বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

বাঙালির হাতপাখা

পাখার প্রতিটি তালপাতার পালকে মুক্তোর অক্ষরে লেখা চিঠি। সব মিলিয়ে মস্ত একটা প্রেমপত্র। যেন জয়দেবের গীতগোবিন্দ। সোমা খুব যত্ন সহকারে রেখে দিয়েছিল সেই তালপাতার চিঠি। হাতপাখার এমন মলয় সমীরণ ক’জনের জীবনে আসে!

সেন্টু

 

আশির দশকে বহু গ্রাম ছিল যেখানে তখনও দেওয়াল টিপলে আলো, বোতাম ঘোরালে হাওয়া কিংবা নাট ঘোরালে জল পড়ত না। সে সময় প্রকৃতির হাওয়াই ছিল শেষ কথা। আমাদের বাড়ির লাগোয়া ছিল বিশাল এক পুকুর। আজও আছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে সে পুকুরের জল কমত ঠিকই তবে তা এতটা কমত না যে চানের অযোগ্য হত। আর দুপুরে সেই পুকুর বেয়ে আসা শীতল শীতল হাওয়াই ছিল সারা বাড়ির ফুসফুসের আরাম। তবে প্রকৃতির হওয়ায় টান পড়লেই তালপাতার পাখা ছিল আমাদের সম্বল। কবজির মোচড়ে যেটুকু হাওয়া আসত সেটাই ছিল ছোটবেলার বাতানুকূল। তালপাতার সেই পাখার বাঁটে আমাদের ছোটবেলার কত ইতিহাস লুকিয়ে আছে তা কেবল আমরাই জানি ।

সন্ধেয় পড়াতে আসতেন পাড়ার মধুদা। অ্যাকাউন্টেন্সির মেধাবী ছাত্র। ছোটবেলায় পোলিও হয়ে দুটো পা পঙ্গু হয়ে যায়। তবে মধুদা কে দেখতাম সেই পা নিয়েই পাড়ার ক্যারাম, তাস থেকে শুরু করে ভলিবল, ফুটবল, ক্রিকেট, সব কিছুতেই যোগ দিতে। আর ছিল তার অঙ্ক প্রীতি। আমরা যখন অঙ্কের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতাম সে সময় মধুদা বলতেন, অঙ্ক হল দামি লজেন্স। কামড়ে খেতে নেই চুষে খেতে হয়। যত চুষবি ততই মজা। 

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের এমন গরমের দিনে খোলা আকাশের নীচে আমাদের বারান্দার বড় করে মাদুর পাতা হত। মাঝে থাকত একটাই হ্যারিকেন। আমরা সবাই ওই হ্যারিকেন ঘিরেই বসতাম। মধুদা এসে বসতে না বসতেই মানদামাসি এক কাপ চা আর একটা হাতপাখা নিয়ে হাজির হত। এক হাতে চা খেতে খেতে সমানে চলত আর এক হাতের হাতপাখা। আর চা খাওয়া শেষ হতেই সেই পাখার হাতল হয়ে উঠত একটা আস্ত ছড়ি। অঙ্ক ভুল হলে, বানান ভুল হলে কিংবা সূত্র মুখস্থ না পারলে এলোপাথাড়ি সেই হাতলের সৌজন্যে মাথায় যদি আলু গজাত তো গায়ে, হাতে-পায়ে ফুটে উঠত সরলরেখা থেকে বক্ররেখার আজব চিত্র।মধুদার পড়ানো শেষ হতেই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত মোচার ঘণ্ট আর চিংড়ির মালাইকারির রসালো গন্ধ। মার খাওয়ার পর এ গন্ধ যখন প্রাণে-মনে তীব্র খিদের উদ্রেক করত ঠিক সে সময় গেট খোলার আওয়াজ। বুঝতাম বাবা আসছে। দ্রুত গুটিয়ে ফেলা বইপত্তর আবার নামিয়ে শুরু করে দিতাম পড়াশোনা। তার পর বাবা হাতের ব্যাগপত্তর রাখতে রাখতেই বলত, “শুনেছ তোমার ছেলের কীর্তি? 

হাতে কাঁসার গ্লাসে ঠান্ডা জল এগিয়ে দিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে মা বলত, “কেন, আবার কী হল।”

“কেন? ওকেই জিজ্ঞেস করো।” 

“আচ্ছা, তুমি বসো, আমি চা নিয়ে আসচি।” 

খালি গ্লাসটা বাবার হাত থেকে নিয়ে মা পাখাটা বাবার হাতে দিতেই প্রমাদ গুনলাম আমি। লাঠিচার্জ আসন্ন। “কী রে, চুপ করে আছিস কেন?” 

মাথা নিচু করে অস্পষ্ট স্বরে বলতাম, “অঙ্কে বারো পেয়েছি।” 

নিস্তব্ধ সারা বাড়ি। বেশ কিছুদিন কালবৈশাখী না আসায় গুমোট গরম। একটুও হাওয়া নেই। তারই মধ্যে বাবার ঝটিকা। “তুই ফেল করবি সেটা আমি জানি। অঙ্কে বারো পেয়েছিস তাতেও আমার দুঃখ নেই। তাই বলে আমার সই নকল করে খাতা জমা দিবি? কাল তো সম্পত্তি লুটে নিয়ে আমাদের রাস্তায় নামাবি। দ্যাখো, খাইয়ে-পরিয়ে কেমন কালসাপ পুষেছ।”কালসাপদের কি আর মান-অপমান থাকলে চলে! এত মারের পরও ডাল, বেগুনভাজার সঙ্গে মোচার ঘণ্ট আর চিংড়ির মালাইকারি সাঁটিয়েছিলাম আমেজ করে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। কিন্তু সেই বিদঘুটে গরমে যতবারই ঘুম ভেঙেছে, ততবারই দেখেছি আধা ঘুমন্ত বাবার পাখা ধরা হাত ঘুরে গেছে সারারাত আমার মাথার ওপর। সেদিন বুঝিনি। আজ বুঝি, স্নেহশীল পিতার অর্থ কী।

পরদিন ভোরবেলায় উঠোনে কয়লার আঁচে হাওয়া দেওয়ার জন্য মানদামাসির হাতে পাখাটার হাল দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে মাসি বলল, “হাওয়া খাওয়ার জন্য এনেছিলাম। কিন্তু তোমাদের পিঠে পড়ে পড়ে এর হাতলটাই গেছে।” বুঝেছিলাম, তালপাতার পাতার কত রূপ। 

আর এক রূপ দেখেছিলাম সোমাদি আর সৌম্যদার সাধাসিধে রোমান্টিকতায়। অকালে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর দাদাই ছিল সোমাদির সব। তবে বউদিটিকেও পেয়েছিল কপাল করে। সোমার সব আদর-আবদার ওই বউদির কাছে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর দাদা যখন পাত্র দেখার জন্য নিতাই ঘটককে ডেকে পাঠাল, সেদিনই সোমা কেঁদে আছড়ে পড়ল বউদির পায়ে। “আমি আরও পড়তে চাই বউদি। তুমি দাদাকে পাত্র দেখতে মানা করো।” 

এর পর শহরের কলেজ। প্রতিদিন হইহই করে বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেনে করে কলেজে যাওয়া-আসার সময় আলাপ সৌম্যর সঙ্গে। চুপচাপ, মিষ্টভাষী সৌম্যকে সোমার বেশ লাগত। সেদিন ট্রেনে উঠেই পাশাপাশি বসার জায়গা পায় দু’জনেই। সোমাকে দরদর করে ঘামতে দেখে সৌম্য বের করেছিল তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট ফোল্ডিং ছাতা। বেশ সুন্দর দেখতে। অনেকটা ঠাকুরের পিছনে চাঁদমালার মতো। দু’দিকে দুটো ছোট ছোট বাঁট। সেই বাঁটের সঙ্গে বোনা অসংখ্য পাখির পালকের মতো তালপাতা। দুটো বাঁট ধরে খুললেই ময়ূরের পেখমের মতো খুলে যেত আস্ত একটা পাখা। সৌম্য তা দিয়ে হাওয়া দিতেই সেদিন সেই হাওয়া যেন সোমার শরীর ভেদ করে মরমে প্রবেশ করেছিল। 

ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের এই প্রেম ট্রেনেই সীমাবদ্ধ ছিল। দু’জনের দু’জনকে ভাল লাগলেও ভয়ে হোক, লজ্জায় হোক, প্রকাশ করতে পারেনি কোনওদিনই।সেদিন ছিল চৈত্রের শেষ দিন। অফিস ফেরত মানুষের সঙ্গে সঙ্গে চৈত্র সেল ফেরত মানুষের ভিড়ে ঠাসা কম্পার্টমেন্ট। কোনওক্রমে জায়গা করে নিলেও হাওয়া খাওয়ার অবস্থায় ছিল না কেউই। দরদর করে ঘামতে থাকা সোমাকে ফোল্ডিং পাখাটা দিয়ে সৌম্য বলেছিল, “ভিড় কমলে ব্যবহার করো।” এর পর সৌম্য তার স্টেশনে নেমে গেলেও ভিড় আর কমেনি। সোমারও আর হাওয়া খাওয়া হয়নি। তবে রাতে কী মনে করে ব্যাগ থেকে হাতপাখাটা বের করে খুলতে গিয়েই অবাক হয়ে গেল সে। পাখার প্রতিটি তালপাতার পালকে মুক্তোর অক্ষরে লেখা চিঠি। সব মিলিয়ে মস্ত একটা প্রেমপত্র। যেন জয়দেবের গীতগোবিন্দ। সোমা খুব যত্ন সহকারে রেখে দিয়েছিল সেই তালপাতার চিঠি। হাতপাখার এমন মলয় সমীরণ ক’জনের জীবনে আসে!

সোমাদি আর সৌম্যদার কথা বাতাসের গভীরে থাকুক। নিতাইদার কথা হোক। 

আমাদের পাড়ার নিতাইদা নির্বাচনে দাঁড়িয়েই দেখিয়ে দিয়েছিল, নির্বাচনী হাওয়া এমনি এমনি ওঠে না, তুলতে হয়। সেবার নিতাইদা ক্ষমতাসীন দলের টিকিট না পাওয়ায় কপাল ঠুকে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার প্রতীক চিহ্ন হয় হাতপাখা। গ্রাম্য রাজনীতিতে তখন সকাল-সন্ধে জামা বদলের মতো দলবদল হত না। খুল্লামখুল্লা ছাপ্পা ভোটেরও রমরমা ছিল না। ফলে নেতারা তো বটেই, পাড়ার ছেলে-বুড়োরাও বাড়ি গুনে বলে দিতে পারত কারা কত ভোট পেতে পারে। তবে রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও সারা গ্রাম কিন্তু মিলেমিশেই থাকত। একে অপরের কথা শুনত। নিতাইদার তাই সোজাসাপটা বক্তব্য, “আমি আপনাদের লোক। আমায় আপনারা আমায় ভোট দিন আর না দিন, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমি আপনাদের সেবায় ব্রতী ছিলাম আর আমৃত্যু থাকবও। এ শুধু কথার কথা নয়। পাশের বাড়ির প্রতিমার প্রসবযন্ত্রণার সময় ঠান্ডা হাওয়ার প্রলেপ যেমন দিয়েছি, তেমনই ছটফটে নরেনকে এই আমিই ঘুম পাড়িয়ে আসছি। আজ সেই নরেন যুবক। আমার হাতে সেই হাতপাখা। জন্ম থেকে মৃত্যু, আনন্দে, নিরানন্দে আমি আপনার পাশে ছিলাম, থাকব। ওইসব নেতাদের মতো কথার চিঁড়ে ভিজিয়ে চলে যাব না।” 

বক্তব্যে সবার প্রশংসা আর হাততালি পেলেও নিতাইদাও জানত যে কেবল মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজবে না। তাই সারা গ্রামের জন্য নিয়ে এসেছিল হাজার হাজার হাতপাখা। জ্যৈষ্ঠের গরমে সেই হাতপাখায় সারা গ্রাম ছেয়ে গিয়েছিল। এমনকি ভোটের দিনও প্রিসাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে শাসক ও বিরোধী দলের সমস্ত এজেন্টের হাতে হাতে ঘুরছিল হাতপাখা। দীর্ঘ লাইনে ভোটারদের হাতে হাতে হাতপাখা দেখে সেদিন ফলাফলের আগেই ঘোষণা হয়ে গেছিল এবার গ্রামে হাতপাখা।

শুনেছিলাম এভাবে নাকে ঝামা ঘষে দেওয়ায় শাসক দল নিতাইদাকেই অঞ্চল প্রধান ঘোষণা করে। তবে নিতাইদার হাতপাখার গুণকীর্তন এত বেড়ে গিয়েছিল যে নিতাইদা নাকি শেষমেশ রাজনীতি ছেড়ে পাখার ব্যবসায় মন দেয়।হাতপাখার সেই সুদিন আজ আর নেই। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের জন্য বাল্য-কৈশোরের মাথায় পাখার বাঁটের ক্রমাগত উৎপীড়নও আজ আর হয় না। তবে রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানের উনুনের আঁচে আগুন তুলতে সকাল-সন্ধেয় ভাঙা হাতপাখার আজও কোনও বিকল্প নেই। কংক্রিটের জঙ্গলে ভরা এই শহরে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব না থাকলেও শহরতলি এবং গ্রামবাংলায় প্রদীপের মা কিংবা রমেনজেঠু এখনও বালিশের তলায় একখানা তালপাতার পাখা গুঁজে রাখবেই রাখবে। কারণ, বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে কিন্তু কেউ জানে না কখন বিদ্যুৎ যাবে আর কখনই বা আসবে।  

তবে ব্যতিক্রম আমাদের প্রতিমাপিসি। যতই সিলিং ফ্যান থাকুক আর এসি চলুক, জামাই এলে পিসির হাতপাখা চাই-ই চাই। সোফায় বসে জমিয়ে জামাইকে হাওয়া না করলে প্রতিমাপিসির নাকি জামাই আদরের তৃপ্তি হয় না। ফ্লিপকার্টে তালপাতার হাতপাখা থাকুক আর না থাকুক, বাঙালির হাতপাখা কিন্তু বাংলার মনে।

 

অঙ্কন : সেন্টু

  

মতামত জানান

Your email address will not be published.