বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সেকেলে গপ্পো

এদেশে মানুষ আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য কাঠ, ধানের তুষ, পরের দিকে ঘুঁটে ছাড়াও যার সাহায্য নিত তা ওই টিকে। এগুলো রাখা হত যে পাত্রে তাকে বলা হত আগুনের মালসা। ধূপ-ধুনো জ্বালানোর কাজেও লাগত এই টিকে।

গৌতমকুমার দে

পর্ব ৫

টিকে

না না। আঁতকে উঠবেন না। এ ‘টিকে’ সে ‘টিকে’ নয়। অর্থাৎ রোগের প্রতিষেধক নয়। রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘প্রেমরোগের টিকে’ (১৮৯২) কিংবা এ সময়ের সর্বাধিক চর্চিত দেশ-দুনিয়াখ্যাত কোভিড টিকাও নয়। এ হল গিয়ে তামাকবিলাসীদের তামাক পোড়ানোর জন্য কাঠকয়লার গুঁড়ো দিয়ে তৈরি গুটি বা চাকতির মতো একপ্রকার জ্বালানিবিশেষ।
টিকের আর এক নাম টিক্কা। দুটোরই উৎস এক ও অভিন্ন— হিন্দি শব্দ ‘টিকিয়া’। সাহিত্যের ভাষাতেও সসম্মানে ঠাঁই পেয়েছে শব্দদুটি। নমুনা ১ : “মতিলাল পিছন দিক দিয়া একখানা চলন্ত টিকে দাড়ির উপর ফেলিয়া দিল।” (প্যারীচাঁদ মিত্র, ১৮৫৮)। নমুনা ২ : “চিলিম হাতে হাত দোলাইয়া টিক্কা ধরাইতে লাগিলেন।” (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৫৩)।
টিকেকে ‘তামাকের গুল’ বলতেও শুনেছি। বিশেষত পূর্ববঙ্গীয় মানুষজনের কথ্য ভাষায়। হুতোমের লেখাতেও পড়ে থাকবেন এই শব্দবন্ধ : “চাকরদের কাছে (এক জন বুড়ো উড়ে মাত্র) তামাকের গুল, মুড়ো খ্যাংরার দিনে দু বার নিকেশ নেওয়া হয়—” (সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা, সুবর্ণরেখা, বৈশাখ ১৪০৩, পৃ-৭০)। সেযুগে হুঁকোর কুরুক্ষেত্র একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। ফলত তামাকের গুলের আগুনও নিভত না বললেই চলে। তখন “গাঁজার হুকো একবার এ থাকের পাশ মেরে ও থাকে গ্যালো। ঘরের এক কোণে হুঁকো থেকে আগুন পড়ে যাওয়ায় সে দিকের থাকেরা রল্লা করে উঠে দাঁড়িয়ে কোঁচা ও কাপড় ঝাড়চেন ও কেমন করে পড়্‌লো প্রত্যেকে তারই পঞ্চাশ রকম ডিপোজিশন দিচ্ছেন।” (প্রাগুক্ত, পৃ-৭৯)। এই যে ‘আগুন’, তার উৎস অবশ্যই থাকত টিকে বা টিক্কা।
তা বলে এটা ধরে নেওয়াটা ঠিক হবে না যে গোড়া থেকেই তামাক ধরানোর জন্যে টিকের ব্যবহার চলে আসছে। বঙ্গে, বিশেষ করে দক্ষিণাংশে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে জ্বালানির কাজে সুন্দরী কাঠ ব্যবহারের চল ছিল। স্বভাবতই সেসময় এই জ্বলন্ত কাঠের টুকরো ব্যবহৃত হত। ক্রমশ জ্বালানি হিসেবে সুন্দরী কাঠের জায়গা নিতে থাকল কয়লা। তামাক খাওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানি রূপে কয়লার ব্যবহারে খাওয়ার সুখ কমে যেত। কারণ আঁচের ব্যাপারে তামাক অত্যন্ত সংবেদনশীল। নেশার ক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে কয়লা সত্যিই বেজায় বেখাপ্পা। ভয়ানক উগ্র, প্রায় অনুভূতিশূন্য। তুলনায় কাঠকয়লা অনেকটাই চলনসই।
কাঠকয়লার এই বাস্তবোচিত গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন উত্তর-পূর্ব কলকাতার মানিকতলানিবাসী ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষরা। তাঁদের তৈরি কাঠকয়লা ভেঙে চাকতি আকারের টুকরো ব্যবহার করতে লাগল তামাকু সেবনকারীরা। ধর্মীয় গোঁড়ামিবশত প্রথম দিকে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল মুসলমানদের মধ্যে। পরের দিকে নেশার তোড়ে ভেসে যায় সে ছুঁৎমার্গের বাঁধ। সেকালে লোকমুখে এই নেশার জ্বালানি পরিচিতি পেয়েছিল ‘কালোবাতাসা’ নামে। মহেন্দ্রনাথ দত্ত-সহ নানাজনের লেখায় আছে ‘কালোবাতাসা’র কথা। “যখন সুঁদুরী কাঠের জ্বালের প্রথা উঠিয়া গেল এবং পাথুরে কয়লার প্রচলন হইল, ঠিক সেই মাঝ বরাবর সময়ে লোকের তামাক খাইবার বড় কষ্ট হইল। কিন্তু মানুষের এমন বুদ্ধি যে মানিকতলার মুসলমানরা কাঠকয়লা গুঁড়িয়ে চাকতি করে একপ্রকার জিনিষ বাহির করিল, প্রথমে লোকে তাহা দেখিয়া কালবাতাসা নাম দিল এবং মুসলমানদের হাতের জল বা ফ্যান আছে বলিয়া যাঁহারা গোঁড়া হিন্দু তাঁহারা ছুঁইতেন না। কিছুদিন এ একটা বড় সমস্যা হইল যে মুসলমানদের জল ছোঁয়া যাইতে পারে কি না? কিন্তু এমন আবশ্যকীয় জিনিষ যে, ক্রমে ক্রমে চলিয়া গেল, গোঁড়াদের আপত্তি চলিল না।” (কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা, মহেন্দ্রনাথ দত্ত, মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি, ১৩৮২ বঙ্গাব্দ)।

নদিয়া জেলায় নানান জায়গার দারোগা ছিলেন গিরিশচন্দ্র বসু। ১৮৬০ সালে অসুস্থার কারণে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে মুর্শিদাবাদের নবাবের প্রাইভেট সেক্রেটারি এবং শেষে কালীকৃষ্ণ ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার হন। তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’-তে আছে তৎকালীন গৃহস্থবাড়িতে টিকা ব্যবহারের কথা। “রাত্রিকালে টিকা বা প্রদীপ জ্বালিবার নিমিত্ত অনেকক্ষণ যাবৎ ঠকঠক করিয়া শোলায় চকমকি ঠুকিতে হয়।”
লাইটার তো দূর অস্ত, এদেশে মানুষ আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য কাঠ, ধানের তুষ, পরের দিকে ঘুঁটে ছাড়াও যার সাহায্য নিত তা ওই টিকে। এগুলো রাখা হত যে পাত্রে তাকে বলা হত আগুনের মালসা। ধূপ-ধুনো জ্বালানোর কাজেও লাগত এই টিকে। ইংরেজরা তাদের সিগার ধরাত এই টিকের আগুন থেকেই। স্বচক্ষে দেখা, মৃত ব্যক্তির মুখাগ্নির জন্যেও আগুন ধরানো হচ্ছে টিকে থেকে। এই ঘটনা দক্ষিণ কলকাতা শহরতলি অঞ্চলে গড়িয়া সংলগ্ন শ্মশান ও নিমতলা শ্মশানের। প্রথমটি ১৯৯৮ সালে, দ্বিতীয়টি ২০০১-এর। গ্রামাঞ্চলে আজও অনেক জায়গায় টিকের আগুন থেকেই মুখাগ্নির কাজ সারতে দেখা যায়। ইলেকট্রিক চুল্লির প্রচলন এই ধারায় খানিকটা হলেও ভাটা এনেছে।
কলকাতার অভিজাত বাড়ির অন্দরমহলে পুজোর সময় যে টিকের আগুন জ্বলত তা থেকে বেরোত খুশবু। এসব ক্ষেত্রে টিকে সাজানো হত চন্দন, গুগ্‌গুল (একপ্রকার সুগন্ধি নির্যাস), নানাবিধ প্রাকৃতিক (ও পরের দিকে কৃত্রিম) সুগন্ধে। সাহেবদের সিগার ধরার জন্য ব্যবহৃত টিকে হত এই ধারার। পাকশালাতেও রান্না সহায়ক এক অত্যাবশ্যক উপাদান ছিল টিকে। টিকের আগুন দিয়েই উনানে আঁচ ধরানো হত।
ধুনো ও হুঁকোর টিকে তৈরি হত কয়লার ঘেঁষ ও ভাতের মাড় দিয়ে। টিকের সুগন্ধের কাছে বশ মেনেছিল মেমসাহেবরাও। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে এদেশের প্রধান সেনাপতি-জায়া লেডি নুজেন্ট নাকি একদিন দু’টান দিয়েই কেশে অস্থির। তবে ওস্তাদ হুঁকোসেবী ইংরেজ মহিলাও ছিলেন। লেডি পামার ছিলেন এমনই একজন। তিনি নাকি নিজস্ব জাঁকজমকপূর্ণ হুঁকোবরদার নিয়ে আসতেন বিভিন্ন আড্ডার আসরে।
শ্রীপান্থ তাঁর লেখা ‘হুক্কা ও এক্কা’-তে জানিয়েছেন, “চলে আসুন লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরখানায়। পশ্চিমের ৪ নং প্লটের দ্বিতীয় সারিতে দেখবেন কবর রয়েছে একটা। উপরে নাম লেখা এইচ. ভি. বেইলি, বি. সি. এস। এই ভদ্রলোক কলকাতায় শেষ হুঁকোবীর। পরিচয়-লিপিতে দেখেছি ইনিই নাকি শেষ হুঁকো খেয়েছিলেন বেঙ্গল ক্লাবে।” (আজব নগরী, কিশলয় প্রকাশন, ২০১৯, পৃ-৯১)। এই তথ্য সত্যি হলে মেনে নিতে অসুবিধে নেই যে বেঙ্গল ক্লাবে টিকের গন্ধে ভুরভুর হুঁকোর সেটাই ছিল শেষ নিদর্শন!
কলকাতায় টিকের যে এত কদর, তা আসত কোথা থেকে? আসত না, আসলে এইসব টিকে তৈরি হত খোদ কলকাতায়। যার স্মৃতি আজও সুপ্ত রয়েছে এই মহানগরীর স্থাননামে। দু-দুটো টিকেপাড়া নামক স্থান ছিল! ১) রামমোহন রায় সরণি আর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের সংযোগস্থলে আমহার্স্ট রো-এর পূর্বনাম ছিল টিকেপাড়া। ২) রমেশ দত্ত স্ট্রিটের একাংশের আগের নাম ছিল টিকেপাড়া। অঞ্চলদুটির বয়স্ক মানুষজনের মুখে আজও শোনা যায় এই নাম। আর আছে, কলকাতা সংলগ্ন হাওড়ার টিকিয়াপাড়া। এসব জায়গায় এককালে প্রচুর টিকে তৈরি হত। সেই উৎপাদিত কুটিরশিল্পজাত পণ্যের নামেই স্থান পরিচিতি।
টিকের স্বর্ণযুগ অতীত হয়েছে। তবে, আজও ‘টিকে’ টিকে আছে। তার দেখা পাওয়া যায় দশকর্মা ভাণ্ডারে কিংবা সুগন্ধী বিপণিতে। অনুমান করা যেতে পারে, এই পণ্য বিপণনে একসময় ভূমিকা ছিল কলকাতার ফেরিওয়ালাদেরও। সেই টিকেওয়ালাদের দিন গত হয়েছে। ১৯৮৮ সালেও এদের একজনকে টিকে ফেরি করতে দেখেছি বেলেঘাটার চাউলপট্টি রোডে। শেষ চোখে পড়েছে ১৯৯৫ সালে। বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি উপনগরীর গা ঘেঁষে থাকা বৃজি গ্রামে। সেই ফেরিওয়ালার মাথার ঝাঁকায় ছোট-বড় এবং সুগন্ধীযুক্ত তিন রকমের টিকের পাশাপাশি ছিল আরও কিছু সুগন্ধী দ্রব্যের (আতর, জুঁই ফুলের সেন্ট ইত্যাদি) পসরা। বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ টিকেবিক্রেতা দেখেছি বেলঘরিয়া (১৯৯৩), দমদম (১৯৯৪) এবং আগরপাড়ায় (১৯৯৭)। টিকের প্রয়োজন ফুরনোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে টিকে বিক্রির পেশাও। হারিয়ে গেছে ‘টিকে নিবে গো মা’, ‘টিকে চাই, টিকে’, ‘টিকে লিবে গো বাবু, ভাল টিকে আছে, মিষ্টি টিকে-এ-এ-এ…’ হাঁকডাকও। এই ছবি আজ নিছকই সেকেলে গপ্পো। ফেলে আসা সময়ের নস্ট্যালজিক জলছবি।

সারাবছর (বর্ষাকাল বাদে) কমবেশি এঁদের দেখা যেত। বিশেষত বাঙালির উৎসব-পার্বণ এবং বিয়ের মরসুমে এঁদের আনাগোনা একটু বেড়ে যেত। তাতে গৃহস্থবাটীতে আগত অতিথি আপ্যায়নে গৃহস্থের মানরক্ষাতেও সহায়ক হত। অনেক সময় পরিবারের কর্তারা মাস গেলে সংসার খরচ বাবদ কিছু টাকা গিন্নির হাতে ধরে দিতেন। এই ঘরোয়া বাজেটে তামাকবিলাসীর সুগন্ধী টিকের খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকত। তবে পুরুষালি দাপটে এই খাতের খরচে অন্য খাতের টাকাও ঢুকে যেত প্রায়শই। এই ঘটনা ঘটে যাবার পর মাসের বাকি সময়টা সাংখ্যদর্শনের পুরুষের মতো নিজেকে আড়ালে রাখাটাকেই শ্রেয় বিবেচনা করতেন গৃহকর্তারা।
মেয়েলি ছড়ায় উচ্চারিত হতে শুনেছি : বাঁহাতে ধরা টিকে/বোয়ের কাছে ধরা পড়ে মিন্‌সের হাসি ফিকে।” কিংবা, “পতিনিন্দা নাহি করি, সকাল-সন্ধে বাদ/টিকে-হুঁকোয় সঙ্গ করে, রাত্রে পাই নাথ।” (এই দুটি লাইন কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে বলতে হবে। না হলে বাদ যাবে।)
মধ্যবিত্ত বাড়ির অনুষ্ঠানে-উৎসবের সময় আলাদা করে লোক বরাদ্দ করা হত। যাদের কাজই ছিল টিকে সাজানো, টিকে এগিয়ে দেওয়া, টিকে ধরানো। এককথায় টিকের আগুনকে তোয়াজ করে সচল রাখা। এক্ষেত্রে জাতে ওঠার কিংবা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ অথবা নজরে পড়ার অবলম্বন ছিল টিকে।
টিকের উজ্জ্বল অতীতের সাক্ষীস্বরূপ স্মরণ করা যেতে পারে নিম্নোক্ত বাংলা প্রবাদগুলো, যার ফ্রেমে ধরা আছে ‘টিকে’।
১) “আধসের হিসেবে ঠিকে, তায় তামাক আর টিকে।” ঠিকে মজুর বা কাজের লোক মজুরির (এক্ষেত্রে আধ সের চাল) অতিরিক্ত (এখানে তামাক ও টিকে) চায় বোঝাতে বলা হত।
২) “টিকে ধরাবার জামিন চাই।” যে কাজে নিষেধ আছে সেটি করবার অনুমতি চাই অর্থে প্রযুক্ত।
৩) অন্যের সর্বনাশে নিজের ইন্ধন সংগ্রহ করা (কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ) বোঝাতে উচ্চারিত হতে শুনে থাকবেন, “ঘরপোড়ার আগুনে টিকে ধরানো।”
৪) নেশার জগতে সামাজিক পদমর্যাদায় টিকে অনভিজাত, নেহাতই ফেলনা বোঝাতে তুচ্ছার্থে প্রযুক্ত প্রবাদ : “টিকের আবার সেকাল-একাল!”
প্রসঙ্গত, তামাক সাজা কথাটার মধ্যেও রয়ে গেছে টিকে অনুষঙ্গ। কারণ, তামাক সাজা বলতে বোঝায় হুঁকো, গড়গড়া প্রভৃতির কলকেতে তামাক টিকে বা টিকা দিয়ে আগুন ধরানো। উমেশচন্দ্র মিত্রর লেখায় (১৮৫৭) আছে : “এক কলকে তামাক সেজে আনিস।”
‘টিকে’ শব্দটি কোড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে ব্যবহারের নমুনাও পেয়েছি। ১৯৮৪-৮৮ সময়সীমায় দক্ষিণ কলকাতার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকা এক ব্যক্তির কাছে শোনা, হবু প্রেমিকাকে মোটামুটি বাগে আনা বা পটিয়ে ফেলা অর্থে তারা ‘টিকে তোলা’ কথাটি বলতেন। এক্ষেত্রে, বক্তাদের প্রত্যেকেরই একটা গ্রামীণ পশ্চাৎপট ছিল। যাঁরা থেলো হুঁকো থেকে টিকে ধরানো ও সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির সঙ্গে পূর্ব পরিচিত ছিলেন। সেই চিত্রকল্পের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই একই শব্দের এই সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থের উদ্ভব ও বিকাশ সম্ভব হয়েছিল।
আর একবার হাওড়ায় বাসস্ট্যান্ডে এক পকেটমারের কাছে শুনেছিলাম, যে বাসে উঠেছে সেখানে তাদের কাজ হাশিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বোঝাতে সহকর্মীর উদ্দেশে বলা হত, “টিকিয়াপাড়ায় যাবি তো এ বাসে উঠলি কেন!” টিকে ধরানো শব্দবন্ধ যে তাদের কমিউনিটিতে অপরিচিত ছিল না তা অনুমান করা যেতেই পারে।
তামাকের আগুনকেও বলা হত ‘টিকে’। গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখায় (১৮৮৬) আছে, “এখন টিকে ধরাচ্ছে, কাল সকালে এসে খাওয়া যাবে।”
তবে, টিকে সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন একটা অন্য অর্থও পাওয়া গেছে ‘টিকে’ শব্দটির। তা হল, মাটিতে পড়া গোলাকার ঘন কৃষ্ণবর্ণের বিষ্ঠা। সাহিত্যের দুনিয়া থেকে চয়িত একটি নমুনা পেশ করা যাক : “বুড়ো গোরুর টিকে যেন শুয়ে কোলা ব্যাং।” (কাজী নজরুল ইসলাম, রচনাকাল ১৯২৬)। আমাদের ছেলেবেলায় ছাগলের নাদিকেও টিকে বলতে শুনেছি। গোরুর বদলে ছাগলের বিষ্ঠার সঙ্গেই শব্দটি যেন বেশি মানানসই, বিষ্ঠার আকার-আকৃতি ও রঙের সাদৃশ্য বিচারে।

২০০০ সালের শীতার্ত কলকাতা। মেয়ো রোড দিয়ে বাসে চলেছি হাওড়ায়। পাশ দিয়ে তীব্র গতিতে বেরিয়ে যাওয়া এক ম্যাটাডরের গায়ে (পাশের দিকে বডিতে) আঁকা একটা ছবি দেখেছিলাম একপলকের জন্যে, যা আজও স্মৃতিতে অমলিন। সেটা ছিল এরকম : মুখোমুখি বসে দুই বুড়ো। একজনের পরনে লুঙ্গি, আদুল গায়ে কাঁধে ফেলা একখান গামছা। মনের সুখে হুঁকোয় টান দিচ্ছে। আর একজন তার মুখোমুখি। হাত দু’খানা দিয়ে গগনচুম্বী (বললাম কারণ, ছবিতে সেরকমই দেখানো ছিল। উত্থিত ধোঁয়া ছুঁয়েছে নীলাকাশকে) ধোঁয়া তালুবন্দি করার প্রয়াস চালাচ্ছে! নিছক বাহনচিত্রে ‘টিকে’-র উপস্থিতির নমুনা মাত্র নয়, বরং ফেলে আসা সময়ের কথা বলে, মনে পড়ায়। হতে পারে, সংশ্লিষ্ট বাহন মালিক কিংবা বাহনচিত্র রূপকারের হুঁকোপ্রীতি এবং সেই সূত্রে অবশ্যই ‘টিকে’-র প্রতি দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ!
প্রসঙ্গত জানাই, এই পত্রিকার সম্পাদকমশাই তাঁর বাসভবনে নিজের হাতে টিকে সাজিয়ে/ধরিয়ে হুঁকো খেয়েছেন ২০১০ সাল পর্যন্তও। তিনি ‘টিকে’ কিনতেন কালীঘাট থেকে। ২০১০ সালে একটা টিকের দাম পড়ত ৫০ পয়সা। আরও আগে, ১৯৯৩ সালে একটা টিকে বিক্রি হত ১০ পয়সার বিনিময়ে। ২০০১ সালেও ২৫ পয়সার বিনিময়ে বিক্রি হত একটা টিকে। ২০১৩ ও ২০১৯ সালে এর দাম ছিল ৭৫ পয়সা ও ১ টাকা। বাজারদর যখন ৭৫ পয়সা, তখন তিনটে ও দশটার প্যাকেটেও টিকে বিক্রি হতে দেখেছি। তাতে কিছুটা ছাড়ও মিলত। দাম নিত যথাক্রমে ২ টাকা (সাশ্রয় ২৫ পয়সা) ও ৭ টাকা (বাঁচত ৫০ পয়সা)। সেসময় এ রাজ্যে ন্যূনতম বাসভাড়া ছিল ৪ টাকা, সরষের তেলের দর ছিল লিটার পিছু ৬০ টাকা!
বাবু ও বাবু কালচার শহর কলকাতা থেকে বিদায় নিয়েছে বহুদিন আগেই। তবে নতুন করে কলকাতা এবং অন্যত্র চালু হওয়া হুক্কাবার-এর সৌজন্যে টিকে ছিল ‘টিকে’-র অস্তিত্ব। কিন্তু নানাবিধ কারণবশত (যার মধ্যে অন্যতম বেআইনি মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ) সেগুলোতে ঝাঁপ পড়েছে, প্রশাসনিক তৎপরতায়। এসব বারগুলোর কোনও কোনওটাতে ‘টিকে’ বিক্রির ব্যবস্থাও ছিল। তাছাড়া, আজও এই মহানগরীতে যাঁরা ব্রাত্য, প্রান্তিক বাসিন্দা হিসেবে রয়ে গেছেন, সেই তথাকথিত নিম্নবর্গের এবং পিছিয়ে থাকা মানুষদের সমাজে (যাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশই অবাঙালি) মাঝেমধ্যে দেখা মেলে হুঁকোর। অনিবার্যভাবে হাজির থাকে ‘টিকে’। থেলো হুঁকোর মানব পরিচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিনস্বরূপ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে টিকে সাজানো ও ধরানোয় হাত লাগান নেশার সকল হকদাররাই। নেশার সূত্রে ‘টিকে’-র আঁচে-উত্তাপে ম্লান হয়ে যায় সকল সামাজিক লিঙ্গবৈষম্য ও শ্রেণিগত ভেদাভেদ।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা

(পরের পর্ব তৃতীয় মঙ্গলবার)

সেকেলে গপ্পো পর্ব ১

সেকেলে গপ্পো পর্ব ২

সেকেলে গপ্পো পর্ব ৩

সেকেলে গপ্পো পর্ব ৪

মতামত জানান

Your email address will not be published.