বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

রুদ্রর সঙ্গে ভৃগুতালে

বছরের ছ’মাস জলাশয় জমে বরফ হয়ে থাকলেও সেটা শুধু মাঝখানেই দেখা যায়। পাড়ের দিকের জল বলয়াকারে কখনই জমে না। প্রকৃতির এই শিল্পকর্ম দেখে ঘোর লেগে যায়। একটা পাথরের ওপরে বসে থাকি অবাক বিস্ময়ে।

প্রবীর কুমার বিশ্বাস

ট্রেনযাত্রায় বিভ্রাট। দিল্লি-মানালির বাস ফেল করে ক্লান্ত, হতাশ। কলকাতা থেকে কুলু আসতে আসতে সমস্ত উৎসাহ তলানিতে। অনেক রাত, ঠান্ডায় জুবুথুবু হয়ে তখন কুলুতে বাসের মধ্যে গরমের খোঁজ করছি। বাসের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন শক্তপোক্ত একজন হিমাচলী মানুষ। গম্ভীর গলায় তাঁর ঘোষণা শুনে সোজা হয়ে বসলাম।
হ্যালো ক্যাম্পার্স! ওয়েলকাম টু মানালি। আমি রুদ্র, মাউন্টেন গাইড, পাহাড়ি বন্ধু।

ভৃগুতাল ট্রেকিং ম্যাপ।

রাতের আস্তানা হল মানালি থেকে আরও ন’কিলোমিটার এগিয়ে পালচেনে। আদতে এটা একটা আপেল বাগান, পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে বিয়াস নদী।
সকালে চোখ খুলতেই বুঝতে পারলাম হিমাচলের প্রকৃতির জাদু। বুক ভরে হিমালয়ের বাতাস নিয়ে লেগে পড়লাম কাজে, মানে জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে পড়বার জন্য।

পাখির চোখে দেখা পালচেন শহর ও বিয়াস নদী।

প্রতিবছর সামার ক্যাম্পের নাম করে গরমের ছুটিতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দল গড়ে বেরিয়ে পড়ি পাহাড়ে বেশ কয়েক দিনের জন্য। সঙ্গে থাকেন কিছু অভিভাবক ও দায়িত্ববান পাহড়ি বন্ধু। শেষ ক্যাম্পে ছোটরা বায়না ধরল, বরফ দেখব, আরও বড় পাহাড় চাই। ঠিকানা বদলে তাই এবার হিমাচলে। পাহাড়ি হাঁটাপথে পালচেন থেকে আমরা যাব ভৃগুতালে। উচ্চতা ১৩ হাজার ৮৯৪ ফুট। মনে মনে একটা গোপন ইচ্ছে আছে, আবহাওয়া অনুকূল হলে ছোটদের উৎসাহ দিতে উঠে পড়ব ভৃগু শৃঙ্গে। উচ্চতা ১৪ হাজার ২০০ ফুট।

পথ আটকেছে পাহাড়ী ছাগলের দল।

মে মাসের শেষ বলে সন্দেহ ছিল বরফের ছিটেফোঁটাও মিলবে কিনা। সুখবর, দু-তিন দিন আগেই নতুন করে বরফ পড়েছে ওপরের পাহাড়ে। তাই জমিয়ে ঠান্ডাটাও টের পাচ্ছি পালচেনে বসে।

জঙ্গল ক্যাম্পের দিকে।

বিয়াস টপকে উল্টো দিকের পাহাড় ধরে সোজা ওঠা। সবার সামনে রুদ্র আর সবশেষে আমি। পাহাড় ও প্রকৃতি নিয়ে রুদ্রর গল্প ও তথ্য ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে আমাদের। পাখি দেখতে দেখতে অনেকটা পথ চলে এসেছি। পিছন ফিরে দেখলাম, আমরা অনেক ওপরে, নীচে রুপালি ফিতের মতো বিয়াস আর দূরে মানালি শহরটাকে খেলনা ঘরবাড়ি দিয়ে সাজানো মনে হচ্ছে। উল্টো দিক থেকে এসে মিশেছে সোলাং নালা। সোজা উত্তর বরাবর রোটাং পাস। পর্যটকদের সারি সারি গাড়ি চলেছে সেদিকে। যদিও আমরা চলেছি পাখির গান শুনতে শুনতে পাইন, সিলভার ওক গাছের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটাপথ ধরে।

ছবির মতো জঙ্গল ক্যাম্প।

একটা ঝরনার পাশে বসে সঙ্গে আনা আলু-পরোটা আর আচার দিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করে হইহই করে রওনা হতে যাচ্ছি, এমন সময় সাবধানবাণী শোনালেন রুদ্র, আগে ভালু কা ডেরা, একসাথ যানা হ্যায়।

জঙ্গল ক্যাম্পে সদলবলে আমরা।

একটা, দুটো, তিনটে পাহাড় টপকে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলাম জঙ্গলের মাঝে একটা ফাঁকা জায়গা, সারি সারি তাঁবু লাগানো। জঙ্গল ক্যাম্প, আমাদের রাত্রিবাসের জায়গা, উচ্চতা ৯ হাজার ফুটের আশেপাশে হবে। হিসাব করে দেখলাম, পথ হেঁটেছি ১০ কিলোমিটারের মতো।

রডোডেনড্রন গুচ্ছ।

পরদিন শুরুতেই বিরাট বিরাট ভুজ গাছের জঙ্গলটা পার হতেই গাছের উচ্চতা হঠাৎ করেই ছোট হয়ে গেল। সামনের পাহাড়ের ঢালটা ঢাকা পড়েছে সবুজ ঘাসের গালিচায়। তার মাঝে মাঝে নানান রংবেরঙের নাম না জানা ফুল।
সামনে ওটা সাদা রঙের কী? ছোট্ট আয়ুষ জানতে চায়।
আরে, ওটাই তো বরফ।
দৌড় দৌড়। বরফে গড়াগড়ি, বরফের বল পাকিয়ে ছোড়াছুড়ি। রুদ্র কিন্তু এর মাঝেই ক্লাস নিয়ে নিলেন, কীভাবে সাবধানে বরফে চলতে হয়। বুঝতে পারলাম, আমরা বরফের রাজ্যে পা ফেলতে চলেছি।

সবুজ বুগিয়াল।

গাছপালা যেখানে শেষ সেখান থেকেই পাহাড় ঢাকা পড়েছে নরম বরফের চাদরে। ঢাল বেয়ে উঠতেই অন্য এক পৃথিবীর দরজা খুলে গেল চোখের সামনে। বড় ঘাসের সমতল একটা জমি। তারই একপাশে বৃত্তাকারে সাজানো আমাদের তাঁবু। এক ধারে বরফগলা জলের সরু একটা ধারা। পিছনের আকাশ জুড়ে ভৃগু শৃঙ্গ। এটাই আমাদের স্নো ক্যাম্প। উচ্চতা ১২ হাজার ফুট। জঙ্গল ক্যাম্প থেকে দূরত্ব বেশি নয়, মেরেকেটে আট কিলোমিটার হবে।
পুরো বিকেলটাই কেটে গেল বরফের ওপরে হাঁটবার কায়দা শিখতে। যদিও বার বার বেকায়দায় পড়তে হচ্ছিল। ব্যাগে আনা সব গরম জামাকাপড় গায়ে চাপিয়েও ঠান্ডায় কাঁপছি। ছোট ক্যাম্পারদের সে কী উত্তেজনা। আগামীকালই আমাদের অভিযানের খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেই চিন্তায় রাতে ভাল ঘুম হল না সবার।

বরফের ওপরে হাঁটবার নিয়ম শেখাচ্ছেন গাইড রুদ্র।

স্নো ক্যাম্প থেকে সামনের গিরিশিরা ধরে উঠে আসবার পর চোখের সামনে আর কোনও বাধা রইল না। উত্তরে পিরপাঞ্জাল রেঞ্জ, পশ্চিম বরাবর ধৌলাধার রেঞ্জ। সামনে সোলাং উপত্যকা আর তার পিছনে সার দিয়ে ফ্রেন্ডশিপ পিক, স্মৃতিধর শৃঙ্গ, পাতালসু ও সবার পিছনে হনুমান টিব্বা। পূর্ব দিকে বিখ্যাত হামতা পাস (১৪ হাজার ৯ ফুট ) ট্রেক রুটের গোটাটাই দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ বরাবর মেঘের চাদর ভেদ করে মাথা উঁচু করে আছে দেওটিব্বা আর ইন্দ্রাসন শৃঙ্গ। রুদ্র বললেন ওখানেই দুহাঙ্গন উপত্যকা। আসলে আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটা সুউচ্চ জলবিভাজিকার ওপরে। না, এখানে কোনও হিমবাহ নেই।

আমাদের স্নো ক্যাম্প।

ঘোর কাটল রুদ্রর নির্দেশে। অনেক আড্ডা হল, এর পরের আড্ডা হবে ভৃগুতালের ধারে। এখন থেকে আমাদের আরও সতর্ক হয়ে পথ চলতে হবে। সামনের বরফ আরও শক্ত। যাদের জুতো সেই কঠিন বরফে হড়কে যাবে তাদের কিন্তু পোর্টারের সঙ্গে ফিরে যেতে হবে নীচে।
রুদ্রর নির্দেশমতো ভৃগু মহারাজের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে আমরা উঠে দাঁড়ালাম।

গদ্দীদের সঙ্গে গানের আসরে।

ভৃগু ঋষির নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এই ১৪ হাজার ফুট উচ্চতার ছোট্ট জলাশয়। গোটা হিমাচলবাসীর কাছে এই লেক বা তাল খুবই পবিত্র। মানালির খুব কাছে পুরনো এক জনপদ বশিষ্ঠ থেকে প্রতিবছর শ্রাবণ মাসে ডোলি আসে ভৃগুতালে, স্নান উৎসব উপলক্ষে। প্রচুর লোকসমাগম হয়, মেলা বসে যায় কয়েকটা দিন। এসবই রুদ্রর কাছে শোনা। ঋষি ভৃগু প্রজাপতি ব্রহ্মার মানসপুত্র। তার সাধনা ক্ষেত্র হিসেবে এই তালটি চিহ্নিত করা হয়। ভৃগু ঋষিই প্রথম প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে জ্যোতিঃশাস্ত্রের মেলবন্ধন ঘটান তাঁর রচিত ‘ভৃগু সংহিতা’ গ্রন্থে। এই তালে আসবার তিনটি প্রচলিত রাস্তার প্রথমটি উত্তর দিক থেকে গুলাবা হয়ে। দ্বিতীয় রাস্তাটি এসেছে বশিষ্ঠ গ্রাম থেকে। এই পথে ২৫ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। শেষ পথে জঙ্গল ধরে পালচেন থেকে জঙ্গল ক্যাম্পে এক রাত কাটিয়ে ভৃগুতাল পৌঁছনো যায়। রাস্তা ছোট হলেও পুরোটাই চড়াই পথ। এই পথেই আমরা এসেছি।

বরফের ঢালে অভিযাত্রীরা।

রুদ্রর সঙ্গে আলোচনা করে আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম, আকাশ এখনও পরিষ্কার, তাই আগে ভৃগু শৃঙ্গে উঠে তার পর ওটার পিছন দিয়ে সরাসরি নেমে যাব ভৃগুতালে। শেষ বরফের ঢালে দড়ি লাগাতেই হল আর সেই দড়ির সাহায্য নিয়েই সরু গিরিশিরার পথ ধরে উঠতে লাগল সবাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটা আকারে কিছুটা ছোট হয়েছে। একসময় শৃঙ্গের ওপরে ক্যাম্পাররা জড়ো হল এক এক করে। জীবনে প্রথমবার কোনও শৃঙ্গ স্পর্শ করবার আনন্দ ছুঁয়ে গেল সবাইকে। অনেক নীচে দেখা যাচ্ছে জমে যাওয়া ভৃগুতাল। শৃঙ্গ থেকে রুদ্রর দেখানো পদ্ধতিতে ‘গ্লেসিডিং’ করে বরফের ওপর বসে স্লিপ করে নেমে এলাম তালের ধারে।

ভৃগু শৃঙ্গ আরোহণের পথে।

ডিম্বাকার এই জলাশয়টি সত্যিই এক প্রাকৃতিক বিস্ময়। চারপাশের উঁচু ঢালের জমা বরফ গলে নেমে আসে এই তালে। বছরের ছ’মাস জলাশয় জমে বরফ হয়ে থাকলেও সেটা শুধু মাঝখানেই দেখা যায়। পাড়ের দিকের জল বলয়াকারে কখনই জমে না। প্রকৃতির এই শিল্পকর্ম দেখে ঘোর লেগে যায়। একটা পাথরের ওপরে বসে থাকি অবাক বিস্ময়ে।

ভৃগুতালে আমরা।

রুদ্রর ধমকে ঘোর কাটে, জলদি উতরো, বরফ গির রাহা হ্যায়।
স্নো ক্যাম্পে ফিরে এসে মনে হল, একটা মিষ্টি স্বপ্নের রেশ রয়ে গেছে হৃদয়ে।

ছবি : লেখক

Comments are closed.