বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

প্রতিপ্রস্তাব

ভাবতে অবাক লাগে, যখন আমাদের ইতিহাস অশান্ত ও অনিশ্চিত তখন তপন সিংহ ভাবতে পারছেন অভ্যন্তরীণ ভাঙনের কথা। ‘জতুগৃহ’ (১৯৬৪) ছবিতে। এখানে সময় ছায়া ফেলছে না সরাসরি।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৩৪

মধ্যবিত্তের গেরস্থালি : তপন সিংহ ১

আজ মনে হয় আমাদের চলচ্চিত্রে স্বাধীনতা উত্তর পঞ্চাশের দশক আশীর্বাদের সঙ্গে কিছু অভিশাপও বয়ে এনেছিল। একদিকে যেমন চলচ্চিত্রকে পৃথক এক ভাষা হিসেবে দেখবার অভ্যাস তৈরি হচ্ছিল, চলচ্চিত্রকেও নেহাত বিনোদনের বাইরে ‘আর্ট’ ভাবার প্রয়াস চলছিল, অন্যদিকে তেমন জনতা সান্নিধ্য বা জনপ্রিয়তাকে সন্দেহভাজন মনে হচ্ছিল। আমরা যাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের শিখরপ্রদেশ ভাবছিলাম তা আসলে ইওরোপীয় ‘আর্ট’ সিনেমার ভাষাশৈলী। রুচির নির্মাণ ও রুচির একদেশদর্শিতা মোটেই যুগপৎ অভিপ্রেত নয়। কিন্তু আমাদের শিল্পবোধ কোনওকালেই যুক্তি ও শৃঙ্খলার বশীভূত নয়; সুতরাং আমাদের সিনেমা-বিশ্ব অনালোকিত থেকে গেল অনেকভাবেই। প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য আমাদের এতই অভিভূত করল যে আমরা খেয়াল করলাম না, চাঁদ আসে একলাটি, নক্ষত্রেরা দলবেঁধে আসে। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক আমাদের মননে উপনিবেশ গড়লেন, অন্য অনেক কিছুই মনে হল গৌণ বা তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর ও উপেক্ষণীয়। আসলে এ ধরনের নির্বাচিত শিল্পবোধের ফলে যা উপহসিত হয় তা শেষপর্যন্ত ইতিহাস। এখন স্বচ্ছন্দেই বোঝা যায়, ঋত্বিক-সত্যজিতের উপস্থিতি সত্ত্বেও বাংলা বিনোদন বিন্যাস একদিকে উত্তম-সুচিত্রার মতো যুগল নক্ষত্র, অন্যদিকে অজয় কর, তপন সিংহ, নির্মল দে বা ‘যাত্রিক’, ‘অগ্রদূত’ বা ‘অগ্রগামী’ পরিচালক ও কাহিনিকারদের প্রতি অন্যরকম স্বাগতভাষণ প্রস্তুত রেখেছিল।
আসলে তপন সিংহের ছবির গতিপ্রবাহ আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনচর্চার সঙ্গে কতখানি জড়িত তা আমরা আগে বুঝতে পারিনি। একুশ শতকে এসে যখন বাংলা ছবি একদিকে উচ্চবিত্তের সম্পর্ক-সমস্যা অন্যদিকে নিম্নবিত্তের প্রান্তিকতা, একদিকে স্থানু লিরিক অন্যদিকে লুম্পেন রেটরিক ধরতে চাইছে তখন অসহায়ভাবে বুঝতে পারি, আমাদের সামাজিক আঙিনা যেমন মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও ব্যর্থতার জন্য, তেমনই তপনবাবুর ছায়াছবির জন্যেও আলাদা একটি পরিসর চিহ্নিত করেছিল। আজ মধ্যবিত্তদের যে পতনবিন্দু তার ঠিক উল্টোদিকে তপন সিংহ— যেখানে বাঙালির মাঝারিয়ানাও অত আলগা ও বায়বীয় ছিল না। বছর পঁয়ষট্টি আগের কথা। ভাবতে অবাক লাগে, যখন আমাদের ইতিহাস অশান্ত ও অনিশ্চিত তখন তপন সিংহ ভাবতে পারছেন অভ্যন্তরীণ ভাঙনের কথা। ‘জতুগৃহ’ (১৯৬৪) ছবিতে। এখানে সময় ছায়া ফেলছে না সরাসরি। ক্রমাগত ছাত্র আন্দোলন; নুরুল ইসলাম ও আনন্দ হাইতের রক্ত গড়িয়ে পড়ে লাল হয়ে যাচ্ছে বাঙালির মানচিত্র। রাস্তাঘাটে, রেস্তোরাঁয় ভিয়েতনাম হ্যানয় থেকে সায়গন পর্যন্ত ছত্রী সেনার মতো নেমে আসছে নাপাম বোমা, স্কুল-কলেজের যৌবন ক্ষুব্ধ ও উত্তোলিত বাহু। তখনই শ্রীযুক্ত তপন সিংহ নিবেদন করছেন ‘গল্প হলেও সত্যি’ (১৯৬৬)-র মতো অলীক শান্তিনিকেতন। আমাদের কাছে চারজন কাশবনের মতো সাদা বিধবা সাদা-কালোর শূন্যতা উপহার দিয়েছে আরও আগে ‘নির্জন সৈকতে’ (১৯৬৩)। তখনও আমরা তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের বিবর্তনের রূপরেখার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে শিখিনি। বাংলা সিনেমার ঐতিহ্য বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় আমরা বুঝতেই পারিনি কেন ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫) বা ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬)-তে ছোট্ট অপুর মুখে যখন প্রায় কোনও সংলাপই দেওয়া হয় না তখন ‘কাবুলিওয়ালা’ (১৯৫৭) ও ‘অতিথি’ (১৯৬৫)-তে শিশুশিল্পীরাও সংলাপে এমন আশ্চর্য দক্ষতা কোথা থেকে পায়!

অভিজাত পরিবারের সন্তান তপন সিংহ, সেযুগের সিনেমা ব্যবস্থায় যা প্রায় অস্বাভাবিক, পদার্থবিদ্যায় এমএসসি। ছায়াছবি বলতে প্রমোদের স্থূল বিন্যাস বোঝেননি কিন্তু তাঁর শিক্ষায় নব-বাস্তবতা বা সোভিয়েত ছবি ততটা ছায়া ফেলে না, যতটা হলিউড ফেলে। ফলে তিনি আজীবন বিশ্বাস করে গেছেন যে, সিনেমা যেহেতু একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা তাই তাকে যদি সুন্দরের অভিযানে যেতেও হয় সেই অভিযান বাণিজ্য-সমর্থিত হতে হবেই। আভাঁগার্দ প্রবক্তাদের বদলে তিনি বরং উদাহরণ পেয়েছিলেন হলিউড বন্দিত জন ফোর্ড ও উইলিয়াম ওয়াইলারের মধ্যে। যদি সিনেমা স্বয়ংশাসিত হয়ও তবু তাকে গল্পের ওপর নির্ভরশীল থেকে যেতে হবে আর প্রতিনিয়ত সেই গল্পকে বিচিত্র পথে যেতে হবে।
যে উইলিয়াম ওয়াইলার ‘রোমান হলিডে’-র মতো পেলব গীতিকবিতা লেখেন তিনিই ‘বেনহুর’ ছবির ব্যাপ্ত পটভূমি মেলে ধরেন। যে জন ফোর্ড ওয়েস্টার্ন গোত্রের ধূ-ধূ প্রান্তর ও পাথরের এক্সট্রিম লং-শর্টকে অমর করে রাখেন তিনিই মৃত্তিকার প্রতি মৃত্যুহীন আনুগত্য বজায় রাখেন ‘হাউ গ্রিন ওয়াজ মাই ভ্যালি’-তে। সুদূর বাংলায় গল্প বলার দেশে জন্মে, মা-ঠাকুমার মুখে অন্তহীন গল্প শুনতে শুনতে তপন সিংহের মনে হল ছবির অধিকারই নেই বিমূর্ত হওয়ার, তাকে আলো, শব্দ, ছবি দিয়ে গল্প বুনে যেতে হবে; হরেক রকমের বিচিত্র স্বাদের কাহিনিমালা। আর সেই গল্প যতই বিদেশ থেকে আমদানি হোক, সুরে ও মেজাজে বাঙালির মানসসরণি ধরেই এগোবে। সহজ করেই বলি, জন ফোর্ড যেভাবে আইরিশ খনিশ্রমিকের জ্যাজ শোনেন, তপন সিংহ তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হন। কিন্তু ‘হাঁসুলি বাঁক’— এপিক শ্রমের অন্যরকম আনন্দ পায় যা হলিউডের নয়, বীরভূমের লালমাটিরও নয়, তারাশঙ্কর বাঙালি মধ্যবিত্তকে যে গ্রামীণ লোককথা শোনান তার একটি ছবি ও শব্দ সাজিয়ে যথাসাধ্য রূপায়ণ। তপন সিংহ ইংরেজ পরিচালক ডেভিড লিন-এর অসম্ভব ভক্ত কিন্তু মর্মে মর্মে বিশ্বাস করেন ‘ব্রিফ এনকাউন্টার’ তাঁর নয়, তাঁর জন্য ‘ক্ষণিকের অতিথি’। তপন সিংহের স্বাদেশিকতা বা বাঙালিয়ানার মুদ্রা ফুটবলে মোহনবাগান, খবরের কাগজে ইংরেজি স্টেটসম্যান ও সিনেমার কারখানায় নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও।

সোজাসুজি বললে, আমরা বাঙালিরা গল্প বলতে পারি আর সেই গল্প বলার ঢং হলিউড আমাদের রক্তে প্রবেশ করায়নি, আমাদের কথকতার একটি ধরন ছিলই। তাতে সম্পদের জোয়ার এনে দিয়েছিলেন আমাদের কথাশিল্পীরা। বিশেষত মধ্যবিত্তের কথার ধরনে তো সারা বিশ শতক জুড়ে বিরাজ করলেন ‘জবাকুসুমসঙ্কাশ’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এজন্যেই যে মুহূর্তে বাংলা ছবি শব্দের সান্নিধ্যে কৌমার্যমোচন করতে পারল তখন থেকেই সে সাহিত্যের অনুগত। আমরা একটু ভেবে নিতে পারি শ্রীযুক্ত বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও তাঁর নিউ থিয়েটার্স-এর সাহিত্যধর্মিতার কথা। প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকীকুমার বসু শহর ও মফস্বলের অজস্র মধ্যবিত্ত পরিবারকে যে শব্দের হরিণে, যে দৃশ্যের মায়ায় মজিয়েছিলেন তা কিংবদন্তি হয়ে আছে।
তপন সিংহের ছবি চিত্রের উদ্যান নয় বরং সংলাপের সঞ্চারপথ। এ পথ সত্যজিৎ রায়ের পাঁচালীর জন্য নয়। তপন সিংহ একেবারেই আক্ষরিক অর্থেই নিউ থিয়েটার্স ঐতিহ্যের সন্তান। আর সব অর্থেই তপনবাবুর মধ্যে স্বাধীনতা-পূর্ব সচ্ছল বাঙালি মধ্যবিত্তের একধরনের আত্মপরিচয় নথিভুক্ত আছে। অন্তত তাঁর ছবি সেই মনোপরিসরের প্রতিনিধি— যখনও পর্যন্ত বাঙালি মধ্যবিত্ত হৃতস্বপ্ন হয়নি, যখনও পর্যন্ত তারা উনিশ শতকের ক্রমক্ষীয়মাণ রশ্মিটুকু বহন করে যেত। অর্থাৎ সে মধ্যবিত্ত দারিদ্র ও দুঃখকে জানে অথচ জীবনের দীনতা যাকে স্পর্শ করে না। যে মধ্যবিত্ত শব্দের সৌজন্যে হৃদয়ের উৎসব খুঁজে পায়— তপন সিংহ তাদেরই প্রতিনিধি। তিনি কোনও মধ্য সিনেমার প্রতীক নন। বরং আমাদের চলচ্চিত্রে মূল কাহিনিপথেই এক সফল পদাতিক। না হলে ‘নির্জন সৈকতে’ বা ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘জতুগৃহ’ আর ‘ক্ষণিকের অতিথি’ তৈরি হল কী করে? তিনি সত্যজিৎ রায়ের মতো চিত্রভাষাকে নিঃশব্দতার জঠর থেকে সংগ্রহ করে আনেন না। সাহিত্য যে তার উত্তমর্ণ এ কথা জানাতে পেরে তপনবাবুর গৌরবের অন্ত নেই। তিনি শুরুই তো করেছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অঙ্কুশ’ (১৯৫৪) দিয়ে। তার পরে রবীন্দ্রনাথ, শৈলজানন্দ, জরাসন্ধ ও তারাশঙ্কর, রমাপদ চৌধুরী ও সমরেশ বসু, শংকর কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়— কাউকেই তিনি অনাত্মীয় ভাবেন না। নিজে একজন শব্দযন্ত্রী হওয়ায় তপনবাবু চলচ্চিত্রকে সবসময়ই সংলাপযুক্ত ও আখ্যানসুরভিত চিত্রভাষা হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের মতো শব্দকে সম্মুখবর্তী করার দুঃসাহসিক পরীক্ষায় মগ্ন হননি তিনি। মৃণাল সেনের মতো রাজনৈতিক মিছিল তাঁকে আকর্ষণ করেনি। বাঙালির বৈঠকখানা ও রন্ধনশালার আটপৌরে কথকতা তপন সিংহের সৌজন্য ও যান্ত্রিক বদান্যতায় হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের আধুনিক আখ্যান। বাংলা ছায়াছবির পরিপ্রেক্ষিতে তপন সিংহ ‘মধ্যপন্থী’ নন; একটি সাম্যাবস্থা। তাঁর শিল্পরা কথা বলে কিন্তু কোলাহল করে না, তাঁর চরিত্ররা সংলাপমুখর কিন্তু তাতে অতিশয়োক্তির উপচে পড়া ফেনা নেই।

ছবি : ইন্টারনেট

(পরের পর্ব ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়)

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৪

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৫

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৬

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৭

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৮

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৯

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১০

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৪

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৫

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৬

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৭

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৮

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১৯

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২০

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৪

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৫

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৬

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৭

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৮

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২৯

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩০

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩৩

Comments are closed.