বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পেরুস্কোপ

আমাদের এই ক্লাইম্বটা ছিল রুরেকের ইস্ট ফেজ ধরে মোটামুটি সরাসরি একটা ক্লাইম্বিং লাইন। আর এই আনকমন রুটে ক্লাইম্বে রইল একজন ভারতীয়ের নাম।

অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়

পর্ব ১০

১৩ জুলাই, ২০১৮, উয়ারাজ

৯ জুলাই জলখাবারের পরই পিয়েত্রো আর ফ্রেদেরিকো ওদের সাজসরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্য নর্থ রিজের অ্যাপ্রোচ রেকি করা। আমরা এতদিন লাগুনা রাহুকোল্টাকে আমাদের বাঁহাতে রেখে উয়ানসানের পশ্চিম হিমবাহতে উঠছিলাম। এবার ওরা লেকটাকে ডানদিকে রেখে সেই একই গ্লেসিয়ারের উত্তর প্রান্তে ঢোকার চেষ্টা করবে। এইদিক থেকে গ্লেসিয়ারে পৌঁছনোটা যে কোনও সমস্যা হবে না তা আমরা সাউথ রিজের পথে যাবার সময়ই ওপর থেকে দেখেছিলাম। গ্লেসিয়ার বেডে উঠতে ওদের একটা পাথুরে গালি (gully) দিয়ে উঠতে হবে ঠিকই তবে সেই গালির পথে কোনও রক-ফল (rock fall) কিংবা অ্যাভালাঞ্চ নেমে আসার আশঙ্কা যে নেই তা পাহাড়ের গা দেখেই আমরা বুঝে গেছিলাম।

নেভাদো রুরেকের ক্লাইম্বিং রুট।

পিয়েত্রোরা বেরিয়ে পড়ার পর আমরা বাকিরা আবার এক রাউন্ড মিটিংয়ে বসলাম। চেজার, ফ্রেডির সঙ্গে ৮ তারিখ সন্ধেতেই দীর্ঘ আলোচনা আমার হয়েছিল। আলবের্তোকেও আভাস দেওয়া ছিল আমাদের একটা অতি দ্রুত সামিট করার পরিকল্পনার ব্যাপারে। পিকও দেখাই ছিল। কিন্তু দলনেতার কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল আসা জরুরি ছিল। এবার তাই আর এক রাউন্ড ফাইনাল মিটিংয়ে বসা হল। একটু বড় টিমের এটা একটা সুবিধা। বড় দল ভাগ হয়ে গিয়ে একইসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যে এগোতে পারে। অভিযানের শেষে সবার চেষ্টায় যা হল তা অভিযানের সম্মিলিত সাফল্য। এই যেমন পিয়েত্রো এবং ফ্রেদেরিকো নর্থ রিজ রেকি করার ফাঁকে বাকি দলটা বসে থাকছে না। তারা চেষ্টা করছে একটা পিক ক্লাইম্ব করে ফেলার।

বেস ক্যাম্পে আড্ডা চলছে। ফ্রেডি, চেজার, এডুইন, মালু, ফ্রাঞ্চেস্কো (বাঁদিক থেকে ডানদিক)।

মেস টেন্টে ঢুকে টেবিলের ওপর ম্যাপটা ছড়িয়ে খুলে বসা হল। উয়ানসানের সাউথ রিজ যেখানে হিমবাহে এসে মিশেছে সেখানে একটা কল (col) রয়েছে। সেই কল থেকেই গ্লেসিয়ারকে বেড় দিয়ে মোটামুটিভাবে পশ্চিম দিকে চলে গেছে আর একটি গিরিশিরা। কল থেকে সরাসরি উঠেই সেই গিরিশিরাটি একটি শিখর তৈরি করেছে। তার পর আরও পশ্চিমে গিয়ে সেই লাগুনা আহুয়াকের কাছে পৌঁছে শেষ হয়েছে তার বিস্তার। এই কল-সংলগ্ন শৃঙ্গটির উচ্চতা ৫৭০০ মিটার এবং নাম নেভাদো রুরেক। ‘নেভাদো’ কথাটার অর্থ শৃঙ্গ। কর্ডিয়েরা ব্লাঙ্কায় সব পিকের নামের আগেই একটা সম্মানসূচক ‘নেভাদো’ বসানো হয়। যাইহোক, নেভাদো উয়ানসানের সাউথ রিজ ক্লাইম্ব করার বিফল প্রচেষ্টা থেকে ফেরার পথেই নেভাদো রুরেক আমার নজরে ছিল। ৮ তারিখ বেস ক্যাম্পে ফেরার পথেই চেজারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার বিশদ আলোচনাও হয়েছিল। আসলে হিমালয়ে দীর্ঘ দু-দশকের এক্সপ্লোরেটরি ক্লাইম্বিং অভিজ্ঞতা আমাকে বরাবরই বলছিল, এ ধরনের অভিযানে একবারের চেষ্টাতেই মূল শিখর আরোহণের সম্ভাবনা খুবই কম থাকে— তা সে যেখানেই হোক না কেন এবং যত শক্তিশালী দলই হোক না কেন। এই ধরনের অনিশ্চয়তার প্রাথমিক কারণ হল, এলাকাটা যে অজানা, অচেনা! সবটাই সারপ্রাইজ! এক্সপ্লোরেটরি ক্লাইম্বিংয়ের সবটাই আবিষ্কার ও পুনরাবিষ্কারের চ্যালেঞ্জ এবং প্রাপ্তির আনন্দে ভরপুর। এদিকে চেজার, ফ্রেডি, মালু সকলেই খুব খুশি হয়েছিল এই প্রস্তাবে। ৯ জুলাই সকালে ম্যাপ খুলে আলবের্তোকে ব্যাপারটা খুলে বলতেই সে খুব উৎসাহের সঙ্গে সম্মতি দিল আমাদের। সাত দিন পার হয়ে গেছে, উয়ানসানের দোরগোড়ায় বসে আছি। এইবেলা একটা ক্লাইম্ব যেন না হলেই নয়।

রাতের তুষারপাতে আমাদের তাঁবুর অবস্থা।

১০ জুলাই। আমরা চারজন এক রাতের রসদ এবং ক্লাইম্বিং সরঞ্জাম নিয়ে আবার সেই ক্যাম্প ওয়ানের পথ ধরলাম। বেস ক্যাম্পে আসা থেকে এই নিয়ে তিনবার উঠছি একই রাস্তায়, তাই পথের দৈর্ঘ্য এবং শ্রম দুটোই যেন অনেক কমে গেছে। ফলে, একবারও না থেমে সেদিন আমরা পোঁছে গেলাম সেই ক্যাম্প সাইটে যেখান থেকে মাত্র তিন দিন আগেই আমরা চেষ্টা করেছিলাম উয়ানসানের সাউথ রিজ।

উয়ানসানের পশ্চিম ফেসের মাথায় সিরাস মেঘের ঘনঘটা।

ক্যাম্প পৌঁছে তাঁবু লাগানোর পর আমরা চারজন যে যার মতো ছড়িয়ে পড়লাম। আমি গ্লেসিয়ারে না ঢুকে তাঁবু লাগোয়া পাথরের ঢাল ধরে কিছুটা স্ক্র্যাম্বল করে উঠতে লাগলাম। উদ্দেশ্য শরীরটা গরম রাখা, অ্যাক্লিমেটাইজেশন পদ্ধতিটাকে চালু রাখা এবং একইসঙ্গে একটু উঁকিঝুঁকি মেরে ক্যাম্পের আশেপাশের ভূগোলটা খতিয়ে দেখা— এই আর কি! শ’দুয়েক ফুট ক্লাইম্ব করে একটা পাথুরে শেল্‌ফ গোছের জায়গা পেলাম। সেখান থেকে পেলাম ক্যাম্প এবং উয়ানসান ওয়েস্ট গ্লেসিয়ারের হিমপ্রপাতের এক অসাধারণ দৃশ্য। কিছুক্ষণ বসে থাকলাম সেখানেই। সুর্য ক্রমশ ঢলতে লাগল, একটা দমকা ঠান্ডা হাওয়া আমাকে যেন বলল, এবার তাঁবুতে ফেরার সময়। দু-একটা ছবি তুলে আমি তাঁবুতে ফিরলাম। তবে তাঁবুতে ঢোকার আগে চার বন্ধু মিলে বরফ গলিয়ে প্রথমে এক রাউন্ড স্যুপ, তার পর একটু পাস্তা বানালাম। শেষে একটা করে গ্রিন-টি খেয়ে, সকালের জন্য যে যার বোতলে জল ভরে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম। টেন্ট পার্টনার সেই আগের মতোই। আমি আর মালু একটা টেন্টে, এদিকে চেজার আর ফ্রেডি অন্যটায়।

শুরু হল রুরেকের ইস্ট ফেস ধরে ক্লাইম্ব।

১১ জুলাই। ভোর তিনটেয় সবাই অ্যালার্ম দিয়েই শুয়েছিলাম। একপ্রস্থ চা আর বিস্কুট, ব্যাস। তৈরি হওয়া শুরু। ভোররাতের আধো অন্ধকারে যন্ত্রের মতো কাজ। জুতো-ক্র্যাম্পন-হারনেস-হেলমেট। হেড টর্চের আলোয় একে অপরের ইকুইপমেন্ট চেক। তার পর রোপ-আপ করে ক্লাইম্ব শুরু। আজ দুটো রোপে ভাগ করে আমরা চারজন। ফ্রেডি আর মালু একটা রোপে, আর অন্য রোপে আমি আর চেজার।

ক্লাইম্বের ফাঁকে ক্ষণিকের বিশ্রাম। লেখক আর চেজার। ছবি তুলেছেন ফ্রেডি।

ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে প্রথম এক ঘণ্টা পরিচিত রাস্তা। সেই ক্যাম্প থেকে একটা বড় ক্রিভাসে নামা। তার পর সেই ক্রিভাস থেকে একটা স্নো স্লোপ ধরে গ্লেসিয়ার বেডে উঠে পড়া। তার পর গ্লেসিয়ারে মাঝামাঝি ধরে সরাসরি দক্ষিণে, অর্থাৎ কলের দিকে এগিয়ে চলা। আধো অন্ধকারে হিমবাহে চলার মধ্যে একটা ম্যাজিক আছে। সেই ম্যাজিকের উপাদান ছড়িয়ে আছে তার রহস্যময় অন্ধকারে, পায়ের সামনে তৈরি হওয়া হেড টর্চের আলোর বৃত্তে, প্রতিটি পদক্ষেপে বরফে দাঁত বসানো ক্র্যাম্পনের কামড়ে এবং নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের ঘনীভূত উত্তেজনায়। আমরা যাচ্ছি একটু একটু করে, এক পা এক পা করে আমরা এগোচ্ছি আমাদের লক্ষ্যের দিকে। রাতের অন্ধকার একটু একটু করে সরে গিয়ে জায়গা করে দিচ্ছে দিনের আগমনের। উয়ানসানের দেওয়াল কালো থেকে হয়ে উঠছে গভীর নীল। সুর্য উঠবে এবার চাভিন উপত্যকায়, পাহাড়টার অন্য দিকে। আমাদের গায়ে, এই গ্লেসিয়ারে তার আভাস আসতে দেরি ঢের। তবে আশার আলো লাগছে আমাদের ডানদিকের গিরিশিরায়— আমাদের গন্তব্য যেদিকে। যেন বলছে, তাড়াতাড়ি ক্লাইম্ব শুরু করো আমার গা বেয়ে, তাহলেই তো রোদের ছোঁয়া পাবে।

সামিট হাতের নাগালে।

এমনই নিজের সঙ্গে কথা বলার একমুহূর্তে আমরা সবাই একটু দাঁড়িয়ে পড়ি। এবার গ্লেসিয়ার বেড ছেড়ে সরাসরি বরফের দেওয়াল বেয়ে ক্লাইম্ব শুরু করতে হবে। একটার পর একটা স্নো- স্লোপ, র্যা ম্প— ক্লাইম্ব করে উঠতে থাকি আমরা চারজন। মাঝেমধ্যে বেদম হয়ে দাঁড়ানোর সময় ছাড়া একেবারেই কথা হয় না কারও মধ্যে। ব্রেক নেবার সময় আমরা সেই যন্ত্রের মতোই কাজ করে চলি। তখন স্যাক নামাই পিঠ থেকে, একচুমুক জল খাই, হয়তো একটা লজেন্স মুখে দিই, একটা-দুটো ছবি তুলি। তার পরই আবার পিঠে স্যাক তুলে ক্লাইম্ব শুরু।

নেভাদো রুরেক সামিট। চেজার, মালু, ফ্রেডি (বাঁদিক থেকে ডানদিক)।

আজকের ক্লাইম্ব পুরোটাই পিচ-বাই-পিচ, একে অপরকে বিলে করে আমরা উঠতে থাকি। কখনও আমরা, আবার কখনও ফ্রেডি-মালুরা লিড করে, রুট ওপেন করে। প্রত্যেকটা ধাপেই ইশারায় কথা হয়, পরের পিচ অফ ক্লাইম্ব কোন দিকটা দিয়ে হবে সেটা ঠিক করা হয়। একটা সময় আমরা একটা বড়সড় আইস ফিল্ডে পৌঁছে যাই। আইস ফিল্ড, অর্থাৎ একটা ছোটখাটো বরফের ময়দানের দু’দিকে দুটো শৃঙ্গ দেখা যায়। কন্ট্যুর ম্যাপের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে আমরা বুঝতে পারি, ওই দূরের পিকটাই নেভাদো রুরেক।

সামিট শট। চেজার, মালু ও লেখক। ছবি তুলেছেন ফ্রেডি।

আরও এক ঘণ্টা পর পৌঁছে যাই শিখরে। উয়ানসানের আকাশে তখন সিরাস মেঘের ঘনঘটা। এত সকালেই মেঘেদের ব্যস্ততা দেখে মৃদু শঙ্কা হয়। তবু একটা সামিট বলে কথা। এই অভিযানের প্রথম সামিট। মালুকে দেখি আনন্দে প্রায় নাচছে। সবাই মিলে কিচ্ছুক্ষণ একে অপরকে ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা বিনিময় করার পর শুরু হল ছবি তোলার পালা। গ্রুপ ছবি, একলা ছবি, সেলফি— কিছুই বাদ গেল না। এদিকে মেঘেদের নড়াচড়ার ঘনঘটা এতক্ষণে সমাবেশের রূপ নিয়েছে। আর আমাদের অনেকটা পথ ফিরতে হবে। ক্যাম্প ওয়ান নয়, ফিরব সরাসরি বেস ক্যাম্প। পিক যখন ক্লাইম্ব হয়েই গেছে, কে আর এই ঠান্ডায় বসে থাকে! বেস ক্যাম্পের আপাত উষ্ণতা আর এডুইনের রান্না তখন আমাদের ডাকছে।

সামিট শট। লেখক, চেজার, ফ্রেডি। ছবি তুলেছেন মালু।

সামিটে দাঁড়িয়ে এটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে রুরেক পিকেরও বেশ কয়েকটা সাব-সামিট রয়েছে। আর রুরেকের সামিট তো বেশ প্রমিনেন্ট। আমার ভালো লাগছিল মূলত দুটো কারণে। এক, আমাদের এই অভিযানে এই প্রথম একটা সামিট আরোহণ হল। দলের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য এরকম একটা সাফল্য খুব দরকার ছিল। দুই, রুরেক পিকে এই প্রথম আমাদের আগে একাধিক ক্লাইম্ব থাকলেও সেগুলো সবই ছিল হয় তার পশ্চিম ফেজ ধরে, না হয় উয়ানসানের সাউথ কল থেকে। আমাদের এই ক্লাইম্বটা ছিল রুরেকের ইস্ট ফেজ ধরে মোটামুটি সরাসরি একটা ক্লাইম্বিং লাইন। আর এই আনকমন রুটে ক্লাইম্বে রইল একজন ভারতীয়ের নাম।

নেভাদো রুরেক সামিট থেকে দেখা রুরেক নর্থ সামিট।

পিক থেকে নামার সময় দেখলাম, ইস্ট ফেজের যে রুটে উঠে এসেছি তার থেকে উয়ানসানের সাউথ কোলে নেমে যাওয়াটা অনেক সহজ হবে এবং গ্লেসিয়ার বেডে অনেক কম সময়ে আমরা পৌঁছে যাব। অতএব যেমন ভাবনা তেমন কাজ। আমরা হইহই করে, কখনও প্লাঞ্জ স্টেপ করে, কখনও ডাউন ক্লাইম্ব করে অচিরেই পৌঁছে গেলাম হিমবাহের আপাত নিরাপত্তায়। মন থেকে যেন এক বিরাট ভার নেমে গেল। একটা পিক ক্লাইম্ব করে আজ আমরা ফিরছি বেস ক্যাম্পে। এক ঘণ্টার মধ্যে ক্যাম্প ওয়ান সাইটে পৌঁছে, সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে আবার নামা শুরু।

সামিট থেকে দেখা উয়ানসান সাউথ ওয়েস্ট ফেস।

বিকেল তিনটে নাগাদ সবাই পৌঁছে গেলাম বেস ক্যাম্প। এডউইন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল হাতে জুসের কেটলি নিয়ে। আলবের্তো আর এনরিকো দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে। কাছে আসতেই একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরল দলনেতা। অনেক হাসিঠাট্টায় আবার ভরে উঠল বেস ক্যাম্প। সন্ধেয় ডিনারের পর গল্পের আসর জমে উঠল। সামিটে যাবার রুট খুঁজে বের করার গল্প, ক্রিভাসগুলোকে পাশ কাটানোর গল্প আর সাউথ কল হয়ে নেমে আসার গল্প। একটা রুটে ক্লাইম্ব করে অন্য রুটে নেমে আসা— এ তো একরকম সামিটকে ট্রাভার্স করাও হয়ে গেল। তাই আবার একচোট আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল মেস টেন্টে। আর মোটামুটি সেই সময়ই ওয়াকিটকিতে ভেসে এল পিয়েত্রোর গলা। ওরা ভাল আছে এবং নর্থ কলে ওরা আজ উঠে আবার গ্লেসিয়ারের ক্যাম্পে ফেরত এসেছে। ওদের রেকি অনুযায়ী নর্থ রিজ সাউথ রিজের থেকে অপেক্ষাকৃত কম বিপজ্জনক, অতএব একটা চেষ্টা করা উচিত। আলবের্তো জানায়, পরদিন, অর্থাৎ ১২ জুলাই বলিভিয়ার দুই ক্লাইম্বার বেস ক্যাম্প এসে পৌঁছবে। ওরা এলে নর্থ রিজে ওদেরকে ক্লাইম্বিংয়ের সুযোগ দিলে ভাল হয়। সেদিন বড় ক্লান্ত লাগে। তাই আর কিছু চিন্তাভাবনা না করে আমরা যে যার তাঁবুতে ঢুকে পড়ি।

মাকাস্কা গ্রাম যাবার পথে কেচুয়া ঠাম্মা।

১২ জুলাই। একটু বেলার দিকেই বেস ক্যাম্প এসে পৌঁছায় দুই তরুণ বলিভিয়ান এভো আর আস্কে। এভো বলে তার ক্লাইম্বিং জুতোর অবস্থা ভাল নয়। ঘটনাচক্রে আমার জুতো এভোর পায়ের সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। এক বিচিত্র পরিস্থিতির উৎপত্তি হয়। আমি এভোকে আমার ক্লাইম্বিং জুতো দিয়ে দেওয়া মানে হল এই অভিযানে আমার ক্লাইম্বিংয়ের পালা শেষ। আমি বেশ অবাক হয়ে যাই ইকুইপমেন্টের অভাব দেখে। এমনটা হবে আমি সত্যিই আশা করিনি। যাইহোক, আমি বেশ বুঝতে পারি যে বলিভিয়ার ছেলেদুটোকে ক্লাইম্বিংয়ে সুযোগ না দেওয়াটাও সত্যিই দুঃখজনক তাদের পক্ষে। এমনিতেই বুঝে গেছিলাম উয়ানসান মেন শিখর এ যাত্রায় ক্লাইম্ব অসম্ভব। তাই আনন্দের সঙ্গেই আমার ক্লাইম্বিং জুতোজোড়া এভোকে দিয়ে দিই। আর সঙ্গে আলবের্তোকে এটাই জানিয়ে দিই যে আমি তাহলে আর বেস ক্যাম্পে বসে দিনযাপন করব না। নিজের মালপত্র নিয়ে পত্রপাঠ নীচের দিকে রওয়ানা হব। পেরু হয়তো ইহজীবনে এই একবারই আসা হবে। তাই আমার ক্লাইম্বিংয়ের পালা যখন শেষ তখন আমি নিজের মতো ঘুরে বেড়াতে চাই। দেখতে চাই বাকি দেশটার যতটা সম্ভব। আলবের্তো, এনরিকোর কোনও অনুরোধই আর কানে তুলি না। একবার যখন মনস্থির করে ফেলেছি তখন আমাকে আর রুখছে সাধ্য কার!

মাকাস্কা গ্রামের একটি বাড়ি।

১৩ জুলাই। বেস ক্যাম্পের সবাইকে বিদায় জানিয়ে, আমার লোটা-কম্বল পিঠে তুলে নেমে চলি সেই রোড হেডের দিকে। কোনও গাড়ি পাব না জানা ছিল। ফলে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা পুরোটাই হেঁটে নেমে আসি প্রথমে সেই ন্যাশনাল পার্কের গেটে, যেখান থেকে আসার সময় খচ্চরেরা আমাদের মাল লোড করেছিল। তার পর গাড়ির রাস্তা ধরে, আপনমনে গান গাইতে গাইতে একসময় পৌঁছে যাই মাকাস্কা গ্রাম। মাকাস্কা থেকে উয়ারাজ যাওয়ার গাড়ি পেতে পারি একথা আমাকে চেজার বলে দিয়েছিল। বিকেলের দিকে একটা গাড়ি আমাকে লিফ্‌ট দেয় উয়ারাজ পর্যন্ত। সন্ধের মুখে আমি পৌঁছে যাই সেই ব্রাজিলিয়ান মহিলার হস্পেদাহেতে। মনে হয় যেন ঘরে ফিরে এসেছি।

ছবি : লেখক

(পরের পর্ব আগামী মঙ্গলবার)

পেরুস্কোপ পর্ব ১

পেরুস্কোপ পর্ব ২

পেরুস্কোপ পর্ব ৩

পেরুস্কোপ পর্ব ৪

পেরুস্কোপ পর্ব ৫

পেরুস্কোপ পর্ব ৬

পেরুস্কোপ পর্ব ৭

পেরুস্কোপ পর্ব ৮

পেরুস্কোপ পর্ব ৯

মতামত জানান

Your email address will not be published.