বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পেরুস্কোপ

সাউথ সামিট পৌঁছনোর আগেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সাব-সামিটের বিশাল বরফ মাশরুম। সেই মাশরুমের ওভারহেড বিপদ উপেক্ষা করে ক্লাইম্ব করাটা আমাদের সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল উন্মাদনার সমান।

অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৯

৮ জুলাই, ২০১৮, বেসক্যাম্প

জুলাইয়ের ৪ তারিখের রেকি এবিং ফেরি সফলই হয়েছিল বলা যেতে পারে। লোড ফেরির থেকেও জরুরি কাজ ছিল রেকি (এই ‘রেকি’ শব্দটি আসলে ইংরাজি ‘reconnaissance’ –এর সংক্ষিপ্ত রূপ ‘recce’)। আসলে, বহুবছর পর কেউ উয়ানসানের এই দিকগুলোয় যাচ্ছিল। তাই হিমবাহ এবং গিরিশিরার কী পরিস্থিতি, সেগুলো কতটা নিরাপদ, একটা ক্লাইম্বিং রুট ঠিক করা, নিরাপদ ক্যাম্পসাইট দেখে রাখা— এই সব কিছুর জন্যই একটা রেকি প্রয়োজনীয় ছিল। আর যাচ্ছিলামই যখন, খালি হাতে কেন যাব? তাই একটু লোড ফেরিও করা হয়েছিল।

বেসক্যাম্পে মেসটেন্টের ধারে বসে আড্ডা।

যাইহোক, ৪ তারিখের রেকিতে এটা স্পষ্ট হয়েছিল যে, আমেরিকান ডিরেক্ট রুট ভেঙে গেছে। আমরা কেন, ওই রুটে আর কেউই ক্লাইম্ব করতে পারবে না। এটাও বোঝা গেছিল যে, সাউথ-ওয়েস্ট রিজ ধরে একটা চেষ্টা করা যেতে পারে এবং এদিক দিয়ে গেলে গ্লেসিয়ার থেকে একটা নিরাপদ লাইন অফ ক্লাইম্ব আছে যেটা ধরে রিজের মাথায় উঠে পড়া যাবে। তাই ৪ তারিখ রাতে বেস ক্যাম্পে ফিরে টিম মিটিংয়ে ঠিক হয়েছিল উয়ানসানের শিখরের উদ্দেশে প্রথম আক্রমণ এই সাউথ-ওয়েস্ট রিজ দিয়েই করা হবে।

উয়ানসান পশ্চিম হিমবাহের পাশে আমাদের ক্যাম্প ১।

পরদিন, অর্থাৎ ৫ জুলাই, সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হল বিশ্রাম নেওয়া হবে। একটা স্ট্র্যাটেজি যখন দানা বাঁধলই তখন ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একটু দম নিয়ে নেওয়া যাক— এই আর কি। বেস ক্যাম্পে বিশ্রামের দিন সবসময়ই বড় মিষ্টি লাগে আমার। একটু দেরি করে, আয়েশ করে ঘুম থেকে ওঠা। সূর্যের আলো টেন্টের গায়ে পড়ার পরই বেরিয়ে আসা। তার পর কিচেন টেন্টের সামনে এক মগ গরম চা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ খোশগল্প। এরপর জলখাবার সেরে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়া। কেউ সরু ঝোরার জলে জামাকাপড় কাচতে, কেউ দাড়ি কামাতে ব্যস্ত। আবার কেউ রোদে পিঠ রেখে আধশোয়া হয়ে একটা বইয়ে মুখ গুঁজল। কেউ চলল একটু হেঁটে বেড়াতে। সকলের দেখা হবে আবার সেই লাঞ্চে।

ক্যাম্প ১, পিছনে দেখা যাচ্ছে উয়ানসানের সাউথ-ওয়েস্ট রিজ।

আমি যোগ দিলাম হেঁটে বেড়ানোর দলে। দল ছোট্ট। আমি, আলবের্তো আর এনরিকো ফেরি। সেই বেস ক্যাম্প আসার দিন থেকেই এনরিকো আমার হাঁটার সঙ্গী। বড় অদ্ভুত মানুষ এনরিকো। পেশায় একজন ফোটোগ্রাফার। নেচার ফোটোগ্রাফিতে বেশ নামডাকও আছে ইতালিতে। আমার সঙ্গে এনরিকোর আলাপ সেই জেমু পিক অভিযানের সময় থেকেই। ইংরেজি একেবারেই বলতে পারে না সে (যেমন আমি পারি না ইতালিয়ান)। তবু আমার সঙ্গে কোনওদিনই আড্ডায় খামতি পড়েনি এনরিকোর। কেন জানি না, ও যা বলে, আমি সব বুঝতে পেরে যাই। আবার আমার কথাতেও দেখি এনরিকো দিব্যি ঘাড় নাড়ছে। ভাষার ব্যবধানের তোয়াক্কা না করে আমাদের এই বিচিত্র কথোপকথন দেখে আলবের্তো বেশ মজা পায় আর মুচকি মুচকি হাসে। সেদিন আমরা ঠিক করি, ঘরে আসব লাগুনা রাহুকোল্টার পাড় থেকে। উঁচু পাঁচিলের মতো মোরেনের ঘেরাটোপ থাকায় বেস ক্যাম্প থেকে সে অদৃশ্য। বেস ক্যাম্প থেকে এক-দেড়শো মিটার চড়াই ভেঙে উঠতেই লাগুনা রাহুকোল্টা দেখা দিল। নামার সময় দেখি তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে উঠে আসছে আমাদের কুক এডউইন। কাছে আসতেই বলে, রান্না হয়ে গেছে, তাই আমিও একটু ঘুরতে এলাম।

বিকেলবেলা একটু হিমবাহ বিলাস।

লাঞ্চের পর একটু বিশ্রাম নিয়ে আমি আবার হাঁটতে বেরোলাম, এবার একা। রাহুকোল্টার সরু নালা পার করে ভ্যালির নীচের দিকে বেশ খানিকটা নেমে গেলাম। উয়ানসান ক্রমশ আরও বড় আকার নিয়ে দেখা দিল। মনে মনে ভাবলাম, আগামীকাল থেকেই তাহলে যুদ্ধ শুরু। হেমিংওয়ে কোথায় যেন লিখেছিলেন, বুল ফাইটিং, মোটর রেসিং আর মাউন্টেনিয়ারিং— একমাত্র এই তিনটেই স্পোর্টস, বাকি সব নিতান্তই গেমস— ছেলেখেলা। মাউন্টেনিয়ারিং সম্বন্ধে হেমিংওয়ের মতো এত এক্সট্রিম ধারণা আমি নিজে পোষণ না করলেও ব্যাপারটা যে এক চরম পর্যায়ের কমিটমেন্ট দাবি করে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। একথাও সত্যি যে, কোনও একটা সিরিয়াস ক্লাইম্ব শুরু করার আগে আমার মধ্যে এটা সবসময় মনে হয় যে আর ফিরে নাও আসতে পারি।

সূর্যাস্তের সময় উয়ানসান-এর ওয়েস্ট ফেস।

৬ জুলাই, আবার ওঠা শুরু হল। সেই একই টিম— সেজার, ফ্রেডি, মালু, পিয়েত্রো, ফ্রেদেরিকো এবং আমি। এবার একেবারে তৈরি হয়ে ওঠা। সাউথ-ওয়েস্ট রিজে একটা চেষ্টা না করে এবার ফেরা নয়। আমাদের এই দফার কাজ হল গ্লেসিয়ারে একটা ক্যাম্প করে, সেখান থেকে পরদিন সাউথ-ওয়েস্ট রিজে ওঠা এবং তার পরবর্তী রাস্তা দেখা।

ভসভসে বরফের দেওয়াল স্টেপ তৈরি করে সাউথ রিজে ওঠার চেষ্টা।

৪ তারিখের লোডফেরি, অর্থাৎ একটা ‘ক্লাইম্ব হাই-স্লিপ লো’ রুটিন এবং তার পরের ৫ তারিখের বিশ্রাম আমার শরীরে তার ফল দেখাচ্ছিল। এবার প্রায় না থেমেই এবং প্রথম দিনের চেয়ে অনেক কম সময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আগের দিন দেখে রাখা ক্যাম্প সাইটে। পাথর সরিয়ে তিনটে প্ল্যাটফর্ম বানালাম। দ্রুত লাগানো হল আমাদের তাঁবু। একটা তাঁবুতে চেজার আর ফ্রেডি, একটায় পিয়েত্রো আর ফ্রেদেরিকো আর একটায় আমি আর মালু। মালুর মতো একজন কম বয়েসি মেয়ে আমার মতো একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত বিদেশির সঙ্গে তাঁবু শেয়ার করতে একমুহূর্ত দ্বিধা করল না দেখে ক্লাইম্বিং কমিউনিটির প্রতি আমার বিশ্বাস এবং মালুর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।

অবশেষে সাউথ রিজের মাথায় আমরা। বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে সাউথ সামিট আড়াল করে রাখা সেই বিশাল মাশরুম।

বিকেলে সকলে মিলে রোপ-আপ করে একবার গ্লেসিয়ারে টহল দিয়ে আসা হল। সূর্য বিদায় নিল উয়ানসানের উত্তর-পশ্চিম গিরিশিরার এক ফাঁক দিয়ে। সেদিনের মতো বিদায় নেওয়ার আগে এক রঙিন সূর্যাস্ত উপহার পেলাম আমরা গ্লেসিয়ার ক্যাম্পে। সাউথ কলের দিক থেকে হাড় হিম করা হাওয়া বইতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই বরফ গলিয়ে একটু স্যুপ আর নুডল বানিয়ে ডিনার সেরে নিলাম আমরা। শুতে যাবার আগে যে যার ক্লাইম্বিং ইকুইপমেন্ট গুছিয়ে রাখলাম। রাতে একবার ঘুম ভেঙে যেতে বুঝতে পারলাম তুষারপাত হচ্ছে ঝিরঝির করে।

একটা আইস ওয়াল ক্লাইম্বের প্রায় শেষে।

৭ জুলাই, অন্ধকার থাকতেই তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। কিন্তু গতকাল রাতের তুষারপাত ঢেকে দিয়েছে আশেপাশের পাথরগুলোকে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সকালের এই মুহূর্তগুলোয় আজকাল সাহায্য করে খুব। ভোররাতের আক্ষরিক অর্থে হাড় জমে যাওয়া ঠান্ডাতেও কাজ করতে পারি একটা নিজস্ব ছন্দে। একসময়, আমার ক্লাইম্বিং জীবনের প্রথম দিকে, এই সময়টাকেই ভয় করত খুব। কিন্তু একটা লম্বা দিনের ক্লাইম্বিংয়ের জন্য এই ভোররাতে বেরিয়ে পড়া অত্যন্ত জরুরি। এতে হাতে সময় যেমন থাকে, দিনটা লম্বা হয়, তেমন ভোররাতে জমে কঠিন হয়ে থাকা বরফে দ্রুত চলার সুবিধা পাওয়া যায়। রাত থাকতেই এই ধরনের ক্লাইম্ব আরম্ভ করাটার জন্ম আল্পসে। সেখান থেকেই একে অ্যাল্পাইন স্টার্ট বলা হয়।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই সবাই হারনেস-ক্র্যাম্পন করে রেডি হয়ে গ্লেসিয়ারে ঢুকে পড়ি। ছ’জনের দল, দুটো রোপে ভাগ হয়ে এগোতে থাকি। একটা রোপে চেজার, পিয়েত্রো আর ফ্রেদেরিকো। অন্য রোপে ফ্রেডি, মালু এবং আমি। আলো ফুটতে থাকে একটু একটু করে। হিমবাহের বরফের প্রান্ত জুড়ে অদ্ভুত আলোর আভা খেলা করে। কিন্তু এই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগের সময় তখন আমাদের নেই। একেবারে যন্ত্রের মতোই চলতে থাকি সকলে।
সাউথ-ওয়েস্ট ফেজ, মানে ফ্রেঞ্চ রুটের কাছাকাছি এসে বুঝতে পারলাম যে, ফ্রেঞ্চ রুটটাও একেবারে অসম্ভব হয়ে গিয়েছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং আগামী কয়েক দশকের ক্লাইম্বিংকে একেবারেই বদলে দেবে বলে আমার মনে হয়। যে হারে দ্রুতগতিতে হিমবাহ এবং তুষারশৃঙ্গের গায়ে জমে থাকা স্নো কভার গলছে তাতে পাহাড়গুলোর ভূগোলটাই বদলে যাচ্ছে।

একটার পর একটা কর্নিস।

যাইহোক, সাউথ-ওয়েস্ট ফেজ বাতিল হয়ে যাবার পর বাকি থাকল দক্ষিণের দিকে ইতালিয়ানদের দেখানো একটা রাস্তা। যদিও গ্লেসিয়ারের দিক থেকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, সেটাও মোটেই খুব সহজ হবে না। তবুও আমরা সাউথ রিজ ধরে ওঠার চেষ্টা করলাম। প্রথমেই আমরা বাধা পেলাম নরম বরফে। কারণ হাঁটু অবধি পা বরফে ডুবে যাচ্ছে। এতটা নরম, ভসভসে বরফ আমরা আশাই করিনি। নরম বরফ ঠেলে ট্রেল ব্রেকিংয়ের কাজ করতে লাগলাম আমরা পালা করে। একজনের পক্ষে একটানা লিড করা এখানে অসম্ভব। একটার পর একটা স্টেপ তৈরি করে মোটামুটি একটা সরাসরি লাইন ক্লাইম্ব করে এক একে আমরা পৌঁছে গেলাম সাউথ রিজের মাথায়। পূর্ব দিক খুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। রোদে স্নান করে উঠলাম যেন মনে হল। সকাল থেকে, সেই তাঁবু ছাড়ার পর থেকে, এতটা ক্লাইম্ব করেও গ্লাভসের ভেতরে হাত যেন জমেই থাকছিল। আইস-এক্স চালালেও সেই আড়ষ্টভাব কাটছিল না। কয়েক মিনিট রোদ পেয়েই শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এল। একটা দুর্দান্ত রোমাঞ্চও হচ্ছিল শরীর জুড়ে। এতদিনের কাঙ্ক্ষিত উয়ানসানের সাউথ রিজে পৌঁছে গেছি আমরা। সরাসরি দেখতে পাচ্ছি গিরিশিরাটা কেমন এঁকেবেঁকে ঢেউ খেলিয়ে উঠে গেছে শিখরের দিকে। মূল শিখরের আগে যদিও বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাউথ সামিট। আর সাউথ সামিটের তলায় আরও একটা সাব-সামিট— একেবারে একটা ঝুলন্ত মাশরুম আকৃতির একটা সেরাক মাথায় নিয়ে পথ আগলে রয়েছে। আর তার আগে রয়েছে আক্ষরিক অর্থেই ছুরির ফলার মতো এক ক্ষুরধার গিরিশিরা যার প্রতিটি ভাঁজে কারুকার্যের মতো ঝুলে আছে একটার পর একটা কর্নিশ।

মাঝে মাঝে সাউথ রিজ একেবারেই নাইফ-এজ রিজ।

রিজের মাথায় আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম। ওঠার সময় যেমন নরম ভসভসে বরফ আমাদের ভুগিয়েছিল, রিজের মাথার বরফটাও ঠিক সেরকমই। কিন্তু এরকম তো হবার কথা নয়! রিজের মাথায় কর্নিশ থাকবে, শার্প ট্রাভার্স করতে হবে— সেগুলো তো স্বাভাবিক। কিন্তু গিরিশিরার মাথা যেন গলন্ত আইসক্রিম! কোনও ভরসাজনক অ্যাঙ্করও করা যাচ্ছে না। সকলেই যথেষ্ট অভিজ্ঞ ক্লাইম্বার। আমরা প্রত্যেকেই সেই মুহূর্তে বুঝতে পারছিলাম যে ক্লাইম্বিং কন্ডিশন মোটেই সুবিধের নয়। যেরকম বরফের অবস্থা তাতে একটু বেলা বাড়লেই কর্নিশ ভাঙা একরকম অবশ্যম্ভাবী। আর সেটা ঘটলে আমাদের যেকোনও একটা রোপ, অর্থাৎ একটা তিনজনের পার্টি হয় চাভিনের দিকে, নয় রাহুকোল্টার দিকে অ্যাভালাঞ্চে তলিয়ে যাব। তবু চট করে হাল ছেড়ে দিতে পারলাম কেউই। হয়তো আরও একটু উঠে গেলে পরিস্থিতি একটু ভাল হবে এই আশায় ক্লাইম্ব শুরু হল আবার।
এর পর যে ক্লাইম্ব শুরু হল তার সঙ্গে আমি কেবল আমার জীবনের দুটো ক্লাইম্বের তুলনা করতে পারি। একটা সতোপন্থ, দ্বিতীয়টা নন্দাদেবী ইস্ট শিখর। এই দুটো পিক ক্লাইম্ব করার সময়েই একমাত্র আমি এক দীর্ঘ নাইফ-এজ রিজ ক্লাইম্ব করেছি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল সতোপন্থ কিংবা নন্দাদেবী ইস্ট— এই দুটোর কোনওটার রিজই উয়ানসানের এই সাউথ রিজের মতো কর্নিশে ভরা নয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিচ্ছিরি নরম বিশ্বাসঘাতক বরফ। তবু প্রায় দুশো-আড়াইশো মিটার ক্লাইম্ব করলাম আমরা।

সাউথ রিজে আমাদের হাই পয়েন্ট থেকে দেখা সেই ভয়াবহ মাশরুম।

একটা সময়, বিশেষ করে একটা নীলচে বরফের ফণার তলা দিয়ে ট্রাভার্স করার পর আমরা সকলেই উপলব্ধি করলাম, এটা একটা আত্মঘাতী প্রচেষ্টা। এর কোনও মানেই হয় না। কারণ রিজের ওপর কোথাও একটা ক্যাম্প টু করার মতো জায়গা খুঁজে পেলেও সমস্যার সমাধান হবে না। সাউথ সামিট পৌঁছনোর আগেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সাব-সামিটের বিশাল বরফ মাশরুম। সেই মাশরুমের ওভারহেড বিপদ উপেক্ষা করে ক্লাইম্ব করাটা আমাদের সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল উন্মাদনার সমান। ঠিক যেন গিলোটিনের ধারালো ব্লেডের নীচে জেনেশুনে মাথা পেতে দেওয়া। আর যদি ধরেও নিই যে মাশরুম আমরা পার করে দিতে পারব নিরাপদে, তাহলেও দিল্লি দূর অস্ত। অন্তত আরও একটা ক্যাম্প (অর্থাৎ তিন নম্বর ক্যাম্প) কিংবা একটা বিভুয়াক লাগবে সাউথ সামিট টপকে মূল শিখরে পৌঁছতে। বলা বাহুল্য, এভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে এমন জায়গায় ক্যাম্প করতে আমরা বাধ্য হব যা চূড়ান্ত বিপজ্জনক হতে বাধ্য। কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের পর্বতারোহীই এই অকারণ ঝুঁকি নিতে চাইবে না। উপস্থিত সকলেরই একমত হতে বেশি সময় লাগল না। আমরা সেদিনই বেস ক্যাম্প ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

এই ছিল সাউথ রিজ ধরে আমাদের ক্লাইম্বিং রুট। স্টার চিহ্ন অবধি আমরা উঠেছিলাম।

আবার সেই সাউথ রিজের দীর্ঘ ট্রাভার্স সাবধানে সেরে, খান দুয়েক র্যারপেল করার পর পৌঁছলাম গ্লেসিয়ারের আপাত নিরাপত্তায়। ক্যাম্প ওয়ান থেকে তাঁবু ইত্যাদি গুটিয়ে ফিরে চললাম বেস ক্যাম্প। বেস ক্যাম্পে ফিরে বিশদে সকলকে সব কিছু বললাম। আলবের্তো জানাল, পরের দু’দিন রেস্ট ডে।
৮ জুলাই সকালে টিম মিটিং বসল আবার। আমার যারা সদ্য সাউথ রিজে নাক ঘষে ফিরেছি তারা সকলেই সমস্বরে জানিয়ে দিলাম, সাউথ রিজ দিয়ে এই মুহূর্তে উয়ানসান ক্লাইম্ব করা আত্মহত্যার সমতুল। অতএব পড়ে থাকল নর্থ রিজ। পিয়েত্রো এবং ফ্রেদ্রেরিকো জানাল, ওরা ৯ জুলাই নর্থ রিজ রুটটা রেকি করতে যেতে প্রস্তুত। আমার মন ঠিক সায় দিচ্ছিল না। কারণ নর্থ রিজেরও তো সেই একইরকম সমস্যা হবে তা বোঝাই যাচ্ছিল। সেখানেও মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নর্থ সামিট। আর বেস ক্যাম্প থেকেই দেখা যাচ্ছিল নর্থ সামিট এবং মেন সামিটের সংযোগকারী গিরিশিরার ভয়াবহ চেহারা। আমার মন বলছিল আরও একবার আগের ক্যাম্পে ফেরত যেতে। কারণ সাউথ রিজ থেকে নামার সময় গ্লেসিয়ারের অন্য প্রান্তে আমি আর একটি শৃঙ্গ দেখেছিলাম। দক্ষিণ দিকের পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলার আগে আমি অন্তত একটি পিক ক্লাইম্ব করে ফেলতে চাইছিলাম। এ যাত্রায় উয়ানসানের মেন সামিট যে আমাদের অধরাই থেকে যাবে তা আমার কাছে বিলক্ষণ পরিষ্কার হয়ে গেছিল। তাই দ্রুত একটি শিখর আমি ক্লাইম্ব করে ফেলতে চাইছিলাম। আমার প্রস্তাব দেখলাম আলবের্তোর পছন্দ হল।

ছবি : লেখক

পেরুস্কোপ পর্ব ১

পেরুস্কোপ পর্ব ২

পেরুস্কোপ পর্ব ৩

পেরুস্কোপ পর্ব ৪

পেরুস্কোপ পর্ব ৫

পেরুস্কোপ পর্ব ৬

পেরুস্কোপ পর্ব ৭

পেরুস্কোপ পর্ব ৮

মতামত জানান

Your email address will not be published.