বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

স্বাতীলেখা : এক সম্পূর্ণ অভিনেত্রীর নাম

অসম্ভব ভাল গাইতে পারতেন তিনি। ‘ফেরিওয়ালার মৃত্যু’ নাটকের বিরতি হত তাঁর গানেই। সব গুণ ছিল তাঁর। নাচ, গান, কবিতা, বাজনা আর অভিনয়। একজন দক্ষ অভিনেতা হতে গেলে যা যা দরকার, সব।

সুমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়

‘ভদ্রমহিলা চলে গেলে, মানে যবেই যান আর কী, তাঁর কথা থেকে যাবে, গান থেকে যাবে। আর তাই পুঁজি করেই আমাদের চলবে কিছুদিন।’
‘অজ্ঞাতবাস’ নাটকে অনুরাধাদেবীর (স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর অভিনীত চরিত্র) সম্বন্ধে বলা পায়েলের সংলাপটা আজ খুব মনে পড়ছে। স্বাতীদি আর আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর কথা, তাঁর বেহালা বাজানো, তাঁর গান, তাঁর অভিনয় ও তাঁর শিক্ষা রয়ে যাবে।
স্বাতীদিকে আমি প্রথম দেখি ‘ঘরে বাইরে’ সিনেমায়। তার পর দেখি কলেজ স্ট্রিটে বাসের ভেতর থেকে। উনি ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখনও জানতাম না নান্দীকারে স্যার (রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত) ও স্বাতীদির হাতেই আমার থিয়েটারের শিক্ষা শুরু হবে, একসঙ্গে কাজ করব ১৯৮৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত। ২০২০ বললাম এই কারণে যে, আমি স্বাতীদির সঙ্গে মঞ্চে শেষ অভিনয় করেছিলাম ২০২০-র ২৫ ডিসেম্বর ‘নাচনী’ নাটকে। সেই দিন ওঁর পরিচালিত নাটক ‘মাধবী’-ও ছিল।

‘মৃত্যুর কুঁড়ি’ নাটকের স্টেজ রিহার্সালে স্বাতীদি।

নান্দীকারে আমি যোগদান করি একটি প্রশিক্ষণ শিবিরের মাধ্যমে ১৯৮৮ সালে। সেখানে স্যার স্বাতীদি, গৌতমদা (গৌতম হালদার), শুভাশিসদা (শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়) ও দেবশঙ্করদা (দেবশঙ্কর হালদার) আমাদের ক্লাস নিতেন। স্বাতীদির সঙ্গে আমি প্রথম অভিনয় করি অ্যাকাডেমি মঞ্চে ‘আন্তিগোনে’ নাটকে। নান্দীকারের হয়ে সেই ছিল আমার প্রথম অভিনয় আর সেই দিনই প্রথম একাডেমি মঞ্চে নামা, যা ছিল তখনকার দিনে জেগে স্বপ্ন দেখার মতো রোমাঞ্চকর। তখনও আমাদের প্রশিক্ষণ চলছে। স্যারের কথামতো দেবশঙ্করদাই আমাকে রিহার্সাল করাচ্ছিলেন। কোনওভাবে একটা দৃশ্য বাদ চলে গিয়েছিল রিহার্সালের সময়। আমাদের শো করার কথা ছিল মুম্বইয়ের পৃথ্বী থিয়েটারে। তার আগে একটা শো ছিল অ্যাকাডেমিতে। যথারীতি সেই শোয়ের দিন আমি হাজির অ্যাকাডেমিতে ভাল করে শো দেখার জন্যে। আমার পার্ট ছিল বৃদ্ধ প্রহরীর। আচমকা স্যার বললেন, সুমন্ত, তুমি আজকের শো-টা করবে, যাও মেকআপ করে নাও। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। শুরু হল নাটক। দু-একটা দৃশ্য উতরেও গেল ঠিকঠাক। স্টেজে চলছে নাটক। হঠাৎ দেবুদা এসে বললেন, তোকে এখন ঢুকতে হবে। একটা দড়ি— যেটা অনেকটা হাতকড়ার মতো দেখতে— আমার হাতে দিয়ে বললেন, শোন, মঞ্চে ঢুকেই দেখবি স্বাতীদি ডানদিকে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দাঁড়াবি। যখন তোর দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে, তুই এই হাতকড়াটা টাইট করে বেঁধে টানতে টানতে স্বাতীদিকে বাইরে বের করে নিয়ে আসবি। যা ঢোক। দেবশঙ্করদা প্রায় ধাক্কা মেরে আমাকে সেদিন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন স্টেজে। এই সেই দৃশ্য যা আমি কোনওদিন রিহার্সাল করিনি। আদেশ পালন করেছিলাম কিন্তু অতিরিক্ত উত্তেজনায় আমি স্বাতীদিকে একটু বেশিই টেনে ফেলেছিলাম সেদিন। স্বাতীদি শোয়ের পর হেসে বলেছিলেন, তুই যা জোরে টানছিলি, আমি তো স্টেজেই উল্টে পড়ে যেতাম। না বকুনি খাইনি। আড়ালে নিজের কান নিজেই মুলেছিলাম সেদিন।

‘যাহা চাই’ নাটকে স্বাতীদি।

প্রশিক্ষণ শেষে নান্দীকারে একগাদা নতুন ছেলে, দাপটের সঙ্গে ‘ফুটবল’ নাটক নিয়ে দিল্লি, বাংলাদেশ ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় শো করে বেড়াচ্ছি। তখন স্বাতীদি একটা নাটক নিয়ে হাজির হলেন নান্দীকারে। তাঁর নিজের অনুবাদ, একটি হিন্দি সিনেমা ‘এক রুকা হুয়া ফয়সলা’ থেকে ‘এক থেকে বারো’। মূল ইংরেজি নাটক ‘12 Angry Men’। নান্দীকারের ১২ জন তরুণ নাটকে অভিনয় করল, অবশ্যই স্যার ও স্বাতীদির তত্ত্বাবধানে। নাটকের মিউজিক করলেন স্বাতীদিই। গৌতম হালদারের প্রথম পরিচালনা। খুব আনন্দ করে আমরা নাটকটা করতাম।
স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত ছিলেন প্রবাসী বাঙালি। ১৯৫০-এ এলাহাবাদে জন্ম। এলাহাবাদেই কনভেন্ট স্কুলে পড়া এবং পরবর্তীকালে এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। এলাহাবাদেই তাঁর থিয়েটারের চর্চা শুরু। সেখানে এ সি ব্যানার্জির পরিচালনায় মন্মথ রায়ের নাটক ‘কারাগার’-এ প্রথম অভিনয় করলেন। এলাহাবাদে শো করতে গিয়ে আমরা স্বাতীদির বাড়ি গিয়েছিলাম, তখনও তাঁর মা বেঁচেছিলেন। একটা গোটা দিন আমরা সেখানে কাটিয়েছিলাম। স্বাতীদি খাওয়াতে খুব ভালবাসতেন। স্কুলে থাকাকালীনই স্বাতীদির মিউজিকের প্রতি আকর্ষণ ছিল। পরে Trinity College, London থেকে তিনি মিউজিকে ডিগ্রি নেন। গুগল সার্চ করলেই এইসব জানা যাবে। কিন্তু তার পর তিনি মিউজিক নিয়ে যে কাণ্ডটা করবেন সেটা সার্চে মিলবে না।

ওমান সফরের সময়।

১৯৭৮ সালে তিনি নান্দীকারে আসেন। তখন ‘খড়ির গণ্ডী’ নাটকের কাজ চলছে। সেই নাটকের ‘লুৎফা’ চরিত্রের জন্যে খোঁজ চলছে এমন একজন অভিনেত্রীর যিনি গান, নাচ ও ভাল অভিনয় করতে পারেন। আর যাঁকে দেখতে সুন্দর। সব গুণই ছিল আমাদের স্বাতীদির। নান্দীকার খুঁজে পেল স্বাতীদিকে। কেউ স্বাতীদির খবর দেয়। ডাক পড়ে। সেই প্রথম আসা নান্দীকারে। তার পর ‘আন্তিগোনে’ নাটকে তিনি দাপিয়ে অভিনয় করেছেন মূল চরিত্রে। তার পর রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর সঙ্গে বিয়ে। প্রথম যেদিন আমি ওঁর সঙ্গে অভিনয় করি সেদিন ভাল করে দেখতে পাইনি ‘আন্তিগোনে’। পরে দেখেছিলাম তাঁর সে কী দৃপ্ত অভিনয়। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত।
‘ফুটবল’ নাটক চলতে চলতে নান্দীকারে আর একটা নাটকের রিহার্সাল শুরু হল। নাটকের নাম ‘শেষ সাক্ষাৎকার’। একটা রাশিয়ান নাটকের বাংলা অনুবাদ, স্যার করেছিলেন। এই নাটকে স্বাতীদির সাকুল্যে হয়তো দু-তিনটে সংলাপ ছিল। বাকি সময় উনি স্টেজেই বসে থাকতেন শুধু। স্টেজে তখন তোড়ে নাটক চলছে, তৈরি হচ্ছে টেনশন। অভিনেতা থেকে দর্শক সবাই টান টান কিন্তু স্বাতীদি বসে আছেন স্থির নিশ্চল। আমরা দেখতে পেতাম, পুরো উত্তেজনা ওঁর মধ্যেও বর্তমান। কোনও সংলাপ ছাড়া কীভাবে চরিত্রকে নিয়ে স্টেজে ভরাট থাকতে হয়, শিখলাম ওঁর কাছে। নাটকটার সম্ভবত ৫০টির ওপর শো দেখেছিলাম। রিহার্সালে প্রম্পট করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। প্রায় সব সংলাপ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল আমার তখন।

১৯৯৮ সালে আমেরিকার ক্লিভল্যান্ড শহরে।

এর পর স্যার অনুবাদ করলেন ব্রেখটের একটি নাটক ‘Good Person of Szechwan’ অবলম্বনে ‘শঙ্খপুরের সুকন্যা’। আগে নান্দীকার এই নাটকটিই করেছিল অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ ও নির্দেশনায়। নাটকের নাম ছিল ‘ভালোমানুষ’। কিন্তু এই নাটক ‘শঙ্খপুরের সুকন্যা’ ছিল একদম অন্যরকম। পুরো নাটকে ছিল ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ব্যবহার। একই নারী চরিত্র এই নাটকে একবার মহিলা ও একবার পুরুষ হিসেবে মঞ্চে প্রবেশ করত। মহিলা চরিত্রটি খুবই নরম প্রকৃতির আর পুরুষ চরিত্রটি ছিল রাগী ও হিংস্র। স্বাতীদি অসাধারণ দক্ষতায় দুটি চরিত্রই করতেন। আমি করতাম একটি দেবতার চরিত্র ও গানের সঙ্গে তবলা, খোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজাতাম। একটা দৃশ্যে পার্থদা (পার্থপ্রতিম দেব) গান গাইতেন, আমি বাজাতাম আর স্বাতীদি তখন দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলে যেতেন। সে যেন কবিতার মতো লাগত। অত সামনে থেকে সেই অভিনয় আমি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতাম আর শিখতাম অনেক অনেক কিছু।
সত্যি কথা বলতে কী, স্বাতীদিই ছিলেন আমার প্রথম গুরু। কারণ আমাদের প্রশিক্ষণের জন্য যে সিলেবাসটা তৈরি করা হয়েছিল সেটা উনিই করেছিলেন। সেই অনুযায়ী আমাদের প্রতিটি বিষয়ের ক্লাস নেওয়া হত। স্বাতীদি নিতেন রিদমের ক্লাস আর গানের ক্লাস। স্যার নিতেন ভয়েস। গৌতমদা, শুভাসিশদা নিতেন অ্যাক্টিংয়ের বাকি ক্লাসগুলো। পরের বছর, ১৯৮৯ সালে নান্দীকারে শুরু হয় ‘থিয়েটার এডুকেশন’-এর কাজ। সেই সময় সারা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৭৫টি মাধ্যমিক স্কুলে আমরা ‘থিয়েটার এডুকেশন’-এর কাজ করেছিলাম। সেখানেও স্বাতীদির সেই সিলেবাসই ফলো করা হত। প্রথমে বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরিতে স্কুলের টিচারদের নিয়ে একটা প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা হয়। তার পর শুরু হয় বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিবির করা। গোবরডাঙা, উত্তরপাড়া, নৈহাটি, ভাটপাড়া, হালিশহর, শিলিগুড়ি ও আরও বিভিন্ন শহরে। আর সব জায়গায় স্বাতীদিই ছিলেন আমাদের নেত্রী। স্যারও থাকতেন সব জায়গায় কিন্তু স্বাতীদির নির্দেশেই আমাদের কাজ চলত। তিন দিনের শিবির শেষে প্রত্যেক স্কুলে শেষ দিনের শেষবেলায় একটা করে নাটক পরিবেশন করত। তাতে কে কী পোশাক পরবে তাও স্বাতীদিই ঠিক করে দিতেন। কখনও কখনও নিজেই পোশাক পরিয়েও দিতেন। মাটির মানুষ ছিলেন উনি। কোনওদিন অহংকার করতে দেখিনি। খুব আনন্দ করে এই কাজগুলো তিনি করতেন। নিজের অভিনয়ে কোনওদিন সন্তুষ্ট হতে দেখিনি। আমরা দেখছি অসাধারণ অভিনয় করছেন, উনি বলছেন ঠিক হল না। তাই মনে হয় অসামান্য সব অভিনয় করে যেতে পেরেছিলেন।

‘নাচনী’ নাটকে স্বাতীদি ও অন্যান্য অভিনেতা। ছবি : রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

এর পরে ১৯৯৪-এ হল ‘ফেরিওয়ালার মৃত্যু’ নাটকটি। আর্থার মিলারের বিখ্যাত নাটক ‘Death of A Salesman’ অবলম্বনে স্যারের অনুবাদ। সেই নাটকে স্বাতীদি করতেন সেলসম্যানের স্ত্রী ‘পার্বতী’-র চরিত্র। এই নাটকে উনি মিউজিক করেছিলেন। সেই মিউজিকগুলো এখনও আমার কানে বাজে। গ্রামবাংলার একটা মেঠো সুর বাজত নাটকের শুরুতে। রেকর্ডিংয়ের সময় সেই বাঁশির সুরের সঙ্গে আমি খোল বাজিয়েছিলাম। অপূর্ব সুর করতেন স্বাতীদি। থিয়েটার ছিল স্বাতীদির রক্তে, সেইজন্যেই পারতেন থিয়েটারের জন্য ওই ধরনের মিউজিক করতে। অসাধারণ অভিনয়ও করতেন ওই নাটকে। আর এই নাটকের সূত্রে আমারও একটু নামডাক হল তখন। একটা দৃশ্যে আমার কাঁদতে কাঁদতে ঢোকা ছিল। স্বাতীদির সঙ্গেই পুরো সিনটা ছিল আমার। সেই দৃশ্যে ঢোকার আগে উইংয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিট ধরে কেঁদে নিতাম, তার পর ঢুকতাম। পরে উনি আমার ওই দৃশ্যে ঢোকার কথা সবাইকে বলতেন। খুব প্রশংসা করতেন। কেউ ভাল করলে যেমন প্রশংসা করতেন আবার ভাল না হলে বলতেও ছাড়তেন না। কোনও ভণিতা ছিল না ওঁর মধ্যে। ছিল অসম্ভব নিয়মানুবর্তিতা। যদি ছ’টায় রিহার্সাল শুরু হওয়ার কথা থাকত, উনি দশ মিনিট আগে পৌঁছে যেতেন। কোনওদিন এর নড়চড় হয়নি, তাঁর রিহার্সালে আসার শেষ দিনেও নয়। দেরি করে আসার জন্য আমি বহুবার বকুনি খেয়েছি ওঁর কাছে।
এর পর ১৯৯৫ সালে হল ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। গৌতমদার একক অভিনয় ছিল সেটা। স্টেজের বাঁদিকে থাকতাম আমি, স্বাতীদি ও পার্থদা। আমি বাজাতাম তবলা, খোল, পাখোয়াজ ইত্যাদি। পার্থদা বসতেন হারমনিয়াম নিয়ে। আর স্বাতীদি বসতেন তাঁর বেহালা নিয়ে। অসাধারণ বেহালা বাজাতেন তিনি। আমরা সেই প্রথম তাঁকে গোটা নাটক ধরে বেহালা বাজিয়ে যেতে দেখলাম। আমরা সবাই মিলে স্বাতীদির নেতৃত্বে সেই নাটকের মিউজিক তৈরি করেছিলাম। গৌতমদার অভিনয় ও স্বাতীদির বাজনায় স্টেজে এক কাণ্ড ঘটে যেত। সারা ভারতে ও পরে বিদেশেও আমরা ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র প্রচুর শো করেছিলাম।
‘নগর কীর্তন’ নাটকের শো শুরু হল ১৯৯৭ সালে। এই নাটকেও স্বাতীদি থাকতেন মিউজিক পিট–এ তাঁর বেহালা নিয়ে। আমরাও থাকতাম অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে। নাটকের শুরুই হত একটা কীর্তন গান দিয়ে। নাটকের শুরুর দৃশ্যে দেখানো হত একটা কীর্তনের আসর বসেছে। সেই আসরে নাটকের একটি চরিত্র হয়ে স্বাতীদিই গাইতেন সেই গান। অসম্ভব ভাল গাইতে পারতেন তিনি। ‘ফেরিওয়ালার মৃত্যু’ নাটকের বিরতি হত তাঁর গানেই। সব গুণ ছিল তাঁর। নাচ, গান, কবিতা, বাজনা আর অভিনয়। একজন দক্ষ অভিনেতা হতে গেলে যা যা দরকার, সব।
আমাদের প্রথম বিদেশ সফর ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৬ সালে ‘নগর কীর্তন’-এর আগেই তৈরি হয়েছিল আর্থার মিলারেরই আর একটি নাটক ‘A view from the Bridge’ অবলম্বনে ‘গোত্রহীন’। আমরা গিয়েছিলাম ‘International Fringe Theatre Festival’-এ, নিউ ইয়র্কে। সেই ফেস্টিভ্যালে ‘গোত্রহীন’ নাটকের পাঁচ দিনে পাঁচটা শো হয়েছিল। এর মধ্যে ব্রডওয়ে থিয়েটারের দু’জন অভিনেতা, যাঁরা এই একই নাটক করেন ব্রডওয়ের একটা থিয়েটার হলে, তাঁরা আমাদের নাটক দেখতে এলেন। আমাদেরও নিমন্ত্রণ হল তাঁদের নাটক দেখতে যাওয়ার। সবাই মিলে পরের দিন গিয়েছিলাম সেই নাটক দেখতে। এছাড়াও আমরা প্রায় দেড় মাস ধরে আমেরিকার ১৩টি স্টেটে গিয়েছিলাম নাটক করতে। আমেরিকার শোগুলো হয়ে যাওয়ার পরে আমরা লন্ডন ও এডিনবার্গেও দুটো শো করেছিলাম। বাড়ি থেকে প্রায় পৌনে দু’মাস বাইরে। স্যার ও স্বাতীদিকে নিয়ে আমরা আটজন সেই সফরে গিয়েছিলাম। নান্দীকার তখন একটা পরিবার। কলকাতা থেকে নিউ ইয়র্কে পৌঁছনোর পরের দিনই আমরা গিয়েছিলাম ডালাস। সকালে একটা ফ্লাইট মিস করার পরে আমরা পরের ফ্লাইটে দুপুরে গিয়ে পৌঁছলাম ডালাস। সেখানে পৌঁছনোর পরেই আমাদের লাগেজ নিতে গিয়ে দেখলাম থিয়েটারের দুটো বাক্স উধাও। তার একটার মধ্যে ছিল আমাদের পোশাক ও মেকআপের বাক্স আর অন্যটার মধ্যে ছিল কিছু মিউজিকাল ইনস্ট্রুমেন্ট। আমাদের তো মাথায় হাত। পৌঁছনোর পরেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হল হলে। কিন্তু পোশাক (ধুতি ও ওড়না) ছাড়া আমরা শো করব কী করে? স্বাতীদি নিজের চার-পাঁচটা শাড়ি আমাদের দিয়ে দিলেন। আমরা সেইগুলোকেই ধুতির মতো পরে নিলাম। ওড়নার বদলে চাদরের মতো শাড়ি জড়িয়ে নিলাম গায়ে। শুরু হয়ে গেল নাটক ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। এই ছিলেন আমাদের স্বাতীদি। পরে অবশ্য আমরা বাক্সগুলো পেয়েছিলাম। মেকআপের বাক্স থেকে স্পিরিট গাম পড়ে গিয়েছিল, গড়িয়ে বাক্সের বাইরেও বেরিয়ে এসেছিল। এয়ারপোর্টের লোকেরা ভেবেছিলেন বিস্ফোরক, তাই আটকে দিয়েছিলেন। পরের ফ্লাইটে পোশাক ও মিউজিকাল ইনস্ট্রুমেন্টগুলো এসেছিল। তবে আমাদের বাক্সগুলোতে নয়, দুটো প্যাকিং বাক্সে।
১৯৯৮ সালে উইলি রাসেলের ‘Shirley Valentine’ অবলম্বনে স্যার অনুবাদ করলেন নাটক ‘শানু রায়চৌধুরী’। স্বাতীদির ছিল একক অভিনয়। সে অভিনয়ও অসাধারণ। সবসময় দেওয়ালের সঙ্গে কথা বলে যাওয়া এক গৃহবধূর চরিত্র, যে একদিন বাইরে বেরিয়ে যায়, আর কোনওদিনই ফিরে আসে না চার দেওয়ালের মধ্যে, যার সঙ্গে নিঃসঙ্গ সে কথা বলে যেত। পরে সুইডেন সফরে আমরা এই নাটকের একটা শো করেছিলাম। পিটার টারসনের ‘Zigger Zagger’ নাটকটির অনুবাদ ‘ফুটবল’ লিখেছিলেন স্যার। ২০০১ সালে এই নাটকের হিন্দি অনুবাদ ও পরিচালনা করেছিলেন স্বাতীদি। দিল্লি দূরদর্শনের জন্য সে নাটকের অভিনয়ও করি আমরা। অল্প কয়েকটি শোও হয়েছিল অন্যত্র।
এর পর ২০০৩-এ হল ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। জসিমউদ্দিনের লেখা কবিতা থেকে এই নাটক। নির্দেশনা গৌতম হালদার। সেখানেও স্বাতীদি বেহালা নিয়ে হাজির। ২০০৫-এ একক নাটক করলেন ‘চোখ গেল’। আমার দেখা স্বাতীদির সেরা অভিনয় ছিল এই ‘চোখ গেল’ নাটকে। একটি বৃদ্ধার চরিত্রে উনি অভিনয় করতেন। সারা নাটকে তাঁর সংলাপ ছিল খুব কম। বেশিরভাগটাই থাকত ভয়েসওভারে ন্যারেশন। কিন্তু কী অসাধারণ সেই অভিনয়, যাঁরা দেখেছেন তাঁরাই জানেন।

‘নাচনী’ নাটকে স্বাতীদি গান-নাচে স্টেজ মাতিয়ে দিতেন। ছবি : রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

এর পর স্বাতীদি লিখলেন ‘আঁধারমণি’, ‘দুলিয়া’, ‘পাখি’, ‘নতুন ছেলে নটবর’ ইত্যাদি নাটক। নান্দীকারে প্রতিবছরই প্রশিক্ষণ শিবির চলতে থাকে। সেইসব নতুন ছেলেদের নিয়ে স্বাতীদি করতেন এই নাটকগুলো। আমিও ছিলাম ‘পাখি’, ‘নতুন ছেলে নটবর’ আর ‘দুলিয়া’-তে।
২০০৪-এ আমরা গেলাম আমেরিকার ওয়াশিংটনের বাল্টিমোর শহরে বঙ্গ সম্মেলনে। সেখানে ‘শেষ সাক্ষাৎকার’ হয়েছিল। ১৯৯৮-এর মতোই আমরা আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ঘুরতে লাগলাম ‘গোত্রহীন’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘শেষ সাক্ষাৎকার’ এইসব নাটক নিয়ে। লন্ডনেও শো হয়েছিল ‘শেষ সাক্ষাৎকার’-এর। ২০০৫-তেও আমেরিকা গেলাম। এবার গেলাম শিকাগো শহরে বঙ্গমেলায় যোগ দিতে। নাটক হল ‘বাপ্পাদিত্য’।
২০০৭ সালে শেক্সপিয়রের হারিয়ে যাওয়া নাটক নিয়ে সুকান্ত চৌধুরীর লেখা ‘যাহা চাই’ নাট্য প্রযোজনায় অসাধারণ অভিনয় ও সঙ্গীত প্রয়োগের নিদর্শন রাখেন স্বাতীদি। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও গৌতম হালদার। মজাদার এই নাটকের অল্প কয়েকটি শো হয়েছিল।
আমি যে আজ নান্দীকারের একজন নির্দেশক, তাও স্বাতীদির জন্যেই। একদিন, তখন বেশ কিছুদিন আমাদের শো ছিল না, নান্দীকারের অফিসঘরে স্বাতীদি বসে আছেন, স্যার যেখানে বসেন সেই চেয়ারে। ২০০৭ সাল। স্যার সেদিন কোনও কারণে আসেননি। আমাকে দেখেই বললেন, হ্যাঁ রে সুমন্ত, তুই তো শুনি অফিসে খুব নাটক করিস, প্রাইজ পাস, তো আমাদের নিয়ে একটা নাটক কর। বললাম, আমি? উনি বললেন, হ্যাঁ, তুই। সাহস করে আমার দাদা সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘অজ্ঞাতবাস’ গল্পটা বললাম। সোহিনীও শুনল গল্পটা। খুব উচ্ছ্বসিত হলেন স্বাতীদি। পরের দিনই স্যারের ফোন। সুমন্ত, শুনলাম স্বাতী আর বাবুয়াকে দাদার একটা খুব ভাল গল্প শুনিয়েছ। আমাকে দাও গল্পটা। স্যারকে দিলাম। পড়লেন ও আরও অনেককে পড়ালেন। খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, দাদাকে বলো নাটকটা লিখতে। লেখা হল নাটক। রিহার্সাল শুরু হল।
২০০৮ সালে হল সেই নাটক ‘অজ্ঞাতবাস’। নাটকের মূল চরিত্র অনুরাধাদেবীর অভিনয় করতেন স্বাতীদি। দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে অভিনয় দেখত। পরবর্তীকালে আমরা এই নাটক নিয়ে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন শহরে করেছি। এই নাটক নিয়ে ২০০৯-এ বাংলাদেশে ও ২০১০-এ কুয়েত সফরে গেলাম। ২০১১ সালে স্বাতীদি সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেলেন। আমরা চললাম দিল্লি, এই নাটকের শো করতে। প্রথমে একটা শো হওয়ার কথা ছিল। একদিন স্যার বললেন, শো-টা দশ দিন আগেই হাউসফুল হয়ে গেছে, ওরা আর একটা শো করাতে চায়। করা যাবে? বললাম, যাচ্ছিই যখন, দুটো শো করতে অসুবিধে কী? একই দিনে দুটো শো হল, দুটোই হাউসফুল। এই নাটকের শেষ শো হয়েছিল দূরদর্শন কেন্দ্রে ২০১৯-এ। সেটা ছিল এই নাটকের ২০৪তম অভিনয়।

‘অজ্ঞাতবাস’ নাটকের পোস্টার।

২০০৯ সাল। স্বাতীদি একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক অনুবাদ করলেন— ‘মাধবী’। ভীষ্ম সাহানির লেখা নাটক থেকে বাংলা অনুবাদ। পরিচালনাও করলেন তিনি। মিউজিক করলেন অসাধারণ। নিজে অভিনয় করলেন না, আমাদের নিয়ে করলেন। এই নাটকেরও প্রচুর মঞ্চসফল শো আমরা করেছি সারা ভারতে। ২০১৩ সালে পার্থপ্রতিম দেবের পরিচালনায় ‘নাচনী’ নাটকে স্বাতীদি গান-নাচে স্টেজ মাতিয়ে দিতেন। ওই বয়সেও তাঁর কী এনার্জি! এর পর করলেন ‘বিপন্নতা’, ‘পাঞ্চজন্য’। ২০১৭ সালে মঞ্চস্থ হয় স্বাতীদির লেখা ‘রানি কাদম্বিনী’। ততদিনে তিনি ধীরে ধীরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। তবুও মনের জোর ছিল অসম্ভব। ২০২০ সালেও নিয়মিত তিনি নান্দীকারের ছেলেদের প্রশিক্ষণ শিবিরে যেতেন। ক্লাস নিতেন।
আমি স্বাতীদির সঙ্গে শেষ অভিনয় করেছিলাম ২০২০-র ২৫ ডিসেম্বর ‘নাচনী’ নাটকে, অ্যাকাডেমি মঞ্চে। আর তাঁর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০২১-এর ৩১ জানুয়ারি, স্যারের জন্মদিনে। ওই দিন আমরা ‘ফুটবল’ নাটকটা পড়ছিলাম সবাই মিলে। যদি আবার শো করা যায় এই প্যানডেমিক অবস্থা মিটে গেলে। হবে কিনা জানি না, তবে ওঁকে আর আমরা পাব না।
গত ১৬ জুন ২০২১ স্বাতীদি আমাদের ছেড়ে চিরকালের মতো চলে গেলেন। থেকে গেল তাঁর গান, কবিতা, সঙ্গীত, অভিনয় আর আমরা। ‘অজ্ঞাতবাস’ নাটকের একটা দৃশ্যে স্বাতীদি আমার মাথায় দু’বার হাত বুলিয়ে দিতেন। তার পর আমার কেঁদে ওঠার কথা। কিন্তু কোনওদিনই আমাকে কষ্ট করে চোখের জল আনতে হয়নি। চোখে এমনিই জল চলে আসত।
খুব বড় একজন অভিনেত্রীকে আমরা হারালাম। আর আমি হারালাম আমার এক পরম আত্মীয়কে। এর পরেও থিয়েটার হবে নান্দীকারে। কিন্তু একটা বিরাট শূন্যস্থান তৈরি হয়ে গেল। কীভাবে পূরণ হবে জানি না।

ছবি : লেখক
মতামত জানান

Your email address will not be published.