বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সিনেমার দর্শক : অস্তিত্ব খোঁজার পালা

নতুন দশকে সংবাদপত্রে ‘পেজ থ্রি’ কালচার শুরু হওয়ার ফলে গঠনমূলক আলোচনা বন্ধ হয়। পক্ষপাতের ফলে প্রচার প্রাধান্য পায় এবং শিল্পচর্চার পরিবেশ নষ্ট হয়। অথচ অতীতে আলোচকদের দ্বারা দর্শকরা সমৃদ্ধ হতেন।

বিশ্ব রায়

একটি ভাল ছবি দেখার আগে দর্শকের মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। দর্শকের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যও তাতে ধরা পড়ে। এই প্রেক্ষিতের ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র শিল্পে নির্মাতা ও অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং দর্শকের সম্পর্কের ইতিবৃত্তটি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব। তবে নির্মাতা ও অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং দর্শকের সম্পর্কের বিষয়ে আলোকপাত করার আগে আর একটি বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। তা হল, চলচ্চিত্র সমালোচকদের দিকটি।
মোটামুটি গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত আমরা যদি সংবাদপত্রগুলি লক্ষ করি তাহলে দেখব, শিল্প সমালোচনা— বিশেষ করে নাটক এবং ছবি (সিনেমা) রিভিউয়ের জন্য সমালোচকদের অনেকটা স্পেস দেওয়া হত। নতুন দশকে সংবাদপত্রে ‘পেজ থ্রি’ কালচার শুরু হওয়ার ফলে গঠনমূলক আলোচনা বন্ধ হয়। পক্ষপাতের ফলে প্রচার প্রাধান্য পায় এবং শিল্পচর্চার পরিবেশ নষ্ট হয়। অথচ অতীতে আলোচকদের দ্বারা দর্শকরা সমৃদ্ধ হতেন। সামগ্রিকভাবে সিনেমার প্রতি তাঁদের আগ্রহও বাড়ত। অন্যদিকে, এই আলোচকদের আলোচনা (রিভিউকে) নির্মাতারা বাজার তৈরির সহায়ক হিসেবে (কিছুটা হলেও) গুরুত্ব দিতেন। আর অভিনেতা-অভিনেত্রীরা দুটি কারণে সমালোচকদের গুরুত্ব দিতেন। ১) নিজেদের দর্শকের নজরে আনতে বা দর্শকদের সমর্থন পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে। ২) নিজেদের অভিনয় ক্ষমতা যাচাই করার জন্যও গুরুত্ব দিয়ে থাকতেন।
যদিও এই কথা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকতেই পারে। কেউ বলতেই পারেন, সমালোচকের কলমের এমন কী জোর যে দর্শককুলকে নিয়ন্ত্রণ করবেন? এই কথারও দ্বিমত পোষণ করি না। নির্মাতা ও বিশিষ্ট অভিনেতা-অভিনেত্রীকে নিয়ে গোষ্ঠী তৈরি করে একটা সূক্ষ্ম বিভাজনের রীতি বহু দিন থেকে চলে আসছে, যা আমরা থিয়েটার আর চলচ্চিত্র উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ করি। শিল্পক্ষেত্রে যা ক্ষতি তো অবশ্যই। এই ক্ষতি সমগ্র বাংলা সংস্কৃতির।
বঙ্গদেশে ছবি নিয়ে বিশিষ্টজনদের গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনাগুলিকে তাই বলে আমি অস্বীকার করছি না। আমরা যা পড়েছি বা জেনেছি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৫৮ সালে The Statesman পত্রিকার পাতায় ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে নীরদচন্দ্র চৌধুরী ও সত্যজিৎ রায়ের পত্র বিনিময়। আবার ১৯৬৫ সালে NOW নামের একটি পত্রিকার পাতায় সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ নিয়ে চিদানন্দ দাশগুপ্ত, প্রবোধ মৈত্র, সত্যজিৎ রায় ও অন্যান্য বিশিষ্টজনের মত-মতান্তর। ১৯৬৫ সালে মৃণাল সেনের ‘আকাশকুসুম’ নিয়ে The Statesman পত্রিকার ফিল্ম ক্রিটিকের আলোচনার সূত্র ধরে সত্যজিৎ রায়, আশিস বর্মণ, মৃণাল সেন, বরুণ চন্দ এবং একাধিক ব্যক্তির পত্র বিনিময় রীতিমত পত্রযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। এছাড়া, ‘কলকাতা ৭১’ নিয়ে, সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ ছবি নিয়ে আলোচনা স্মরণযোগ্য। তালিকা না বাড়িয়ে সব শেষে উল্লেখ করছি দুটি আলোচনার কথা। তা প্রকাশ পেয়েছিল Frontier পত্রিকার পাতায়। প্রথমটি, মৃণাল সেনের সামাজিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ বিষয়ে একটি সামগ্রিক আলোচনা। এবং দ্বিতীয়টি, ঋত্বিক ঘটকের সমগ্র চলচ্চিত্র জীবন নিয়ে বিশ্লেষণ। এই ক্ষেত্রেও একদিকে যেমন মত-মতান্তর ঘটেছিল অন্যদিকে তা শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে, দেখার চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক সমাজে তা কতটা ছাপ ফেলতে পেরেছে সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।
আমরা দেখেছি, চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কিছু আলোচক সচেতনভাবে নিজেদের আভিজাত্য প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁদের লেখা বা আলোচনা এমন করে লিখেছেন যার ফলে ছবিটির প্রতি সাধারণ দর্শকদের আগ্রহ তৈরি হয়নি বরং তা তাঁদের বোঝার বাইরে রয়ে গেছে। আমি কখনওই বলছি না লেখককে বা সমালোচককে সাধারণ দর্শকদের বোঝানোর জন্য তাঁর লেখাটির সরলীকরণ করতে হবে। বরং আমি বলতে চাই, একটি উচ্চমার্গের ছবি সমালোচকের লেখনীর উপস্থাপনের গুণে কীভাবে সাধারণ একজন দর্শকের বোধের উত্তরণ ঘটাতে পারে তা সমালোচক হিসেবে তাঁদেরও চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখের যে তা অনেক সময়েই ঘটেনি।

এবার আসা যাক দর্শকদের প্রসঙ্গে। একটা সময় বাংলা সিনেমার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দি সিনেমা তৈরি হয়েছে। আর এখন দক্ষিণের সিনেমার ফ্রেম টু ফ্রেম কপি করে বাংলা সিনেমা তৈরি হচ্ছে। এক শ্রেণির দর্শক তাই দেখছেন। আর অন্য একদল সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল থেকে গৌতম, উৎপলেন্দু হয়ে ঋতুপর্ণ, অপর্ণা ছুঁয়ে হালের কৌশিক, অঞ্জন দত্ত, সৃজিতদের কাছে আশ্রয় খুঁজছেন।
ছবি নির্মাতাদের মূল্যায়ন কীভাবে করব? মনে পড়ে, একদা মৃণাল সেন লিখেছিলেন : ‘আমি প্রথম সামাজিক মানুষ তারপর ছবি করিয়ে, সামাজিক মানুষ হিসেবে আমি react করি surrounding situation-এ।’ বাস্তবিক যে, সামাজিক মানুষ হিসেবে শিল্পীর দায় শেষ হয় না। সত্তরের দশকে মৃণাল সেনের ছবি প্রতিবাদমুখর, আশির দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবচ্ছেদ করে দেখান তিনি, আর নব্বইয়ের দশকে তাঁর ছবি অন্তর্মুখী। নতুন দশকে তাঁর শেষ ছবি ‘আমার ভুবন’-এ বাঙালির ধর্মীয় বিভাজনকে আন্ডারলাইন করার যে প্রবণতা সেই মানসিকতার লোকেদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখান আর শেখান যে, ধর্ম নয়, শ্রেণিবিভাজন আসলে অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
আমাদের এক সাংবাদিক বন্ধু একদিন কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, কমার্শিয়াল সিনেমা আর আর্ট ফিল্মের মধ্যে মিলিয়ে দেখা নাকি অবান্তর! আমি সেদিন মনে মনে ভেবেছিলাম, কোনও পরিচালক কি চান তাঁর ছবি দর্শকদের আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত থাকুক? আর্থিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ুক? সেই কথার সূত্র ধরে প্রশ্ন ওঠে, কমার্শিয়াল ছবির সংজ্ঞা কী? হাল আমলের সিনেমাগুলোকে যদি কমার্শিয়াল সিনেমার উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় তাহলে তো অজয় কর, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদারদের তৈরি সিনেমাকে আর্ট ফিল্ম বলতে কোনও দ্বিধা থাকে না। বরং অতীত ও বর্তমানের ছবিগুলোর কথা মাথায় রেখে আর্ট ফিল্ম বা কমার্শিয়াল ফিল্মের বিভাজন না করে ভাল ছবি (Good film) আর মন্দ ছবি (Bad film)-র বিভাজনরেখাটিকে সমর্থন করা যায়।
ফিল্ম বা সিনেমা অন্য মাধ্যম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনই অন্য শিল্পমাধ্যমের তুলনায় দর্শকদের আকর্ষণ করার ক্ষমতাও বেশি অর্জন করেছে। ফলে সমাজে চলচ্চিত্রের প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। সেই কারণে চলচ্চিত্রস্রষ্টার যেমন দায়দায়িত্ব রয়েছে, তেমনই দ্রষ্টার অর্থাৎ দর্শকেরও দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। এখন প্রশ্ন, চলচ্চিত্রশিল্প সঠিকভাবে গঠনকালে স্রষ্টারা নিজ দায়ভার রক্ষা করবেন কীভাবে এবং দ্রষ্টারা নিজেদের কর্তব্যর প্রতি সচেতন থাকবেন কীভাবে?
একজন সাধারণ মানুষ তাঁর বোধকে কাজে লাগিয়ে সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে উঠতে পারেন। গড়ে উঠতে পারে একটা জীবনদর্শন। সিনেমার ক্ষেত্রে সেই দর্শন কী? ‘Fan’ নয়, নিজেকে ‘Critic’ হিসেবে তৈরি করতে হবে। আমি ‘Critic’ বলেছি, ‘সমালোচক’ না বলে। কেন? কারণ, বাঙালির কাছে ‘সমালোচক’ শব্দটি অর্থগতভাবে ‘সম আলোচনা’-কে যতটা না চিহ্নিত করে, ভাবগতভাবে ‘খুঁত খোঁজা’ কোনও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে বেশি। আসলে সব মিলিয়ে এমন এক মূল্যায়নকারী ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে হবে যিনি বিশ্লেষণকালে অন্ধ অনুরাগী নন। তিনি একইসঙ্গে আভিজাত্যপূর্ণ এবং ভক্তিতে অটল। কোনও ব্যক্তি (দর্শক) যদি জনগণের মধ্যে থেকে উঠে এসেও নিজেকে অনুসন্ধান করতে সমর্থ হন তখন তিনি আবিষ্কার করতে পারবেন কোন পথটা তাঁর। নিজের অস্তিত্ব খুঁজে নেওয়ার পথে এই যে প্রশ্নচিহ্ন, সেটাই হবে নতুন দর্শক গড়ে ওঠার পথ। নির্মাতারাও তখন সেই পথের পথিক হয়ে উঠবেন।

ছবি : ইন্টারনেট
মতামত জানান

Your email address will not be published.