বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

মোটেরাম : রাষ্ট্রের উদ্দেশে কৈফিয়ত

ধর্ম ও রাজনীতির আঁতাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যে দেশের অখণ্ডতা আর সম্প্রীতির পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা বিলক্ষণ বুঝতেন সফদর। সেইজন্যে পথনাটকের ছোট পরিসর ছাড়াও প্রসেনিয়ামে আরও বিস্তারে তিনি এ বিষয়টি তুলে ধরতে চাইলেন।

শুভেন্দু সরকার

টানা দশ বছর জননাট্য মঞ্চ (১৯৭৩)-র হয়ে পথনাটক লেখা ও প্রযোজনার পর একটি সভায় (২৯ অক্টোবর, ১৯৮৮) পুরনো কাজের পর্যালোচনার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্বন্ধে খানিক আভাস দিয়েছিলেন সফদর হাশমি (১৯৫৪-৮৯)।
তিনি বলেন, নিছক পোস্টারধর্মী নয়, রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থির রেখে পথনাটককে বরং হতে হবে নান্দনিকভাবে শক্তিশালী। আঙ্গিক আর বিষয়গত দিক দিয়ে যথাক্রমে উদ্ভাবনমূলক ও ব্যাপ্ত। সেখানে তিনি এও জানান, পথনাটক আর মঞ্চনাটকের মধ্যে আড়াআড়ি পাঁচিল তুলতে তাঁর রীতিমতো আপত্তি। পথনাটক ও প্রসেনিয়াম— দুটি মাধ্যমেই জনগণের কাছে প্রগতিশীল ধ্যানধারণা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এমনই ছিল সফদরের মত। বোঝা যায়, প্রসেনিয়ামের বাড়তি সুবিধে (যেমন, জটিল বিষয়বস্তুর গভীরে পৌঁছনো ও প্রযোজনাকে শৈল্পিকভাবে সমৃদ্ধ করা) তিনি ছাড়তে চাননি। উল্লেখযোগ্য, গোড়ার দিকে জননাট্য মঞ্চ অভিনয় করেছে প্রসেনিয়ামেই। অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা (১৯৭৫-৭৭)-র পর প্রতিকূল আর্থিক ও সাংগঠনিক পরিস্থিতিতে মূলত সফদরের চেষ্টাতেই পথনাটক চালু হয়। অবশ্য মঞ্চকে তিনি ভোলেননি কখনওই। পথনাটকে ডুবে থাকাকালীনও তৈরি করেছেন গোর্কির নাটক (দুশমন) আর প্রেমচন্দর গল্প (সত্যাগ্রহ)-র মঞ্চরূপ।
কারখানার মালিক, পুলিশ, গুন্ডা আর নেতার সঙ্গে শ্রমিকদের রাজনৈতিক লড়াই অথবা সার্বিকভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া নিঃসন্দেহে সফদর হাশমির পথনাটকের প্রধান বিষয়বস্তু। তবে এও খেয়াল রাখার, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভয়ানক পরিণাম (বিশেষত খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনে) সম্বন্ধে তিনি ছিলেন সর্বদা সজাগ। নিজেদের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ কায়েমের জন্যে শাসকগোষ্ঠী যে ধর্মের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে লড়াই বাধায়, এমনকি মৌলবাদীদের সঙ্গেও হাত মেলায়— তা প্রচারের জন্যে সফদর লেখেন ‘হত্যারে’ (১৯৭৮) আর ‘অপহরণ ভাইচারে কা’ (১৯৮৬)। বলা চলে, ধর্ম ও রাজনীতির আঁতাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যে দেশের অখণ্ডতা আর সম্প্রীতির পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা বিলক্ষণ বুঝতেন সফদর। সেইজন্যে পথনাটকের ছোট পরিসর ছাড়াও প্রসেনিয়ামে আরও বিস্তারে তিনি এ বিষয়টি তুলে ধরতে চাইলেন।

তরুণ সফদর হাশমি।

১৯৮০-র দশকে ভারতে নানা সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা চাড়া দেয়। হিন্দু-মুসলিম পুরনো সাম্প্রদায়িক সমস্যার পাশাপাশি চোখে পড়ে শিখ সাম্প্রদায়িকতা। এর জেরে ঘটে একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা। বেঘোরে প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে নজরে আসে ভোটের জন্যে মৌলবাদী শক্তিগুলিকে তোষামোদ করার সরকারি প্রচেষ্টা। অস্থিরতা ছড়ায় গোটা দেশে। স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য প্রগতিশীল মানুষের মতো সফদরও তখন বিপন্ন বোধ করেন, সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা চালান। বিরাট মিছিল সংগঠিত করার পাশাপাশি নাটক লেখেন পথে আর মঞ্চে অভিনয়ের জন্যে।
অল্প সময়ের মধ্যে তাৎক্ষণিক কোনও বিষয়কে সরাসরি জনতার দরবারে হাজির করে পথনাটক। চটজলদি ফল পাওয়াই সেখানে নাট্যদলের অভীষ্ট। নাটকের এই ধারাতেই হাত পাকিয়ে ছিলেন তরুণ সফদর; এমনকি, ছাপও রাখেন স্বকীয়তার। প্রথম দিকে (১৯৭৩-৭৫) প্রসেনিয়ামে অভিনয় করলেও উঁচু মানের মৌলিক মঞ্চ নাটক লেখার দক্ষতা অর্জনের আগেই তিনি নিহত হন ১৯৮৯-এর গোড়ায়। তাই সফদরের মঞ্চ ভাবনার হদিশ পাওয়ার জন্যে দুটি রূপান্তরই আমাদের সম্বল। তার মধ্যে একটি নিয়ে এখানে কথা বলছি।
১৯৮০-র দশকের দুঃসহ সাম্প্রদায়িক পরিবেশকে মঞ্চে তুলে ধরতে আর তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে প্রেমচন্দর ছোটগল্পের শরণ নিলেন সফদর। স্থির হল, তাঁর নাট্যরূপটি জননাট্য মঞ্চের হয়ে পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন হাবিব তনবির (১৯২৩-২০০৯)। ১৯৮৮ সালের পুরো জুন মাস ধরে চলল নাট্যরূপ তৈরির কাজ। হাবিব তনবিরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় সফদরের খসড়াটি ক্রমশ পাল্টাল। বিশেষত প্রথম দিকে অনেকখানি অংশ যোগ হল, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে এল নতুন সব চরিত্র। নাটকের নামকরণও করলেন হাবিব (আগে ছিল সত্যাগ্রহ)। বলা চলে, হাবিব তনবিরের পরিমার্জনের পর রঙ্গব্যঙ্গের মাত্রা বাড়ল; প্রহসনটি আরও মনোগ্রাহী হল। সফদর সেইজন্যে মনে করতেন, ‘মোটেরাম কা সত্যাগ্রহ’ তাঁর একার লেখা নয়। নাট্যকার হিসেবে হাবিব তনবিরেরও সমান কৃতিত্ব। মাসখানেক ধরে মহড়ার পর নাটকটি প্রথম অভিনয় হল প্রেমচন্দর জন্মবার্ষিকীর আগের দিন, ৩০ জুলাই ১৯৮৮।

‘মোটেরাম কা সত্যাগ্রহ’ নাটকে সফদর।

হাসির মোড়কে জনবিরোধী শাসন ব্যবস্থার আসল চেহারা তুলে ধরা ‘মোটেরাম কা সত্যাগ্রহ’-র অন্যতম উদ্দেশ্য। দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকগোষ্ঠী আর চাটুকার আমলাতন্ত্র যে কতখানি ফোঁপরা, সেটাই স্পষ্ট হল যখন বড়লাটের হঠাৎ কাশী সফরের খবর পেলেন ম্যাজিস্ট্রেট সার উইলিয়াম পার্কিনসন। তড়িঘড়ি উচ্চপদস্থ আমলাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি লাটসাহেবকে স্বাগত জানানোর যাবতীয় প্রস্তুতি নিলেন, তাঁদের পরামর্শ একের পর এক অনুমোদন করলেন। সকলেই তখন নিজের ঊর্ধ্বতন পদাধিকারীকে খুশি করতে মরিয়া। রাস্তা চওড়া, বস্তি উচ্ছেদ, ভিখিরি ও বেকারদের অন্যত্র সরানো, অস্থায়ী তোরণ তৈরি— এক হপ্তার মধ্যে কাশীর ভোল পাল্টাতে নেওয়া হল এমন সব চটজলদি সিদ্ধান্ত। শুধু তাই নয়, কাশী শহরকে সাতটি ভাগে ভাগ করে সাতজন আমলাকে দেওয়া হল ভাইসরয়কে বরণের সবরকম দায়িত্ব। তাঁদের চিন্তাভাবনা ও স্তাবকতা যে কতখানি হাস্যকর পর্যায় পৌঁছতে পারে তা বুঝতে নীচের অংশটি পড়া দরকার।
অফিসার ৭ : স্যার, আইডিয়াটা হল— ভাইসরয় সাহেব হলেন দেশের হাকিম— দণ্ডমুণ্ডের কর্তা— এই বিশাল দেশের শাসক— তা তিনি যখন তাঁর প্রজাদের কাছে আসবেন— তখন তাঁকে দেখে যেন অত্যাচারী, ভ্রষ্ট, স্বার্থপর, নীচ বলে মনে না হয়। যেন মনে হয় এক অতি পরিচিত পরম আত্মীয়— দুঃখের সাথী— ব্যথার ব্যথী— এক অতি কাছের লোক।
ম্যাজিস্ট্রেট : বাট— দ্যাটস ইমপসিবল।
অফিসাররা : এ কী করে সম্ভব হবে! অবিশ্বাস্য! অদ্ভুত কথা! ক্রেজি! স্টুপিড!
অফিসার ৭ : এখানেই তো আমার আইডিয়ার বিশেষত্ব স্যার— অসম্ভবকে সম্ভব করা।
ম্যাজিস্ট্রেট : আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড।
অফিসাররা : আমরাও কিস্ সু বুঝলাম না। গাধা কোথাকার। এতে আসলে বোঝার কিছুই নেই। ব্যাটা একেবারে পাঁঠা। পাঁঠা কী— বলো রামপাঁঠা!
অফিসার ৭ : তবে শুনুন। যখন যে পাড়া দিয়ে হিজ এক্সেলেন্সি যাবেন তখন সেই এলাকার অধিবাসীদের পোশাক পরবেন। এতে প্রতিটি পাড়ায় ওঁকে নতুন নতুন পোশাকে, নতুন নতুন রূপে দেখা যাবে।
ম্যাজিস্ট্রেট : আই থিংক— আই সি হোয়াট ইউ মিন— গো অন— গো অন।
অফিসার ৭ : যেমন লাটসাহেব যখন বামুনপাড়া দিয়ে যাবেন তখন তাঁর পরনে থাকবে রেশমি ধুতি ও খড়ম।
ম্যাজিস্ট্রেট : মার্ভেলাস!
অফিসার ৭ : যখন কায়েত গলিতে ঢুকবেন তখন মাথায় থাকবে পাগড়ি আর হাতে খোলা তলোয়ার।
ম্যাজিস্ট্রেট : ফ্যাবুলাস!
অফিসার ৭ : সবজি বাজারে পরবেন আচকান আর কালো টুপি।
ম্যাজিস্ট্রেট : ফ্যান্টাস্টিক!
অফিসার ৭ : মুসলমান পাড়ায় পরবেন শেরওয়ানি ও তুর্কি টুপি।
ম্যাজিস্ট্রেট : সুপার্ব!
অফিসার ৭ : আর— রান্ডি বস্তিতে যখন পৌঁছবেন তখন ভিজে গায়ে থাকবে মলমলের পাঞ্জাবি— গলায় লাল রুমাল— হাতে জড়ানো বেলফুলের মালা— আর মুখে থাকবে ছাঁচিপানের খিলি!
ম্যাজিস্ট্রেট : সেন্সেশনাল— সেন্সেশনাল!

সফদর হাশমি ও হাবিব তনবিরের লেখা ‘মোটেরাম কা সত্যাগ্রহ’ নাটকের নির্দেশক ছিলেন হাবিব। ১৯৮৮।

এখানেই অবশ্য শেষ নয়। বড়লাটের মনোরঞ্জনের জন্যে সন্ধেয় বাইনাচের মহফিল আর রাতে চামেলিজানের আতিথেয়তার ব্যবস্থাও হল। প্রেমচন্দর গল্পে চামেলিজানের চরিত্রটি ছিল না। নাটকে সেটি পাঠক/দর্শকের উপরি পাওনা। বারাণসীর গর্ব চামেলিজান সব কেষ্টুবিষ্টুর কলজে ঘায়েল করেন। অনেক হোমারাচোমরাই তাঁর সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক রাখেন। লাটসাহেবকে খুশি করার সুযোগে চামেলিজানকে আগে যাচাই করতে চাইলেন ম্যাজিস্ট্রেট। এর আগে নিজের আত্মীয়কে তিনি রঙের বরাত পাইয়ে দিয়েছেন। এছাড়া, কালোবাজারি শেঠদের সঙ্গে পার্কিনসনের যোগসাজশের কথাও ইতিমধ্যে জানা গেছে।
কিন্তু সমস্যা হল, একই সময় বড়লাটের সফরের প্রতিবাদে হরতাল ডাকল সরকার-বিরোধী পক্ষ। রাস্তা সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা পথে নামল, দোকানপাট বন্ধ রাখার হুমকি দিল আর সরকারি কাজে লাগাতার অসহযোগিতা করল। খেয়াল রাখার ব্যাপার, এই আন্দোলন সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের পূর্ণ সমর্থন পেল। আর তাতেই বিপাকে পড়লেন সমাজের ওপরওলারা। এমনকি, বিরোধী নেতাদের জেলে পোরা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, বেকারদের সরকারি চাকরির লোভ আর কালোবাজারিদের (যারা সকলেই সরকারের তাঁবেদার) ভয় দেখিয়েও নিশ্চিন্ত হওয়া গেল না। শেষে ব্রিটিশদের দালাল রাজা লালচাঁদ আর বাহাদুর মেহবুব আলির সঙ্গে মিলে ম্যাজিস্ট্রেট ফন্দি আঁটলেন— শহরের গণ্যমান্য পণ্ডিত মোটেরাম শাস্ত্রী যদি অনশনে বসেন তাহলে বিরোধীরা ঠিক জব্দ হবে। চাপের মুখে হরতাল উঠবে। তিন দিন পর লাটসাহেবের সফর নির্বিঘ্নে মিটবে।
দশাসই মোটেরামকে আগাগোড়া নেতিবাচকভাবে হাজির করা হয়েছে— সে গল্পেই হোক বা নাটকে। পেটুক, লোভী, ভণ্ড, কিপটে ও বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ মওকা বুঝে দাঁও মারলেন। টাকাকড়ির জন্যে হরতালের বিরুদ্ধে অনশনে বসতে রাজি হলেন। এভাবেই নিজেদের ফায়দার জন্যে জোট বাঁধল রাজনৈতিক শিবির ও ধর্মব্যবসায়ী। তাই মোটেরাম নিজের স্ত্রীকে বোঝালেন—
মোটেরাম : ও ভালমানুষের ঝি! একটু বুদ্ধি খরচ করো। ভাগ্যসূর্যের উদয় হয়েছে। আজ আমার আর রাজশক্তির মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এক নতুন যুগের শুভারম্ভ। প্রিয়ে, ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে এই যে সমঝোতা, এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এখন আর কিছু ভাবলে চলবে না। চলো— এখন খাওয়াও, আর মিষ্টির দোকানের ছেলেটাকে হাঁক দাও।
এও দেখার, মোটেরামের দূরভিসন্ধি সাধারণ মানুষ— যুবক থেকে ফেরিওয়ালা— সহজেই ধরে ফেলে। তিনি হয়ে ওঠেন হাসির খোরাক। তাই টাউন হলের ভাষণে সরকারের পক্ষে এবং হরতালের বিরুদ্ধে হাজার যুক্তি সাজালেও মোটেরাম শ্রোতাদের মন জিততে পারলেন না। তাঁর পক্ষে থাকলেন শুধু পেটোয়া ব্যবসায়ীরা।
মোটেরাম : নগরবাসীগণ, ব্যাপারিগণ শেঠ ও মহাজনেরা— তোমরা এটা ভাল করেই জান যে, সারাজীবন আমি রাজনীতি থেকে সাত হাত দূরে থেকেছি। সুতরাং তোমাদের মনে এ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে এতদিনের বৈরাগ্য ও নির্মোহ ভাবনাকে দূরে ছুড়ে ফেলে আজ আমি এখানে— তোমাদের সামনে কেন উপস্থিত হয়েছি? [কিছু লোক হাসতে থাকে] —কারণ একেবারে স্পষ্ট। আমি তাদের একজন নই— যারা চোখের সামনে দেশ-জাতি ও সমাজের আসন্ন সর্বনাশ দেখেও চোখ উল্টে বসে থাকে। ধর্মবিরোধী কাজ হতে দেখেও কিচ্ছু বলে না [হাসি]— তোমরাই ক্ষমতালোভী, পরদ্রব্যলোভী, কতগুলো বদমাইশের কথায় পড়ে নিজেদের অন্নদাতা, আশ্রয়দাতা, ভাগ্যবিধাতা বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্রোহ করবে! [তালির আওয়াজ] বড়লাটসাহেবের শুভ-আগমণ উপলক্ষে হরতাল করবে ঠিক করেছ তোমরা? [হাসি] এ কত বড় বেইমানির কথা! উনি চাইলে তোমাদের কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দিতে পারেন। পুরো শহরকে খুঁড়ে কবরখানা একসঙ্গে বানিয়ে দিতে পারেন। উনি হলেন রাজা— এ কি হাসিঠাট্টার কথা! [হাসি] লাট-বাহাদুর চাইলে ট্রেন চলবে না, ডাক বন্ধ হয়ে যাবে, মাল আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কী করবে?
ভিড় : হরতাল!

‘মোটেরাম কা সত্যাগ্রহ’ নাটকের একটি দৃশ্য।

ঘটনা হল, নিজের সিদ্ধান্তর জেরে মোটেরাম পড়লেন ফ্যাসাদে। হরতাল প্রসঙ্গে তাঁর অনশন আর শহরবাসীর অবস্থান নিয়ে আলোচনা পঞ্চায়েত অবধি গড়াল। সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দু’দিন পেরিয়ে গেল। ফেরিওয়ালাকে ভজিয়ে পেটুক মোটেরাম কিছু গলাধঃকরণ করলেও মিটল না তাঁর রাক্ষুসে খিদে। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্রমশ কাহিল হলেন তিনি। দেখার ব্যাপার, ধর্মের দোহাই দিয়ে শেঠরা নানা কৌশলে মোটেরামের পক্ষ সমর্থন করলেও সন্ত, পণ্ডিতমশায় আর মৌলবি সাফ জানালেন, ধর্ম ও রাজনীতি— একে অপরের থেকে দূরে থাকাই ভাল। তাতে সকলেরই মঙ্গল। বোঝা যায়, ধর্মব্যবসায়ীর সঙ্গে ধার্মিকের ফারাক করা হয়েছে এখানে।
ঘটনাক্রম নতুন মোড় নিল যখন আচার্যমশায় এসে জানালেন, পণ্ডিতসমাজের জরুরি সভা মোটেরামকে সমর্থন করেছে, হরতালের চিন্তা তাই ছেড়ে দেওয়াই ভাল। শাসকগোষ্ঠী যে স্রেফ মোটেরাম নয়, ক্ষমতাশালী অন্যান্য ধর্ম-কারবারির সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে, তা বুঝতে দেরি হল না। সেইজন্যে শেষ চাল চালতে বাধ্য হলেন যুবক (প্রেমচন্দর ছোটগল্পে তিনি ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধি)। চিরদিনের মতো ধর্ম ও রাজনীতির গাঁটছড়ায় সিলমোহর পড়ুক— এমনটা যুবক চাননি। তাই অন্যদের চেয়ে আগে ভুখা মোটেরামের সঙ্গে দেখা করলেন তিনি। সঙ্গে নিলেন হরেকরকম মিঠাই। আর তাতেই হল কেল্লা ফতে।
যুবক : দু-চারটে চাখুন না।
মোটেরাম : কী আর চাখব? ধর্মসংকট, বুঝলে— ধর্মসংকট।
যুবক : চেখেই ফেলুন। এখন চেখে যে তৃপ্তি পাবেন, লাখ টাকায়ও তা পাবেন না। আমি কি কাউকে বলতে যাচ্ছি না কি?
মোটেরাম : আমি কি কাউকে ভয় করি না কি? আমি এখানে অন্নজল ত্যাগ করে পড়ে আছি আর কারও কোনও পরোয়া নেই। দাও— বাক্সটা এদিকে দাও। যাও, সবাইকে গিয়ে বলো যে, শাস্ত্রীমশায় ব্রত ভঙ্গ করেছেন। যদি ধর্মই না থাকে তবে আমি কি ধর্মরক্ষার ঠিকা নেব না কি? মরুক গে যাক— বাজার খোলা থাকুক বা না থাকুক— আমার কী? আমার কথা কে ভাবে যে আমি অপরের কথা ভাবব!
এভাবেই মোটেরামের মেকি সত্যাগ্রহ/ধর্মাগ্রহের অবসান ঘটল। তাঁকে নিয়ে সকলে মশরায় মাতল। হরতালের পথে আর বাধা রইল না। পণ্ড হল শাসকের কারসাজি।
ব্রিটিশ ভারতের পটভূমিতে লেখা হলেও ‘মোটেরাম কা সত্যগ্রহ’-কে পাঠক/দর্শক ১৯৮০-র দশকের বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে যাচাই করুন— এমনটাই চেয়েছিলেন সফদর হাশমি। তাই বেশ কয়েক জায়গায় (বিশেষত প্রত্যেক দৃশ্যের গোড়ার গানে) তিনি দুই যুগকে একসূত্রে জুড়েছেন। পথনাটকে সফদর বিষয়বস্তুকে সামলেছেন সোজাসুজি। মঞ্চনাটকের বেলায় তাঁর পরিমার্গ অনেকটাই পাল্টাল। বোঝা যায়, ধর্ম ও রাজনীতির যোগসাজশ রোখার বার্তা নিয়ে মঞ্চনাটক মারফত তিনি পৌঁছতে চাইলেন মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে (পথনাটকে তাঁর দর্শক মূলত শ্রমিক)। এমনকি, দরকার হলে কৌশলের সাহায্যেও শাসকগোষ্ঠী আর মোটেরামদের স্বরূপ ফাঁস করতে হবে— সেই ইঙ্গিতও থাকল নাটকে। সফদর মনে করতেন, ভারতে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হলে তার ফল হবে ভয়ানক। সম্প্রীতির মূল্য ছিল তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সফদর এও জানতেন, হাসি-তামাশায় আর নাচ-গানে ঠাসা নাটকে তাঁর উদ্দেশ্য সফল হবে নিশ্চিত।

সূত্র :
১। সফদর হাশমি, সফদর হাশমি নাট্যসংগ্রহ, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি, ১৯৯৮।
২। মুন্সি প্রেমচন্দ, ‘সত্যাগ্রহ’ (হিন্দি), https://premchandstories.in/satyagrah-kahani-premchand-pdf।
৩। Deshpande Sudhanva, Halla Bol, The Death and Life of Safdar Hashmi, New Delhi, Leftword, 2020।
৪। Hashmi, Safdar, The Right to Perform : Selected Writings of Safdar Hashmi. New Delhi, SAHMAT, 1989।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.