বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

রায়চৌধুরী ইকুয়েশন

শেষপর্যন্ত অমলকুমার রায়চৌধুরী আবিষ্কৃত ‘Raychaudhuri Equation’-এর হাত ধরেই সমস্ত সংশয় দূর করে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ এবং আরও দুই বিজ্ঞানী রাইনহার্ড গেনজেল ও আন্দ্রেয়া ঘেজ ২০২০ সালের নোবেল পুরস্কার জিতে নেন।

উজ্জ্বল ঘোষ

বিশিষ্ট ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী অমলকুমার রায়চৌধুরী বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে সুপরিচিত হলেও সাধারণের মধ্যে একেবারেই নন। তিনি নিজে মনে করতেন, বিজ্ঞানীর কাজ সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃতপক্ষে বোঝাও সম্ভব নয়। গত বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী রজার পেনরোজের সৌজন্যে তিনি খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিলেন। এই আলোচনায় আমরা বিজ্ঞানীকে এবং তাঁর কাজকে একটু বোঝার চেষ্টা করব। তবে শুরুতে এই বাঙালি বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত পরিসরেও খানিক ঘুরে আসব।
অবিভক্ত ভারতের বরিশাল শহরে (অধুনা বাংলাদেশ) ১৯২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এক যৌথ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অমলকুমার রায়চৌধুরী। ১৯৩৩ সালে তাঁর পরিবার কলকাতার বালিগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। তাঁর বাবা সুরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী ছিলেন কলকাতার ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুলের গণিতের শিক্ষক। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তাঁর বড়দা ছিলেন চিকিৎসক এবং অন্য দাদা ও দিদি ছিলেন অধ্যাপক। তাঁর স্ত্রী নমিতা (সেন) রায়চৌধুরী রসায়নে এমএসসি কিন্তু তিনি চাকরি করেননি, স্ত্রী এবং মায়ের কর্তব্যের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। কেউ অধ্যাপক, কেউ ডাক্তার।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশেই তিনি বড় হয়েছেন। সাতটি স্বর্ণপদক-সহ হিন্দু স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে দুটি স্বর্ণপদক সহ বিএসসি পাশ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। ১৯৪৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হয়ে রৌপ্যপদক সহ এমএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ইউনিভার্সিটি সায়েন্স কলেজ থেকে। ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স (IACS) থেকে লাভ করেন ডিএসসি উপাধি। দেশের আরও অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁকে প্রদান করে সাম্মানিক ডিএসসি উপাধি।
১৯৪৫ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি প্রবেশ করেন কর্মজীবনে, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্সে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৯ সালে সেখান থেকে তিনি চলে আসেন আশুতোষ কলেজে। ১৯৫২ সালে আবার ফিরে যান IACS-এ রিসার্চ অফিসার হয়ে। ১৯৬১ সালে সেখান থেকে আবার চলে যান প্রেসিডেন্সি কলেজে। একইসঙ্গে চলতে থাকে তাঁর গবেষণার কাজও।
ছোটবেলা থেকেই এই বিশ্বজগৎ তাঁকে বিস্মিত করত। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন রাতের আকাশের দিকে। তাঁর ভাবনাজগতে চলত দিশাহীন আলোড়ন। ক্রমে পদার্থবিদ্যা তাঁর ভালবাসার বিষয় হয়ে ওঠে। ছাত্রজীবনে বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে নানা ধরনের মতবাদ তাঁকে ক্রমাগত বিভ্রান্ত করছিল।
কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব নিয়ে সেই ১৯১৫ সাল থেকে বিজ্ঞানীমহলে চলছে শোরগোল, যে কাজ শুরু করেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। কিন্তু তিনি কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যেতে পারেননি, কেবল অনুমান করেছিলেন মাত্র। এবং সেই অনুযায়ী এই বিশ্বজগৎ সসীম হওয়ার কথা। কিন্তু পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী অমলকুমার রায়চৌধুরী দেখান, এই প্রস্তাবনা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ১৯৫৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘Physical Review’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তিনি দাবি করেন, গাণিতিকভাবে কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই গবেষণায় মহাকর্ষ বল ছাড়া অন্য কোনও বলের অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও উল্লেখ না থাকায় কিছুটা সংশয় থেকে যায়।
১৯৪৪ সালে এমএসসি পাশ করার পরপরই তিনি গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ ও বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে তিনি লিখে চলেন একের পর এক গবেষণাপত্র এবং তা পাঠাতে থাকেন ‘Physical Review’, ‘Nature’ প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত পত্রিকায়। একবার ‘Nature’ পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয় যে তাঁর আলোচ্য বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যেই আইনস্টাইন তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। অমলকুমার বিস্মিত হন অতবড় একজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর ভাবনা মিলে যাওয়ায়। যাইহোক, শেষপর্যন্ত অমলকুমার রায়চৌধুরী আবিষ্কৃত ‘Raychaudhuri Equation’-এর হাত ধরেই সমস্ত সংশয় দূর করে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ এবং আরও দুই বিজ্ঞানী রাইনহার্ড গেনজেল ও আন্দ্রেয়া ঘেজ ২০২০ সালের নোবেল পুরস্কার জিতে নেন। ৬৫ বছর পর অবশেষে প্রমাণিত হল অমলকুমারের গবেষণা ভ্রান্ত ছিল না।
অমলকুমার রায়চৌধুরী মূলত সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (General Theory of Relativity) ও বিশ্বতত্ত্ব (Cosmology) নিয়ে কাজ করেছেন। সামান্য কিছু কাজ করেছেন Solid Physics নিয়ে। তবে তাঁর যে কাজের জন্য তিনি বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে সুপরিচিত হয়েছেন তা একটা সমীকরণের জন্যই। ‘Raychaudhuri Equation’ নামেই যা জগদ্বিখ্যাত। আপেক্ষিকতাবাদ আলোচনায় যাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
কী সেই সমীকরণের বক্তব্য? আসুন, তাঁর নিজের ভাষায় আমরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। তিনি বলছেন, “কোনও একটি বস্তু-নিচয় যার ভেতরে মহাকর্ষ বিদ্যমান, সেটি সময়ের সঙ্গে আয়তনে কিরূপ পরিবর্তিত হয়— সেটিই আমি দেখিয়েছি। একদিকে মহাকর্ষের জন্য আয়তন সংকুচিত হবার সম্ভাবনা এবং গতি যদি বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন হয়, তাও সংকোচনকে সাহায্য করে। কেবলমাত্র যদি গতির ভেতরে ঘূর্ণন থাকে তাহলে তা সংকোচনের বিরোধিতা করে। আরও একটি বিষয় আছে, তা হল মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনও বল— এই বলটির কথা অবশ্য আমার আলোচনায় ছিল না। আমার আলোচনার গুরুত্ব হল এই যে— যদি সম্প্রসারণশীল বিশ্বে কোনও ঘূর্ণন বা অন্য কোনও বল না থাকে তবে বিশ্বের আদিতে একটি অসীম সংকুচিত অবস্থা থাকতে বাধ্য। এই অবস্থাকে ইংরেজিতে ‘Big Bang’ বলা হয়।”
সরল, সাদাসিধে, অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটির সঙ্গে কথা বলে বোঝার উপায় নেই যে তিনি কোন উচ্চতায় চিন্তা করেন। তিনি মূলত তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী। তাই তাঁর গবেষণায় সরাসরি কোনও যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। তবে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় রেডিও টেলিস্কোপ ভারতে আছে। তাই তাঁকে গবেষণার জন্য বিদেশে যেতে হয়নি। সারাজীবন অধ্যাপনা করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। পড়াতে পড়াতেই করেছেন গবেষণার কাজ। প্রেসিডেন্সি কলেজেই পড়িয়েছেন প্রায় পঁচিশ বছর। তাছাড়া পড়িয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে। পেয়েছেন NASC থেকে A. C. Banerjee Memorial Award ও INSA থেকে Vainu Bappu Memorial Award।
তৎকালীন প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা, অধ্যাপক সত্যেন বসু, অধ্যাপক নিখিলরঞ্জন সেন— এঁদের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁর জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এঁদের বিভিন্ন গুণাবলি দেখে একদিকে তিনি যেমন মুগ্ধ হয়েছেন, অন্যদিকে নানারকম দুর্বলতা দেখে হতাশও হয়েছেন। প্রথম দিকে অধ্যাপক সাহা কিংবা অধ্যাপক বসু, কেউই তাঁকে গুরুত্ব দিতে চাননি। তরুণ বিজ্ঞানীকে উৎসাহ দেওয়া দূরে থাক, তাঁর কাজটি নিয়েও কোনও আগ্রহ দেখাননি। তখন কে জানত একদিন তাঁর কাজ আইনস্টাইন, সত্যেন বসু, স্টিফেন হকিং, রজার পেনরোজ প্রমুখের সঙ্গে একযোগে উচ্চারিত হবে!
বিজ্ঞান বিষয়ক অসংখ্য প্রবন্ধ এবং গবেষণাপত্র তিনি লিখেছেন যার বেশিরভাগই ইংরেজিতে। এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি সহাস্যে উত্তর দিতেন : “আমরা ইংরেজি মাধ্যমে বিজ্ঞান শিখেছি, আবার ইংরেজি মাধ্যমে পড়াই— তাই বাংলায় লিখতে একটু আড়ষ্টতা আসে। তবে গবেষণাপত্র ইংরেজিতে লিখলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সহায়তা হয়। তাছাড়া আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা কোথায় গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে দেখে একজন বিজ্ঞানীর মূল্যায়ন করেন। বিদেশের প্রসিদ্ধ পত্রিকায় হলে প্রথমেই তাঁদের ধারণাটা অন্যরকম হয়। এ বিষয়ে আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি— অধ্যাপক কোঠারি যিনি UGC-র চেয়ারম্যান, ভারত সরকারের সামরিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান উপদেষ্টা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তাঁর সঙ্গে যখন আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তিনি বলেন, You have published some papers in Physical Review (USA), অর্থাৎ ইঙ্গিত, তাহলে তো আপনি ভাল কাজই করেছেন।
জগদ্বিখ্যাত এই বিজ্ঞানী ব্যক্তিজীবনে ছিলেন নিরহঙ্কারী, শান্ত, সংযত, সদালাপী ও হাসিখুশি। গান্ধীজির আত্মজীবনী ‘My Experiment with Truth’ তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সত্য অনুসন্ধানই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। প্রচারবিমুখ সত্যান্বেষী এই মানুষটি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছেও ছিলেন আপনজন। তাদের তিনি এগিয়ে দিয়েছেন আলোর পথে। বহু বিজ্ঞানীর গবেষণার হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর হাতে। দেশে-বিদেশে তাঁর বহু ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে রয়েছেন বিভিন্ন সম্মানীয় পদ আলোকিত করে। তাঁর একমাত্র বাংলা গ্রন্থ ‘আত্মজিজ্ঞাসা ও অন্যান্য রচনা’ পাঠ করলে তাঁর ভাবনার গতিবিধি খানিকটা আঁচ করা যায়।
২০০৫ সালের ১৮ জুন ব্যাঙ্কে গিয়ে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হন এই মহান বিজ্ঞানী। ব্যাঙ্কের কর্মীরাই তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যান। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ৮২ বছর বয়সেই ‘কৃষ্ণগহ্বরে’ বিলীন হয় তাঁর জীবনদীপ।

তথ্যসূত্র : পূর্ণিমা সম্মেলন পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা ও ব্যক্তিগত আলাপচারিতা।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.