বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

বিরুদ্ধ-সাক্ষ্য

…শোষকের ভাষাকে হাতিয়ার করে শোষকের বিরুদ্ধে লড়া বেশ অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। তবুও মানুষ লড়ে যায়, ঘাতকের ভাষাটি রপ্ত করে সে ঘাতককে আক্রমণ করে, তার প্রতিবাদ জানায়, তার স্বরকে তুলে ধরে।

বিকাশ গণ চৌধুরী

 

ঔপনিবেশিক শোষকদের লুণ্ঠনের যে দিকটা আমাদের প্রায়শই নজর এড়িয়ে যায় সেটা হল ভাষা। ইংরেজদের তাঁবে প্রায় দুশো বছর থাকলেও আমরা তেমন করে এটা লক্ষ করি না— ইংরেজি ভাষার শিক্ষা আমাদের একটা অর্জন বলেই বোধহয়, যা দিয়ে আমরা এই ভুবনগ্রামে করেকম্মে খাই— তলে তলে যে আমাদের ভাষা নড়বড়ে করে দেওয়ার পরিকল্পনা চলে সেটা আমরা দেখতে পাই না। ইংরেজদের ভাষা-লুণ্ঠনের চেয়ে ফরাসিদের ভাষা-লুণ্ঠন যেহেতু অনেক গুণ বেশি, অনেক গুণ আক্রমণাত্মক, সে কারণে ফরাসি উপনিবেশে এই ব্যাপারটা সাদা চোখেই দেখা যায়। ফরাসিরা যেখানে যেখানে উপনিবেশ স্থাপনের নামে গেঁড়ে বসেছিল সেখানে সেখানেই সেই দেশের ভাষাকে প্রথমেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফল হয়েছে বিষময়। ভাষা কেড়ে নেওয়ার ফলে সে দেশের মানুষজন ঠিকমতো নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন না, শোষকের ভাষাকে হাতিয়ার করে শোষকের বিরুদ্ধে লড়া বেশ অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। তবুও মানুষ লড়ে যায়, ঘাতকের ভাষাটি রপ্ত করে সে ঘাতককে আক্রমণ করে, তার প্রতিবাদ জানায়, তার স্বরকে তুলে ধরে। ঔপনিবেশিকরা তাদের দেশ দৃশ্যত ছেড়ে গেলেও নয়া-উপনিবেশবাদের কৌশলে পুরনো বোতলে নতুন মদের মতো উপনিবেশের হিংস্র থাবার চাপ রয়েই যায়। সে কারণে পুরনো উপনিবেশের একজন লেখককে বলতে হয় : “স্বাধীনতার পর লোকেরা যেমন করেছে, আমি তা-ই করব; সাহেবদের ছেড়ে যাওয়া বাড়ির পাথর একটা একটা করে খুলে নিয়ে বানাব আমার নিজের বাড়ি, নিজের ভাষা।”

নিজের দেশীয় ভাষায় নিজেকে জ্ঞাপন করতে না পারার জন্য তাকে মেনে নিতে হয় ঔপনিবেশিকের স্বর, সহ্য করতে হয় তার নিজের পরিচয়ের অবহেলা। নিজেদের মনে হয় এক ভূত। পিঠে বয়ে বেড়াতে হয় লুণ্ঠনকারীর গির্জার ঘণ্টা, দেবদারু গাছ আর রাজহাঁস।

এই ভাবনার দর্শন থেকেই আলজেরিয়ার লেখক কামেল দাউদ লিখেছেন : ‘ম্যরসো, বিরুদ্ধ সাক্ষ্য’। (Meursault, contre-enquête, ম্যরসো, কন্ত্র-অঁকেত)। যে লেখায় কামেল প্রশ্ন তুলেছেন অলব্যের কাম্যুর বিখ্যাত উপন্যাস, ‘বহিরাগত’ (L’Étranger, লেত্রঁজে)-তে খুন হয়ে যাওয়া আরব মানুষটির পরিচয়হীনতার। আমরা জানি, সমুদ্রসৈকতে খুন হয়ে যাওয়া মানুষটির কথা বলতে গিয়ে বইয়ে পঁচিশ বার ‘আরব’ শব্দটি ব্যবহার করলেও তার কোনও নাম আমরা পাই না। লেখকের জবানিতেই বলি : “সাহেব, যা যা নিজের করে নিচ্ছে তাকেই একটা নাম দিয়ে দিচ্ছে, আর যেটা উপদ্রব সৃষ্টি করছে, নাম তুলে নিচ্ছে তার থেকে। এভাবেই কয়েক শতক ধরে সে তার সম্পত্তি বাড়িয়েছে। যেভাবে হারা উদ্দেশে ইতিউতি চলে-ফিরে বেড়ায় লোক, সময় খতম করে, সেভাবে তাকে খুন করবে বলে সে আমার দাদার নাম দিয়েছে আরব। … লেখক তার কোন নামকরণ করেনি, করলে আততায়ীর আত্মসংকট হতো; যার নাম আছে তাকে চট করে মেরে ফেলা যায় না। … সে [কথকের দাদা] খতম হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে, কিন্তু তার যে কোনো অস্তিত্ব ছিল সে কথা প্রমাণ করা প্রায় অসাধ্য”।

লেখক লেখাটা লিখেছেন মুসার ভাই হারুনের জবানিতে। আর মুসা— মুসা খুন হয়ে যাওয়া সেই মানুষ, যাকে কাম্যু শুধুমাত্র ‘আরব’ বলেই দায় সেরেছেন। কাম্যুর উপন্যাস শুরু হয়েছিল এই বাক্য দিয়ে : « Aujourd’hui, maman est morte. Ou peut-être hier, je ne sais pas. » (আজ, মা মারা গেছেন, নাকি গতকাল, আমি [ঠিক] জানি না)। এই বাক্য এখন অতি বিখ্যাত। কামেল তার উপন্যাস শুরু করছেন ঠিক এর বিপরীতে :  « Aujourd’hui, maman est encore vivante. » আজও মা বেঁচে [আক্ষরিক অনুবাদ : আজ, মা এখনও বেঁচে।] এভাবেই সেই আরব-খুনের বিরুদ্ধ-সাক্ষ্যের বিষয়মুখ ঠিক হয়ে যায়।

নানান ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে আমরা জানতে পারি মুসার পরিবারের, বড় করে দেখলে সমস্ত ঔপনিবেশিত মানুষজনেরই পরিচয় খোঁজার এক ইতিহাস। জানতে পারি কীভাবে একটা লোক এক দিনের ভেতর প্রথমে তার নাম, তার পর তার জীবন, তার পর তার লাশটাকেও খোয়ায়। আমরা মুখোমুখি হই “আরব বলে কোনো নাগরিকত্ব হয় কিনা” সেই প্রশ্নের। সেখানে কথক জানতে চায় : কোথায় সেই দেশ?

যে নির্জ্ঞানের দর্শনের অভিজ্ঞানরূপে রাখা হয় ‘বহিরাগত’-কে, তার নায়কের সেই সর্বাত্মক নীর্বেদের নীচে এডোয়ার্ড সাইদের মতো তাত্ত্বিকরা চিহ্নিত করেছেন ঔপনিবেশিক মনের উপনিবেশ হারানোর বিষাদ। যদি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা পাঠ করতে পারি সেই বই তবে আমাদের সামনেও খুলে যাবে সেই গোপন অবদমনের লেখচিত্র।

কামেল আমাদের সামনে উন্মোচিত করছেন সেই খুন, যা শুধু খুন নয়। নিজেকে দার্শনিক সংকটের বলিপ্রদত্ত প্রমাণ করে কীভাবে এক আততায়ী ম্যরসো বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠল আর প্রকৃত বলি তলিয়ে গেল ‘আরব’ নামের এক অনির্ণেয় পরিচয়ের নীরবতায়। হ্যাঁ, ম্যরসো একটি মানুষকে খুন করল দু’বার। প্রথমে তার শরীরকে, তার পর তার আত্মপরিচয়কে। নিহত মানুষটি কি ‘আরব’ ছিল? আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কোর মানুষরা বার্বার জনগোষ্ঠীর লোক। তারা কথা বলে হয় বার্বার ভাষায় নয়তো আরবি ভাঙা এক ভাষায়। এখানেই প্রকট হয়ে উঠে আসে সেই অপরিচয়ের অবহেলা।

তবে এ কাহিনি কোনও একমুখী বয়ে চলা নয়। দাদার খুনের অনুরূপে হারুন যখন হত্যা করে বসে এক অচেনা, অজানা ফরাসিকে তখন থেকে কাহিনি বাঁক নেয় অন্য এক পথে। সেই খুনের পর হারুনের মনে হতে থাকে, তার দাদার মৃত্যুর মূল্যহীনতা সে মেনে নিতে পারেনি অথচ তার প্রতিশোধের কপালেও তো জুটল সেই একই অপবাদ। তার মনে হতে লাগল : “এত সবের পরও তো তৃপ্তি এল না।… খুনের পর শুধু যে নিজের পবিত্রতা খোয়ালাম, তা নয়, আরও বেশি করে খোয়ালাম জীবন আর অপরাধের মধ্যেকার সীমারেখা; সেই রেখা মুছে গেলে ফের কায়েম করা যায় না। অপরের মাপে নিজের যে পরিমাপটা নিই খুনের পর সেটা হারিয়ে যায়।” তার আরও মনে হল : “খুন করে রেহাই পেলে খুনির মনে এক ধরণের আলস্যের স্বাদ কায়েম হয়; তার সঙ্গে অপূরণীয় কিছু একটার বোধ : অপরাধ চিরকালের মতো ভালোবাসাকে, ভালোবাসার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়।”

খুনের পর হারুনের চোখে জীবন হারিয়ে ফেলল তার পবিত্রতা। তার কাছে হারিয়ে গেল নারীশরীরের আবেদন, পরমের বিভ্রম তৈরি হবার সম্ভবনা। মনে কামনা জেগে উঠলেই তার মনে হতে লাগল এমন অনায়াসে যাকে ধ্বংস করা যায় তাকে সে কীভাবে ভালবাসবে? তা কি ভাবের ঘরে চুরি হয়ে যাবে না? এসবেরও পর, স্বাধীনতার পরপরই এক ফরাসিকে হত্যার কারণে বীরের সম্মান দূরে থাকুক, তার কপালে জোটে স্বাধীন আলজেরিয়ার পুলিসরাজের হাতে অপমান। তার পরই যে কাহিনি চলেছিল ঔপনিবেশিক ‘অপর’-এর সমালোচনা লক্ষ করে তা ঘুরে গেল ঔপনিবেশিক-উত্তর সমাজ, তার দেশের দিকে। আর এখানেই এই আখ্যানটি আলাদা হয়ে গেল অন্যান্য সমগোত্রীয় উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রতি-আখ্যানের থেকে। কোথাও এসে যেন হারুন আর ম্যরসো মিশে গেল। মিশে গেল সেইখানে যেখানে দু’জনের সমালোচনার লক্ষ্য : ধর্ম ও রাষ্ট্র। যেখানে দু’জনের চেতনায় সৃষ্টিশীল বিদ্রোহ। বিপ্লব নয়, বিদ্রোহ। সমষ্টির নয় ব্যক্তির। যেখানে দু’জনেরই স্বাধীকারকামী মন প্রশ্ন তোলে, সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।

শুধুই কাম্যুর উপন্যাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নেই এই উপন্যাস। দার্শনিক তত্ত্বকথার সীমা পেরিয়ে তা ঢুকে পড়েছে আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক ও সামাজিক ভূমিতে। আর ধর্মের বিরুদ্ধে।

কামেল দাউদের জন্ম ১৯৭০-এ। পরিবারে প্রথম আলোকপ্রাপ্ত। স্বদেশে স্বৈরতন্ত্র ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর লেখালেখির কারণে তার অনুগামী এবং শত্রু এই দুইয়েরই অভাব নেই। সংবাদপত্রে লিখতে লিখতেই এই আখ্যান লেখার পরিকল্পনা করেন। ২০১৩ সালে বইটি প্রথমে আলজেরিয়ায় এবং পরে ২০১৪ সালে ফ্রান্সে প্রকাশিত হয়। প্রথম বছরেই বিক্রি হয় লক্ষাধিক কপি। মাত্র দুটি ভোটের ব্যবধানে ফসকে যায় ফ্রান্সের সবচেয়ে নামজাদা ‘গোঁকুর পুরস্কার’ (Prix Goncourt)। তবে পান ‘শ্রেষ্ঠ প্রথম উপন্যাসের গোঁকুর পুরস্কার’ (Prix Goncourt du Premier Roman)। এ বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। আর সম্প্রতি ২০২২-এর জুনে (প্রকাশকের ঘোষণায় অবশ্য ২০২১-এর মার্চ) তৃণাঞ্জন চক্রবর্তীর তর্জমায় প্রকাশ পায় বাংলায়। সচরাচর এত দ্রুত কোনও সাম্প্রতিক সময়ের বিদেশি আখ্যান আমাদের বাংলায় অনূদিত হয় না। এ এক খুশির খবর।

 

 

Comments are closed.