বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

লোকনাট্যে সম্প্রীতি : ভাঁড়যাত্রা

ভাঁড়যাত্রার চরিত্রগুলি দৈববাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, তারা বাস্তব জীবনের প্রতিমূর্তি হয়ে বিকশিত হয়। ধর্মের গোঁড়ামি ভেঙে এক নতুন ঐতিহ্যের বাতাবরণ তৈরি করে। শুধু মেদিনীপুর নয়, বাংলার এই বিশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী ধারাটি আজ সর্বত্র সম্পূর্ণ অবলুপ্তির পথে।

তরুণ কুমার প্রধান

লোকসংস্কৃতির বহুমুখী ঐতিহ্যের ধারায় লোকনাট্য একটি অন্যতম নাট্যশৈলী। ভারতের লোকনাট্যগুলির মধ্যে যে সকল মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার মধ্যে ভাঁড় একটি অন্যতম বৈচিত্র্যময় উপাদান। ভাঁড় চরিত্র এই নাট্যশৈলীর অন্যতম নিয়ন্ত্রক। উপস্থাপনার শুরু থেকে অন্তিম দৃশ্য পর্যন্ত যার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। নাট্যঘটনায় চরিত্রটি একাধিক ভূমিকায় অনায়াসে যাতায়াত করে। রিলিফ ক্যারেক্টর হিসেবে অভিনয়ের পরতে পরতে কৌতুকপ্রবণতা লক্ষ করা যায়। বাহ্যিক রসবোধের অন্তরালে সমাজের কঠিন বাস্তব ছবিটা অনায়াসে পৌঁছে দেয় দর্শকদের কাছে। যেমন আলকাপের ছুকরি বা ছোকরা, লেটো পালায় ব্যাঙাচি এবং অন্যান্য লোকপালায় বিবেক বা বিদূষকের মতো ভূমিকায় ভাঁড়ের চরিত্রের জুড়ি মেলা ভার।
পশ্চিমবঙ্গের লোকনাট্যের রূপবৈচিত্র্যে আজও লোকজীবনে সীমাহীন ব্যাপ্তির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। জাতপাত, ধনী-দরিদ্র, ধর্মের ভেদাভেদের বাইরে সকল মানুষের সমান অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দলমত নির্বিশেষে সমাজের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি কৌতুকরসে জারিত হয়ে পরিবেশিত হয়। অভিনীত পালাগুলি শোষণ, কুসংস্কার, অন্যায়, ব্যাভিচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নীরবে সমাজের শিক্ষক অথবা অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে। ভাঁড়যাত্রা সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। শিল্পী ও দর্শকদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ মিশ্র সংস্কৃতির একটি অন্যতম উদাহরণ। পালাকার হিসেবে, সঙ্গীতে, বাদ্যে, পরিচালনায় স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সমান দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি পালার শিরোনামে তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। রসন জানাল, মসনদার, মোঘল তামাশা, কালো হাওয়া ও পৌরাণিক চরিত্রের পালাগুলি সম্প্রীতির নিদর্শন।

উৎস ও প্রবাহ : বাংলার মধ্যবর্তী অঞ্চলের অতি জনপ্রিয় লোকনাট্য ছিল ‘ভাঁড়যাত্রা’। এইসব জেলার ক্রমবিলীয়মান লোকনাট্যগুলির মধ্যে অন্যতম লোকনাট্য হল ভাঁড়যাত্রা। লোকজীবনের প্রাত্যহিক জীবনচর্চায় সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বিরহ-বেদনা নিত্যদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়গুলি নিয়ে কৌতুকরসের মাধ্যমে দর্শককে আনন্দ দান করা ভাঁড়যাত্রার বৈশিষ্ট্য। অবলুপ্তপ্রায় লোকনাট্যের এই ধারাটি ধর্মবিবর্জিত দৃষ্টিগ্রাহ্য লোকআঙ্গিকের বিশিষ্ট ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। ভাঁড়যাত্রার চরিত্রগুলি দৈববাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, তারা বাস্তব জীবনের প্রতিমূর্তি হয়ে বিকশিত হয়। ধর্মের গোঁড়ামি ভেঙে এক নতুন ঐতিহ্যের বাতাবরণ তৈরি করে। শুধু মেদিনীপুর নয়, বাংলার এই বিশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী ধারাটি আজ সর্বত্র সম্পূর্ণ অবলুপ্তির পথে। কতিপয় অত্যুৎসাহী গবেষকের তত্ত্বাবধানে এর পুনরুজ্জীবনের প্রয়াস চলছে।
‘ভাঁড়’ শব্দটি তদ্ভব শব্দ। সংস্কৃত ভণ্ড শব্দ থেকে এসেছে। ‘ভণ্ড’ শব্দের অর্থ কপট। ভাঁড় শব্দের আভিধানিক অর্থ হাস্যরসিক বা বিদূষক। ভাঁড়, হাস্যরসিক বা বিদূষক চরিত্রকে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে যেমন পাই, তেমনই সংস্কৃত নাটক ও রবীন্দ্রনাটকে বিদূষক চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ করি। তবে এই বিদূষক চরিত্র শানিত, ক্ষুরধার বুদ্ধিমান এবং সংযমী। তবে ভাঁড়যাত্রার ভাঁড় চরিত্রটি দুর্বল ও চঞ্চল, ব্যক্তিত্বহীন। শ্লীল, অশ্লীল গ্রাম্য ভাষায় লোকজীবনের নানা ঘটনাকে কাহিনি আকারে পরিবেশন করা হয়। নৃত্যগীতের মাধ্যমে যে অভিনয় হয় তার মধ্যে কোনও পূর্বপরিকল্পনার ছাপ থাকে না, তবে এটিই গ্রামীণ লোকনাট্যের বৈশিষ্ট্য। ‘যাত্রা’ অর্থে গমন করা। সংস্কৃত ‘যা’ ধাতু থেকে ‘যাত্রা’ শব্দের উৎপত্তি। আবার বিদগ্ধ পণ্ডিতবর্গ ‘যাত্রা’ শব্দের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন ‘যাত্রা’ অর্থে নট, অভিনয়, যাত্রাভিনয়, উচ্চস্বরে সংলাপ, সঙ্গীত, বাদ্য সহযোগে অভিনয় হল ‘গীতাভিনয়’, ‘নাট্যগীত’ বা যাত্রাভিনয়। ভাঁড়যাত্রার ক্ষেত্রে যাত্রাভিনয় অর্থটি অধিক গ্রহণযোগ্য। ব্যঙ্গকৌতুক অঙ্গাভিনয়ে ছোট গ্রামীণ বিষয় নিয়ে হাস্যরস পরিবেশন করা ভাঁড়যাত্রার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এর আগে আমরা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের লেখাতে যে ভাঁড়ু দত্ত চরিত্রটি পাই তাতে বর্ণিত হয়েছে ভাঁড়ুর কপটতা, চালাকি আর রসিকতার ছলে নিজস্ব উদরপূর্তির কাহিনি।
‘‘পসার লুটিয়া ভাঁড়ু ভরয়ে চুপড়ি
জত দ্রব্য লয় ভাঁড়ু নাঞি দেয় কড়ি।
লন্ডে ভন্ডে দেয় গালি বলে শালাশালা
আমি মহামণ্ডল আমার আগে তোলা।’’
এইভাবে ভাঁড়ু দত্ত নিজেকে মহামণ্ডল ঘোষণা করে জোর করে তোলা আদায় করে। তার আচরণের মধ্যে ছিল রসিকতা। আবার আমরা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে যে গোপাল ভাঁড়ের উল্লেখ পাই তাতে চরিত্রটি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ। রাজসভায় রসিকতার সাহায্যে আনন্দ দেওয়াই ছিল তার কাজ। এজন্য গোপাল ভাঁড় নানা অশ্লীলতার আশ্রয় নিতেও দ্বিধাবোধ করত না। তাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বহু গল্পও প্রচলিত রয়েছে।
ভাঁড়যাত্রার উৎপত্তির অনুসন্ধানকালে চরিত্রটিকে প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যে যেমন পাই, তেমনই মেদিনীপুর জেলার বাইরে হুগলি, নদিয়া, হাওড়া প্রভৃতি জেলাতেও ভাঁড়যাত্রার অতীত অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। লোকনাট্য বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থে ভাঁড়যাত্রার উল্লেখ পাই। মেদিনীপুরের ভাঁড়যাত্রার সঙ্গে সুদূর কাশ্মীরের ‘ভাঁড়পথর’ নামে একটি লোকনাটকের মিল পাওয়া যায়। ভাঁড়যাত্রার সঙ্গে এর বৈসাদৃশ্য থাকলেও সাদৃশ্যও বহুল পরিমাণে লক্ষ করা যায়। ‘ভাঁড়পথর’-এর অভিনেতারা নাচ, গান এবং কৌতুকে অসাধারণ নাটুকে প্রতিভার অধিকারী। ‘ভাঁড়পথর’ পৌরাণিক ও সামাজিক কাহিনিকে ব্যঙ্গকৌতুকের মধ্য দিয়ে পরিবেশন করে। যে অভিনেতারা এই চরিত্রে অভিনয় করেন তাঁদের ভাঁড় বলে। ভাষাগত পার্থক্য ছাড়া বিষয় ও অভিনয়রীতি প্রায় একই। তবে ‘ভাঁড়পথর’ পালাকে কাশ্মীরের লোকসমাজ যে শ্রদ্ধার চোখে দেখে সে তুলনায় এখানকার ভাঁড়যাত্রা অজ্ঞতা ও উপেক্ষার শিকার। অবশ্য এর পেছনে রয়েছে উপস্থাপনাশৈলীর ত্রুটি ও বিষয় নির্বাচনের ভ্রান্তি। অঞ্চলভেদে এর ভিন্ন নাম। কোথাও একে বলে ‘ভাঁড়নাচ’ আবার কোথাও বা ‘ভাঁড়াম যাত্রা’ (ভাঁড়ামো যাত্রা)। শ্যামল বেরা তাঁর ‘ভাঁড়যাত্রা’ গ্রন্থটিতে নামের ভিন্নতা সম্বন্ধে বলেছেন, ‘‘নদীয়া জেলায় ‘ভাঁড়যাত্রা’ ‘ভাঁড়ের গান’ নামেও পরিচিত। ভাঁড়যাত্রাকে ‘ভাইয়া’ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে।’’ তবে সঙ্গীতে ও আঙ্গিকে অনেক মিল থাকলেও আঞ্চলিক লোকনাটকগুলির ভৌগোলিক ব্যবধানে ভিন্ন নামকরণ লোকনাট্যের বৈশিষ্ট্য বলেই মনে করা হয়। মেদিনীপুর জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটি নাচের বহুল প্রচলন আছে যার আঞ্চলিক নাম ‘ভাওয়াইয়া’। মাথায় প্রদীপ নিয়ে নারীবেশে ঝুমুর সঙ্গীত সহযোগে দীর্ঘ সময় এই নৃত্যটি পরিবেশিত হয়। কখনও এতে কসরতমূলক অঙ্গাভিনয় থাকে। চাঁদাবিলা গ্রামের সঞ্জয় মাহাত, লালগড়ের সঙ্গু মাইতি, ক্ষেমাশুলি অঞ্চলে প্রবীর কালিন্দীর নাচ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বাংলা থেকে বহু দূরে গুজরাতের ‘ভাওয়াইয়া’ জনপ্রিয় লোকনাট্য। এর ভাঁড় চরিত্রটির উপস্থিতি অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় লোক উৎসবে বাংলার দলনেতা হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। তখন এই কলাটির সঙ্গে পরিচিত হই। আবার রাজস্থানের ‘ভাবাই’-তে মাথায় বড় কলসি এমনকি গোরুর গাড়ির চাকা নিয়েও নাচতে দেখা যায়। তবে এটি মূলত নৃত্যগীত সহযোগে লোকনৃত্য হিসেবে জনপ্রিয়। কাশ্মীরের ‘ভাঁড়পথর’-এর সঙ্গে বাংলার ‘ভাঁড়যাত্রা’-র বিশেষ মিল রয়েছে নৃত্য, গীত ও উপস্থাপনায়। ড. ধ্রুব দাস তাঁর ‘ভারতের লোকনাট্য’ গ্রন্থে লিখছেন, ‘‘এই ঐতিহ্যবাহী নাটক তারা কাশ্মীর তথা উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশেন করে থাকে। এই ভাঁড়েরা আবার দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এক শ্রেণির ভাঁড় কেবল বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান গেয়ে বেড়ায় আর অন্য শ্রেণির ভাঁড়েরা নৃত্য ও বাদ্য সহযোগে নাটক পরিবেশন করে বেড়ায়।’’ আমাদের আলোচনার বিষয় ‘ভাঁড়’ ও তার যাত্রা— মেদিনীপুরের ভাঁড়যাত্রা।
উৎপত্তি সম্বন্ধে সঠিক সন-তারিখ উদ্ধার করা যায়নি। হাতিহলকা নিবাসী প্রবীণ শিল্পী সুদাম খাঁর আলোচনা থেকে অনুমান করা যায়, এদেশে মুসলিম ধর্মের প্রবর্তনের অব্যবহিত পরেই এর উৎপত্তি ঘটে। বাধ্য হয়ে যে সমস্ত শিল্পী মুসলমান সমাজে প্রবেশ করেছিলেন তাঁরা রক্ষণশীল পরিবেশে থেকে নিজেদের পূর্বের মতো বিকাশ করতে না পেরে পরবর্তীকালে ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেন। কালক্রমে স্বতন্ত্র নাট্যশৈলী ‘ভাঁড়যাত্রা’ রূপ লাভ করে। কারণ শিল্পীরা অধিকাংশ মুসলমান সমাজের হলেও তাঁদের অভিনীত কিছু পালা ও তার বিষয়বস্তু হিন্দু দেবতা ও সমাজ আশ্রিত। ভাঁড়যাত্রা শুরুই হয় সরস্বতী বন্দনাগীত গেয়ে।
“কোথায় গো মা সরস্বতী সর্বমঙ্গলা (২)
তোমার চরণ ধরে আছি মোরা এ সংসারে—
আমরা অবলা (২)
কোথায় গো মা… সর্বমঙ্গলা…।”
বর্তমানে যদিও হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। পাথরা নিবাসী ভাঁড়যাত্রার সঙ্গীতশিল্পীর আলোচনা থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই ভাঁড়যাত্রা এই অঞ্চলে অভিনীত হত। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিষয়ে এর বিবর্তন ঘটেছে। আদিপর্বে এর সঙ্গীত ছিল পদ্যধর্মী। পরে স্থানীয় ও আধুনিক সুর সংযোজিত হয়েছে। আগে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে কর্নেট, ক্লারিওনেট, বাঁশি, ঝুমকা ও ছোট ঢোল ব্যবহার হত। বর্তমানে হারমোনিয়াম, ডুগি তবলা-সহ অন্যান্য আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সংযোজিত হয়েছে। বহির্ভারতের নাট্যপালায় ‘ভাঁড়’-এর ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য্য ইরান ভ্রমণকালে ভাঁড় সম্বন্ধে যে মূল্যবান আলোচনা করেছেন তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক— ‘‘ইরানী যাত্রার মূল চরিত্রই এই ভাঁড় চরিত্র। এই বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানী যাত্রার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়বস্তু এবং বিভিন্ন চরিত্র আছে, কিন্তু তার প্রত্যেক পালার মধ্যে একটি ভাঁড়ের চরিত্র অপরিহার্য রূপে যুক্ত হয়ে থাকে। ভাঁড়কে সর্বদাই কালামুখ অর্থাৎ কালো রঙ মুখ রঞ্জিত করে রূপসজ্জা করতে হয়। কদাচিৎ সাদা রঙেরও ব্যবহার করা হয়।’’
মেদিনীপুরের ভাঁড়যাত্রার ভাঁড় নিজেই একটি প্রধান চরিত্র। তার নিয়ন্ত্রণে পুরো পালাটি নিয়ন্ত্রিত হয়। পালা চলাকালীন ভাঁড়ের ভূমিকাই মুখ্য ভূমিকা হয়ে ওঠে। ইরানি ভাঁড়শিল্পীর মতো মূলত মুসলিম শিল্পী সমাজের বিনোদনের ভাঁড় চরিত্রটির মুখে কালো রঙের প্রলেপের ওপর সাদা রং দিয়ে বিভিন্ন রেখা অঙ্কিত করা হয়। এই কালো রং মুসলিম শিল্পী সমাজের মিলনের ইঙ্গিতবাহী হতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলের ‘ভাঁড়’ চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি মেদিনীপুরের ভাঁড়যাত্রায় বিদ্যমান।
বিভিন্ন অঞ্চলের ভাঁড় চরিত্রকে কেন্দ্র করে অভিনীত পালাগুলির সঙ্গে এই অঞ্চলের ভাঁড়যাত্রার সাদৃশ্য থাকলেও এর উৎপত্তি সম্বন্ধে সঠিক তথ্য আজও পাওয়া যায়নি। আমাদের ক্ষেত্রসমীক্ষাকালে বিভিন্ন প্রবীণ শিল্পী ও দর্শকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারি, ভাঁড়যাত্রার উৎপত্তি ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের প্রারম্ভে। পূর্বে খোলা আকাশের নীচে আসর বসত। বর্তমানে ছাউনি-সহ মঞ্চ করে অনুষ্ঠান হয়। হ্যাজাকের বা বৈদ্যুতিক আলোয় যাত্রা পরিবেশিত হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই পালা বর্তমানে জেলার বিস্তৃত বৃহৎ অঞ্চল থেকে বিলীয়মান। তবে লুপ্ত আকারে দুটি অঞ্চলে বিদ্যমান।

পরিবেশন পদ্ধতি : ভাঁড়যাত্রায় নৃত্য ও গীত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে থাকে। ভাঁড়যাত্রায় প্রথমে ধূপ জ্বেলে সরস্বতীত বন্দনাগীত গাওয়া হয়। কোথাও মূল শিল্পীরা উপস্থিত হয়ে গান করেন। আবার কোথাও সমস্ত শিল্পীর উপস্থিতিতে বন্দনাগীত গাওয়া হয়। ভাঁড় দ্বারা যে নৃত্য পরিবেশিত হয় তাতে স্থানীয় নৃত্যের ভঙ্গি থাকলেও কোনও ধারাবাহিকতা থাকে না। শিল্পীরা নিজের শরীরের ক্ষমতানুযায়ী নিজের মতো করে পরিবেশন করেন। সংলাপের সময় দাঁড়িয়ে অল্প পায়ের চলনে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বাক্যালাপ করেন। মাঝেমধ্যে শরীরকে ঝাঁকুনি দিয়ে আবার দর্শকদের দিকে ঘুরে দাঁড়ান। দর্শক চারদিকে থাকে বলে বৃত্তাকারে অভিনয় চলে। মঞ্চের মূল দুই শিল্পী গানের মুখ ধরেন, এক কলি পরেই বাদ্যশিল্পী-সহ সকলে ধুয়ো ধরে গান পরিবেশন করেন। পালার মধ্যে ঘটনার স্থায়ী পর্বগুলিতে সংলাপ ব্যবহার করা হয়। ঘটনার প্রবাহকালের বর্ণনা সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পালার মধ্যে নির্দিষ্ট কোনও বিষয় চলতে চলতে হঠাৎ ভাঁড় সহশিল্পীকে নিয়ে বিষয়ের বাইরের গান গেয়ে কৌতুক ও নৃত্য পরিবেশন করেন। তখন আধুনিক সঙ্গীতের সুরও ব্যবহার হয়। বাজনাদারদের গদ বন্দনা দিয়ে পালা শুরু হয়ে চলে সারারাত। ছোট ঘটনাকে শিল্পীরা নিজেদের দক্ষতায় বিস্তার ঘটাতে পারেন। আবার প্রয়োজনে সংকুচিত করতে পারেন। এটি ভাঁড়যাত্রার এক বৈশিষ্ট্য বলা যায়। পালার মধ্যে ভাঁড় সঙ্গিনীকে নিয়ে কৌতুক পরিবেশন করেন। দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী পালা পরিবেশিত হয়। পালার মধ্যে চটুল ব্যঙ্গবিদ্রূপ এত বেশিমাত্রায় ব্যবহৃত হয় যে পালাটি গ্রাম্যতাদোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে। সে কারণে হয়তো এই পালায় নারী দর্শক অনুপস্থিত থাকেন। পালায় নৃত্য আঙ্গিকের ব্যবহার বেশি, তাই এর আকর্ষণক্ষমতাও বেশি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নৃত্য ও ঘটনা নিয়ে জমজমাট উপস্থাপনা পালাটিকে জনপ্রিয় করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিবর্তন না হওয়ায় স্থবির হয়ে গেছে।
মঞ্চ : অভিনয় হত মূলত ফাঁকা মাঠে। উঁচু সাজানো মঞ্চ সচরাচর দেখা যায় না। অভিনয় মঞ্চের চার কোণে চারটি সরল বাঁশ পুঁতে মাথায় সামিয়ানা টাঙিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। পূজা উপলক্ষে ভাঁড়যাত্রার মঞ্চ ভূমি থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু খাট বা পাটাতন দিয়ে বানানো হয়। আবার মাটির ওপর সতরঞ্চি বিছিয়েও মঞ্চ বানানো হত। মঞ্চে চারদিকের বাঁশের খুঁটিতে হ্যাজাক লাইট ঝোলানো হয়। বর্তমানে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার দেখা যায়। ভাঁড়যাত্রার মঞ্চশৈলী গ্রামীণ লোকনাটকের ধারায় আজও অম্লান।

ভাঁড়যাত্রার মঞ্চ।

সাজপোশাক : দুটি চরিত্র ছাড়া অন্য সকলের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত পোশাক পরিপাটি করে ব্যবহার করা হয়। ভাঁড়যাত্রার সাজপোশাকে গ্রামজীবনের ছবিটি ধরা পড়ে। দুটি চরিত্র বিশেষ ধরনের পোশাক ব্যবহার করে। ভাঁড় পুরুষ চরিত্রটি ধুতি, পাঞ্জাবি এবং কোমরে কোনও কোনও সময় গামছা বাঁধেন অথবা গলায় গামছা বা মাফলার থাকে। মহিলা চরিত্রের শিল্পী রঙিন অথবা জরি বসানো কালো শাড়ি ব্যবহার করেন। অন্য সহযোগী চরিত্র রঙিন ছাপা শাড়ি কাছা দিয়ে পরেন, গায়ে থাকে পাঞ্জাবি, গলায় মাফলার। চরিত্রানুযায়ী পোশাকের কোনও পরিবর্তন হয় না। পালার বিষয়ে পরিবর্তন ঘটলেও সাজপোশাকে কোনও পরিবর্তন ঘটে না। ভাঁড়যাত্রার রূপসজ্জায় একটু অভিনবত্ব লক্ষ করা যায়। ভাঁড় চরিত্রটির মেকআপে একটু কালো বেস মেকআপের ওপর সাদা রং দিয়ে চোখ ও ভুরু আঁকা হয়। কপালে তিলক কাটেন। অন্যান্য চরিত্রগুলিতে সাধারণ মেকআপ নিয়ে ভুরা দিয়ে মুখ উজ্জ্বল করা হয়। সহযোগী শিল্পীদের রূপসজ্জার কোনও নিদর্শন পাওয়া যায়নি।
বাদ্যযন্ত্র : ভাঁড়যাত্রার বাদ্যযন্ত্রগুলি স্থানীয় সহজলভ্য বাদ্যযন্ত্র থেকে গৃহীত। পূর্বে বাঁশি, ঢোল ও ঝুমকা ছিল। পরে কর্নেট ও ক্লারিওনেট যোগ হয়। তারও পরে হারমোনিয়াম ও ডুগি তবলার সংযোজন ঘটে। সাম্প্রতিককালে বিদেশি সিন্থেসাইজার ব্যবহারের কথা শোনা যায়। পূর্বে বাদ্যযন্ত্রগুলির বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

ভাঁড়যাত্রায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র।

সংলাপ, সঙ্গীতের কথা, সুর ও তাল : ভাঁড়যাত্রার সংলাপ ছড়ার আকারে হয়। রাজা বা রানি চরিত্রের সংলাপগুলি গ্রামীণ যাত্রার মতো উচ্চস্বরে উচ্চারিত হয়। এই যাত্রার সংলাপ বা গান নির্দিষ্ট কোনও বাঁধাধরা নিয়মে হয় না। পালার বিষয়ের সময় সঙ্গীতের সুর একরকম। আবার কৌতুক বা ফার্স যখন চলে তখন জনপ্রিয় বাংলা বা হিন্দি গানের সুর ব্যবহৃত হয়। ভাঁড়যাত্রার অন্যান্য গানগুলি হল রসের গান, সম্প্রীতির গান, সাক্ষরতার গান ইত্যাদি। আবার গান কখনও বিষয় থেকে বেরিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। এই অনায়াস আদানপ্রদান চলে সঙ্গীতে ও সংলাপে। ভৈরবী, পূরবী, ক্ষেমটা, টুমরি, বাগেশ্বরী ইত্যাদি রাগ ব্যবহৃত হয়। তালের ক্ষেত্রে মূলত দাদরা, কাহারবা ও ঝাঁপতালের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
ভাঁড়যাত্রার গান ও স্বরলিপি—
“কোথায় গো মা সরস্বতী সর্বমঙ্গলা (২)
তোমার চরণ ধরে আছি মোরা এ সংসারে
আমরা অবলা (২)।

ভাঁড়যাত্রার গানের স্বরলিপি।

এলাকা ও সময় : লোকনাট্যের এই বৈশিষ্ট্যের যে অঞ্চলগুলিতে বিস্তার ঘটেছিল সেগুলি হল মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, উত্তর চব্বিশ পরগনা ও নদিয়া। মেদিনীপুর জেলার সরিষাকোলা ও চন্দ্রকোনা, খড়্গপুর, হাতিহলকা অঞ্চলে এখনও প্রবীণ শিল্পীদের বিশেষ আয়োজনে পালা পরিবেশন করা সম্ভব। মেদিনীপুরের হাতিহলকা গ্রামে প্রবীণ শিল্পী সুদাম খাঁ, শেখ সাইসুদ্দিন, মনির দালাল, তাবারক গায়েন, খুরসেদ আলি, শেখ সাইফুদ্দিন, শেখ আবদুল, আফজল খাঁ এবং নবীন শিল্পীদের নিয়ে নতুন করে পালাটি মঞ্চায়নের মহড়া চলছে। এদের মহড়া চলাকালীন পালা ও তার সঙ্গীত এবং অন্যান্য বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শিল্পীরা যেহেতু কৃষিজীবী তাই পৌষ মাসের ফসল ঘরে ওঠার পর থেকে পালাগান শুরু হয়ে চলত বৈশাখ মাস পর্যন্ত। উপস্থাপনা হত মূলত রাত থেকে ভোর পর্যন্ত। বর্তমানে এর কোনওটাই আর দৃষ্টিগোচর হয় না। বেশিরভাগটাই প্রবীণ শিল্পীদের জবানবন্দি থেকে সংগৃহীত।
শিল্পী সমাজ : ওস্তাদ, পরিচালক, সুরকার, রংদার বা ভাঁড় ও অন্যান্য শিল্পীদের নিয়ে ভাঁড়যাত্রার শিল্পী সমাজ। শিল্পীরা মূলত কৃষিজীবী ও খেতমজুর। এঁরা বেশিরভাগ মুসলিম সমাজের মানুষ। শিল্পীদের মধ্যে বেশিরভাগই নিরক্ষর। যে চার-পাঁচজন লেখাপড়া জানেন তাঁরাই গান এবং পালা রচনা করেন। পরিবেশ প্রতিকূল হওয়া সত্ত্বেও ভাঁড়যাত্রার প্রতি অগাধ আস্থা ও অসীম ভালবাসা রয়েছে এঁদের।
বিশ্বায়নের ঢক্কানিনাদে গ্রামীণ মানুষের আপন সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। আধুনিক পুঁজি ব্যক্তি ও সমষ্টিগত সমাজজীবনকে যেভাবে প্রলুব্ধ করে গ্রাস করছে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই পালাগুলি বিলীন হয়ে যাবে। জায়গা পাবে অতীতের স্মৃতিপটে। অথবা সমাজবিজ্ঞানের নিয়মে মানবসংস্কৃতির বিনাশ না হয়ে পরিবর্তিত ধারায় অধিক গতিসম্পন্ন হয়ে প্রবাহিত হবে।

তথ্যসূত্র :
১। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম বিরচিত চণ্ডীমঙ্গল, সম্পাদনা : সুকুমার সেন, সাহিত্য আকাদেমি, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৫, চতুর্থ মুদ্রণ ২০০২।
২। ভাঁড়যাত্রা, শ্যামল বেরা, লোক সংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, প্রথম প্রকাশ ২০০২।
৩। ভারতের লোকনাট্য, ড. ধ্রুব দাস, প্রতিভাস, প্রকাশ ১৯৯২।
৪। বাঙলা গ্রামীণ লোকনাটক, সম্পাদনা : সনৎ মিত্র, পরিবেশক : পুস্তক বিপণি, প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ২০০০।
৫। শেখ সাইফুদ্দিন, গান সংগৃহীত, হাতিহলকা গ্রাম, মেদিনীপুর, সাক্ষাৎকার ১৭ জুলাই ২০০২।
৬। ভাঁড়যাত্রার গান, শেখ সুদাম খাঁ, হাতিহলকা, মেদিনীপুর, গান রেকর্ডিং ১৯ জুলাই ২০০২।

ছবি : লেখক
মতামত জানান

Your email address will not be published.