বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পৌষ পার্ব্বণ

ঈশ্বর গুপ্ত

সুখের শিশির কাল সুখে পূর্ণ ধরা।
এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গভরা।।
ধনুর তনুর শেষ মকরের যোগ।
সন্ধিক্ষণে তিন দিন মহা সুখভোগ।।
মকর-সংক্রান্তি-স্নানে জন্মে মহাফল।
মকর মিতিন্‌ সই চল্‌ চল্‌ চল্‌।।
সারানিশি জাগিয়াছি দেখ সব বাসি।
গঙ্গাজলে গঙ্গাজল অঙ্গ ধুয়ে আসি।।
অতি ভোরে ফুল নিয়ে গিয়েছেন মাসী।
একা আমি আসিয়াছি সঙ্গে লয়ে দাসী।।
এসেছি বাপের কাছে ছেলে মেয়ে ফেলে।
রাঁধাবাড়া হবে সব আমি নেয়ে এলে।।
ঘোর জাঁক বাজে শাঁক যত সব রামা।
কুটিছে তণ্ডুল সুখে করি ধামা ধামা।।
বাউনি আউনি ঝাড়া পোড়া আখ্যা আর।
মেয়েদের নব শাস্ত্র অশেষ প্রকার।।
তুক তাক্‌ মন্ত্র তন্ত্র কতরূপ খ্যাল।
পাঁদাড়ে ফুলিচে শ্যাল্‌ শ্যাল্‌ শ্যাল্‌ শ্যাল্‌।।
খোলায় পিটুলি দেন হয়ে অতি শুচি।
ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ হয় ঢাকা দেন মুচি।।
উনুনে ছাউনি করি বাউনি বাঁধিয়া।
চাউনি কর্ত্তার পানে কাঁদুনি কাঁদিয়া।।
‘চেয়ে দেখ সংসারেতে কতগুলি ছেলে।
বল কি হইবে নয় রেক চেলে?
ক্ষুদকুঁড়া গুঁড়া করি কুটিলাম ঢেঁকি।
কেমনে চালাই সব তুমি হলে ঢেঁকি।।
আড় করি পাড় দিতে সিকি গেল গড়ে।
লেখা করি নাহি হয় আদ পোয়া গড়ে।।
ছাঁই ক’রে রাখিলাম অর্দ্ধভাগ কেটে।
হাতে হাতে গেল তিল তিল তিল বেঁটে।।
ঝোলাগুড় তোলা ছিল শিকের উপরে।
পোয়া কাঁচ্চা কি করিবে নহে এক মন।
বাড়ীর লোকের তাহে নহে এক মন।।
একমনে খায় যদি আদ মণে সারি।
একমনে না খাইলে দশ মণে হারি।।
ভাঙ্গামণে পূরোমণ মন যদি খুলে।
পূরোমণে কি হইবে ভাঙ্গামন হ’লে।।
তুমি ভাব ঘরে আছে কত মণ তোলা।
জান না কি ঘরে আছে কত মন ভোলা।।
কারে বা কহিব আর বোঝা হ’ল দায়।
খুলে দিলে মন কি হে তুলে রাখা যায়?
বিষম দূরন্ত ওটা মেজোবোর ব্যাটা।
কোনমতে শুনেনাক ছোঁড়া বড় ঠ্যাঁটা।।
না দিলে ধমক্‌ দেয় দুই চোখ রেঙ্গে।
ঘটী বাটী হাঁড়ি-কুঁড়ি সব ফ্যালে ভেঙ্গে।।
পুলি সব উঠে গেল কিছু নাই ছাঁই।
নারিকেল তেল গুড় ফের সব চাই।।
অদৃষ্টের দোষ সব মিছে দেই গালি।
চর্ব্বণে উঠিয়া গেল পার্ব্বণের চালি।।
আমি লই মোটা চাল সরু চালে চেলে।
বুঝিতে না পারি তুমি চল কোন্‌ চেলে।।
ও বাড়ীর মেয়েদের বলিয়াছি খেতে।
নূতন জামাই আজ আসিবেন রেতে।।
তোমার কি ঘর পানে কিছু নাই টান।
হাবাতের হাতে যায় অভাগীর প্রাণ।।
কি বলিব বাপ মায় কেন দিল বিয়ে।
একদিন সুখ নাই ঘরকন্না নিয়ে।।
কোন দিন না করিলে সংসারের ক্রিয়ে।
দিবানিশি ফেরো শুধু গোঁপে তেল দিয়ে।।
সবে মাত্র দুইগাছা খাড়ু ছিল হাতে।
তাহাও দিয়েছি বাঁধা মেয়েটির ভাতে।।
সুদে সুদে বেড়ে গেল কে করে খালাস?
বাঁচিবার সাধ্য নাই মলেই খালাস।।
রাত্রিদিন খেটে মরি এক সন্ধ্যা খেয়ে।
এত জ্বালা সহ্য করি আমি যাই মেয়ে।।
এইরূপ প্রতি ঘরে দৃশ্য মনোহর।
গিন্নীর কাঁড়ুনী হয় কর্ত্তার উপর।।
মাগীদের নাহি আর তিন রাত্রি ঘুম।
গড়াগড়ি ছড়াছড়ি রন্ধনের ধূম।।
সাবকাশ নাই মাত্র এলোচুল বাঁধে।
ডাল ঝোল মাছ ভাত রাশি রাশি রাঁধে।।
কত থাকে তার কাঁচা কত যায় পুড়ে।
সাধে রাঁধে পরমান্ন নলেনের গুড়ে।।
বধূর রন্ধনে যদি যায় তাহা এঁকে।
শ্বাশুড়ী ননদ কত কথা কয় বেঁকে।।
‘‘হ্যাঁলো বউ কি করলি দে’খে মন চটে।
এই রান্না শিখেছিস মায়ের নিকটে?
সাত জন্ম ভাত বিনা যদি মরি দুখে।
তথাচ এমন রান্না নাহি দিই মুখে।।
বধূর মধুর খনি মুখ-শতদল।
সলিলে ভাসিয়া যায় চক্ষু ছল ছল।।
আহা তার হাহাকার বুঝিবার নয়।
ফুটিতে না পারে কিছু মনে মনে রয়।।
ভাগ্যফলে রান্না সব ভাল হয় যাঁর।
ঠ্যাকারেতে মাটীতে পা নাহি পড়ে তাঁর
হাসি হাসি মুখখানি অপরূপ আড়া।
বেঁকে বেঁকে যান গিন্নী দিয়ে নাথ নাড়া
‘হ্যাঁগা দিদি এই শাক রাঁধিয়াছি রেতে।
মাথা খাও সত্তি বল ভাল লাগে খেতে।।’
‘দিব্বি দিস্‌ কেন বোন্‌ হেন কথা কয়ে?
ষাট্‌ ষাট্‌ বেঁচে থাক জন্ম-এয়ো হয়ে।।
পুরুষেরা ভাল সব বলিয়াছে খেয়ে।
ভাল রান্না রেঁধেছিস্‌ ধন্য তুই মেয়ে।।
এইরূপ ধূমধাম প্রতি ঘরে ঘরে।
নানামত অনুষ্ঠান আহারের তরে।।
তাজা তাজা ভাজাপুলি ভেজে ভেজে তোলে।
সারি সারি হাঁড়ি হাঁড়ি কাঁড়ি ক’রে কোলে।।
কেহ বা পিটুলি মাখে কেহ কাই গোলে।
* * * * (বর্জিত অংশ)
আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর।
গড়িতেছে পিটেপুলি অশেষ প্রকার।।
বাড়ী বাড়ী নিমন্ত্রণ কুটুম্বের মেলা।
হায় হায় দেশাচার ধন্য তোর খেলা।।
কামিনী যামিনীযোগে শয়নের ঘরে।
স্বামীর খাবার দ্রব্য আয়োজন করে।।
আদরে খাওয়াবে সব মনে সাধ আছে।
ঘেঁসে ঘেঁসে বসে গিয়া আসনের কাছে।।
‘মাথা খাও খাও’ বলি পাতে দেয় পিটে।
না খাইলে বাঁকামুখে পিটে দেয় পিটে।।
আকুলি বিকুলি কত চুকুলির লাগি।
চুকুলি গড়িয়া হন চুকুলির ভাগী।।
‘প্রাণে আর নাহি সয় ননদের জ্বালা।
বিষমাখা বাক্যবাণে কান হ’ল কালা।।
মেজো বউ মন্দ নয় সেই গোড়ে গোড়।
কুমারের পোড়ে যেন পোড়ে পোড়ে পোড়।।
মনোদুখে প্রাতে আজ কুটি নই থোড়।
এখন রয়েছে তাই কোঁদলের তোড়।।
শ্বাশুড়ী আলাদা রেখে ছাই তিন হাঁড়ি।
চুপি চুপি পাঠালেন কন্যাটির বাড়ী।।
ঠাকুরঝির ছেলেগুলো খায় ঠেসে ঠেসে।
আমার গোপাল যেন আসিয়াছে ভেসে।।
মরি মরি ষাট্‌ ষাট্‌ কেঁদেছিল রেতে।
বাছা মোর পেট পূরে নাহি পায় খেতে।’
শক্তিভক্তিপরায়ণ হন যেই নর।
তখনি এ সব বাক্যে ভেঙ্গে দেন ঘর।।
উপাদেয় দ্রব্য সব গড়িয়াছে চেলে।
সদ্য হয় কর্ম্ম শেষ গোটা দুই খেলে।।
কামিনী-কুহকে পড়ি খায় যেই হাবা।
নিজে সেই হাবা নয় হাবা তার বাবা।।
বুকে পিটে গুড়পিটে গুড়পিটে গড়ে।
হিঁদুর দেবতা সম ঠাট তার ধড়ে।।
ভিতরে পূরিয়া ছাঁই আলু দেয় ঢাকা।
* * * * (বর্জিত অংশ)
লোভ নাহি থেমে থাকে খাই তাই চোটে।
পিটে পুলি পেটে যেন ছিটে-গুলী ফোটে।।
পায়েসে পিটুলি দিয়া করিয়াছি চুসি।
গৃহিণীর অনুরাগে শুদ্ধ তাই চুষি।।
যুবো সব সুবো প্রায় থুবো নাহি নড়ে।
কাছে ব’সে খায় ক’সে রোসে নাহি পড়ে।।
ধন্য ধন্য পল্লীগ্রাম ধন্য সব লোক।
কাহনের হিসাবেতে আহারে ঝোঁক।।
প্রবাসী পুরুষ যত পোষড়ার রবে।
ছুটি নিয়া ছুটাছুটি বাড়ী এসে সবে।।
সহরের কেনা দ্রব্যে বেড়ে যায় জাঁক।
বাড়ী বাড়ী নিমন্ত্রণ মেয়েদের ডাক।।
কর্ত্তাদের গালগল্প গুড়ুক্‌ টানিয়া।
কাঁটালের গুঁড়ি প্রায় ভুঁড়ি এলাইয়া।।
দুই পার্শ্বে পরিজন মধ্যে বুড়া ব’সে।
চিটে গুড় ছিটে দিয়া পিটে খান ক’সে।।
তরুণী রমণী যত একত্র হইয়া।
তামাসা করিছে সুখে জামাই লইয়া।।
আহারে দ্রব্য লয়ে কৌশলে কৌতুক।
মাঝে মাঝে হাস্যরবে সুখের কৌতুক।।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.