বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

বাউল দর্শনের আলোয় লালন ফকিরের গান

লালন ফকির আমৃত্যু বাউল দর্শন, সুফিবাদ, ভক্তিবাদ, সহজিয়া দর্শনের চর্চা করতে করতে বার বার আঘাত করেছেন সমাজের সমস্ত ধর্মীয় কুসংস্কার এবং নানারকমের জগৎবিমুখ, মানববিমুখ, অলীক তত্ত্বের দার্শনিক শাস্ত্রকে।

অনর্ঘ মুখোপাধ্যায়

লালন ফকির বাংলার সঙ্গীত তথা সাহিত্যের ক্ষেত্রে, আমাদের চেতনার জগতে এক বিস্তৃত স্থান অধিকার করে আছেন। বাউল দর্শনের সমস্ত রত্ন-আকরকে তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে যেভাবে সমগ্র উপমহাদেশ তথা বিশ্বের কাছে সহজ ভাষায়, সহজ সুরে উপস্থাপিত করেছেন এবং তা বাস্তবে সংস্কৃতির সাম্রাজ্যের পরিসীমাকে এতটাই বর্ধিত করেছেন যে অ্যালেন গিন্সবার্গের মননেও লালন ফকিরের প্রবেশ ঘটেছিল। লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী। যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক এই মনোভাব থেকেই তিনি তাঁর গান রচনা করেছেন।
লালনের জীবন সম্পর্কে বিশদ কোনও বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসূত্র তাঁর নিজেরই রচিত অসংখ্য গান। কিন্তু লালনের কোনও গানে তাঁর জীবন সম্পর্কে কোনও তথ্য তিনি রেখে যাননি। কয়েকটি গানে তিনি নিজেকে ‘লালন ফকির’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। ১৮৯০ সালে তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতকরী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।” পত্রিকার ওই সংখ্যাতেই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক রাইচরণ দাস লেখেন, “ইনি ১১৬ বৎসর বয়সে গত ১৭ই অক্টোবর শুক্রবার প্রাতে মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছেন।” সেই হিসেব অনুযায়ী লালনের জন্মসাল হবে ১৭৭৪। মৌলবী আব্দুল ওয়ালী (১৮৫৫-১৯২৬)-র মতে, লালনের জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হরিশপুর গ্রামে।
লালন শাহের জাতি বা সম্প্রদায় নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। এই প্রশ্ন তাঁর জীবদ্দশাতেও বিদ্যমান ছিল। পারিপার্শ্বিক প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয়েছে যে, তিনি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু ছেলেবেলায় অসুস্থ অবস্থায় তাঁর পরিবার তাঁকে ত্যাগ করে। তখন সিরাজ সাঁই নামের একজন মুসলমান বাউল তাঁকে আশ্রয় দেন এবং সুস্থ করে তোলেন। লালন কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তাঁর শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন। ওই ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় তিনি মারা যান।
অধ্যাপক ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলার বাউল ও বাউলগান’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ে (পৃ. ১০৫) লালন সম্পর্কে বলেছেন, “সব দিক দিয়া বিবেচনা করিলে বাউল-গান রচয়িতা হিসাবে মুসলমান বাউল লালন ফকিরই সর্বশ্রেষ্ঠ। মূল-তত্ত্বজ্ঞতা, সাধনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, প্রত্যয় ও দিব্যদৃষ্টি, বৈষ্ণবশাস্ত্র ও সুফীতত্ত্ব-সম্বন্ধীয় জ্ঞান, বক্তব্য ইঙ্গিত ও ব্যঞ্জনাময় করিয়া বলিবার কৌশল, সহজ কবিত্ব-শক্তি প্রভৃতিতে তাঁহার গানগুলি বাংলা সাহিত্যের একটি সম্পদ।… সুর-সংযোগে অভিব্যক্ত তাঁহার গানের অকৃত্রিম আবেগের মধ্যে একটা অনির্বচনীয়ত্বের বিদ্যুৎ খেলিয়া গিয়া আমাদের চিত্তকে অপূর্ব ভাবলোকে যেন উত্তীর্ণ করিয়া দেয়।”

লালন ফকিরের গানের ভাষা ও বক্তব্যের মধ্যে ‘easy and obvious philosophy’-র সন্ধানরত বিখ্যাত অভিজ্ঞতাবাদী (empiricist) দার্শনিক ডেভিড হিউমের সেই বিখ্যাত কথা ‘Be a philosopher; but, amidst all your philosophy, be still a man’ যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল। লালন ফকির আমৃত্যু বাউল দর্শন, সুফিবাদ, ভক্তিবাদ, সহজিয়া দর্শনের চর্চা করতে করতে বার বার আঘাত করেছেন সমাজের সমস্ত ধর্মীয় কুসংস্কার এবং নানারকমের জগৎবিমুখ, মানববিমুখ, অলীক তত্ত্বের দার্শনিক শাস্ত্রকে। যে কারণে তিনি বর্ণবাদী হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেছেন, “জাত বলিতে কি হয় বিধান শাস্ত্র খুঁজিলে?” আবার ইসলামের ধর্মতত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেছেন, “আদম তন আর নিরূপ খোদা/নিরাকারে মিলল কি করে?” আসলে লালন কোনও বিশেষ ধর্মমতকে উপজীব্য করে সাধনার পরিপন্থী ছিলেন এবং নিজে অধ্যাত্মবাদী হয়েও কোনওদিন, কোনও প্রকারের অযৌক্তিক রটনা, গালগল্প বা বুজরুকিকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় তো দেননি, বরং সেসবের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করে গেছেন। আর তাই হিন্দু বা মুসলমান— সমস্ত সম্প্রদায়েরই ধর্মগুরু বা সমাজপতিরা তাঁকে নানাভাবে হেনস্থা করে গেছে আজীবন। তবুও মানবতাবাদী লালন বলেছেন, “যবন কাফের ঘরে ঘরে/শুনে আমার নয়ন ঝরে/লালন বলে মারিস কারে/চিনলি নে মন মনের ধোঁকায়।” এভাবেই বাউল দর্শন লালনের হাত ধরে প্রবল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এখানে তাই লালন চর্চার উদ্দেশ্যেই বাউল দর্শন আর তার সঙ্গে লালনের গানের সম্বন্ধ নিয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।

লালন ফকিরের প্রায় সমস্ত গানেরই মর্মবস্তু বাউল সম্প্রদায়ের দার্শনিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। তাই গোড়াতে বাউল সম্প্রদায়ের বিষয়ে কিছু আলোচনা আবশ্যক। বাউল সম্প্রদায়ের ভিত্তি ছিল সহজিয়া পন্থা এবং নাথবাদ। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে লিখিত সরোরুহপাদের ‘দোহাকোষ’-এর প্রতিপাদ্য বিষয়ের দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে যে বেদপন্থী ছয় আস্তিক দর্শনের মতামত খণ্ডন করে সরোরুহপাদ (মতান্তরে, সরোহপাদ) জাতিভেদ-বর্ণভেদ প্রথাগুলোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সরব। আর এই ধারাই পরে সহজিয়া পন্থার মাধ্যমে, বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মাধ্যমে এসে বাউল দর্শনে রূপান্তরিত হয়। তাছাড়া ছিল সুফিবাদ, ভক্তিবাদ, বৈষ্ণব ধর্ম আর বৌদ্ধ দর্শন। বাউলরা কোনও ধর্মকেই আদর্শরূপে গণ্য করেন না বলেই এঁদের স্বতন্ত্র একটি সম্প্রদায় হিসেবেই গণ্য করা হয়।
এঁদের ‘বাউল’ নামকরণ নিয়ে প্রচুর মতবিভেদ রয়েছে। সাধারণত ‘বাউল’ শব্দের অর্থ উদাস ভাব। বাউলরা লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ধর্ম-বর্ণের সংকীর্ণতায় যেহেতু বিশ্বাস করেন না এবং যেহেতু তাঁরা সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন প্রকারের জীবনযাপন করেন, তাই তাঁদের এইরকম নামকরণ। কারও মতে বাউল শব্দের উৎপত্তি হিন্দি ‘বাউর’ শব্দ থেকে, যার অর্থ পাগল, কারণ বাউলরা আজীবন ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে লিপ্ত থাকেন। সেই কারণেই অনেকে এও মনে করেন যে সংস্কৃত ‘ব্যাকুল’ শব্দ থেকেও বাউল শব্দের উদ্ভব। শশীভূষণ দাশগুপ্তর মতে, সংস্কৃত ‘বাতুল’ শব্দ থেকেও বাউল শব্দের উৎপত্তি সম্ভব। তিনি ‘বাতুল’ শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “enlightened, lashed by the wind to the point of losing one’s sanity, god’s madcap, detached from the world, and seeker of truth”। সর্বপ্রথম ‘বাউল’ শব্দের সন্ধান পাওয়া যায় মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যে। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ কাব্যের আদিলীলা অংশে মহাপ্রভু, রামানন্দ রায় ও সনাতন গোস্বামীর কাছে কৃষ্ণ বিরহ বিধুর নিজেকে ‘মহাবাউল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেই থেকে অনুমান করা হয় বাউল শব্দের উৎপত্তির কথা।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত অন্যান্য লোকগীতি, যেমন ঝুমুর, ভাদু, টুসু, ভাওয়াইয়া, সারি, বিহু, ভাটিয়ালি ইত্যাদির সঙ্গে বাউলসঙ্গীত (বা সাহিত্য)-এর পার্থক্য দুটি জায়গায়। একটি হল এই যে, এই সমস্ত লোকগীতির গানের কথা খুব সহজবোধ্য হলেও, তা মূলত কোনও একটি নির্দিষ্ট দেশীয়কালিক (spatiotemporal) অবস্থার বর্ণনা দিলেও, সেসবের মধ্যে দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু বাউল সম্প্রদায়ের গানে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে দার্শনিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা উপস্থিত করা হয়। কেননা, বাউলদের লৌকিক সাধনার তত্ত্ব গড়েই উঠেছে বিভিন্ন দর্শনের সমন্বয়ে। তাঁদের বক্তব্য তাঁরা সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। দ্বিতীয়টি হল, অন্যান্য লোকসঙ্গীতের ধারাগুলি এক একটা ক্ষুদ্রতর অঞ্চলে, কয়েকটি জেলার মধ্যে প্রচলিত ও সীমাবদ্ধ। বাউল তা নয়। সারা (অবিভক্ত) বাংলাদেশ জুড়েই এর প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। আজও পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশের সর্বত্র বাউল সমানভাবে জনপ্রিয় ও চর্চিত।

বাউল সম্প্রদায়ের মত জানার উপযোগী কোনও পুথি বা দলিল পাওয়া যায় না। তবে ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘লোচন দাসের ‘বৃহৎ নিগম’ গ্রন্থকে বাউলরা তাহাদের ধর্মের প্রামাণ্য গ্রন্থ বলিয়া শ্রদ্ধা করে এবং কেহ কেহ ইহার অনেক অংশ ধর্মালোচনা-কালে মৌখিক উদ্ধৃত করে।… অনেক বৈষ্ণব-সহজিয়া-সাহিত্যের পুথির মধ্যে নির্দিষ্ট বাউল-সাধনার ইঙ্গিত আছে।’’
বাউলগানের বক্তব্যের মধ্য থেকেই বাউল সম্প্রদায়ের দার্শনিক মতবাদ এবং সাধনপদ্ধতি সম্পর্কে আমরা ধারণা পেতে পারি। বিভিন্ন বাউল সঙ্গীতকে বিশ্লেষণ করে ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বাউল তত্ত্বের পাঁচটি উপাদান সনাক্ত করেছেন।
* বেদ-বহির্ভূত ধর্ম।
* গুরুবাদ।
* দেহতত্ত্ব (স্থূল মানবদেহের গৌরব— ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ডবাদ)।
* মানুষতত্ত্ব (মনের মানুষ অন্বেষণ)।
* রূপ-স্বরূপ তত্ত্ব।
লালন ফকিরের গানে এই উপাদানগুলো কীভাবে নিহিত আছে সে বিষয়ে আলোচনা করা যাক।

বেদ-বহির্ভূত ধর্ম

ভারতীয় দর্শনের জগতে বহু আগেই লোকায়ত মতের প্রবক্তা হিসেবে খ্যাত চার্বাকরা বৈদিক দেশাচার আর ধর্মতত্ত্বের কঠোর বিরোধিতা করে তার বিরুদ্ধে অকাট্য যুক্তি প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রভাব সমাজের মূল স্রোতের ওপরে আস্তে আস্তে কমে আসে। বৌদ্ধযুগের অবসানের পরে যখন ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান ঘটে তখন তাঁদের সমস্ত রচনা ধ্বংস করে ফেলা হয়। তবে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মত অনুসরণ করে দেখিয়েছেন যে, সহজিয়া-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের তত্ত্বের মধ্যে সেই চার্বাকদের বেদবিরোধী, নাস্তিক্যবাদী এবং দেহাত্মবাদী দর্শনের কিয়দংশ আজও রয়ে গেছে। যেহেতু বাউল দর্শনের মধ্যে সহজিয়া-বৈষ্ণব মতের উপাদান আছে তাই বাউলরা তো নিঃসন্দেহেই বেদবিরোধী তত্ত্বের প্রচার করেন। তার পাশাপাশি তাঁরা বেদের বিধান পরিত্যাগ করার মতও প্রচার করে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনেক বাউলই বেদ-বিধি বলতে চিরাচরিত দেশাচার এবং/অথবা আনুষ্ঠানিক ধর্মকে বোঝান। তাঁদের মতে, আনুষ্ঠানিক ধর্ম যেমন প্রকৃত সত্যের সন্ধান দিতে ব্যর্থ, তেমনই তা আমাদের মানবজীবনের কোনও মূল তত্ত্ব নির্ণয় করতেও অক্ষম। মূল্যহীন এই সমস্ত গতানুগতিক ধর্মের অর্থহীন রীতি-রেওয়াজের আঁধারে প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। একজন বাউল হিসেবে লালন ফকিরও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি প্রবল বেদবিরোধী অবস্থান থেকে লিখেছেন—
“কার বা আমি কে বা আমার
আসল বস্তু ঠিক নাহি তার
বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার
উদয় হয় না দিনমণি।”
লালন বিবেচনা করে দেখেছেন যে, বৈদিক ধর্মে পাপ-পুণ্যের কথা আছে। সেখানে এও বলা আছে যে, পুণ্যের ফলস্বরূপ মানুষ স্বর্গগামী হলেও সে পুণ্যের ফল ভোগ শেষ হলেই পুনর্জন্ম লাভ করে। তাই তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন—
“এবার কি সাধনে শমনজ্বালা যায়
ধর্মাধর্ম বেদের মর্ম শমনের বিকার তায়।
দান ব্রত তপ যজ্ঞ করে
পুণ্যের ফল পেতে সে পারে
সে ফল ফুরালে তারে
ঘুরিতে ফিরিতে হয়।
নির্বাণ-মুক্তি সেধে সে তো
লয় হবে পশুর মতো
সাধন করে এমন প্রাপ্ত
কি সুখে সাধক চায়।”
লালন ফকিরের মতে, বৈদিক আচারের চেয়ে ‘রাগের ঘর’ শ্রেয়। বৈদিক রীতি-রেওয়াজের সংকীর্ণ গহ্বর থেকে বেরিয়ে এসে সেই ‘রাগের ঘরে’-ই ‘মানুষের করণ’, অর্থাৎ মনের মানুষকে সন্ধান করার কথা বলেছেন।
“জানো যে মানুষের করণ কীসে হয়।
ভুলো না মন বৈদিক ভোলে
রাগের ঘরে রও।”
লালন ফকিরের উদার দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে বৈদিক দর্শনের কামরিপু এবং প্রেম সংক্রান্ত তত্ত্বের প্রতি বীতশুদ্ধ করে তোলে। সেই প্রসঙ্গে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য—
“সময় গেলে সাধন হবে না
দিন থাকিতে তিনের সাধন কেন করলে না।
জানো না মন খালে বিলে
থাকে না মীন জল শুকালে
কী হবে আর বাঁধাল দিলে, মোহনা শুকনা।
অসময়ে কৃষি করে
মিছামিছি খেটে মরে
গাছ যদিও হয় বীজের জোরে, ফল ধরে না।
অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়
মহাযোগ সেই দিনে উদয়
লালন বলে তাহার সময় দণ্ড রয় না।”

গুরুবাদ

নাথবাদ, সুফিবাদ, সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্ম, তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদির সমন্বয়ের ফলে সৃষ্ট হওয়ার কারণে বাউল দর্শনে গুরুবাদ একটা বিস্তৃত স্থান অধিকার করে আছে। কিন্তু এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, বৈদিক সংস্কৃতির গুরু-শিষ্য পরম্পরার সঙ্গে বাউল বা অন্যান্য সহজিয়া ঘরানার গুরুবাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। বৈদিক গুরুকুল ব্যবস্থায় বর্ণভেদ এবং জাতিভেদের প্রভাব ছিল মারাত্মক। উচ্চবর্ণ বা উচ্চজাতি ছাড়া কেউ সেই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারত না। কিন্তু বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে এরকম কোনও বিভেদমূলক দৃষ্টি ছিল না। যেকোনও লোকই শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে পারত এবং বাউলমত প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারত।

বাউল সাধনা গুরুমুখী সাধনা। বাউল সাধনা পদ্ধতি গ্রন্থাকারে না থাকার কারণে গুরু বা মুর্শিদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। গুরু বা মুর্শিদই শিষ্য/শিষ্যাদের সঠিক পথে সাধনা করতে শেখান— এটাই বাউলদের বিশ্বাস। পারমার্থিক এবং লৌকিক— উভয় বিষয়েই গুরুবচন একজন বাউলের কাছে আপ্তবাক্যস্বরূপ। বাউল দর্শনে গুরুকে দু’ভাবে দেখা হয় : মানবগুরু রূপে এবং পরমতত্ত্ব রূপে। বাউলগানে উভয় দৃষ্টান্তই দেখা যায়।
লালন ফকির দ্বিবিধ গুরুকে কখনও কখনও একীভূত করেছেন। নিম্নোক্ত লালনগীতির দৃষ্টান্তে লালন ফকিরের সে দৃষ্টিভঙ্গির নিদর্শন পাব—
“মুরশিদ বিনে কী ধন আর আছে রে মন এ জগতে
যে নাম স্মরণে মন রে, তাপিত অঙ্গ শীতল করে
ভববন্ধন জ্বালা যায় গো দূরে জপ ঐ নাম দিবারাতে।
মুরশিদের চরণের সুধা, পান করিলে যাবে ক্ষুধা
করো না মন দেলে দ্বিধা, যেহি মুরশিদ সেহি খোদা
ভজ ওলিয়েম মুরশিদা আয়াত লেখা কোরানেতে।
আপনি আল্লা আপনি নবি, আপনি হন আদম সফি
অনন্ত রূপ করে ধারণ, কে বোঝে সাইর লীলার করণ
নিরাকারে হাকিম নিরঞ্জন মুরশিদ রূপ ওই ভজন পথে।
কুল্লে সাইন মোহিত আর, আল্লা কুল্লে সাইন কাদির
পড় কালাম নিহাজ কর তবে সে ভেদ জানতে পার
কেন লালন ফাঁকে ফের ফকির নাম পাড়াও মিছে।”
আবার কখনও গুরু-মুর্শিদের প্রতি লালনের জীবন সম্পূর্ণরূপে সমর্পিত। গুরুবাদী মনন থেকেই তিনি লিখেছেন—
“গুরু দোহাই তোমার, মনকে আমার লও গো সুপথে
তোমার দয়া বিনে তোমার সাধব কী মতে।
তুমি যারে হও গো সদয়
সে তোমারে সাধনে পার
বিবাদী তার স্ববশে রয়
তোমার কৃপাতে।
যন্ত্রেতে যন্ত্রী যেমন
যেমত বাজায় বাজে তেমন
তেমনি যন্ত্র আমার মন
বোল তোমার হাতে।
জগাই মাধাই দস্যু ছিল
তারে গুরুর কৃপা হল
অধীন লালন দোহাই দিল
সেই আশাতে।”
কখনও লালন ফকিরের দৃষ্টিতে গুরু বা মুর্শিদ হয়ে ওঠেন পথপ্রদর্শক বা কাণ্ডারী। সেই কাণ্ডারীরূপী গুরুর উদ্দেশে লালনের বক্তব্য—
“গুরু যার কাণ্ডারী ভবে
সেই অনায়াসে হবে পার
এক নিরিখে থাকলে পরে
তুফান বলে ভয় কি তার।
শুদ্ধ মাস্তুল ঠিক করিয়া
প্রেম-বাদাম দেও খাটাইয়া
ও মদনগঞ্জ বাঁয়ে রাখিয়া
চালাও তরী উজান ধার।
শুদ্ধ প্রেমের তরীখানা
এক মনের বেশি ধরে না
গুরু-শিষ্য একই জনা
ও তাই লালন বলে
এক মনের সই ওজন তার।”

বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে গুরু-শিষ্যের চিন্তনের বন্ধন খুবই দৃঢ়। লালন ফকিরের বহু গানেই তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইয়ের নাম উল্লেখিত আছে। আসলে সিরাজ সাঁই লালনের মনে একপ্রকারের নবজাগরণের বীজ বপন করেছিলেন। তাই লালন তাঁর গুরুর চিন্তাধারা নিজের শিষ্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বহু গুরুতত্ত্ব সংক্রান্ত গানে সিরাজ সাঁইয়ের নামোল্লেখ করতেন। সেরকমই একটা গানের অন্তিম স্তবকে লিখেছেন—
“মুরশিদ পথের দাঁড়া
যাবে কোথায় তারে ছাড়া
সিরাজ সাই কয় লালন গোড়া
মুরশিদ ভজলে জানা যায়।”
সিরাজ সাঁই ছাড়াও লালন ফকিরের চিন্তাজগতে দশম শতাব্দীর সুফিসাধক মনসুর-আল-হাল্লাজের প্রভাব ছিল। লালন তাই গুরুতত্ত্বের মাহাত্ম্য প্রচার করতে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন—
“মনসুর হেল্লাজ ফকির সে তো
জেনেছিল আমি সত্য
সই পলো সাঁইয়ের আইন মতো
শরায় কি তার মর্ম্ম পায়।
‘কওম বেইজনী কওব বাইজ্ লিল্লা
সাঁই হুকুম দুই আমি হিল্লা
লালন বলে এ ভেদ খোলা
আছে যে মুর্শিদের ঠাঁই।“

দেহতত্ত্ব (স্থূল মানবদেহের গৌরব– ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ডবাদ)

বাউলদের কাছে এই মানবজীবন এবং এই নরকলেবর পরম সম্পদ রূপে স্বীকার করা হয়। বাউল সাধনার মূল আশ্রয়ই হল মানবদেহ। মানবদেহকেই বাউলতত্ত্বে পরমতত্ত্ব বা ‘মনের মানুষ’-এর আধার হিসেবে মানা হয়। এই নরদেহই বাউল সাধনা পদ্ধতির মাধ্যমে আত্মোপলব্ধির সোপান। তাই বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা প্রচলিত কথা আছে, ‘যা আছে ভাণ্ডে, তা আছে ব্রহ্মাণ্ডে।’ শুধু সেটাই নয়, মাদুর্যভজন বা প্রেমমূলক উপাসনার প্রধান আশ্রয়ই এই মানবদেহ। তাই বাউল সম্প্রদায় এই নরদেহকে পরম শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের চোখে দেখে।
ফকির লালন দেহতত্ত্বের আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েই এক আনন্দ-অমৃতের ধারা প্রবাহিত হয়ে যায় অবিরাম; এর এক বিন্দুতেই সিন্ধু লুক্কায়িত। তাই মানবজন্ম সম্পর্কে লালনের অভিমত—
“কত ভাগ্যের ফলে না জানি
মন রে পেয়েছ এই মানবতরণী
বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়
যেন ভরা না ডোবে।”
লালন আরও মনে করেন, সমস্ত সাধনার পূর্বেই মানুষের উচিত এই মানবজন্মের রহস্যের সন্ধান করার জন্য এই মানবদেহের বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করা। তাই তাঁর বক্তব্য—
“আপন ঘরের খবর লে না
অনায়াসে দেখতে পাবি
কোনখানে কার বারামখানা।
কোমল ফোটা কারে বলি
কার মোকাম তার কোথায় গলি
কোন সময় পড়ে ফুলি
মধু খায় সে অলি অলি জনা।
অন্য জ্ঞান যার সখ্য মোক্ষ
সাধক উপলক্ষ
অপরূপ তার বৃক্ষ
দেখলে চক্ষের পাপ থাকে না।
শুষ্ক নদীর শুষ্ক সরোবর
তিলে তিলে হয় গো সাঁতার
লালন কয়, কৃতি-কর্মার
কী কারখানা।”

আগেই বলা হয়েছে, লালন ফকির কোনও ধরনের বাহ্যিক রীতি বা আচার-উপচারে বিশ্বাস করতেন না। তাই লালনের দেহতত্ত্বেও সব ধরনের তীর্থ-হজ, উপাসনা, ব্রত বা জপতপের বিরোধিতা করা হয়েছে। স্বয়ং লালনের ভাষায়—
“আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে
দেখ না রে মন চেয়ে
দেশ-দেশান্তর দৌড়ে এবার
মরিস কেন হাঁপিয়ে।
করে অতি আজব ভাক্কা
গঠেছে সাঁই মানুষ-মক্কা
কুদরতি নূর দিয়ে।
ও তার চার দ্বারে চার নূরের ইমাম
মধ্যে সাঁই বসিয়ে।
মানুষ-মক্কা কুদরতি কাজ
উঠছে রে আজগুবি আওয়াজ
সাততলা ভেদিয়ে।
আছে সিংহ-দরজার দ্বারী একজন
নিদ্রাত্যাগী হয়ে।
দশ-দুয়ারী মানুষ মক্কা
গুরুপদে ডুবে দেখ না
ধাক্কা সামলায়ে।
ফকির লালন বলে, সে যে গুপ্ত মক্কা
আমি ইমাম সেই মিঞে।
ওরে সেথা যাই কোন পথ দিয়ে।”
এই প্রসঙ্গে লালন আরও বলেছেন—
“উপাসনা নাই গো তার
দেহের সাধন সর্ব সার
তীর্থ-ব্রত যার জন্য
এ দেহে তার সব মিলে।”
ঈশ্বরের প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে লালন দেহতত্ত্বের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বোঝাতে চেয়েছেন, পরমেশ্বর মানবদেহেই বিরাজমান। কিন্তু সেই বিষয়টিকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি না অনেক সময়ে। সেই প্রসঙ্গে তিনি গানের মাধ্যমে তাঁর মত ব্যক্ত করেছেন।
“আমার এ ঘর খানায় কে বিরাজ করে
জনম ভরে একদিনও তারে দেখলাম না রে।
নড়েচড়ে ঈশান কোণে
দেখতে পাইনে এই নয়নে
হাতের কাছে যার ভবের হাট বাজার
ধরতে গেলে হাতে পাইনে তারে।
সবে বলে প্রাণপাখি
শুনে চুপে চেপে থাকি
জল কি হতাশন মাটি কি পবন
কেউ বলে না আমার নির্ণয় করে।
আপন ঘরের খবর হয় না
বাঞ্চা করি পরকে চেনা।
লালন বলে পর বলিতে পরমেশ্বর
সে কী রূপ আমি কী রূপ রে।”
দেহতত্ত্বের আলোচনা করতে করতেই লালন জীবনের রহস্যের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন সেই বহুল প্রচলিত ও বিখ্যাত গান—
‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মন-বেড়ি দিতাম তাহার পায়।
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা
আয়না-মহল তায়।
কপালে মোর নইলে কি আর
পাখিটির এমন ব্যবহার
খাঁচা খুলে পাখি আমার
কোন বনে পালায়।
মন, তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর তৈক্রি কাঁচা বাঁশে
কোনদিন খাঁচা পড়বে খসে
লালন কেঁদে কয়।”
গানটির রূপক তাৎপর্য আজও আমাদের আধুনিক মনকে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তি এনে দেয়।

মানুষতত্ত্ব (মনের মানুষ অন্বেষণ)

বাউল দর্শনে মানবদেহে স্থিত পরমতত্ত্বকে ‘মনের মানুষ’ বলা হয়। দেহতত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল মানুষতত্ত্ব। ‘মনের মানুষ’ সংক্রান্ত যাবতীয় মতামতের আলোচনাকে বাউল দর্শনে মানুষতত্ত্ব বলা হয়। পরমতত্ত্ব বা পরমাত্মাকে ‘মানুষ’ বলার কারণ হল এই যে, বাউল দর্শন অনুসারে এই পরমাত্মা মানবদেহেই অবস্থান করে এবং তার রূপও মানবাকৃতি। পূর্ণদাস বাউল এবং সেলিনা থিয়েলেম্যান ‘মনের মানুষ’ সম্পর্কে ‘Baul Philosophy’ গ্রন্থে বলেছেন, “For however long I am together with That One, there is eternal bliss. And this is full bliss, undivided bliss— there is no partialness in it”।
লালন ফকিরের গানে এই পরমতত্ত্বের বিভিন্ন রূপ ও অবস্থানের কথা উল্লেখিত হয়। লালন বলেছেন—
“এই মানুষে সেই মানুষ আছে
কত মুনি ঋষি চারযুগ ধরে বেড়াচ্ছে খুঁজে।”
আবার ‘আমার ঘরের চাবি পরের হাতে’ গানের শেষ স্তবকে বলেছেন—
“এই মানুষে আছে রে মন
যারে কয় মানুষ রতন।”

লালন ফকিরের বক্তব্য হল, নিজেকে চিনলে এবং অনুধাবন করলে আপাতদৃষ্টিতে অচেনা-অদেখা সেই সত্তার জ্ঞান আমরা লাভ করতে পারি। কেবলমাত্র শাস্ত্রপাঠ করেই সেই বিষয়কে অনুভব করা অসম্ভব, তাই মনে নিষ্ঠা সহকারে সর্বাগ্রে আত্মোপলব্ধি করতে হবে। লালন একটি গানে এই বিষয়ে বলেছেন—
“আমার আপন খবর আপনার হয় না।
সে যে আপনারে চিনলে পরে, যার অচেনাৱে চেনা।
সাঁই নিকট থেকে দূরে দেখায়
যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায় দেখ না।
আমি ঢাকা দিল্লি হাতড়ে ফিরি
আমার কোলের ঘোরত যায় না।
সে যে আত্মারূপে কর্তাহরি,
মনে নিষ্ঠা হলেই মিলবে তারি ঠিকানা।
আর বেদ-বেদান্ত পড়বে যত
বাড়বে তত লক্ষণা।
আমি আমি কে বলে মন,
যে জানে তার চরণ শরণ লে না।
ফকির লালন বলে বেদের গোলে
হলাম চোখ থাকিতে কানা।”
লালন ফকিরের মানুষতত্ত্ব শুধুমাত্র এখানেই এসে থেমে যায়নি। তিনি সেই পরমতত্ত্বস্বরূপ ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধান করতে করতে জাতি-ধর্মের বেড়া ভেঙে একদম স্বয়ংসম্পূর্ণ মনুষ্যত্বের স্বরূপকে অনুভব করেছেন। শুধুমাত্র দার্শনিক তত্ত্বের উপস্থাপক তাঁর স্বরচিত সঙ্গীতের মাধ্যমেই নয়, নিজের জীবনযাপনেও সেই মনুষ্যত্বের পথ ধরে আজীবন অনড় থেকেছেন। লালন তাই প্রশ্ন করেছেন—
“এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জাতি-গোত্র নাহি রবে।
শোনায়ে লোভের বুলি
নেবে না কেউ কাঁধের ঝুলি
ইতর আতরাফ বলি
দূরে ঠেলে নাহি দেবে।
আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই
সবার পাওনা পাবে সবাই
আশরাফ বলিয়া রেহাই
ভবে কেহ নাহি পাবে।
ধর্ম কুল গোত্র জাতির
তুলবে না গো কেহ জিগির
কেঁদে বলে লালন ফকির
কেবা দেখায়ে দেবে।”
লালন খুব সহজভাবে মানুষতত্ত্বের সংজ্ঞা দিয়েছেন এইভাবে—
“মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
সেকি অন্য তত্ত্ব মানে।
মাটির ঢিপি কাঠের ছবি
ভূত-ভবিষ্যৎ দেবা-দেবী
ভোলে না সে এসব রূপী
মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে।”
লালনের মানুষতত্ত্বের মধ্যে অধ্যাত্মবাদ থাকলেও তা কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়নি। মানুষতত্ত্বের মাধ্যমেই জাতিভেদ প্রথার সংকীর্ণতার স্বরূপ খুঁজে পেয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি উপলব্ধি করেছেন—
“আসবার কালে কী জাত ছিলে
এসে তুমি কী জাত নিলে
কী জাত হবে যাওয়ার কালে
সে কথা ভেবে বলো না।
ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি
এক জলেতে হয় গো শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না।”
লালনের ব্যক্তিজীবনেও তাঁকে বহুবার জাতি-ধর্মের প্রশ্নের আঘাত সহ্য করতে হয়েছে। তিনি তাই স্পষ্টভাবে বলেই দিয়েছেন তাঁর একটি বহুল প্রচলিত গানে— “লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না নজরে।”

রূপ-স্বরূপতত্ত্ব

খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, রূপ বলতে কোনও বস্তুর বহিরঙ্গের আকার বোঝায়। এই রূপকে আশ্রয় করে, এই রূপেরই অভ্যন্তরে সেই বস্তুর যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকে তাকে স্বরূপ বলা হয়। ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেছেন, “জগতের পুরুষ ও নারীর যে রূপ, তাহা তাহাদের বাইরের রূপ। এই রূপ বা বিশিষ্ট আকৃতিকে অবলম্বন করিয়া তাহার অভ্যন্তরে যে উহার একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অস্তিত্ব, তাহাই স্বরূপ।” বাউলগানের মধ্যে আমরা এই রূপ-স্বরূপের উল্লেখ দেখি। বাউল সাধনার সার্থকতা নিহিত আছে এই রূপের ভেতর থেকে স্বরূপে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে। বাউলরা মানবদেহের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডকে কল্পনা করেন। প্রাকৃত দেহকে অপ্রাকৃতে রূপান্তরিত করে সেই নরদেহেও পরমতত্ত্বকে উপলব্ধি করাই হল বাউল সাধনার মূল লক্ষ্য।
লালনের মতে, রূপের আবরণে জ্যোতির্ময় সেই অটল স্বরূপ বিদ্যমান। কিন্তু তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। তাই সেই স্বরূপকে উপলব্ধি করার পন্থা হিসেবে লালন, তাঁর গুরুর মত অনুসারে, বলেন—
“তিন রসের সাধন করো
রূপ-স্বরূপের তত্ত্ব ধরো
লালন কয় তবে যদি পারো
প্রাণ জুড়াতে সে রূপ হেরে।”

লালনের মতে, এই স্বরূপ বা অটল রূপকে উপলব্ধি করতে হলে প্রাকৃত দেহের সাধন অপরিহার্য। রূপ বা শ্রীরূপের জ্ঞান এই প্রাকৃত দেহ থেকে লব্ধ হয়। সেই জ্ঞান লাভ করলেই স্বরূপের সন্ধান পাওয়া যাবে। আর তাই লালন রূপ-স্বরূপতত্ত্বের ব্যাখ্যার্থে বলেছে—
“রূপের ঘরে অটল রূপ নেহারে চেয়ে দেখ না তোরা।
ফণী মণি জিনি রূপের বাখানি দুই রূপে আছে সেইরূপ হল করা।
যে-জন অনুরাগী হয় রাগের দেশে যায়
রাগের তালা খুলে সে রূপ দেখতে পায়
রাগেরি কিরণ বিধি বিস্মরণ
নিত্য নীলের ও পার নেহারা।
ও সে অটলরূপ সাই ভেবে দেখ তাই
সে রূপের কভু নিলে নিত্য নাই
যে-জন পঞ্চতত্ত্ব যজে, নিলে রূপে মজে
সে কি জানে অটলরূপ কী ধারা।
আছে রূপের দরজায় শ্রীরূপ মহাশয়
রূপের তালা ছোড়ান তার হাতে সদাই
যে-জন শ্রীরূপে গত হবে তালার ছোড়ান পাবে
অধীন লালন বলে অধর ধরবে তারা।”

লালন ফকিরের গানের মধ্যে বাউল দর্শনের মূল যে উপাদানগুলো নিহিত রয়েছে সেগুলো লালনের সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন পরিধিও পেয়েছে। বাউল দর্শন, সুফিবাদ, ভক্তিবাদ, বৈষ্ণব-সহজিয়া মত, বৌদ্ধ মত, তান্ত্রিক দর্শন— সব কিছুর সমন্বয়ে তিনি যেভাবে তাঁর গানের মাধ্যমে বাউল দর্শনকে ব্যাখ্যা করেছেন, তা একাধারে দর্শন, সঙ্গীত এবং সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী তাঁর ‘লালন শাহ’ গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন যে, “প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন স্বশিক্ষিত;… ভাবের সীমাবদ্ধতা, বিষয়ের পৌনঃপুনিকতা, উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের বৈচিত্র্যহীনতা ও সুরের গতানুগতিকতা থেকে লালন ফকির বাউলগানকে মুক্তি দিয়েছিলেন।… ভাব-ভাষা-ছন্দ-অলঙ্কার বিচারে এই গান উচ্চ শিল্পমানের পরিচায়ক— এবং তা তর্কাতীতরূপে কাব্যগীতিতে উত্তীর্ণ।” লালন ফকির বাউল দর্শনের ক্ষেত্রে শুধু তাঁর পূর্ববর্তী বাউল তাত্ত্বিকদের কাজের পরিসরে নিজের মতাদর্শগত অবস্থানকে আটকে রাখেননি বরং তিনি তাঁর সময়ে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব শুরু হল, সেই সময়ের পরিস্থিতির ঘটনাবলিকেও তাঁর গানে টেনে এনেছেন। বিশেষত মানুষতত্ত্বের মধ্যে তিনি যে নতুনত্ব এনেছেন তা নিঃসন্দেহে সমাজদর্শনের জগতেও এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। শুধু তাই নয়, তাঁর অন্যতম শিষ্য কাঙাল হরিনাথের হাতে সৃষ্ট বিভিন্ন ‘ফিকিরচাঁদী গান’-এর মাধ্যমে মীর মোশারফ হোসেন বা রজনীকান্তের অনেক গানের বন্দিশের মধ্যে লালনের ভাবধারা প্রভাব বিস্তার করেছে, যা পরে রবীন্দ্রসঙ্গীতকেও অলংকৃত করে তোলে।
লালন সঙ্গীতের কথা-অংশ পাঠ করতে বসে আজ একটা ভাবনা হয়তো অনেকের মনের জানলাতেই উঁকি দেয়। ভারত তথা বাংলার ইতিহাস যদি সেদিন অন্যরকম হত, ব্রিটিশ বাণিজ্যতরী যদি এই ঘাটে এসে না বাঁধত, তাহলে কি ভারতের নবজাগরণ হত না? না কি যা এবং যেভাবে হয়েছে তার তুলনায় এক অন্যতর পথ অবলম্বন করত? ইতালির মডেলকে সামনে রেখে নবজাগরণের যে মূল তিনটি উপাদান আমরা লক্ষ করি, তার একটি চিন্তার গুঞ্জন— সবার উপরে মানুষ সত্য— ইতিমধ্যেই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির আঙিনায় এসে গিয়েছিল। লালনের গানেও সেই কথা বাণী এবং সুর লাভ করে আরও সোচ্চার হয়েছিল। আর একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আগেরটিরই অন্তরঙ্গ সহযোগী ভাবধারা— অর্থাৎ ধর্মীয় ঐশ্বরিক উহলৌকিক স্বপ্নময় ধ্যানধারণা থেকে পার্থিব ইহজাগতিক লোকে অবতরণ (কিংবা উত্তরণ?)— তার যেন একরকম আবাহনী সুর লালন শাহের গানের মধ্যে আমরা শুনতে পাই। অনেকটা তাঁর প্রায় সমকালেই রামমোহন রায় এসে গদ্যের ভাষায় যা বললেন। ঈশ্বর বা ব্রহ্ম আছেন। কিন্তু এই জগৎকে উপেক্ষা করে তাঁর দিকে তাকিয়ে নিস্তব্ধ নিষ্ক্রিয় ধ্যানে এই মানবজীবনকে নষ্ট হতে দিয়ো না। জ্ঞান, শিক্ষা, উৎপাদন, শ্রম— এইসব বাদ দিয়ে আর যাই হোক, মনুষ্যজীবন হয় না। লালনও তাঁর গানের মধ্যে এইসব কথাই উত্থাপন করেছিলেন বলে মনে হয়। সেই অর্থে তিনি ইউরোপীয় শিক্ষার দরজা থেকে অনেক দূরে বসে বাংলার নিজস্ব ঘরানায় লোকসংস্কৃতির পাঠশালায় বিদ্যালাভ করে স্বশিক্ষিত হয়ে এসেও রাজা রামমোহন রায়ের রেনেসাঁস মনোভুবনের সহযাত্রী বললে কি খুব ভুল কথা বলা হবে? আমাদের আধুনিক লালনচর্চায়, তাঁর গানগুলি গাইতে গাইতে এবং শুনতে শুনতে এই প্রশ্নটিরও উত্তর আজ খোঁজা যাক। ভারত রেনেসাঁসের এক অন্যতর মাটির পথিক হিসাবে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকারও মূল্যায়ন শুরু হোক৷

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :
১) লালন ফকিরের গান (পূর্ণাঙ্গ প্রামাণিক জীবন সহ), প্রথম খণ্ড, সুপ্রতীপ দেবদাস।
২) লোকায়ত দর্শন, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
৩) বাংলার বাউল ও বাউলগান, ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য।
8) লালন শাহ, আবুল আহসান চৌধুরী।
৫) বাংলার বাউল, ক্ষিতিমোহন সেন।
৬) Baul Philosophy, Baul Samrat Purna Das, Selina Thielemann।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.