বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে

 

আমাদের এখন নানাবিধ দিবস। সেসব যাতে উদ্‌যাপিত হয় সেজন্য নানাপ্রকার ব্যবস্থাও রয়েছে। গোটা দুনিয়া জুড়েই রয়েছে। সেভাবেই আমরা পরিবেশ দিবসটিকেও পালন করি। তবে তাকে লালন করি না। দিবসান্তে তা যেন আর এক দিবসে বিলীন হয়ে যায়। 

আমাদের এই গ্রহটির বয়স মোটামুটিভাবে সাড়ে চারশো কোটি বছরেরও বেশি। আর মানুষের উৎপত্তি ধরা যায় দু’লক্ষ বছর আগে। পৃথিবীর যে পরিবেশের মধ্যে সে বেড়ে উঠেছিল, যে ধাত্রী তাকে লালনপালন করেছিল, তারই সর্বনাশের পথ মানুষ তৈরি করেছে। সেইসঙ্গে নিজেদের এবং তাবৎ প্রাণীকুলেরও। কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে। আমরা কোনওটিতেই শিখিনি বলেই মনে হচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষা নিয়ে গত পঞ্চাশ বছরে সম্মেলন, আলোচনা, চুক্তি কম হয়নি। তবে তাতে কাজের কাজ তেমন হয়েছে বলে প্রত্যয় হয় না। তার নেপথ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ এমনভাবে নির্মিত যাতে করে প্রয়োগের দিকটি নিষ্ফলা হয়ে যায়। ‘গাছ লাগাও প্রাণ বাঁচাও’, ‘জল ভরো জল ধরো’, ‘একটাই পৃথিবী’ বা এরকম আরও স্লোগান নেহাতই কথার কথা হয়ে ঘুরপাক খায়। পরিবেশ বাঁচানোর নানা উদ্যোগ ও আন্দোলন দিগভ্রান্ত হয়ে যায়, হোঁচট খায় অথবা সুকৌশলে তাদের লাগাম টেনে ধরা হয়। এরমধ্যে উষ্ণায়ন বাড়ছে, আন্টার্কটিকার ও হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাচ্ছে দ্রুত, বাড়ছে সমুদ্রের জলস্তর, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান, নদীগুলো দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, পৃথিবীর নানা অংশে বনজঙ্গল কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে, মানুষের রক্তে ঢুকে পড়ছে প্লাস্টিক, বায়ুদূষণে আশঙ্কার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে নানা দেশ, বেপরোয়া হয়ে উঠছে শিল্পায়ন ও নগরায়ন, গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। সব মিলিয়ে যা একসময় তুমুল করে তুলবে দুর্ভিক্ষ, দাবানল, বন্যা, খাদ্য সংকট। আমরা এই পৃথিবীর গ্রিন হাউসের মধ্যে বসে তার দিকেই ঢিল ছুড়ছি। 

পঞ্চাশ বছর আগে সুইডেনের স্টকহোমে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলন হয়েছিল। তার পর থেকে এই সময় পর্যন্ত পৃথিবীর পরিবেশের উন্নতি ঘটেছে সে কথা বলা যাবে না। ওই পঞ্চাশ বছর আগেই অ্যাপোলো অভিযানের সময় চাঁদ থেকে মাটি এনেছিলেন মহাকাশচারীরা। সেই মাটি বা রিগোলিথে সম্প্রতি গবেষণাগারে জন্ম নিয়েছে সবুজ চারাগাছ। ভবিষ্যতে যদি মানুষকে চাঁদে গিয়ে থাকতে হয় তাহলে সেখানে খাবারের ব্যবস্থা করা যাবে কিনা তেমন ভাবনাচিন্তার বীজ বলা যেতে পারে এই গবেষণা। কিন্তু ততদিনে পৃথিবীর কী হবে সে প্রশ্নের উত্তরে মৌন থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই আপাতত। তবে মানুষ তার প্রতিবেশ নষ্ট করে, তার সঙ্গেই স্থিত অন্য প্রাণীদের বিপন্নতায় পৌঁছে দিয়ে, চোখ মুদে খোশমেজাজে বেঁচে থাকবে এমন ভাবা বাতুলতা। 

আমরা এসব জানি না, বুঝি না এমন নয়। তবু প্রতিদিনের জীবনযাপনে পরিবেশ নিয়ে ভাবনার বা তার জন্য সামান্য কোনও একটি কাজ করার কোনও স্পৃহাই থাকে না আমাদের বেশিরভাগেরই মধ্যে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কবিতার কথা ভেসে ওঠে। “ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে?/মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া।/অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?/কেবল শূন্যে চলবে না আগাগোড়া।” প্রলয় আসছে দেখেও অন্ধ হয়ে বসে থাকার কৌশলকে নির্বুদ্ধিতাই বলে। এভাবে যে একটি একটি দিবস গত হয়ে চলেছে সে কথা না ভুললেই বরং মঙ্গল ছিল। 

সাহিত্যে এসব কথা উঠে আসে। পরিবেশের বিপন্নতা ক্রমশ সাহিত্যের বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। কলম সেখানে থেমে নেই। সাহিত্যিকরা মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন অবিরত। ছোট হলেও ‘সুখপাঠ’ তারই একটি অংশ। 

এর মধ্যেই আরও একটি বছর পেরিয়ে এল ‘সুখপাঠ’। এবার পত্রিকার চব্বিশতম সংখ্যাটি প্রকাশিত হল। অসুখের সময় থেকে শুরু করে ‘সুখপাঠ’ বলেছিল মনের শুশ্রূষার কথা। যে শুশ্রূষা আসে সাহিত্যপাঠের হাত ধরে। সাহিত্য যদি সমাজের চিন্তায় আলোড়ন তোলার কাজে প্রয়াসী হয় তাহলে ‘সুখপাঠ’ নানা দিক থেকে সেই আলোড়নের সঙ্গী হয়ে থাকতে চায়।

 

অরিন্দম বসু
সম্পাদক

 

মতামত জানান

Your email address will not be published.