বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

মাছ দিয়ে শাক ঢাকা

বাঙালির আহারের হায়ারার্কিতে মাছের অবস্থান সবচেয়ে ওপরে আর সবচেয়ে নীচে হল শাক-সবজি। তাই নিরীহ শাক-সবজিতেও মাছ মিশিয়ে তাদের জাতে তোলার আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা।

আর সি বন্যা

না, চোখ কচলাবেন না। কিচ্ছু ভুল পড়েননি। আমি কিচ্ছুটি ভুল লিখিনি। মানছি যে, প্রচলিত কথাটি ঠিক উল্টো; লোকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকে, কিন্তু বাঙালির বেলায় সেটি আদপে খাটে না। বাঙালি মাছ দিয়ে শাক ঢাকে। ভেবে দেখুন তো, রোজ বাঙালির ভাতের থালায় শাকের পরিমাণ কতটা আর মাছের কতটা? গোলাকার থালার জগতে এককোণে পড়ে থাকে জড়সড়, সংকুচিত শাক আর তার পাশে সদর্পে, আত্মম্ভরিতায় বুক ফুলিয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে অবস্থিত মাছ। তার ওপর আবার যেন মাতব্বর চিনের মতো তার ঝাল বা ঝোলের অতিক্রমণ আর আস্ফালনে জেরবার হয়ে শাক হয়ে ওঠে নিজস্বতা বজায় রাখার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া তিব্বত।
বাঙালির আহারের হায়ারার্কিতে মাছের অবস্থান সবচেয়ে ওপরে আর সবচেয়ে নীচে হল শাক-সবজি। তাই নিরীহ শাক-সবজিতেও মাছ মিশিয়ে তাদের জাতে তোলার আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা। অতএব, জোলো স্বাদের লাউ জাতে ওঠে চিংড়ি বা মাছের মুড়োর সংশ্রবে আর অমনি লাফিয়ে আহারের ব্যাটিং অর্ডারে ওপেনার থেকে সোজা মিডল অর্ডারে। তেমনই, চিংড়ি দিয়ে কচুর শাক, মাছের মাথা দিয়ে বাঁধাকপি, মুগের ডাল, মাছের মুড়োয় অল্প চাল বা এমনকি অতি সাত্ত্বিক চিঁড়ে মিশিয়ে হয়ে গেল তৈরি অভিজাত মুড়িঘণ্ট।
আমার এক মৎস্যপ্রেমী মালয়ালি বন্ধু এক বাঙালি বিয়েবাড়িতে মুড়িঘণ্ট খেয়ে যারপরনাই বিভ্রান্ত হয়ে বলেছিল, কী খেলাম ঠিক বুঝলাম না। অদ্ভুত খাবার। মাছের চেয়ে মাছের কাঁটা আর মাথা বেশি, তাতে মেশানো অল্প চাল, সেটা আবার ভাত দিয়ে মেখে খেতে হল। বুঝলাম যে বাঙালির মাছ-ভাতের প্রতি মোহ বিন্দুমাত্র অতিশয়োক্তি নয় আর বাঙালির ‘ভেতো’ দুর্নামও এমনি এমনি নয়। তবে, নাম-দুর্নামে কী আসে-যায়। মুড়িঘণ্ট অতি উপাদেয় বটে।
বাঙালির এই মাছ দিয়ে শাক ঢাকার ব্যাপারটিতে উত্তরপ্রদেশের এক দ্বিবেদী ব্রাহ্মণের নিরামিষাশী মেধাবী পুত্র আইআইটি খড়গপুরে পড়তে এসে প্রথম দিনেই বেশ ভালরকম মানসিক আঘাত পেয়েছিল। তারই জবানিতে বলি। আশির দশকের শেষের দিকে কানপুর থেকে সুদুর পশ্চিমবঙ্গে পড়তে এসে প্রথম দিন এমনিতেই সব প্রশ্নের জবাব বাংলায় আর ‘হিন্দি নেহি মালুম’ শুনে রীতিমতো বিপর্যস্ত অবস্থা। তার ওপর দুপুরবেলা খিদে নিয়ে বাবা আর আমি মেসে ঢুকতেই ভড়কে গেলাম। এ কী দৃশ্য! বড় বড় থালাভর্তি হলুদ রঙের কোনও খাদ্যবিশেষের ওপর ইয়া বড় বড় মাছের মাথা রাখা, তাদের চোখগুলো আবার জুলজুল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা তো সঙ্গে সঙ্গে উল্টো দিকে রওনা দিলেন। এমনিতেও বাবার ইচ্ছে ছিল আমি বাড়িতে থেকে আইআইটি কানপুরে পড়ি, আমারই জেদে খড়গপুর আসা। তার ওপর আবার প্রথম দিনেই এমন রোমহর্ষক দৃশ্য, তাও আবার খাবারের জায়গায়! যাই হোক, এত দুপুরে কোথায় আর খাবার পাবে, আর কিছু চেনা-পরিচিত সিনিয়রদের আশ্বাস দেওয়ায় যে নিরামিষ খাবারও পাওয়া যায়, নিতান্ত অনিচ্ছায় বাবা মেসে ফিরে এলেন। আমি কৌতূহলের বশে কাছে গিয়ে খাদ্যবস্তুটিকে পরীক্ষা করে দেখি, ও হরি, এ তো আমাদের অতি প্রিয় বাঁধাকপির তরকারি! এমন উপাদেয় খাবারে যে তোমরা বাঙালিরা মাছের মাথা কেন মেশাও, আমি আজও বুঝলাম না।
যদিও চার বছর বাঙালি আর মাছের সঙ্গলাভের ফলস্বরূপ সেই পুত্র এখন মৎস্য এবং মাংসাহারী, তবুও বিশুদ্ধ নিরামিষাশী পরিবারকে লুকিয়ে উনি কিন্তু প্রচলিত প্রবাদটিকে মেনে শাক দিয়ে মাছ ঢেকেই খান।

বাঙালির হেঁশেলের একটি অভিন্ন অঙ্গ হল মাছ। শুভ কাজে মাছ, তত্ত্বে যাবে মাছ, নেমন্তন্নে মাছ, বেড়াতে গিয়ে মাছ, মরসুম বদলের সঙ্গে মাছ, মায় শরীর খারাপেও মাছ। তাও আবার নানা রকমের মাছ। ছোট মাছ, বড় মাছ, পোনা মাছ, কুঁচো মাছ, জিওল মাছ, শুঁটকি মাছ, নদীর মাছ, পুকুরের মাছ, মোহনার মাছ, সমুদ্রের মাছ— সে এক এলাহি ব্যাপার। তুমুল বৃষ্টি? খাও খিচুড়ি আর মাছভাজা, ইলিশ হলে তো কথাই নেই। পেট খারাপ? খাও শিং বা মাগুর মাছের ঝোল। স্বাস্থ্য সচেতন? খাও কম তেলে বাটিচচ্চড়ি বা ভাপা বা পাতুরি। রক্তাল্পতা? খাও কই মাছের ঝোল। এমনকি বাংলার সাহিত্যে মাছ ও মাছের উপমায় ভরা। ‘মনসামঙ্গল’-এ বরিশালের বিজয়গুপ্ত এবং ময়মনসিংহের বংশীদাস দিয়েছেন কত রকমের মাছের রন্ধন পদ্ধতি এবং ব্যঞ্জনের বর্ণনা। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’-এ রয়েছে, “জীবানন্দ ক্ষুধার্ত— নিমি পিঁড়ি পাতিয়া মল্লিকা ফুলের মতন পরিষ্কার অন্ন, কাঁচা কলাইয়ের ডাল, ডুমুরের ডালনা, পুকুরের রুই মাছের ঝোল এবং দুগ্ধ আনিয়া জীবানন্দকে খাইতে দিল।” সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, “মাছের সঙ্গে সর্ষে যেন রবীন্দ্রসঙ্গীতে কথার সঙ্গে সুরের মিলন।”
এক বাঙালি বান্ধবীর মেয়ের বিয়েতে আমাদের কিছু অবাঙালি বন্ধুরাও ছিল নিমন্ত্রিত, তাদের মধ্যে একজন জৈন মাড়োয়ারি। আজকাল বাঙালি বিয়েতেও চল হয়েছে মেহেন্দি, গানবাজনার। চলছিল ভালই। বিয়ের দিন সকালে গায়ে হলুদের জন্যে সাজ সাজ রবের মধ্যে এসে পৌঁছল বরের বাড়ির তত্ত্ব। নানা জিনিসের মধ্যে রয়েছে এক প্রকাণ্ড মাছ, সিঁদুর মাখানো, লাল টুকটুকে ওড়না জড়ানো, নাকে পরানো সোনালি নথ। তার ওপর আবার তখনও জ্যান্ত, বিরাট হাঁ-মুখ খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। সবার প্রশংসায় আবিষ্ট চোখ মাছের ওপর নিবদ্ধ, মাছের গুণাগুণ নিয়ে আলোচনার মধ্যে হঠাৎ ধপাস করে কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ। তাকিয়ে দেখি আমাদের জৈন বান্ধবী বিয়ের তত্ত্বে সযতনে সজ্জিত জ্যান্ত মাছের ‘কালচার শক’ সহ্য না করতে পেরে পপাত ধরণীতলে।
বাঙালির বিয়েবাড়ির খাওয়া মাছ ছাড়া অপূর্ণ। মধ্য ভারতের ইস্পাত নগরীতে জন্ম ও কর্মের দৌলতে ভারতের মোটামুটি সব প্রদেশের লোকেদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, খাওয়াদাওয়া, উত্সব, পালা-পার্বণ সম্পর্কে আমার ভালই অভিজ্ঞতা আছে। বলতে দ্বিধা নেই যে বাঙালির আনুষ্ঠানিক ভোজ, বিশেষ করে বিয়েবাড়ির ভোজে থাকে সবচেয়ে এলাহি ব্যাপার-স্যাপার। নিরামিষ এবং আমিষ পদ মিলিয়ে অগুনতি ব্যঞ্জন। তবে বেশি নিরামিষ পদ রাখলে বিপদ। অমনি নিন্দুকেরা বলবে, এসব হল খরচ বাঁচানোর কারসাজি যাতে অতিথিরা মাছ-মাংস কম খান।
শেষ করব এক বিয়েবাড়ির গল্প দিয়ে। তুতো সম্পর্কের এক দেওরের বিয়েতে মেয়ের বাড়িতে তত্ত্ব পৌঁছতে গেছি। সেখানে দুপুরের খাওয়ার নিমন্ত্রণ আগে থেকেই পাওনা ছিল। খেতে বসে দেখি মাছের মোচ্ছব। একের পর এক মাছ চলেই আসছে। ভেটকির ফ্রাই দিয়ে শুরু, তার পর তোপসে, পার্শে, পাবদা, চিংড়ি, রুই মাছের কালিয়া, ইলিশ মাছ ভাপা— সবকটার জাম্বো সাইজ। খাওয়াটাও যে একটা অত্যাচার হতে পারে, সেদিন বুঝলাম। সিআইএ যদি জানতে পারে, আইডিয়াটা লুফে নেবে। মানবাধিকার সংস্থাও গেল গেল রব তোলার আগে মাথা চুলকোবে যে আষ্টেপৃষ্ঠে গেলানোকে নির্যাতনের শ্রেণিতে ফেলা যায় কিনা।
যাইহোক, কলাপাতায় বিচিত্র রকমের মাছ দেখে ভাবছি কী করে এগুলোর সদগতি করা যায়। তখন দেখি পাশের মহিলা গাদা গাদা ভাত আনাচ্ছেন। অবাক হলাম, এতসব পদ ছেড়ে বার বার ভাত আনাচ্ছেন কেন? আর এমনও নয় যে খাচ্ছেন। ভাত কেবল ডাঁই হচ্ছে তাঁর পাতে। ভাবতে ভাবতেই আমার কানে হঠাৎ তাঁরই ফিসফিস, মাছগুলো খেতে না পারলে ভাতের তলায় লুকিয়ে দিন। না দেখতে পেলে আপনারও অপচয় হচ্ছে ভেবে অপরাধবোধ হবে না আর গৃহকর্তাও আপনাকে খাওয়া ছেড়ে উঠতে দেবেন। না হলে কিন্তু বিকেল অবধি এত মাছ নিয়ে বসে থাকতে হবে কিংবা পেট খারাপ করে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে এত মাছ খেয়ে হজম করা অসাধ্য। বুঝলাম ভাতের রহস্য।
ওই যে বললাম, যুগ-যুগান্তর ধরে বাঙালির মাছ-ভাতের সম্পর্ক। সেবার দেখলাম, বাঙালি শুধু শাক দিয়ে নয়, ভাত দিয়েও মাছ ঢাকে।

অঙ্কন : রাজ রায়
মতামত জানান

Your email address will not be published.