বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

বাংলার আসন কথা

আগেকার দিনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সুন্দর আসন বুনে উপহার দেওয়ার চল বাংলায় ছিল। সাহিত্যেও এর উদহারণ মেলে। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর শেষ সৃষ্টি ‘সাধের আসন’।

সৌরভ নন্দী

আসন বোনা, নকশিকাঁথা তৈরি করা এইসব হস্তশিল্প বাংলার লোকশিল্পে বাঙালি নারীদের নিজস্ব অবদান। আগেকার দিনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সুন্দর আসন বুনে উপহার দেওয়ার চল বাংলায় ছিল। সাহিত্যেও এর উদহারণ মেলে। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর শেষ সৃষ্টি ‘সাধের আসন’। জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী বিহারীলাল চক্রবর্তী রচিত সারদামঙ্গলের একনিষ্ঠ পাঠিকা ছিলেন। তিনি বিহারীলালকে একটি পশমের আসন উপহার দেন। সেখানে সারদামঙ্গলের কবিতার অংশ লেখা ছিল—
“হে যোগেন্দ্র যোগাসনে,
ঢুলু ঢুলু দু নয়নে
বিভোর বিহ্বল মনে কাহারে ধেয়াও?”
কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পর বিহারীলাল তাঁর কথা স্মরণ করে ‘সাধের আসন’ লেখেন এই বলে— “কাহারে ধেয়াই দেবী নিজে আমি জানি নে”। যাইহোক, বাংলা সাহিত্যে বঙ্গ নারীদের হাতে বোনা এই আসনের কথা পাওয়া যায়।
রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’-য় আসন শব্দের অর্থ খুঁজলে পাওয়া যায়, ‘বসিবার ছোট গালিচা। যোগসাধনের জন্য উপবেশন ? বিভিন্ন প্রণালী (পদ্মাসন)।
বর্তমানে প্রতিটি বাড়িতে ডাইনিং টেবিলের ব্যবহারের ফলে বাঙালির মাটিতে আসন পেতে কাঁসার থালায় খেতে বসার চল আজ বিলুপ্তির পথে। গ্রামবাংলাতেও মা-কাকিমাদের আসন বোনার চলও অনেকটাই কমে গেছে। একসময় এই আসন, কাঁথা, সোয়েটার বোনা ছিল তাদের অবসরকালীন শিল্প সৃষ্টি। গ্রামবাংলার কিছু জায়গায় অবশ্য এখনও রকমারি আসন বুনতে দেখা যায়। বিভিন্ন রকমের আসন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, চটের ওপর রঙিন উল দিয়ে বোনা আসন, কুশাসন (কুশ একপ্রকার তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ), পাটের আসন, কম্বলের আসন, তালপাতায় বা খেজুরপাতায় বোনা আসন (গ্রামবাংলায় একে ছোট চাটাই বলে)।

ভাসা ফোঁড় বা এলো ফোঁড়।

চটের ওপর উল দিয়ে বোনা আসন : পাটের চটের ওপর নানারঙের উল দিয়ে রকমারি কারুকার্য করে আসন বোনা বাংলার মহিলাদের হস্তশিল্পের এক অন্যতম উদহারণ। আলুর বীজ রাখার জন্য ব্যবহৃত ঘন পাটের বস্তা বা চা রাখার জন্য ব্যবহৃত পাটের বস্তা আসন বোনার জন্য ব্যবহার করা হত। এখন বাজারেও ভাল পাটের চট কিনতে পাওয়া যায়। এই পাটের বস্তার বা চটের ওপর রকমারি নকশা বা মোটিফ গ্রাফে তুলে নানারঙের উল দিয়ে সূচের সাহায্যে আসন বোনা হয়। আগেকার দিনে যখন বহু রঙের উল বাজারে পাওয়া যেত না তখন মহিলারা পুরনো শাড়ির পাড় থেকে রঙিন সুতো বের করে, সেই সরু সুতোর পাঁচ-ছ’টিকে একত্রিত করে পেঁচিয়ে, একটু পুরু করে নিয়ে, সেই দিয়ে আসন বুনতেন। অনেকে আবার আসন বুনতে সিমেন্ট রাখার জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বস্তাও ব্যবহার করে থাকেন। এই আসন বোনার পদ্ধতির বা স্টিচের বিভিন্ন ভাগ আছে। যেমন মাছি ফোঁড়, ভাসা ফোঁড় বা এলো ফোঁড়, ছাঁটা ফুল-এর আসন প্রভৃতি। মাছি ফোঁড় অর্থাৎ মাছির আকৃতির মতো ছোট ছোট করে ঘর গুনে গ্রাফ তুলে একটি সম্পূর্ণ ডিজাইন বা মোটিফের রূপ দেওয়া হয়। এই মাছি ফোঁড় আবার দু’রকম হয়। ছোট মাছি ফোঁড়-এর ক্ষেত্রে দুটি ঘর থাকে, আর বড় মাছি ফোঁড়-এর ক্ষেত্রে চারটি ঘর থাকে। খুব নৈপুণ্যের সঙ্গে সূক্ষ্মভাবে মহিলারা আসন বুনে থাকেন। একটি ঘর গুনতে ভুল হলে বা ছোট-বড় হলেই সমগ্র নকশা বা ডিজাইনটির গ্রাফ মিলতে চায় না।
ভাসা ফোঁড় বা এলো ফোঁড়-এর ক্ষেত্রে কাঁথা স্টিচ যেভাবে বোনা হয়ে থাকে, অনেকটা সেইভাবে উল দিয়ে বুনে একটি নকশাকে ভরাট করা হয়। আবার ছাঁটা ফুল-এর ক্ষেত্রে প্রথমে মাছি ফোঁড়ের সাহায্যে ঘর গুনে গ্রাফ তৈরি করা হয়। পরে তার ওপর ভাসা ফোঁড় দিয়ে ওপর ওপর চাপিয়ে পুরু করে বোনা হয়। এর পর সেই বুননের ভেতর কাঁচি ঢুকিয়ে কেটে ও ছেঁটে দিলে সুন্দর ফুলের আকৃতি নেয়। এটিই হল ছাঁটা ফুল। এইরকম বিভিন্ন ফোঁড় বা স্টিচের সাহায্যে পাটের চটের ওপর রঙিন উল দিয়ে রকমারি ডিজাইন, মোটিফ, জামিতিক নকশা তোলা হয়ে থাকে।
এইসব আসনে সুন্দর রকমারি মোটিফ ও ডিজাইন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন ময়ূর, প্রজাপতি, শঙ্খ, মঙ্গলঘট, টিয়াপাখি, পুতুল, কুকুর, বিড়াল। বিভিন্ন ফল, যেমন আনারস, আমের নকশাও দেখা যায়। আবার ফুলের ক্ষেত্রে গোলাপ, শেফালি, শিউলি, পদ্ম দেখা যায়। এমনকি গ্রামের বাড়িঘর, মন্দির প্রভৃতিও বাংলার এই আসনে উঠে এসেছে। মূলত গ্রামবাংলায় যেসব জিনিস দেখতে পাওয়া যায় সেইগুলিই বিভিন্ন ফর্মে বিভিন্নভাবে আসনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। আবার বাংলা অক্ষর অ, আ কিংবা ইংরেজি অক্ষর A, B, C থেকে শুরু করে রকমারি মজার মজার মোটিফ বাংলার এই আসন-শিল্পে উঠে এসেছে। এমনকি লুডো খেলবার ছকও এই আসনে ঠাঁই পেয়েছে। আগেকার দিনে আসনের মধ্যে লুডোর ছকের ডিজাইন তুলে সেই ছকের মধ্যে লুডোর ঘুঁটি সাজিয়ে শীতের দুপুরবেলায় মিষ্টি রোদে পিঠ দিয়ে বসে আড্ডার ছলে লুডো খেলতে দেখা যেত মহিলাদের। যদিও সেসব এখন অতীত ।

মাছি ফোঁড়।

এই আসনের আবার নকশা অনুযায়ী অনেক নাম আছে। যেমন খাসগ্লাস (আসনের চার কোণ থেকে চারটি ফুলদানি সমেত ফুলের ঝাড়ের মতো নকশা), হোলি প্রিন্ট (বিভিন্ন রঙের সমাহার, উল দিয়ে এলো ফোঁড়-এর সাহায্যে বোনা হয়), আনারসের চোখ (আনারসের গায়ে যে চোখের মতো গঠন থাকে তার মতো নকশা), তেঁতুল পাতা (তেঁতুল পাতার মতো নকশা), ধানের শীষ (ধানের শীষের মতো নকশা), ব্লেড প্রিন্ট (দাড়ি কাটার জন্য যে ব্লেড সেইরকম নকশা), কদমছাঁট, ময়ূরপুচ্ছ, মণিপুরী (মাছি ফোঁড়ের সাহায্যে ঘর তুলে এলো ফোঁড় দিয়ে বরফি মতো করে ভরাট করতে হয়) প্রভৃতি আসনের নকশার নাম গ্রামবাংলায় প্রচলিত আছে। বাংলা কবিতা বা ছড়ার বিভিন্ন লাইনও গ্রাম বাংলার এই আসনে দেখতে পাওয়া যায়।

ছোট মাছি ফোঁড় ও বড় মাছি ফোঁড়।

চিত্রশিল্পীরা যেমন নিজেদের আঁকা ছবির নীচে স্বাক্ষর করেন তেমনই এই আসন যিনি বোনেন তাঁর নামও গ্রাফের সাহায্যে তুলে উল দিয়ে বুনে আসনের এককোণে লিখতে দেখা যায়। শঙ্খ, মঙ্গলঘট, গোপাল ঠাকুর, গণেশ, প্রদীপ এইসব মোটিফের যে আসন বোনা হয় সেগুলি বসার জন্য ব্যবহৃত হয় না। এসব হিন্দু ধর্মে শুভ হিসেবে বিবেচিত হয়।তাই দেবতাকে ভোগ নিবেদনের সময় যে আসন দেবতার উদ্দেশে পাতা হয় সেই কাজেই একমাত্র এই আসনগুলি ব্যবহার করা হয়। আগেকার দিনে বিয়ের সময় বর বসানোর জন্য বড় আকৃতির আসন তৈরি করতেন গ্রামবাংলার মহিলারা। তাকে বলা হত ‘বর আসন’। এইরকম বড় আসন তৈরি করে মেয়ের বিয়ের দানসামগ্রীর সঙ্গেও দেওয়া হত। বাংলার এই হাতেবোনা আসনের চারদিকে লালকাপড় অথবা নকশা ভেদে বিভিন্ন রকমের রঙিন কাপড়ের কুচি করা ঝালর দেওয়া হয়। এই কুচি করা ঝালরের ব্যবহার যে শুধু বাংলার আসনের চারদিকেই দেখতে পাওয়া যায় তাই নয়। হাতপাখার চারদিকে, আগেকার সময়ে মশারি, বালিশে, দেবতার পুজোয় ব্যবহৃত চাঁদোয়া বা সামিয়ানাতেও এই ঝালরের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যেত। এই ঝালর ব্যবহারের ফলে আসনের ভেতরের নকশাটির সঙ্গে সমগ্র আসনটি আরও নান্দনিক হয়ে ওঠে।
কুশাসন : এই আসন কুশের সাহায্যে বোনা হয়। কুশ সাধারণত হিন্দু ধর্মে পূজার্চনায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কুশকে হিন্দু ধর্মে পবিত্র গণ্য করা হয়। তর্পণ ও শ্রাদ্ধের কাজে কুশাঙ্গুরী পরতে দেখা যায়। এই কুশের আসন সাধারণত পুজোর কাজেই ব্যবহৃত হয়। এই আসন অনেকটা মাদুরের মতো করে বোনা হয়ে থাকে।
কম্বলের আসন : এই আসন সাধারণত ভেড়ার মোটা লোমের হয়ে থাকে। সাদা বা ঘি রঙের এই আসন পুজোর কাজে অথবা অশৌচের সময় যে কাছা পরা হয় তার সঙ্গে নিতে দেখা যায়। এছাড়া বসবার জন্যেও কম্বলের মোটা আসন ব্যবহার করা হয়।
পাটের আসন : এই আসন পাট দিয়ে তৈরি হয়। পাট পাকিয়ে দড়ি তৈরি করে তা দিয়ে এই আসন বোনা হয়। সাধারণত এই আসনও পুজোর কাজেই ব্যবহৃত হয়।
তালপাতার বা খেজুরপাতা দিয়ে বোনা আসন : তালপাতা ও খেজুরপাতা দিয়ে ছোট চাটাইয়ের মতো করে বোনা আসন গ্রামবাংলার অনেক জায়গাতেই বসার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। খেজুরপাতা হালকা রোদে শুকিয়ে পাতার অগ্রভাগের কিছুটা অংশ এবং পাতার নীচের দিকের ছুঁচলো অংশটিকে কেটে বাদ দেওয়া হয়। ওই সরু পাতাটিকে আবার মাঝ বরাবর চিরে সেই সরু পাতার ফালিগুলিকে যোগ করে করে নিখুঁতভাবে আসন বোনা হয়ে থাকে। তালপাতার ক্ষেত্রেও পাতাটিকে চিরে সরু ফালি বের করে বোনা হয়ে থাকে। এই পাতার তৈরি ছোট চাটাই বা আসনগুলিও সাধারণত গ্রামবাংলার মহিলারাই ধৈর্যের সঙ্গে অতি সূক্ষ্মভাবে বুনে থাকেন। অনেক সময় পুরুষরাও বুনে থাকেন। আসনগুলিকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে কখনও কখনও রকমারি রঙের ব্যবহারও করা হয়ে থাকে ।
এছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন গালিচা ও মখমলের বা ভেলভেটের আধুনিক আসন বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। তবে সেখানে বাংলার হাতের ছোঁয়া নেই।

গ্রন্থ ঋণ :
১। সারদামঙ্গল, বিহারীলাল চক্রবর্তী, সম্পাদনা মিহির চন্দ্র কামিল্লা।
২। চলন্তিকা, রাজশেখর বসু ।

আসনের আলোকচিত্র : পৃথা মুখোপাধ্যায়
মতামত জানান

Your email address will not be published.