বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

শ্রীধর আচার্য : এক বিস্মৃতপ্রায় গণিতবিদ

হাজার বছর আগে এক ভারতীয় পণ্ডিত নির্মাণ করে গেছেন গণিত শিক্ষার এক অসামান্য রূপরেখা। যা আজকের দিনেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্যালয়ে অঙ্ক শেখানোর এক সর্বজনগ্রাহী প্রকল্প হয়ে আছে। আবার আধুনিক ব্যাঙ্কিং পরিচালনা বা ক্রীড়াবিজ্ঞান বিশ্লেষণেও তাঁর সূত্র বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে।

অংশু ভট্টাচার্য

বিদ্যালয় শিক্ষার মাঝারি ক্লাসে শুরু হয় বীজগণিতের চর্চা। তারপর অঙ্কের এই শাখাটি আমাদের পড়াশুনার জীবনের এক অচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। অন্তত যতদিন পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া হয় অঙ্ক বা সম্পর্কিত বিষয়ে। যেসব বিষয়ের সংখ্যা মোটেই কম নয়, বরং ক্রমবর্ধমান। মোদ্দা কথা, বীজগণিত তথা অঙ্ক আমাদের সহজে ছাড়ে না।
এই বীজগণিতের শুরুতে আমরা কয়েকটা সাধারণ সূত্র শিখি। সেগুলো মনে রাখা বা কোনও সমস্যায় প্রয়োগ করা বিশেষ কঠিন নয় যদিও। যেমন (এ যোগ বি)-র বর্গ। কিছুদিন পরে শুরু হয়ে যায় একটু কঠিন অঙ্ক। যেমন দ্বিঘাত সমীকরণ বা কোয়াড্রাটিক ইকুয়েশন। যেখানে আছে এক অজানা রাশি এক্স, আবার আছে তার বর্গও, ax2 + bx + c = 0। এইরকম সমীকরণগুলির একটি সাধারণ সমাধানসূত্র ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হয়, যার প্রয়োগ চলতেই থাকে সারাজীবন।
বীজগণিত শিক্ষার শুরুতে আমরা জানি যে, এই শাখাটির সূচনা মধ্যপ্রাচ্যে অথবা মিশর দেশে এবং শুরুর দিকের সূত্রগুলো সাধারণত প্রাচীন গ্রিক গণিতজ্ঞদের তৈরি। কিন্তু দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানসূত্র আলোচনার সময় আমরা জানতে পারি, এর আবিষ্কারক একজন প্রাচীন ভারতীয় গণিতজ্ঞ। তাঁর নাম শ্রীধর আচার্য। আমরা আনন্দিত হই বীজগণিতে ভারতের অবদান দেখতে পেয়ে। যুগ যুগ ধরে এই দ্বিঘাত সমীকরণের তত্ত্ব ও তার সমাধান আমরা সবাই মনে রেখেছি শ্রীধরের সূত্র থেকেই।দ্বিঘাত সমীকরণের বীজের এই সূত্রটি শ্রীধর প্রকাশ করেন একটি ছন্দবদ্ধ শ্লোকের মাধ্যমে এবং তার পুথি বীজগণিতে এই শ্লোকটি লিপিবদ্ধ আছে বলে ধারণা। আমাদের অতীব দুর্ভাগ্য, এই বইটি আধুনিক কালে কখনওই পাওয়া যায়নি, কালের গর্ভে তা বিলীন হয়ে গেছে। শুধুমাত্র পরবর্তী কালের কয়েকজন গণিতজ্ঞ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর রচনায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন এই বিখ্যাত দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানসূত্র, সেটাও আসলে জানা যায় দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের লেখায়।
এই দ্বিঘাত সমীকরণ বা কোয়াড্রাটিক ইকুয়েশন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন আজকের জীবনে? কয়েকটা উদাহরণ দিলেন বোঝা যাবে। শুরু করি খেলাধুলার বিষয় দিয়ে। এই দ্বিঘাত সমীকরণের জ্যামিতিক রূপ আসলে একটি পরাবৃত্তীয় রেখা বা প্যারাবোলিক কার্ভ। এই ধরনের বক্ররেখার কিন্তু বহুল প্রয়োগ আছে ব্যবহারিক জীবনে, অঙ্কের বইয়ের বাইরে। যেমন, যদি কেউ একটি বল খুব জোরে ওপরের দিকে ছুড়ে দেয় তা হলে খানিকক্ষণ বাদে মাটিতে পড়ে। বলটি যে পথে শূন্য ভ্রমণ করল সেটা একটি পরাবৃত্তীয় রেখা। উলম্ব গতি বলটিকে ওপরের দিকে নিয়ে যায়। আবার অভিকর্ষ তাকে ক্রমশ নীচের দিকে টানে। বল যত উঁচুতে ওঠে তার উলম্ব গতি কমতে থাকে। আর অভিকর্ষজ ত্বরণ বৃদ্ধি পায়, যার মান অভিকর্ষজ গতির বর্গ। এই পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় একটি দ্বিঘাত সমীকরণের মাধ্যমে।
এর প্রয়োগ বিভিন্ন খেলায় দেখা যায়। যেমন, একজন ফিল্ডার বাউন্ডারি লাইন থেকে যখন উইকেট কিপারের দিকে ক্রিকেট বল ছোড়েন তখন বল কত উচ্চতায় আছে সেখান থেকে বুঝে যাওয়া যায় কখন সেটা কিপারের হাতে পৌঁছবে। ব্যাটসম্যান সেই অনুযায়ী ঠিক করে নিতে পারবেন যে দ্বিতীয় রানটি নেওয়ার জন্য দৌড়োবেন কিনা। অথবা এই প্যারাবোলিক কার্ভের মাধ্যমে ফিল্ডার বুঝতে পারবেন তাকে বল কত উঁচুতে ছুড়তে হবে যাতে সেটা সরাসরি উইকেট কিপারের হাতে পৌঁছয়, তার আগে নেমে না আসে বা কিপারকে অতিক্রম করে চলে না যায়।
এই একই পদ্ধতিতে আমরা বুঝতে পারি একজন শটপাট খেলোয়াড় তার ডিস্কটিকে কোন গতিতে বা কোণ থেকে ছুড়লে সেটা কত দূর যেতে পারে। বা একজন জ্যাভলিন থ্রোয়ার তার বর্শা কত দূর পাঠাতে পারবেন কোন গতিতে এবং কত উচ্চতা থেকে ছুড়লে। অলিম্পিকের অনেক খেলাই এই পরাবৃত্তীয় রেখা মেনে চলে যা সমাধান করা যায় দ্বিঘাত সমীকরণের মাধ্যমে। আবার একজন রাগবি বা আমেরিকান ফুটবল খেলোয়াড় এই পরাবৃত্তীয় রেখা আন্দাজ করেই বলে শট মারেন, মাঠের কোন জায়গায় তিনি আছেন সেই হিসেব করে।

এই সমস্ত বিশ্লেষণ আসলে করেন তাদের কোচেরা, দলের অঙ্ক বিশেষজ্ঞরা। তারাই নির্ধারণ করেন খেলার বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন গতিতে মাঠের বিভিন্ন অংশে থাকা খেলোয়াড়রা কীভাবে, কত জোরে বা কত উঁচুতে বলে শট মারবেন বা কিপারের দিকে ছুড়বেন যাতে নিশ্চিতভাবে ঠিক জায়গায় পৌঁছয়। আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞান অঙ্ক ও সংখ্যাতত্ত্বকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। আগের খেলাগুলোর ফলাফল, খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠন, সক্ষমতা ইত্যাদি নিয়মিত বিশ্লেষণ হতে থাকে। এখানে যে কয়েকটি সূত্র সবচেয়ে বেশি কাজে আসে তার মধ্যে একটি দ্বিঘাত সমীকরণের সূত্র, যার রচয়িতা ভারতীয় পণ্ডিত শ্রীধর আচার্য।
কিন্তু শ্রীধর আচার্য কি কেবলই তাঁর এই একমাত্র দ্বিঘাত সমীকরণের জন্য বিখ্যাত হয়ে থাকবেন? আসলে শ্রীধরের অবদান আরও অনেক বেশি ও গভীর। আমাদের স্কুলে যে পাটিগণিত শিক্ষা প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু হয় এবং যেভাবে অঙ্কের শিক্ষার বিস্তার হয় বিভিন্ন শ্রেণি জুড়ে— পাটিগণিত থেকে জ্যামিতি, পরিমিতি এবং বীজগণিত— সেটাও প্রায় পুরোটাই শ্রীধরেরই পদ্ধতি অবলম্বন করে।
শ্রীধর জন্মেছিলেন আজ থেকে প্রায় এগারোশো বছর আগে। আধুনিক পণ্ডিতরা তাঁর সময়কাল নির্দেশ করেছেন ৮৫০ থেকে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ। হয়তো বা এই বাংলাতেই, হুগলি জেলায় রাধা মহকুমার ভুরিশ্রেষ্ঠী গ্রামে। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বেশ কয়েকটি বই লেখেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত যে দুটি বই তার একটির নাম পাটিগণিত, অপরটি পাটিগণিতসার। মনে করা হয়, দ্বিতীয় বইটি প্রথম বইটির একটি সংক্ষিপ্তকরণ। প্রথম বইতে আছে প্রায় নশোটি শ্লোক। তাই একে অনেকে বৃহৎ পাটি বা নবশতি বলেন। দ্বিতীয় বইটিকে বলা হয় ত্রিশটিকা, এতে আছে তিনশোটি শ্লোক। এই দুটি বই বা প্রকারান্তরে একটিই বই, ভারতীয় তথা বিশ্বের অঙ্ক শিক্ষাপদ্ধতির একটি দিকনির্দেশ হয়ে রয়েছে।

কী আছে শ্রীধরের এই বইতে? অঙ্ক ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ব্যুৎপত্তিই বা কতটা ছিল? শ্রীধরের প্রায় দেড়শো বছর আগে জন্মেছিলেন ভারতীয় গণিতের বিখ্যাততম পণ্ডিত ব্রহ্মগুপ্ত। তিনি বলে গেছিলেন— যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, বর্গ ও বর্গমূ্‌ল, ত্রৈরাশিক ভগ্নাংশ ইত্যাদি কুড়ি রকমের প্রকরণ জানা থাকলে আর মিশ্রণ, সুদ ইত্যাদি আট রকমের ব্যবহার জানা থাকলে তাকেই গণিতবিদ বলা যায়। শ্রীধরের পাটিগণিতে উনত্রিশ রকমের প্রকরণ আর প্রায় নয় রকমের দৈনন্দিন ব্যবহার লিপিবদ্ধ আছে। সেই হিসেবে শ্রীধর ব্রহ্মগুপ্তের গণিতবিদের সংজ্ঞার অনেক ওপরে।
এই পাটিগণিত বইয়ের মধ্যে আমরা দেখি যে, এই বইটি শ্রীধর অনেকগুলো বিভাগে বিস্তৃত করেছেন। শুরু করেছেন বিভিন্ন সংজ্ঞা, পরিমাপ একক ইত্যাদি দিয়ে, যেমনটি আমরা অঙ্কের বইয়ে দেখে অভ্যস্ত। এরপর আছে সাধারণ পাটিগণিত— যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, বর্গ ও বর্গমূল, ভগ্নাংশ, ত্রৈরাশিক ইত্যাদি। তারপর রেখেছেন পরিমিতির অংশগুলো এবং জ্যামিতির কিছু অংশ। এর পরের অংশে আছে বেশ কিছু অঙ্কের ব্যবহারিক প্রত্যয়। যেমন সুদকষা, মিশ্রণ, শ্রমের মজুরি, অংশীদারি ব্যবসা ইত্যাদি। শেষে আছে কিছু বিশেষ ধরনের সূত্র, রোজকার কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য। ঠিক যেমনভাবে আমাদের আধুনিক স্কুলে অঙ্কের বইগুলি সাজানো হয়। বইটিতে একটি করে সূত্র দেওয়া আছে, আবার তার সঙ্গে দেওয়া আছে কয়েকটি অনুশীলনী, যাতে করে ছাত্ররা সেই সূত্রগুলি অভ্যাস করতে পারে, আবার তার ব্যবহারিক প্রয়োগ জানতে পারে।
আমরা বরং দেখি কয়েকটি ক্ষেত্র যেখানে শ্রীধর ও তাঁর সূত্র আজও আমাদের কাজে লাগে। যেমন, একটি গোলকের আয়তন নির্ণয়। শ্রীধর একটি সহজ সূত্র দিয়েছিলেন— গোলকের ব্যাসের ঘনফলের অর্ধেক আর তার সঙ্গে সেই ঘনফলের আঠেরো ভাগের এক ভাগ যোগ করলে পাওয়া যায় গোলকের আয়তন। অঙ্কের ভাষায়—
গোলকায়াতন = (ব্যাস)/২+ (ব্যাস)/১৮ = ৪.২২ * (ব্যাসার্ধ)
যদিও এই গোলকায়াতন সূত্র প্রাচীন ভারতে অজানা ছিল না। এর আগে প্রথম আর্যভট্ট একটি সূত্র দেন কিন্তু সেটা অতটা সঠিক নয়। প্রথম ভাস্করাচার্যের সূত্র অনেকটাই শ্রীধরের সঙ্গে মেলে। তবে আধুনিক যে সূত্র আমরা ব্যবহার করি— [৪/৩π * (ব্যাসার্ধ), = ৪.১৯ * (ব্যাসার্ধ)], তার সবচেয়ে কাছাকাছি শ্রীধর আচার্যের সূত্র।
শ্রীধর গোলকের ব্যাস ও পরিধির অনুপাত, অর্থাৎ পাই (π)-এর মান বের করেছিলেন ১০ এর বর্গমূল, √১০। যা আধুনিক পাই-এর মানের খুব কাছাকাছি। আধুনিক পাই-এর মান ব্যবহার করলে গোলকের আয়তনের যে মান পাওয়া যায় শ্রীধরের সূত্র থেকে, সেটা আধুনিক গোলকায়াতন সূত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
আজকের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় দুটো প্রধান দিক আছে। একটি হল রিটেল বা সাধারণের জন্য ব্যাঙ্কিং। আর একটি হল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং বা ব্যবসায়িক দিক, যাকে আমরা বলতে পারি বিনিয়োগপ্রধান ব্যাঙ্কিং। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্যাঙ্কিং বাণিজ্য পুরোটাই গণিত নির্ভর। সুদকষা সরল ও চক্রবৃদ্ধি নিয়মে, সময়ের দাম ইত্যাদি নির্ধারণের ওপরে সম্পূর্ণ ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। সাধারণ সুদকষার অঙ্ক, চক্রবৃদ্ধির মূল নির্ণয় করা, এগুলো খুব সহজ, শ্রীধরের আগে ও পরে অনেকেই এই সমস্ত সূত্র লিখে দিয়ে গেছেন।

তবুও আশ্চর্যজনকভাবে আমরা দেখতে পাই, শ্রীধর একটি সূত্র তৈরি করেছেন, কীভাবে কোন ঋণগ্রহীতা মাসে মাসে সমপরিমাণ টাকা শোধ করে একসময় সুদ ও মূল পুরোটাই ফেরত দিতে পারবেন। আজকের ভাষায় যাকে বলে ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট বা সোজা কথায় ইএমআই। কিন্তু আমরা অবাক হই এটা ভেবে যে, প্রায় হাজার বছর আগে শ্রীধর এই সূত্র তৈরি করে দিয়ে গেছেন। অথচ আমাদের দেশে মাত্র বছর তিরিশ হল এই ইএমআই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বাড়ি, গাড়ি থেকে আরম্ভ করে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, এমনকি জুতোও আজকাল ইএমআই-তে কেনা যায়।
শ্রীধরের পাটিগণিত বইয়ের ৪৯ ও ৫০ নম্বর সূত্র এই ইএমআই-এর সময়, ধার শোধের রাশি ইত্যাদি নির্দেশ করে, যদি আমরা ঋণের পরিমান ও সুদের হার জেনে থাকি। এর সঙ্গে গোটা দুই অনুশীলনীও (৫৫ ও ৫৬) তিনি দিয়ে গেছেন এই ইএমআই-এর গুরুত্বপূর্ণ রাশিগুলি অঙ্ক কষে বের করার অভ্যাস তৈরি করার জন্য।
ব্যাঙ্কিং পরিচালনার জন্য সুদের ওপরেও যে আরও সেবামূল্য, বন্ধকি জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ইত্যাদি দরকার হয় এবং একটি ব্যাঙ্কের আয়ের পথ কীভাবে এই সমস্ত হিসেব নিয়ে তৈরি হতে পারে তারও সহজ সূত্র (৪৮ নং) দিয়ে গেছেন শ্রীধর।
আজ যখন কেউ কোনও পুঁজি কোনও বিশেষ মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে চান, তার সুফল হিসেবে সবচেয়ে সহজে বুঝে নিতে চান কত দিনে টাকা দ্বিগুণ হবে বা তিনগুণ হবে। কোনও এজেন্ট যখন আমাদের যেকোনও বিনিয়োগ বোঝানোর চেষ্টা করেন তখন তিনিও এই দ্বিগুণ বা তিনগুণের হিসেবে বোঝাতে চান। কত তাড়াতাড়ি এই টাকা বাড়বে সেটাই যেন আমাদের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই টাকার গুণিতক ও সময় নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি শ্রীধর দিয়ে গেছেন তার ৫২ নম্বর সূত্রে।
আবার ঋণপত্রের সুদ ও আসল নির্ণয়ের এমন একটি সূত্র তিনি দিয়ে গেছেন যার মাধ্যমে আমরা একটি যৌগিক ঋণপত্রের মূল্য নির্ধারণ করতে পারি। মানে, যদি কোনও ব্যাঙ্ক একাধিক ঋণগ্রহীতার ঋণপত্রগুলো একত্র করে একটি সংযুক্ত ঋণপত্র বানায় তা হলে সেই ঋণপত্রের মুল্য কত হবে বা সুদ কত হবে তা নির্ণয় করা যাবে শ্রীধরের ৫১ নম্বর সূত্র থেকে। মনে রাখতে হবে বিভিন্ন ঋণপত্রের সময়কাল আলাদা, শুরুর দিন আলাদা, সুদের হার আলাদা, আবার মূলধনও আলাদা। সবগুলিকে একত্র করে একটি একটি সংযুক্ত কাগজ তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। শুনতে খটোমটো লাগলেও বর্তমান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিংয়ে এইরকম সংযুক্ত ঋণপত্র বা যৌগিক ঋণপত্র খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। মোটামুটি সমগ্র ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিংই এইরকম সংযুক্ত ও যৌগিক পত্রের ওপর চলে বললেও অত্যুক্তি হয় না। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় এ ধরনের বিষয়কে বলে ডেরিভেটিভ প্রোডাক্ট।

ভাবতে গেলে অবাক হতে হয় যে, আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে শ্রীধর এইরকম সূত্র কল্পনা করতে পেরেছিলেন। অথবা এটাও হয়তো সম্ভব যে তৎকালীন ভারতবর্ষে শ্রেষ্ঠী, মহাজনেরা এইরকমভাবেই মূলধনী ব্যবসা করতেন। একজন স্থানীয় কুসীদজীবী হয়তো তার বেশ কিছু ঋণগ্রহীতার ব্যবসা একত্র করে একজন শ্রেষ্ঠীকে হস্তান্তর করে দিলেন। সেই শ্রেষ্ঠী আবার এরকম বেশ কিছু কাগজ আবার একত্র করে আরও বড় মহাজনকে বিক্রি করে দিলেন। একটি সংগঠিত ঋণের বাজার কল্পনা করা যায় এইভাবে। বিনিয়োগপ্রধান ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা ছিল কিনা না জানা গেলেও এই ধরনের লেনদেন যে অপ্রচলিত ছিল না তার প্রমাণ শ্রীধরের এই সূত্রগুলি। যদিও আগের ও পরের কোনও গণিতবিদ তাঁদের লেখায় এই ধরনের সূত্র প্রকাশ করে যাননি। সেই হিসেবে শ্রীধর নিশ্চয়ই তাঁর সময়ের অনেক আগে ভাবতে পেরেছিলেন। এখানেই একজন গণিতজ্ঞের বা বিজ্ঞানীর সার্থকতা।
এইরকম কিছু অপ্রচলিত নতুন সূত্র ছাড়াও শ্রীধরের পাটিগণিতের বইদুটির আরও অনেক বিশেষত্ব আছে। আগেই বলেছি, এই বইদুটির বিস্তার বিভাগ নিয়ে। শ্রীধর হয়তো প্রথম ভারতীয় গণিতজ্ঞ যিনি পাটিগণিত ও বীজগণিত দুটি বিষয়কে আলাদা করে ভাবতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী দুটি আলাদা বইও লেখেন। শ্রীধরের বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল যে তিনি কীভাবে প্রত্যেকটি সূত্রের একটি সহজ সরল ব্যবহারিক ব্যাখ্যা দিতে পেরেছেন এবং অনুশীলন যোগ করেছেন প্রায় প্রত্যেকটি সূত্রের সঙ্গে। যেগুলি প্রায়ই দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে উঠে আসা উদাহরণ। যেমন তিনি যখন গাণিতিক বিস্তার বা অ্যারিথমেটিক সিরিজের ব্যাখ্যা করছেন, উদাহরণ দিয়েছেন একটি জলের গ্লাসের। যার নীচের দিক সরু, এবং ধীরে ধীরে উপরের দিকে চওড়া হয়ে যাচ্ছে। তখনকার মাটির গ্লাস বা এখনকার কাচের কী স্টিলের গ্লাস, সবগুলি আকারে কিন্তু একইরকম। এইবার যদি আমি ধরি নীচের অংশ একটি সিরিজের শুরু এবং প্রত্যেকটি ধপে সিরিজ বা তার ব্যাসের মান একটু একটু করে বাড়ছে সমানুপাতে বা সমপরিমাণে, তাহলে এই গ্লাসের আকার আসলে একটি গাণিতিক সিরিজ বা শ্রেণি প্রকাশ করে। তার ৭৯ নম্বর সূত্র এই গাণিতিক শ্রেণি ও তার বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেছে। এই গ্লাসের উচ্চতা সেক্ষেত্রে ওই সিরিজটিতে কতগুলি মান আছে সেটাই নির্দেশ করে।

এখানে a-d/2 হচ্ছে গ্লাসের সবচেয়ে নীচের অংশ, বা আমাদের গাণিতিক সিরিজের প্রথম পদ। প্রত্যেকটি ধাপে যোগ হচ্ছে d পরিমাণ। মোট ধাপ আছে n খানা।
আবার অঙ্কের ব্যবহারিক প্রয়োগের এত উদাহরণ শ্রীধর তাঁর বইতে দিয়ে গেছেন যে তার বাইরে নতুন কিছু কল্পনা করা দুষ্কর। আজকের দিনে আমরা চৌবাচ্চায় জল ভরার অঙ্ক কষি, যেখানে বিভিন্ন নল দিয়ে জল আসছে আবার কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে। বেশ জটিল অঙ্ক সন্দেহ নেই এবং যুগ যুগ ধরে আমরা কেশব চন্দ্র নাগ বা তার আগের যাদব চক্রবর্তীর প্রতি ক্ষোভ উদগীরণ করে আসছি আমাদের অঙ্কের এই সাজা দেবার জন্য। বেশ মজার ব্যাপার যে, এই চৌবাচ্চার অঙ্কও প্রথম শিখিয়ে যান শ্রীধর আচার্য।
এই ভাবেই হাজার বছর আগে এক ভারতীয় পণ্ডিত নির্মাণ করে গেছেন গণিত শিক্ষার এক অসামান্য রূপরেখা। যা আজকের দিনেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্যালয়ে অঙ্ক শেখানোর এক সর্বজনগ্রাহী প্রকল্প হয়ে আছে। আবার আধুনিক ব্যাঙ্কিং পরিচালনা বা ক্রীড়াবিজ্ঞান বিশ্লেষণেও তাঁর সূত্র বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। শ্রীধরের এই বিভিন্ন অবদান পরবর্তী যুগের পণ্ডিতরা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন। পরবর্তীতে লেখা অনেক অঙ্ক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইয়ে, যেমন দ্বিতীয় ভাস্করাচার্য, দ্বিতীয় আর্যভট্ট ইত্যাদি প্রথম সারির গণিতজ্ঞেরা তাঁর সূত্রের ব্যবহার করে তাঁকে সশ্রদ্ধ সম্মান জানিয়েছেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ পরবর্তীতে রচিত একটি শ্লোক, যার বাংলা অনুবাদ অনেকটা এরকম হতে পারে—
উত্তরে হিমালয়, প্রণম্য দেবালয়
দক্ষিণব্যাপী আছে পর্বত মলয়
পুবের সাগর আর পশ্চিমে পারাবার,
তারি মাঝে গণিত সেরা, শ্রীধর নিশ্চয়।।
হিন্দু ও জৈন, উভয় ধর্মের গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী বা দার্শনিকরা এই শ্লোকের উচ্চারণের মাধ্যমে শ্রীধরের ক্ষমতা ও মেধার পরিচয় বহন করে চলেছেন।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, শ্রীধরের জীবন সম্বন্ধে বেশি তথ্য জানা যায় না। এটুকু জানা যায় যে, তিনি ছিলেন শিবভক্ত। তাঁর দুটি বইয়ের শুরুতে তিনি বন্দনা করেছেন মহাদেবের এবং বইদুটি নিবেদন করেছেন শিবের পাদপদ্মে। আবার বেশ কয়েকটি অনুশীলনে তিনি উদাহরণ দিয়েছেন পঞ্চানন শিবের। ফলত শ্রীধর আচার্যের শিবভক্তি নিয়ে তেমন কোনও প্রশ্ন নেই।
আগেই অনুমান করা হয়েছে, শ্রীধরের জন্ম এই বাংলায়। যে সূত্র ধরে শ্রীধরের বীরশ্রেষ্ঠ গ্রামে জন্মের কথা ভাবা হয় সেটা হল একটি দর্শনের বই, ‘ন্যায়কাণ্ডালি’। যার লেখক শ্রীধর হুগলি জেলার সন্তান। কিন্তু এরকম মত আছে যে, সেই বই লেখা হয় ৯৯১ খ্রিস্টাব্দে । অথচ আমরা দেখেছি যে শ্রীধরের পাটিগণিত খ্রিস্টাব্দ সাড়ে আটশো থেকে সাড়ে নশো, এই সময়কালের মধ্যে লেখা। সেই হিসেবে ৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জীবিত থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। সুতরাং শ্রীধর বঙ্গসন্তান, এই তত্ত্ব খুব বেশি জোরালো নয়। যদিও তাঁর বঙ্গ-ঐতিহ্য আমাদের বিশেষ শ্লাঘার কারণ হতেই পারত।

অঙ্কন : রাজ রায়/ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.