বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সাহিত্যে পরিবেশের বিপন্নতা

আজকের পরিবেশবাদী সাহিত্যের সঠিক সংজ্ঞায় রবীন্দ্রনাথের এই রচনাগুলিকে চিনে নেওয়া যায় বই কী। রবীন্দ্রনাথই বাংলার প্রথম পরিবেশবাদী সাহিত্যিক। পরিবেশ বিজ্ঞানী।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

পৃথিবী আজ সর্বনাশের পথে। বিপন্ন পরিবেশ। পরিবেশের সংকট আসলে সভ্যতার সংকট। বিপন্ন প্রকৃতি নয়, বিপন্ন আজ মানবসভ্যতা, মানুষের জীবন। সমগ্র জীবজগৎ। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘ সুইডেনের স্টকহোমে পরিবেশ নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সেই সম্মেলনে পরিবেশ এবং দূষণ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তার পর থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে কত সম্মেলন-আলোচনাচক্র হয়েছে। প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। পৃথিবীর পরিবেশ বিজ্ঞানীদের চিন্তার কেন্দ্রে এখন দূষণ এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন।
আমরা পরিবেশ ধ্বংস করে নিজেদের উন্নতি করতে চেয়েছি। প্রযুক্তির উন্নতি, সভ্যতার বিকাশ প্রভাবিত করেছে প্রকৃতিকে। আমরা উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে প্রকৃতির ওপর তার প্রভাব কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা নিয়ে ভাববার সময় পাইনি। আজও তাই অরণ্য ধ্বংস করি, পুকুর-জলা বুজিয়ে বাড়ি বানাই। নদীর স্বাভাবিক প্রবহমানতাকে রুখে দিই ইচ্ছেমতো বাঁধ দিয়ে। প্রাত্যহিকতার বর্জ্য ভাসিয়ে দিই নদীর স্রোতে। কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির ধোঁয়ায় বাতাস ভারী। দূষণ সর্বত্র। জল-বায়ু-আকাশ-বাতাস-নদী-সমুদ্র সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে সভ্যতার দূষণ। এর অনিবার্য প্রভাব পড়েছে ঋতু পরিবর্তনে। রোদ-বৃষ্টি, শীত-গরম সবই এখন প্রকৃতির খেয়ালে। ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনে নয়। ঋতু মানচিত্র ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে একটি অঞ্চলের আবহাওয়া, জলবায়ু। এখন যারা কিশোর-যুবক তাদের জন্ম হয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন শুরু হওয়ার পরে। তাই ষড়ঋতুর স্বতন্ত্র ঐশ্বর্য অনুধাবন করতে পারবে না তারা। শরৎ-হেমন্ত-বসন্ত কখন আসে, কখন যে যায়, তা আর টের পাই না আমরা। শীতকাল ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। প্রকৃতির খেয়ালখুশিমতো বৃষ্টি হয়, বর্ষাকালে নয়। গ্রীষ্মকালের ব্যাপ্তি বেড়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং দূষণ তছনছ করে দিয়েছে ঋতু মানচিত্র, বাস্তুতন্ত্র, খাদ্যশৃঙ্খল এবং জীববৈচিত্র্যকে।
প্রতিবছরই পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। মেরুপ্রদেশের বরফের পাত ভেঙে গেছে। পৃথিবীর বড় বড় পর্বতের বরফ গলছে। কত কত পাহাড় ন্যাড়া হয়ে গেছে ক’বছরে। হিমালয়েরও বরফ গলছে। সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র উপকূল অঞ্চলের বহু এলাকা এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ গোটা সুন্দরবন-সহ চব্বিশ পরগনা, কলকাতার বহু অঞ্চল জলের তলায় চলে যাবে। আয়লায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে পাথরপ্রতিমার অচিন্ত্যনগর দ্বীপ। লোহাচরা, সুপারিভাঙা দ্বীপগুলোকে গ্রাস করেছে বঙ্গোপসাগর। ভাঙনের মুখে ঘোড়ামারা দ্বীপ। কত নদী আজ বিলুপ্তির পথে। কত কত নদী স্রেফ চুরি হয়ে গেছে। আমাজনের জঙ্গলও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর অরণ্যের পরিমাণ কমছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, গত কয়েক বছরে বজ্রপাত বেড়েছে। প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছেন বজ্রাঘাতে। বিজ্ঞানীরা এত বজ্রপাতের কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন মাত্রাছাড়া দূষণকে।

আকাশে এখন তেমন করে পাখি দেখি না আর। কত কত পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেল এই কয়েক বছরে। আকাশই নেই, গাছই নেই তো কোথায় উড়বে, কোথায় বসবে পাখি! শুধু পাখি নয়, আরও কত পোকামাকড়, প্রাণী বিপন্ন হতে চলেছে। পরিবেশের সমতা নষ্ট হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ইকোলজিক্যাল ব্যাল্যান্স। একটুকরো সবুজের জন্য আমাদের দৌড়োতে হয় ডুয়ার্সে বা সুন্দরবনে। তবুও হুঁশ ফেরে না মানুষের!
মাঝে মাঝে সতর্ক করেছে প্রকৃতি। আমাদের এখানে আয়লা, উমফানের মতো ঘটনা ঘটেছে। উত্তরাখণ্ডের মতো ঘটনা বুঝিয়ে দিয়েছে কতটা মারাত্মক হতে পারে প্রকৃতির রূপ। উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয়ের মূলে মানুষের ভূমিকাকে অস্বীকার করেননি কেউই। নির্বিচারে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহকে আটকে দেওয়া, ডিনামাইটে পাহাড় ফাটিয়ে পার্বত্য ভূমিকে দুর্বল করে দেওয়া, পার্বত্য অরণ্য ধ্বংস করে দেওয়ায় মাটি আঁকড়ে রাখতে না পারা, লাগামছাড়া ট্যুরিস্টদের ফেলে যাওয়া পলিথিনের প্যাকেট ইত্যাদির দায় তো আমাদেরই। যার ফল কত মানুষের মৃত্যু। মুহূর্তের মধ্যে ব্যস্ত জনপদের নদীপথে পরিণত হওয়া!
এ সম্পর্কে এখনই সচেতন হওয়া দরকার। পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য তাই বিভিন্ন জায়গায় সবুজ বাঁচাও সমিতি, পরিবেশ রক্ষা কমিটি ইত্যাদি শুরু হয়ে গেছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য রীতিমতো আন্দোলন হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য সমস্ত দেশের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। পরিবেশবিদরা চিন্তিত। এই মর্মে নানারকম প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে পত্রপত্রিকায়। পিছিয়ে নেই সাহিত্যও। পরিবেশকেন্দ্রিক সাহিত্য রচিত হচ্ছে। কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ করছেন পরিবেশ সম্পর্কে তাঁদের ভাবনাচিন্তা। পাঠককে সচেতনও করতে চাইছেন। সমসাময়িক পরিবেশকেন্দ্রিক সমস্যাকে সাহিত্যের বিষয় করে তুলছেন। পরিবেশের সর্বনাশের খতিয়ান ধরে রেখেছে বাংলা সাহিত্য।
তার শুরুটা সেই রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন তো ছিলেনই। বৃক্ষনিধন, অরণ্যনিধনকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। ‘অরণ্যদেবতা’ (১৭ ভাদ্র ১৩৪৫) প্রবন্ধে বলেছিলেন— “মানুষ গৃধ্‌নুভাবে প্রকৃতির দানকে গ্রহণ করেছে; প্রকৃতির সহজ দানে কুলোয় নি, তাই সে নির্মমভাবে বনকে নির্মূল করেছে। তার ফলে আরব মরুভূমিকে ফিরিয়ে আনবার উদ্যোগ হয়েছে। ভূমির ক্রমিক ক্ষয়ে এই-যে বোলপুরে ডাঙার কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে, বিনাশ অগ্রসর হয়ে এসেছে— এক সময়ে এর এমন দশা ছিল না, এখানে ছিল অরণ্য— সে পৃথিবীকে রক্ষা করেছে ধ্বংসের হাত থেকে, তার ফলমূল খেয়ে মানুষ বেঁচেছে। সেই অরণ্য নষ্ট হওয়ায় এখন বিপদ আসন্ন। সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে আবার আমাদের আহ্বান করতে হবে সেই বরদাত্রী বনলক্ষ্মীকে— আবার তিনি রক্ষা করুন এই ভূমিকে, দিন তাঁর ফল, দিন তাঁর ছায়া।… লুব্ধ মানুষ অরণ্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতিকে ডেকে এনেছে; বায়ুকে নির্মল করবার ভার যে গাছপালার উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে। বিধাতার যা-কিছু কল্যাণের দান, আপনার কল্যাণ বিস্মৃত হয়ে মানুষ তাকেই নষ্ট করেছে।” শুধু কথার কথা নয়, বনলক্ষ্মীর আহ্বান করেছিলেন তিনি। সেই কবে শান্তিনিকেতনে শুরু করেছিলেন বৃক্ষরোপণ উৎসব।

‘বলাই’-এর মতো ছোটগল্প লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘বনবাণী’ (১৯৩১)-র মতো কাব্য। ‘মুক্তধারা’-র মতো নাটক। প্রকৃতির স্বাভাবিক জলধারাকে আটকে দিতে যন্ত্র বিভূতির সহায়তায় বাঁধ বেঁধেছিলেন উত্তরকূটের রাজা। শেষপর্যন্ত প্রবহমান জলধারাকে আটকে রাখতে পারেননি। যান্ত্রিক বাঁধ ভেঙে মুক্তধারা প্রবাহিত হয়েছিল শিবতরাইয়ের ওপর দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ ভাবনার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে এই নাটকে। আজকের পরিবেশবাদী সাহিত্যের সঠিক সংজ্ঞায় রবীন্দ্রনাথের এই রচনাগুলিকে চিনে নেওয়া যায় বই কী। রবীন্দ্রনাথই বাংলার প্রথম পরিবেশবাদী সাহিত্যিক। পরিবেশ বিজ্ঞানী।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেই কবে অনুভব করেছিলেন অরণ্যের প্রয়োজনীয়তা। গাছপালার প্রয়োজনীয়তা। সবুজের প্রয়োজনীয়তা। ‘আরণ্যক’-এর সত্যচরণ জানতেন অরণ্য রক্ষা করতে পারবেন না। কিন্তু চেষ্টা করেছিলেন এই অরণ্য ধ্বংসের কাজটাকে যতটা সম্ভব পিছিয়ে দিতে। আক্ষেপ করেছিলেন তাঁর হাত দিয়ে অরণ্য ধ্বংস হয়েছিল বলে। উপন্যাসের শুরুতেই তাঁর স্বীকারোক্তি— “এই স্বচ্ছন্দ প্রকৃতির লীলাভূমি আমার হাতেই বিনষ্ট হইয়াছিল, বনের দেবতারা সেজন্য আমায় কখনও ক্ষমা করিবেন না জানি। নিজের অপরাধের কথা নিজের মুখে বলিলে ভার শুনিয়াছি লঘু হইয়া যায়। তাই এই কাহিনীর অবতারণা।” উপন্যাসের শেষে নাঢ়া বইহার, লবটুলিয়া বইহার থেকে চলে যাওয়ার সময় দিগন্তলীন মহালিখারূপের পাহাড় ও মোহনপুরা অরণ্যানীর উদ্দেশে দূর থেকে নমস্কার করেছিলেন তিনি— “হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়। বিদায়!…”
কলকাতা থেকে অরণ্য অঞ্চলে পিকনিক করতে আসা লোকজনদের তিনি ঠিক মেনে নিতে পারেননি। কারণ তাদের চালচলন কথাবার্তা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায়নি। চলে যাওয়ার সময় তারা কয়েকটি খালি জমাট দুধের ও জ্যামের টিন ফেলে রেখে গিয়েছিল। বিভূতিভূষণ লিখছেন— “লবটুলিয়া জঙ্গলের গাছপালার তলায় সেগুলি আমার কাছে কি খাপছাড়াই দেখাইতেছিল!” এই মন্তব্য লেখকের পরিবেশ সচেতনতা থেকে উঠে আসা। যুগলপ্রসাদের মতো চরিত্রের প্রতি পক্ষপাত ছিল তাঁর। নিছক অরণ্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবার জন্য নানা জায়গা থেকে নতুন নতুন ফুল-লতা-পাতার চারা এনে লাগাত সে।
মাইলের পর মাইল অরণ্য ধ্বংসের ফলে ইকোলজিক্যাল ব্যাল্যান্স নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের এহেন ভয়াবহতায় আতঙ্কিত মানব সভ্যতা। এরকম একটি সময়ে বড় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এই উপন্যাস। একটা সময় যার সাহিত্যমূল্য নিয়ে কথা হয়েছে শুধু, আজ সেই উপন্যাস অন্য একটি মাত্রায় উন্নীত হচ্ছে। এর পরিবেশবাদী মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ‘আরণ্যক’-কে বাংলায় লেখা প্রথম পরিবেশবাদী আখ্যান (‘eco-novel’/‘ecological novel’/ ‘environmental novel’) বলাও অসঙ্গত হবে না।

যদিও তখন এই শব্দগুলির ব্যবহার ছিল না। পরিবেশবাদ বা পরিবেশবাদী সাহিত্য পাঠের/ সাহিত্য সমালোচনার বিষয়টি বেশি পুরনো নয়। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, নব্বইয়ের মাঝামঝি সময়ে গ্লোটফেল্টি (Cheryll Glotfelty)-র ‘The Eco-criticism Reader : Landmarks in Literary Ecology’ (১৯৯৬) গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গ্লোটফেল্টির সঙ্গে সম্পাদক হিসেবে ছিলেন হ্যারল্ড ফ্রম (Harold Fromm)। আমাদের দেশে পরিবেশের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কের বিষয়টি এভাবে দেখা শুরু হয় আরও পরে। কিন্তু ওই সময় থেকেই বাংলায় পরিবেশকে বিষয় করে, পরিবেশের নানা সমস্যা নিয়ে সচেতনভাবে সাহিত্য রচনা শুরু হয়ে গেছে। পরিবেশের সংকটে চিন্তিত হয়েছেন বাঙালি লেখকেরা। পরিবেশের বিপন্নতা স্পর্শ করেছে তাঁদের চেতনাকে। পরিবেশবিদদের মতো তাঁরাও সোচ্চার হয়েছেন। পরিবেশের বিপন্নতার ধারাবিবরণী তুলে ধরেছেন তাঁদের কবিতা-গল্পে-উপন্যাসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সাহিত্যপাঠের ভাবনাও। পরিবেশবাদী সাহিত্য পাঠের বিষয়টিও অনিবার্য হয়ে এসেছে আমাদের চারপাশের পরিবেশের বিপন্ন প্রেক্ষাপটে।
সচেতনভাবে পরিবেশকেন্দ্রিক সমস্যাকে আখ্যানের বিষয় করে লেখা হয়েছে কিন্নর রায়ের ‘প্রকৃতি পাঠ’ (১৯৯০)। কলকাতার পরিবেশের বিপন্নতার স্বরূপ মূর্ত এখানে। প্রিয় শহরটাকে আমরা দিনে দিনে কতটা নষ্ট করে ফেলেছি, সেটাই লেখক স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। কলকাতার আকাশ থেকে পাখি কমে আসছে। পোকা কমছে। ব্যাং কমছে। এখন আর ব্যাং-শিকারিদের চোখে পড়ে না। কীটনাশক, ধোঁয়া, অ্যাসিড-বৃষ্টিতে দূষিত হচ্ছে কলকাতার প্রকৃতি। বহুতলে ঢেকে গেছে আকাশ। আলিপুর চিড়িয়াখানায় হিমালয়ের পাখি, আর সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা হাঁসেরা নামে না এখন। পাঁচতলা হোটেল, শব্দদূষণ, ঘুড়িতে বঁড়শি বাঁধা চোরাশিকারি ফিরিয়ে দিচ্ছে নাকতা, ছোট সরাল, বড় সরাল, নীল ডানা আর সূচিপুচ্ছ হাঁসেদের। জলের স্তর নামিয়ে দিচ্ছে বহুতল বাড়ি। শাল গাছ কেটে, স্বাভাবিক অরণ্য ধ্বংস করে মানুষ এখন তার সুবিধে মতো লাগাচ্ছে ইউক্যালিপটাস যা বনভূমির জলের স্তর নামিয়ে দিচ্ছে। ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি দ্রুত বেড়ে যাওয়া গাছ কখনওই দেশজ গাছের পরিপূরক হতে পারে না। শীত এলে ধোঁয়া মেশা কুয়াশার ভারী পর্দা ঝুলে থাকে কলকাতার আকাশে। হাজার হাজার উনুনের ধোঁয়া, মাইকের চিৎকারে হাওয়া পচে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ফুসফুসে চাপ পড়ে।
সভ্যতার অগ্রগতির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিদ্যুতের। বিভিন্ন শিল্প, কলকারখানা গড়তে অপরিহার্য এই বিদ্যুৎ। তাই বিদ্যুৎ প্রকল্পেরও অনিবার্যতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একটি তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প যেমন সভ্যতার অন্ধকারকে আলোকিত করে তেমনই ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত করে প্রকল্প সন্নিহিত পরিবেশ-প্রকৃতি— সমগ্র জীবজগৎ। অমর মিত্রের ‘কৃষ্ণগহ্বর’ (১৯৯৮)-এর কেন্দ্রে আছে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের সূত্রে পরিবশের বিপন্নতার বিভিন্ন স্তর। আলো কোম্পানির বিশাল আয়োজন কত কত মানুষকে খেয়ে ফেলছে। গিলে ফেলছে মানুষের বসতভিটে, চাষের জমি। আলো কোম্পানির কাজ চলছে জোরকদমে। লরি লরি ছাই আসছে। এই আটশো বিঘেতে যত গাছ ছিল, কাটা হয়ে গেছে। গাছের যত পাখি, যত বাসা, যত ছায়া, যত বাতাস, সব উধাও হয়ে গেছে। মণ্ডলপাড়ার কোনও অস্তিত্বই নেই। পুকুরগুলোর জল কালো থকথকে। কালো ছাইয়ে ঢেকে গেছে চারপাশ। ঘরে-বাইরে ছাই। মানুষের কাশের রোগ ধরছে। হাঁপানির ধাত বাড়ছে। কাশতে কাশতে দম বন্ধ হয়ে আসে। মধু ধীবরের মতো কেউ কেউ তার আর্জি জানায় চিঠিতে। লেখাপড়া জানা ছোটবউমাকে সে লিখতে বলে। লিখতে লিখতে তার বউমা টের পাচ্ছিল— “তাকে ঘিরে আছে শুধু হেলে বংশী, মধু ধীবর নয়, এই অন্ধকারে জোয়ান পুরুষ সাপটি, তরুণ গোখরোটি, মেটুলি সাপ, ব্যাঙ, পোকামাকড়, বাদুড়, টিয়া, ফড়িং, প্রজাপতি, শ্যামাপোকা, কাক কোকিল সব যেন এসে দাঁড়িয়েছে। কাঁঠালবেড়েতে তারা শতজন্ম বাস করেছে, শতজন্মের বাস ওঠাতে হচ্ছে।”

মানুষ, পশু, পাখি— সমগ্র প্রাণী জগৎ একাকার। তারা সকলে বিপন্ন আজ। এই বিপন্নতা অনিবার্যভাবে প্রভাবিত করছে ইকোলজি, ইকোসিস্টেমকে। গাছপালা বা প্রাণীরা নয়, থার্মালের করাল গ্রাসের শিকার হয়ে যায় নদীও। প্ল্যান্টের ময়লা যাবে গঙ্গায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে বায়ুতে কার্সিনোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত। কলকাতার বাতাসে ক্যানসারের বিষ। কুপবন বহিতেছে সর্বত্র। তৃতীয় বিশ্বে এর পরিমাণ বেশি। চাই বা না চাই, প্রতিনিয়ত আমরা ডুবে আছি সেই কুবলয়ে। বাধ্য হচ্ছি এক হাঁ-মুখ কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করতে। বায়ুদূষণের বহু কারণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প।
গ্রাম থেকে, মফস্‌সল থেকে ছুটে আসছে সবাই শহরে। মহানগরে। কলকাতায়। প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে এই শহরের পরিধি। নতুন টাউনশিপ তৈরি হচ্ছে। আর নতুন টাউনশিপও ঢুকে পড়ছে কলকাতার পেটে। সল্টলেক তৈরি হল কয়েক দশক আগে। এখন তৈরি হচ্ছে রাজারহাট, নিউটাউন, জ্যোতি বসু নগর। নতুন শহরগুলি তৈরি হচ্ছে অজস্র চাষের জমি, জলাভূমির ওপর। পরিবেশ ধ্বংস করে গড়ে উঠেছে সল্টলেক সিটি। গড়ে উঠছে নিউটাউন উপনগরী। এই নিয়েই রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘অপারেশন রাজারহাট’ (২০১৩)। ধুপির বিল-সহ পাঁচ হাজার হেক্টরের প্রায় একটা দেশ, তার সমস্ত সম্পদ পোকামাকড়-পাখি-সাপ-উদবেড়াল, সবজি-ধানের মাইল মাইল সবুজ— সব নষ্ট হয়েছে চোখের সামনে। রাজারহাটের ১৫ লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ৫৫টি মৌজার মানুষও শিকড়হীন হয়ে গেছে গাছগুলোর মতো। কলকাতা হাইকোর্টে রাজারহাট জমি বাঁচাও কমিটির মামলা খারিজ হয়ে গেছে। লেখক একে বলেছেন দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। এখানকার ভূমিবিপ্লবে কত মানুষের যে প্রাণ গেছে! কত মানুষ হারিয়ে গেছে চিরতরে! আবার কত গরিব রাজা-গজা হয়ে গেছে। লেখক এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন— “পরিবেশবাদীরা, উন্নয়ন-উচ্ছেদের ঘোর বিরোধীরা কোনো রাস্তা খোঁজেনি, অন্তত যখন ওই হা-হুতাশ, অন্তত যখন মান্ধাতার আমলের চাষে-মাছে-কাদায়, ম্যালেরিয়া-পেটের রোগ-সাপে কাটায় গলা পর্যন্ত ডুবে ছিল গরীরগুর্বো।” জমি বাঁচানো আর পরিবেশ বাঁচানো একই সূত্রে গাঁথা। মোট যে ২৪২১ হেক্টর জমি ২০১০ পর্যন্ত অধিগ্রহণ বা কেড়ে নেওয়া বা কিনে নেওয়া হয়, তার মধ্যে ২১৯৭ হেক্টর মানে ৯১ শতাংশ জমিই কৃষিজমি। এই ৯১ শতাংশ জমির প্রাক্তন মালিকদের কম করে ৮০ শতাংশই ছোট চাষি বা প্রান্তিক কৃষক। এই হিসেবে হেক্টর পিছু জমি মালিকের সংখ্যা ৪২। এবার গোটা নিউটাউন প্রকল্পের ৫৪০০ হেক্টরকে ৪২ দিয়ে গুণ করলে দেখা যাবে অন্তত লাখ দুয়েক মানুষ জীবিকা, সম্পর্ক, সম্মান ও নিজেদের বেঁচে থাকার এতদিনের ধরন থেকে উচ্ছেদ হয়ে এক হতশ্রী, অনিশ্চয়তায় হারিয়ে যাবে। পৃথিবীতে উর্বরতম চাষজমির পরিমাণ দ্রুত কমে এসেছে, রাজারহাটের সবুজ ভূমি পৃথিবীর সেই দুর্লভ উর্বরভূমির অন্তর্গত। তাও চলে গেল মহানগরের করাল গ্রাসে।

কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে দেয় প্রকৃতি-পরিবেশ। নিজেদের মতো করে বানাতে চায় নতুন পরিবেশ। তাদের লোভের স্টিম-রোলার অনায়াসে পিষে দেয় নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত গাছপালা সব— সমস্ত পরিবেশটাকেই। কখনও বা রাষ্ট্রই এগিয়ে আসে এই মর্মান্তিক নিধনযজ্ঞে। পরিবেশ সচেতন মানুষদের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দেয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। রাষ্ট্রের উদাসীনতায় কত নদী হারিয়ে যাচ্ছে। অমর মিত্রের ‘সোনাই ছিল নদীর নাম’ (২০০৩) এবং সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‘শেষ রাতের শিয়াল’ (২০০৩) দুটি আখ্যানে সোনাই নদীর কথাই বলা হয়েছে, যে নদীর কোনও অস্তিত্বই নেই আর! অথচ একদিন ছিল এই নদী। একটা আস্ত নদীকেই চুরি করে নিল কিছু লোভী মানুষ। সেই নদী উদ্ধারে নেমেছে কিছু পরিবেশ সচেতন মানুষ। শেষপর্যন্ত অবশ্য সোনাইকে উদ্ধার করা যায়নি। যারা নদীটাকে চুরি করেছিল তাদের শাস্তিও হয়নি। কিন্তু কীভাবে চোখের সামনে রাষ্ট্রের মদতে হারিয়ে যায় নদী, পাহাড়, গ্রাম— তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই উপন্যাসে।
পিয়ালি, বিদ্যাধরী, সরস্বতী কত কত নদী হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সোনাই তো নিজে থেকে হারায়নি। কেউ অদৃশ্য করে দিয়েছে। আজও সমানে চলছে নদী চুরি। চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে নদী। যেমন উত্তরবঙ্গের লোইতি নদী। জলপাইগুড়ি জেলার মানাবাড়ির কাছে দখল হয়েছে এই নদী। নদীর বুকে কংক্রিটের ঢালাই করা বাড়ি। প্রকাণ্ড পে-লোডার নদীর বুক থেকে পাথর তুলছে। সেই পাথর ভাঙা হচ্ছে নদীর বুকে বসানো যন্ত্রে। দার্জিলিং পাহাড় থেকে নেমে আসা রোক্তি, চামটা, চাঁদমণি এবং লচকা নদীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে জমি মাফিয়া বা পাথর ভাঙার কারখানার মালিকেরা দখল করে নিয়েছে। নদিয়ার জলঙ্গী এখন প্রায় রুদ্ধ। তার ওপর দিয়ে হচ্ছে দ্বিতীয় রেলব্রিজ। পিলার তোলার জন্য দু’পাশে মাটি ফেলে নদীকে প্রায় ঢেকে ফেলা হয়েছে। কৃষ্ণনগরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা অঞ্জনা নদীর বুক জুড়ে কংক্রিট শুধু। মজে গিয়ে একটা খালের আকার নিয়েছে। মুর্শিদাবাদের ভাণ্ডারদহ, ভৈরব, গোবরানালাও বিপন্ন আজ। সবাই সব জানে। কিন্তু কী এক আশ্চর্য কারণে নীরব। নীরব প্রশাসনও। সরকারি উদ্যোগে ধ্বংস করা হচ্ছে প্রকৃতি।
সরকারি উদ্যোগেই নির্বিচারে বাঁধ দিয়ে জলাধার তৈরি হয়েছে। শত বছরের প্রাচীন গ্রামগুলি চলে গেছে জলাধারের তলায়। একটি জলাধার কত গ্রামকে নদীতে পরিণত করে দেয়। এলাকার ইতিহাস-ভূগোল, সংস্কৃতি ধ্বংস করে দেয়। জলাধার তৈরির ফলে ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয় সেখানকার মানুষদের। কে কোথায় ছড়িয়ে পড়ে। হারিয়ে যায় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, মহুল সই। কত গ্রাম, গ্রামের ইতিহাস জলাধারের তলায় নিশ্চিহ্ন! সম্বলপুরে মহানদীকেও বেঁধে ফেলা হয়েছে হীরাকুদ বাঁধ দিয়ে। জলভাণ্ডার নির্মাণের ফলে মানুষের সঙ্গে পশুপাখিরাও বিপন্ন হয়ে গেছে। তাদের বসত হারিয়েছে। অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘মহানদী’ (২০১৫) আখ্যানে ঘরহারা নদী-উদ্বাস্তুদের মর্মন্তুদ হাহাকার প্রতিফলিত হয়েছে। জলজীবী মানুষের কথা এসেছে। মহানদীর ওপর নির্ভরশীল তারা। নিজেদের জমি-জায়গা নেই। ভূমিহীনতাকে কোনওদিন সম্পদহীনতা বলে মনে হয়নি। কিন্তু সময়ের ফেরে তারাও সম্পদহীন, অসহায় হয়ে পড়েছে। বাঁধের ফলে নদীতে মাছ কমেছে। নদীর জলও কমেছে। নদীর ওপর তৈরি হচ্ছে ব্রিজ। নৌকা চালানো যাদের বংশানুক্রমিক পেশা ছিল তাদের দিন চলছে না। ধীবর-কৈবর্তদেরও উপার্জন কমে যাচ্ছে। লোভে পড়ে কেউ কেউ অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনিতা এই উপন্যাসে নদী দূষণের নতুন একটি দিক উন্মোচন করেছেন। জলে ব্লাস্টিং করে মাছ ধরা। ব্লাস্টিংয়ে বড় মাছ মরে। কম দামে দ্রুত বিক্রি করে কিছু লোভী ব্যবসায়ী। এতে জলের দূষণ হয়। ছোট ছোট মাছরা মরে যায়। মাছের উৎপাদন কমে আসে। কিন্তু সরষের মধ্যে ভূত থাকায় এই ব্লাস্টিং কমানো যায় না। এছাড়াও আছে নদীর মধ্যে চিংড়ি মারার জন্য বিষপ্রয়োগ। এর ফলে কোনও কোনও এলাকায় মাছের ফলন তলানিতে এসে ঠেকেছে। মানুষের রুজিতে টান পড়ছে। কোনও কোনও জায়গার ঋতুচক্রেও প্রভাব ফেলেছে মহানদীর বাঁধ। যে সময় বর্ষা আসার কথা সে সময় আসছে না।

বীরেন শাসমলের ‘জলকর’ (২০১৯)-এ আছে সুন্দরবনের ভেড়ি কালচারকে কেন্দ্র করে পরিবেশের বিপর্যয়ের চিত্র। একসময় বাদাবন কেটে বসতি গড়ে উঠেছিল। মানুষ সাধ্যমতো, প্রয়োজনমতো চাষের জমি তৈরি করেছিল। পরে চাষের জমি বদলে যেতে থাকে ভেড়িতে। সেই বদল বহুক্ষেত্রেই হয় জোর করে। কাঁচা পয়সার লোভে মাটি, মাছ, ইট ভাঁটার অধিকার নিয়ে লড়াই চলে। ভেড়ি-মাফিয়াদের সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক দল। আর ধ্বংস হয়ে যায় সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশ। সুন্দরবনের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ভেড়ি কালচারের ওপর। জলকরের নেশা বড় নেশা। কাঁচা টাকার লোভে মানুষ পাগলের মতো জমিতে থাবা বসাচ্ছে। শস্যশ্যামলা গ্রামবাংলার সবুজ ধ্বংস করে রাতারাতি বেড়ে উঠেছে জলকর। ঢুকে পড়েছে মুনাফালোভী কর্পোরেট হাউসের টাকা। চাষের জমি জলকর খেয়ে নিয়েছে। এখানকার সাধারণ মানুষের চোখে— “জলকর হল গে রাক্ষস। মানুষেরে ধরি ধরি খেয়ে লেচ্ছে। চাষি বলতি আর কেউ থাকছে নে।” সুন্দরবনে মোট দ্বীপ ছিল ১০২টি। বহু দ্বীপ খেয়ে নিয়েছে বঙ্গোপসাগর। যেমন লোহাচরা, সুপারিভাঙা দ্বীপ। আয়লায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে অচিন্ত্যনগর। ঘোড়ামারা দ্বীপও এখন ভাঙনের মুখে। সুন্দরবনের পরিবেশের আর একটি সমস্য ইটভাঁটা। লোভী মানুষ মাটি কেটে কেটে তছনছ করে দিচ্ছে। এখানে ওখানে ইটভাঁটা বানিয়ে মস্ত চোঙ তুলে দিচ্ছে আকাশে। আইনে বলা আছে ছ’ফুটের বেশি নীচে খুঁড়তে পারবে না। কিন্তু ওরা চোদ্দো ফুটের বেশি খুঁড়ে ইট বানিয়ে শহরে বিক্রি করছে। মাটির গোড়া আলগা। এত নীচে ঘাসের শিকড়ও গজাবে না। ইটভাঁটা সুন্দরবনের মাটির সর্বনাশ করে ছেড়ে দিচ্ছে। পরিত্যক্ত ইটভাঁটায় কোনওদিন চাষ হবে না, মাছও হবে না। মাটি বন্ধ্যা।
জলবায়ু পরিবর্তন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে এপ্রিলের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রতল বৃদ্ধি বছরে গড়ে ৩.২ মিলিমিটার মতো হলেও আমাদের সুন্দরবনে তা প্রায় ৮ মিলিমিটার। কারণ মাটি বসে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে তা আরও বেশি। শুধু সুন্দরবন নয়, পৃথিবীর সমস্ত দ্বীপগুলিই এখন বিপন্ন। যাদের সামর্থ্য আছে তারা বসবাস গুটিয়ে অন্যত্র চলে আসার ব্যবস্থা করছেন। বহু দ্বীপে কোনও পাহাড় বা উঁচু জায়গা নেই। বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে দ্বীপবাসীদের পালানোর উপায় নেই, সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া।
ভারতে দূষণ সংক্রান্ত প্রথম আইন হয়েছিল ১৯৭৪ সালে, জলদূষণ সংক্রান্ত আইন। সেই আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ হয়নি ঠিকমতো। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‘জলতিমির’ (১৯৯৮) উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে জলদূষণ। পানীয় জলের ভয়াবহতা। আর্সেনিক সংক্রান্ত দূষণ মহামারির আকার নিয়েছে বিগত কয়েক দশকে। আর এই ভয়াবহতার মূলেও সভ্যতার অগ্রগতি। গত চার দশক ধরে গ্রীষ্মকালে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ জলের বিপুল পরিমাণ ব্যবহার রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত যখন বৃষ্টি হয় না তখন এলোপাথাড়ি ডিপ এবং শ্যালো নলকূপ দিয়ে জল টেনে তোলার ফলে জলের স্তর অত্যন্ত নীচে নেমে যায়। পাইরাইট নামে একধরনের মিনারেল, আর্সেনিক মিলেমিশে লুকিয়ে থাকে যার মধ্যে। জলতলের শূন্যস্থানে বায়ুর সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিষে পরিণত হয়। জলের লেভেল বেশি উঁচু থাকলে শূন্যস্থান তৈরি হয় না। বায়ুর সঙ্গে পাইরাইটের রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রশ্ন ওঠে না। তাই বর্ষাকালে আর্সেনিক সমস্যা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে কৃষিজমির পরিমাণ বাড়েনি। তাই পরিমিত জমিতে ফলন বাড়াতে হয়েছে। উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহারে চাষের জন্য জলের প্রয়োজন বেড়েছে। ভূগর্ভস্থ জলের লেভেল নেমে যাওয়ায় শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পাইরাইটের মধ্যে আর্সেনিক রূপের সঙ্গে বায়ুর অক্সিজেনের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে মারণ বিষ। নতুন বীজ, নতুন চাষে সেচের জলের দাবি বাড়বে, উৎপাদন তিন-চার গুণ হবে এবং আর্সেনিকের উৎপাত বাড়বে অনিবার্যভাবে। এ যেন সভ্যতার অগ্রগতির সাইড এফেক্ট।

গত পাঁচ দশকে বাংলার যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে কত ধরনের কারখানা। হেভি কেমিক্যালের কাজ হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারিং লাইসেন্স ছাড়া। ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে এই রাসায়নিক কারখানাগুলি এবং তার পরিবেশ। আবুল বাশার ‘শেষ রূপকথা’ (১৯৯৯) উপন্যাসে রাসায়নিক দূষণের ভয়াবহ স্বরূপটি উন্মোচিত করেছেন। মার্কারি একটা ধাতু। তৈরি করা যৌগটির নাম মারকিউরাস ক্লোরাইড। তার বিষক্রিয়া চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে যায়। নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করলে ধাতুবিষে মানুষ আক্রান্ত হয়। মাত্রার তারতম্যে এই যৌগ কখনও ওষুধ কখনও বা গরল। মানুষের মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ঢিলে হয়ে যায় এর প্রভাবে। আখ্যানে একটি কারখানার কথা এসেছে। তার ড্রেনেজ বলে কিছু নেই। কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য গিয়ে পড়ে পুকুরে। পুকুরের জল বিষকুম্ভ। সোকপিট উপচে জল চলে আসে রাস্তায়। পুকুরপাড়ে গজানো ঘাসে জমত টক্সিক পদার্থ। দিনের পর দিন সেই ঘাস খেয়েছে পুকুরপাড়ে অবস্থিত খাটালের গোরু। পুকুরের জল দিয়ে জাবনা দিত গোরুদের। গাভীদের বাঁটে গিয়ে জমে ধাতুবিষ। দুধ পরিণত হয় বিষে। কেমিক্যালের প্রভাবে গাইগুলোর বাঁটে ঘা হয়। ফোঁড়া ফেটে পুঁজরক্ত যেভাবে রং ধরে, দুধের রংও সেইরকম। সেই দুধ খেয়ে একটি শিশুকন্যা অন্ধ হয়ে গেল। তার সারা গায়ে ঘা হয়েছিল। শিশুর দাঁতের গোড়ায় অবধি পৌঁছে গেছিল ঘা। চেহারাও কেমন বিকৃত হয়ে গেছিল। কৃষ্ণ বুঝতে পারত মৌয়ের অসুখের কারণ। হঠাৎই একদিন মারা গেল মৌ। তার শরীরে মৃত্যুর আগে কতকগুলো স্ফোটক ধরনের কী ফুটে উঠেছিল। লেখক দেখিয়েছেন রাসায়নিক বিষ কীভাবে মানুষের ভাবাবেগকে প্রভাবিত করে। এই ধরনের কারখানা আমাদের দেশে মানুষের জীবন এবং যৌবন দুই-ই কেড়ে নিতে পারে। বিকারগ্রস্ত করে তোলে। স্নায়ুতন্ত্রের ব্যাধিতে আক্রান্ত করে তোলে। পুরো একটি কারখানা ঢুকে যায় কৃষ্ণের মগজে। সে শুয়ে শুয়ে বিষ-শৃঙ্খলের একটি ভয়াবহ রেখাচিত্র কল্পনা করে— “ভয়ঙ্কর কোনও বর্ষা নামছে পৃথিবীতে। অতি বৃষ্টির দাপটে পুকুর ভরে উঠে উপচে যাচ্ছে বিষাক্ত জল। ছড়িয়ে পড়ছে অন্য পুকুরে এবং ডোবায়। এই সব ঘটছে আদি গঙ্গার বদ্ধ জলের ভিতর। পুকুরের মাছগুলি চলে যাচ্ছে আদি গঙ্গার জলে। একদিন বৃষ্টি থামলে সেই মাছ বাজারে উঠবে। মানুষ সেই মাছ খেয়ে অন্ধ হবে এবং মরবে। এই আদি গঙ্গার জনবসতি শ্মশান হয়ে যাবে। শ্মশান ঘাটে আর খেলা করবে না ডানাঅলা ক্ষুদ্র পরী।… একটি প্রকাণ্ড মাছের আস্ফালন শোনা গেল পুকুরের জলে। ছোট মাছকে খেয়েছে এই মাছটা। অজস্র মায়ামাছ চলে গেছে এর পেটে। এক একটা ছোট কারখানা ঢুকে গেছে এই বৃহৎ মাছের উদরে। এইভাবে ছোট ছোট ভোপাল রচনা করেছে ভারতবর্ষ।”
রাসায়নিক দূষণের অন্য একটি মাত্রা উঠে এসেছে এই আখ্যানে। কাহিনির শেষে এসেছে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কারখানাগুলির কথা। বন্দুক-গুলি-বারুদ-মাস্কেটের কারখানা! “ধাতুবিষ সভ্যতার শেষ বিলয়ভূমি, নগর থেকেই সভ্যতার পতন হবে।… পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলা করবে হিংস্র রাষ্ট্রগুলি, গ্রাম খেলা করবে মাস্কেটে মাস্কেটে, গুপ্ত বোমায়, নগরের সব সোক পিট উপচে পড়বে বিষস্রাবের ধোঁয়ায়। পৃথিবীর করুণার কাব্যে গাভীগুলি হবে বিষাক্ত। সাধের গ্রহ এই পৃথিবী একদিন আশ্চর্য গরলদ্রবে গ্যাসে মিলিয়ে যাবে। তখনও কি তোমার অপরিজ্ঞাত পাপকে বুঝে উঠতে পারবে না সত্য সনাতন পির?”

মনে পড়ে হিরোশিমা বিস্ফোরণের কথা। ভোপাল এখনও মানুষের বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ১৯৮৪-র ডিসেম্বরের দুর্ঘটনার প্রভাবে আজও বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মাচ্ছে। একবার যার শরীরে বিষ ঢুকেছে সে সারাজীবনের মতো অসুস্থ হয়ে গেছে। ‘গ্যাস ভিকটিম’ তকমা লেগে গেছে তাদের গায়ে। এইরকম মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না। কারণ তারা হয়তো সন্তান জন্ম দিতে পারবে না। পারলেও সন্তানের বিকলাঙ্গ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এই ধরনের মেয়েদের বিয়ে করলে চিকিৎসায় প্রচুর টাকা খরচ করতে হবে। তাই ’৮৪-র শিশু মেয়েরা, আজ যারা পূর্ণ যুবতী, তাদের অনেকেরই বিয়ে হচ্ছে না। ছেলেদেরও হাত-পা অসাড়, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, যৌনসক্ষমও নয় অনেকেই। শুক্রাণুর সংখ্যা কম। সন্তান জন্ম দিতে পারছেন না। দাম্পত্য জীবনে স্বস্তিতে নেই। প্রশাসনের বক্তব্য— অত বড় বিপর্যয়ের ধাক্কা তো থাকবেই। কিন্তু সাধারণ মানুষেরা ভিকটিম শুধু। তারা এই বিপর্যয়ের দায় কেন নেবেন? যাদের অবহেলায় এরকম ভয়ানক কাণ্ড ঘটল তাদের কী হল ? ইউনিয়ন কার্বাইডের বর্জ্য সরানোর ব্যবস্থা হয়নি এখনও। তাই সেখানকার অভিশাপও মুছছে না।
পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ চেহারা উঠে আসছে বিভিন্ন সমীক্ষায়। হিমালয়ে বাসা বেঁধেছে নানা ক্ষয়রোগ। পাহাড়গুলোতে গাছ কমে যাচ্ছে। বাড়ছে ধসের প্রবণতা। সমুদ্রের বালিয়াড়ির মধ্যে রিসর্ট হচ্ছে। সরকার উদাসীন। সাঁতরাগাছির ঝিলে দূষণের জন্য শীতে পাখিরা আসছে না আর। শকুন বিলুপ্তির পথে। এই প্রজাতিটির এতই করুণ অবস্থা যে এখন ভারতবর্ষের তিনটি জায়গায় শকুন প্রজনন কেন্দ্র তৈরি করতে হয়েছে। হরিয়ানার পিনজোরে (২০০৪), পশ্চিমবঙ্গের রাজাভাতখাওয়ায় (২০০৬) এবং অসমের গুয়াহাটিতে (২০০৮)। শুধু শকুন নয়, আরও কত কত পাখি বিলুপ্তির পথে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (IUCN) পৃথিবীর বিভিন্ন প্রজাতির হিসেব রাখে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক পৃথিবী থেকে গত ৫০০ বছরে চিরতরে হারিয়ে গেছে ৮৭৫টি মেরুদণ্ডী প্রাণীর প্রজাতি। তাদের সর্বশেষ তালিকা (২০১২) অনুসারে পৃথিবীর ১০,০৬৪টি পাখি প্রজাতির মধ্যে ১৩০টি বিলুপ্ত। ৪টি বেঁচে আছে খাঁচাবন্দি অবস্থায় (Extinct in the wild)। ১৩১৩টি প্রজাতি ‘বিপন্ন’ এবং ৮৮০টি ‘প্রায় বিপন্ন’ বলে চিহ্নিত। বর্তমান পাখি প্রজাতির পাঁচ ভাগের এক ভাগই বিপন্ন বা প্রায় বিপন্ন!
এই বিপন্নতার দায় তো আমাদেরই। পরিবেশের নির্জনতা নষ্ট করছি আমরা ভ্রমণের নামে। সঠিক পরিকাঠামো ছাড়া হাজার হাজার ট্যুরিস্ট পাঠাচ্ছি বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে-সমুদ্রে। বন্য জন্তুদের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে তাদের। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে তারা। সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। সেখানেও দূষণ। চাষাবাদে ব্যবহৃত বিভিন্নরকম রাসায়নিক, সমুদ্রযানের জ্বালানি, খনিজবাহী জাহাজ থেকে নানারকম খনিজ ইত্যাদি মিশে সমুদ্রকে দূষিত করে তুলেছে। সামুদ্রিক মাছ কমে যাচ্ছে। কাঁকড়া কমছে। আরও কত সামুদ্রিক জীবজন্তু বিলুপ্ত হতে চলেছে।

পৃথিবীজোড়া পরিবেশের এই সংকটের প্রেক্ষাপটে আমাদের সাহিত্য পাঠের দৃষ্টিভঙ্গিরও বদল ঘটেছে। সাহিত্যমূল্যের পাশাপাশি পরিবেশগত মূল্য নিয়েও চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। পরিবেশবাদী সাহিত্যের উপযোগিতাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই আর। পরিবেশের বহুমাত্রিক স্বর ধারণ করে আছে এই সময়ের বাংলা সাহিত্য। এখানে শুধু নির্বাচিত উপন্যাসের কথা বলা হল। বাংলায় পরিবেশবাদী গল্প, কবিতাও কম লেখা হয়নি। উপন্যাসের মতো সেখানেও ধরা আছে বিপন্ন পরিবেশের আতঙ্কিত সংলাপ। লেখকদের এই পরিবেশ ভাবনা সঞ্চারিত হচ্ছে বৃহত্তর পাঠকদের মধ্যেও। এভাবেই তো জনচেতনার সঞ্চার হয়। মানুষ রুখে দাঁড়ায় পরিবেশের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। এই পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে রাখতে চায়। আর সমবেত চাওয়াই তো সাফল্য এনে দিতে পারে। পেরেছেও তো।
ওড়িশার কালাহান্ডি আর রায়গড়া জেলার ডোঙ্গরিয়া কোন্দ জনজাতির মানুষ তাদের নিয়মরাজা নিয়মগিরি পর্বতকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ সংগ্রাম করে চলেছেন ২০০৪ সাল থেকে। মনে পড়ে চিপকো আন্দোলনের কথা। বন-শহিদদের কথা। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কথা। এই ধরনের ঘটনাগুলিকে আলোকিত করার সময় এসেছে। নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সেই ভাবনায় কিছুটা হলেও অক্সিজেন দেবে এই পরিবেশবাদী উপন্যাসগুলিও।
প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশের মানুষ প্রকৃতি সচেতন ছিল। সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বরং মানুষের পরিবেশ সচেতনতা কমেছে। বনবাসী আর্যরা প্রকৃতির উপাসক ছিলেন। বেদ-উপনিষদ-আরণ্যক-রামায়ণ-মহাভারতের দীর্ঘ অংশ জুড়ে আছে অরণ্য-প্রকৃতির কথা। কৌটিল্যের সময়ে বনভূমি সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অশোকের শিলালিপিতে পথের দু’ধারে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ আছে। শের শাহ নির্মিত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের দু’ধারে গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন সম্রাটই। মোগলরা উদ্যান তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন। বাংলার লোকায়ত ব্রতকথাগুলি প্রকৃতিকে ভালবাসতেও শেখায়।
শেষ করব একটি প্রাচীন গল্প স্মরণ করে। আমাদের সবার জানা বোকা কালিদাসের গল্প। গাছের যে ডালে বসেছিল, সেই ডালই কেটেছিল নিজের হাতে। নিজের মৃত্যু পরোয়ানা নিজেই ডেকে এনেছিল। গাছই তো আমাদের প্রাণবায়ু যোগান দেয়। পরিবেশই বাঁচিয়ে রাখে আমাদের। যে গাছ, যে পরিবেশের কল্যাণে আমাদের বেঁচেবর্তে থাকা, সেই গাছ, সেই পরিবেশকে প্রতিদিন তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছি আমরা। কালিদাস অবশ্য বেশি দিন বোকা থাকেননি। তাঁর রচনার একটা বড় জায়গা জুড়ে তাই এসেছে পরিবেশের বর্ণনার সমারোহ। মানুষের বোকামি কবে দূর হবে কে জানে! কে জানে আমরা কবে সচেতন হব পরিবেশ সম্পর্কে। পরিবেশবাদী সাহিত্য এবং সাহিত্যের পরিবেশবাদী পাঠ পরিবেশ সংরক্ষণে কিছুটা হলেও সচেতন করবে এমন আশা তাই রয়ে যায় মনে।

তথ্যসূত্র
১। জয়ন্ত বসু, ‘সুন্দরবন না বাঁচলে কলকাতাও মরবে’, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ৬ জুন, ২০১৪।
২। সোমা মুখোপাধ্যায়, ‘শরীরে বিষ, ফতিমাদের তাই বর জোটে না’, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৩।
৩। প্রসাদরঞ্জন রায়, ‘একটি প্রজাতির মৃত্যু’, নবপত্রিকা, একদিন, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩।

২ Comments
  1. Ujjal Roy says

    সমৃদ্ধ হলাম।

  2. শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য says

    এই সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা। সাহিত্যে পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা আরও বেশি করে আনতে হবে।

মতামত জানান

Your email address will not be published.