বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২

বাঘ আমি দেখেছি ভারতের নানা বনে। শিকারও করেছি। তখনও ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্য হয়নি। বিহার, ওড়িশার বিভিন্ন জঙ্গল, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, আসাম ইত্যাদি জায়গায় জঙ্গলে বাঘের মুখোমুখি হয়েছি বহুবার। কিন্তু সেসব বাঘ দেখা এবং খৈরিকে দেখা সম্পূর্ণ আলাদা।

বুদ্ধদেব গুহ

সকালে পরোটা আর আলুচচ্চড়ি দিয়ে চা খেয়ে আমরা বেরোলাম। ওই বনবাংলোর উল্টোদিকেই একটি বড় পুকুরের পাশের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা গিয়েই একটি জলধারার কাছে পৌঁছলাম। তার ডানদিক দিয়ে একটি রাস্তা চলে যাচ্ছে সিমলিপাল অভয়ারণ্যেরই শেষ প্রান্তে। সেখানেও একটি বনবাংলো আছে। তবে সেখানে যেতে নদীটি পেরোতে হয়। কিন্তু আমরা তো মূল সিমলিপালে যাব, তাই সেদিকে না গিয়ে আমরা জলধারার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ভারি সুন্দর জলধারাটি বয়ে এসেছে সিমলিপালের গভীর থেকে। হয়তো জোরান্ডা বা বড়াইপানি বাংলোর পাশের প্রপাত থেকে এই নদীটির জন্ম। ঠিক জানা নেই। ভারি সুন্দর, নির্জন জায়গা। এদিকটা ফাঁকা। জঙ্গল নেই। মাথার ওপরে নীল আকাশের চাঁদোয়া আর ডানদিকে সবুজ অরণ্যের হাতছানি। কিছুক্ষণ সেখানে ঘোরাফেরা করার পরে আমরা আবার বাংলোয় ফিরে এলাম।
তার পরে স্নান সেরে, আর এক কাপ করে চা খেয়ে, আমরা কাল রাতে যে পথে গিয়ে বাংরিপোসির ঘাট পেরিয়েছিলাম, সে পথে এগোলাম। কিছুটা গিয়েই বিসোই। এটি পাহাড়ের ওপরের একটি মালভূমি। বিসোইয়ের ডানদিকে আর একটি বাংলো আছে, তার নাম জানি না। আমরা সেখানে না গিয়ে, সোজা এগিয়ে, কিছুক্ষণ পরে বাঁদিকে মোড় ঘুরে পাহাড়, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম জোশিপুরের দিকে।
চিকনকে বললাম, তুমি খৈরির কথা শুনেছ?
হ্যাঁ, শুনেছি। পড়েওছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় পড়েছি। খৈরি তো একটি বাঘের নাম।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছ। শক্তিও একবার এখানে এসে তৎকালীন বনপাল সরোজরাজ চৌধুরীর বাংলো থেকে খৈরিকে দেখেছিল। পরে অবশ্য আমারও দেখার সুযোগ হয়েছিল এবং চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে আলাপ করারও সুযোগ হয়েছিল। উনি আমার বন-জঙ্গলের পটভূমিকায় লেখা নানা উপন্যাস পড়েছিলেন। আমি যখন এসেছিলাম তখন খৈরি পূর্ণবয়স্ক বাঘ। বাঘ আমি দেখেছি ভারতের নানা বনে। শিকারও করেছি। তখনও ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্য হয়নি। বিহার, ওড়িশার বিভিন্ন জঙ্গল, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, আসাম ইত্যাদি জায়গায় জঙ্গলে বাঘের মুখোমুখি হয়েছি বহুবার। কিন্তু সেসব বাঘ দেখা এবং খৈরিকে দেখা সম্পূর্ণ আলাদা। পূর্ণবয়স্ক বাঘ গায়ের কাছে ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে, পায়ের সামনে বসে হাহ্ হাহ্ করে জিভ বের করে নিশ্বাস নিচ্ছে— এ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। খৈরিকে অবশ্য প্রতিপালন করতেন চৌধুরীসাহেবের স্ত্রী। মোটামতো কালাকোলো এক মহিলা। খৈরিকে তিনি সন্তানস্নেহে লালন করছিলেন।

বনপালের বাংলোর কাছেই একটি পাহাড়ি নদী ছিল, যার নাম খৈরি। সেই খৈরির বুকেই একটি ব্যাঘ্রশাবককে পেয়ে চৌধুরীসাহেব নিজের বাংলোয় এনে তাকে গৃহপালিত কুকুরের মতো করে বড় করেন। সেই খৈরি বড় হওয়ার পরেই বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে। তুমি হয়তো ইংরেজি সিনেমা দেখেছ, ‘বর্ন ফ্রি’ নামের। একজন আমেরিকান মহিলা একটি সিংহশাবককে খৈরির মতোই নিজের স্নেহে লালিতপালিত করে বড় করেন। বড় হওয়ার পরে সেই সিংহশাবকটি যখন ঋতুমতী হয় তখন প্রকৃতির কন্যাকে তিনি প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে দেন। যাতে সে অন্য দশটি সিংহীর মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। সেই শাবকটির নাম আজ আমার মনে নেই, সম্ভবত এলসা বা ওরকম কিছু ছিল।
খৈরিকে প্রথমবার দেখার পরে, আরও একবার সিমলিপাল গেছি। তখন খৈরি মারা গেছে এবং মিসেস চৌধুরীও মারা গেছেন। সন্ধের পরে জোশিপুরে গিয়ে পৌঁছেছিলাম গাড়ি চালিয়ে। সঙ্গে অবশ্য আমার একজন অনুচর ছিল, যে ভাল গাড়ি চালাত এবং ভাল রান্নাও করত। বনেজঙ্গলে এরকম সঙ্গীরই প্রয়োজন। গিয়ে দেখি, চৌধুরীসাহেব একা একা বসার ঘরে বসে একটি আট মিলিমিটার মুভি প্রোজেক্টরে ছবি দেখছেন। সিমলিপালের জঙ্গলে একটি হস্তিশাবক একটি গর্তে পড়ে গিয়ে আটকে যায়। তাকে উদ্ধার করে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বনকর্মীরা। তারই ছবি আট মিলিমিটার মুভি ক্যামেরায় তুলে রেখেছিলেন চৌধুরীসাহেব। সেই ফিল্মটি দেখছিলেন তিনি। তাঁর চেহারার এতটাই পরিবর্তন হয়েছিল যে তাঁকে চেনাই দায়। তিনি কিন্তু আমাকে দেখেই উল্লসিত হয়ে বললেন, বসুন বসুন। ছবিটা দেখুন। আপনার ভাল লাগবে।
ছবি দেখা শেষ হলে, হস্তিশাবকটির উদ্ধার সম্পন্ন হলে উনি বললেন, কোথায় উঠবেন? রাতে তো এখন জঙ্গলে ঢুকতে পারবেন না।
তাই তো ভাবছি। ডাকবাংলোয় ওরা বললেন যে জায়গা নেই। কারণ একদল আমেরিকান ট্যুরিস্ট এসেছেন। তাঁরা জঙ্গলের গভীর থেকে বেরিয়ে আজই এখানে এসে থাকবেন। কাল সকালে কলকাতার দিকে যাবেন, তাই আজ বাংলোয় জায়গা হবে না।
তাঁরা আজ আসছেন না। খবর পেয়েছি। আপনি স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন। আপনাদের সঙ্গে একজন রেঞ্জারকে দিয়ে দিচ্ছি, তিনি গিয়ে আপনাদের বাংলোয় সেটল করিয়ে আসবেন। অবশ্য আপনার ডাকবাংলোয় গিয়ে থাকার দরকারই বা কী! আপনি আমার সঙ্গে আমার বাংলোয় থাকুন।
কিন্তু আমি শুনেছিলাম, ওঁর স্ত্রীর এবং খৈরির মৃত্যুর পরে উনি বাংলোয় দুটি হায়নাকে রেখেছিলেন। এই হায়না জন্তুটি কিম্ভুত চেহারা এবং বিকট অট্টহাসির কারণে আমার চিরদিনই অপছন্দের। তার ওপর তারা যেহেতু স্ক্যাভেঞ্জার, পচাগলা মাংস খেয়ে জীবনধারণ করে, তাই তাদের গায়েও উৎকট গন্ধ। আফ্রিকার হায়নারা তো জীবন্ত মানুষ ধরেও খায়, যা আমাদের দেশের হায়নারা করে না। আমাদের দেশের হায়নারা মানুষখেকো নয়। কিন্তু সেকথা বললে চৌধুরীসাহেব আহত হতে পারেন মনে করেই আমি বললাম, ডাকবাংলোয় যদি জায়গা পাওয়া যায় তা হলে সেখানে গিয়ে থাকি আমরা, আপনাকে বিব্রত না করে।

বিব্রত কী! আমি তো একাই থাকি। আপনি বনজঙ্গল ঘোরা মানুষ, আপনি থাকলে গল্পগাছা করে দুয়েকটা দিন আনন্দেই কাটানো যেত।
তবু আমি ওঁকে এড়িয়ে গিয়ে বললাম, আমি তো একা নই, সঙ্গে একজন অনুচরও আছে। তাই আমরা বাংলোয় গিয়ে থাকি।
তারপরে চৌধুরীসাহেবের বাংলোয় চা খেয়ে, একজন লম্বা-চওড়া ফরেস্ট রেঞ্জারকে সঙ্গে করে আমরা ডাকবাংলোর দিকে এগোলাম। সেখানেও এক মনোরম সারপ্রাইজ় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
চৌধুরীসাহেবের কাছ থেকে আমার পরিচয় জেনে, ডাকবাংলো যাওয়ার পথে সেই রেঞ্জারসাহেব— যাঁর নাম আমার আজ মনে নেই— তিনি বললেন, আমার স্ত্রী আপনার খুব ভক্ত।
আমি বললাম, আপনার স্ত্রী বাংলা পড়েন?
রেঞ্জারসাহেব বললেন, পড়েন তো বটেই। তিনি কলকাতা থেকে একটি মেয়েদের কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রবল আগ্রহ।
একথা জানার পরে ওড়িয়াতেই কথা হচ্ছিল। ওড়িয়া ভাষাটা আমায় রপ্ত করতে হয়েছিল ওড়িশার বিভিন্ন বনেজঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে। উনি আমার সঙ্গে আলাপ করে খুবই আনন্দিত হলেন এবং বাংলোয় পৌঁছে আমার থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়ে, পকেট থেকে নোটবুক বার করে আমার অটোগ্রাফ নিয়ে বললেন, এটি আমার স্ত্রীকে দেব। তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হবেন।
চিকনকে বললাম, আরও একটি ঘটনার কথা বলি তোমায়। এই জোশিপুর শহরের কাছেই একটি হাতি ‘rogue’ হয়ে গিয়ে জোশিপুর বস্তির কাছে চলে আসে। খবর পেয়ে চৌধুরীসাহেব গিয়ে ট্র্যাঙ্কুলাইজ়ার গান দিয়ে হাতিটিকে গুলি করেন। তখনকার মতো ট্র্যাঙ্কুলাইজ়ড করে পরে তাকে আবার জঙ্গলে ফিরিয়ে দেবেন, এই মনোস্কামনা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ট্র্যাঙ্কুলাইজ়িং মেডিসিনের মাত্রা বেশি হয়ে যাওয়ায় হাতিটির ঘুম আর ভাঙে না। সেই অপরাধবোধে চৌধুরীসাহেব বহুদিন পীড়িত ছিলেন।
হাতিটি সেখানেই পড়ে থাকে শেষমেশ। শিয়াল ও শকুনে, গ্রামের কুকুরেও তাকে খুবলে খায়। সেই দুঃখবহ স্মৃতি চৌধুরীসাহেবকে এক গভীর অপরাধবোধে ক্লিষ্ট করেছিল। এই ঘটনার কথা উনি সবিস্তারে ইংরেজিতে লিখে রেখেছিলেন এবং যাতে অন্য কোনও বনকর্মীর এই ভ্রান্তি না হয়, সে জন্য সে লেখাটি ছাপিয়েও বনকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। আমাকেও সেই লেখার একটি কপি দিয়েছিলেন। সে সময়ে আমি বালিগঞ্জের পার্ক রোডের চিত্ররেখা অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। সেখান থেকে বছর পঁচিশ আগে যখন বিড়লা মন্দিরের পাশে সানি টাওয়ার্সের ফ্ল্যাটে চলে আসি, সে সময়ে সেই কপিটি আরও অনেক বইপত্রের সঙ্গে হারিয়ে যায়।
চিকন বলল, আমরা যারা আপনার গল্প-উপন্যাস পড়ি তারা তো এত কথা জানি না। নানা বনের আনাচকানাচ ঘুরে আপনার যত আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা, সেসবের কথা জানলে আপনার সব পাঠক-পাঠিকাই খুব খুশি হতেন।
সেটা ঠিক। আমাকে তো পাঠক-পাঠিকারা ভালবাসার গল্পের লেখক বলেই জানেন। আবার কিছু পাঠক আছেন, এক শিক্ষাবিদের মতো, যাঁরা কিঞ্চিৎ শ্লেষের সঙ্গে বলেন যে আমি চাঁদ-তারা-ফুল-প্রজাপতির লেখক।
তাই বলেন নাকি!
বলেনই তো। তিনি যদি নিজের মুখে বলতে পারেন, তবে অন্য পাঠক-পাঠিকারাও তো বলতে পারেনই।
অনেকখানি পথ গিয়ে জোশিপুরে ঢোকার আগেই বাঁদিকে একটি ফরেস্ট গেট দিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম। সিমলিপাল অভয়ারণ্যে। তবে ঢোকার আগে পথের ওপরের একটি ধাবাতে আমরা রুটি, তরকা দিয়ে আর্লি লাঞ্চ সেরে নিলাম। আমি একা থাকলে অন্য কথা ছিল। কিন্তু সঙ্গে শহুরে তরুণী সঙ্গী আছে। তার পক্ষে না খেয়ে থাকা কষ্টের হবে মনে করেই এই সিদ্ধান্ত নিলাম।
এই গেট দিয়ে বনে ঢোকার জন্য আলাদা পারমিশন লাগে। সেখানে বাংলোর রিজ়ার্ভেশনও দেখাতে হয়। সেসব আগেভাগেই করা ছিল। তাই তা নিয়ে কোনও সমস্যা হল না। রুটি, তরকা এবং লস্যি খেয়ে আমরা বনের মধ্যে ঢুকলাম।
বনে ঢুকে, পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা লালমাটির পথে গাড়ি চালিয়ে বিকেল বিকেল আমরা চাহলা বাংলোয় গিয়ে পৌঁছলাম। আগে এখানে একটিই বাংলো ছিল। মূল বাংলো। সে বাংলোতেও আমি আগে এসে থেকেছি। এখন বাংলোর পাশে কয়েকটি কটেজ বানানো হয়েছে। একসারি ইউক্যালিপটাস গাছও আছে। ট্যুরিস্টদের থাকার বন্দোবস্ত আছে। চাহলার চৌকিদারেরা আমার কাগজপত্র দেখে সেই কটেজেরই মধ্যে একটি বড় কটেজে আমায় উঠতে বলল।
আমাদের সামান্য মালপত্র গাডি় থেকে নামিয়ে, গাড়িটিকে গাছতলায় পার্ক করে রেখে আমরা কিছুক্ষণ বাংলোয় আরাম করব বলে ঠিক করলাম। বিকেলে উঠে চা খেয়ে চিকনকে নিয়ে বাংলোর চারপাশ ঘুরিয়ে দেখাব।

বিকেলে উঠে চা খেয়ে, চিকনকে সঙ্গে নিয়ে বেরোলাম মূল বাংলোর দিকে। সিমলিপাল অভয়ারণ্যের প্রত্যেকটি বাংলোর চতুর্দিকে পরিখা খোঁড়া আছে। যেমন পরিখা প্রাচীনকালে ইউরোপের সব দেশের দুর্গগুলির চারপাশে খোঁড়া থাকত। সেই পরিখার ওপর দিয়ে গেট থাকত। সেই গেট উঠিয়ে নেওয়া যেত বাইরের শত্রুর আক্রমণের সময়ে। পরিখায় যথেষ্ট জল থাকত যাতে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা সহজে দুর্গ আক্রমণ না করতে পারে।
সিমলিপালের বাংলোগুলির পরিখায় জল থাকত না। পরিখাগুলি খোঁড়া হয়েছিল হাতি ঠেকানোর জন্য। এই বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা এতই বেশি যে হাতিরা যাতে বনবাংলোর চত্বরে ঢুকতে না পারে সেজন্য এইভাবে পরিখা খোঁড়া থাকত। তার ওপরে যে সেতু থাকত সেগুলি মানুষ অথবা ছোট গাড়ি বা জিপের যাওয়ার জন্য উপযুক্ত হলেও হাতির তা দিয়ে পেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকত না। কারণ সেই সেতু হাতির ওজন নিতে অপারগ ছিল।
চিকন শুধোল, চাহলা শব্দের কি কোনও মানে আছে?
আছে। ওড়িয়াতে ‘চহ লা’ মানে ‘টলি গ্যলা’। তার মানে— টলে গেল। এই পুরো সিমলিপাল আগের করদ রাজ্য ময়ূরভঞ্জের অন্তর্গত। চাহলা ছিল ময়ূরভঞ্জের রাজার শিকার-গড়। রাজা প্রতিবছর দেশ-বিদেশের নানা অতিথিদের নিয়ে এখানে আসতেন শিকারের জন্য। ময়ূরভঞ্জের রাজাদের পদবী হল ভঞ্জ দেও।
একবার শীতের সময়ে অনেক সাহেব, মেমসাহেবের সঙ্গে রাজা এসে শিকারের জন্য এখানে হাঁকোয়া বা ছুলোয়া বা ইংরেজিতে যাকে বলে beating করে শিকারের বন্দোবস্ত করেছেন। শিকারিরা বিভিন্ন মাচায় বসবেন এবং প্রজারা পূর্বনির্ধারিত জায়গা থেকে জানোয়ারদের তাড়িয়ে আনবে এমনভাবে যাতে জানোয়ারেরা সারিবদ্ধ মাচার নীচ দিয়ে দৌড়ে যায়। এক একটি মাচার মধ্যে ব্যবধান থাকত, প্রায় ২৫-৩০ গজের মতো। যাতে একজন শিকারি গুলি করেও জানোয়ারকে ধরাশায়ী না করতে পারলে পরের মাচার শিকারি তা মারার সুযোগ পান।
সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা করে ছিল। শীতের সময়ে আমাদের দেশে বৃষ্টি সচরাচর হয় না কিন্তু সকাল থেকে সেদিন দুর্যোগের ঘনঘটা এবং ছুলোয়া চলাকালীনই প্রবল বর্ষণ আরম্ভ হল সেদিন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড বর্ষণের সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও আরম্ভ হল। সেই বড় বড় শিলার আঘাতে শিকারিদের মধ্যে নারী-পুরুষ অনেকেই মারা গেলেন। সবাই বলল, ‘রাজার আসান টলি গ্যলা।’ সেই থেকেই এ বাংলোর নাম হল চহ লা। তা থেকেই চাহলা। এখনও স্থানীয় মানুষরা বিশ্বাস করেন, এই বাংলোতে এবং তার চারপাশে কোনও প্রাণী হত্যা করলে, এমনকি গাছের গায়ে কুঠার দিয়ে আঘাত করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়ে যাবে। তখন থেকেই চাহলা শিকারের বাংলো হিসেবে পরিত্যক্ত হল।
চিকন বলল, চাহলার পরে আমরা আর কোন কোন বাংলোয় যাব?
বললাম, যাওয়ার মতো বাংলো তো আছে অনেকই। কিন্তু তোমাকে তো সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারব না। কারণ এখন বনবিভাগ খুব কম বাংলোতেই পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি দেয়। বেশিরভাগ বাংলোই সিমলিপাল টাইগার প্রোজেক্টের কোর এরিয়ার মধ্যে পড়ে। এবং কোর এরিয়াতে লোকজন গেলে বাঘেদের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এবং সিমলিপাল যেহেতু একটি টাইগার প্রোজেক্ট, সেখানে বাঘেরাই অগ্রাধিকার পায়।

চিকন বলল, আপনি কোনও বাংলোয় গেছেন যেখানে আমি যেতে পারব না?
সে তো অনেক বাংলোই। যেমন, ধুধুরুচম্পা, বরাকামরা, ভঞ্জুবাসা, বাছুরিচরা— আরও কত বাংলো। এখন নামই মনে পড়ছে না। পরে যখন পড়বে, তোমায় বলব। সিমলিপালে আসার প্রধান বাধা বনবিভাগের আইনকানুন নয়। তা হল, ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। স্থানীয় মানুষরা বলেন ব্রেন ম্যালেরিয়া। ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হলে বাঁচাই মুশকিল। এই ম্যালেরিয়া হলে মাথায় এমন যন্ত্রণা হয় যে মনে হয় মাথাটা গুঁড়িয়ে যাবে। অনেকের স্মৃতিশক্তিও বিঘ্নিত হয়ে যায়। আবার অনেকের মস্তিষ্কে আরও নানা গুরুতর অসুখ হয়ে যায় এবং মানুষকে সারাজীবনের মতো অসুস্থ করে দেয়। মারাও যান অনেকে। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্যের ব্যাপার।
আপনি যে এতবার এখানে এসেছেন, আপনার একবারও ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়নি?
হয়েছিল বইকী। দু’বার হয়েছিল সিমলিপালে এসে আর একবার হয়েছিল ওড়িশারই লবঙ্গীর জঙ্গলে গিয়ে। আমার একটি উপন্যাস আছে, তার নাম ‘লবঙ্গীর জঙ্গলে’। সেটি ‘পারিধি’ উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড। পারিধি, পরিধি নয় কিন্তু। ওড়িশার উঁচু পাহাড়ি এলাকায় এক উপজাতির বাস, তাদের নাম খন্দ্। গোন্দ নয় কিন্তু। গোন্দ আদিবাসীরা থাকেন মধ্যপ্রদেশে। এই খন্দ্ উপজাতি ভাষায় পারিধি শব্দের অর্থ মৃগয়া। আমার পারিধি উপন্যাস বেরোনোর পরে অনেক পাঠক বলতেন, বুদ্ধদেব তো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বাংলা ভাষার জানেটা কী! পরিধি বানানটাও জানে না।
আপনি কী করতেন? প্রতিবাদ করতেন না?
জনে জনে গিয়ে কি প্রতিবাদ জানানো যায়? না না, আমি পরিধি বানান জানি, এটা অন্য শব্দ পারিধি— এমন করা তো সম্ভব ছিল না! বাবা-মা নাম দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব, অনেকে বলতেন নামটা ভুল। হওয়া উচিত ছিল বুদ্ধুদেব। সেই জন্যই পরিধি পারিধি হয়েছে।
আপনি নিজেকে নিয়ে এত মজা করতে পারেন না!
নিজেকে নিয়ে যে মানুষ মজা না করতে পারে তার মনুষ্যত্বে কিছু গোলমাল আছে। এটা অবশ্য আমার ধারণা।
তা তিন-তিনবার এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আপনি বাঁচলেন কী করে!
সেটা আমি নিজেও জানি না। হয়তো ঈশ্বরের দয়ায়।
তা আমায় আর কোন কোন বাংলোয় নিয়ে যাবেন?
তোমায় নিয়ে যাব বড়াইপানিতে, যেখানে ভূত আছে। নিয়ে যাব জোরান্ডায়, সেখানেও ভূত আছে। আর সব শেষে সিমলিপাল ছেড়ে যাওয়ার আগে নিয়ে যাব গুড়গুড়িয়ায়।
গুড়গুড়িয়া? এ আবার কেমন নাম?
কেন, নামটা খারাপ কীসে? বেশ তো কাব্যিক নাম।

আমায় হাতি দেখাবেন তো? এত কষ্ট করে এত দূরে এসে যদি হাতিই না দেখা গেল, তা হলে এসে লাভ কী হল!
তুমি দেখছি টিপিক্যাল কলকাত্তাইয়া ট্যুরিস্ট। যারা বনজঙ্গলে ঘুরতে এসে শুধু হাতি, বাঘ আর হরিণই দেখতে চায়, আর দেখতে না পেলে আসাটাই বৃথা হল বলে মনে করে। প্রকৃতির মধ্যে আসাটাই তো একটা মস্ত লাভ, মস্ত পাওয়া। আর যে সময়ে তুমি এসেছ, এর চেয়ে ভাল সময় বনেজঙ্গলে আর আসে না। ফাল্গুনের শেষ, চৈত্রের প্রথম। ‘শুকনো পাতা কে যে ছড়ায়, কোন দূরে, কোন দূরে…’ শুকনো পাতা ঝরে যাচ্ছে মাটির ওপর দিয়ে, পাথরের ওপর দিয়ে, খসখস শব্দ করে। দুরন্ত চৈতি হাওয়া তাদের ঝাঁট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। আবার কিছু গাছে নতুন পাতা এসেছে। সেসব পাতার কী বাহার! পাতা না ফুল, অনভিজ্ঞের পক্ষে তা বোঝা পর্যন্ত সম্ভব নয়। ‘কুসুম বনে’ শব্দটা রবীন্দ্রনাথের বহু গানে, লেখায় তোমরা হয়তো পড়ো। কিন্তু কুসুম গাছ যে না দেখেছে সে বুঝবে না। এই বসন্তকালে যখন কুসুম গাছে নতুন পাতা আসে, তার রং হয় মাছের রক্ত ধোয়া লাল। যে জানে না সে এই পাতাকেই ফুল বলে মনে করে। কী নরম, পষ্পী সে ফুল। কত গাছগাছালি, পাখপাখালি, কত অজস্র গন্ধ ভরা বনফুল। কত পাখির সহর্ষ কলকাকলি— তা যারা না দেখেছে বা শুনেছে তারা ভারতবাসী হয়েও অভাগা।
বুঝলে চিকন, আমার দেশের মতো সুন্দর দেশ পৃথিবীতে আর নেই। আমার প্রথম যৌবনে যখন প্রায়ই ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগ অঞ্চলে শিকারে যেতাম এবং গিয়ে থাকতাম আমার এক বন্ধুর বাড়িতে, তখনকার কথা মনে গেঁথে আছে। হাজারিবাগ শহরে বড়া মসজিদের সামনে একটি অপরিসর গলিতে এক জুতোর দোকানি ছিলেন। তাঁর নাম ছিল মহম্মদ নাজিম। তিনি আমার বহু লেখায় এসেছেন। এবং আমার উপন্যাস ‘মাধুকরী’-র সাবির মিঞা— তাঁর আদলেই রচিত।
এই মহম্মদ নাজিম ছিলেন এক আশ্চর্য মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বিশেষ করেননি। কিন্তু উর্দুটা খুব ভাল জানতেন। উর্দু শায়েরি উড়ত তাঁর মুখে মুখে। অতি কুশ্রী ছিল তাঁর মুখ। পানখাওয়া বড় বড় দাঁত, গোল গোল অদ্ভুত তাঁর দুটি চোখ, সে চোখদুটি আবার গাড়ির হেডলাইটের মতো ডিপার-ডিমার হত। উত্তেজিত হলে ডিপার হত, আবার উত্তেজনা প্রশমিত হলে ডিমার হয়ে যেত।
উনি বলতেন, ‌‌‌‌‌‘হাজারিবাগ ওয়ার্ল্ডকা সবসে বিটিফুল জাগা হ্যায়।’ আমি দু-দু’বার সুইৎজারল্যান্ড থেকে ওঁকে পিকচার পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলাম এই লিখে, যে ‘নাজিমসাব, ম্যায় স্রিফ ইতনা হি ক্যাহেনেকে লিয়ে ইয়ে খত ভেজ রহা হুঁ। বাত ইয়ে হ্যায় কি, হাজারিবাগ ওয়ার্ল্ডকা সবসে বেহতরিন জাগা হ্যায়।’ নাজিমবুড়ো সেই পিকচার পোস্টকার্ড সকলকে দেখিয়ে দেখিয়ে সগর্বে বলতেন, ‘লালাবাবুনে কেয়া লিখা সুইজারল্যান্ড সে! যো ম্যায় ক্যাহতা হ্যায়, ওহি ক্যাহেনেকে লিয়ে উয়ো উঁহাসে খত ভেজা। হাজারিবাগ ওয়ার্ল্ডকা সবসে বেস্ট জাগা হ্যায়।’
আমাদের দেশের চোত-বোশেখের বনপাহাড়, পাখপাখালি, গাছগাছালি যে দু’চোখ ভরে না দেখেছে বা না শুনেছে, তার জীবনই বৃথা। জীবনানন্দ বাংলাকে দেখেছিলেন দু’চোখ ভরে। তাঁর কাছে আমরা বাঙালিরা প্রত্যেকে ঋণী। কিন্তু বাঙালিদের বহু গুণের মধ্যে একটা প্রধান দোষ হল কূপমণ্ডুকতা। বাংলা আমাদের বাংলাই। প্রত্যেক বাঙালিই সেই কারণে গর্বিত। কিন্তু আমাদের এই মস্ত বড় দেশটার মধ্যে বাংলা ছাড়াও আরও কত রাজ্য আছে। সেসব রাজ্যবাসীরা জ্ঞানে-গুণে কিছু কম নয়। সেসব রাজ্যের সৌন্দর্যও আমাদের বাংলার চেয়ে কিছু কম নয়। ঔদার্য এবং খোলা মন নিয়ে পুরো দেশকে দেখতে পারলে, জানতে পারলে ভারতবর্ষ দেশ হিসেবে আরও অনেক সমৃদ্ধ হত।
আসাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, তামিলনাড়ু, আন্দামান, পণ্ডিচেরী, কর্ণাটক, মহীশূর ইত্যাদি জায়গা আমি খুব ভাল করে দেখেছি। তবে এখনও আমার অদেখা আছে পাঞ্জাব, হিমাচলপ্রদেশ, অরুণাচল, মিজোরাম— এই ক’টি জায়গা। ওড়িশা থেকে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার হাত থেকে বেঁচে এসেছি। কিন্তু বুড়ো বয়সে এই ম্যালেরিয়ার ভয়েই অরুণাচল, মিজ়োরাম যাওয়ার সাহস করে উঠতে পারিনি। আর ক’দিনই বা বেঁচে আছি, আর যাওয়া হবে বলে মনে করি না।

অঙ্কন : মৃণাল শীল

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৫

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৬

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৭

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৮

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৯

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১০

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১১

৭ Comments
  1. Arindam Batabyal says

    Ashadharon..as usual

  2. Anindya Ray says

    ধন্যবাদ সুখপাঠ।

  3. Dr Asutosh Sarkar says

    খুব সুন্দর লেখা

  4. Avinanda Pal says

    Ami unar ekjon gunomugho vokto. Ei pahar jolgol prokriti prem unar hat dhorei. Sei kon choto boyose babli porechilm. Tarpor lobongir jongole,koyeler kache, nogno nirjone, pamri, kojagor, gamhargungi, ektu usnotar jonyo. Duti uponyas, avilash, oboroho, chaprash sob sob porechi. R mugho hoe gechi. Ei golpe noyok lekhok nije. Tai eta bisesh vabe anobodyo. Next part ta porar opekhay adhir hoe roilam

  5. Mousumi Manna says

    Anabadya lekha..

  6. TaritBaranMukhopadhyay says

    অনবদ্য। খুব ভালো লাগলো।

  7. Ranjan Basu says

    অনবদ্য, একবারে না পড়লে কেমন যেন নিজেকে অভুক্ত লাগে

মতামত জানান

Your email address will not be published.