বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

শম্ভু মিত্র : মঞ্চের একক রাজা

বিজন ভট্টাচার্যর সঙ্গে ‘আগুন’ নাটক করার সময়ে তৃপ্তি ভাদুড়ীর সঙ্গে পরিচয় হয় শম্ভু মিত্রর ৷ তৃপ্তি ভাদুড়ীর মাসতুতো দাদা বিজন ভট্টাচার্য৷ এঁদের দু’জনকেই গণনাট্যে এনেছিলেন বিজন ভট্টাচার্য৷ শুধু নাটক নয়, সিনেমাতেও এনেছিলেন তিনি৷

জয়ন্ত সিনহা মহাপাত্র

 

“আমার বয়স হয়েছে ৷ হঠাৎ মারা যেতে পারি ৷ এইটে আমার সর্নিবদ্ধ অনুরোধ যে আমার দেহটিকে নিয়ে বাহার দিয়ে না ঘোরানো হয় ৷ যেখানেই দেহটা থাকার সেখান থেকে সোজা শ্মশানে নিয়ে গিয়ে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলা হবে ৷ ফুল পাতা দিয়ে যেন না সাজানো হয় ৷

এইটে আমার অনুরোধ বলো, আদেশ বলোযা ইচ্ছা বলো৷ কিন্তু দেখো যেন মানা হয়।” শম্ভু মিত্র (১৮/৩/৭২)।

শম্ভু মিত্র এই ইচ্ছাপত্রটি লিখেছিলেন কন্যা শাঁওলীকে৷ শাঁওলী মিত্র বাবার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ১৯৯৭ সালের ১৮ মে গভীর রাতে পিতার মৃত্যুর পর কাউকে কিছু না জানিয়ে সোজা নিয়ে গিয়েছিলেন সিরিটি শ্মশানে৷ বৈদ্যুতিক চুল্লিতে তাঁর দেহটি দান করে ফিরে এসে মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিলেন সবাইকে ৷ বেশিরভাগই মেনে নিতে পারেননি এই শোকসংবাদ ৷ শেষযাত্রায় যেতে চেয়েছিলেন অগণিত মানুষ৷ কিন্তু তাঁদের ইচ্ছে পূরণ হয়নি৷ 

কেন এমন চেয়েছিলেন শম্ভু মিত্র? এ প্রশ্নের উত্তর খানিকটা পাওয়া যেতে পারে ঋত্মিক ঘটককে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে ৷ তিনি লিখছেন“যদিও এ প্রশ্ন তোলা যায় যে রবীন্দ্রসদনগুলো আসলে কাদের? যারা ভালো থিয়েটার সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেতাদের না অন্য সব লোকেদের? তবু রবীন্দ্রসদনটাই আমার বক্তব্যের লক্ষ্য নয়৷ আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে এই দেশের নেতৃত্ব স্থানীয়রা কে কী করেছেন? মাঝে মাঝে করপোরেশন হুমকি দেয় খাজনা বাড়াবে, মাঝে মাঝে সরকার হুমকি দেয় নতুন আইন করে অভিনয় আটকাবে, আর নয়তো দলীয় রাজনীতির প্রশ্রয় দেয় নানা প্রকারে৷ অথচ অন্যদিকে প্রত্যেক নাট্যমঞ্চের ভাড়া বাড়াতে বাড়াতে চলে৷ খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের দাম বাড়তে বাড়তে চলে, ঠেলাওয়ালা থেকে আলো, বাল্ব পর্যন্ত সমস্ত জিনিসের দাম বাড়তে বাড়তে চলে৷ এর মধ্যে যে কী করে ভালো নাট্যপ্রয়াস টিকবে তা বলতে পারো? অথচ সমাজের গণ্যমান্য লোকেরা পিঠ চাপড়ে যান, বিগলিত বৈষ্ণবহাসিতে বলেনচালিয়ে যান, চালিয়ে যান, আপনারাই যা হয় কিছু করছেন, অন্য সব দিকে তো৷ বলে পরিতৃপ্ত নিশ্চিত মুখে বেরিয়ে যান৷” 

আসলে থিয়েটার অন্তপ্রাণ মানুষটিকে গ্রাস করেছিল চরম নৈরাশ্য৷ মেনে নিতে পারেননি শুধু দেখনদারি ভালবাসা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা৷ তাই তিনি চলে যেতে চেয়েছিলেন নির্জনে, নিঃশব্দে ৷নাট্যপ্রাণ শম্ভু মিত্রের জন্ম ১৯১৫ সালের ২২ আগস্ট কলকাতার ডোভার লেনে৷ বাবা শরৎকুমার মিত্র, মা শতদলবাসিনী ৷ তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে শম্ভু মিত্র মধ্যম ৷ শরৎকুমার মিত্র আদতে ছিলেন হুগলি জেলার মানুষ৷ তাঁর পূর্বপুরুষরা হুগলি জেলার কলাছড়া গ্রামের জমিদার ছিলেন৷ কিন্তু শরৎকুমারের কোনওদিনই জমিদারিতে আগ্রহ ছিল না৷ তিনি ছিলেন জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র গ্রন্থাগারিক৷ অন্যদিকে মা ছিলেন ভবানীপুরের স্বনামধন্য ডাক্তার আদ্যনাথ বসুর কন্যা৷ বিয়ের দিন তাঁর হবু স্বামীর অকালমৃত্যুতে বিয়ে করেছিলেন শরৎকুমারকে৷ বিয়ের পর আদ্যনাথ বসু কলকাতার ডোভার লেনের একটি বাড়ি জামাইকে যৌতুক দিয়েছিলেন৷ সেখানেই থাকতেন শরৎকুমার৷

শম্ভু মিত্র পড়াশোনা শুরু করেন বালিগঞ্জ গর্ভমেন্ট হাইস্কুলে৷ এখানে পড়ার সময় থেকেই তাঁর অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়৷ তাঁর সঙ্গে একই ক্লাসে পড়তেন ভাগনে দুর্গা৷ এই দুর্গার ক্লাসে ‘রঘুবীর’ নাটকের আবৃত্তি শুনে আবৃত্তির প্রতি তাঁর ঝোঁক বাড়ে৷ নাটকেও আগ্রহ বাড়ে৷ শাঁওলী মিত্র লিখেছেন “মুখস্থ করার নেশা এবং ক্ষমতা এতটাই ছিল যে ‘সঞ্চয়িতা’ কিংবা তারও পূর্বে ‘চয়নিকা’ গোটাটাই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল৷ কোন পৃষ্ঠায় কোন কবিতা আছে তা পর্যন্ত বলে দিতে অসুবিধা ছিল না ৷ যেন এর চেয়ে সহজ কাজ আর নেই পৃথিবীতে৷”

১৯৩১ সালে শম্ভু মিত্র প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন৷ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে৷ কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ভাল লাগেনি৷ কলেজ ছেড়ে দেন৷ ঠিক করেন নিজেই নিজেকে শিক্ষিত করে তুলবেন৷ তবে হঠাৎ বাবার সঙ্গে তাঁকে চলে যেতে হয় উত্তরপ্রদেশে৷ উত্তরপ্রেদেশের এলাহাবাদে থাকার সময় থেকেই শম্ভু মিত্র শরীর ও স্বরের চর্চায় মন দেন৷ মন দেন পড়াশোনায়৷ নাটক, সাহিত্য, বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন৷১৯৩৬-৩৭ সালে শম্ভু মিত্র ফিরে আসেন কলকাতায়৷ এখানে ওঠেন বন্ধু বিশ্বনাথ মিত্রের বাড়িতে ৷ সেখান থেকে ল্যান্সডাউন রোডে জ্যোতিনাথ ঘোষের বাড়ি৷ এখানেই শম্ভু মিত্রের থিয়েটার, সিনেমার প্রতি আগ্রহ বাড়ে৷ নতুন করে শরীর ও স্বরের চর্চা করেন৷ তবে তাঁর থিয়েটারে যোগ আকস্মিকভাবে৷ শম্ভু মিত্রের কথায় “গিয়ে দেখি কোথায় সেই কল্পনার থিয়েটার৷ একটা পার্ট ধরিয়ে দিলে, এতটুকু একটা কাগজের মধ্যে খুদে খুদে অক্ষরে লেখা৷ বলল, সন্ধেবেলা এটা অভিনয় করবেন৷” 

রিহার্সাল নেই, মঞ্চ-নাটকে অভিনয় সম্পর্কে ধারণা নেই, তবু অভিনয় করলেন শম্ভু মিত্র৷ যুক্ত হলেন ‘রঙমহল’ থিয়েটারে৷ নাট্যমঞ্চে পা রাখলেন পরবর্তীকালের মঞ্চের রাজা শম্ভু মিত্র৷ সালটা সম্ভবত ১৯৩৯৷ এখানেই পরিচয় হয় নাট্যকার মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যর সঙ্গে, যিনি তাঁর পরবর্তীকালের মহর্ষি৷ রঙমহলে তিনি অভিনয় করেন ‘মালা রায়’, ‘রত্নদীপ’, ও ‘ঘূর্ণি’ নাটকে ৷ তার পর রঙমহল বন্ধ হয়ে যায়৷ প্রখ্যাত অভিনেতা ভূমেন রায় শম্ভু মিত্রকে নিয়ে যান ‘মিনার্ভা’-য়৷ ‘জয়ন্তী’ নাটকে অভিনয় করেন৷ পরে চলে যান ‘নাট্যনিকেতন’-এ৷ তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’-তে মিস্টার মুখার্জীর ভূমিকায় অভিনয় করেন৷ কিন্তু হঠাৎ নাট্যনিকেতন উঠে যায়৷ শিশির কুমার ভাদুড়ী ‘শ্রীরঙ্গম’ নাম দিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন থিয়েটারের৷ সাক্ষাৎ ঘটে শিশির ভাদুড়ী-শম্ভু মিত্রের৷ যদিও এখানেও বেশিদিন টিকতে পারেননি শম্ভু মিত্র৷ যোগ দেন ‘কালীপ্রসাদ ঘোষ বি.এস.সি টুরিং’ কোম্পানিতে৷ কিন্তু এখানেও মন টেকেনি৷ 

তখন যুদ্ধ, মন্বন্তর, দেশভাগ, দাঙ্গায় উত্তাল দেশ৷ শম্ভু মিত্র লিখছেন “তখন ১৯৪১ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল৷ আমি শ্যামবাজার থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছি এবং ফ্যাসীবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের সঙ্গে পরিচিত হইনি৷ কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমাদের নিঃসহতায় কষ্ট পেয়েছি৷” এর পর তিনি লিখলেন প্রথম নাটক ‘উলুখাগড়া’, শ্রীসঞ্জীব নামে৷ তার পর ডাক পান ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের৷ খুঁজে পান নাটকের প্ল্যাটফর্ম৷ শ্রীরঙ্গম-এ ১৯৪৪ সালের ২৪ অক্টোবর গণনাট্য সংঘের ব্যানারে পরিচালনা করেন ‘নবান্ন’৷অধ্যাপক পবিত্র সরকারের কথায় “নবান্নর ওই প্রথম অভিনয়ের পর শ্রীরঙ্গমের তখনকার স্বত্বাধিকারী শিশির কুমার ভাদুড়ী ওই মঞ্চে আর এ নাটক অভিনয়ের সুযোগ দেননি, রঙমহলের পরিচালক অহীন্দ্র চৌধুরী সাত দিনের টাকা নিয়েও নাটকের নাম শুনে সে টাকা ফেরত দেন৷ বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসের বদল যেমন হল, তেমনি তার ভূগোলও বেশ খানিকটা বদলে গেল বলা যায়৷ নতুন সময়ের নাট্যকাররা নাটক লিখবেন, অনুবাদ বা দেশিকরণ করবেন, গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ দেবেন, মূলত এই নতুন নাট্যকর্মীদের জন্য, যাঁদের অনেকেই প্রথম দিকে ছিলেন ভারতীয় গণনাট্যর সন্তান৷ এই নতুন নাটক, গণনাট্য পর্বেই হোক, আর গ্রুপ থিয়েটার পর্বেই হোক, আগেকার নাটকের চেয়ে অনেক বেশি পথে পথে ঘুরবে৷ আর এ নাটকের দর্শকের চরিত্রও বদলে যাবে৷” 

এর পর বিজন ভট্টাচার্যর সঙ্গে ‘আগুন’ নাটক করার সময়ে তৃপ্তি ভাদুড়ীর সঙ্গে পরিচয় হয় শম্ভু মিত্রর ৷ তৃপ্তি ভাদুড়ীর মাসতুতো দাদা বিজন ভট্টাচার্য৷ এঁদের দু’জনকেই গণনাট্যে এনেছিলেন বিজন ভট্টাচার্য৷ শুধু নাটক নয়, সিনেমাতেও এনেছিলেন তিনি৷ ‘জবানবন্দী’ অবলম্বনে ‘ধরতি কে লাল’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি ভাদুড়ী৷ ছবিটি দারুণ সাড়া জাগিয়েছিল৷ এই ছবিতে অভিনয়ের সময়েই শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি ভাদুড়ী পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন৷ শাঁওলী মিত্রের কথায় “মা বাবার বিয়ে হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ১০ ডিসেম্বর মুম্বাই শহরে৷ ওদের বিয়ে হয়েছিল খাজা আহমেদ আব্বাসের বাড়িতে৷”

শম্ভু মিত্র – তৃপ্তি মিত্র

১৯৪৮ সালে শম্ভু মিত্র  গণনাট্য ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করে ৷ কেন গণনাট্য ত্যাগ করেন এ নিয়ে নানাজনের নানা বক্তব্য আছে৷ খানিকটা আন্দাজ পাওয়া যায় শম্ভু মিত্রের নিজের বক্তব্যে “যাঁদের শিল্পকলা সম্পর্কে কোন বোধ নেই, অথচ কিছু মার্কসীয় শিল্পতত্ত্বের বুকনি জানা আছে, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারা আমার ক্ষমতায় কুলোত না৷” তাই ১৯৪৯ সালে (মতান্তরে ১৯৫০) গড়ে তোলেন ‘বহুরূপী’ নাট্যদল৷ দলের নামকরণ করেন মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য৷ ১১ এ নাসিরুদ্দিন রোড হয়ে ওঠে বহুরূপীর ঠিকানা৷ তার পর বহুরূপীর প্রযোজনায় পর পর মঞ্চস্থ হয় ‘পথিক’ (১৯৪৯), ‘উলুখাগড়া’ (১৯৫০), ‘ছেঁড়াতার’ (১৯৫০), ‘বিভাব’, (১৯৫৯)৷ বিষয়গত দিক থেকে এইসব নাটকে গণনাট্যর ছাপ থাকলেও নাটকের আঙ্গিক বদলে যায়৷ অভিনয়েও স্বতন্ত্রতার ছাপ ধরা পড়ে৷ বিভাস চক্রবর্তীর কথায়“এইভাবে নবনাট্য আন্দোলন শম্ভু মিত্র ও গণনাট্যর হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল অনেকখানি৷ সেই আন্দোলনকেই আজ আমরা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বলে জানি।”  

শম্ভু মিত্রের প্রথম রবীন্দ্রনাটক ‘চার অধ্যায়’৷ খালেদ চৌধুরীর ধারণা, বিষয়গত কারণেই শম্ভু মিত্র উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়েছিলেন৷ দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে নাটকটি অভিনীত হয়েছিল৷ নাটকটি বামপন্থী মহলে তুমুল আলোড়ন ফেলেছিল৷ নাটকটি দেখে নাট্যকার অমল রায় বলেছিলেন“প্রত্যেকবার দেখার সময় আমি মনে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ নিয়ে হলে ঢুকতাম, কিন্তু বেরিয়ে আসতাম বুকের মধ্যে কাউকে না বলতে পারা এক আশ্চর্য যন্ত্রণা নিয়ে৷”

রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ শম্ভু মিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজন৷ রক্তকরবী বাংলা তথা ভারতীয় নাটকে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল৷ অভিনেতা-নির্দেশক বিভাস চক্রবর্তী সে নাটক দেখার মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন এইভাবে “এত সহজে যে গল্পটি বলা হল, তাতে করে যে স্পষ্ট এবং আর একটি আবছা ছবি তৈরি হয়েছিল কিশোর মনে, তার কথাকার ও রূপকার তো মহানির্দেশক শম্ভু মিত্র৷ আজকাল মঞ্চভাষার কথা খুব শোনা যায়৷ কিন্তু এখন বুঝতে পারি কী অসাধারণ এক নাট্যভাষার উদ্ভাবন ঘটেছিল মঞ্চে যার প্রয়োগ ওই রকম এক কঠিন ‘আনস্টেজেবল’ নাটক মঞ্চায়িত হল, সারা দেশের নাট্যভূমিকে নাড়িয়ে দিল৷” কিন্তু দুর্ভাগ্য, তৎকালীন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এই নাটকটি প্রথম দুটি অভিনয়ের পর বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল৷

মঞ্চে শম্ভু মিত্র

শম্ভু মিত্রর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ‘পুতুল খেলা’৷ নাটকটি দেখে অভিনেতা দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় লেখেন “পুতুল খেলা দেখে এক অবিশ্বাস্য জগৎ আমার চোখের সামনে হাজির হয়েছিল৷ তার মধ্যে প্রেম, নারী-পুরুষের সম্পর্কের গভীর দ্যোতনা, ব্যঞ্জনা ছিল৷ এমনকি তার মধ্যে খুব পরোক্ষভাবে সেক্স এবং কেমন করে একটা সম্পর্ককে কখন ডমিনেট করে তাও ছিল৷ কেমন করে যেন মনের মধ্যে আমার অবচেতনে ওই নাটকটি প্রভাব বিস্তার করেছিল৷ তাঁদের দুজনের অভিনয়ের মায়াজাল আমাকে মুগ্ধ করেছিল৷”

এর পর ‘মুক্তধারা’ (১৯৫৯), ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ (১৯৬১), ‘বিসর্জন’ (১৯৬১), ‘রাজা অয়দিপাউস’ (১৯৬৪), ‘বাকি ইতিহাস’, (১৯৬৭), ‘বর্বর বাঁশি’ (১৯৬৯), ‘পাগলা ঘোড়া’ (১৯৭১), ‘চোপ আদালত চলছে’ (১৯৭১) পরপর মঞ্চস্থ করেন৷ রক্তকরবী ও পুতুল খেলা ভারত ও ভারতের বাইরে মঞ্চস্থ হয়েছে৷ আন্তর্জাতিক নাট্যজগতেও সুনাম অর্জন করেছেন৷ কিন্তু সাধের বহুরূপী শম্ভু মিত্রকে ছাড়তে হয়েছিল৷ ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল শম্ভু ও তৃপ্তি মিত্ররও৷ 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭৮-এর ১০ জুন পুতুল খেলা-র মহলায় শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রর মধ্যে এক বিবাদের সূত্রপাত হয়, যার পরিণাম সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠল প্রতিষ্ঠানের পক্ষে৷ এই ঘটনার পর দু’জনের একসঙ্গে অভিনয় করার সম্ভাবনা যখন আর কিছুতেই রইল না, বহুরূপীকে বেছে নিতে বলা হল কোনও এক পক্ষ৷ সুতরাং বহুরূপীর দুর্ভাগ্য, বাংলা নাটকের দুর্ভাগ্য, পরিস্থিতি তাঁদের ঠেলে দিল, বাধ্য করল এক পক্ষ নিতে৷ সে পক্ষ তাহলে বহুরূপীর ইতিহাস অনুসারে তৃপ্তি মিত্রর৷ কুমার রায়ও এক লেখায় পরে এ কথা জানিয়েছেন৷ তাই ১৯৭৮-এর ১৫ জুন কলামন্দিরে দু’জনে রাজা অয়দিউপাউস নাটকে এবং ১৬ জুন শম্ভু মিত্র ‘দশচক্র’ নাটকে শেষবারের মতো বহুরূপীর হয়ে অভিনয়ে নামলেন৷ সে সময়ে অবশ্য দু’জনে পৃথক থাকতেন ৷ শম্ভু মিত্র বহুরূপীর সম্পাদককে একটি চিঠিতে লিখলেন “আমার আর তৃপ্তির সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা লিখেছো যাতে অত্যন্ত সঙ্কুচিত বোধ হচ্ছে, আমরা আলাদা থাকি একথা সকলেই জানে এবং সেটা অন্যায় নয়৷ বরং ভদ্রজনোচিত৷”পরের বছর আগস্টে শাঁওলী মিত্র বহুরূপী ছাড়েন এবং যার পক্ষ নেওয়ার কথা ইতিহাসকার জানিয়েছিলেন, অর্থাৎ তৃপ্তি মিত্র বহুরূপী ছাড়লেন ওই উনআশিরই ডিসেম্বর মাসে৷ তৃপ্তি মিত্রর লেখা চিঠির শেষ লাইনগুলো ছিল অনেকটা এরকম “স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমাকে আর দরকার নেই৷ প্রেসিডেন্টের সং সেজে আমি আর থাকতে চাই না৷ আমি ছুটি নিলাম৷ আজ থেকে আমি আর বহুরূপীর কেউ নই৷”

শম্ভু মিত্রর চলার পথ ছিল বন্ধুর৷ বারবারই তাঁকে দল ত্যাগ করতে হয়েছে৷ যাপন করতে হয়েছে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা৷ আসলে তাঁর মধ্যে ছিল তীব্র অভিমান৷ অভিমানেই ছেড়ে দিলেন ঘর, নিজের দল ৷ ব্রাত্য বসু তাই সঠিকভাবেই লিখছেন “আর কোনও দিন কোনও দল গড়লেন না তিনি৷ যে ‘রক্তকরবী’র রাজা ছিল একা, যে ‘দশচক্র’র পূর্ণেন্দু হয়ে গেছল একা, যে  ‘রাজা’র রাজা ছিল একা, যে ‘পুতুল খেলা’র তপন হয়ে গেছল একা, যে ‘অয়দিপাউস’এর  অয়দিপাউস পেল নির্বাসন, যে ‘চার অধ্যায়’এর অতীন হল একা, সেই একাকিত্ব যেন গ্রিক ট্রাজেডির নিয়তির মতোই প্রবেশ করলো তাঁর জীবনে৷ আক্রমণ আর কুৎসার নিরন্তর হাতুড়ির বাড়ি, স্ব-জনের ক্রমাগত ভুল বোঝা, ঈর্ষা আর মধ্যমেধার উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে না যুঝে তার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন তিনি৷ একদম গ্যালিলিওর মতোই৷ কন্যা ভার্জিনিয়াকে নিয়ে গ্যালিলিওর শেষ জীবন কাটানোর মতোই শম্ভু মিত্রও যেন নীরবে, নিরুচ্চারে বললেন, আমি তোমাদের নির্বাসন দিলাম৷ তোমরা বাঁচো এ সব নিয়ে ৷ সামনে শুধু ফেলে রাখলাম আমার কাজ, আমার ‘দিসকোর্সি’৷ তাই নিয়ে বিচার হবে ইতিহাসের, মূল্যায়ন জারি থাকবে অনবরত ততদিন , যতদিন জাতি বাঁচবে, ভাষা বাঁচবে আর বাঁচবে ভাষাকেন্দ্রিক আদরে-ভালোবাসার বেদনায়-আর্তিতে মাখামাখি হয়ে যাওয়া এই নাট্যশিল্প চর্চা৷”

 

ছবি : ইন্টারনেট

 

 

মতামত জানান

Your email address will not be published.