বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

ফেলুদার আড়ালে

সত্যজিৎ যে বলেন ‘ছোটদের ছবি’ থেকেও নাকি তাঁকে ‘খোলাখুলিই’ চিনতে পারা যায়, তাহলে ছোটদের লেখা থেকেই বা নয় কেন? এখানেও তো খুব বেশি নিজেকে কিছু লুকোননি সত্যজিৎ! বলা চলে আত্মজীবনী সত্যজিৎ লিখেছেন; ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন! লিখেছেন প্রদোষচন্দ্র মিত্রের বকলমে। কীভাবে?

নির্মাল্য কুমার ঘোষ

সত্যজিৎ রায়ের নাকি জীবনী লেখার ইচ্ছে থাকলেও লেখা হয়ে ওঠেনি। এমনটাই ‘আমাদের কথা’-য় লিখেছেন বিজয়া রায়— ‘অনেকবার ভেবেছিলেন জীবনী লেখার কথা, কিন্তু অন্যান্য কাজের চাপে সেটা হয়ে ওঠেনি।’ আর ১৯৮৭ সালে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেন, ‘আমি এমনি যাকে তথাকথিত আত্মজীবনী বলি, সেরকম কোনও কিছু লেখার ইচ্ছে আমার নেই।’ এই অনীহার কারণ কী? সত্যজিৎ বলেন, ‘আমার পছন্দ, অপছন্দ, আমার রুচি, আমার মূল্যবোধ। এই সব আমার ছবির মধ্যে নিশ্চয় প্রকাশিত হয়েছে। আমি যেহেতু খুব সোজাসুজি ভাবে ছবি করেছি, কোনও কিছুর পেছনে নিজেকে লুকোতে চেষ্টা করিনি, আমি খোলাখুলিই ছবি করেছি, এমন কি যখন ছোটদের জন্য ছবি করেছি তখনও আমাকে চিনতে না পারার কোনও কারণ নেই। সেইজন্যেই মনে হয়েছিল, তার বাইরে আমার আর কি লিখবার প্রয়োজন আছে?’ অর্থাৎ সত্যজিতের বক্তব্য, তাঁর চলচ্চিত্রই তাঁর আত্মজীবনী। ঠিকই বলেছেন সত্যজিৎ।

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির দৃশ্য।

কীভাবে সত্যজিতের পছন্দ-অপছন্দ জায়গা করে নিয়েছে, তাঁর শিল্পে, কীভাবে তা হয়ে উঠেছে আত্মজৈবনিক, তার দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কলকাতার রাস্তায় হাতে-টানা রিকশা-চড়ায় ‘প্রচণ্ড আপত্তি’ ছিল সত্যজিতের। বিজয়া রায় লিখেছেন, ‘‘আমি, আমার শাশুড়ি আর বাবু মাঝে-মাঝে রিকশা চড়েছি। ওঁর এতে প্রচণ্ড আপত্তি ছিল। বলতেন, ‘মানুষে রিকশা টানছে, তাতে বসে তোমরা কী করে যাওয়া-আসা করো আমি তো ভেবে পাই না!’ রিকশা চড়ায় বেজায় আপত্তি ছিল। … মানুষকে জন্তুর পর্যায়ে ফেলতে ওঁর আপত্তি ছিল।’’ লক্ষ করুন ‘মহাপুরুষ’ সিনেমায় সত্যরঞ্জন আর গণেশমামার সংলাপ—

‘গণেশ : … তুমি তো আবার বেম্ম, তায় আবার কমিউনিস্ট। এগোও—

সত্য : কমিউনিস্ট!

গণেশ : হ্যাঁ, আমি তো শুনেছি তুমি হাতে-টানা রিকশ চড়ো না, অন প্রিন্সিপল….।’

‘মহাপুরুষ’ সিনেমার এই সত্যরঞ্জনটি কে বলুন তো? ব্রাহ্ম, তদুপরি ‘অন প্রিন্সিপল’ হাতে-টানা রিকশায় চড়ে না! প্রশ্ন জাগছে না কি? ১৯৬৪-তে যে সত্যরঞ্জন, ১৯৯১-তে সে-ই মনোমোহন!

মনে পড়ে ‘আগন্তুক’-এ মনোমোহন মিত্র সভ্যতার প্রশ্নে রঞ্জনকে কী বলেছিলেন? ‘রাস্তায় এত লোকজন, যানবাহন— আর চতুর্দিকে মূর্তিমান দম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে highrise-গুলো আর পঁয়ত্রিশ বছর পরে এখানে ফিরে এসে দেখি, মানুষ টানছে রিক্সা। এই contradiction না হলে আর সভ্যতা!’

‘সোনার কেল্লা’র শ্যুটিংয়ে সত্যজিৎ রায়।

‘মহাপুরুষ’-এর কথা বলেছি। এবার লক্ষ করুন ‘কাপুরুষ’ সিনেমাটি। প্রেমেন্দ্র মিত্রর গল্প অবলম্বনে, সত্যজিতের তৈরি কার্যত আত্মজৈবনিক এই সিনেমাটিতে নায়ক অমিতাভ রায়, যে উত্তরবঙ্গ গেছে ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লিখবে বলে, সে করুণার স্বামীর প্রশ্নের উত্তরে জানায়—

‘বিমল : ডিগ্রী আছে তো একটা?

অমিতাভ : তা আছে।

বিমল : কিসের? film-এর?

অমিতাভ : (হেসে) না।

বিমল : তবে?

অমিতাভ : বি.এ। অর্থনীতি।’

অর্থনীতির ডিগ্রি নিয়ে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে বেড়ানো এই মানুষটি কে বলুন তো? অচেনা কেউ কি? আশা করি আর একটু খোঁজ করলে নিশ্চয়ই বেরোত, অমিতাভ প্রেসিডেন্সি থেকেই অর্থনীতি নিয়ে পাশ করেছে!

সত্যজিৎ যে বলেন ‘ছোটদের ছবি’ থেকেও নাকি তাঁকে ‘খোলাখুলিই’ চিনতে পারা যায়, তাহলে ছোটদের লেখা থেকেই বা নয় কেন? এখানেও তো খুব বেশি নিজেকে কিছু লুকোননি সত্যজিৎ! বলা চলে আত্মজীবনী সত্যজিৎ লিখেছেন; ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন! লিখেছেন প্রদোষচন্দ্র মিত্রের বকলমে। কীভাবে? সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টাকে মিলিয়ে নিয়ে, সত্যজিৎই ফেলুদা— একথা অনেকেই বলেছেন। ছেলে সন্দীপ রায়ই ‘বাবা আর ফেলুদা’ নামের এক লেখায়, অনেককাল আগেই জানিয়েছিলেন, ‘বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুলের নখটা কাটতেন না বাবা। ফেলুদাও না।’ ফেলু-প্রেমীদের চকিতে মনে পড়ে যাবে, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ উপন্যাসের শেষে তোপসের বলা ফেলুদার শারীরিক চিহ্নগুলির কথা। ‘ফেলুদার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখটা লম্বা। …ফেলুদার বাঁ হাতের কবজির কাছে একটা তিল।’ পূর্বোক্ত প্রবন্ধে সন্দীপ রায় আরও লেখেন— ‘বাবা ক্রমশ তাঁর নিজের চরিত্রের অনেক কিছু গোয়েন্দাকে ধার দিতে শুরু করলেন। ফেলুর মধ্যে আবছা ফুটে উঠতে লাগল বাবার অনেক অভ্যেস, পছন্দ অপছন্দ, এবং কখনও বাস্তবায়িত না হওয়া নিজের বেশ কিছু পরিকল্পনা।’

‘কিসসা কাঠমাণ্ডু কা’ টিভি ধারাবাহিকের দৃশ্য।

ঠিকই, ফেলুদার চরিত্র-চিত্রণে সত্যজিতের আত্মজৈবনিক উপাদানের উপস্থিতি রীতিমতো দৃশ্যমান! বিশেষত, ফেলুদার অভ্যেস, পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে! লেখার পদ্ধতিই ধরুন না কেন! ‘কৈলাস চৌধুরীর পাথর’-এ তোপসে লেখে— ‘ও নোটবইয়ে কী যেন হিজিবিজি লিখছে। ও আবার এসব লেখা ইংরেজি ভাষায় কিন্তু গ্রীক অক্ষরে লেখে।’ ‘গ্রিক অক্ষরে’ ইংরাজিতে ফেলুদা যে তার ‘নোটবই’-তে লেখালেখি করে, তা অবশ্য ইতিপূর্বে ‘বাদশাহী আংটি’ থেকেই আমরা জেনে গেছি। সেখানে ফেলুদা নিজেই বলেছিল, ‘ইংরেজি ভাষাটা গ্রিক অক্ষরে লিখলে বেশ একটা সাংকেতিক ভাষা হয়ে যায়। এমনি লোকের কারুর সাধ্য নেই যে পড়ে।’ ‘এমনি লোকের’ সাধ্য না থাকলেও সত্যজিৎ রায় কিন্তু অনায়াসে পারতেন। পারতেন, কারণ এ পদ্ধতি তো তাঁরই আবিষ্কার! বিজয়া রায় স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেন, ‘উনিই আবিষ্কার করেছিলেন এবং আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, গ্রিক অক্ষর ব্যবহার করে উভয়ে উভয়কে জানানো। ভাষাটা ইংরেজি, কিন্তু অক্ষরগুলো গ্রিক।’ পছন্দ যেমন, তেমনই সত্যজিতের অপছন্দের ধারণাও ফেলুদা-গল্পমালায় পুনরাবৃত্ত। বিজয়া রায় লিখেছেন— ‘‘ওঁর ভাল লাগত না ছেলেদের ডানদিকে সিঁথি করা। বলতেন, ‘পোর্ট্রেট চেঞ্জ করে যায়।’’ ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’-তে তাই ফেলু তোপসেকে বলে, ‘সিঁথিটা ডানদিকে করে নে তো; পোর্ট্রেটটা একটু চেঞ্জ হবে।’ ‘ফটিকচাঁদ’ উপন্যাসে দেখি, শ্যামলাল সেলুনে নিজের পুরনো চেহারার পরিবর্তন ঘটায়। কীভাবে? ‘সিঁথি ডানদিক থেকে বাঁ দিকে চলে গেল।’ মনে পড়ে কি ‘এবার কাণ্ড কেদারনাথে’-তে উমাশঙ্কর পুরীকে দেখে তোপসের প্রথম মন্তব্য, ‘মাথার চুল কাঁচা-পাকা মেশানো, ডানদিকে সিঁথি। এই শেষের ব্যাপারটা দেখলেই কেন জানি আমার অসোয়াস্তি হয়; মনে হয় মুখটা যেন আয়নায় দেখছি। পুরুষদের মধ্যে শতকরা একজনের বেশি ডানদিকে সিঁথি করে কিনা সন্দেহ, যদিও কারণটা জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব না।’ আর সাংবাদিক ভার্গব যে উমাশঙ্কর পুরীর ছেলে দেবীশঙ্কর পুরী, সেটা জানার পর ফেলুদার মন্তব্য, ‘ইনি সিঁথিও করেন ডানদিকে— আর তাই এঁকে দেখে আমার এত অসোয়াস্তি হত।’

‘বাক্স রহস্য’ ছবির দৃশ্য।

সত্যজিৎ যে ফেলুদাকে নিজের জীবনের ঘটনাই ধার দিয়ে বসেছেন, তাও কি ভোলা যায়? ১৯৮৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন অব দ্য অনার’-এ ভূষিত হন সত্যজিৎ রায়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মিতেরঁ স্বয়ং কলকাতায় এসে ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্বরে এক অনুষ্ঠানে সত্যজিৎকে এই সম্মান প্রদান করেন। সেদিনের বর্ণনায় বিজয়া রায় লিখেছেন— ‘ওঁর জন্য ধুতি, পাঞ্জাবি আর ওঁর ঠাকুরদার চমৎকার কাশ্মীরি শাল ঠিক করে গুছিয়ে রেখেছিলাম। ওঁকে ধুতি পড়লে বড় সুন্দর দেখায়।’ ওই ১৯৮৯-এর ‘দেশ’ শারদীয়াতেই ছাপা হয় ‘গোলাপী মুক্তা রহস্য’। আর তাতেই, ওই একবারই মাত্র, আমরা ফেলুদাকে সংবর্ধনা নিতে দেখি। তোপসের বর্ণনায়—‘ফেলুদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরলো বোধ হয় আজ দশ বছর পর। ওকে পোশাকটা যে দারুণ মানায় সেটা স্বীকার করতেই হয়।’ স্রষ্টা-সৃষ্টির সমান্তরাল জীবনযাপন ছাড়া আর কী-ই বা বলবেন একে!

আচ্ছা, ফেলুদার কথা অনেক হল। এবার না হয় ফেলুদার গল্প যাঁর উপস্থিতির কারণে আপনার কাছে ভীষণ প্রিয়, সেই মানুষটির কথায় আসি। জটায়ু। ‘এবার কাণ্ড কেদারনাথে’ বইতে গড়পারের বাসিন্দা অকৃতদার জটায়ু ফেলুদাকে শোনান তাঁর পূর্বপুরুষের কথা— ‘গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার ললিতমোহন ছিলেন পেপার মার্চেন্ট। এল এম গাঙ্গুলী অ্যান্ড সনসের দোকান এই সেদিন অবধি ছিল। ভালো ব্যবসা ছিল। গড়পারের বাড়িটা এল এমই  তৈরি করেন।’ না, সত্যজিতের ‘গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার’ নন, বরং তাঁর ঠাকুরদাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী গড়পারে বাড়ি বানান। তিনি পেপার মার্চেন্ট ছিলেন না, তবে তাঁর ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থা ছিল বই কী। ১৮৯৫ সালে উপেন্দ্রকিশোর এই প্রকাশনা সংস্থার সূচনা করেন আর ১৯১৪ সালের শেষে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে, নিজের নকশা-মাফিক তৈরি করা ‘ইউ রায় এন্ড সন্স’-এর ‘১০০ নম্বর গড়পার রোড’-এর বাড়িতে সপরিবারে, পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন। সত্যজিৎ ‘যখন ছোট ছিলাম’-এ লিখেছেন গড়পারের তাঁর জন্মস্থান সেই বাড়ির কথা। ‘‘শুধু ত বাড়ি নয়, বাড়ির সঙ্গে আবার ছাপাখানা। ঠাকুরদাদা উপেন্দ্রকিশোর নিজে নকশা করে বাড়িটা তৈরি করে তাতে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র বছর চারেক।… বাড়ির সামনে দেয়ালে উপর দিকে উঁচু উঁচু ইংরিজি হরফে লেখা ছিল ‘ইউ রায় অ্যান্ড সনস, প্রিন্টারস্ অ্যান্ড ব্লক মেকারস্’।’’ বুঝতে পারছেন ‘এল এম গাঙ্গুলী এন্ড সনস’-টি কোন স্মৃতি বহন করছে? শৈশবেই পৈতৃক বাড়ি থেকে স্থানচ্যুত সত্যজিতের এক অপূর্ণ বাসনা-স্বপ্নের আশ্চর্য রূপায়ণ নয় কি এটি?

‘বাদশাহী আংটি’ ছবির দৃশ্য।

শেষ নয় এখানেই। ফিরে তাকানো যাক উপেন্দ্রকিশোরের সাধের প্রতিষ্ঠান ‘ইউ রায় অ্যান্ড সনস’- এর শেষবেলার দিকে। কোম্পানির অফিস ম্যানেজার করুণাবিন্দু বিশ্বাস ১৯২৫ সালে এই ব্যবসাটি নিলামে কিনে নেন এবং কোম্পানির নাম ব্যবহার করে ১৯৬০ পর্যন্ত উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, যোগীন্দ্রনাথ, কুলদারঞ্জনদের বইগুলি ছাপাতে থাকেন। মিলিয়ে পড়ুন জটায়ুর পৈতৃক ব্যবসার হাল— ‘এল এম গাঙ্গুলী অ্যান্ড সনস-এর নামটা ব্যবহার হয়েছিল কিছুদিন, কিন্তু মালিক বদল হয়ে গেসল।’ এ যদি জটায়ুর পারিবারিক ইতিহাস হয় তবে তো বলতেই হয় সত্যজিৎ রায়ের ছদ্মনামই ‘জটায়ু’! এই সূত্রে আর একটি কথা না বললেই নয়। ১৯৬৯ নাগাদ ‘কলকাতা’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ ‘গড়পারের ঐ বাড়িতে আর কোনোদিন ফিরে যাননি?’— এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘বছর সাতেক আগে একবার গিয়েছিলাম, মারি— মারি সীটনকে নিয়ে। এখন তো ওটা স্কুল হয়ে গেছে— এথিনিয়াম ইন্সটিট্যুশন— কাজেই বাড়িটা চিনতে খুব অসুবিধে হয়েছিলো।’ অর্থাৎ ১৯৬২-তে সত্যজিৎ একবার তাঁর পৈতৃক বাড়িতে গিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য! যে বাড়িটাকে আঁকড়ে রয়েছে তাঁর ছোটবেলার স্মৃতি, সেই বাড়িটাই পরবর্তীকালে রূপান্তরিত হয়েছে ‘এথিনিয়াম ইনস্টিটিউশন’-এ, লালমোহনবাবুকে সত্যজিৎ পড়তে পাঠালেন সেই স্কুলেই! পৈতৃক ভিটের কাছে ফেরবার আকুলতা, সত্যজিতের ফেলুদা-গল্পমালার এক গোপন বিষণ্ণ সুর!

লালমোহনবাবু তাঁর বাবার সম্পর্কে ফেলুদাকে বলেন, ‘ফিফটি টু-তে চলে গেলেন।’ সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মৃত্যু ঘটে ৫২ বছর বয়সে। ১৯৫৭ সালে উপেন্দ্রকিশোরের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে অনুষ্ঠিত এক সভায় পঠিত ভাষণ ‘ঠাকুরদা-স্মৃতি’-তে সত্যজিৎ নিজেও বলেন সে কথা। ঠাকুরদার মৃত্যুকালীন বয়সের কথাটা সত্যজিতের মস্তিষ্কের ধূসর কোষে সঞ্চিত ছিল, যা তিনি জটায়ুর বাবাকে ধার দিয়েছেন। আসলে ফেলুদা-গল্পমালার আড়ালে প্রায়শই ঘুরে-ফিরে এসেছে সত্যজিতের ঠাকুরদাদের স্মৃতি। তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই। সারদারঞ্জন, কামদারঞ্জন (উপেন্দ্রকিশোর), মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন ও প্রমদারঞ্জন। ফেলুদার গল্পে সরাসরি এঁদের নামের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেই নামের শেষে ওই ‘রঞ্জন’-এর টুকরো স্মৃতি নিয়েই কি কাহিনি-কথক ‘তপেশরঞ্জন’ মিত্রর আবির্ভাব নয়?

ওয়েব-সিরিজে ফেলুদা্।

আচ্ছা, এবার একটু ফেলুদার বাবার দিকে চোখ ফেরান তো। জয়কৃষ্ণ মিত্র ছিলেন ‘ঢাকা কলেজিয়েট’ স্কুলের ‘অঙ্ক আর সংস্কৃতের মাস্টার।’ ফেলুদার পিতৃস্মৃতির মধ্যে মিলে-মিশে গেছেন সত্যজিতের বড় ঠাকুরদা সারদারঞ্জন। পার্থ বসু তাঁর সত্যজিৎ-জীবনীতে জানাচ্ছেন— ‘জ্যেষ্ঠ সারদারঞ্জন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আলিগড় এম এড কলেজ, ঢাকা ও বহরমপুরে অধ্যাপনা করেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য এবং গণিতশাস্ত্র, দুই বিষয়ের উপর তাঁর প্রবল অধিকারের প্রমাণ রয়েছে।’ ফেলুর বাবা জয়কৃষ্ণ মিত্র সম্পর্কে আর একটি অতিরিক্ত খবর পাই ‘সোনার কেল্লা’ সিনেমায়। সেখানে নিজের দাদা সম্পর্কে তোপসের বাবা মন্তব্য করেন, ‘শেয়ালের গর্ত থেকে শেয়ালছানা ধরে আনতেন মেজদা— তখন ওঁর বয়স দশ। তাঁর ছেলে ফেলু।’ সিনেমার পর্দায় যে কাজ জয়কৃষ্ণ করেন, বাস্তবে তা কে করতেন? ১৯৬৩ সালে ‘উপেন্দ্রকিশোর রায়ের কথা’ নামে নিজের বাবা ও বংশ সম্পর্কে এক চমৎকার প্রবন্ধ ‘সন্দেশ’-এর পাতায় লেখেন সুবিমল রায়। সেখানে উপেন্দ্রকিশোরের ভাই মুক্তিদারঞ্জন সম্পর্কে ভাইপো সুবিমল জানান— ‘‘তিনি খুব তাড়াতাড়ি ছুটতে পারতেন। পূর্ববঙ্গে খাটাস বা খট্টাস জাতীয় একরকম জন্তু পাওয়া যায়, তাকে ‘বাঘাল্লিয়া’ বলে। শুনেছি মুক্তিদারঞ্জন একবার একটা বাঘাল্লিয়াকে তাড়া করে ছুটতে ছুটতে সেটার ল্যাজ ধরে ফেলেছিলেন।’’ আর সত্যজিতের অন্যতম প্রিয় ‘ধনদাদু’ কুলদারঞ্জন রায়? তাঁর স্মৃতি নেই কোথাও? একবার আরাতে ঘুরতে গিয়ে ধনদাদুকে এক হিংস্র গরুর মোকাবিলা করতে দেখেছিল ছোট্ট মানিক— ‘দাদু গরুর দিকে মুখ করে দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, হাতের লাঠিটা এরোপ্লেনের প্রপেলারের মতন বন বন করে ঘোরাচ্ছেন। দাদুর এই তেজ পাগলা গরু মিনিটখানেকের বেশি সহ্য করতে পারেনি।’ মনে পড়ছে ‘নেপোলিয়নের চিঠি’ গল্পে সাধন দস্তিদারের পাঠানো গুন্ডাদের কীভাবে জব্দ করেছিলেন জটায়ু? ‘ওয়েপন এই হামানদিস্তা, বললেন লালমোহনবাবু, হাতে নিয়ে মাথার উপর তুলে হেলিকপ্টারের মত করে ঘুরিয়ে গেলাম। আমার ধারে কাছেও এগোয়নি একটি গুন্ডাও।’ ফেলুদার এ কথা স্মরণে ছিল বলেই ‘এবার কাণ্ড কেদারনাথে’-তে জটায়ুকে সে বলে, ‘আপনি আপনার ওই হাতের লাঠিটা প্রয়োজনে পাগলা জগাইয়ের মত মাথার ওপর ঘোরাবেন।’

সরাসরি আত্মীয়-পরিজন নন, অথচ পারিবারিক চেনা পরিচিতির গণ্ডির মধ্যে থাকা মানুষ এঁরা। হ্যাঁ, সত্যজিতের ফেলুদা-কাহিনির আড়ালে তাঁরাও আছেন! স্বনামধন্য, অথচ কালের নিয়মে বিস্মৃতপ্রায় তেমনই একজনের কথা বলা যাক। শশীকুমার হেষ। কে ইনি? ‘সংসদ’-এর ‘বাঙালি চরিতাভিধান’-এ এঁকে পাবেন। ময়মনসিংহের জাতক শশী হেষের জন্মসন ১৮৬৯। দরিদ্র পরিবারের সন্তান শশীকুমার তৈলচিত্র অঙ্কনে পারদর্শিতা অর্জন করেন। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইতালি যান এবং তিন মাসের মধ্যে ভাষাশিক্ষা সম্পূর্ণ করে রয়্যাল অ্যাকাডেমিতে প্রবেশ করেন। এখানে তিন বছর চিত্রাঙ্কন শিক্ষা করার পর জার্মানি যান অতিরিক্ত শিক্ষার জন্য। পরে প্যারিসে গিয়ে তিনি স্বাধীনভাবে জীবিকার্জন করতে আরম্ভ করেন। এখানে বসবাসকালে তাঁর আলাপ হয় আতালি ফ্রামার সঙ্গে। ১৯০০ সালে দেশে ফিরে আতালি ফ্রামাকে ব্রাহ্মমতে বিবাহ করেন শশী হেষ। পোর্ট্রেট পেইন্টার রূপে তিনি এদেশের বহু গুণী মানুষের প্রতিকৃতি অঙ্কন করেন। হঠাৎ একসময় শশীকুমার সপরিবারে ফ্রান্স যাত্রা করেন। তাঁর পরবর্তী জীবন অজ্ঞাত। সম্ভবত ফ্রান্সেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এহেন শশী হেষের সঙ্গে কী যোগ সত্যজিতের? উপেন্দ্রকিশোরের জন্মশতবর্ষে, ১৯৬৩ সালে জ্যাঠামশাইয়ের জীবনী লেখেন লীলা মজুমদার। ‘উপেন্দ্রকিশোর’ নামের সেই বইটি সত্যজিৎ রায়ের দ্বারা অলঙ্কৃত হয়ে নিউ স্ক্রিপ্ট থেকে প্রকাশিত হয়। তাতেই লীলা লেখেন— ‘কয়েকজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পীও সেসময় কলকাতায় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হয়তো শশী হেষ ছিলেন; এঁর সঙ্গে অনেকদিন পর্যন্ত উপেন্দ্রকিশোরের বন্ধুত্বের সম্বন্ধ ছিল। ইনি বিলেত ঘুরে এসেছিলেন, ইটালিয়ান স্ত্রী ছিল, অনেকদিন পরে তাঁর কাছ থেকে উপেন্দ্রকিশোরের বাড়ির মেয়েরা নানারকম সৌখিন রান্না শিখেছিলেন। শশী হেষের আঁকা সুন্দর সুন্দর ছবি, বেশিরভাগই মানুষের চেহারা, এখনো রায় পরিবারের আত্মীয়দের বাড়িতে দেখা যায়। শশী হেষ বেশিদিন বাঁচেননি।’ ঠাকুরদার জীবনীতেই তাঁর বন্ধুর যে সংবাদ ১৯৬৩-তেই পেয়েছিলেন সত্যজিৎ, তাকেই তিনি ব্যবহার করেছেন, প্রায় কুড়ি বছর পরে, ১৯৮২-তে লেখা ‘টিনটোরেটোর যীশু’ উপন্যাসে! মনে করুন, উপন্যাসের ভরকেন্দ্র চন্দ্রশেখর নিয়োগীর জীবনকথা। ১৮৯০ সালে বৈকুণ্ঠপুরে চন্দ্রশেখরের জন্ম। ১৯১২ সালে ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ’ পাশ করেন তিনি। ১৯১৪-য় রোমে যান চন্দ্রশেখর। লেখা হচ্ছে— ‘চন্দ্রশেখর রোমে গিয়ে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ভর্তি হয়। ওর ক্লাসেই ছিল কার্লা ক্যাসিনি। ভেনিসের অভিজাত বংশের মেয়ে। বাবা ছিলেন কাউন্ট। কাউন্ট আলবের্তো ক্যাসিনি। কার্লা ও চন্দ্রশেখরের মধ্যে ভালোবাসা হয়।’ অতঃপর ১৯১৭-তে কার্লা ক্যাসিনিকে বিয়ে করেন চন্দ্রশেখর ওরফে সানড্রো নিয়োগী। ১৯২০-তে জন্ম হয় চন্দ্রশেখরের একমাত্র পুত্র রুদ্রশেখরের। ১৯৩৭-এ ‘ক্যান্সারে’ মারা গেলেন কার্লা আর ১৯৩৮-এ নিজের দেশে ফিরে আসেন চন্দ্রশেখর। অবশেষে ১৯৫৫-তে ৬৫ বছর বয়সে ‘গৃহত্যাগ’ করেন চন্দ্রশেখর। স্ত্রীর মৃত্যুর পর যখন দেশে ফিরে আসেন চন্দ্রশেখর, তারপর— ‘এখানে পোর্ট্রেট আঁকিয়ে হিসেবে খুব নাম হয়। নেটিভ স্টেটের রাজারাজড়াদের ছবি আঁকতেন।’ ফেলুদার গল্পমালার আড়ালে আর কী কী রহস্য যে লুকিয়ে রয়েছে তা খুঁজতে গেলে অতঃপর স্বয়ং ফেলুদাকেই প্রয়োজন!

শেষে আর এক টুকরো। ফেলুদার ভাল নাম ‘প্রদোষ’-এর সূত্রেও একটি সম্ভাবনা বিবেচ্য। সত্যজিতের জন্মের সময় নাম রাখা হয়েছিল ‘প্রসাদ’। সত্যজিৎ বিশেষজ্ঞ দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় জানান, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের অকালপ্রয়াত সন্তান ‘মুলু’-র ভাল নামের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ায়, রায় পরিবারের তরফ থেকে নাম বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঠিক দু’বছরের মাথায় ১৯২৩ সালের ২ মে ‘প্রসাদ’ বদলে নাম রাখা হয় সত্যজিৎ। ভেবে দেখুন, সেই ‘প্রসাদ’-এর ‘দ’ আর ‘স’ যদি নিজেদের মধ্যে স্থান পরিবর্তন করে নেয়, তাহলেই কি ‘প্রদোষ’ সম্ভাবিত হয়ে ওঠে না?

ঋণ : চন্দ্রশেখর নিয়োগীর জীবনীর সঙ্গে শশীকুমার হেষের জীবনকথার সমান্তরালতার দিকে, আমাদের জ্ঞানমতে, ফেসবুকের একটি পোস্টে, প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বদোদরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীদেবরাজ গোস্বামী।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.