বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

অন্যান্য গ্রহগণ জীবের নিবাসভূমি কি না?

প্রকৃতপক্ষে কোন গ্রহের নিবাসীদিগের শারীরিক ও মানসিক গঠন, সেই গ্রহের উত্তাপালোক প্রভৃতি চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থার সহস্থায়ী ফল মাত্র। সুতরাং অন্য কোন গ্রহে মানুষের ন্যায় জীব থাকাই অধিক সম্ভব, তবে সে জীব পৃথিবীর মানুষ হইতে অনেক বিষয়ে ভিন্ন হইবে এই মাত্র।

 

স্বর্ণকুমারী দেবী

 

অসীম আকাশ তলে কত তারা কত নক্ষত্র; আমরা চাঁদে দেখি তো পাইতেছি, আবার যাহাদের দেখিতে পাইতেছি না, এমন কত অগণ্য নক্ষত্র তারকায় বিশ্ব পুরিয়া রহিয়াছে। উহারা সকলেই এক একটি সূর্য্য, সকলেই এই সূর্য্যের মতো গ্রহ উপগ্রহ বেষ্টিত হইয়া অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের কোলে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।

ঐ লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি, গ্রহগণ কি সকলেই পৃথিবীর মত জীবের নিবাসভূমি!

বিশ্বের এই অগণ্য তারকাভাণ্ডারে পৃথিবী একটি অণুকণা, অতি সামান্য, অতি ক্ষুদ্র। একদিকে এইরূপে অতি ক্ষুদ্র হইতে ক্ষুদ্র হইয়াও পৃথিবী আর একদিকে অতি মহৎ। পৃথিবী জীবের নিবাসভূমি, কেবল তাহাই নহে, পৃথিবী মানুষের মত বুদ্ধিমান জীবের নিবাসভূমি।

ঐ অগণ্য গ্রহ-জ্যোতিষ্ক-মণ্ডলী সকলেই কি পৃথিবীর মতো তবে জীবপূর্ণ? সকলেই কি জীব প্রতিপালন করিবার উচ্চ উদ্দেশ্য বক্ষে ধারণ করিয়া সেই উদ্দেশ্যকে পোষণ করিতে করিতে চলিয়াছে? এ প্রশ্নের মীমাংসা কে করে! এখানে বিজ্ঞান নিরুত্তর। দূর দূরান্তর-স্থিত সূর্য্যমণ্ডলী বেষ্টনকারী গ্রহগণ বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অতীত। মানুষের দৃষ্টিগম্য এই সৌরজগতের গ্রহ কয়েকটিই যখন পূর্ণ মাত্রায় বিজ্ঞানের আয়ত্তাধীন নহে, তখন সেই অদৃশ্য গ্রহদিগকে বিজ্ঞান কি প্রকারে আয়ত্ত করিবে!

সৌরজগতের যে কয়েকটি গ্রহ উপগ্রহ আছে তাহার মধ্যে চন্দ্রই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণে বিজ্ঞানের আয়ত্তমধ্যে আসিয়াছে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র কতক পরিমাণে চন্দ্রের আভ্যন্তরিক অবস্থা ভেদ করিয়াছে। বৈজ্ঞানিকেরা জানিয়েছেন, চন্দ্রে জল নাই, চন্দ্রে বায়ু নাই। ইহা হইতে তাঁহারা বলেন চন্দ্র জীবশূন্য।

বৃহস্পতি শনি ইয়ুরেনস্‌ ও নেপচুন এত নিবিড় মেঘ ও বাষ্পাবৃত যে তাহা ভেদ করিয়া দূরবীনের দৃষ্টি চলে না।

কিন্তু সেই নিবিড় মেঘ ও বাষ্প সম্ভবতঃ গ্রহগণের আভ্যন্তরিক বিষম উত্তাপের ফল, এবং সেই উত্তাপের মুহূর্মুহুঃ ঘোর ঘনঘটায় বজ্র বৃষ্টি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হইয়া গ্রহদিগকে বিপ্লবস্থ করিয়া তুলিতেছে। সুতরাং বৃহস্পতি শনি প্রভৃতি গ্রহগণের সেই বিষম অবস্থা পৃথিবীর সাম্য অবস্থা হইতে এত ভিন্ন যে উহারা জীবের নিবাসভূমি নহে বলিয়াই বৈজ্ঞানিকেরা অনুমান করেন।

বুধ, শুক্র ও মঙ্গলের আভ্যন্তরিক অবস্থা যতদূর জানা যায় তাহাতে ইহারা অনেক বিষয়ে পৃথিবীর বড় কাছাকাছি, বিশেষতঃ মঙ্গলের আভ্যন্তরিক অবস্থার সহিত পৃথিবীর সর্ব্বাপেক্ষা অধিক ঐক্য দেখা যায়। এ সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিকরা দেখাইয়া থাকেন যে তাহা মনুষ্যের বাসের অনুপযোগী। বুধ ও শুক্র সূর্য্যের অতিরিক্ত নিকট বশতঃ সূর্য্যের নিকট হইতে যেরূপ প্রচুর পরিমাণে উত্তাপ ও আলোক পাইয়া থাকে, সেরূপ প্রচুর উত্তাপালোকে কোনরূপ জীবের প্রাণ রক্ষা হইতে পারে বলিয়া তাঁহারা জানেন না। মঙ্গল গ্রহ এ সম্বন্ধে ভাগ্যবান, সূর্য্যের নিকট পৃথিবী যে পরিমাণে উত্তাপ ও আলোক পাইয়া থাকে, মঙ্গলও প্রায় সেই এক পরিমাণে উত্তাপালোক পায়। সুতরাং উত্তাপালোকের প্রাচুর্যবশতঃ মঙ্গল গ্রহ জীবদিগের বাসের অনুপযুক্ত নহে। কিন্তু উত্তাপালোক জীবে প্রাণরক্ষার প্রধান কারণ হইলেও একমাত্র কারণ নহে। গ্রহের নিজের মাধ্যাকর্ষণ প্রভৃতি তাহার চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থার উপরেও গ্রহস্থ জীবগণ গৌণরূপে নির্ভর করিয়া থাকে। অনেকেই জানেন পৃথিবীর আকার ও পদার্থ সমষ্টির উপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ-বলের হ্রাসবৃদ্ধি নির্ভর করে। যদি পৃথিবীর পদার্থ সমষ্টির পরিমাণ ঠিক এখনকার মত থাকিয়া আকারে ইহা এখানকার অর্দ্ধেক হইত তাহা হইলে ইহার আকর্ষণ-বল এখন যেমন আছে তাহার চতুর্গুণ হইত, অর্থাৎ পৃথিবীর প্রত্যেক দ্রব্যের ভার এখনকার অপেক্ষা চতুর্গুণ বাড়িয়া যাইত।

মঙ্গল গ্রহের পদার্থ সমষ্টি পরিমাণ পৃথিবীর অপেক্ষা অল্প, এবং যে পরিমাণে অল্প তাহা হইতে গণনা দ্বারা স্থির করা যায় যে পৃথিবীর যে দ্রব্য এখানে ওজন ২৭ সের সেই দ্রব্য মঙ্গলে লইয়া গেলে ওজনে ১০ সের মাত্র হইবে। পৃথিবীর আকর্ষণ হঠাৎ মঙ্গল গ্রহের মত কম হইয়া পড়িলে ইহার জীবদিগের পক্ষে তাহা যে কিরূপ হানিজনক তাহা সহজেই বুঝা যায়। হিউএল বলেন পৃথিবীর দ্রব্য সকল তাহা হইলে যেখানে রাখা যাবে সেখানেই ঠিক হইয়া বসিয়া থাকিবে না, মানুষ জীবজন্তু দাঁড়াইবার সময়, বেড়াইবার সময় ঠিক হইয়া চলিতে পারিবে না, জাহাজ যেমন সমুদ্রে টলমল করে সেইরূপ সর্ব্বদা টলমল করিতে থাকিবে। এই স্বল্পাকর্ষণে বাতাস অত্যন্ত লঘু হইয়া যাইবে। এখন পৃথিবীতে সমুদ্রতীরবর্ত্তী এক বর্গইঞ্চ স্থানের উপর বায়ুর ভার প্রায় সাড়ে সাত সের, কিন্তু পৃথিবীর আকর্ষণ মঙ্গলের সমান হইলে, পূর্ব্বোক্ত পরিমিত স্থানের উপর পৃথিবীর বায়ুর ভার প্রায় পৌনে তিন সের মাত্র হইবে। সমুদ্রতীর হইতে ৫ মাইল ঊর্দ্ধে এখন পৃথিবীর এইরূপ লঘু বাতাস দেখা যায়। একরূপ পাখী ছাড়া এ বাতাসে পৃথিবীর অন্য কোন জীবজন্তুর বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব।

মঙ্গলের চারিপাশে কত পরিমাণ বায়ু তা এখনো জ্যোতিষীগণ জানেন না, কিন্তু তাহা পৃথিবীর বায়ুর সমপরিমাণ হউক আর নাই হউক, পৃথিবীর জীবদিগের পক্ষে উহা সকল অবস্থাতেই হানিজনক। পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে, মঙ্গলের আকর্ষণ পৃথিবীর আকর্ষণ অপেক্ষা অল্প, সুতরাং মঙ্গল গ্রহের বায়ুর ঘনত্ব পৃথিবীর বায়ুর ঘনত্বের সমান হইতে গেলে মঙ্গলের বাতাসের পরিমাণ— পৃথিবীর অপেক্ষা অনেক অধিক হওয়া আবশ্যক। কিন্তু তাহা হইলে আবার মঙ্গলের ন্যায় এসব স্বল্পাকর্ষণ-বিশিষ্ট গ্রহে যখন ঝড় হইবে তখন সেই ঘন বাতাসের বল অত্যন্ত অধিক হইবে। সেই ভীষণ বলে পৃথিবীর মতো জীবজন্তু সহজেই উড়াইয়া লইয়া যাইবে। অথচ এদিকে মঙ্গলের বায়ু পৃথিবী অপেক্ষা অধিক ঘন না হইলে মঙ্গলে অত্যন্ত শীতের প্রভাব বৃদ্ধি হইবে, কেননা পৃথিবী অপেক্ষা মঙ্গল গ্রহ সূর্য্য হইতে অধিক দূরে অবস্থান করিতেছে। মঙ্গলে বায়ুর ঘনাবরণ না থাকিলে আভ্যন্তরিক উত্তাপ সহজেই সে বাহিরে ফেলিয়া দিবে। সুতরাং মঙ্গলের বায়ু পরিমাণ পৃথিবীর সমান হইতে আরম্ভ করিয়া যতই ইহার অধিক হইবে— ততই ঝড়ের প্রভাব বৃদ্ধি হইবে— আর যত কম হইবে— ততই শীতের প্রভাব বৃদ্ধি হইবে— কোন অবস্থাতেই পৃথিবীর জীবগণ জীবনধারণ করিতে পারে না। তাহার পর মঙ্গল গ্রহের বৎসরের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর প্রায় দ্বিগুণ। একবার সূর্য্য প্রদক্ষিণ করিতে মঙ্গলের ৬৮৭ দিন লাগে। পৃথিবীর বৎসর মঙ্গলের মত দীর্ঘ হইলে তাহাতে উদ্ভিদ-জগতে বিষম বিপ্লব বাধিবার সম্ভাবনা।

এইরূপে মঙ্গলের চারিদিকের অবস্থা পৃথিবীর অবস্থা সমূহের সহিত মিলাইয়া জ্যোতিষীগণ সিদ্ধান্ত করেন, সম্ভবতঃ মঙ্গল গ্রহও জীব শূন্য। এখন দেখা যাইতেছে, বিজ্ঞান, প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা সৌরগ্রহগণে জীব আছে কিনা সিদ্ধান্ত করিতে না পারিয়াও অন্যরূপে ইহার উত্তর দেন। পৃথিবীর অবস্থা অন্য গ্রহগণের সহিত পরিবর্ত্তন করিয়া বৈজ্ঞানিকরা দেখেন যে সে অবস্থায় পৃথিবীর জীবসকল বিনাশপ্রাপ্ত হইবে। পৃথিবীর উত্তাপ ও আলোক কিছু অধিক হ্রাস বা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হউক, পৃথিবীর আকর্ষণের কিছু অধিক ন্যূনাধিক হউক অমনি পৃথিবীর প্রলয় উপস্থিত হইবে। তাঁহারা এই জ্ঞান দিয়া অন্য গ্রহগণের অবস্থাও বিচার করিতে চাহেন। সুতরাং বৈজ্ঞানিকেরা যখন বলেন সৌরজগতের কোন গ্রহগণ জীবশূন্য—  তাহার অর্থ এই, পৃথিবীতে যেরূপ জীব দেখা যায়, অন্য গ্রহে সেইরূপ প্রকৃতির জীব বর্ত্তমান নাই। ইহার অধিক আর তাঁহারা কিছু বলিতে পারেন না। কিন্তু বৈজ্ঞানিকদিগের এই কথার যথার্থ অর্থ না বুঝিয়া যাঁহারা নিষ্পত্তি করেন পৃথিবী ছাড়া সকল গ্রহই প্রকৃতপক্ষে বসতিহীন— তাঁহাদের নিষ্পত্তির কোনরূপ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। এই অবস্থায় জীবন সম্ভব আর এই অবস্থায় জীবন অসম্ভব, এইরূপ একটি সীমা আজও পর্য্যন্ত বিজ্ঞান দিতে পারে নাই। মেরুদেশবর্ত্তী স্থানে ছয় মাস ধরিয়া সূর্য্য দেখা দেয় না, সেই হিমশৈলাবৃত খণ্ডে যে মানুষ আছে ইহা না জানিলে কি আমরা তাহা মনে করিতে পারিতাম? সেইরূপ দারুণ শীত আমাদের দেশে হঠাৎ আসিয়া পড়িলে আমাদের উদ্ভিদ জীবজন্তু সকলেরই প্রাণবিনাশ করিবে সন্দেহ নাই। সেইজন্য যথার্থ চিন্তাশীল যথার্থ বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিগণ কি অবস্থায় জীবন সম্ভব আর কি অবস্থায় জীবন অসম্ভব— ইহা মীমাংসা করা অসম্ভব মনে করেন।

বিজ্ঞান এ সম্বন্ধে অল্পদিন হইল অতি কঠোর শিক্ষা পাইয়াছে। সুগভীর সাগরতলের অবস্থা বৈজ্ঞানিকগণ যতদূর আয়ত্ত করতে পারিয়াছিলেন, তাহা হইতে তাঁহারা এই সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন যে অতি গভীর সাগর তলে কোন প্রাণী থাকিতে পারে না, কেননা অধিক গভীর জলস্তর দ্বারা সিন্ধুতলে যতখানি চাপ পড়িবার কথা ততখানি চাপে আমরা যে সকল জীবজন্তু জানি তাহাদিগের কোনটিই বাঁচিতে পারে না। তাপ সম্বন্ধীয় পরীক্ষা হইতে তাঁহারা প্রতিপন্ন করেন যে সেই ঘোর জল-চাপে কঠিন কুম্ভীর-পৃষ্ঠ কিম্বা গণ্ডার-চর্ম্ম কিম্বা কঠিনতম ও ঘনতম কাষ্ঠও চুরমার হইয়া যাইবে।

অথচ এখন জানা গিয়েছে যে, সেই অতি গভীর সাগরতলে জীবের বসতি আছে, কেবল তাহাই নহে, তাহারা সাগরতলের সেই গাঢ় অন্ধকার ভেদ করিয়াও দেখিতে পায়। ইহা হইতে দেখা যাইতেছে, কোন স্থানের চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থা ভেদে সেই অবস্থার অনুযায়ী জীব উৎপন্ন হইতে পারে, জীব জন্মিবার জন্য একটি বা কতকগুলি বিশেষ সার্ব্বভৌমিক উপযোগী অবস্থা যে অবশ্য প্রয়োজনীয় তাহা নহে। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিকেরা বলিতে পারেন না— যে, “এই পর্য্যন্ত ইহার সীমা— ইহার অধিক নহে।”

ইয়োরোপের অনেক চিন্তাশীল পণ্ডিতগণ যুক্তিদ্বারা গ্রহগণ যে জীবের নিবাসভূমি ইহাই কল্পনা করিয়া থাকেন। একটি ক্ষুদ্র পৃথিবী ছাড়া— আর কোটি কোটি কোটি গ্রহমণ্ডলী যে জীব পালন-রূপ মহৎ উদ্দেশ্যহীন হইয়া অবারিত গতিতে অনন্তপথে অনন্তকাল ঘুরিয়া বেড়াইতেছে তাঁহাদের মতে ইহা যুক্তিসিদ্ধ নহে।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রাশি রাশি অগণ্য যে সূর্য্য রহিয়াছে, তাহারা কত উত্তাপালোক বিকিরণ করিতেছে! সে সকলি যে বৃথা ব্যয় হইতেছে, এইরূপ কল্পনাই উচ্চতম বৈজ্ঞানিক কল্পনা বলিয়া স্থির হইতে পারে না।

ব্রহ্মাণ্ডের অগণ্য নক্ষত্রের কথা ছাড়িয়া যদি কেবলমাত্র আমাদের সূ্র্য্যের উত্তাপের কথা ভাবা যায় তাহাতেই দেখা যাইবে যে, যে উত্তাপ পাইয়া পৃথিবী জীবিত আছে তাহা সূ্র্য্যের বিকিরিত উত্তাপের ২১, ৭০০, ০০ ০০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। সূ্র্য্যের এই উত্তাপরাশির অতি সামান্য অংশ পৃথিবীর উপকার সাধন করিয়া অবশিষ্ট সকলি কি বৃথা নষ্ট হইতেছে! তাহা নহে, ঈশ্বরের রাজ্যে কিছুই উদ্দেশ্যহীন নহে, কিছুই বৃথা নষ্ট হয় না। আমাদের এই সীমাবদ্ধ ধারণা-শক্তির দ্বারা এই বিশ্বজগতের অভিপ্রায় সীমাবদ্ধ করিতে গেলেই আমরা ভ্রমে পতিত হইব। জ্যোতিষী প্রকটার এ সম্বন্ধে সুন্দর কথা বলিয়াছেন, “ইহা অতি আশ্চর্য্য, যে আমরা মুখে বলিবার সময় ঈশ্বরের মঙ্গলময় ভাব তাঁহার সৃষ্ট বস্তুমাত্রেতেই অর্পণ করি এবং তাঁহাকে অসীম জ্ঞানবান অসীম ক্ষমতাবান বলিয়া থাকি, অথচ অন্য লোকে প্রাণী আছে কি না এ বিষয় মীমাংসা করিতে গেলেই তখন সেই অসীম ক্ষমতাশালী ঈশ্বরের ক্ষমতা ও জ্ঞান সীমাবদ্ধরূপে ধরিয়া লই। অন্য লোকে জীব কল্পনার সময় সেই লোকের স্থানীয়-অবস্থার উপযোগী করিয়া যে তিনি সেখানকার জীবদিগকে সৃষ্টি করবেন ইহা না ভাবিয়া, যেরূপ জীবগণ আমাদের নিকট পরিচিত, আমরা তখনো সেইরূপ জীবগণের কল্পনা করিয়া থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোন লোকে সেইরূপ জীব বাস করিতেই পারে না, আর যদিই বা পারে তবে তাহাদের সেখানে কষ্টের সীমা থাকে না।”

যদি প্রকৃতির মূল নিয়ম, সকল বিশ্বব্যাপী হয়, তবে জীব উৎপাদিনী শক্তি এই পৃথিবীতেই একমাত্র আবদ্ধ এ কথা কেমন করিয়া বলা যায়। ফরাসি জ্যোতিষী ডাক্তার কার্ল ডু-প্রেল ‘গ্রহদিগের নিবাসীগণ’ বলিয়া যে পুস্তক লিখিয়াছেন তাহাতে বলেন, অন্য গ্রহে তাহার চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থার উপযোগী আকার ও শরীরযন্ত্রাদি সম্পন্ন জীব উৎপত্তি (যেরূপ জীবের অস্তিত্ব আমরা জানি না) যে কেবল সম্ভাবনীয় এমন নহে। যদি উহা সৃষ্টির অবশ্য প্রয়োজনীয় নাও হয়— তাহা হইলেও যুক্তি-যুক্তরূপে যে উহা অবশ্য ঘটনীয় ইহা বলিতেই হইবে। এখন কথা হইতেছে, অন্য গ্রহে জীব থাকিতে পারে— কিন্তু পৃথিবীর মানুষের ন্যায় জ্ঞানবান জীব আছে কি না?

যদি অন্য গ্রহে কোনরূপ জীব থাকা সম্ভব হয়— তবে মানুষের মত বুদ্ধিমান জীব থাকা কেনই বা সম্ভব না হইবে? তবে গ্রহের অবস্থা ভেদে সে জীবদিগের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রাদি পৃথিবীর মানুষ হইতে ভিন্ন হইবে সন্দেহ নাই। জীবগণ যাহাতে বাঁচিয়া থাকিতে পারে সেই উদ্দেশে চারিদিকের অবস্থা ভেদে তাহাদিগের আকৃতি ও যন্ত্রাদির বিভিন্নতা দেখা যায়; এক লোকে কোন জীবের যে একটি শারীরিক যন্ত্রের আবশ্যক, অন্য লোকে তাহারি অনাবশ্যক হইতে পারে। সেই হেতু অন্য লোক নিবাসীদিগের আকৃতি, ভার, বল, ইন্দ্রিয়, জীবনের স্থিতিকাল, মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি এই সমুদায়কেই বাসভূমির চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থার উপযোগী হইতে হইবে। প্রকৃতপক্ষে কোন গ্রহের নিবাসীদিগের শারীরিক ও মানসিক গঠন, সেই গ্রহের উত্তাপালোক প্রভৃতি চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থার সহস্থায়ী ফল মাত্র। সুতরাং অন্য কোন গ্রহে মানুষের ন্যায় জীব থাকাই অধিক সম্ভব, তবে সে জীব পৃথিবীর মানুষ হইতে অনেক বিষয়ে ভিন্ন হইবে এই মাত্র।

আমরা দেখিতে পাই, উদ্ভবন, ক্রমোন্নতি, ক্রমবিকাশ সৃষ্টির মূল নিয়ম। ভূতত্ত্ববিদেরা আমাদের দেখাইতেছেন ক্রমোন্নতির নিয়মে জড়ের পর উদ্ভিদ, উদ্ভিদের পর ইতর জীবজন্তু, তাহার পর মানুষ এই পৃথিবীতে উৎপন্ন হইয়াছে। ইহা হইতে একটু ভাবিয়া দেখিলেই এই আমরা দেখিতে পাইব, যখনি সৃষ্ট জগতে কোন বস্তু জড়পদার্থ রূপে ব্যক্ত হইল তখন প্রাণ উৎপাদিনী শক্তি তাহাতে নিহিতরূপে বিদ্যমান রহিল। এই শক্তি সে কোন নূতন স্থান হইতে লইয়া আসিল তাহা নহে, যখন সে জড়রূপে ব্যক্ত হয় নাই, যখন সে অতি সূক্ষ্মতম ভাবে বিশ্বে বিলীন ছিল— সেই আদি কাল হইতেই সে শক্তি তাহার সঙ্গে ছিল।

বাস্তবিক পক্ষে আমরা যাহাদের অচেতন পদার্থ বলি, তাহারা যে প্রকৃতপক্ষে চেতনাহীন তা হইতেই পারে না। তুলনায় মাত্র তাহারা এই নামের বাচ্য। বিজ্ঞান বলিতেছে জগতের শক্তি সমষ্টির হ্রাসবৃদ্ধি নাই, বাহির হইতে নূতন কোন শক্তি আসিয়া শক্তি সমষ্টির সংখ্যা বাড়াইতে পারে না, রূপান্তরভাবে মাত্র তাহা প্রকাশ পাইয়া থাকে। তবে জড় রাজ্যের বাহির হইতে কি করিয়া হঠাৎ জ্ঞান আসিবে? আমি যে এই দেয়ালে মুষ্ট্যাঘাত করিলাম, আঘাত করিবার শক্তি আগে হইতেই অবশ্য আমাতে বিদ্যমান ছিল, তবে সে শক্তি আমাতে লুকাইয়াছিল মাত্র, এখন তাহাই কার্য্যকরী শক্তিতে রূপান্তরিত হইয়া মুষ্ট্যাঘাত হইয়া দাঁড়াইল। অচেতন জগৎ ও চেতনাময়— সমস্ত জগতেই প্রাণ ও চেতনা অস্ফুট ভাবে শক্তির আকারে বিরাজ করিতেছে। তাহারি ক্রমোন্নতি দ্বারাক্রমে সে প্রাণ সে জ্ঞান উদ্ভিদ হইতে ইতর জীবজন্তুতে, ইতর জীবজন্তু হইতে মানবে অধিকতর রূপে পরিস্ফুট হইতেছে মাত্র।

ভাবিয়া দেখিতে গেলে জড় ও প্রাণরাজ্যের বস্তুগত প্রভেদ কিছুই নাই— কেবল মাত্র শ্রেণীগত অর্থাৎ সোপানগত বিভেদ। ঐ যে কতকগুলি সোপান রহিয়াছে, উহারা একই পদার্থে নির্ম্মিত কেবল উচ্চ নীচতায়, পরষ্পর প্রভেদ মাত্র। সেইরূপ জড় পদার্থে ও জীবিত পদার্থে সোপানগত প্রভেদ মাত্র।

জড় ও প্রাণময়, জড় ও চেতনাময় কেবল তাহার চেতনা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়া আছে, সে চেতনা আপনার জমাট বাঁধিয়া তেমন ফুটিয়া উঠে নাই। যাহাকে আমরা জীব বলি তাহাতে তাহা ফুটিয়া উঠিয়াছে। সুতরাং জড়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতম জ্ঞান-বিশিষ্ট প্রাণী-উদ্ভবনের সম্ভাব্যতা বজায় রহিল।

ক্রমোন্নতির এই নিয়মেই পৃথিবীকে আমরা এখনকার এই অবস্থায় দেখিতেছি। প্রথম হইতেই ইহার এ অবস্থা ছিল না— প্রথমেই পৃথিবীতে মানুষ জন্মে নাই। আদিম সৌরজগৎব্যাপী সূর্য্য নীহারিকা হইতে বিচ্ছিন্ন পৃথিবী-গোলক বাষ্পাবস্থা হইতে তরলাবস্থা— তাহা হইতে সংহত-কঠিন অবস্থা ধারণ করিল, তাহার পর পৃথিবী বাসোপযোগী হইলে ইহাতে ইতর জীব উৎপন্ন হইতে আরম্ভ হইয়া ক্রমে মানুষ পর্য্যন্ত আবির্ভাব হইল, এবং এইখানেই যে সেই উন্নতির চরম সীমা তাহাই বা কে বলিবে? বিজ্ঞান দেখাইতেছে যে ক্রমোন্নতির গতি ঘূর্ণ সোপানাবলীর ন্যায় ঊর্দ্ধ হইতে ঊর্দ্ধে উঠিতেছে। এই গতির সঙ্গে সঙ্গে জড়জগৎ হইতে প্রাণীজগৎ সকলেরি চলিতে হইতেছে। তবে যাহারা এই গতির সহিত সমান বেগে দৌড়িতে পারে তাহারাই ঊর্দ্ধ সোপানে উঠে, আর যাহারা তাহা না পারে তাহারা নীচে পড়িয়া ক্রমে ক্রমে তখনকার মত লোপ পায়। ডারউইন এই নিমিত্তই বলিয়াছেন সর্ব্বাপেক্ষা যোগ্য জীবেরাই বাঁচিয়া যাইবে। ভূতত্ত্ববিদরা দেখিতেছেন যে চতুর্পাশ্বস্থ অবস্থার পরিবর্ত্তন অনুসারে যে সকল জীব আত্মরক্ষার উপযোগী শরীরযন্ত্রাদি উদ্ভাবন করিতে না পারে, সে জাতি ক্রমে ক্রমে একেবারে লোপ পাইয়া যায়, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তাহার স্থান শূন্য হইয়া পড়ে না, কেন না অন্য উপযোগী জীব উৎপন্ন হইয়া সে স্থান অধিকার করে। অন্য গ্রহগণ জীবের নিবাসভূমি বলিয়া যদি একবার স্বীকার করা যায়, তাহা হইলে সেই সঙ্গে আরো অধিক দূর পর্য্যন্ত উঠিতে হইবে, ঐ পর্য্যন্ত আসিয়াই থামিতে পারা যাইবে না। যে লোকে জীব আছে, ক্রমোন্নতির নিয়মে সেখানে ইতর হইতে ক্রমে উচ্চতর জীবের আবির্ভাব অবশ্যই সম্ভাবনা বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। তবে এই আবির্ভাব কোন গ্রহে ঘটিয়া গিয়াছে, কোন গ্রহের জন্য অপেক্ষা করিতেছে, এরূপ কল্পনা অসঙ্গত নহে।

 

ভারতী, জৈষ্ঠ ১২৯১

বানান অপরিবর্তিত

 

Comments are closed.