হিন্দু বলে কোনও ধর্ম ছিল না। এমনকি দার্শনিকভাবেও বেদ-উপনিষদ ছাড়াও ছ’টি মুখ্য দর্শনপ্রস্থান ছিল যারা আস্তিক অর্থাৎ বেদকে মান্য করে চলে। তার বাইরে ছিল নাস্তিক তথা বেদকেই সব না মানা দর্শনপ্রস্থানসমূহ। বৌদ্ধ-জৈন-চার্বাকাদি তার অংশ। বৈদিক অংশও নিজেদের পরিচয় হিন্দু বলে দিতেন না। বরং দেবতার অনুগামীদের ভিত্তিতে দেখা হলে ঐন্দ্র্য-সৌর-বৈষ্ণব ইত্যাদিদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। বস্তুত বৈষ্ণব শব্দটাও বাকিদের তুলনায় অর্বাচীন যা জিতেন্দ্রনাথ তাঁর ‘পঞ্চোপাসনা’-তে বহুকাল আগেই দেখিয়েছেন। এ বিষয় আরও বই বা কাজ তো আছেই।
ভারতবর্ষ বলে যে ভাবনা সে ভাবনার সঙ্গে এমনকি ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়ারও কোনও মিল ছিল না। উত্তরাপথ, মধ্যদেশ ইত্যাদি নানা নামে এই উপমহাদেশের নানা অঞ্চল যে চিহ্নিত হত তা যাযাবরীয় রাজশেখরের লেখা থেকে কালিদাসের রঘুবংশ— নানা উৎসেই আছে। অর্থাৎ সেই অর্থে ইন্ডিয়ান কালচার বললে যা বোঝায় তা ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা এক রাজনৈতিক দর্শন। যেমন হিন্দুত্বও।
অবশ্য অনেক আগেই এই জাতীয় ফাঁদ শুরু হয়ে গিয়েছে। জোন্সের কথা লিখেছি। সঙ্গে হোরেস উইলসনের ‘Select Specimens of the Theatre of the Hindus’ বইটির কথাও বলা উচিত। কী চেয়েছিলেন উইলসন? “to secure the Hindu Theatre a place in English literature”। কেন? রাজা জর্জ ‘patron of oriental literature’-কে উৎসর্গ করা বইটি। উদ্দেশ্য হচ্ছে, “to familiarise his British subjects with the manners and feelings of their fellow subjects in the East”। ব্রিটিশ সাহিত্যের অংশ হতে পারলে ধন্য হবে অধম বিজিতরা। ব্রিটিশ প্রজারা, পৃথিবীর আর এক প্রান্তে একেবারেই একটি উপনিবেশের কথা তিনটি নাট্যের মাধ্যমে জেনে যাবে। এখানে সাবজেক্ট শব্দটির ব্যবহার দেখার মতো। যেন ব্রিটেনের বাসিন্দা আর ব্রিটিশ উপনিবেশ ইন্ডিয়ার বাসিন্দাদের কোনও পার্থক্যই ছিল না নাগরিক অধিকারে।
এখান থেকে দেখলে পিটার ব্রুকের বিখ্যাত ‘মহাভারত’-এর শুরুটিকে অন্যভাবে দেখতে ইচ্ছে করে। নাট্যে নাটককার এবং নির্দেশকের স্বাধীনতা অনস্বীকার্য। মহাভারত বিষয়বস্তু হলেই যে প্রচলিত পাঠকে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুকরণ করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। নাট্য প্রযোজনাটি যে উদ্দেশ্যে হচ্ছে সেই উদ্দেশ্যের দিকেই তার গমন হওয়া স্বাভাবিক। তাহলে প্রযোজনাটির উদ্দেশ্য কী?
মার্গারেট ক্রয়ডেনের কথায়, “synthesis[ed] all his previous theatrical inventions, did nothing less than attempt to transform Hindu myth into universalized art, accessible to any culture”। সেই হিন্দু মিথ। ‘মহাভারত’-এর জন্ম তখন, যখন হিন্দু বলতে সিন্ধুকুশের পূর্ব দিকের লোকদের বোঝাত, সিন্ধুকুশের পশ্চিমে থাকা লোকেরা। এই পূর্ব কদ্দূর? জাপান অবধি? এসব ভৌগোলিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন বাদ দিয়েই, ‘স’ উচ্চারণ করতে না পারা সিন্ধুকুশের পশ্চিমাদের থেকে ‘সিন্ধু’-র ‘হিন্দু’ হওয়াকে ঘাড়ে নিয়ে রামায়ণ-মহাভারতকে শুধু হিন্দু মিথ করে ছেড়েছেন এঁরা।
মনে পড়ে ম্যাক্সমুলারদের কথা। আমাদের বাল্যকালের সাহ্লাদে ঋষি মোক্ষমূলর বলে জানতাম। মানে ইতিহাস শিক্ষাটা তেমনই ছিল। ১৮৪৭-এ সবে ইংল্যান্ডে গিয়েছেন, অক্সফোর্ডে পেপার পড়ছেন ‘বাংলা ভাষার সঙ্গে আর্য এবং অন্যান্য মূলভাষার সম্পর্ক’ নিয়ে। পেপারে প্রায় সোজা বসিয়ে দিচ্ছেন লাসেনের কাজ ইন্ডিশে অলটারামস্কুন্দে-র ভাবনা। শ্বেত আর্যরা এদেশে এসেছিল। কালো নিগ্রোদের মতো অধিবাসীদের পরাজিত করেছিল। তার পরে থেকে গেল। তাই সংমিশ্রণ হল। হল বলে তাদের সভ্যতা ক্রমে উচ্ছন্নে গেল। এই ম্যাক্সমুলার বর্ণাশ্রমের সমর্থক হবেন না তো কে হবেন!
অবশ্য আর্য বনাম সেমিটিক যুদ্ধটা আদপে ইউরোপে ইহুদি বনাম খ্রিস্টান যুদ্ধ, যা কালে কালে ইন্দো-জার্মান জাতিগত শ্রেষ্ঠতায় পর্যবসিত হবে। ম্যাক্সমুলাররা সেই যুদ্ধেরই যোদ্ধা। কখনও ভারতে আর্যত্বের লড়াই করছেন তো কখনও জার্মানিতে। যেখানেই লড়ুন, আসলে যে কথা বলছেন সে কথা হল সব জাতির বৈচিত্র্য্ই আছে ইতিহাসের নিয়মে, কিন্তু শ্রেষ্ঠ জাত হল এই কল্পিত ‘আর্য’-রা। এরাই উপনিবেশ গড়বেন আর পৃথিবী চালাবেন। অতএব আর্যত্ব প্রকল্প হিটলার ইত্যাদির দাপটে পিছনের সারিতে চলে গেলেও হিন্দুত্ব রয়েই গেল। ব্রুকেরা কি একে বাদ দিয়ে ‘মহাভারত’ পড়েছেন? ব্রুক নিজে Straits Times-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, মহাভারত “like the complete works of Shakespeare that India had kept possessively. Done in every part of India, but never allowed to travel. We felt it our duty to say, ‘Sorry, India, this isn’t only yours’।”
বেশ কথা। বিশ্বের মহাকাব্য তো বটেই মহাভারত। কিন্তু সেই মহাকাব্যকে দেখছেন কেমন করে! প্রয়াত কিরণ নগরকর, যাঁর ‘বেডটাইম স্টোরি’ তথাকথিত হিন্দুত্বের কাছে ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড়ের মতো, তিনি ব্রুকের ‘ব্যাটলফিল্ড’ দেখতে গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত এও বলা প্রয়োজন, ‘বেডটাইম স্টোরি’ ১৯৭৮-এ লেখা হবার পরে যখন বিতর্ক শুরু হল তখন মুম্বইয়ের ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে তাঁকে বলা হয়েছিল ব্রুকের কাছে পাঠাতে নাটকটি। ব্রুক এবং জাঁ ক্লোদ কাহিয়ের তখন ‘মহাভারত’ নিয়ে কাজ করছেন। প্রযোজনাটি হয়নি তখনও। সেই নাটকটি তাঁরা পেয়েছিলেন কিনা তাও নগরকর কখনও জানতে পারেননি। যাইহোক, নগরকরের ব্রুকের ‘মহাভারত’ পরবর্তী ‘মহাভারত’ নির্ভর ‘ব্যাটলফিল্ড’ দেখার অভিজ্ঞতার কথা লিখি।
“What exactly did Peter Brook have in mind when he decided to do ‘Battlefield’?” এই নামে তিনি একটি সমালোচনা লেখেন। সেখানে বলছেন, যুদ্ধবিরোধী বলে নাটকটির প্রচার উচ্চ-নিনাদিত। সেই বিরোধ কোথায়? পাঁচ-ছ’বার ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছিলাম বললেই যুদ্ধ-বিরোধ হয়ে যায়? নগরকর লিখছেন, মহাভারতের সবচাইতে প্রাসঙ্গিক যুদ্ধ বিরোধিতার অংশ হল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তটি। যখন অর্জুন, যুদ্ধক্ষেত্রে এসে সারে সারে আত্মীয়স্বজনদের দেখছেন। দেখে বলছেন আত্মীয় বধের মতো কাজ তিনি করবেন না। সেখানেই গীতার অংশ চলে আসছে। কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করতে দর্শনাদির অবতারণা করছেন।
এখানেই আসছে সেই অংশ যেখানে দেহকে বাসাংসি জীর্ণানি বলা হচ্ছে। এক বস্ত্র পরিত্যাগ করে অন্য বস্ত্র পরার মতো জন্ম-মৃত্যু। পূর্বজন্ম-পরজন্মের প্রকল্প সিদ্ধি পাচ্ছে। অমরত্বের একটি ধ্রুপদী প্রকল্পও এখানে পুষ্ট হয়েছে। আত্মার প্রকল্প। সব কিছুকে হত্যা করা চলে, আত্মা অবিনশ্বর। অতএব অর্জুন কাকেই বা হত্যা করছে! তাছাড়া কে অর্জুন! কে হন্তারক, কে হত! সবই তো অবিনশ্বরের অংশ। অতএব যার কাজ যা সেটুকু করে গেলেই হবে। ফলাফল নিয়ে ভাবার কারণ নেই। এই যে ভাবনা, যা একাধারে পূর্বজন্ম-পুনর্জন্ম, পাপ-পুণ্য, আত্মা ইত্যাদি চক্রকে চালিয়ে নিয়ে যায়, এ সম্পর্কেই নগরকর বলেছিলেন, “an exceptionally wise and philosophical commentary on life and the human condition and with enough contradictions and sleights of hand for generations to grapple with”।
এই ভোজবাজিই আদপে পাশ্চাত্যের দর্শনে ঢুকে পড়া নিয়তি। নিয়তি কোনও দেবদেবী নয়। নিয়তি কয়েক হাজার বছরের সংস্কৃতি। যখন দেখি সক্ষম, বুদ্ধিমান, সচেষ্ট মানুষ জীবনের কোনও একটা পর্যায়ে বা বিষয় মেনে নিচ্ছে এই ভেবে যে এর পরে তার পক্ষে আর সম্ভব নয়, তখনই দেখি নিয়তিকে হা-হা করে হাসতে।
এই নিয়তির জন্ম কবে? প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে এর জন্ম। মানুষের পৃথিবী তখন অনেক ছোট্ট। এক জায়গার লোক জানতও না অন্য জায়গার অস্তিত্ব। চলাচলের যাবতীয় ইচ্ছে একদিকে জ্ঞান আর সম্পদ বাড়ায়, অন্যদিকে না ফেরার আশঙ্কাকে তীব্র করে তোলে। যেমন ওডিসিউসের যাত্রাটাই দেখুন। ট্রয়ের যুদ্ধের গ্রিক নায়ক থেকে একসময় সাইক্লোপসের গুহায় নিজেই নিজেকে বলছেন ‘নো বডি’। ইগো থেকে ‘কেউ নই’ হয়ে যাওয়া, পরিচয়ের এই স্থানচ্যুতি। কেন? কারণ ওডিসিউস তার ইথাকায় ফিরতে পারছে না।
ফিরতেই হবে কেন? কারণ ওডিসিউস ইথাকায় অভ্যস্ত। তার বাইরের যে বিস্তীর্ণ জগৎ সেখানে সে নিজেকে অচেনা, দুর্বল ও সহায়হীন বলে মনে করে। নিজের বৃত্ত ছেড়ে গেলেই যেমন হয়। অথচ অগ্রসর হতে থাকা মানেই তো পুরনো অবস্থানকে ছেড়ে আসা। অথবা তাকেও নতুনে ক্রমবর্ধিত করা। একদিকে অগ্রসর হচ্ছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে পিছনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রবল টানছে তাকে। ইথাকায় না ফিরলে সে আসলে কেউ নয়। এইখানে নিয়তির জন্ম। সে যে নতুন ওডিসিউস, পুরনো ওডিসিউসের খোলস খসে পড়ে গেছে, তা সে নিজেই মানতে পারছে না। ভয়ে, স্বভাবে, অভ্যাসে। যে তিনটেরই পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু সে যদি নিজেই মনে করে অসম্ভব তাহলে বৃত্তাকারে ফেরা ছাড়া রাস্তা কই!
কিন্তু ফেরার সময়েও থেকে যায় আসলে যা হতে চেয়েছি বা হতে পারতাম আর যা হলাম তার টানাপোড়েন। ইথাকায় ঢোকার আগে তাই তাকে আসতে হয় কেভ অফ নিম্ফস-এ। সেখানে নিম্ফেরা পাথরের তাঁতে রক্ত-মাংস বুনে বুনে আত্মাকে দেহ পরাচ্ছে। ঠিক যার কাছাকাছিই একদিন এ দেশে বহুল প্রচারিত গীতায় শুনবেন, বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় ইত্যাদি। ওঁরা পরাচ্ছিলেন দেহ, আর এখানে পুরনো বসনের মতো দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহে পুনর্জন্মের গল্প।
আসলে আশ্বাস। আসলে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। কারণ ওডিসিউস যদি বুঝে যায় ছয় বছরের সে আর ছত্রিশ বছরের সে এক নয়, কিছুতেই এক থাকতে পারে না, যদি বুঝে যায় ফেরার অর্থ আসলে নতুন পথ অন্বেষণ করে চলার বদলে পুরনোর সংস্কার থেকে শৃঙ্খল সবই মেনে নেওয়া, তাহলে ওডিসিউস নিয়তিকে মানবে না। তাহলে সম্পদ থেকে সমাজব্যবস্থার শাসনের হাল কিছুতেই ঠিক থাকবে না। চ্যালেঞ্জের পর চ্যালেঞ্জ শাসনের সিস্টেমকে ধসিয়ে দেবে। তাহলে সম্পদের মালিকানার কী হবে? মানুষের এই নতুনকে জানা-বোঝা, যাপন করা আর পুরনো ধাঁচার সম্পদ-মালিকানা ব্যবস্থার মধ্যে দোল খায় নিয়তি। যে নিয়তি তার হাতে একটি লজেন্স ধরিয়ে দেয়, তোমার তো চিন্তা নেই, এ জন্মে না হলে পরের জন্ম তো রইলই। একটি ভুয়ো প্রতিশ্রুতি যা কখনও পালিত হবে না।
মহাকাব্য সেই প্রতিশ্রুতিকেই বিপুলাকারে ধরে রাখে। পুরুষার্থ বনাম দৈবী বা নিয়তি— এই খেলায় পুরুষার্থকে হারিয়ে দেওয়া হয় কাহিনিতে। গ্রিকেরা যদি দলে দলে অজানা বিশ্বের খোঁজে চলে যায়, সেখানেই নতুন নতুন জীবনযাপন করে তাহলে গ্রিক বলে আর কে-ই বা থাকবে! তাহলে গ্রিক ব্যবস্থার, সম্পদের, শাসনের কী-ই বা হবে! রাজা থেকে পুরোহিত সকলেরই আসন থাকা আর না থাকা সমান হয়ে যাবে যে। অন্তত নতুন জায়গায় গেলেও পুরনো জায়গাকে সে যেন কর দেয়, সে যেন নিজের জায়গা বলে মনে করে। তবেই না গ্রিকই হোক অথবা ব্রিটেন, সাম্রাজ্য বজায় থাকবে।
অতএব ইথাকায় ওডিসিউসকে ফেরাতেই হবে। নিয়তিতাড়িত বলে চিহ্নিত করতে হবে। তবেই না মানুষের উদ্যম, অন্বেষণ, স্বপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষায় বাধ সাধা যাবে। প্রচলিত শাসনের বদলে নবীন এবং সম-সক্ষমতার শাসন ও সমাজের আসাকে ঠেকানো যাবে। আমাদের উপনিবেশও আমাদের এভাবেই ভাবতে শিখিয়েছে। কর্ণের রথচক্র আটকে যায় অভিশাপরূপী নিয়তির কাদায়। বর্ণাশ্রমিক সমাজে তার সম্পদ অর্জনের, সম্মান অর্জনের চেষ্টা নিছক ব্যর্থতা।
একলব্যের গল্পে যেমন। একলব্য নিজের সমাজকেই সম্মান করে না। দ্রোণ তাঁকে ধনুর্বিদ্যা শেখাননি। তাহলে একলব্য জানলেন কেমন করে শব্দভেদী বাণ চালাতে? তাঁর সমাজে যে অস্ত্রশিক্ষা ছিল তাতেই যে তাঁর শিকড়। বস্তুত দ্রোণের মতো শিক্ষকরাও যে এসব সমাজ থেকে এ শিক্ষা নিয়ে থাকতে পারেন তা একলব্য ভাবতেই পারেননি। এই যে বর্ণাশ্রমের নানা চেহারায় এঁটে বসা, এই যে ব্রাহ্মণ্যবাদ, একে চ্যালেঞ্জ করলেন পিটার ব্রুক? একদিকে সম্পদের এবং সম্মানের বিভাজন থাকবে, অন্যদিকে যুদ্ধ থেমে যাবে? অথচ এই নিয়তিতাড়ন হয়ে উঠল পিটার ব্রুকের ‘মহাভারত’ কিংবা পরের ‘ব্যাটলফিল্ড’-এর উপজীব্য। এই-ই বিশ্বনাট্য?
এমন নয় যে তিনি বা কাহিয়ের মহাভারতের টেক্সট নিয়ে কোনও স্বাধীনতা নেননি। অঢেল স্বাধীনতা নিয়েছেন। অম্বাকে সারাক্ষণ যুবতী করে রেখে দিয়েছেন নানা অংশে। তাঁর মৃত্যু বা শিখণ্ডীরূপ জন্মায়ইনি। কর্ণকে আচমকা এনেছেন চক্রে স্থাপিত মাছের চোখ বিদ্ধ করতে, কুরু রাজপুত্রদের অস্ত্রপরীক্ষার সময়, যা পরে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভার বিষয়। এমনই আর একটি অংশের কথা প্রদীপ ভট্টাচার্য ‘Peter Brook’s Mahabharata: The Film’ সমালোচনায় এনেছেন। এঁদের মহাভারতে আচমকাই পাশাখেলার আগে কৃষ্ণ এসে ভীষ্মকে বলে চলে যান, যা ঘটবে তা ঘটতে দিতে হবে। ভীষ্ম যেন তাতে হস্তক্ষেপ না করেন। তার ফলে দ্রৌপদীকে যুধিষ্ঠির বাজিতে হারলে যে জটিল ধর্ম ব্যাখ্যাকারী অংশের সূত্রপাত হয় তার মাহাত্ম্যই তরল হয়ে যায়। অপমানিতা, নিগৃহীতা, সম্মানচ্যুতা দ্রৌপদী প্রচলিত মহাভারতের সেই অংশে যখন ভীষ্মের কাছে ধর্মের কথা শুনতে চান, ভীষ্ম বলেন, ‘ধর্মের গতি অতি সূক্ষ্ম’। কী সেই ধর্ম?
ধৃ ধাতু থেকে আসা ধর্ম যেমন ধারণ বোঝায় তেমনই ‘ধনাৎ স্রবতি ধর্ম হি ধারণাদ্বেতি নিশ্চয়ঃ’ ইত্যাদিও বোঝায়। তাই-ই ধর্ম, যা ধন উৎপাদনে সহায়তা করে। এও আছে মহাভারতেই। এই যে আপাত দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্ব নিয়ে কাজ করার সক্ষমতাকে এড়িয়ে গিয়েছেন ব্রুকেরা। দ্রৌপদী সম্পদ? স্বামী পঞ্চপাণ্ডব প্রভু অর্থে? তাই যদি হয় তাহলে প্রশ্নটা হচ্ছে, দ্রৌপদীর স্বামীত্ব পাণ্ডবদের স্বাধীনতা বজায় থাকলেই তো থাকবে। তারাই দাস হয়ে গেলে স্বামীত্ব তো দূরের কথা, ক্রোধের অধিকারও থাকে না। দ্রৌপদীর স্বামীরা দাস হয়ে গেলে দ্রৌপদী, যিনি এমনিই সম্পদের মতো অধীন, তিনি আর স্বাধীন থাকেন কেমন করে? দাসের সম্পদ তো প্রভুর অধীন। তাহলে তাঁকে পৃথক বাজি ধরার অর্থই বা কী! কী অর্থ সেই বাজি হারা নিয়ে প্রশ্ন-উত্তরের? নারী এবং দাসের অধিকার সংক্রান্ত এই যে বিপুল গুরুত্বের অংশ, এখানে ব্রুকেরা প্রচলিতকে ভাঙার সাহস দেখালেন না। কেন?
বৈপরীত্য এবং বৈপরীত্য! অথচ ওঁরা কাজ করেছিলেন বিশ শতকে, যখন আবিশ্ব এক তুমুল চেতনার বিপ্লবে আন্দোলিত। নারী স্বাধীনতার আন্দোলন, শ্রেণি অধিকারের আন্দোলন চারপাশকে তছনছ করছে। সেই সময়কার জরুরি প্রশ্নগুলিই সযত্নে সরিয়ে রাখা কেন? এর উত্তর স্পষ্ট করে পেতে গেলে ব্রুকের নিজের কথাগুলোকেই লক্ষ করতে হবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ব্রুক যখন ‘US’ প্রযোজনাটি করছেন। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, তাঁর সহযোগীরা চাইছিলেন তিনি ভাল ব্রিটিশ সোশ্যালিস্ট হয়ে উঠুন। ভিয়েতনামিরা ভাল, আমেরিকানরা খারাপ জাতীয় নাট্য প্রযোজনা করুন। তিনি করেননি। বরং জানাচ্ছেন, “I wanted the audience to deal with a real tragedy; not to make right-wing people feel that they are in the right, nor to feel good as a left-wing person simply because you are in opposition”। তাহলে কী করলেন? তাঁর বক্তব্য অনুসারে তিনি একটি প্রযোজনা করলেন যা খানিক ‘requiem’-এর মতো। এই ‘requiem’ অর্থ আমরা এভাবে বুঝতে পারি, রোমান ক্যাথলিক চার্চে মৃত আত্মাদের শান্তির উদ্দেশে প্রার্থনা সঙ্গীত।
তাহলে? পিটার ব্রুক কি তাঁর ‘মহাভারত’-এ স্থিতাবস্থাকে প্রশ্ন করতে চেয়েছেন আদৌ? না কি মৃত আত্মাদের উদ্দেশে শান্তি সঙ্গীতের মতো ‘হস্তক্ষেপবিহীন’ ভীষ্মের ভূমিকা পালন করতে চেয়েছেন? তিনি নিজেই ১৯৯৫-এর একটি সাক্ষাৎকারেও বলছেন, “For me, today, Mahabharata is infinitely more profound in terms of politics and political education”। আবার তাঁরই কথায়, “Tradition itself, in times of dogmatism and dogmatic revolution, is a revolutionary force which must be safeguarded”। অতএব মহাভারতের মধ্যে থেকে রাজনৈতিক শিক্ষা আবিষ্কার করার চাইতে স্থিতাবস্থাকেই বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থেকেছেন।
সুনীল কোঠারি, তিনি একদা রবীন্দ্রভারতীর নৃত্য বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রধান, একটি স্মৃতিচারণায় পিটার এবং তাঁর দলের মণিপুরে রতন থিয়ামের কাজ দেখতে যাওয়ার কথা লিখেছিলেন। সেখানে একটি অংশ ছিল। রতনের কোরাস রেপার্টরি কমপ্লেক্সে যাচ্ছিলেন তাঁরা। কাছের রাস্তাটা খারাপ বলে সারানো হচ্ছিল। একটি ছোট্ট অগভীর নদীর ওপর একটি আপৎকালীন সেতু তৈরি করা হয়েছে। সম্ভবত সাঁকোই হবে। সবাইকে বলা হয়েছিল একে একে পার হতে, নইলে সেতু ভেঙে পড়বে। পিটার এবং বাকিরা উত্তেজনায় সবাই একসঙ্গে সেতুতে উঠলেন। সেতু ভেঙে নদীর জলে। আরও অনেকে তাঁদের উদ্ধার করতে ছুটে আসায় সুনীল সেই অবস্থায় ছবি তুলতে শুরু করেন তাঁদের। তা দেখে পিটার হাসতে হাসতে সুনীলকে বলেন তাঁর উচিত ছিল তাঁদের উদ্ধারে সহায়তা করা। সুনীল বলেছিলেন, পিটার, তোমার নাটকের মাধ্যমে ফ্রান্স এবং ভারতের মধ্যে তোমার সেতুবন্ধন করার কথা এবং দ্যাখো কী হল! সুনীলের রসিকতাময় উত্তরটি পিটারের ‘মহাভারত’ প্রযোজনার জন্যও সার্থক।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.