বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

বের্টল্ট ব্রেশ্‌টের আন্তিগোনে : সমকালের আলোয় ক্লাসিক

অতীতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দিশা দেখায়, তাই হিটলারের পতনের পরও সে বিষয় নাড়াচাড়ার দরকার পড়ে। আন্তিগোনেকে দিয়ে নাটকে প্রথম দিকে ব্রেশ্‌ট বলিয়েছেন, অতীতকে ভুলে গেলে অতীত ফিরে আসে।

শুভেন্দু সরকার

হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হলেন ৩০ জানুয়ারি ১৯৩৩-এ। তার পরই শুরু হল বিরোধীদের (বিশেষত ইহুদি আর কমিউনিস্ট) ওপর যথেচ্ছ দমনপীড়ন। অনেকের মতো বের্টল্ট ব্রেশ্‌টও (১৮৯৮-১৯৫৬) তখন প্রাণের তাগিদে বেছে নিলেন জার্মানির বাইরে একের পর এক নিরাপদ দেশ। তাঁর স্বেচ্ছানির্বাসনপর্ব চলেছিল অক্টোবর ১৯৪৮ অবধি। ততদিনে অবশ্য নাৎসি জমানার পতন ঘটেছে। মনে রাখা জরুরি, দেশে থেকে তিনি যা পারতেন না, নির্বাসনকালে ব্রেশ্‌ট তাই করলেন অবিরাম। সরাসরি হিটলার বিরোধী সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়ার পাশাপাশি তিনি লিখলেন ‘গালিলেওর জীবন’ (১৯৩৮), ‘মা কুরাজ ও তাঁর সন্তানরা’ (১৯৩৯) আর ‘সেৎসুয়ানের ভালমানুষ’ (১৯৪০)-এর মতো ধ্রুপদী নাটক।

জার্মানি ছাড়ার ষোলো বছর পর ৫ নভেম্বর ১৯৪৭-এ সুইটজারল্যান্ডের ৎসুরিশে কাসপের নেহেরের সঙ্গে ব্রেশ্‌টের দেখা হয়। মঞ্চ পরিকল্পক নেহের আগাগোড়াই জার্মানিতে ছিলেন। এবার আর একবার দু’জনে জুটি বাঁধলেন। শুরু হল ব্রেশ্‌টের নাটক প্রযোজনার এক নয়া অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫) চলাকালীন ব্রেশ্‌টের বেশ কয়েকটি নাটক ৎসুরিশে অভিনীত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর পর তাই সেখানেই থিতু হবার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। স্ত্রী হেলেনে ভাইগেল আর অন্যান্য বন্ধু ও সহকর্মী অল্প দিনের মধ্যেই সেখানে এলেন। সকলে মিলে তাঁরা বের করলেন একটি ইস্তাহার— তাতে দেওয়া হল বিশ্বশান্তির ডাক।

বিশ্বশান্তি আন্দোলনের নিরিখে প্রথমে ‘মা কুরাজ ও তাঁর সন্তানরা’ অথবা ‘কসাইখানার সন্ত যোহানা’ (১৯২৯-৩১) মঞ্চস্থ করার ভাবনা এসেছিল। কিন্তু ৎসুরিশের কাছে শুর শহরের এক থিয়েটার হলের মালিক হান্‌স কুরজেনের ইচ্ছেয় ঠিক হল, নেহের আর ব্রেশ্‌টের যুগ্ম পরিচালনায় সেখানে পরিবেশিত হবে সোফোক্লেসের ‘আন্তিগোনে’। নেহেরের কথামতো সোফোক্লেসের (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৪৯৬-৪০৬) নাটকের জার্মান অনুবাদ (১৮০৪-এ যেটি করেছিলেন রোমান্টিক কবি ফ্রিডরিশ হোল্ডারলিন) নিয়ে বসলেন ব্রেশ্‌ট। দার্শনিক হেগেলের প্রিয় এই প্রাচীন গ্রিক নাটকে ছিল দ্বান্দ্বিকতার ছাপ। দুটি বিরোধী শক্তির সংঘাতের মধ্যে দিয়ে এগোয় তার কাহিনি। ১৯৩০-এর দশক থেকে দ্বান্দ্বিকতাকে তাঁর নাটকের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছিলেন ব্রেশ্‌ট। সোফোক্লেসের নাটক তিনি যে ঢেলে সাজবেন এ আর আশ্চর্য কী! মহিলাকেন্দ্রিক নাটক বাছার আর একটি কারণ অবশ্য দীর্ঘদিন পর হেলেনে ভাইগেলকে মঞ্চে তোলার সাধ। এক মাসের মধ্যে ব্রেশ্‌ট যে স্ক্রিপ্টটি কুরজেনকে দিলেন তা ছিল সোফোক্লেস ও হোল্ডারলিন, দু’জনের থেকেই আলাদা। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮-এ প্রথম অভিনয় হল সেই নাটক।

ব্রেশট ও নেহের পরিচালিত ‘আন্তিগোনে’র দৃশ্য।

প্রাচীন গ্রিক নাটকের রূপান্তর হলেও ব্রেশ্‌টের ‘আন্তিগোনে’-র গঠন অন্যরকম। তা স্পষ্ট হয় প্রস্তাবনায় (প্রোলগ)— যার পটভূমি ১৯৪৫-এর বার্লিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিতে দুই বোনের দুর্বিষহ জীবনের ছবি ফুটে ওঠে সেখানে। আশ্রয়শিবিরে রাত কাটিয়ে বাড়ি ফিরে দু’জন দেখল, ঘরের কোণে কেউ খাবার রেখে গেছে। তারা ভাবল, সেনাদলের সঙ্গে নিশ্চয়ই ফিরে এসেছে ভাই। আনন্দ করে খেতে খেতে তারা শুনতে পেল আর্তনাদ। তখন বোঝা গেল, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর দায়ে ভাইয়ের ফাঁসি হয়েছে। দড়ি কেটে নামালে তার প্রাণ বাঁচবে— এই ভেবে বোন ছুরি নিয়ে বেরোতে গেল। কিন্তু তার পথ আটকে দাঁড়াল পুলিশ। পলাতক যোদ্ধার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করল দিদি। কিন্তু বোনের হাতে ছুরি থাকায় পুলিশের সন্দেহ বাড়ল। প্রস্তাবনার শেষে দুই জার্মান বোন দর্শকের সামনে (মঞ্চটি ছিল পর্দাবিহীন) আধুনিক পোশাক পাল্টে আন্তিগোনে আর ইসমেনে রূপে দেখা দিল। সময়ের ব্যবধান ঘুচিয়ে এভাবেই নাটকের বিষয়বস্তু সমকালীন করে তুললেন ব্রেশ্‌ট।

ব্রেশ্‌ট ও নেহের পরিচালিত ‘আন্তিগোনে’-র মঞ্চসজ্জাও ছিল ব্যতিক্রমী। চূড়ান্ত অ-স্বভাববাদী অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের পোশাক, মুখোশ আর নাচ। মঞ্চের পিছনে ছিল অভিনেতাদের বসার ব্যবস্থা। সংলাপ বলার সময় তাঁরা এগিয়ে এলেন কয়েকটি খুঁটি দিয়ে ঘেরা নির্দিষ্ট অভিনয়ক্ষেত্রে। এইসব খুঁটির মাথায় ঝোলানো হয়েছিল গরম জলে ধুয়ে লাল রং করা ঘোড়ার মাথার খুলি। এছাড়া, মঞ্চের একপাশে হাজির ছিল একটি বিশাল কাঁসর-ঘণ্টা আর অন্যপাশে মুখোশ রাখার তাক।

গোড়ায় বলে নেওয়া দরকার, সোফোক্লেস আর ব্রেশ্‌টের নাটকের প্রেক্ষাপটেই বিস্তর ফারাক। প্রাচীন গ্রিক নাটকে দু’ভাই এতেওক্লেস ও পোলুনেইকেসের মৃত্যু ঘটেছে আত্মঘাতী যুদ্ধে। রাজসিংহাসনের আশায় আর্গদের সাহায্যে পোলুনেইকেস আঘাত হানেন মাতৃভূমির ওপর। উল্‌টোদিকে, থেবা নগরীকে বাঁচানোর দায়িত্বে ছিলেন রাজা এতেওক্লেস। আর্গ সেনাদল পরাস্ত হলে তাই থেবাবাসী জয়ের উল্লাসে মাতে। আত্মীয়তার সূত্রে এর পর রাজার মুকুট পরেন ক্রেয়োন। রাজধর্ম মেনে তিনি আদেশ দেন, দেশপ্রেমিক এতেওক্লেসকে সসম্মানে কবর দেওয়া হবে; কিন্তু দেশদ্রোহী পোলুনেইকেসের মরদেহ পড়ে থাকবে খোলা আকাশের নীচে। সেটি খুবলে খাবে কুকুর আর শকুন।

খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৪০০ বছর আগের গ্রিক ফুলদানিতে আন্তিগোনে, দু’জন বর্শাধারী প্রহরী ক্রেয়োনের সামনে নিয়ে এসেছে।

ব্রেশ্‌ট কিন্তু প্রথম থেকেই ক্রেয়োনকে রাজা হিসেবেই দেখালেন। কাহিনির পাশাপাশি তাঁর চরিত্রেও হেরফের ঘটল। সোফোক্লেসের নাটকে আর্গ সেনাদল এসেছিল থেবায়; এবার ক্রেয়োনের হুকুমে থেবার সৈন্যরা আক্রমণ করল আর্গ নগরী। সেখানকার খনিজ পদার্থ লুঠ করাই ছিল রাজার মতলব। ব্রেশ্‌টের ‘আন্তিগোনে’-তে আত্মঘাতী লড়াইয়ের প্রসঙ্গও আসেনি। সেখানে যুদ্ধের মাঠে ঘোড়ার পায়ের তলায় চাপা পড়ে মারা গেলেন এতেওক্লেস। তা দেখে থেবার দিকে ছুটলেন ভয়ার্ত ছোটভাই পোলুনেইকেস। ফেরার পথে অবশ্য তাঁকে ক্রেয়োনের হাতে পড়তে হল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর অপরাধে পোলুনেইকেসকে নিঃসংকোচে মারলেন স্বয়ং রাজা ক্রেয়োন। লুঠের সম্পত্তির লোভে বিভোর থেবার জনগণ ব্যয়বহুল আগ্রাসী যুদ্ধকে সমর্থন জানাল; ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে তারা জীবিত সৈনিকদের অপেক্ষায় রইল। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, ক্রেয়োনের আগ্রাসনের মধ্যে দিয়ে আসলে হিটলারের সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ (১৯৪১) তুলে ধরেছেন ব্রেশ্‌ট। প্রযোজনার সময় হিটলারের মতো অঙ্গভঙ্গিও করতেও দেখা গেল ক্রেয়োনকে।

আদিম সমাজকে টিকিয়ে রাখতে তৈরি হয়েছিল বেশ কিছু সামাজিক-ধর্মীয় রীতিনীতি। পারিবারিক সম্পর্ক, গৃহকর্তা-অতিথি আর জীবিত-মৃতকে ঘিরে জন্ম নেয় সেসব মূল্যবোধ। মানুষের কাছে এগুলি ছিল অলঙ্ঘনীয়। সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে পরিবর্তন হলেও ভাবাদর্শের স্তরে প্রথাগুলি মোটের ওপর আজও বহাল আছে। তাই নিকট আত্মীয়ের মরদেহ সৎকারকে আন্তিগোনের মনে হয়েছিল ঈশ্বরের আদেশ। অন্যদিকে, তুলনায় নতুন ভাবাদর্শের (যার উৎস নগর-রাষ্ট্রীয় সমাজব্যবস্থা) পক্ষে সওয়াল করলেন ক্রেয়োন। তাঁর চোখে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রের মূল্য অনেক বেশি। এই দুই ভাবাদর্শের সংঘাতই সোফোক্লেসের নাটকের ভিত্তি। এর জেরে আসে দুঃখ, আসে মৃত্যু।

ব্রেশ্‌ট জানতেন, বিশ শতকে স্রেফ সামাজিক-ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা তোলাই যথেষ্ট নয়। নিছক আবেগতাড়িত বিষয় বলে তা গণ্য হবে। পাঠক/দর্শক এমনও ভাবতে পারেন যে, ক্রেয়োনের সিদ্ধান্তর সারবত্তা আছে। সেইজন্যে আন্তিগোনের জেদের কারণ অপরিবর্তিত থাকলেও ব্রেশ্‌টের নাটকে জোর পড়ল অন্যত্র। আন্তিগোনে-ক্রেয়োন দ্বন্দ্ব সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ বনাম রাষ্ট্রের হিতাহিতের গণ্ডী পেরিয়ে পৌঁছল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বনাম শান্তির স্তরে। আন্তিগোনে দৃপ্তকণ্ঠে জানালেন, রাজার দাস হতে অস্বীকার করেছে যে ভাই, সে-ই তাঁর বেশি প্রিয়। রাষ্ট্রের বিপন্নতার দোহাই দিয়ে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী আদতে নিজস্ব স্বার্থই চরিতার্থ করে। জনগণকে ভজিয়ে তারা লুঠ চালায় নির্বিবাদে। শুধু বিদেশ নয়, এমনকি, দেশবাসীর ওপর আঘাত হানতেও তারা কসুর করে না। শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধে সায় দিয়ে দেশের মানুষ ডেকে আনে নিজেদের বিপদ। তাদের প্রাণ যায় বেঘোরে।

ব্রেশট। ১৯৪৮, সুইটজারল্যান্ড।

সোফোক্লেসের নাটকে অলৌকিকের ভূমিকা বড্ড বেশি। আন্তিগোনের মৃত্যুদণ্ড হবার পর তা আরও বড় আকার ধারণ করে। আন্তিগোনের প্রতি দেশের জনগণের নরম মনোভাব টের পেয়েছিলেন হাইমোন। বাবা ক্রেয়োনকে নম্র হবার পরামর্শও দেন তিনি। কিন্তু রাজা তখনও মানতে রাজি হলেন না যে, আন্তিগোনে পুণ্যবতী— যিনি ঈশ্বরকে দিয়েছেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান। অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা তাইরেসিয়াসের সতর্কবাণী শুনে অবশ্য ক্রেয়োনের মত বদলাল। অপমানিত ভবিষ্যদ্বক্তা বললেন, জোড়া অপরাধের (মৃত পোলুনেইকেসকে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আর সেইসঙ্গে জীবন্ত আন্তিগোনেকে কবর দেওয়া) জন্যে ক্রেয়োনের জীবনে নেমে আসবে ঘোর অন্ধকার। রাজপ্রাসাদ ভরে উঠবে মড়াকান্নার রোলে, নরকের সব পিশাচিনী তাঁর কৃতকর্মের জন্যে শাস্তি দেবে ক্রেয়োনকে। শিউরে উঠে রাজা তখনই সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। গুহার দরজা ভেঙে আন্তিগোনেকে উদ্ধারের আদেশ দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আত্মহত্যা করেছেন আন্তিগোনে। ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে গেলে ক্রেয়োনের সামনেই স্বেচ্ছামৃত্যু ঘটল হাইমোনের। খবর পেয়ে নিজের বুকে ছোরা বসালেন রানি অয়রুদিকে। শেষে সব কিছুর দায় নিলেন বিধ্বস্ত ক্রেয়োন। ঈশ্বরের অমোঘ নিয়মের কাছে এভাবেই ফিকে হয়ে গেল নশ্বর মানুষের তৈরি নিয়ম। নিয়তির সঙ্গে সংঘর্ষে খান খান হল মানবের দম্ভ।

পুরাকাহিনির জন্মকালে প্রকৃতির সামনে মানুষ ছিল অসহায়। মানবসভ্যতার গোড়ায় তারা যে নিজেদের ভাগ্যের হাতের পুতুল মনে করবে— এ তো স্বাভাবিক! কিন্তু প্রকৃতির ওপর মানুষের কর্তৃত্ব যত বাড়বে ততই এরকম নেতিবাচক ধারণায় পরিবর্তন ঘটবে। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকর্মের সঙ্গে মিলবে না বিশ শতকের নাটক। সেইজন্য ভবিষ্যৎ নয়, অতীত আর বর্তমানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন ব্রেশ্‌টের তাইরেসিয়াস। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধ বাধিয়ে আখেরে লাভ নয় বরং অভাবনীয় ক্ষতি হয়েছে। থেবাইয়ের প্রবীণদের (সূত্রধার) সঙ্গেও একসময় বচসায় জড়িয়ে পড়েন ক্রেয়োন। চলে একে অপরকে দোষারোপের পালা। চাপের মুখে অবশ্য রাজা স্বীকার করেন যে, লড়াই এখনও চলছে। দুর্দিনে তবু তিনি স্বপ্ন দেখেন, বড়ছেলে মেগেইরাস (সোফোক্লেসের নাটকে যিনি যুদ্ধ শুরুর আগেই মারা যান) থেবার হয়ে জয় হাসিল করবেন। আর ঠিক তখনই খবর এল, লড়াইয়ের মাঠে মেগেইরাস মারা গেছেন। ক্রেয়োনের বিধ্বস্ত সেনাদলকে কোণঠাসা করে আর্গরা এগিয়ে আসছে থেবার দিকে। একদিকে হঠকারী সিদ্ধান্ত, ক্লান্তি ও অপ্রতুল রসদ আর অন্যদিকে আর্গবাসীর মরিয়া চেষ্টার (যা হিটলারের বিরুদ্ধে ১৯৪৩-এ সোভিয়েত জনগণের প্রতিরোধকে মনে করায়) ফলে থেবার পতন ঘনিয়ে এল। শেষ সম্বল হিসেবে ছোটছেলে হাইমোনকে ফেরাতে ছুটলেন ক্রেয়োন। কিন্তু অপূর্ণই থাকল রাজার সাধ। আন্তিগোনের পর হাইমোনও আত্মঘাতী হলেন। ক্রেয়োনের সর্বগ্রাসী যুদ্ধ এভাবেই মিটল। থেবার আতঙ্কিত জনগণ শত্রুপক্ষর আগমনের আশঙ্কায় প্রমাদ গণল।

দেখার বিষয়, আন্তিগোনেতে ক্রেয়োনের (হিটলার) পাশাপাশি থেবাবাসীকেও (জার্মান জনগণ) দুষেছেন ব্রেশ্‌ট। ভয় অথবা লোভের বশে তারা যুদ্ধবাজ ক্রেয়োনকে সমর্থন যুগিয়েছে। যুদ্ধে তাদের সায় না থাকলে থেবা ও আর্গ, দুটি নগরেই বজায় থাকত শান্তি। সর্বনাশ হবার পর অবশ্য তাদের বোধ জাগল; নিজেদের ভুল তারা বুঝতে পারল।

আর একটি ব্যাপার খেয়াল রাখা জরুরি। গালিলেও আর মা কুরাজের মতো এখানেও প্রধান চরিত্রর নেতিবাচক দিকটি তুলে ধরেছেন নাট্যকার। প্রস্তাবনায় আর মূল নাটকে (বিশেষ করে শেষদিকের সংস্তবে) ফুটে বেরোয় আন্তিগোনের স্বার্থপরতা। অন্যদের জন্যে নয়, তাঁর যাবতীয় চিন্তা ছিল পোলুনেইকেসকে ঘিরে। আবার এও বলা যায়, প্রতিবাদে সোচ্চার হতে আন্তিগোনের প্রচুর সময় লাগল। তিনি জেগে ওঠার আগেই মারা গেছেন এতেওক্লেস; সেইসঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন অগুনতি সাধারণ মানুষ। আন্তিগোনের ভুল ধরিয়ে দিয়ে ব্রেশ্‌ট বোঝাতে চাইলেন, অনেক আগেই দরকার ছিল হিটলারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এর থেকে ভবিষ্যতে মানুষ শিক্ষা নেবে— এমনই আশা ছিল তাঁর। অতীতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দিশা দেখায়, তাই হিটলারের পতনের পরও সে বিষয় নাড়াচাড়ার দরকার পড়ে। আন্তিগোনেকে দিয়ে নাটকে প্রথম দিকে ব্রেশ্‌ট বলিয়েছেন, অতীতকে ভুলে গেলে অতীত ফিরে আসে।

মৌলিক নাটক লেখার পাশাপাশি ব্রেশ্‌ট মাঝেমধ্যেই হাত দিয়েছেন রূপান্তরের কাজে। নানা যুগের নাটক ও উপন্যাসকে দর্শক/পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন নতুনভাবে। মনে রাখা দরকার, অনেক সময়েই মূল সাহিত্যকর্মের নিরিখে একেবারে বিপরীত হয়ে উঠেছে তাঁর রূপান্তরের অভিমুখ। নিজের কাজকে সর্বদা সমসাময়িক প্রেক্ষিতে উপস্থাপন করাই ছিল ব্রেশ্‌টের অভীষ্ট। একথা তাঁর মৌলিক নাটকগুলির বেলায়ও খাটে— সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যেগুলির একের পর এক পাঠ তিনি তৈরি করে চলতেন। সমকালকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণের জন্যে ব্রেশ্‌ট কাজে লাগিয়েছেন নানা উপায়। তার মধ্যে অন্যতম হল ভিনদেশি আর অতীতের প্রেক্ষাপট ও কাহিনি। ব্রেশ্‌টের ‘বিষঙ্গীকরণ’-এর তত্ত্বের সঙ্গে তা ভালভাবে খাপ খায়। অচেনার মাধ্যমে দর্শক/পাঠক সম্যকভাবে উপলব্ধি করেন চেনাজানা জগৎকে। অবশ্য স্রেফ চারপাশকে ব্যাখ্যাই ব্রেশ্‌টের নাটকের উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি চাইতেন তাঁর নাটক থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করুন দর্শক/পাঠক। থিয়েটারকে আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর অন্যতম হাতিয়ার ভাবতেন ব্রেশ্‌ট।

আগেই বলেছি, নির্বাসনকালের গোড়া থেকে ব্রেশ্‌ট লাগাতার সোচ্চার ছিলেন ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের বিপক্ষে; বার বার মানুষকে রুখে দাঁড়ানোর ডাকও দিয়েছেন এমন অমানবিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু দেখা গেল, বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের পরও ‘আন্তিগোনে’ মারফত তিনি ফিরলেন নাৎসিবাদ প্রসঙ্গে। এবার অবশ্য তাঁর লক্ষ্য আলাদা। নৈর্ব্যক্তিকভাবে তিনি বুঝতে চাইলেন হিটলারের উত্থানের ভিত্তি। তাই ‘আন্তিগোনে’-তে বিশেষ জোর পড়ল জনগণের বৌদ্ধিক অপরিপক্কতার ওপর। আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের আবেগে ভেসে আর অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের স্বপ্নে মেতে তারা সমর্থন করেছিল হিটলারের সবরকম কুকাজ। আখেরে অবশ্য তারা নিজেদের ভুল বুঝল। তাই বলা চলে, ব্রেশ্‌টের ‘আন্তিগোনে’ স্রেফ একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের পর্যালোচনা নয় বরং মানুষের কাছে তা বয়ে আনে সতর্কবাণী। আগামীদিনে যাতে এমন অগণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম না হয়— ব্রেশ্‌ট সেই শিক্ষাই দিতে চেয়েছেন। সোফোক্লেসের নাটকটি গড়েপিটে তাই সমকালের উপযোগী করে তুললেন তিনি। শেষে বলার এই যে, ব্রেশ্‌টের ‘আন্তিগোনে’  বিশ শতকের ইওরোপের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ক্লাসিকের নিছক রূপান্তর নয়, কালের বিচারে ব্রেশ্‌টের ‘আন্তিগোনে’ নিজেই হয়ে উঠেছে আর এক ক্লাসিক।

সূত্র
Bertolt, Brech, Sophocles’ Antigone, Translation : Judith Malina, New York, Applause Theatre Book Publishers, 1990।
Sophocles, Antigone, The Theban Plays, London, Penguin Books, 1974।
সোফোক্লেস, আন্তিগোনে, অনুবাদ : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, নতুন দিল্লি, সাহিত্য অকাদেমি, ২০০২।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.