বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

শব্দের সদর ও মফস্বল

কয়েকটা নিরীহ প্রশ্নের সমাধান থেকে শুরু হয় বইয়ের কাজ। কেমন ছিল সেই প্রশ্নগুলো? যেমন ধরুন, ‘সতীর্থে’ তীর্থ কেন? ‘কেশবে’ কেশ কোথায়? আবার ‘নাগরিক’-এর ভেতরে নাগ কে? এমন ধ্বনিগত মিলের কী এমন কারণ হতে পারে?

সুপ্রতিম কর্মকার

বই তার নিজের গুণে পাঠকের দরবারে স্থায়ী আসন করে নেয়। এমন একটি বই ‘শব্দের ভিতর ও বাহিরে : এক আহাম্মকের ভাষাচর্চা’। লেখক সৌরভ মিত্র। সদ্য এই বই পেয়েছে সুধীর চক্রবর্তী স্মারক সম্মাননা। লেখকের লেখা পড়েই জানা যাচ্ছে, কয়েকটা নিরীহ প্রশ্নের সমাধান থেকে শুরু হয় বইয়ের কাজ। কেমন ছিল সেই প্রশ্নগুলো? যেমন ধরুন, ‘সতীর্থে’ তীর্থ কেন? ‘কেশবে’ কেশ কোথায়? আবার ‘নাগরিক’-এর ভেতরে নাগ কে? এমন ধ্বনিগত মিলের কী এমন কারণ হতে পারে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে লেখক দেখলেন, আমাদের ভাষার পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও চেতনার অন্দরমহলের চাবিকাঠি।
শব্দের বহুমাত্রিকতা বিষয়টির সঙ্গে আমরা খুব পরিচিত নই। আমাদের মুখের বিশেষ্য পদকেন্দ্রিক ভাষা একমাত্রিক। এই ভাষার একটি শব্দের কেবল একটি অর্থ হয়। একাধিক অর্থ হলেও তা যেন পূর্বনির্ধারিত। আধুনিক সময়ে আমরা দেখছি, আধুনিক কবিতাতেও এমন বহু ব্যবহার হচ্ছে। যার বহু উদাহরণ আমরা পাই।
‘ভদ্র’ শব্দের বর্তমানে প্রচলিত অর্থগুলো হল অমায়িক, নম্র, সুপ্রতিষ্ঠিত ইত্যাদি। কিন্তু মনুসংহিতা অনুযায়ী ‘যে গোপনে পাপ করে ও প্রকাশ্যে তা প্রচ্ছন্ন রেখে পরধন গ্রহণ করে, সে হল ভদ্র’। আবার তন্ত্রশাস্ত্রে ‘ভদ্র’ শব্দের অর্থ চৌষট্টি কলায় পারদর্শী দক্ষ বা ভৃগুগণ। এই চৌষট্টি কলা কামসূত্রের কলা কি? না। তা নয়। এই কলায় রয়েছে কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, অঙ্কনবিদ্যা, কেশসজ্জা, সুগন্ধি প্রস্তুতি-সহ আরও নানা কিছু। যৌনশাস্ত্র হিসেবে পরিচিত কামসূত্রে আমরা পাচ্ছি বিদ্যাচর্চার বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে ধারণা। যৌনতা নিয়ে সেখানে তেমন কিছু নেই।
ক্রিয়াভিত্তিক শব্দের অর্থ খোঁজার বিষয়ে সৌরভ মিত্রের এই কাজ যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। শব্দের এই রসায়ন অপূর্ব। রসায়নের পরিভাষায়, কোনও যৌগিক পদার্থে তার উপাদানগুলি ‘আয়ন’ রূপে থাকে। শব্দ নির্মাণের সময়েও এইরকম একটা ঝোঁক থাকে। রসায়নে যেমন দুই প্রকারের আয়ন আছে, তেমন কখনও ঐকিক এবং কখনও সমবায় রূপে শব্দ গঠন হয়। এই বর্ণ সমবায় ব্যাকরণে চিহ্নিত হয় ‘ধাতু’ হিসেবে। ধ্বনি বা বর্ণের অর্থের পারস্পরিক পরিবর্তনশীলতাকে ভর করে একটি ধাতুতে উপস্থিত বর্ণগুলি ধাতুটির অর্থ নির্মাণ করে। উদাহরণ দেখা যাক।

‘হাতি’ শব্দের খোঁজ করা যাক। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন, ‘দিগগজ তোমার কিঙ্কর স্নানে’। আবার এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির মৃত্যুর পর জনৈক উত্তর ভারতীয়কে বলতে শুনেছি ‘শর্মাজি বহুৎ বড়ে হস্তী থে’। কে বা কারা এই গজ ও হস্তী?— সমগ্র বেদে মাত্র পাঁচবার ‘হস্তী’ শব্দটিকে পাওয়া যায়। সায়ণাচার্য তাঁর বেদভাষ্যে এর মধ্যে তিনটি ক্ষেত্রে ‘হস্তী’ শব্দের অর্থ বলেছেন— ‘হস্তযুক্ত ঋত্বিক্’ ও ‘পদযুক্ত ঋত্বিক্’। ‘ঋত্বিক্’ শব্দের অর্থ ‘যিনি ঋতুতে (সুযোগ্যকালে) যজ্ঞ (কর্মযজ্ঞ) করেন’। এখানে হস্ত/পদ-এর অর্থ হাত/পা হলে, যেহেতু ‘ঋত্বিক’ অবশ্যই এক শ্রেণির মানুষ, তাই ‘হস্তযুক্ত/পদযুক্ত’ শব্দবন্ধগুলি এক অর্থে ব্যর্থ বিশ্লেষণ হয়ে যায়।
‘হস্’ ধাতু থেকে হাস, হাস্য, হস্তী, প্রহসন শব্দগুলি এসেছে। সেই সূত্র ধরে অমরকোষ টীকায় পাওয়া যায় ‘হস্ত’ শব্দের একটি অর্থ, ‘প্রাধান্য হেতু অন্য অবয়বের প্রতি উপহাসক’। (প্রাণী শরীরেও হস্ত বা হাতের প্রাধান্য স্মর্তব্য।) আর ‘পদ’ শব্দের একটি বহুল অর্থ ‘ডেজিগনেশন’। এই পদের ‘সক্রিয়ভাবে (ঈ) বাহিত (ব)’ হয় পদবী শব্দ দ্বারা। অর্থাৎ কর্ম বা পরিচয়ে হস্তীগণ হল সমাজের ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ’।
আবার ঋগ্বেদের বাকি দুটি ক্ষেত্রে হস্তীকে তুলনা করা হয়েছে ‘মৃগে’র সঙ্গে। শ্রদ্ধেয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ‘প্রাচীন বাংলার গৌরব’ গ্রন্থে অবশ্য বলেছেন— যেহেতু ‘বহিরাগত’ আর্যরা ভারতবর্ষে পা দেওয়ার আগে কখনও হাতি দেখেনি, সেই কারণে নাকি হাতিকে তারা ‘মৃগবিশেষ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু, এই ব্যাখ্যায় বেশ কিছু ঘাটতি আছে। প্রথমত, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে আর্যরা ‘বহিরাগত’; তবুও এই ভূখণ্ডে পা রাখা মাত্রই নিশ্চয় তারা বেদ রচনা করতে শুরু করেননি!
একটি মানবগোষ্ঠী শিকারি থেকে পশুপালক ও কৃষিজীবী হয়ে ওঠার মধ্যে যথেষ্ট সময় ছিল হাতি চেনার। দ্বিতীয়ত, হরিণ অর্থে মৃগের সঙ্গে হাতির আকারে আয়তনে স্বভাবে সাদৃশ্যের চেয়ে বৈসাদৃশ্য বেশি। সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কেবল হস্তীকে নিয়ে। হস্তীকে মৃগ বা হরিণ ধরে নেওয়াতেই সমস্যা। আসলে মৃগ শব্দটার ব্যুৎপত্তি অর্থ হল, যে অন্বেষণ করে/যাকে অন্বেষণ করা হয়। অথবা যে বিচরণ করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি সমাজের ‘বড়ে হস্তী’দের মধ্যে আজকের দিনেও প্রত্যক্ষ করা যায়।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, অমুক কাজটা ‘ঘটা’ করে সম্পন্ন হল। অভিধান চিন্তামণিকে অনুসরণ করলে আমরা দেখব, আড়ম্বর বা ঘটা শব্দের অর্থ নাকি ‘বহু হস্তির মেলনের/মিলনের নাম’! এদিকে পুরাণ অনুসারে অষ্টদিগজ হল অষ্টদিক রক্ষাকারী হস্তীগণ। দিক থেকে দিগগজ। পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ ঈশান বায়ু নৈঋত ও অগ্নি এই আট দিক রক্ষাকারী হস্তীরা হল ঐরাবত, অঞ্জন, সার্ব্বভৌম, বামন, সুপ্রতীক, পুষ্পদন্ত, কুমুদ ও পুণ্ডরীক।
এমনভাবেই বইটিতে শব্দ নিয়ে নানা কথা ছড়িয়ে রয়েছে। এগারোটি অধ্যায় নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই গ্রন্থটি। প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনে যে তথ্যসূচি রয়েছে সেটি আর একটি বইয়ের রসদ যোগান দেয়। লেখক সৌরভ মিত্রের জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলায়। বর্তমানে তিনি তথ্যপ্রযুক্তির লোক। নিয়মিত লেখেন নানা পত্রপত্রিকায়। তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের পর অবাক হতে হয়, একজন তথ্যপ্রযুক্তির মানুষ কী চমৎকারভাবে শব্দের ভেতর ও বাইরের নির্মাণের সৈনিক হয়ে উঠলেন। এইরকম বই বাংলা ভাষাকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ দেখাল। ভাষা নিয়ে ভাবনার অনেক পরিণতি ঘটাল। বইটির পিছনে থাকা সংক্ষিপ্ত গ্রন্থপঞ্জিটিও ভাষা গবেষকদের কাছে খুবই গুরুত্ব পাবে।
৩০৪ পাতার বইয়ে কয়েকটি মুদ্রণপ্রমাদ ছাড়া বইটি সর্বাঙ্গীন সুন্দর।

শব্দের ভিতর ও বাহির : এক আহাম্মকের ভাষাচর্চা
সৌরভ মিত্র
দ্য কাফে টেবিল
প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০১৯
মূল্য : ৩৫০ টাকা

মতামত জানান

Your email address will not be published.