বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৫

বাঙালি মনস্তত্ত্বের আসল রহস্য সুচিত্রা ধরতে পেরেছিলেন। আর সেইজন্যই তিনি বাঙালি যুবক-যুবতীর মায়াবনবিহারিণী হরিণী রয়ে গেলেন। তাঁর থেকে বড় অভিনেত্রী আমরা পেয়েছি কিন্তু তাঁরা ততবড় তারা নন।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সুচিত্রা সেন : মায়াবনবিহারিণী

ষাট দশকের মাঝামাঝি শিরার পারদে কত ওঠানামা! স্বপ্নে কুসুমগুচ্ছ, কিশোরীর আরক্ত কপোল। সে মুহূর্তে আমরা দেখছি— কী আশ্চর্য যুগ— একইসঙ্গে একই বছরে (১৯৬৭) ‘এন্টনী ফিরিঙ্গী’, ‘বালিকা বধূ’ ও ‘ছুটি’-র মতো সিনেমা। অর্থাৎ সুচিত্রা সেন ঠিক আমাদের প্রজন্মের আইকন ছিলেন না। তবু তিনি প্রথমা নেই জেনে আমাদের মনের আকাশে তখনও মেঘ জমত। আজ মাথার চুল পেকেছে। কিন্তু সেই প্রণয়পর্ব শেষ হল না। আজও বাঙালি পুরুষের তিনিই প্রধান সঙ্গিনী।
সুচিত্রা সেনই বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম নারী নীহারিকা। মানে স্টার। জানি অনেকেই আপত্তি করবেন কাননদেবীর কথা ভেবে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, কাননদেবী যৌথ পরিবারের মধ্যে নারীরূপে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, একটি লাবণ্যপ্রভা, গৃহিণী বা নিশীথের নর্মসহচরী। অর্থাৎ তিনি সামন্ততান্ত্রিক জলবায়ুর ফসল। হয়তো কোনও কোনও মুহূর্তে আমরা ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৮) ছবির অনুরাধাকে দেখে চঞ্চল হয়েছি, এমনকি ‘আমি বনফুল গো’ গান শোনার সময় কাননদেবীকে প্রেমের চিরকুট পৌঁছে দিতে আমাদের অগ্রজদের দ্বিধা ছিল না। তবু ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ (১৯৫৩) দেখা যায়, সুচিত্রা প্রথম একজন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে দৃষ্টি টানছেন। সেই ছবিতে একাধিক পুরুষের মেসবাড়িতে সুচিত্রার শরীরী গঠন আকর্ষণের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু নয়। তাঁর আহত ভ্রূবিলাস আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু তিনি স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা তখনও হয়ে ওঠেননি। তবুও ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র (১৯৫৪) পর প্রশ্ন আসে পরতে পরতে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁর অবস্থান তাহলে কোথায়?
স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, সুচিত্রাকে পুরুষতন্ত্রের যাবতীয় শর্তপূরণের ক্ষেত্রে যৌন উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আগেকার অভিনেত্রীরা ছিলেন পরিচালকের হাতে নটী। যদি আর একটু তলিয়ে দেখি তাহলে দেখব, তারকার নির্মাতাও কিন্তু পুরুষ। একজন পুরুষ অভিনেতা যদি নক্ষত্র হন তবে তিনি স্বনির্ভর, তাঁর উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয় তিনি কী কী করতে পারেন বা তাঁর পক্ষে কী কী করা সম্ভব। অন্যদিকে পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত আমাদের নায়িকাদের নির্ভর করতে হত সমাজ-নির্দেশিত মানচিত্রের ওপরে। একজন নায়িকার গঠন সম্পূর্ণ হত না যদি না তাঁর বেশভূষা, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর রুচি থেকে বোঝাতে না পারেন যে তিনি পুরুষের পৃথিবীতে কীভাবে ব্যবহারযোগ্য। একজন পুরুষ মূলত দ্রষ্টা, একজন নারী মূলত দ্রষ্টব্য। সত্যি কথা বলতে কী, নারী দেখে যে সমাজ তাকে কীভাবে দেখছে। নায়িকাদের ক্ষেত্রে তাঁদের শরীরী বিভঙ্গ পুরুষের আহ্লাদ। দেহই একমাত্র ভ্রমণকেন্দ্র। পুতুল নাচের ইতিকথা। নায়কের সঙ্গে নায়িকার প্রধান পার্থক্য যে, নায়কের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ প্রতিশ্রুতি, নায়িকার সৌন্দর্যকে শুধু ব্যবহারের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হয়। এইজন্যই বলে, ছায়াছবিতে মেন অ্যাক্ট, উইমেন অ্যাপিয়ার। সুচিত্রা সেনের ওষ্ঠে সেই বিখ্যাত গান ‘তুমি যে আমার’ শুনতে শুনতে আমরা মেনে নিই যে— “Woman is more mythic than man as both subject and object. She is naturally more of a star than man”। যদি জনপ্রিয় ছবির আদলে ভাবি, তাহলে দেখব পঞ্চাশ দশকের সুচিত্রা-উত্তম মেলোড্রামায় সুচিত্রা সেনের মুখে যে অপরূপ রেখার কারুকার্য তার উৎস কিন্তু বৈষ্ণব পদাবলি : “এলাইয়া বেণী, ফুলের গাঁথনি/দেখয়ে খসায়ে চুলি।/ হসিত বয়ানে চাহে মেঘ পানে/ কি কহে দুহাত তুলি।”

দেবকীকুমার বসু তাঁর ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ (১৯৫৪) ছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার ভূমিকায় সুচিত্রা সেনের অভিনয়ে মোটামুটি চণ্ডীদাসকেই অনুসরণ করেছিলেন। এই ছবিতে সুচিত্রার কেশবিন্যাস প্রমাণ করেছিল চল্লিশ দশকের সমাপ্তি ও পঞ্চাশ দশকের সূচনা। বাঙালি নারীর হেয়ার স্টাইল তাঁকে লক্ষ্য করে বদলেছে। একটু পরেই অজয় কর সুচিত্রা সেনকে নিয়ে সফ্‌ট ফোকাস ক্লোজআপে যে সমস্ত রেখাচিত্র আঁকেন তাতে সুচিত্রার ইমেজ পূর্বরাগের সময় ও কলহান্তরিতা রাধার অনুরূপ। তিনি আমাদের চেতনার গহনে ইশারা করেন, যার ফলে হলিউডের পাহারা এড়িয়ে আমরা তাঁকে আমাদেরই মায়াকাননের ফুল হিসেবে চিনতে পারি। অজয় কর যে কী অনায়াসে বাঙালির নিজস্ব পরিচয়ের ছাড়পত্র খুঁজে পান এই নায়িকার মধ্যে! আমার তো মনে হয়, অভিনয়পটুতার চাইতেও আমাদের অভ্যন্তরীণ চেতনার উন্মোচন সুচিত্রাকে অবিস্মরণীয়তা দেয়। সুচিত্রা তাঁর অভিনয় দিয়ে আমাদের পরাস্ত করেননি। তাঁর অভিমানী ওষ্ঠাধর, আড়াআড়ি দৃষ্টিপাত দেখে মনে হয়, তিনি যতটা দূরের ততটা কাছের নন। আবার মনে হয়, কত কাছের তবু কত দূরের। এই যে মায়ার টান, সেখান থেকে তিনি অড্রে হেপবার্নের মতো প্রথম মৃত্তিকাবাসিনী হয়ে উঠলেন। তাঁকে ছোঁয়া যায়, বলা যায় “ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে”, কিন্তু দার্জিলিংয়ের কুয়াশা তাঁকে আমাদের কাছে অপরিচিত করে রাখে।
১৯৫৭ সালে অজয় কর এমন এক ভাষ্যকার যিনি ‘হারানো সুর’ ছবিটিতে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের একটি সাঁকো নির্মাণ করেন। কিন্তু এই প্রেমগীতি দেখবার সময় আমাদের কারওরই মনে থাকে না যে আসলে তা হলিউডের ‘র‌্যানডম হারভেস্ট’ ছবিটির অনুবাদ। বরং আমরা সবিস্ময়ে দেখি, কালিদাসের হারানো আংটির পুনরুদ্ধার যেভাবে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলাকে মিলিত করে, ‘হারানো সুর’ সেই বিচ্ছেদ ও মিলনের সুরটিকে নতুন করে বলে। আমাদের সমাজ সবসময় ভেবেছে, মেয়েদের একটা আদর্শ সময়ে মা হওয়া প্রয়োজন। ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতেও সুচিত্রা সমাজের সেই শর্ত পূরণ করেছেন। সুচিত্রা সেনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলিতে তিনি সবসময় নায়ক উত্তমকুমার, বসন্ত চৌধুরী বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ডমিনেট করেছেন। সুচিত্রার এই যুগপৎ বালিকা ও মা হওয়ার মনোভাব একইসঙ্গে আমাদের মধ্যে সুপ্তভাবে প্রেমিকাকে মা হিসেবে দেখার প্রবৃত্তির কথা মনে করায়। সুচিত্রা সেন যখন ছবি বিশ্বাস প্রমুখ পিতার ভ্রূকুটি অস্বীকার করে উত্তমকুমারকে বিলেতে পাঠান এবং সেই উত্তমকুমার যখন বিলেত থেকে ফিরে আসেন তখন সুচিত্রাকে আমাদের প্রণয়িনী মনে হলেও আদতে তিনি এক আশ্বাসবাক্য বা দেবদারু বৃক্ষ বা এমন এক ছায়া পরিসর যেখানে আমরা সান্ত্বনা পেতে পারি। শুধু চুম্বন নয়। এই চুম্বন এবং সান্ত্বনার মধ্যবর্তী স্তর থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী কুড়ি-পঁচিশ বছর সুচিত্রা আমাদের শাসন করে গেলেন।

ষাট দশকে যখন তিনি উত্তমকুমারের বাইকের পেছনে বসলেন, সেই পথ আর শেষ হল না। তিনি সমস্ত বাধানিষেধের ঊর্ধ্বে এমনই এক পরিসর ‘সপ্তপদী’-তে (১৯৬১), যেখানে মুহূর্তে খুলে যায় স্বপ্নের স্বাধীনতা। উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে আমাদের যে স্বাধিকারপ্রমত্তা তরুণীর দরকার হয়েছিল, তিনি সিনেমার সুচিত্রা সেন। তাঁকে আমরা প্রায় দর্পিতা ও অভিমানিনী— এই ভূমিকায় যুগপৎ সচল দেখি। তাঁর আহার, ভ্রমণবিলাস, তাঁর অপার স্বায়ত্তশাসন এবং কর্তৃত্বকে ছলনা করার ছলনা, সন্দেহ নেই, একটি বিশিষ্ট প্রকাশভঙ্গি নির্দেশ করে। সে সময় আমাদের জরুরি হয়ে পড়েছিল এমন এক তন্বী নাগরিক যিনি নতুন গণতান্ত্রিক সমাজের নতুন আকাঙ্ক্ষাগুলিকে নতুনতর রং দিতে পারবেন। এটা শুধু বাংলা ছবির ক্ষেত্রে নয়, ‘আঁধি’-র (১৯৭৫) মতো হিন্দি ছবি দেখলে বোঝা যাবে, সুচিত্রা আশ্চর্যভাবে সেই স্বাধিকারের কথা বলেন। এখনও প্রৌঢ়া মহিলাদের দেখা যায় তারা সুচিত্রা সেনকে অনুসরণ করতে চাইছেন। কাঁধ বেঁকিয়ে কথা বলা, আপাতভাবে সব কিছুকে তুচ্ছ বলে প্রতিপন্ন করা— এসবই সুচিত্রা সেনের সাংস্কৃতিক হস্তাক্ষর। এটাই একজন স্টারের বেঁচে থাকার শর্ত। যেটা মেরিলিন মনরো বা এলিজাবেথ টেলরের ছিল। যেটা তুলনামূলকভাবে উন্নত অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও মাধবী মুখোপাধ্যায়ের নেই।
সুচিত্রা সেনকে আমার প্রায়ই বাঙালি ব্রিজিত বার্দো মনে হয়। আমাদের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে শরীরী-সন্ত্রাস তত জরুরি নয়। আর ফরাসি নগ্নতার সেই বেপরোয়া উচ্ছ্বাস বাদ দিলে সুচিত্রাও চিরবালিকা— অবুঝ ও প্রেমিকের মধ্যে একজন অভিভাবকের খোঁজে থাকেন। সত্তরের দশকে যে সমস্ত ছবিতে সুচিত্রা অভিনয় করলেন সেখানে তাঁর স্বাধীন স্বতন্ত্র রোমান্টিক ইমেজের বদল ঘটল। ‘নবরাগ’, ‘ফরিয়াদ’ ইত্যাদি ছবিতে পাপের পথে একা নরকযাত্রী হিসেবে যে চরিত্রগুলি ভাবা হয়েছিল সেখানে সুচিত্রা খুব একটা খাপ খান না। এটা সুচিত্রা সেন আমাদের চেয়ে আগে বুঝেছিলেন। সেজন্যই তিনি আড়াল অবলম্বন করেছিলেন। যেহেতু তিনি অন্তরালে তাই তাঁকে নিয়ে গুজব পল্লবিত হয়েছে। ক্রমাগত রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। এই রহস্যময়তা আর কোনও বাঙালি নায়িকাকে নিয়ে তৈরি হয়নি। সুচিত্রা জানতেন তাঁকে রক্তমাংসের কাঠামোর তুলনায় সেলুলয়েডের প্রাপ্ত কাঠামোর মাধ্যমে বেঁচে থাকতে হবে। সেজন্যই তিনি গ্রেটা গার্বোর মতো সরে গেলেন। তাঁর রক্তমাংসের অবয়ব হেমন্ত রাতের মতো মিশে থাকল কুয়াশায়। বাঙালি মনস্তত্ত্বের আসল রহস্য সুচিত্রা ধরতে পেরেছিলেন। আর সেইজন্যই তিনি বাঙালি যুবক-যুবতীর মায়াবনবিহারিণী হরিণী রয়ে গেলেন। তাঁর থেকে বড় অভিনেত্রী আমরা পেয়েছি কিন্তু তাঁরা ততবড় তারা নন। মের্লিন ডিয়েট্রিশ, সেই ‘নীল দেবদূতী’ হলিউডে যেমন পরিচালক স্টানবার্গের আবিষ্কার, আমার বিনীত নিবেদন— অজয় করও তেমন সুচিত্রা সেনের ক্ষেত্রে নারী থেকে নক্ষত্রলোকে উত্তরণের সোপান।

অঙ্কন : সৌজন্য চক্রবর্তী

(পরের পর্ব তৃতীয় বুধবার)

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৪

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৫

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৬

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৭

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৮

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৯

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১০

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৪

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৫

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৬

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৭

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৮

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৯

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২০

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৪

মতামত জানান

Your email address will not be published.