বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কোন সূত্রে বাঁধা

মোটকথা, এই গ্রহে প্রাণের আবির্ভাবের পর তার অস্তিত্ব নির্ভর করে আছে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যামানের (numerical values) ওপর, যার সামান্য এদিক-ওদিক পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে দিতে পারে।

দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়

[বিধিসম্মত সতর্কতা

প্রথাগত বিজ্ঞান প্রবন্ধ বলতে যা বোঝায়, এ লেখা ঠিক সেই গোত্রের নয়। এখানে আমার উদ্দেশ্য, সাধ্যমতো তথ্যনিষ্ঠ থেকে, দার্শনিক দুর্বোধ্যতায় ঢাকা পিলে চমকে দেওয়া কিছু প্রশ্ন থেকে গাম্ভীর্যের মোড়ক যতটা সম্ভব ছাড়িয়ে হালকা চালে কিছু ব্যতিক্রমী প্রশ্ন উসকে দেওয়া। পরিভাষার বা নির্দিষ্ট সমীকরণের জটিলতা তাই বর্জন করেছি। তাতে লেখার মূল সূর বুঝতে অসুবিধে হবে না বলেই আশা করি। অতি দীর্ঘ এক কালের বা বলা ভাল, মহাজাগতিক কালের পটভূমিতে কথাগুলো বলা হয়েছে। এক হিসেবে ধরেই নেওয়া হয়েছে যে, কোনও এক পরিমাপযোগ্য অতীতে এক মহাবিস্ফোরণের ফলে এ জগৎ চরাচরের জন্ম হয়েছিল! কিন্তু বলে রাখা দরকার যে, বিজ্ঞানের আর পাঁচটা চালু তত্ত্বের মতো এ তত্ত্বও যাকে বলে সব সংশয়ের ঊর্ধ্বে নয়।]

প্রশ্নমাত্রই কি উত্তর দেওয়া সম্ভব? কিছু উত্তর-অসম্ভব প্রশ্ন

শুরুটা এইভাবে করা যাক যে, সব প্রশ্নেরই কি উত্তর আছে? নিশ্চিতভাবেই না! কারণ যতরকম প্রশ্ন মানুষের মস্তিষ্ক ভাবতে সক্ষম তার বহু প্রকারভেদ আছে। ‘বাজারে কি ইলিশ এল?’ বা ‘পুঁটিরানির কি বিয়ে হয়ে গেছে?’ বা ‘করোনাভাইরাস কি সত্যিই উহানের ল্যাবে তৈরি হয়েছিল?’ এমন সরল সাদাসিধে প্রশ্ন থেকে ‘ব্রহ্মের স্বরূপ কী?’ বা ‘এ জগৎ কোথা হতে এল?’ বা সেই বিখ্যাত বঙ্কিমী প্রশ্ন, ‘এ জীবন লইয়া কি করিব?’… এ সবই প্রশ্ন হলেও এসবের উত্তর একইরকমভাবে সিধেসাধা নয়। ‘পুঁটির বিয়ে’ বা ‘ইলিশ ওঠা’ বা ‘উহানের ল্যাব’ নিয়ে সংশয় যেভাবে মোকাবিলা করা যায়, ‘ব্রহ্মের স্বরূপ’ নিয়ে তেমনটা চলে না। ব্যাপারটা এমনও নয় যে আজ জানা নেই, কিন্তু আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু, জানা ঠিকই যাবে। এ নিয়ে দার্শনিকরা বহুকাল ধরেই তর্কবিতর্ক করে চলেছেন। কিন্তু কেউ কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন বলে জানা যায়নি।
মোটকথা, সব প্রশ্নের যে সন্তোষজনক উত্তর থাকতেই হবে, এমন মাথার দিব্যি কেউই দিতে পারে না!
আমাদের শুরুর প্রশ্নটা একেবারে ওই ‘ব্রহ্মের স্বরূপ কী?’ গোছের না হলেও কিছুটা ওই জাতের তো বটেই। তবে ভরসা এই যে, এখানে উত্তরটা আঁচ করার কিছু নির্দিষ্ট উপায় হাতের কাছে আছে। অবশ্য খেয়াল রাখতে হবে, উত্তর দেওয়ার কথা বলছি না, কথা হল আঁচ করার।
সেকথায় ঢোকা যাক সোজাসুজি এবার।

Anthropic Principles ও মৌলিক ধ্রুবকেরা

বিজ্ঞান আলোচনার খুব গুরুগম্ভীর ক্লাসরুমের বাইরে কফি-ব্রেক আলোচনায় কান পাতলে কখনও Anthropic Principles-এর কথা কানে আসতে পারে। Anthropic-এর আভিধানিক মানে, মনুষ্য-কেন্দ্রীয় বা মনুষ্য-সংক্রান্ত বা মনুষ্য-নির্ভর। কিন্তু তার মানেটা কী দাঁড়াল?
চেষ্টা করা যাক সুতোগুলো খোলার।
বহুদিন ধরে বিজ্ঞানের অঙ্ক, সূত্র এসব নাড়াচাড়া করে পোড় খেয়ে কিছু বিজ্ঞানী একটু অন্যরকমভাবে ভাবতে বসেন। মানে চেনা জিনিসকেই একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা আর কি। তবে অনেকসময় এসব ক্ষেত্রে আবার বিজ্ঞানীর দার্শনিক বনে যাবার দুর্নাম রটে যায়। দলছুট হবার ভয় সব পেশাতেই কমবেশি থাকে। ফলে যাঁরা খুব বিখ্যাত বিজ্ঞানী, দল বা পেশার ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন বা যাঁরা একদম চিহ্নিত বিজ্ঞান দার্শনিক, তাঁরা ছাড়া এ জাতীয় প্রশ্নে মাথা ঠোকাঠুকির উদাহরণ প্রায় নেই বললেই চলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সিংহভাগ গবেষণাই চলে তেমন প্রশ্নগুলো নিয়েই যেগুলোর উত্তর অন্তত নীতিগতভাবে ভাবা হয়, পাওয়া যায়। যে প্রশ্নের উত্তরের সম্ভাব্য চেহারা নিয়েই ধোঁয়াশা তার পেছনে ছোটা খুব একটা কাণ্ডজ্ঞানের কথা বলে ভাবার চল নেই।
যাইহোক, এবার বিষয়টায় ঢুকি।
অনেক বিজ্ঞান দার্শনিক বলে থাকেন যে, বিজ্ঞান ওপর ওপর দেখতে নৈর্ব্যক্তিক (মানে ব্যক্তিমানুষ-কেন্দ্রীয় নয়।) হলে কী হয়, তার অবকাঠামো মজ্জাগতভাবে Anthropic বা মনুষ্য-কেন্দ্রিক। ব্যাপারটা খোলসা করে বললে কিছুটা এইরকম দাঁড়ায় যে, প্রকৃতির যত নিয়মকানুন তার কেন্দ্রে মানুষ বা আরও বৃহত্তর অর্থে প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশের এক ছদ্মবেশী উদ্দেশ্যের আবছা জলছাপ দেখা যায়। একথায় অনেকেই তারস্বরে প্রতিবাদ করবেন। কারণ একথা বলার মানেই হল, বিজ্ঞানে ঈশ্বরের ছদ্মবেশ খুঁজে পাওয়ার কথা বলা। সরাসরি যদিও বলা হচ্ছে না, তবে ঘুরিয়ে সেই নাকই ধরা হচ্ছে। কিন্তু তাতে খুব কিছু এদিক-ওদিক হয় না। একথা বললে ভুল হয় না যে, প্রাকৃতিক নিয়মকানুনগুলো (‘বুদ্ধিমান’) প্রাণীদের জীবনসহায়ক।
আরও একটু খোলসা করলে মন্দ হয় না— ভৌত অর্থাৎ প্রাকৃতিক জগতের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক নিয়ম জারি আছে, গাণিতিক সমীকরণগুলো যেগুলোর চিহ্নরূপ। এই গাণিতিক সমীকরণগুলোর মধ্যে আবার জায়গা করে নেয় কিছু মৌলিক ধ্রুবক (fundamental constant) এবং আরও নানারকম কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণগত সংখ্যা। সত্যি বলতে কী, বিজ্ঞানের কারবারই হল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাপতে পারা যায় এমন কিছু সংখ্যাসূচক ‘ধারণা’ ও তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে। এই সম্পর্কগুলোকেই আমরা সমীকরণ বলে বুঝি।

গত প্রায় ৩০০ বছরে নানা সূত্রে জানা মৌলিক ধ্রুবকগুলোর মধ্যে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G, আলোর গতি c, প্লাঙ্ক ধ্রুবক h, ইলেকট্রন ভর m ও আধান e, বোলৎসমানের ধ্রুবক k, গ্যাস ধ্রুবক R… এমন সব। এছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু ধ্রুবকের সমাহারও কিছু ক্ষেত্রে সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, যেমন fine structure ধ্রুবক (α), যার মধ্যে ঢুকে বসে আছে e, h আর c– 2/(ħc)!

fine structure ধ্রুবকের মান মোটামুটিভাবে ১/১৩৭। এই ১৩৭ সংখ্যা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের রথী-মহারথীরা বিস্ময়মাখা উচ্ছ্বাসে অনর্গল। গত শতাব্দীর একেবারে শুরু থেকে পরমাণুর অভ্যন্তরটা বোঝার চেষ্টার শুরু। আপাত জটিলতাহীন হাইড্রোজেন পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠনশৈলী থেকে নিয়ে এ সংখ্যার উপস্থিতির অব্যাখ্যাত স্বাক্ষর পড়া যায় আধুনিক Grand Unified Theory-র তাত্ত্বিক ঠাসবুনোটেও। প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব গাণিতিক ভাষার ইশারায় এই বিশেষ সংখ্যাকে আরও ভাল করে বোঝার আহ্বান জানিয়ে চলেছে।

এখানে সেই গাণিতিক ইশারার টেকনিক্যাল বিশদে যাওয়া সম্ভব নয়। সেটা এই লেখার সীমিত অবকাশে খুব জরুরিও নয়। উলফগ্যাং পাউলি নাকি চেয়েছিলেন মৃত্যুর পরেও এই সংখ্যা নিয়ে শয়তানের সঙ্গে সংলাপ চালাতে! রিচার্ড ফাইনম্যান নিশ্চিত ছিলেন যে ১৩৭ সংখ্যামানে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতির অজানা রহস্য ধরা আছে।

ফলকথা এই যে, আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডের গতি ও স্থিতির হালহকিকত— নিকট বা দূর, অতিক্ষুদ্র থেকে অতিবৃহতে ছড়িয়ে থাকা এই বিরাট বিপুল প্রাণ ও অপ্রাণের সংসারের fine tuning-এ কিছু অপরিবর্তনীয় সংখ্যামানই শেষ কথা বলে। এমনও বলা যায় যে, সৃষ্টি, স্থিতি আর প্রলয়ের যে পৌরাণিক ভূমিকায় একসময় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ছিলেন, বিজ্ঞানের নিয়মে বাঁধা চৌহদ্দিতে দেখা যাচ্ছে যে, আদতে সে ভূমিকা কিছু সংখ্যার!
এবার যে প্রশ্নটায় আসব তাকে পণ্ডিতরা counterfactual বলে থাকেন। নামটা একটু খটোমটো বটে কিন্তু মানেটা সোজা কথায় হল, এমন কিছু পরিস্থিতি যা সত্যি হয়নি বা হতে পারেও না, কিন্তু হলে কী হত এমন প্রশ্ন।
তবে পরিষ্কার গাণিতিক সমীকরণে ঠাসা বিজ্ঞানের চৌহদ্দিতে counterfactual-এর কথাটা ওঠে কীভাবে?
ওঠে এভাবে যে, ধরা যাক, যদি এই নিত্য অপরিবর্তনীয় ধ্রুবকগুলোর মানগুলো অনিয়মিতভাবে ওঠানামা করত, অর্থাৎ কিনা যা হয় না, তা যদি কখনও হত, তবে? এককথায় বললে যেটা হত তা হল, পৃথিবীতে প্রাণ সম্ভব হত না!

যদি অক্সিজেন হত হাইড্রোজেন আর হাইড্রোজেন হত অক্সিজেন

উদাহরণ না দিলে জমবে না। ধরা যাক, যে অক্সিজেন ছাড়া তাবৎ জীবকুল বাঁচতে পারে না সেই অক্সিজেন মলিকিউলের ভর বাস্তবে যা (৩২ অ্যাটমিক মাস ইউনিট বা ৫.৩১X১০-২৩ গ্রাম) তার থেকে অনেক কমে হাইড্রোজেনের সমান (২ এএমইউ) বা আরও কম হয়ে গেল! এ হল Counterfactual পরিস্থিতি। কী হত সেক্ষেত্রে?

পৃথিবীটাকে মুড়ে যে বায়ুমণ্ডলের চাদর আছে তার মধ্যে বিভিন্ন গ্যাস মলিকিউলের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাক্সওয়েলের গতি বন্টনের নিয়ম (velocity distribution law, ১৮৬২)। বিভিন্ন গ্যাস মলিকিউলের ভাগে বকেয়া যতটা গতির ভাগবাঁটোয়ারার সম্ভাবনা (most probable speed) সেটা তার ভরের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এবার প্রশ্ন আসে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের হাত ছাড়িয়ে পালানোর জন্য দরকারি গতি, যাকে বলে পলায়ন গতি (escape velocity) সেটার ন্যূনতম মান কত?
এ গতি কিন্তু পৃথিবীর বুকে হালকা, ভারী সব ধরনের বস্তুর জন্যই একরকম। মোটের ওপর ১১ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডে। অক্সিজেনের মলিকুলার ভার তুলনামূলকভাবে বেশি হবার কারণে বাতাবরণ তথা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় মায়া কাটিয়ে অক্সিজেনের পলায়নের সম্ভাবনা কম।

বায়ুমণ্ডলের জন্মকথা

কিন্তু আর একটু পিছিয়ে গিয়ে এই অক্সিজেনেরও প্রথম উৎপত্তির সময়টায় একটু উঁকিঝুঁকি দিয়ে এলে মন্দ হয় না। খুব বেশিদিন নয়, মোটামুটি বিলিয়ন তিনেক বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যখন তৈরি হচ্ছিল, তাতে অক্সিজেনের আবির্ভাব। আবির্ভাব কথাটাই মানানসই, কারণ তিন বিলিয়ন বছর আগে এই কাণ্ডটা না হলে আজকের এই পৃথিবীতে অক্সিজেনভুক মানবসভ্যতা আদৌ তৈরিই হত না। অন্য কী হত কেউ ভাবতে চাইলে ভাবুক।

একথা তো কমবেশি সকলের জানা যে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল একঝটকায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়নি। প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর আগের সেই সূর্য-ছেঁড়া বা অন্য কোনওভাবে হওয়া আগুনে গোলাটা ঠান্ডা হতে সময় নিয়েছে অনেকটাই। বেশ কিছু ধাপে ধাপে, দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে সেই প্রক্রিয়া চলেছে। সেই জলন্ত আগুনে গোলার বাতাবরণে, পণ্ডিতরা বলেন, সেসময় হাইড্রোজেন সালফাইড, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড এমন সব যৌগের মাতামাতি। আজকে প্রাথমিক রসায়নের ছাত্রদেরও জানা আছে যে এই যৌগগুলো গন্ধে, বর্ণে কেমন।

এরপর জলের জন্ম হয়েছিল। জনমানবহীন, বৃক্ষলতাগুল্মহীন, প্রাণহীন ন্যাড়া সেই আগুনে গোলাটা ততদিনে বেশ ঠান্ডা হয়ে এসেছে। অন্তত তার বাইরের খোলাটা। কিন্তু তখনও সেই ঠান্ডা-গরম গোলাটার পৃথিবী বা ধরিত্রী হতে ঢের দেরি। খুব অল্পকথায় আমরা এখানে লক্ষ লক্ষ বছর পেরিয়ে যাচ্ছি। সেই আগুনে গোলার খোলার ওপরে তখন কার্বন ডাই অক্সাইড আর নাইট্রোজেনেরও ছড়াছড়ি।
এবার শুরু হতে চলেছে জলের ফটোকেমিক্যাল বিশ্লেষণ (photochemical breakdown), যার মধ্যে দিয়ে তৈরি হবে অক্সিজেন। তার পর সাগর, পাহাড় তৈরির সঙ্গে সঙ্গেই প্রাণের আগমনের সম্ভাবনার শুরু। প্রথমে সামুদ্রিক গুল্ম, তার পর স্থলভূমিতে।
তবে তাড়াহুড়ো করা প্রকৃতির ধাতে নেই। প্রাণীকুল তৈরি হলে অতিবেগুনি রশ্মি তথা আরও পাঁচরকম ক্ষতিকর মহাজাগতিক হানাদার তরঙ্গের থেকে তাকে বাঁচাতে তাদের মাথায় ছাতা ধরার দরকার। ফলে ওজোন স্তর তৈরি হয়েছিল প্রাণের আবির্ভাবের আগেই। তাছাড়াও বাঁচার প্রশ্ন শুধু যে প্রাণীকুলের তা তো নয়, উদ্ভিদ গুল্মজাতীয় যারা সালোকসংশ্লেষে সক্ষম তারাই যেহেতু কার্বন ডাই অক্সাইডের বিনিময়ে অক্সিজেন তৈরি করবে, তাদের তো আগে বাঁচাতে হবে। সত্যিকারের মহাজাগতিক ‘প্রাণ’বায়ু তৈরির কাজটা তো তাদেরই। এতসব ঘরদোর গুছিয়ে যে কাজটা থাকল, সেটা হল, অক্সিজেন ঘনত্বকে তো অন্তত একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পেরোতে হবে (minimum critical level), যেটা হলে তাবৎ প্রাণীকুলের কোষে কোষে অক্সিজেনের যোগান নিশ্চিত করা যায়। ফলে আরও কিছু দিন— বেশ কয়েক লক্ষ বছর পার হয়ে এল অক্সিজেন-ভোজী জীবকুল। এরও ঢের পরে শেষমেশ মানুষ।
যাক, মানুষের আসার সে গল্প অন্য।

পূর্বনির্ধারিত না কি আকস্মিকতা?

অক্সিজেন ও তা নিয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীকুলের Anthropic সম্পর্কসূত্রটি— যদিও আকার-ইঙ্গিতে বলা হল— তবু আশা করি বোঝা গেল। এটা আকস্মিক না পূর্বপরিকল্পনা (কার?) সে নিয়ে অবশ্য আগামী প্রলয়কাল অবধি ধুন্ধুমার তর্ক করা যায়। এ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, দুই বিলিয়ন বছর আগে যেদিন জলের ফটোকেমিক্যাল বিশ্লেষণ শুরু হয়েছিল, সেদিনই কি তবে বহু বহুদূর ভবিষ্যতের একদিন প্রাণের তথা মানুষের আবির্ভাবের নীলনকশায় সিলমোহর পড়ে গিয়েছিল? তার পর শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল। বিবর্তন কি শুধুই ‘আগে থাকতেই’ তৈরি (কার তৈরি?) নীলনকশার ক্রম উন্মোচন?
কিন্তু তা বললে অনেক কিছুই অব্যাখ্যাত থেকে যায়। জগতে প্রাণীকুলের আবির্ভাবের সঙ্গে সম্ভাবনার তত্ত্বের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্কটা অস্বীকারের কোনও জায়গা নেই।
জগতে প্রাণের আবির্ভাবকে কোনওভাবেই প্রবল সম্ভাবনাময় ঘটনা (most probable event) হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। কিন্তু তবুও সেই অতীব অল্প সম্ভাবনাই বাস্তব হয়েছে!
এই প্রসঙ্গের মধ্যে এই ছোট্ট লেখার অবকাশে আর ঢুকছি না। শুধু উল্লেখমাত্র করা থাকল। কিন্তু এই ছোট উদাহরণে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, ম্যাক্সওয়েলের গতি বন্টনের সূত্রকেও একরকম Anthropic rule হিসেবে দেখা যেতেই পারে। এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। তার মধ্যে গিয়ে কাজ নেই। মোটকথা, এই গ্রহে প্রাণের আবির্ভাবের পর তার অস্তিত্ব নির্ভর করে আছে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যামানের (numerical values) ওপর, যার সামান্য এদিক-ওদিক পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে দিতে পারে।

ঈশ্বর কি তবে গণিতবিদ

সুতরাং আমাদের শুরুর প্রশ্নটার সম্ভাব্য উত্তরের একটা খুঁটো বাঁধা থাকে বলে দেখছি মূলত গণিতের কার্যকারিতা নিয়ে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন (যদিও উত্তর নেই!) যে, প্রকৃতি কেন গণিতের জটিল পরিভাষাতেই ধরা দিতে চায়?
এতে গণিতে যারা বাঘ-ভাল্লুক দেখে থাকে তারা ভারি রাগ করে বটে কিন্তু সত্যিই জগৎ ব্রহ্মাণ্ড বানিয়ে সেখানে বুদ্ধিমান প্রাণীর বেঁচে থাকার এতশত মোটঘাট বাঁধা সম্ভব হত না যদি না খুব খানিক সূক্ষ্ম গাণিতিক হিসেবের কারুকার্য এর পেছনে থাকত!
ফলে যেমন একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষও করা যাক তেমন একটা প্রশ্ন দিয়েই, যার যথারীতি কোনও উত্তর নেই। ঈশ্বর বলে কেউ বা কিছু থাকলে তিনি কি গণিতজ্ঞ?
উত্তরের হদিশ না থাকলেও প্রশ্নটা ভেবে দেখা যেতে পারে। সময় অনন্তকাল।

সূত্র 

১) “When I die my first question to the Devil will be: What is the meaning of the fine structure constant?” — Pauli।
২) কে না জানে যে, গ্রহ-তারা মায় সৌরজগতের জন্মকথা নিয়ে অনুমানের শুরু লোককথা, কল্পকাহিনি দিয়ে, সেই কবে, সভ্যতার আদিকাল থেকেই। কিন্তু গল্পকাহিনি বানানোর সঙ্গে সঙ্গেই খালিচোখে আকাশ দেখতে থাকার বা যাকে বলা যায় observational astronomy, তার শুরুও বহু বহুকাল আগে থেকেই। সূর্য ছিঁড়ে পৃথিবীর সৃষ্টিকথা তত্ত্ব হিসেবে আজ আর যদিও তেমন চালু নয়, তবুও অতিবৃহৎ দেশকালের মহাজাগতিক পরিসরে কোটি কোটি বছর আগে হয়ে থাকা একটা ‘ভবিষ্যতে বাসযোগ্য’ গ্রহর জন্মের মতো কোনও অতিবিশেষ ঘটনার কারণ যে একেবারে নিঃসংশয়ে বলা যাবে, তা হয়তো নয়। বিজ্ঞানে অগাধ আস্থা রাখা কেউ হয়তো সে আশা পোষণ করতেই পারেন। কিন্তু শুরুর সেই খালিচোখের observational astronomy-র যদিও আজ দৈত্যাকার Telescope আর Satellite-এর যুগে পর্বান্তর ঘটে গেছে, আর তার সঙ্গত করতে হাজির নিত্যনতুন ঝকঝকে গণিতে মোড়া তত্ত্ব, তবুও শেষ কথা বলার অবকাশ এখনও আসেনি। আদৌ কি আসবে? অনেকগুলো competing Theory-র মধ্যে কোনও একটার পালে হয়তো অনুকূল পর্যবেক্ষণের বাতাস লেগে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। ইদানীং ভাবা হচ্ছে যে, এক অকল্পনীয় জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মহাজাগতিক মেঘেরা দানা বেঁধে একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে এ ব্রহ্মাণ্ড চরাচর তৈরি করেছে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (General Relativity Theory) তাত্ত্বিক কাঠামো এই দানা বাঁধার প্রক্রিয়া (Gravitational collapse mechanism) বোঝায় কাজে লাগানো হয়। প্রস্তাবটা অবশ্য বেশ পুরানো, উনিশ শতকের একদম গোড়ার দিকে ল্যাপলাসের। কিন্তু হালে তাকে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গাণিতিক পরিভাষায় মুড়ে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই সৃষ্টি প্রক্রিয়া চলেছে ও চলবে। গ্রহ-তারা মায় আস্ত সৌরজগতের জন্ম-মৃত্যুর এ অলাতচক্র চলতেই থাকবে। এই লেখার মূল সূর ধরতে আপেক্ষিক তত্ত্বের টেকনিক্যাল জটিলতার প্রয়োজন হবার কথা নয়। তবে উৎসাহীরা খুঁজলে ইউটিউবে সৃষ্টিকথার অজস্র ভিডিও পাবেন।

মতামত জানান

Your email address will not be published.