বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪৫

সভ্য হয়েছিলাম নেতাজির বাড়ির পাশে উডবার্ন পার্কের বিখ্যাত টেনিস ক্লাব ক্যালকাটা সাউথ ক্লাবে। কাজ এবং পড়াশোনার জন্য আমি বিকেলে বা রাতে টেনিস খেলতে পারতাম না। তবে রোজ সকালে আমি সেই ক্লাবের হার্ড কোর্টে টেনিস খেলতাম।

বুদ্ধদেব গুহ

আমার জীবনে প্রথম বড় গদ্য লেখা আলমোড়া থেকে ফিরে আসার পরে। সে উপন্যাসের নাম দিয়েছিলাম ‘আলমোড়ার চিঠি’। সেটি লেখা হওয়ার পরে আমার কলেজের সাহিত্যমনস্ক দশ-বারোজন বন্ধুকে কনীনিকা বাড়িতে ডেকে লেখাটি শুনিয়েছিলাম। মা তাদের জন্য কড়াইশুঁটির চপ, পান্তুয়া এবং চা বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন। লেখাটি শোনার পরে তারা সকলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল, লেখ লেখ। তোর আরও লেখা উচিত। এটা ছাপতে দে কোথাও। আমি বললাম, আমার ইচ্ছেতেই কি ছাপা হবে? কেই-বা বা আমায় চেনে। তবে তাদের প্রশংসার কারণ আমার লেখা না আমার মায়ের হাতের চপ-মিষ্টি, তা আজও জানি না। কয়েক বছর পরে যখন আমি লিখতে শুরু করেছি তখন এক ম্যাগাজিন আমার কাছে লেখা চেয়েছিল, এই লেখাটি দিয়েছিলাম। নাম বদলে করেছিলাম ‘অনুমতির জন্য’। কারণ নায়িকার নাম ছিল অনুমতি সেন।
কলেজে পড়ার সময়ে আমি গদ্যর চেয়ে কবিতা লিখতাম বেশি। বিশেষ করে ঋতুকে ভালবাসার কারণে বাড়িতে আমার নিগ্রহ শুরু হওয়ার পর থেকে কবিতাই ছিল আমার আশ্রয়। আমার প্রথম বই কবিতার বই, খুব কম মানুষই তা জানেন। পাতলা বইটির প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন বিখ্যাত শিল্পী শ্যামল দত্তরায়। তাতে অল্প ক’টি কবিতা ছিল। প্রতিটি কবিতাই কাউকে না কাউকে উৎসর্গ করা ছিল। যেমন মোহরদিকে, আমার বন্ধু দীপক চক্রবর্তীকে। শেষ কবিতাটি ছিল আমার মাকে উৎসর্গ করা। কবিতাটি আজ আর পুরো মনে নেই, তবে কয়েকটি পঙ্‌ক্তি মনে আছে। ‘খোকন তোমার নিখাদ সোনায় মোড়া। বোবা মেয়ের একটু সোনা নয়, আজকে আমি ঝড়ের বুকে একা, ভুল করোনি জানো কি নিশ্চয়?’ এই কবিতায় মায়ের প্রতি আমার গভীর অভিমান প্রকাশ পেয়েছিল।
সেই সময়ে দেশ পত্রিকায় আমার কবিতা বেরিয়েছিল। সেই একবারই। পরে আর লিখিনি। সেই কবিতাটির নাম ছিল ‘শান্তিনিকেতনের একজনের ছবি’। তবে যখন ছাপা হয়েছিল, ওঁরা নামটি বদলে করেছিলেন ‘ছবি’।
চিকন বলল, সেই কবিতা আপনার মনে আছে? বলুন না।
কবিতাটি ছিল ছোট্ট, যেটুকু মনে আছে বলি। ‘যতবার আঁকলাম, মুছলাম তার চেয়ে বেশি। চোখ, চিবুক, নাক, সব একই আছে। হারিয়ে গেছে শুধু ভাবনাটুকু’।
দীপক একদিন উত্তেজিত হয়ে ফোন করে বলেছিল, তুই দেশে কবিতা পাঠিয়েছিলি?
হ্যাঁ। কেন বল তো?
তোর কবিতা ছাপা হয়েছে।
আমি দেশ নিতাম কিন্তু ও বলার পরে দেখলাম। তবে দেখার পরেও উত্তেজনা আমায় নিজের মধ্যেই চেপে রাখতে হল। কারণ আমার বাড়িতে আমার লেখা বা গান নিয়ে কারও উৎসাহ ছিল না।

বাবা শিশুকাল থেকেই বাড়িতে বসে কোনও কিছু খেলা খুব অপছন্দ করতেন। তাস, দাবা, ক্যারম, লুডো— এসব কোনও খেলাই তিনি খেলতে দিতেন না। বলতেন, খেলতে হলে মাঠে গিয়ে খেলো। ক্রিকেট খেলো, হকি খেলো, ভলিবল খেলো। কিন্তু বাড়িতে বসে খেলবে না। বাড়িতে কোনও বন্ধুবান্ধবও আসা চলবে না। তুমিও কোনও বন্ধুর বাড়ি যাবে না।
আমি যখন স্কুলে পড়তাম, রাস্তায় গ্যাসের বাতি ছিল, ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না। বাবা বলতেন, গ্যাসের বাতি জ্বলার আগে বাড়ি ফিরবে। খুব শাসন ছিল আমার ওপর। আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার এই শাসন শাপে বর হয়েছে। আমি এমনিতে অন্তর্মুখী ছিলাম কিন্তু সে অন্তর্মুখিতা যে কোন দুর্বল মুহূর্তে গানের দিকে, লেখার দিকে, ছবি আঁকার দিকে প্রবাহিত হয়ে গেছিল তা নিজেও বুঝতে পারিনি। আমার বইয়ের আলমারি যেদিন পরিষ্কার করতে বসতাম সেদিন পরিষ্কার করতে করতে আমার সংগৃহীত সব বই আবার নতুন করে উল্টেপাল্টে দেখতাম ও পড়তাম। এই করে অ্যাকাউন্ট্যান্সি ও ল-এর ছাত্র হয়েও প্রচুর গদ্য ও কবিতা পড়ে ফেলার সুযোগ আমার হয়েছিল। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘হরিণ চিতা চিল’ কাব্যগ্রন্থ আমার প্রিয় বই ছিল। তখন তরুণ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘নীল নির্জন’ বইটি আমার প্রিয় ছিল। জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা, ধূসর পাণ্ডুলিপি’ ইত্যাদি বহু বই আমার প্রিয় ছিল। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘অর্কেস্ট্রা’ বইটিও ভাল লাগত কিন্তু শব্দ নিয়ে ওঁর কঠিন খেলা সবসময় সহজপাচ্য হত না। বুদ্ধদেব বসুর মাধ্যমেই জার্মান কবি রিলকে এবং ফরাসি কবি বোদলেয়ারকে জেনেছিলাম।
চিকন, তুমি তো কমপ্যারেটিভ লিটারেচার নিয়ে এমএ পাশ করেছ, তুমি হয়তো জান না, এই ডিপার্টমেন্টের পত্তন করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নরেশ গুহ এবং আরও অনেকে। আমার বন্ধু দীপক ও নবনীতা ওঁদের প্রথম দিকের ছাত্র। তখন অমিয় দেব, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখরাও ওঁদের সতীর্থ ছিলেন। নবনীতা যদিও আমাদের সঙ্গেই স্কুল ফাইনাল পাশ করে, তবে ও ভর্তি হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজে। আমি ভর্তি হই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখানে আমার সহপাঠী ছিল দীপক চক্রবর্তী। আর একজন ছিল সাহিত্যে উৎসাহী, অরুণ দাম। যে পরবর্তীকালে গায়িকা পূর্বাকে বিয়ে করে। পূর্বার পদবি ছিল সিনহা, অরুণকে বিয়ে করে ও পূর্বা দাম হয়।
জীবনে ভাল কাজ খুব কমই করেছি। তার মধ্যে একটি হল, সাম্প্রতিক অতীতে অ্যালজাইমার্সে শয্যাশায়ী পূর্বার সাহায্যকল্পে আমি শিশির মঞ্চে একটি একক অনুষ্ঠান করে, গান, গল্পকথার মাধ্যমে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে অরুণকে দিয়েছিলাম। এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল টেগোর সোসাইটি, সেখানে জর্জদা অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাসের অনেক ছাত্রছাত্রী ছিলেন। তাঁরা অনুষ্ঠানের শেষে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে এসেছিলেন অরুণকে।
পাঁচের দশকের গোড়ায় প্রেসিডেন্সির ছেলেমেয়েরা এবং সেন্ট জেভিয়ার্সের ছেলেরা মিলে একটি পত্রিকা প্রকাশ করত, যার নাম ছিল ‘সংলাপ’। এই পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত ছিল নবনীতা এবং অরুণ। আমি আর দীপকও সে পত্রিকায় লিখতাম। সেই সুবাদেই নবনীতার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। নবনীতা ছিল কবি নরেন্দ্র দেবের মেয়ে। নবনীতার মা ছিলেন রাধারানি দেবী। আমার বড়মামা ছিলেন সুনির্মল বসু, সে সময়ের বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও অত্যন্ত ভাল কবি। বড়মামার সঙ্গে নরেন দেব মশাইয়ের ভালই যোগাযোগ ছিল। সেই সুবাদেও আমি নবনীতার মা ও বাবাকে চিনতাম। নবনীতার মা ছোটখাটো মহিলা ছিলেন, বেশ সুন্দরী। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে প্রীতির চোখে দেখতেন। রাধারানি দেবী দেশে একটি বড় ধারাবাহিকও লিখেছিলেন শরৎবাবুকে নিয়ে।

আমার বইয়ের আলমারি পরিষ্কার করতে করতে যেসব বই প্রায়ই বেরিয়ে পড়ত, তার মধ্যে দুটি কবিতার বইয়ের কথা আমি উল্লেখ করব বিশেষ করে। একটি রাজলক্ষ্মী দেবীর কবিতার সংকলন ‘ভাব ভাব কদমের ফুল’ আর একটি কবিতা সিংহের লেখা ‘সহজ সুন্দরী’।
চিকন বলল, আমরা যেদিন প্রথম সিমলিপালে এলাম সেদিন হাটগামারিয়ার হাটে ঘুরতে ঘুরতে আপনি রাজলক্ষী দেবীর এই বইটির কথা বলেছিলেন। ওঁকে নিয়েও অনেক কথা বলেছিলেন।
হ্যাঁ বলেছিলাম। তোমার মনে আছে জেনে ভাল লাগল। রাজলক্ষী দেবী ছিলেন মহাশ্বেতাদির বান্ধবী। পরবর্তী সময়ে সুবোধ সরকারের স্ত্রী মল্লিকা সেনগুপ্ত ও কৃষ্ণা বসু নারীবাদী কবি হিসেবে খ্যাত হয়েছিলেন। তবে কবিতা সিংহের মতো নারীবাদী কবি আমি কমই দেখেছি। তাঁর কবিতাগুলি ছিল অসাধারণ। কবিতা সিংহ আকাশবাণীতে কাজ করতেন। তখন আমার প্রায়ই নেমন্তন্ন থাকত আকাশবাণী থেকে, গল্প পাঠের জন্য। তখন কবিতা সিংহের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। কবিতার স্বামীও ছিলেন অসম্ভব গুণী মানুষ, বিমল রায়চৌধুরী। যাঁরা তাঁকে জানতেন তাঁরাই জানেন সে কথা।
বাবা যে আমায় ঘরে বসে খেলতে দেননি, বাইরে বেরোতে বলতেন, সেই পিতৃবাক্যই হয়তো আমার খেলাধুলোর অদম্য বাসনার পেছনে কাজ করত। বিকম পাশ করার আগেই আমি দেশপ্রিয় পার্কের দক্ষিণ কলিকাতা সংসদের লনে টেনিস খেলতাম। সে কথাও আগেই বলেছি। যখন আমি, বাবা এবং বর্মণকাকু মালঞ্চের কাছে পাখি শিকারে গিয়ে তালের ডোঙা উল্টে পকাৎ করে পড়ে গেছিলাম তখন নাক অবধি জল ঠেকলেও প্রাণে বেঁচে গেছিলাম। তাই বিকম পড়ার সময়ে আমি ঢাকুরিয়ার অ্যান্ডারসন ক্লাবে সাঁতার শিখি। বিকম পাশের পরে ঢাকুরিয়া লেকেরই লেক ক্লাবে রোয়িং করার জন্য মেম্বার হই। স্কাল ছাড়া অন্য সব নৌকাই নিয়মিত চালিয়েছি আমি সকালে অথবা সন্ধেয়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায়। রোয়িংয়ের মতো ভাল এক্সারসাইজ় খুব কমই আছে। লেকের মধ্যে পানকৌড়ি ভরা ছোট ছোট দ্বীপগুলির পাশ দিয়ে নৌকা চালিয়ে যেতে ভারি ভাল লাগত। লেকের পাড়ে বসে থাকা বৃদ্ধ,-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতীরা যখন সাদা শর্টস আর সাদা গেঞ্জি পরা আমাদের দেখতেন তখন খুব রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। তবে তারও আগে আমার ক্লাব ছিল সাউথ ক্যালকাটা রাইফেল ক্লাব। স্কুলে পড়ার সময়ে যখন সেখানে যেতাম। তখন গুলিভরা বন্দুক আমাদের দেওয়া হত না। আমরা ফাঁকা বন্দুক বা এয়ার রাইফেল নিয়ে শ্যাডো প্র্যাকটিস করতাম। পরবর্তীকালে সেই ক্লাবেই পিস্তল ছুড়েছি নিয়মিত। সে ক্লাবটি তখন ছিল টালিগঞ্জের গল্‌ফ ক্লাব রোডের মোড়ে, পুলিশের দখল করা এলাকায়। কিন্তু নকশাল আন্দোলনের সময়ে সেখানে পুলিশ অফিসারদের কোয়ার্টার বানানো হলে সে ক্লাব উঠে যায় পিজি হসপিটালের পাশে, পুলিশ রেঞ্জে। সেখানেও আমি গিয়েছি কিন্তু গল্‌ফ ক্লাব রোডে থাকাকালীন আমি প্রতি রবিবার সকালে অবশ্যই যেতাম পিস্তল ছুড়তে। তার পরে সভ্য হয়েছিলাম নেতাজির বাড়ির পাশে উডবার্ন পার্কের বিখ্যাত টেনিস ক্লাব ক্যালকাটা সাউথ ক্লাবে। কাজ এবং পড়াশোনার জন্য আমি বিকেলে বা রাতে টেনিস খেলতে পারতাম না। তবে রোজ সকালে আমি সেই ক্লাবের হার্ড কোর্টে টেনিস খেলতাম। সে সময়ে জয়দীপ মুখার্জি, প্রেমজিৎ লাল, বিনয় ধাওয়ান, নরেশ কুমার, আখতার আলি, তাঁর ছোটভাই আনোয়ার এবং আরও অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়।
একদিন অফিস থেকে বেরোচ্ছি, রাত প্রায় আটটা, নীচে নেমে দেখি আখতার।
আরে গুহাসাব, আপকো কেয়া হো গ্যয়া? আপ বিলকুল আতা নেহি! ম্যায় জানতা আপ কামমে ফাঁসা হ্যায়, মগর টেনিস খেলিয়ে। ইউ উইল অলওয়েজ ওরি অ্যাবাউট ইয়োর ব্যাকহ্যান্ড। দুসরা শোচনেকা মওকা নেহি মিলেগা। আপ আইয়ে, উই মিস ইউ।

তার পরে স্ট্র্যান্ড রোডের বিখ্যাত ক্যালকাটা সুইমিং ক্লাবের সভ্য হই। সেখানে বিদেশিরাই কেবল সভ্য হতেন কিছুদিন আগে পর্যন্ত। কনসাল জেনারেল ও তাঁদের স্ত্রীরা আসতেন সাঁতার কাটতে। সেখানে দুটি পুল ছিল। ভেতরে একটি ঢাকা পুল, বাইরে খোলা। যত রাতই হোক, রোজ ক্লাবে গিয়ে পুলে নামতাম। জল তখনও গরম থাকত। সাঁতার কাটতে খুব ভাল লাগত। ক্যালকাটা সুইমিং ক্লাবের খাওয়াদাওয়া ছিল খুব ভাল। সেখানে এক স্টুয়ার্ড ছিলেন, তাঁর নাম মানু। মানু পি অ্যান্ড ও লাইনসের স্টুয়ার্ড ছিলেন। তখনকার দিনে খুব কম লোকই প্লেনে করে বিলেত যেত। জাহাজে যাওয়া একটা শৌখিনতা ছিল। সে যাওয়াটাই একটা হলিডে ছিল। পৃথিবীর সব সুখাদ্য জাহাজের ডাইনিংয়ে পাওয়া যেত। মানু যেহেতু সেই জাহাজের স্টুয়ার্ড ছিলেন তাই তাঁর ঝুলিতে ছিল এমন বহু পদ, যা আগে খাইনি। ঋতু এবং আমার মেয়েরাও এই ক্লাব পছন্দ করত। বিদেশ থেকে আমাদের অতিথি-অভ্যাগতরা এলে ঋতু এই ক্লাবেই নিয়ে যেত তাঁদের।
আগে আমি তো ন্যাশনাল ক্রিকেট ক্লাব ও ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের সদস্য ছিলামই। তার পরে মেম্বার হই ক্যালকাটা ব়্যাকেট ক্লাবের। বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম আর বড় গির্জার মাঝখানে সে ক্লাবে স্কোয়াশ খেলা হত। স্কোয়াশ হল পৃথিবীর দ্রুততম খেলা। আধ ঘণ্টা সে খেলা খেললে যে পরিমাণ ঘাম বেরোত তাতে আর কোনও এক্সারসাইজ়ের দরকার হত না। বহু আর্মি অফিসার, ক্রিকেটার, টেনিস প্লেয়াররা স্কোয়াশ খেলতে আসতেন ফিটনেসের জন্য। র‌্যাকেট ক্লাবের লেডিস চেঞ্জরুমে তো আমি কোনওদিন যাইনি, তাই কী ছিল আমি জানি না। কিন্তু জেন্টস চেঞ্জরুমে একটা বড় জায়গায় নুন থাকত। প্র্যাকটিস করে এসে সবাই দু-তিন চামচ করে নুন নিয়ে জলে গুলে খেত। এত ঘাম ঝরত, সেজন্য খেতে হত। সেখানে গুরুচরণ নামের এক মার্কার ছিলেন, ওড়িশার লোক, রোগা লিকপিকে। তাঁর যে কী অসাধারণ স্ট্যামিনা, সারাদিনে অত লোকের সঙ্গে কী করে খেলতেন তা আমি জানি না। ওঁকে দেখে আমি অবাক হতাম। ফ্রান্সিস নামে আরও এক ভাল মার্কার ছিলেন। তাঁরও বেজায় স্ট্যামিনা।
আমি পরে টালিগঞ্জ ক্লাবেরও মেম্বার হই। আনন্দবাজারের অভীক সরকার আমায় নিয়ে গিয়ে মেম্বার করেছিলেন। তখন ক্লাবের রেসিডেন্ট ডিরেক্টর ছিলেন বব রাইট। ববের স্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত ওয়াইল্ডলাইফ এন্থুজিয়াস্ট অ্যান রাইট। ওঁদের একমাত্র মেয়েও ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার, তাঁর নাম বেলিন্দা রাইট। ক্যালকাটা ক্লাবের অবশ্য সদস্য ছিলাম না আমি। জাস্টিস বিশু মিত্রর সঙ্গে যেতাম বছরে এক বার করে। আমার আর এক মক্কেল ছিলেন ওড়িশার শোনপুরের মহারাজা। ট্রাইব্যুনালের পরে উনি আমায় সেখানে নিয়ে গিয়ে লাঞ্চ খাওয়াতেন।
শোনপুরের রাজধানীর নাম ছিল বলাঙ্গির। সেখানেও অনেক জঙ্গল ছিল এবং তিনি শিকার করতেন। তিনি আমায় অনেক বার বাঘ মারার আমন্ত্রণ করেছিলেন। সে যাইহোক, ক্যালকাটা ক্লাবে ঝকঝকে করে পালিশ করা ঘণ্টা বাজালে আবদার এসে দাঁড়াত। সেখানকার বারের যাঁরা বেয়ারা তাঁদের বলা হত আবদার। আবদার এলে তিনি বলতেন, দো ছোটা স্কচ উইথ পানি, নো আইস। দুটো হুইস্কি খেয়ে আমরা ডাইনিংরুমে গিয়ে ডিনার খেতাম।
ক্যালকাটা ক্লাব তখন সত্যিই খুব সম্ভ্রান্ত ক্লাব ছিল। আজেবাজে লোকেরা মেম্বার হতেও পারতেন না। সে ক্লাবের স্ক্রিনিং কমিটি খুব কড়া ছিল। মেন হলে বহু মানুষ বসে থাকতেন, কেউ বই পড়তেন, কেউ হুইস্কি খেতেন। সকলে ফিসফিস করে কথা বলতেন। আজকের ক্লাবগুলির মতো তা মাছের বাজার ছিল না।

সত্যজিৎ রায় এই ক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁকে প্রোপোজ করেছিলেন তাঁর ভায়রাভাই, জে ওয়ালটার থম্পসন অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুভাষ ঘোষাল। এই প্রস্তাব কে সেকেন্ড করেছিলেন আমি জানি না। সুভাষদা অ্যাডভার্টাইজিং জগতের এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ ছিলেন। সত্যজিৎ রায়কে স্ক্রিনিং কমিটি ডেকেছিল ইন্টারভিউয়ের জন্য। তখনই ক্লাব থেকে বলে দেওয়া হয় ড্রেসকোড সম্পর্কে। ডার্কস্যুট পরে আসতে হত। স্ক্রিনিং কমিটির মেম্বাররাও ডার্কস্যুট পরে থাকতেন। তবে সত্যজিৎ রায় তো পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। এমনিতেই যথেষ্ট হ্যান্ডসাম মানুষ ছিলেন। কিন্তু সাহেবি পোশাকে তাঁর রূপ যেন আরও খুলে যেত। মানিকদা সেদিন বললেন, আমি স্যুট পরব না। ফলে ওঁকে মেম্বারই করা হল না। সত্যজিৎ রায় তখন বিশ্ববিখ্যাত মানুষ। তবু মেম্বার করা হল না তাঁকে। পরে ক্লাবের কর্তারা তাঁদের অপকর্মের কথা হৃদয়ঙ্গম করে ওঁকে চিঠি পাঠালেন যে পুনর্বিবেচনা করে সত্যজিৎ রায়কে মেম্বার করা হয়েছে। তবে সত্যজিৎ রায় বছরে এক-দু’দিনই আসতেন ক্লাবে। বিশেষ করে যেদিন ক্যুইজ থাকত সেদিন আসতেন। তিনি ধুতি-পাঞ্জাবি পরেই আসতেন। ধুতি-পাঞ্জাবি আর কালো রঙের লং কোট-প্যান্ট, এই অনুমোদিত ছিল ক্লাবে। সত্যজিৎ রায় ক্যুইজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। মঙ্কুমাসিও আসতেন। সকলে ক্যুইজ খুব এনজয় করতেন।
আমার সদস্য হওয়ার কথা বি সি মিত্র প্রোপোজ করেছিলেন এবং সেকেন্ড করেছিলেন শেলি দত্ত। তিনি আমাদের ক্লায়েন্ট বেঙ্গল ল্যাম্পের অফিসার ছিলেন। এইভাবেই পরে আমি ক্যালকাটা ক্লাবের মেম্বার হলাম। তার পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, বিখ্যাত ইএনটি ডাক্তার অমিতাভ রায় আমায় বললেন, এত বছর ধরে ক্যালকাটা ক্লাবে আমরা চিরকুমার সভা করতে পারিনি, কারণ গান গাওয়ার কেউ ছিল না। তুমি মেম্বার হয়েছ, এই বার আমরা চিরকুমার সভা করব। প্রতিবছরই পয়লা বৈশাখের আগের সন্ধেয় ক্যালকাটা ক্লাবের সদস্যরা মিলে একটি নাটক মঞ্চস্থ করত। সেটি আগে হত অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে। পরে ক্লাবের মেম্বারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হত বিড়লা সভাঘর হওয়ার পরে। রিহার্সাল হত ক্লাবের সেক্রেটারির কোয়ার্টারে, ক্লাবেরই মধ্যে। তার পরে প্রতি রবিবার হত অমিতাভদার ভবানীপুরের অ্যালেনবি রোডের বাড়িতে।
সেবার চিরকুমার সভা করেছিলাম। পরে একবার রবীন্দ্রপক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধে আবার করেছিলাম রবীন্দ্রসদনে। আরও পরে আর একটি নাটক করেছিলাম, অ্যান্টনি কবিয়াল। তাতে আমি ভোলা ময়রার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমার তখন কিঞ্চিৎ ভুঁড়ি ছিল ও আমি গান গাইতে পারতাম। এই দুই কারণেই আমায় ভোলা ময়রা করা হয়েছিল। সেই নাটক আবার মঞ্চস্থ হয়েছিল বিড়লা সভাঘরে।
সমস্ত ক্লাবের আমার গতিবিধি ছিল। এতসব ক্লাবে যে অ্যাকটিভ সদস্য ছিলাম, সব ক্লাবের সব খেলাতেই অংশ নিতাম। শুধু হুইস্কি খাওয়ার সদস্য ছিলাম না।
এসবই ষাটের দশকের গোড়ার কথা, বাবার কোম্পানির পার্টনার হওয়ার পরে।

অঙ্কন : মৃণাল শীল

(পরের পর্ব আগামী বুধবার)

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৫

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৬

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৭

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৮

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৯

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১০

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১২

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৪

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৫

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৬

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৭

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৮

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১৯

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২০

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২২

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৪

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৫

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৬

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৭

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৮

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২৯

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩০

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩২

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৪

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৫

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৬

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৭

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৮

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩৯

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪০

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪২

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪৪

Comments are closed.