বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

ভাসের নাটক : এক মহাকাব্যিক দর্শন

একটি নাটক যা মহাভারত সংশ্লিষ্ট এবং যা দশ রূপকের মধ্যে ‘ব্যায়োগ’ শ্রেণিতে পড়ে। সেই ‘মধ্যম ব্যায়োগে’-ও প্রচলিত মহাভারতের চরিত্র অবলম্বন করে তুমুল টানাপোড়েন বোনেন রচয়িতা, যা প্রথাসিদ্ধ মহাভারতকে অনুসরণ করছে না।

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

সংস্কৃত সাহিত্যে বহুপ্রসিদ্ধ কবি হলেন ভাস। তিনি যে কালিদাসের পূর্ববর্তী তা কালিদাসই জানিয়ে গিয়েছেন। নিজ কাব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভাসের প্রশংসা করেছেন। তার পরে বহুকাল ধরে নেওয়া হয়েছিল, ভাসের নাটক সব হারিয়ে গিয়েছে। অন্য কোনও কোনও কবির রচনায় তাঁর প্রশংসনীয় উল্লেখ, কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃতি ছাড়া আর কিছু নেই। বাণভট্ট, রাজশেখর, অভিনবগুপ্ত— সেকালের তাবড় সব কবি এবং সমালোচক-টীকাকাররা যাঁর এত সুখ্যাতি করছেন তাঁকে কোথাও পাওয়া যাবে না? সৌমিল্লক অথবা কবিপুত্রের মতো তাঁরও প্রত্যক্ষ চিহ্ন থাকবে না?
তাঁর রচনায় রাজসিংহ বলে এক নরপতির বারংবার বন্দনা আছে। সেই নরপতির নাম কি রাজসিংহ? না কি উপাধি? অনেকেই একদা রাজসিংহ উপাধি নিয়েছেন। যাইহোক, ভাসকে পাওয়া গেল বিংশ শতকের শুরুর দিকে। এবং পাওয়া সত্যিই গেল কিনা তা নিয়ে সন্দেহও আছে এখনও। ত্রিবান্দামে, আজকের কেরলে টি গণপতি শাস্ত্রী খুঁজে পেলেন তেরোটি নাটকের পুথি। একেবারে প্রাচীন মালয়ালাম হরফে লেখা। তিনিই নানা সূত্র ধরে ধরে বিশ্লেষণ করে বললেন এ সকল নাটক ভাসের লেখা। ‘নাটকচক্রম’ নামে তা প্রকাশিত হয়েছে। সকলে মেনে নিয়েছিলেন বা নিয়েছেন, এমন নয়। প্রতিপক্ষ সমালোচকরা অনেক প্রশ্ন তুলেছেন। একজনেরই লেখা সবগুলো? পুরনো নাটক থেকে নিয়ে পরে কেউ এসব লেখেনি তো? পাণ্ড্য রাজা থেকে পল্লব রাজা কিংবা চাক্কিয়ারদের লেখা নয় তো? এমন সব হাজারো প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা, যেমন ধরুন অভিনবগুপ্ত, তিনি নাট্যশাস্ত্রের অন্যতম এবং অসামান্য টীকাকার; তিনি ‘স্বপ্নবাসবদত্তা’-র উল্লেখ কয়েক বার করছেন। একটি ক্ষেত্রে উল্লেখ করছেন সেটি কাব্য হিসেবে অনুৎকৃষ্ট বলে। অলংকারেই নজর কবির, রসের হানি ঘটেছে— তাই এই বক্তব্য তাঁর। দ্বিতীয় বার তিনি কালিদাসের নাটকের সঙ্গে নাটকটির নাম করছেন। এবং কোনওবারেই কিন্তু তিনি দৃশ্যকাব্যটির রচয়িতার নাম করছেন না। অথচ তিনি কিন্তু ভাসকে অন্যত্র মহাকবির স্বীকৃতিও দিচ্ছেন। এমন আরও কয়েকজন করেছেন। এই নাটকটির উল্লেখ আছে, রচনাকারের নাম নেই। এই করে করে মোটামুটি আমরা পৌঁছে যাচ্ছি খিস্টপূর্ব বারোশো শতকে। রামচন্দ্র এবং গুণচন্দ্র ‘স্বপ্নবাসবদত্তা’-র সঙ্গে ভাসের নাম জুড়ছেন। তাঁদের আগে আলোচক সারদাতনয় ‘স্বপ্নবাসবদত্তা’-র গোটা প্লটটিই আলোচনা করেছেন এবং তাঁর উদ্ধৃত একটি শ্লোক মালয়ালামে পাওয়া পুথিতে মিলছেও। কিন্তু তিনিও নাম করছেন না রচকের। এভাবে ভাস এবং তাঁর নাটক নিয়ে সমস্যা বেড়েছে।
এরই সঙ্গে আছে এই প্রমাণগুলোকে সামনে রেখে গণপতি শাস্ত্রীর দাবিকে উড়িয়েই দেওয়া। পাল্টা প্রমাণ কী? অনুমান সব। ভাষা বিশ্লেষণ থেকে নাট্য আঙ্গিকের বিশ্লেষণ সেখানে কম কাজ করছে। ভরত রচিত বলে কথিত নাট্যশাস্ত্রের রীতি অনুযায়ী আগে নান্দী হবে তার পর সূত্রধর প্রবেশ করবেন। বাণের মতো মহাকবি ভাসের নাটক প্রসঙ্গে বলছেন, ভাসের এই সূত্রধরের ব্যবহার অত্যন্ত বিখ্যাত। নান্দী নয়, সোজা সূত্রধর প্রবেশ করছেন। ভাসের নাটক বলে আজ যা পরিচিত তাতেও একই ব্যবস্থা। অবশ্য দুটি নাটক এর ব্যতিক্রমও। যাইহোক, বাকিগুলোতে নাট্যশাস্ত্রের রীতি মানছেন না ভাস বা রচয়িতা এবং সেইটা বাণ একরকম জানেন তাহলে। শুধু এই নয়, নাট্যশাস্ত্রে নান্দীর পরে হবে প্রস্তাবনা। সেই প্রস্তাবনা এইসব পুথিতে স্থাপনা হয়ে আছে। অর্থাৎ পরিচিত নাট্যশাস্ত্রের ব্যতিক্রমী এ রীতি! ভাষা এবং তার ব্যবহার নিয়ে বহু বিশেষজ্ঞের মত, নাটকচক্রম একই লেখনীর ফলাফল। ইনি কি ভাস? এ দ্বন্দ্বের মীমাংসা আজকের কাজ নয় আমাদের। আরও গুণীজন আছেন উপযুক্ত এ কাজের। আমরা চলে আসি নাটকের কথায়।
যিনি এই নাটকচক্রম-এর রচয়িতা তিনি রামায়ণ এবং মহাভারত নিয়ে বেশ কয়েকটি কাজ করেছেন। তার মধ্যে একটি নাটক যা মহাভারত সংশ্লিষ্ট এবং যা দশ রূপকের মধ্যে ‘ব্যায়োগ’ শ্রেণিতে পড়ে। সেই ‘মধ্যম ব্যায়োগে’-ও প্রচলিত মহাভারতের চরিত্র অবলম্বন করে তুমুল টানাপোড়েন বোনেন রচয়িতা, যা প্রথাসিদ্ধ মহাভারতকে অনুসরণ করছে না।
নাটকের শুরুতে ভীম ও হিড়িম্বার পুত্র ঘটোৎকচ বনে এক ব্রাহ্মণ এবং তার পরিবারকে অনুসরণ করছে। হিড়িম্বা নরমাংস ভক্ষণ করবেন বলে ছেলেকে আদেশ করেছেন। তাই ঘটোৎকচ এদের অনুসরণ করছে। ভয় দেখাচ্ছে। একটা সময় গোটা পরিবার বাধ্য হল ভয়ে থেমে যেতে। ঘটোৎকচ তাদের জানাল যে তার মায়ের জন্য নরমাংস চাই। তারা যেন নিজেদের মধ্যেই বিবেচনা করে নেয় কে তার সঙ্গে যাবে বলি হতে! এই ঘটনা চলাকালীনই আমরা জানছি যে পাণ্ডবরা রাজ্য হারিয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেই সময় সেই বনেই তাঁদের থাকার কথা। এও জানছি, সকল পাণ্ডব সেখানে নেই। তাঁরা দ্রৌপদী-সমেত শতকুম্ভ নামের এক যজ্ঞে গিয়েছেন মহর্ষি ধৌম্যের আশ্রমে। একমাত্র রয়েছেন মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন।
এবারে ব্রাহ্মণ পরিবারের মধ্যম পুত্রটি সকলকে বুঝিয়ে স্বেচ্ছা-বলিদানে এগিয়ে আসে। আর সেই কাজ করবে বলে যাবার আগে কাছাকাছি সরোবরে তৃষ্ণা নিবারণ করে আসতে চায়। ঘটোৎকচ খানিক অনিচ্ছাতেও মাতৃআজ্ঞা পালনের জন্যই এদের অনুসরণ করছিল। সে অনুমতি দেয় যেতে। অনুমতির আরও কারণ আমরা খানিক পরে আলোচনা করছি। আপাতত দেখি এই সময় কী ঘটছে! ছেলেটির ফিরতে সময় লাগছে। মায়ের খাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বলে ঘটোৎকচ উৎকণ্ঠিত। শেষে সে ‘মধ্যম মধ্যম’ করে পুত্রটিকে ডাকতে থাকে। সেই ডাক কানে যায় মধ্যম পাণ্ডবের। তিনি অনতিদূরে ব্যায়াম করছিলেন। অত তেজীয়ান কণ্ঠস্বর শুনে এবং তার সঙ্গে অর্জুনের কণ্ঠস্বরের মিল পেয়ে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসেন। ‘মধ্যম’ বলে তাঁকে কে ডাকছে?
রচয়িতার মুনশিয়ানা দেখার মতো এখানে। স্রেফ ‘মধ্যম’ শব্দটির প্রয়োগে ভীমসেন এবং ব্রাহ্মণ বালক জুড়ে গেলেন। আমরা যেহেতু জানি ইনি ভীমসেন ও ঘটোৎকচ ভীমেরই সন্তান, সুতরাং আমাদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এই উৎকণ্ঠাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখবেন নাটককার। ব্যায়োগ মুখ্যত একাঙ্ক রূপক। তার শেষ অবধি অন্যান্য সমস্ত কার্যধারার মধ্যেও উৎকণ্ঠাকে তিনি সযত্নে রক্ষা করে যাবেন। তারই সঙ্গে আছে নিজের নয়, অর্জুনের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়ার নৈপুণ্যও। একদিকে ঘটোৎকচকে পারিবারিক বৃত্তের মধ্যে সযত্নে এই পরিচিতি টেনে আনছে। অন্যদিকে তার বীরত্বের সম্ভাবনাকে অর্জুনের সঙ্গে তুলনীয় করে রাখছে এখানেই। মহাভারতীয় কাহিনি পরম্পরায় ঘটোৎকচের মৃত্যু হবে কর্ণের হাতে। হবে সেই অস্ত্রে যে অস্ত্রে কর্ণ অর্জুনকে বধ করবেন বলে ভেবেছিলেন। অর্জুন এবং ঘটোৎকচের এই যে স্থান বিনিময়, এও যেন ওই অর্জুনের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিল করিয়ে নাটককার আমাদের মাথায় এনে দেবেন। অর্থাৎ দৃশ্যগত তাৎপর্যই শুধু নয়, মানবমনের গতিকেও নাট্যগতিতে সম্পৃক্ত করে নিচ্ছেন কুশলী নাটককার।
কিন্তু শুধু কি এই গুণ নিয়েই আমরা কথা বলব? না। আমাদের কথা বলার বিষয় তো মহাভারতের বহুপাঠে এই নাটককারের ভূমিকা। ফলত, মহাভারতের কথা একটু আগে বলে নেওয়া উচিত। পুণের ভাণ্ডারকর ইনস্টিটিউট মহাভারতের ক্রিটিক্যাল এডিশন প্রকাশ করার কাজ করেছে। সেখানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক পুথিগুলোর কথা সামান্য বলি। কাশ্মীরি, মৈথিলী, বাঙালি, দেবনাগরী, তেলুগু, গ্রন্থ, মালয়ালম— এইসব ভাষা ও লিপির পুথি। এবং এক একটা ভাষার এক একটি পুথি নয় মাত্র, তথাকথিত অনুবাদ শুধু নয়, সব মিলিয়ে বহুলসংখ্যক পুথি। নির্দিষ্ট সংখ্যাটি লিখি। সংখ্যাটি হল ১,২৫৯।
কেন এমন হয়েছে? আমাদের দেশে শ্রুতির স্বভাব এর প্রাথমিক কারণ। শুনে শুনে মনে রাখতে হবে। সেই শোনা ও মনে রাখা থেকে কিছু বিভ্রান্তিও জন্মাতে পারে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হল এর নিজস্ব গড়ন। বিশেষ করে মহাভারতের। সচরাচর আমরা যে টেক্সটটি পাঠ করি তা শুরু হচ্ছে নৈমিষারণ্যে। কুলপতি শৌনকের অনুরোধে শুরু হচ্ছে। ভি এস সুথংকর, ক্রিটিকাল এডিশনের সম্পাদক, যদিও এ নিয়ে বেশ আপত্তি করেছেন। শৌনক শুরুতেই ভার্গবদের কথা জানতে চাইছেন বলে। ভার্গব শৌনক নিজেও। এখান থেকে ও অন্যান্য নানা জায়গা থেকে নানা প্রমাণ সংগ্রহ করে তাঁর অভিমত হচ্ছে, এই টেক্সট মহাভারতকে ভৃগুগোষ্ঠীর ভার্গবকরণের প্রচেষ্টা। যাইহোক, এখান থেকে শুরু হচ্ছে গল্প বলা। বলছেন সূত উগ্রশ্রবা। তিনি স্রষ্টা কাহিনির? না। তিনি আবার শুনেছেন পাণ্ডবকুলের রাজা জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞে, বৈশম্পায়নের কাছে। ব্যাস শিষ্য বৈশম্পায়ন, সেই সর্পসত্রে বসে জন্মেজয়কে তাঁরই বংশের পূর্বজদের গরিমাসূচক এ কাহিনি শোনাচ্ছেন। তিনি জানাচ্ছেন এ কাহিনির রচয়িতা হলেন মহাকবি ব্যাসদেব।
আবার এরই অন্য সূত্র সব বলছে, ব্যাসদেবের মূল রচনাটি হল ‘জয়’ কাব্য। দেবলোক থেকে মানবলোকে এর নানা রূপ প্রচলিত। তাতে শ্লোক সংখ্যাও বিভিন্ন। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, মূল রচয়িতা বলে যিনি চিহ্নিত তিনি নিজেও এ কাহিনির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই। আজকের লেখক সচরাচর এমন ক্ষেত্রে, ‘আমি যখন ওখানে গেলাম’ ইত্যাদি বাক্য দিয়ে লিখবেন। কিন্তু এখানে আমরা দেখছি ‘ব্যাসদেব সেখানে উপস্থিত হলেন’ জাতীয় বাক্যবন্ধ বা শ্লোক সমুদয়। যিনি কাহিনি সৃষ্টি করছেন তিনি নিজেই নিজেকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে ‘অন্য’ হিসেবে দেখছেন? না। যেহেতু সূতরা এ কাহিনি নানা স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন, তাই তাঁরা কাহিনি কথনের সময় ব্যাসদেবকে সম্মান জানাচ্ছেন এভাবে। লক্ষ্য করার বিষয়, সকলেই বৈশম্পায়নের মতো ব্রাহ্মণ নন। অব্রাহ্মণ, এমনকি শূদ্রও এ কাহিনির সূত।
অর্থাৎ প্রমাণিত হচ্ছে, শুরুর দিন থেকেই এ কাহিনির প্রায় নানা রূপান্তর পথে-প্রান্তরে ছড়াচ্ছে। সূতরা গল্প বলতে গিয়ে একটার সঙ্গে অন্যটা যোগ করে দিচ্ছেন। এই ভূখণ্ডের প্রাচীনকালের কাব্য, সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, ন্যায়-নীতি শাস্ত্র, আইনকানুন, রীতি-রেওয়াজ, ধর্মাধর্ম সব জুড়ে যাচ্ছে। এমনকি নেড়া-নেড়িরাও অর্থাৎ শ্রামণিক দর্শনসমূহের মানুষ সব, তাঁরাও জুড়ে যাচ্ছেন এর সঙ্গে। যত সময় এগিয়েছে মহাভারত তত আশপাশের নানা কিছুকে আত্মস্থ করে নিয়ে চলেছে।
পরবর্তীতে যখন লিখিত রূপের সংখ্যা বাড়ল, তখনই এ কলেবরে বিপুল বিবর্ধিত। অনুবাদ থেকে শুরু করে এর কাহিনি অবলম্বনে যাঁরা কাজ করছেন তাঁরা একে খানিক দিকনির্দেশ হিসেবেই গ্রহণ করলেন। নিজ নিজ অঞ্চলের ও সময়ের কথা মাথায় রেখে এর বিনির্মাণ-নির্মাণ করলেন। বৃহৎ দার্শনিক ভাবনা থেকে শুরু করে কাজে যিনি অর্থ দিচ্ছেন তাঁর প্রয়োজন— সবটাই এসব ভাবনার মধ্যে চলে এল। কাহিনির আরও পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটল, সংযোজন-বিয়োজন হল, রূপান্তর হল। সেজন্যই এত এত পুথিকে মিলিয়ে মিলিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এটাও ভাবার বিষয় যে তার বাইরে কতসংখ্যক হারিয়ে গিয়েছে। কত খণ্ডিত পুথি পাওয়া গিয়েছে, বাকি অংশ উধাও। মহাকাব্য নিয়ে এমন উন্মাদনা বোধহয় আর কোথাও নেই।
সেই ধ্বংস ও সৃজন উন্মাদনার অন্যতম পথিক এই নাট্যকারও। ‘মধ্যম ব্যায়োগ’ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ নয়। কিন্তু আমাদের দেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের। আগেই নাট্যঘটনাটির প্রাথমিক সূত্র জানা হয়েছে। সেইখানে ফিরি।
ঘটোৎকচের মাতৃআজ্ঞা পূর্ণ করতে যে ব্রাহ্মণ সন্তানটি নিজেকে বলি দিতে চাইল, তার এমন ইচ্ছা হল কেন? ব্রাহ্মণ প্রথমে নিজেকে বলি হিসেবে পেশ করতে চেয়েছিল। সে বয়স্ক ও দুর্বল বলে ঘটোৎকচ বাতিল করে। তার পর ব্রাহ্মণীকে বাতিল করে স্ত্রীলোক তার মায়ের পছন্দ নয় বলে। এর পর প্রথম পুত্র নিজেকে এগিয়ে দেয়। পরিবাররক্ষার্থে সে নিজেকে বলি দেবে। দ্বিতীয় বা মধ্যম পুত্রটি মনে করায় জ্যেষ্ঠ পুত্র পরিবারে কত গুরুত্বের। কুলশ্রেষ্ঠ সে। তাছাড়া মা-বাবার সবচেয়ে প্রিয়। কাজেই সে যাবে। এর মধ্যে তৃতীয় বলতে থাকে সে যাবে, কারণ ব্রহ্মবাদীরা বলে জ্যেষ্ঠ পিতৃতুল্য। গুরুজনের প্রাণরক্ষা তার কাজ।
প্রথম আবার পিতাকে উদ্ধার ইত্যাদির পুণ্যের কথা বলে ওঠে। এইবারে আসরে নামে আবার মা-বাবা। বাবা বলে জ্যেষ্ঠ তার প্রিয়, তাই ছাড়বে না। মা বলে কনিষ্ঠ প্রিয়, তাকেও ছাড়া যাবে না। ব্যাস! রয়ে গেল মধ্যম। সে কারও তত প্রিয় নয়। পিতা-মাতা নিজ নিজ পছন্দ জানিয়ে দিয়েছে। সে নেই তাতে। মা-বাবা তার প্রতি তত প্রসন্ন নয়। ঘটোৎকচ এখানে শ্লেষ করে বলে, মধ্যম পুত্রে সে প্রসন্ন। তাই তাকেই তাহলে নিয়ে যাবে। এইখানে আবার ভীম নিজেকে ব্রাহ্মণের মধ্যম পুত্রের বদলে এগিয়ে দিলেন।
এসব শ্লেষ ইত্যাদির প্রসঙ্গে পরেই আসব। আপাতত দেখি এ কাহিনি এবং মহাভারতের যোগাযোগ। ঘটোৎকচের সঙ্গে ভীমের এমন দেখা হওয়া, হিড়িম্বার নরমাংস খেতে চাওয়া— এসবের কিছু সচরাচর দেখা যায় না মহাভারতের প্রচলিত রূপে। তাহলে? কবিকল্পনা অবশ্যই। কিন্তু কবিকল্পনার মধ্যেও লুকিয়ে আছে মহাভারতকে নতুন করে সাজানোর ইচ্ছে।
এই যে ব্রাহ্মণ এবং তার পরিবারের কাহিনিটি, তা মহাভারতের একচক্রা নগরীতে বকরাক্ষসের কাহিনির সঙ্গে বেশ খানিকটা মিলে যায়। সে কাহিনি পাণ্ডবদের জতুগৃহ দহন থেকে বাঁচার পরে আত্মগোপনের সময়কালীন। একচক্রার কাছে বসবাসকারী বকরাক্ষস সেখানকার নিরাপত্তা প্রদান করত। কারণ রাজাটি অকর্মণ্য। রাজার সঙ্গে নিরাপত্তা দেবার চুক্তি অনুযায়ী একটি করে মানুষ তার কাছে পাঠাতে হত। পাণ্ডবরা যে ব্রাহ্মণের বাড়িতে ব্রাহ্মণ বেশে লুকিয়ে ছিলেন সেই বাড়ির পালা পড়েছিল। ব্রাহ্মণ অন্য কাউকে কিনে পাঠাতে পারবে না! সে অর্থ নেই তার। তাহলে কে যাবে? এইখানে ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণী, কন্যা এবং পুত্রের মধ্যে কে কার বা কাদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবে তার আলোচনা চলতে থাকে। শেষমশ কুন্তী ব্রাহ্মণকে বলে ভীমকে পাঠান এবং ভীম বকরাক্ষস বধ করেন। সেই গল্পে নরমাংস ভোজনে রাক্ষসের ইচ্ছে এবং তার সঙ্গে ব্রাহ্মণের পরিবারের অসহায়তা ও আত্মদানের পদ্ধতি এখানে জুড়ে গিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। নাটককারের মুনশিয়ানা ও উদ্দেশ্য আরও সাংঘাতিক প্যাঁচালো। এই নরমাংস ভোজনের ইচ্ছে ও আত্মবলিদান তো না হয় ওখান থেকে এল, কিন্তু মধ্যমের প্রতি মা-বাবার সেই টান না থাকা? তাকে বলি দেওয়া চলে— এমন ভাবটি এল কোথা থেকে? এই ভাবনাটি এসেছে ঐতরেয় উপনিষদের একটি কাহিনি থেকে। বলা হয়, সে কাহিনির বীজ আবার লুকিয়ে ঋগ্‌বেদের দশম মণ্ডলের একটি সামান্য অংশে। দশম মণ্ডলকে অনেকেই প্রক্ষিপ্ত বলেন, অর্বাচীন বলেন, সুতরাং কার থেকে কোথায় গেছে বলা মুশকিল। কিন্তু কাহিনিটি বলাই যায়।
পৌরাণিক রাজা হরিশ্চন্দ্র পুত্রসন্তানের জন্য বরুণের কাছ থেকে বর নিয়েছিলেন। পুত্র হলে যজ্ঞ করবেন। বরুণ বলেছিলেন পুত্র দিয়েই যজ্ঞ করতে সেক্ষেত্রে। পুত্র হল, রোহিত তার নাম। এবারে যতবার বরুণ যজ্ঞ করতে বলেন, হরিশ্চন্দ্র পিছিয়ে যেতে থাকেন নানা অজুহাতে। শেষে রোহিত বড় হতে সে পলাতক হল। বরুণের শাপে হরিশ্চন্দ্রকে রোগগ্রস্ত হতে হল। একদিকে রোহিতের বাবার অসুখ, অন্যদিকে নিজের জীবন। পালাতে পালাতে একটা সময় সে এক ব্রাহ্মণকে পেল যে ব্রাহ্মণ অভাবগ্রস্ত, দুস্থ। তার তিন ছেলে। তার একজনকে রোহিত কিনতে চাইল। এইখানে ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণী দু’জনেই যথাক্রমে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠকে আগলে রাখলেন। মধ্যম শুনঃশেপ বিক্রি হয়ে গেল একশো গোরুর বিনিময়ে। ব্রাহ্মণও দারিদ্রে সন্তান বিক্রি করে, বর্ণাশ্রমে সব ব্রাহ্মণই সুবিধেজনক অবস্থায় থাকে না, এ প্রসঙ্গও এখানে লক্ষণীয়।
যাইহোক, রোহিত তাকে নিয়ে এল। নিজের বিনিময়ে তাকে দিয়ে বরুণের থেকে মুক্তি চাইল। বরুণ রাজি। যজ্ঞ শুরু। বাঁধবে কে একে বলির জন্য? অজীগর্ত নামের সেই ব্রাহ্মণ পিতা আবার একশো গোরু চাইল। পেয়ে বেঁধে দিল ছেলেকে। এমনকি বলি দেবার জন্য অন্য কেউ রাজি না হওয়ায় আরও একশো গোরু পেলে বলি দেবেও বলল। কাহিনির বাকি অংশ এখানে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা দেখব, নাটককার কী উদ্দেশ্যে এই মধ্যমের ব্যবহারকে তাঁর নাটকে সংগ্রহ করেছেন।
রাক্ষসই শুধু নরমাংস চায়? নরবলি প্রথা হিসেবে জঘন্য নয়? একদিকে হিড়িম্বার নরমাংসের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে তথাকথিত অ-রাক্ষসদের নরবলি। দুটোকে মেশালেন কেন? উত্তর আছে এই নাটকের মধ্যেই। ভীম নিজেকে এগিয়ে দেওয়ার পরে ঘটোৎকচ তাঁকে সঙ্গে যেতে বলল। ভীম বললেন তাঁকে কেউ দম্ভের সঙ্গে ডাকলে তিনি যেতে ইচ্ছুক হন না। যুদ্ধে হারিয়েই নিয়ে যেতে হবে। ভীমের সঙ্গে যুদ্ধে ঘটোৎকচ তাকে পরাজিত করতে পারল না। ভীম পিতৃগর্ব নিয়েই যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধে অপরাজেয় থেকেও ব্রাহ্মণের মধ্যম সন্তানের বদলে নিজে চললেন হিড়িম্বার কাছে।
হিড়িম্বার কাছে পৌঁছতে হিড়িম্বাই পরিচয় করালেন পুত্রের সঙ্গে। পুত্র ক্ষমা চাইল এবং সে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের যম হবে ঘোষণা চালিয়ে গেল। এইসবের মধ্যে বেরোল আসল কথাটা। ভীম বললেন, রাজ্য হারিয়ে দুঃখে বনের মধ্যে তাঁরা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, হিড়িম্বা তাঁদের দুঃখ মোচন করে দিলেন। এইটা কেমন হল? বিস্মিত হয়ে বললেন! হিড়িম্বা সহাস্যে বললেন, এইটা যেমন হল, তেমনই। অর্থাৎ নরমাংস নয়, এইভাবে পুত্রের সঙ্গে পিতার পরিচয় করানো উদ্দেশ্য ছিল। উদ্দেশ্য ছিল পাণ্ডবদের আশ্রয় দেওয়া। ঠিক যেমনভাবে, শুনঃশেপকে বলি হবার হাত থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করে বিশ্বামিত্র বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নরবলি আর চলতে পারে না। সেভাবেই এখানেও রাক্ষস সমাজে নরমাংস ভোজন যে আর চলছে না তা বুঝিয়ে দেওয়া হল। ভীম আপ্লুত হয়ে বলেও ফেললেন, হিড়িম্বা জাতিতে রাক্ষসী হলেও আচরণে নয়।
দুটি পৌরাণিক উপাখ্যানের উপাদান মিশিয়েছেন। অর্থাৎ সেগুলোকে ভেঙেছেন এবং নতুন আর একটি উপাখ্যান নির্মাণও করেছেন তা দিয়ে। যারা অন্যদের রাক্ষস বলে অশ্রদ্ধা করে তারা নিজেরা নরবলি দেয় কেমন করে? এই স্ববিরোধ তুলেছেন ইঙ্গিতে। যাঁরা টেক্সট শুধু নয়, সাবটেক্সট পড়তে বা দেখতেও অভ্যস্ত, তাঁরা নাটক পাঠে একথা বুঝবেন। সেখানেই শেষ নয়, নাট্যকার এও বুঝিয়েছেন, দুই সমাজেই অচল হচ্ছে এ আচরণ।
খেয়াল করার মতো কথা হল, ভীম হিড়িম্বাকে ‘জাতিতে রাক্ষসী’ বলছেন। অর্থাৎ রাক্ষস সংক্রান্ত ধারণায় মানবের মতোই জাতিভেদের ধারণা দিচ্ছেন নাট্যকার। কুলোর মতো কান, মুলোর মতো দাঁত— এই জাতীয় ধারণাকে তিনি ভাঙছেন। যে কারণে ঘটোৎকচের বর্ণনাতেও তা আনছেন। গায়ের রং কালো। চোখের মণি কটা। বিশাল বলশালী শরীর। দাঁত সামান্য উঁচু এবং সাদা। ব্রাহ্মণী ও তার সন্তানদের উপমায় বার বার ঘুরিয়ে বলছেন ঘটোৎকচকে দেখতে প্রলয়কালীন মহাদেব বা শিবের মতো। শুধু তাই নয়, সে যে উপবীত ধারণ করে, যা শূদ্র ও নারী ব্যতীত ত্রিবর্ণ ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ রাক্ষসেরও সংস্কার আছে যা তথাকথিত াার্য সংস্কারের সঙ্গে মেলে।
আশ্চর্যভাবে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন নাট্যকার। বর্ণভেদ, জাতিভেদ এসব মাথায় রেখে রূপক রচনা করছেন। এসবের গঠনমূলক সমালোচনা করছেন। শুধু তাই নয়, বর্ণাশ্রমে বিশ্বাসীদের একেবারেই ভয় পাচ্ছেন না। মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেনকে দিয়ে বলাচ্ছেন— ‘উত্তম-ব্রাহ্মণ সর্ব অপরাধেই বধের অযোগ্য’। উত্তম ব্রাহ্মণ? তাহলে অধম ব্রাহ্মণকে বধ করা যেতেও পারে অপরাধ তেমন হলে? ওদিকে ব্রহ্মহত্যা মহাপাপ। ব্রাহ্মণ যেমনই হোক সে অবধ্য, এই কথাটা যথাসম্ভব কাব্যে, দর্শনে, ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রে ঠুকে ঠুকে বোঝানো হয়েছে। তো মনু সংহিতার অনুগামীরা সে সময় এ নিয়ে আন্দোলন করেননি? গর্দান চাননি?
জানি না। কিন্তু একথা জানা যাচ্ছে, সেই সময়েও কারও কারও কলম এভাবে খোঁচা রেখেই দিয়েছেন। তার সঙ্গে কুপ্রথা, কুসংস্কার এবং বিরোধ বিবাদের পরিবর্তে সহৃদয় সহবাসের শিক্ষা দিতে চেয়েছেন সমাজকে। নাটকচক্রম-এর নাটককার কি ভাস? পণ্ডিতেরা লড়তে থাকুন এ নিয়ে। আমাদের কাছে গুরুত্বের বিষয় হল, এই নাটককার যিনিই হোন, তিনি বিনা প্রশ্নে কিছুকেই মেনে নিতেন না। শ্লেষ ও সহৃদয়তা দুই মিশিয়েই যা বলার বলছেন এবং মহাকাব্যের বহুপাঠকে কাজে লাগাচ্ছেন সামাজিক-রাজনৈতিক মানসিকতা সংশোধনের। এই নাটককার, কবি যিনিই হয়ে থাকুন, তিনি মানবগৌরব।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.