বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

মাটি থেকে আকাশে : ডাকঘর

অমলকে ঘরের মধ্যে বন্ধ থাকতে হয়েছিল কারণ সে অসুস্থ, এই শরৎকালের রৌদ্র আর বায়ু এ দুই-ই ওই বালকের পক্ষে বিষবৎ। অমল তাই ঘরের মধ্যেই বসে থাকে, কিন্তু ফকিরবেশী ঠাকুরদা সেই বন্ধনের মধ্যেই এনে দেন বাইরের পৃথিবীকে, বাস্তবের যতটা, কল্পনার পৃথিবী তার চেয়ে অনেক বেশি।

সৌমিত্র বসু

 

যদি প্রশ্ন করেন, রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কী? আমি দ্বিধাটুকুও না করে জবাব দেব, ডাকঘর। হঠাৎ খেয়াল হল, এই নাটকটির একশো দশ বছর বয়েস হয়ে গেল। একশাে দশ বছর? আবার পড়তে বসলে দেখা যায়, দ্রুতলয়ে পালটে যাওয়া এই পৃথিবীতে একই স্বাদ, একই মায়া নিয়ে পাঠকের জন্যে অপেক্ষা করে আছে সে। পাঠকের জন্যে, সেই পাঠকে যিনি অবয়ব দেবেন সেই অভিনয়শিল্পীদের জন্যে। কেন ভাল লাগে ডাকঘর? তার অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে প্রথম কারণটি নিয়ে দু-চার কথা বলতে চাই।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে লেখা শারদোৎসব থেকে রবীন্দ্রনাথের নাট্য রচনায় এক নতুন পর্ব শুরু হল, যা চলবে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ফাল্গুনী পর্যন্ত। আমরা দেখেছি, শারদোৎসবে এসে রবীন্দ্রনাথ নাটক রচনার প্রথাগত ধাঁচাগুলােকে নানাভাবে অস্বীকার করলেন, অন্য রকমের হয়ে উঠল তাঁর নাটক। এর মধ্যে একটি হল সম্ভাব্যতা বা বাস্তবতার যুক্ত-শৃঙ্খলকে ভেঙে দেওয়া। শারদোৎসব নাটকের অনেক কিছুই যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, ঠিক যেমন যাবে না রাজা নাটকের বেশ কিছু অংশ। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পেল তাঁর দুটি নাটক, ডাকঘর আর অচলায়তন। এখানে কিন্তু যুক্তির একটা আবরণ আছে। যদিও সেই আবরণের ভেতর থেকে যে যুক্তির অতীত দর্শন বা ভাবনা বেরিয়ে আসছে তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। বলা যেতে পারে, এই দুটি নাটকেই দুটি স্তর আছে। এক স্তরে তা যুক্তিনির্ভর ঘটনাক্রম দিয়ে সাজানাে আখ্যান, অন্য স্তরে সেই আখ্যানকে অতিক্রম করে যাওয়া। তাও যদি বা অচলায়তনের কোনও কোনও অংশ নিয়ে প্রশ্ন তােলা সম্ভব, ডাকঘরে কিন্তু প্রায় নিশ্ছিদ্রভাবে যুক্তিক্রমকে মেনে চলা হয়েছে। বলা যেতে পারে, অসাধারণ ক্ষমতায় রবীন্দ্রনাথ বাস্তবতা এবং সম্ভাব্যতা দিয়ে ঘেরা একটি আখ্যানের মধ্যে বাস্তবােত্তীর্ণ নানা ব্যঞ্জনা সঞ্চারিত করে দিতে পেরেছেন। বিষয়টি বােঝবার জন্যে আমরা এ নাটকের কাহিনি সামনে রাখতে চাই।

ডাকঘর নাটকের কাহিনি খুব সরল। বলা যেতে পারে প্রথাগত অর্থে নাটকীয়তা বর্জিত। মাধবদত্ত নিঃসন্তান, মধ্যবিত্ত মানুষ। তাঁর দূর সম্পর্কের ভাইপাে অমল, অসুস্থ, বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। মাধবকে কৃপণ বলা উচিত হবে বলে মনে করি না, তবে সে অর্থব্যয় বিষয়ে সতর্ক একজন গৃহস্থ। তবু, সম্ভবত দায়ে পড়েই এই বাপ-মা হারা আত্মীয় বালকটিকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। কিন্তু স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মেই এই বালকের প্রতি তার মায়া পড়ে গেছে, যেমন মায়া পড়ে গেছে মাধবের স্ত্রী, অমলের পিসিমারও। নাটকের শুরুতেই আমরা কবিরাজের মুখে জানতে পারি, অমল খুবই অসুস্থ, বস্তুত মৃত্যুপথযাত্রীওর ভাগ্যে যদি আয়ু থাকে তাহলে দীর্ঘকাল বাঁচতেও পারে, কিন্তু আয়ুর্বেদে যে রকম লিখেছে তাতে তো। অমল খুব দুর্বল, শরীরের প্রতিরােধশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে, বাইরের আলাে হাওয়া তার শরীরের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু একটা ছােট ছেলে কেবলমাত্র ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে চাইবেই বা কেন? শেষপর্যন্ত সে পথের পাশে জানলার ধারে বসে থাকার অনুমতি পায়।

সেই পথ দিয়ে নানা ধরনের মানুষ যায়। অমল তাদের দেখে, কারও কারও সঙ্গে ডেকে কথাও বলে। এমন করে তার সঙ্গে আলাপ হয় দইওয়ালা, প্রহরী, মােড়ল, সুধা বা খেলতে যাওয়া ছেলের দলের। অমলের জানলার কাছে এসে দাঁড়ায় যারা, কথা বলে, তাদের আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে চাই। এক, দইওয়ালা, প্রহরীদের মতো বয়স্ক মানুষকেবল যে অসুস্থ এই ছােট ছেলেটিকে দেখে তাকে সঙ্গ দেবার ইচ্ছে থেকেই তারা অমলের সঙ্গে দু’দণ্ড কাটিয়ে দিতে চায় এমন নয়। অমলের কাছ থেকে এরা তাদের চেনা পৃথিবীর খুব অন্যরকম রূপের কথা শুনতে পায়। কোথাও হয়তাে নিজের কাজ সম্পর্কে আলাদা রকম একটা ভাললাগার বীজ বুনে দিতে পারে অমল। দইওয়ালা যেমন, দই বিক্রি হবার আশাতেই অমলের জানলার কাছে এসেছিল, দই বিক্রির সম্ভাবনা নেই শুনে চটেও গিয়েছিল। কিন্তু অমলের কথা থেকে সে জানতে পারে, বিক্রির জন্যে সে যে ডাক দিয়ে যায়, তার মধ্যেও আছে এক সঙ্গীত, যা সে কখনও ভেবে দেখেনি। অমলের কল্পনায় আঁকা তার গ্রামের ছবি তাকে মুগ্ধ করে। তার সবটা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না, কিন্তু প্রাত্যহিককতার মধ্যে সুন্দরকে  আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধে হয় না। প্রহরীর ঘণ্টার মধ্যেও অমল আবিষ্কার করে সেই সঙ্গীত, যা চারপাশের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে সুন্দরহয়ে ওঠে। ছেলেটাকে প্রহরীর মজার লাগ। অমল তাকে প্রতিদিনের চেনা জীবনের বাইরে অন্যরকম অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়। বলা দরকার, এ স্বাদ অমল দিতে পারছে তার বালক বয়সের সারল্য থেকে, এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রায় যাই হােক, অমলের কোনও তাত্ত্বিক অভিপ্রায় নেই। দ্বিতীয় ভাগে আছে সুধা এবং বালকদল, যারা অমলের সমবয়েসি। রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ দক্ষতায় বালক-বালিকাদের নিজস্ব কথনভঙ্গি, তাদের নিজস্ব জগৎকে তুলে ধরেছেন এই অংশে।
প্রহরীর মুখেই অমল শােনে, তার ঘরের কাছাকাছি রাজার ডাকঘর বসেছে। শুনে তার কল্পনা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। বাস্তবতার বিচারে ডাকঘর লেখার সমকালে, অর্থাৎ ১৯১২ বা তার কাছাকাছি সময়ে যে কোনও ডাকঘরই হওয়ার কথা রাজার ডাকঘর, কারণ ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে থেকে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত এই ভারত উপনিবেশের শাসনকর্তা ছিলেন রাজা পঞ্চম জর্জ। প্রহরী যে মানেতেই বলুক, অমল কিন্তু রাজা বলতে পঞ্চম জর্জকে বােঝে না, তার কল্পনায় রাজা এক অন্য রূপ নিয়ে আসেন। যেকোনও বালকের পক্ষে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

একেবারে প্রথম দৃশ্যে খুব কম সময়ের জন্যে দেখেছিলাম এক চরিত্রকে। দ্বিতীয় দৃশ্যে সে ছদ্মবেশে আসে। ঠাকুরদার কথা বলছি। পুরনাে আমলের গ্রামীণ তাে বটেই, শহুরে জীবনেও এমন ঠাকুরদার দেখা পাওয়া যেত। তাঁরা মূলত অবসর জীবন যাপন করছেন। নিজের এবং পাড়ার সব ছােট ছেলেমেয়ের আদরের ধন। তাদের সঙ্গে গল্প করা, খেলা করার মধ্যে দিয়ে যাপন করেন তাঁর দ্বিতীয় শৈশব। ডাকঘরে ঠাকুরদার দুটি বৈশিষ্ট্য। এক, তিনি রবীন্দ্রনাথের অন্য ঠাকুরদা বা দাদাঠাকুরদের মতো দলবেঁধে চলেন না, একটি মাত্র বালকের রােগশয্যার পাশেই সময় কাটান। আর দুই, অমলের সামনে তিনি আসেন ফকিরের ছদ্মবেশে। দুটি বিষয় লক্ষ করতে বলি। এক, যদিও ছেলেগুলােকে ঘরের বাইরে বের করাই ঠাকুরদার বুড়াে বয়েসের খেলা, তাই সংসারী, গৃহস্থ মাধবদত্ত তাকে ভয় করে। এর উত্তরে ঠাকুরদা বলেছিলেন, ঘরে বসিয়ে রাখার মতো খেলাও তিনি কিছু কিছু জানেন। কেমন সে খেলা তার পরিচয় পাওয়া যাবে দ্বিতীয় দৃশ্যে। সেখানে ফকিররূপী ঠাকুরদাদা অমলকে নানা অলীক দেশের গল্প বলেন। বাস্তবে তাদের কোনও অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়, কিন্তু ফকিরের ধরতাইটুকুর সুত্র ধরে অমল কল্পনায় মনের মধ্যে সে দেশকে গড়ে নিতে পারে।
জীবনে যেমন হয়, সকলেই যে এই ছােট ছেলেটি আর তার তার কল্পনার ভুবনকে প্রশ্রয়ের চোখে দেখে তা নয়। অমলের ডাকে মােড়ল আসে। তার নাম পঞ্চানন মােড়ল দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। চকিতে আমাদের মনে অন্নদামঙ্গলের সেই পঙ্‌ক্তিটি। ভেসে ওঠে কু কথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ। অন্নদামঙ্গলের কবি যে অর্থেই ব্যবহার করে থাকুন না কেন, রবীন্দ্রনাথ এই নামটি হয়তাে তার বাইরের অনুষঙ্গ নিয়েই প্রয়ােগ করেছেন। অমল রাজার চিঠির জন্যে অপেক্ষা করে আছে শুনে মােড়লের মনের বিষ উঠে আসতে চায়। মাধবদত্তকে বিপদে ফেলার অস্ত্র হিসেবে সে নেয় এই খবর। আসে সুধা, ফুল তুলে যাবার পথে অমলের সঙ্গে তার দেখা হয়, আসে ছেলের দল, অমল তাদের নিজের সব খেলনা দিয়ে দেয়।

ছেলের দলকে খেলনা দিয়ে দেওয়ার এই ঘটনার সূত্রে অধ্যাপক পবিত্র সরকার একটি জরুরি তথ্য জানিয়েছেন আমাদের। ডাকঘর : নাস্তিকের নিবিড় পাঠ নামের একটি অসামান্য প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ১৯৭৩ নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপােলিসে মিনেসােটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল কলেজ ও On Death and Dying (1968, Macmillan & Co. | New York) গ্রন্থের রচয়িতা মৃত্যু বিশেষজ্ঞ ডক্টর এলিজাবেথ কুবলার-রস এর একটি বক্তৃতায় শুনেছিলাম, মৃত্যুপথযাত্রী শিশুর ব্যবহারের মধ্যে অনেক সময় এরকম লক্ষণ দেখা যায়। যে খেলনাটি নিয়ে দু’দিন আগেও ভাই বা বােনের সঙ্গে তার তুমুল লড়াই হয়েছে, সেটি সে অক্লেশে তাকে দিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ কুবলার রসের লেখা পড়েননি, কিন্তু শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ে তাঁর কী আশ্চর্য জ্ঞান ছিল তা এই সুত্রে বুঝতে পারা যায়। সুধার সঙ্গে কথােপথনের শেষে সুধা তার জন্যে ফুল নিয়ে আসবে বলে কথা দিয়েছিল। এ নাটকের শেষ দৃশ্যে সেটিও এক জরুরি তথ্য হয়ে আসবে।

শেষ দৃশ্যে অমল ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জীবাত্মা, পরমাত্মা ইত্যাদি প্রসঙ্গ সরিয়ে রেখে সমগ্র দৃশ্যটিকে যদি তার মৃত্যুকালীন আচ্ছন্নতার মধ্যে চলে যাওয়া বলে মনে করি, তাহলে দেখতে পাব, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চরিত্রের মুখে তার ভাললাগা কথাগুলি কেমন করে শরীর ধরে সত্য হয়ে আসে তার চোখের সামনে। এই আচ্ছন্নতার পথ বেয়ে রবীন্দ্রনাথ ডাকঘর নাটকটিকে বাস্তবােত্তীর্ণ করে তুলেছেন, কিন্তু তার একটা বৈজ্ঞানিক যুক্তি থাকার কারণে অন্য নাটকের মতো সম্ভাব্যতার বােধকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। বলা বাহুল্য, এতক্ষণের আলােচনায় যে সূত্রগুলাে বিন্যস্ত করা হয়েছে, পরের আলােচনায় তা আরও বিস্তারিত রূপ পাবে।

যদি মনে রাখি, প্রতীক শব্দের অর্থ হল, কোনও কিছু যা অন্য কিছুর ব্যঞ্জনাকে প্রকাশ করছে, তাহলে ডাকঘর নাটকে বেশ কিছু প্রসঙ্গ প্রতীকে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথের অন্য বহু নাটকের মতো এ নাটকেও ঘর আর বাইরের দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়েছে। অমল থাকে ঘরের মধ্যে, বস্তুত ঘরের মধ্যে আটকে থাকাই তার নিবন্ধ। তার জানলার বাইরে দিয়ে বয়ে চলে জীবনের ছবি, তার ভাল- মন্দ সব কিছু নিয়ে। আমাদের অনিবার্যভাবে মনে পড়বে প্রকৃতির প্রতিশােধ নাটকের কথা। সেখানেও সন্ন্যাসী নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল গুহার মধ্যে, দূর থেকে অবজ্ঞাভরে দেখেছিল সচল মানুষের আনন্দময় জীবনযাত্রা। মনে পড়ে বিসর্জন নাটকের একটি অংশ, যেখান মন্দিরের মধ্যে বন্দি জয়সিংহের সামনে দিয়ে “আমারে কে নিবি ভাই সঁপিতে চাই আপনারে” গাইতে গাইতে চলে যায় নিশিপুরের মেলায় যাওয়া জনতার দল। অবশ্য এদের দু’জনের সঙ্গে অমলের তফাত আছে। সন্ন্যাসী স্বেচ্ছায় নিজেকে গুহাবন্দি করে রেখেছিল। অন্তর থেকে সে প্রত্যাখ্যান করেছিল বাইরের জগৎকে। জয়সিংহকে মন্দিরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে হয়েছিল ধর্মীয় অনুশাসনের জন্যে। অমলকে ঘরের মধ্যে বন্ধ থাকতে হয়েছিল কারণ সে অসুস্থ। শরৎকালের রৌদ্র আর বায়ু, এ দুই-ই ওই বালকের পক্ষে বিষবৎ। অমল তাই ঘরের মধ্যেই বসে থাকে, কিন্তু ফকিরবেশী ঠাকুরদা সেই বন্ধনের মধ্যেই এনে দেন বাইরের পৃথিবীকে। বাস্তবের যতটা, কল্পনার পৃথিবী তার চেয়ে অনেক বেশি।

ঠাকুরদার কথায় পরে আসা যাবে, তার আগে ঘরের বাইরে অমলকে যে যে দৃশ্য টানছে তাদের মাত্রই কয়েকটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, অমলের সংলাপ কতগুলি স্তরে ব্যঞ্জনা তৈরি করছে। প্রথম স্তরে আছে কেবলমাত্র দৃশ্যটির উল্লেখ, দ্বিতীয় স্তরে অমল কেমন করে দেখছে দৃশ্যটিকে, আর তৃতীয় স্তরে দেখতে পাব, অমল শারীরিকভাবে সম্পৃক্ত হতে চাইছে সেই দৃশ্যের সঙ্গে। কয়েকটি উদাহরণ সামনে রাখলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধে হতে পারে।
ক.

দৃশ্যের উল্লেখ

আমি কি ওই উঠোনটাতেও যেতে পারব না? যেখানে পিসিমা জাঁতা দিয়ে ডাল ভাঙেন।

দৃশ্যের বর্ণনা, অমলের নিজের চোখে

ঐ দেখাে-না, যেখানে ভাঙা ডালের খুদগুলি দুই হাতে তুলে নিয়ে লেজের উপর ভর দিয়ে বসে কাঠবিড়ালি কুটুস কুটুস করে খাচ্ছে ওখানে আমি যেতে পারব না?

দৃশ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততার আকাঙ্ক্ষা

আমি যদি কাঠবিড়ালি হতুম তবে বেশ হত।

দৃশ্যের উল্লেখ

আমাদের জানলার কাছে বসে সেই- যে দুরে পাহাড় দেখা যায়

দৃশ্যের বর্ণনা, অমলের নিজের চোখে

পিসেমশায়, তােমার কি মনে হয় ও বারণ করছে? আমার ঠিক বােধ হয় পৃথিবীটা কথা কইতে পারে না, তাই অমনি করে নীল আকাশে হাত তুলে ডাকছে।

দৃশ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততার আকাঙ্ক্ষা

আমার ভারি ইচ্ছে করে ঐ পাহাড়টা পার হয়ে চলে যাই।
গ.

দৃশ্যের উল্লেখ

আমার মত খেপা আমি কালকে একজনকে দেখেছিলুম।

দৃশ্যের বর্ণনা, অমলের নিজের চোখে

…তার কাঁধে এক বাঁশের লাঠি। লাঠির আগায় একটা পুঁটুলি বাঁধা। তার বাঁ হাতে একটা ঘটি। পুরনাে একজোড়া নাগরা জুতাে পরে সে এই মাঠের পথ দিয়ে ঐ পাহাড়ের দিকেই যাচ্ছিল। আমি তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলুম, তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বললে, কী জানি, যেখানে হয়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন যাচ্ছ? সে বললে, কাজ খুঁজতে যাচ্ছি।… তারপরে সেই নাগরা জুতাে পরা লােকটা চলে গেল। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম। সেই যেখানে ডুমুরগাছের তলা দিয়ে ঝরনা বয়ে যাচ্ছে, সেইখানে সে ঝরনার জলে আস্তে আস্তে পা ধুয়ে নিলে তার পরে পুঁটুলি খুলে ছাতু বের করে জল দিয়ে মেখে নিয়ে খেতে লাগল। খাওয়া হয়ে গেলে আবার পুঁটুলি বেঁধে ঘাড়ে করে নিলেপায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়ে সেই ঝরনার জলের ভিতর নেমে জল কেটে কেটে কেমন পার হয়ে চলে গেল।

দৃশ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততার আকাঙ্ক্ষা

আমিও তাদের মত কাজ খুঁজে বেড়াব। … পিসিমাকে বলে রেখেছি ঐ ঝরনার ধারে গিয়ে একদিন আমি ছাতু খাব।
বলা বাহুল্য, এমন উদাহরণ আরাে বেশ কিছু দেওয়া সম্ভব। বলা যেতে পারে, মুখ্যত দ্বিতীয় স্তরের কারণেই অমল তার জানলার সামনে আসা প্রায় প্রতিটি মানুষের ভালবাসা আদায় করে নেয়। দইওয়ালাকে সে তাদের গ্রামের বিবরণ দিয়ে দেয়, সে বিবরণ যে হুবহু মেলে তা নয়। বাস্তবের সঙ্গে শিল্পের যা সম্পর্ক, বলা যেতে পারে দইওয়ালার গ্রামের সঙ্গে অমলের বর্ণনার মধ্যে তারই একটি উদাহরণ দেখতে পাই আমরা। এবং আগে দেওয়া উদাহরণগুলির মতো, এখানেও অমল ভাল হয়ে উঠলে সেই গ্রামে শারীরিকভাবে যেতে চায়। এইভাবে একটা জৈব সংপৃক্ততা তৈরি হয়ে উঠতে পারে। অমলের মুখ থেকে দইওয়ালা বা প্রহরীরা আবিষ্কার করে তাদের প্রাত্যহিকতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যকে। সেই আবিষ্কার তাদের বেঁচে থাকাকে সুন্দর করে তােলে। এর আর একটি উদাহরণ হিসেবে আমরা সামনে রাখতে চাই তৃতীয় দৃশ্যে ফকিরবেশী ঠাকুরদার মুখে ক্রৌঞ্চদ্বীপের বর্ণনা। লক্ষ করলে দেখা যাবে এই দ্বীপের রূপ অমল ধরিয়ে দিচ্ছে ঠাকুরদাকে, ঠাকুরদা তাকে অবলম্বন করেই দ্বীপটির ছবি তৈরি করছেন। যেমন—

অমল।। ক্রোঞ্চদ্বীপ কিরকম দ্বীপ আমাকে বলাে না ফকির!

ঠাকুরদা৷৷ সে ভারি আশ্চর্য জায়গা। সে পাখিদের দেশসেখানে মানুষ নেই, তারা কথা কয় না, চলে না, তারা কেবল গান গায় আর ওড়ে।।

অমল।। বাঃ! কি চমৎকার। সমুদ্রের ধারে?

ঠাকুরদা।। সমুদ্রের ধারে বই কি।

অমল।। সব নীল রঙের পাহাড় আছে?

ঠাকুরদা।। …

অমল।। পাহাড়ে ঝরনা আছে?

ঠাকুরদা।। …

অমল।। আমি যদি পাখি হতুম তাহলে—

নিশ্চয় লক্ষ করব, পাখিদের দেশ এই সূত্রটুকু ধরে দ্বীপটির একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করবার দিকে অমলই ঠাকুরদাকে এগিয়ে দিচ্ছে এবং শেষে আসছে সেই অমােঘ সংলাপ, সেও পাখি হয়ে উঠতে চায়। এই হয়ে উঠতে চাওয়ার সূত্রেই আমরা পরবর্তী কোনও অধ্যায়ে অমলকে বােঝবার চেষ্টা করব।

ফকিরেরই মুখে রাজার চিঠি আসার সংবাদটুকু পেয়ে ঠিক এমনিভাবেই সে ডাকহরকরার যাত্রাপথের একটি অসামান্য বর্ণনা দেয়, যাকে রবীন্দ্রদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ভিন্নতর তাৎপর্য তৈরি হবে। ছােট একটি ঘরের বর্ণহীনতার বিপরীতে এই যে নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা বহির্বিশ্বের নানা প্রকাশ, অমল তার নিজের মতো করে বানিয়ে তুলছে বলেই তারা এ নাটকে প্রতীকের রূপ নেয়। প্রতীকের এই সব ধরনের থেকে আর একটি গভীরতর স্তর চলে আসে যখন প্রহরীর মুখে রাজার ডাকঘরের কথা শােনা যায়। অন্তত তিনটি চাবি-শব্দ চলে আসে এখানে। রাজা, ডাকঘর, রাজার চিঠি এবং ডাকহরকরা। এদের একটি করে বাইরের অর্থ আছে। রচনাকালের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সরল অর্থ বলে মেনে নিতেও কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু শব্দগুলি তাদের অনুষঙ্গের সূত্রে নানা ধরনের ব্যঞ্জনা তৈরি করে। যেমন, রবীন্দ্ৰনাটকের পাঠক বা দর্শক রাজা বলতে বােঝেন ঈশ্বর বা কোনও পরমকে। রাজার মতো নাটকে বা গীতাঞ্জলি গীতিমাল্য গীতালির বহু গানে যাঁর অনুষঙ্গ ছড়িয়ে আছে। ডাকঘর শব্দের অনুষঙ্গে মনে আসে চিঠির কথা। বহুদুরে কোনও প্রিয়জন আমার কথা ভাবছেন, বহু পথ পার হয়ে সে ভাবনা তার আবেগ, তার ভালবাসা নিয়ে আমার কাছে এসে পৌঁছচ্ছে। ডাকহরকরার হাত দিয়ে এমন ভাবনা মনের মধ্যে জেগে ওঠে। আর রাজাকে যদি প্রেম বলে ভাবি তাহলে তাঁর চিঠি নিছক চিঠি নয়, সে যেন ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের যােগ তৈরি করে দিচ্ছে। অথচ, একটি ছােট ছেলে তার নিজের মতো করে কল্পনায় এই সব ছবি তৈরি করছে। এই সম্ভাব্যতাকে নাটক কখনও অতিক্রম করে যায় না।

তৃতীয় দৃশ্যে মৃত্যুর মুহূর্তে অমলের কাছে সত্যি হয়ে আসছে আগে নানাজনের মুখ থেকে শােনা নানা প্রসঙ্গ। যেমন ১। প্রহরী তাকে বলেছিল রাজা তাকেও চিঠি লিখবেন। নাটকের শেষে সে চিঠি সত্যিই আসে। ২। প্রহরী তাকে বলেছিল, অমলের চেনা কবিরাজের চেয়ে বড় কবিরাজ এসে অমলকে ছেড়ে দিয়ে যাবেন। নাটকের শেষে তাই হয়। ৩৷ সুধা তাকে কথা দিয়ে যায় সে ফুল তুলে আসবে। নাটকের শেষে তাই হয়। ৪। মােড়ল বলে রাজা তাঁর জন্যে মুড়ি মুড়কির ভােগ তৈরি রাখতে বলেছেন, রাজকবিরাজও সেই আদেশের কথাই বলেন। বলা বাহুল্য, সম্ভাব্যতার বিচারে এই অংশটিকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু যদি মনে রাখি, এই দৃশ্যে অমল ধীরে ধীরে মৃত্যুর সুষুপ্তিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তখন সে যা কিছু শুনেছে, যা কিছু তার মনের মতো কথা, তাই যেন সত্য হয়ে দেখা দিচ্ছে সেই ঘুমের অতলে ডুবে যাবার মুহূর্তে। এইভাবেই বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েও আকাশে ডানা মেলে দেয় সে। বাস্তবের সব শর্ত মেনে নিয়েও বাস্তবােত্তীর্ণ হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়ায় ডাকঘরকে এক অনন্য নাটক বলা যেতে পারে। আর সেই অনন্যতাই একশাে দশ বছর পরে এই নাটককে নবীন করে রাখে।

 

ছবি: ইন্টারনেট

Comments are closed.